শিখা দপদপ করছে। নিভে যাবে না তাে? লিলিয়ান তাকিয়ে আছে হারিকেনের শিখার দিকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতেই কোন রকম কারণ ছাড়া আচমকা তীব্র ভয়ে লিলিয়ান আচ্ছন্ন হয়ে গেল। তার মনে হল — ভয়ংকর কোন বিপদ ঘটতে যাচ্ছে।

তাহের কিছুক্ষণের মধ্যেই ভয়াবহ কোন বিপদে পড়বে। লিলিয়ান যন্ত্রের মত পরপর তিন বার বলল, Oh God! Save him Please, Save him. পরম করুণাময় ঈশ্বর। তুমি আমার স্বামীকে রক্ষা কর। লিলিয়ানের সামনে রাখা হারিকেন নিভে গেল। সে স্পষ্ট শুনল খুব হালকা। পায়ে কে যেন আসছে তার ঘরের দিকে। যে আসছে তার পা ছােট ছোট, সে পা ফেলছে খুব সাবধানে। দরজার কাছে এসে সে থমকে দাড়িয়েছে, এক হাতে দরজা ধরেছে তা বুঝা যাচ্ছে। দরজায় কঁচিকাচ শব্দ হল। এর উপস্থিতিই কি লিলিয়ান টির পাচ্ছিল ? কে, এ কে ? লিলিয়ান আতংকে অস্থির হয়ে কাঁপা গলায় বলল, কে? কে? Who is there?
ছােট্ট করে কে যেন নিঃশ্বাস ফেলল। ছােট নিঃশ্বাস, কিন্তু লিলিয়ান স্পষ্ট শুনল। সে কি তার নিজের নিঃশ্বাসের শব্দই শুনেছে? ভয় পেলে মানুষের মস্তিষ্ক ঠিক কাজ করে না। তারও কি তাই হয়েছে ? উঃ ভারমান নিশ্চয়ই এর চমৎকার ব্যাখ্যা দিতে পারবেন কিন্তু তার কাছে কোন ব্যাখ্যা নেই। তাহের সিগারেট ধরিয়েছে। বর্ষাকাল হলেও কয়েকদিন বৃষ্টি না হওয়ায়। রাস্তাঘাট শুকনাে। একজন যাচ্ছে সামনে সামনে। তার হাতে টর্চলাইট।
আয়নাঘর-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ
সে টর্চের আলাে ফেলছে। তাহেরের সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে চারজন যুবক। একজনের নাম তাহের জানে – ছালাম। চাচার মেজো ছেলে। সে আসছে সবার পেছনে। বাকি তিনজন কে? এরা সঙ্গে যাচ্ছে কেন? কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হচ্ছে না। ওরাও কিছু বলছে না। চাচার এমন কি জরুরী কথা থাকতে পারে? জমিজমা সম্পর্কিত কিছু? তাহেরের পৈতৃক জমি নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই। যা হবার হবে। এগুলি হাতছাড়া হয়ে একদিকে ভাল হয়েছে। বন্ধনমুক্ত হওয়া গেছে। জমির কারণে তার বাবাকে অপঘাতে মরতে হয়েছে। এই অভিশাপ থেকে তাহের মুক্তি চায়। তবে বাড়িটা সে রাখবে। সংস্কার করাবে। লিলিয়ানের যখন এত পছন্দ। তাদের ছেলেমেয়েরা বড় হলে এদের দেখাতে নিয়ে আসবে। কে জানে বৃদ্ধ বয়সে সে নিজেও হয়ত ফিরে আসবে। সে এবং লিলিয়ান জীবনের শেষ সময়টা কাটাবে নদীর ধারের এই বিশাল বাড়িতে। ততদিনে গ্রামে গ্রামে ইলেকট্রিসিটিও নিশ্চয়ই চলে আসবে।।
দলটা নদীর পাড়ে এসে থমকে দাড়াল। তাহের বলল, এখানে কি ? টর্চ হাতের ছেলেটা বলল, নদীর হেই পাড়ে যাওয়া লাগব।। তাহের বিস্মিত হয়ে বলল, নদীর ঐ পাড়ে কেন ? ঐ পাড়ে কি? ছালাম তুমি এদিকে এস। তােমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি। ছালাম এল না। সে দ্রুত সুরে গেল। গেল নদীর দিকেই। সেখানে ঝাকড়া একটা পাকুর গাছ। পাকুর গাছের ডালের সঙ্গে নৌকা বাঁধা। চাদ উঠে নি।
আয়নাঘর-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ
চারদিক অন্ধকার। নক্ষত্রের আলােয় কিছু দেখা যাচ্ছে না। অসংখ্য ঝিঝি পােকা ডাকছে। Something is very Wrong, তাহের দ্রুত ভবতে চেষ্টা করছে। চারজন যুবক তাকে ঘিরে আছে কেন ? এরা নদীর পাড়ে তাকে নিয়ে এসেছে কেন ? হত্যা করতে চায়? কেন চায়? টাকা–পয়সার জন্যে ? মানুষ খুন করা এত সহজ! টর্চ হাতের লােকটা বলল, আসেন নৌকায় আসেন।
