লিলিয়ানের অনুমান মিথ্যা হল না। বিকেলে লিলিয়ানদের দলের সবাই বসে কফি খাচ্ছে। ছেলেটি উপস্থিত। লিলিয়ানের কাছে গিয়ে হাসিমুখে বলল, আমি আপনার জন্যে একটা ফিল্ম কিনে এনেছি।

লিলিয়ান কঠিন মুখে বলল, কেন?
‘আমার কারণে আপনার ফিল্ম নষ্ট হয়েছে। আমি প্রথম থেকেই লক্ষ্য করেছিলাম। আমার উচিত ছিল আপনাকে সতর্ক করা। তা করি নি, উল্টা মজা পেয়ে হেসেছি। অবশ্যই অপরাধ করেছি, কাজেই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করছি।
লিলিয়ান কঠিন মুখে বলল, অপরাধ–টপরাধ কিছু না। আপনি আমার সঙ্গে গল্প করার লােভ সামলাতে পারছেন না। সুন্দর অজুহাত বানিয়ে এগিয়ে এসেছেন।
‘আপনি ভুল বললেন। নিজেকে খুব রূপবতী ভাবছেন বলে এই সমস্যা হয়েছে। আপনি হয়ত আপনার দেশে, কিংবা খােদ এই আমেরিকাতেই রূপবতী। কিন্তু আমাদের দেশের রূপের বিচারে রূপবতী নন।
আয়নাঘর-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ
‘আপনাদের দেশে রূপবতী হবার জন্যে কি গায়ের রঙ আপনার মত কুচকুচে কালাে হতে হয় ? ‘তা না। আমাদের দেশে রূপবতী মেয়েদের প্রথম শর্ত হল – তাদের চোখ সুন্দর হতে হয়।
‘আমার চোখ সুন্দর না ?
‘না। আপনার চোখের মণি নীল। আমাদের দেশে বাদামী বা নীল চোখের তারার মেয়েদের বলে বিড়াল চোখা মেয়ে। এদের সহজে বর জুটে না। পুরুষরা এদের বিয়ে করতে চায় না।
‘কি অদ্ভুত কথা ! আপনি কোন দেশের মানুষ?
‘দেশের নাম আপনাকে বলছি, কিন্তু দয়া করে দেশের নাম শুনে ঠোঁট উল্টে বলবেন না – এই দেশ আবার কোথায়?‘ এ জাতীয় কথা যখন কেউ বলে অসম্ভব রাগ লাগে। আমার দেশের নাম “বাংলাদেশ। নাম শুনেছেন?
‘না।”
‘নাম না শােনার অপরাধ আমি ক্ষমা করলাম, যদিও ক্ষমা করা উচিত হচ্ছে না। যাই হােক আমি কি আপনার পাশে বসতে পারি ?
‘বিড়াল–চোখা মেয়ের পাশে বসে কি করবেন ? ‘আপনার সঙ্গে এক কাপ কফি খাব, তারপর চলে যাব।”
‘আপনার নাম কি জানতে পারি? ‘লিলিয়ান গ্রে। ‘আমার নিজের নামটা কি আপনাকে বলতে পারি ?
লিলিয়ান চুপ করে রইল। মানুষটার সাহস দেখে সে বিস্মিত হচ্ছে। লােকটা হাসিমুখে বলল, আমার নাম তাহের। আপনি যেমন লিলিয়ান গ্রে, তেমনি গায়ের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে আমাকে তাহের ব্ল্যাক বলে ডাকা যায়। আমি সম্প্রতি আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক্তারি পাস করেছি। আমার ফিল্ড অব স্পেশালাইজেশন হচ্ছে – চোখ। আমি ডাক্তারি পড়ছি, ভবিষ্যতে চোখের ডাক্তার হব।
আয়নাঘর-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ
‘চোখের ডাক্তার হিসেবে আপনার নীল চোখ সম্পর্কে আমি আপনাকে মজার একটা তথ্য দিতে পারি। তথ্যটা হচ্ছে – বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আপনার চোখ কিন্তু কালাে হতে থাকবে, নীল থাকবে না।
চোখের পিগমেন্টগুলি বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বড় হতে থাকে। চোখের রঙ নির্ভর
করে পিগামেন্টের সাইজের উপর। সাইজ বড় হলে রঙ কালাে হয়ে যাবে। এক ধরনের Tyndall effect.‘
‘কখন চোখ কালাে হবে?” ‘যখন বুড়াে হবেন তখন।
‘আপনি বলতে চাচ্ছেন বৃদ্ধ বয়সে আমি যদি আপনার দেশে যাই তাহলে আমাকে সবাই রূপবতী বলবে?
