আয়নাঘর-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ

আয়নাঘর-হুমায়ূন আহমেদ

শিখা দপদপ করছেনিভে যাবে না তাে? লিলিয়ান তাকিয়ে আছে হারিকেনের শিখার দিকেতাকিয়ে থাকতে থাকতেই কোন রকম কারণ ছাড়া আচমকা তীব্র ভয়ে লিলিয়ান আচ্ছন্ন হয়ে গেলতার মনে হল ভয়ংকর কোন বিপদ ঘটতে যাচ্ছে

আয়নাঘর

তাহের কিছুক্ষণের মধ্যেই ভয়াবহ কোন বিপদে পড়বেলিলিয়ান যন্ত্রের মত পরপর তিন বার বলল, Oh God! Save him Please, Save him. পরম করুণাময় ঈশ্বরতুমি আমার স্বামীকে রক্ষা কর। লিলিয়ানের সামনে রাখা হারিকেন নিভে গেলসে স্পষ্ট শুনল খুব হালকাপায়ে কে যেন আসছে তার ঘরের দিকেযে আসছে তার পা ছােট ছোট, সে পা ফেলছে খুব সাবধানেদরজার কাছে এসে সে থমকে দাড়িয়েছে, এক হাতে দরজা ধরেছে তা বুঝা যাচ্ছেদরজায় কঁচিকাচ শব্দ হলএর উপস্থিতিই কি লিলিয়ান টির পাচ্ছিল ? কে, কে ? লিলিয়ান আতংকে অস্থির হয়ে কাঁপা গলায় বলল, কে? কে? Who is there

ছােট্ট করে কে যেন নিঃশ্বাস ফেললছােট নিঃশ্বাস, কিন্তু লিলিয়ান স্পষ্ট শুনলসে কি তার নিজের নিঃশ্বাসের শব্দই শুনেছে? ভয় পেলে মানুষের মস্তিষ্ক ঠিক কাজ করে নাতারও কি তাই হয়েছে ? উঃ ভারমান নিশ্চয়ই এর চমৎকার ব্যাখ্যা দিতে পারবেন কিন্তু তার কাছে কোন ব্যাখ্যা নেই। তাহের সিগারেট ধরিয়েছেবর্ষাকাল হলেও কয়েকদিন বৃষ্টি না হওয়ায়রাস্তাঘাট শুকনােএকজন যাচ্ছে সামনে সামনেতার হাতে টর্চলাইট

আয়নাঘর-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ

সে টর্চের আলাে ফেলছেতাহেরের সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে চারজন যুবকএকজনের নাম তাহের জানে ছালামচাচার মেজো ছেলেসে আসছে সবার পেছনেবাকি তিনজন কে? এরা সঙ্গে যাচ্ছে কেন? কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হচ্ছে নাওরাও কিছু বলছে নাচাচার এমন কি জরুরী কথা থাকতে পারে? জমিজমা সম্পর্কিত কিছু? তাহেরের পৈতৃক জমি নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেইযা হবার হবেএগুলি হাতছাড়া হয়ে একদিকে ভাল হয়েছেবন্ধনমুক্ত হওয়া গেছেজমির কারণে তার বাবাকে অপঘাতে মরতে হয়েছেএই অভিশাপ থেকে তাহের মুক্তি চায়তবে বাড়িটা সে রাখবেসংস্কার করাবেলিলিয়ানের যখন এত পছন্দতাদের ছেলেমেয়েরা বড় হলে এদের দেখাতে নিয়ে আসবেকে জানে বৃদ্ধ বয়সে সে নিজেও হয়ত ফিরে আসবেসে এবং লিলিয়ান জীবনের শেষ সময়টা কাটাবে নদীর ধারের এই বিশাল বাড়িতেততদিনে গ্রামে গ্রামে ইলেকট্রিসিটিও নিশ্চয়ই চলে আসবে। 

দলটা নদীর পাড়ে এসে থমকে দাড়ালতাহের বলল, এখানে কি ? টর্চ হাতের ছেলেটা বলল, নদীর হেই পাড়ে যাওয়া লাগবতাহের বিস্মিত হয়ে বলল, নদীর পাড়ে কেন ? পাড়ে কি? ছালাম তুমি এদিকে এসতােমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করিছালাম এল নাসে দ্রুত সুরে গেলগেল নদীর দিকেইসেখানে ঝাকড়া একটা পাকুর গাছ। পাকুর গাছের ডালের সঙ্গে নৌকা বাঁধাচাদ উঠে নি

আয়নাঘর-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ

চারদিক অন্ধকারনক্ষত্রের আলােয় কিছু দেখা যাচ্ছে নাঅসংখ্য ঝিঝি পােকা ডাকছেSomething is very Wrong, তাহের দ্রুত ভবতে চেষ্টা করছেচারজন যুবক তাকে ঘিরে আছে কেন ? এরা নদীর পাড়ে তাকে নিয়ে এসেছে কেন ? হত্যা করতে চায়? কেন চায়? টাকাপয়সার জন্যে ? মানুষ খুন করা এত সহজটর্চ হাতের লােকটা বলল, আসেন নৌকায় আসেন। 