তাহের কি দৌড়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করবে? পারবে পালাতে? এমনও তাে হতে পারে পুরাে ব্যাপারটা কিছুই না। সে ভয় পাচ্ছে বলেই আজেবাজে চিন্তা করছে। হয়ত তার চাচা নদীর ঐ পারে আরেকটা বাড়ি করেছেন। এই ছেলেগুলিকে রাখা হয়েছে বাড়ি পাহারার জন্যে।
‘খাড়াইয়া আছেন ক্যান? আসেন। দেরি কইরা তো কিছু লাভ নাই।
তাহের যন্ত্রের মত এগুলাে। পাকুর গাছের কাছে চাদর গায়ে আর একটা লােক দাঁড়িয়ে আছে। এই গরমে তার গায়ে চাদর কেন ? লােকটা নৌকায় উঠে বসল। তাহের এগুলাে যন্ত্রের মত।
সবাই নৌকায় উঠল না। ছালাম এবং টর্চ হাতে ছেলেটা পাকুর গাছের নিচে দাড়িয়ে রইল। বাকি দুজন তাহেরের দুহাত ধরে নৌকায় প্রায় টেনে তুলল।
আয়নাঘর-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ
চাদর গায়ের লােকটা ছাড়াও নৌকার একজন মাঝি আছে। মাঝি সঙ্গে সঙ্গে নৌকা ছেড়ে দিল। চাদর গায়ের লােকটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আইজ চরম বড় বেশি পড়ছে। লােকটির গলার স্বরে বোঝা যাচ্ছে সে বৃদ্ধ। তাহেরের বলার ইচ্ছা করছে – গরম বেশি কিন্তু আপনি চাদর গায়ে দিয়েছেন কেন? তাহের কিছুই বলল না। তাহেরের হাতে সিগারেট, প্যাকেট থেকে বের করে হাতে নিয়েছে। আগুন ধরাতে ভুলে গেছে। যদিও আগুন নেই তবু তাহের অভ্যাসমত সিগারেট মুখে দিচ্ছে এবং টানছে।
চাদর গায়ে বুড়াে লােকটি খুকখুক করে কেশে বলল, নৌকা মাঝগাংগে নিয়া চল। লােকটির মাথা থেকে চাদর সরে গেছে। তার মাথার সব চুল সাদা। থুতনির কাছে অল্প কিছু দাড়ি। দাড়ির রঙ কালাে। তাহেরের মনে হল তার বুকের উপর দিয়ে বরফ শীতল পানির একটা স্রোত বয়ে গেল। এরা তাকে খুন করার জন্যে এখানে নিয়ে এসেছে। গ্রামের সব খুনখারাপি হয় নদীর কাছে। নদী হত্যার চিহ্ন ধুয়ে মুছে ফেলে। জলধারার প্রবল স্রোত মৃতদেহ অনেকদূর নিয়ে যায়। জলজ প্রাণী। অতি দ্রুত মৃতদেহ নষ্ট করে দেয়। চেনার উপায় থাকে না।
বুড়ো বলল, আপনের সিগারেট নিভা। সিগারেট ধরান। সিগারেট ধরাইয়া আরাম কইরা একটা টান দেন। আহ শালার গরম কি পড়ছে।
আয়নাঘর-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ
তাহেরের বা হাতটা একজন ধরে ছিল। সে হাত ছাড়ল! তাহের পকেট থেকে দেয়াশলাই বের করল। তাকাল বুড়াের দিকে। মনে হচ্ছে এই বুড়ােই হত্যাকারী। বুড়ো বন্দুক আনে নি। নিশ্চয়ই চাদরের নিচে ছোরা নিয়ে এসেছে। খােলা জায়গায় বন্দুকের আওয়াজ অনেক দূর পর্যন্ত যাবে। সেই তুলনায় ছােরা অনেক নিরাপদ।
বুড়ো বলল, ধরান সিগারেট ধরান।
তাহের সিগারেট ধরানাের চেষ্টা করছে। ধরাতে পারছে না। বাতাসের বেগ প্রবল। তাছাড়া তার হাত কাঁপছে। দেয়াশলাইয়ের চারটি কাঠি নষ্ট হবার পর, পঞ্চম কাঠিটি ধরল। তীব্র ঘামের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ঘামের গন্ধে তার বমি এসে যাচ্ছে।
তাহের দেখল সবাই এক দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। কেউ মুহূর্তের জন্যেও দৃষ্টি ফিরিয়ে নিচ্ছে না। বুড়াে লােকটির মুখ হাসি হাসি । চাঁদের আলােয় হাসিমুখের এই বুড়ােকে কি ভয়ংকরই না লাগছে।
Read more