তাহের হাে–হাে করে হাসতে লাগল। এমন হাসি যে লিলিয়ানদের দলের সবাই চোখ ঘুরিয়ে তাকাল। লিলিয়ান নিজেও খানিকটা অপ্রস্তুত বােধ করতে লাগল। হাসতে হাসতে তাহেরের চোখে পানি এসে গেল। সে রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল, সরি। আমি একটু বেশি হাসি। আমার হাসি–রােগ আছে। একবার হাসতে শুরু করলে থামতে পারি না। পুরাে এক ঘন্টা তেইশ মিনিট ক্রমাগত হাসার আমার একটা ব্যক্তিগত রেকর্ড আছে। গিনিস রেকর্ড কত তা অবশ্যি জানি না।
‘হাসি–রােগ ছাড়া আর কি রােগ আছে ? ‘ঘুম–রােগ আছে। ‘ঘুম–রােগটা কি?” ‘একবার ঘুমিয়ে পড়লে সহজে আমার ঘুম ভাঙে না।। ‘খুব আনকমন রােগ কিন্তু না। অনেকেরই এই রােগ আছে।
আয়নাঘর-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ
‘আমারটা আনকমন। উদাহরণ দিলে বুঝতে পারবেন। দু‘বছর আগে আমি লস এনজেলসে ছিলাম। হােস্টেলে থাকি। একবার ভূমিকম্প হল। ভূমিকম্পের নিয়ম হচ্ছে প্রথম একটা ছােট দুলুনি হয় – তারপর হয় বড় দুলুনি। প্রথম দুলুনির পর আমার বন্ধু বান্ধবরা আমার ঘুম ভাঙানাের প্রাণপণ চেষ্টা করল। কোন লাভ হল না। শেষে ওরা আমাকে চ্যাংদোলা করে বাইরে নিয়ে ফুটপাতে শুইয়ে রাখল। আমার ঘুম ভেঙেছে ভােরে, জেগে দেখি আমি একটা হাইড্রেন্টের পাশে শুয়ে আছি।
লিলিয়ান খিলখিল করে হেসে উঠল। লিলিয়ানের সঙ্গির আবারাে ফিরে তাকাল। তাহের বলল, আমরা বােধহয় ওদের ডিসটার্ব করছি, একটু দূরে গেলে কেমন হয় ?
‘ভাল হয় না। আমাদের যাত্রার সময় হয়ে গেছে। আমি এখন উঠব। ‘আমার সঙ্গে গাড়ি আছে। আমি আপনাকে পৌছে দিতে পারি। ‘ধন্যবাদ। অপরিচিত কারাে গাড়িতে আমি চড়ি না।
‘শুরুতে অপরিচিত ছিলাম। এখন নিশ্চয়ই অপরিচিত না। আপনি আমার নাম জানেন। আমি আপনার নাম জানি।
লিলিয়ান কঠিন মুখে বলল, আপনি শুধু শুধু আমার সঙ্গে ভাব জমানাের চেষ্ট।
করছেন। আপনার গাড়িতে আমি যাব না।
আয়নাঘর-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ
লিলিয়ান তার সঙ্গিদের দিকে রওনা হল। একবার তার ইচ্ছা করল পেছন ফিরে মানুষটির মুখের বিব্রত ভঙ্গিটা দেখে। অনেক কষ্টে এই লােভ সে সামলাল। মনে মনে ভাবল – ভাল শিক্ষা হয়েছে। কাউকে শিক্ষা দেবার এটাই সবচে ভাল টেকনিক। প্রথম কিছুটা প্রশ্রয় দিতে হয়, তারপর ছুঁড়ে ফেলতে হয় আঁস্তাকুড়ে। আশ্চর্য স্পর্ধা – ফিলম কিনে নিয়ে এসেছে। আড়াই ডলার দামের একটা উপহার কিনে মনে মনে ভেবেছে অনেকদূর এগিয়ে যাবে। লিলিয়ান ডরমিটরিতে থাকে না। রুমিং হাউসে থাকে। রুমিং হাউসগুলি ইউনিভার্সিটির কোন ব্যাপার না।
ব্যক্তিমালিকানায় চলে। বাড়িওয়ালারা সস্তায় ভাড়া দেয়। রুমিং হাউসে শুধু থাকার ব্যবস্থা। রান্না করার ব্যবস্থা নেই, কারণ কিচেন নেই। কমন বাথরুম। মাসে চল্লিশ ডলারে এরচে ভাল কিছু আশা করাও অবশ্যি অন্যায়। এরচে বেশি খরচ করে ডরমিটরিতে জায়গা নেয়া লিলিয়ানের সাধ্যের বাইরে। পিকনিক করতে এসে পঞ্চাশ ডলার খরচ হয়ে গেছে। এই মাসটা তার কষ্টে যাবে। কয়েকটা বই কেনা দরকার। এ মাসে কেনা হবে না। ভেবেছিল মা’র জন্মদিন উপলক্ষ্যে মা’কে লংডিসটেন্স কল করবে। তাও সম্ভব হবে না। তিন মিনিট কথা বলতেই লাগে আঠার ডলার।