তাহের কি দৌড়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করবে? পারবে পালাতে? এমনও তাে হতে পারে পুরাে ব্যাপারটা কিছুই নাসে ভয় পাচ্ছে বলেই আজেবাজে চিন্তা করছেহয়ত তার চাচা নদীর পারে আরেকটা বাড়ি করেছেনএই ছেলেগুলিকে রাখা হয়েছে বাড়ি পাহারার জন্যে

 খাড়াইয়া আছেন ক্যান? আসেনদেরি কইরা তো কিছু লাভ নাই। 

তাহের যন্ত্রের মত এগুলােপাকুর গাছের কাছে চাদর গায়ে আর একটা লােক দাঁড়িয়ে আছেএই গরমে তার গায়ে চাদর কেন ? লােকটা নৌকায় উঠে বসলতাহের এগুলাে যন্ত্রের মত। 

সবাই নৌকায় উঠল নাছালাম এবং টর্চ হাতে ছেলেটা পাকুর গাছের নিচে দাড়িয়ে রইলবাকি দুজন তাহেরের দুহাত ধরে নৌকায় প্রায় টেনে তুলল

আয়নাঘর-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ 

চাদর গায়ের লােকটা ছাড়াও নৌকার একজন মাঝি আছেমাঝি সঙ্গে সঙ্গে নৌকা ছেড়ে দিলচাদর গায়ের লােকটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আইজ চরম বড় বেশি পড়ছেলােকটির গলার স্বরে বোঝা যাচ্ছে সে বৃদ্ধতাহেরের বলার ইচ্ছা করছে গরম বেশি কিন্তু আপনি চাদর গায়ে দিয়েছেন কেন? তাহের কিছুই বলল নাতাহেরের হাতে সিগারেট, প্যাকেট থেকে বের করে হাতে নিয়েছেআগুন ধরাতে ভুলে গেছেযদিও আগুন নেই তবু তাহের অভ্যাসমত সিগারেট মুখে দিচ্ছে এবং টানছে

চাদর গায়ে বুড়াে লােকটি খুকখুক করে কেশে বলল, নৌকা মাঝগাংগে নিয়া চললােকটির মাথা থেকে চাদর সরে গেছেতার মাথার সব চুল সাদাথুতনির কাছে অল্প কিছু দাড়িদাড়ির রঙ কালােতাহেরের মনে হল তার বুকের উপর দিয়ে বরফ শীতল পানির একটা স্রোত বয়ে গেলএরা তাকে খুন করার জন্যে এখানে নিয়ে এসেছেগ্রামের সব খুনখারাপি হয় নদীর কাছেনদী হত্যার চিহ্ন ধুয়ে মুছে ফেলে। জলধারার প্রবল স্রোত মৃতদেহ অনেকদূর নিয়ে যায়জলজ প্রাণীঅতি দ্রুত মৃতদেহ নষ্ট করে দেয়চেনার উপায় থাকে না

বুড়ো বলল, আপনের সিগারেট নিভাসিগারেট ধরানসিগারেট ধরাইয়া আরাম কইরা একটা টান দেনআহ শালার গরম কি পড়ছে। 

আয়নাঘর-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ 

তাহেরের বা হাতটা একজন ধরে ছিলসে হাত ছাড়ল! তাহের পকেট থেকে দেয়াশলাই বের করলতাকাল বুড়াের দিকেমনে হচ্ছে এই বুড়ােই হত্যাকারীবুড়ো বন্দুক আনে নিনিশ্চয়ই চাদরের নিচে ছোরা নিয়ে এসেছেখােলা জায়গায় বন্দুকের আওয়াজ অনেক দূর পর্যন্ত যাবেসেই তুলনায় ছােরা অনেক নিরাপদ। 

বুড়ো বলল, ধরান সিগারেট ধরান। 

তাহের সিগারেট ধরানাের চেষ্টা করছেধরাতে পারছে নাবাতাসের বেগ প্রবলতাছাড়া তার হাত কাঁপছেদেয়াশলাইয়ের চারটি কাঠি নষ্ট হবার পর, পঞ্চম কাঠিটি ধরলতীব্র ঘামের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছেঘামের গন্ধে তার বমি এসে যাচ্ছে। 

তাহের দেখল সবাই এক দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছেকেউ মুহূর্তের জন্যেও দৃষ্টি ফিরিয়ে নিচ্ছে নাবুড়াে লােকটির মুখ হাসি হাসি চাঁদেআলােয় হাসিমুখের এই বুড়ােকে কি ভয়ংকরই না লাগছে

 

Read more

আয়নাঘর-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *