কয়েক দিনের বৃষ্টিতে রাস্তা প্যাচপ্যাঁচে কাদা হয়ে আছে। পা রাখামাত্রই দেবে যাচ্ছে। কবির সাহেব চটি খুলে ফেললেন। পাজামা হাঁটু পর্যন্ত টেনে তুললেন। এক হাতে একটি ছাতা নিয়ে সাবধানে পা ফেলে এগুতে লাগলেন। আকাশ মেঘলা হয়ে আছে। বৃষ্টি শুরু হবার সম্ভাবনা। এ-রকম দিনে না বের হলেও চলত। কিন্তু অভ্যাস হয়ে গেছে।–সকালে না ঘুরলে মনে হয় দিনটা ঠিকমতো শুরু হল না। কিছু একটা যেন বাকি রয়ে গেল।সূর্য এখনো ওঠে নি, কিন্তু গ্রাম জেগে উঠেছে! শহরের সাথে গ্রামের সবচে বড়ো পার্থক্য হচ্ছে, শহরের মানুষরা কখনো সূর্যোদয় দেখে না। কবির সাহেবের মনে হল, সূর্যোদয় দেখাটা অত্যন্ত জরুরি।
এই দৃশ্যটি মানুষকে ভাবতে শেখায়। মন বড়ো করে। কবির সাহেবের পরীক্ষণেই মনে হল, মন বড়ো করে, ধারণাটা ঠিক না। গ্রামে অত্যন্ত ছোট মনের মানুষদের তিনি দেখেছেন। মন বড়ো-ছোট ব্যাপারটির সঙ্গে প্রকৃতির কোনো সম্পর্ক বোধহয় নেই।মাস্টার সাব, স্নামালিকুম।ওয়ালাইকুম সালাম। কেমন আছ কুদ্দুস? জ্বি মাস্টার সাব, আপনের দোয়া।যাও কোথায় এত সকালে? ইস্টিশনে যাই। ঢাকা যাওন দরকার।টেন তো সকাল দশটায়, এখনই কোথায় যাও!কুদ্দুস কিছু বলল না। কবির সাহেবকে এগিয়ে যাবার সুযোগ করে দেবার জন্যে সে প্রায় রাস্তায় নেমে গেল। কবির সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, স্টেশনে এতক্ষণ বসে থেকে শুধু শুধু সময় নষ্ট করবে,এটা ঠিক না। অশিক্ষার জন্যে এটা হচ্ছে। দশটায় টেন, গিয়ে বসে থাকবে ছ টার সময়।
মাস্টার সাবের শইলডা বালা? হ্যাঁ, ভালোই।কুদ্দুস তার পেছন পেছন আসতে লাগল। দু জনে হাঁটছে নিঃশব্দে। রাজারামের পুকুর ঘাট পর্যন্ত এসে কবির সাহেব বললেন– তুমি তো আসছ কুদ্দুস, ইস্টিশানে যাবে ইস্টিশনে যাও।জ্বি আচ্ছা।কুদ্দুস উত্তরের সড়কের পথ ধরল। কবির সাহেব দিঘিতে পা ধোয়ার জন্যে নামলেন। পা ধোয়া অর্থহীন। আবার কাদা লাগবে। কিন্তু রাজারামের এই দিঘির কাছে এলেই পানিতে হাত-পা ডোবাতে ইচ্ছে করে। বিশাল দিঘি। আয়নার মতো স্বচ্ছ পানি। এই ঘোর বযয়িও এর জল কাকের চোখের মতো স্বচ্ছ! হাত পা ধুতে ধুতেই কবির সাহেব লক্ষ করলেন, ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে দুজন ভিখিরি যাচ্ছে। এই দৃশ্যটি নতুন। গ্রামের মানুষজন সহজে ভিক্ষা করে না। এরা কি এই গ্রামেরই নাকি? তিনি হাত ইশারা করে ডাকলেন না, এরা এ গ্রামের না। কবির সাহেব কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করতে লাগলেন, বাড়ি কোন গ্রামে?
কত দিন ধরে ভিক্ষা করছ? বসতবাড়ি আছে? ছেলেমেয়ে নেই? ভিক্ষা করতে করতে কত দূর যাও? রাতে নিজ গ্রামে ফিরে যাও, না থেকে যাও? ওরা বেশ আগ্রহ নিয়েই প্রশ্নের জবাব দিল। গ্রামের ভিক্ষুকরা শহরের ভিক্ষুকদের মতো নয়, এরা কথা বলতে পছন্দ করে। জীবন সম্পর্কে আগ্রহ এখনো আছে। কবির সাহেব হাত-মুখ ধুয়ে উঠে দাঁড়াতেই ওদের এক জন চিকন সুরে বলল, চাচামিয়া, আট আনা পয়সা দেন। কবির সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, আমি ভিক্ষা দিই না।ওরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তিনি উত্তরের সড়ক ধরলেন। সূর্য উঠে গেছে, এখন আর হাঁটতে ভালো লাগবে না। গ্রামে ভিক্ষুক বাড়ছে। খুব খারাপ লক্ষণ। এটা হতে দেওয়া যায় না। গ্রাম হচ্ছে উৎপাদনের জায়গা, এখানে ভিক্ষুক তৈরি হলে চলবে কীভাবে?
স্যার, স্নামালিকুম।ওয়ালাইকুম সালাম। রকিব ভালো আছ? জ্বি স্যার। একটু বসবেন না? না, আরেক দিন।রকিব সঙ্গে সঙ্গে আসতে লাগল। সে গ্রামে থাকে না। রাজশাহীতে ফুড সাপ্লাইয়ে কাজ করে। অল্প দিনের মধ্যেই পয়সাকড়ি করে ফেলেছে। বাড়ি এসেছে ঘর পাকা করবার জন্যে।স্যার, একটা দোনলা বন্দুক কিনলাম।তাই নাকি? বন্দুক কেন? একটা বন্দুক থাকলে স্যার ডাকাতি হয় না। জানেন তো আশেপাশে খুব ডাকাতি হচ্ছে।তাই নাকি? জানি না তো।খুব হচ্ছে স্যার। এই গ্রামেও হবে। বন্দুকটা কিনলাম। এই জন্যেই। আসেন না স্যার, একটু দেখে যান।
বন্দুক-টন্দুকের ব্যাপারে আমার উৎসাহ নেই রকিব। বন্দুক দিয়ে কিছু হয় না।বলেই তাঁর মনে হল কথাটা ঠিক না। মুক্তিযুদ্ধ বন্দুক দিয়েই করতে হয়েছে। বন্দুক একটা অত্যন্ত দরকারি জিনিস।রকিব!জ্বি, স্যার।বন্দুক দিয়ে কিছু হয় না, তোমাকে যে বললাম-এটা ঠিক না। বন্দুকের দরকার আছে।জ্বি, স্যার, তা তো আছেই। গ্রামের এক বাড়িতে বন্দুক আছে শুনলে সেই গ্রামে আর ডাকাত আসে না।তাই নাকি? জ্বি স্যার।তোমার বন্দুক বাড়িতেই থাকবে? জ্বি।তুমি কত দিন আছ? এক সপ্তাহ থাকব স্যার। কাল এক বার আসব আপনার কাছে? কোনো কাজে? না, এমনি দেখা-সাক্ষাৎ? একটা কাজ স্যার আছে!কখন আসলে পাওয়া যাবে আপনাকে?
সব সময়। যাব। আর কোথায়? ঘরেই থাকি সারা দিন।রকিব বিদায় নিতে গিয়ে পা ছুঁয়ে সালাম করল। এটা একটা নতুন ব্যাপার। কোনো উদ্দেশ্য আছে কি? উদ্দেশ্য ছাড়া আজকাল কেউ কিছু করে না। তিনি ভুরু কোঁচকালেন। গুডগুড করে মেঘ ডাকছে। বৃষ্টি হবে বোধহয়। খবর পেয়েছিলেন, শিয়ালজানি খালে পানি বাড়ছে। খুব খারাপ লক্ষণ। বন্যা এ বছরও কি হবে? একটু ঘুরে শিয়ালজানি খালটা দেখে গেলে হয়। একটা বীধ-টাধ দেওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার। প্রতি বছর বন্যা হলে তো সবাই ভিখিরি হয়ে যাবে। চিন্তিত মুখে তিনি শিয়ালজানি খালের দিকে রওনা হলেন। ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়তে লাগল। সঙ্গে ছাতা আছে, কিন্তু ছাতা মেলতে ইচ্ছা করছে না। পথে যেতে যেতে তাঁর মনে হল, আর দেরি করা ঠিক হচ্ছে না! কাজে হাত দেওয়া দরকার। মানুষ কচ্ছপ নয়, সে আড়াইশ বছর বাঁচে না। অল্প কিছুদিন বাঁচে।
যা করবার, এই অল্প সময়ের মধ্যেই করতে হবে। শুরু করতে হবে একা, তারপর অনেকে এসে দাঁড়াবে পাশে। কোনো স ৎকাজে মানুষের অভাব হয় না। মানুষ এক সময় না এক সময় পাশে এসে দাঁড়ায়। তাঁর পাশেও লোকজন এসে দাঁড়াবে।ছাত্রদের কাছে চিঠি লিখতে হবে। দেখা করতে হবে সবার সাথে। অনেক কাজ। শিয়ালজানি খালের পাড়ে কবির সাহেব দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে রইলেন। ঝমোঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। ছাতা মেলতে হয়েছে শেষ পর্যন্ত। পানি সত্যি সত্যি অনেকখানি বেড়েছে। ছোট একটা খাল। কিন্তু কত অল্প সময়ের নোটিশে বিশাল হয়ে যেতে পারে। এ-রকম নজির আছে।
স্নামালিকুম মাস্টার সাব।ওয়ালাইকুম সালাম।খালের পানি বাড়তাছে।হুঁ।এই বছর কিন্তুক পানি অইত না।বুঝলে কীভাবে?পরপর দুই সন বান হয় না। তারপর পানিটা দেখেন, ভারি পানি, বানের পানি অয় পাতলা।তাই নাকি? জ্বি।ভারি-পাতলা বোঝা কীভাবে? হাতে নিলেই বুঝন যায়।কবির সাহেব অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বললেন, খালের তীর বরাবর বাঁধ দেবার ব্যবস্থা করব, বুঝলে মজনু মিয়া? এইটা সম্ভব না। মাস্টার সাব।কবির সাহেব রাগী গলায় বললেন, অসম্ভব বলে কোনো জিনিস নেই, মজনু মিয়া, সবই সম্ভব। মানুষের ক্ষমতা খুব বেশি। অবশ্যি বেশির ভাগ মানুষই তা জানে না। এস, ছাতার নিচে এস, ভিজছ কেন?
মজনু মিয়া হাসতে হাসতে বলল, ভিজতে ভালো লাগে মাস্টার সাব।মজনু মিয়ার দাড়ি বেয়ে বৃষ্টির পানি পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে। ভালো লাগছে দেখতে।তিনিও ছাতা নামিয়ে ফেললেন। মজনু অবাক হয়ে বলল ও মাস্টার সাব, তিজতাছেন তো? বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোই লাগছে।মজনু মনে-মনে ভাবল, আমাদের মাস্টার খুব পাগলা কিসিমের আছে।সন্ধ্যার দিকে খবর এল, শিয়ালজানি খালের পানি অনেকখানি বেড়েছে। এই হারে বাড়তে থাকলে রাতের মধ্যে গ্রামে পানি ঢুকবে। নীলগঞ্জের সমস্ত মানুষ শঙ্কিত। খালের পাশে লোকজন আছে। অবস্থা তেমন দেখলে হাঁক-ডাক দেবে।
কবির সাহেব সন্ধ্যা থেকেই চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে আছেন। সকালবেলা বৃষ্টিতে ভেজা ঠিক হয় নি। জ্বর এসে গেছে। গলা ব্যথা করছে। ঢোক গিলতে পারছেন না। বয়সের লক্ষণ। শরীর বলছে-এখন আর আমাকে দিয়ে যা-ইচ্ছা-তা করিয়ে নিতে পারবে না। আমার দিন ফুরিয়ে আসছে।শওকত ঘুরছে শুকনো মুখে। তার খুব ইচ্ছা, এক জন ডাক্তার নিয়ে আসে। কবির সাহেব রাজি নন। সামান্য জ্বরজারিতে ডাক্তার কী? তাছাড়া এ গ্রামে ডাক্তার নেই। বৃষ্টির মধ্যে যেতে হবে ফটিকখালি। কোনো অর্থ হয় না। শওকত কাঁচুমাচু মুখে বলল, স্যার, একটু চিড়া ভিজাইয়া দেই, খান।
না।রুটি বানাইয়া দেই? দুধ দিয়া চিনি দিয়া খান।কিছু খাব না রে শওকত। তুই যা, পানির অবস্থাটা কি খোঁজ নিয়ে আয়।না খাইয়া থাকবেন। সারা রাইত? হুঁ। একটা কথা মন দিয়ে শোন শওকত। এদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ পেটে খিদে নিয়ে ঘুমুতে গেছে। সুস্থ মানুষ। আর আমি অসুস্থ। খেতে ইচ্ছা করছে না। আমি এক বেলা না খেলে কিছু যাবে-আসবে না।কবির সাহেবের মন অন্য একটি কারণেও বেশ খারাপ। ঢাকা থেকে নীলু হঠাৎ করে তাঁকে দীর্ঘ একটি চিঠি লিখেছে। সে চিঠিতে শাহানার সেকেণ্ড ডিভিশনে মাটিক পাশের খবরের সঙ্গে তার বোন বিলুর মৃত্যুসংবাদ আছে। শেষ লাইনটিতে সে লিখেছে, মামা, আপনি তো অনেক জ্ঞানী মানুষ, আপনি আমাকে বলুন, এত কষ্ট কেন মানুষের? চিঠি পড়ে তিনি চোখ মুছেছেন। এটাও বয়সের লক্ষণ। মন দুর্বল হয়ে গেছে। সামান্যতেই চোখ ভিজে ওঠে।
দুপুর-রাতে শওকত খবর নিয়ে এল, পানি কমতে শুরু করেছে। এই খবরের আনন্দেই সম্ভবত কবির সাহেবের জ্বর কমে গেল। তিনি হাসিমুখে বললেন, একটু যেন খিদে–খিদে লাগছে রে শওকত।ভাত খাইবেন? দে, চারটা ভাতাই খাই। তরকারি কী? খইলাসা মাছ ডেঙ্গা দিয়া রাঁধছি। মাষের ডাইল আছে।খেয়েই ফেলি চারটা।খেতে খেতেই তিনি মনস্থির করলেন, আগামী কাল ভোরে ঢাকা যাবেন। সুখী নীলগঞ্জের কাজে হাত দেওয়া দরকার। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে 66छ।
শওকত।জ্বি স্যার।ঢাকা যাব। কাল। তুইও চল আমার সাথে।জ্বি আচ্ছা।বড়ো একটা কাজে হাত দেব। সুখী নীলগঞ্জ নীলগঞ্জের মানুষের আর কোনো দুঃখ থাকবে না।শওকত তাকিয়ে থাকল। এই অদ্ভুত মানুষটিকে সে খুবই পছন্দ করে। সেও মজনু মিয়ার মতো মনে-মনে ভাবল, আমাদের স্যার খুব পাগলা।কবির সাহেব যাবেন ঢাকা। ভৈরব রেল স্টেশনে আটকা পড়ে গেলেন। এক গ্লাস পানি খাবার জন্যে স্টেশনের পাশের এক হোটেলে ঢুকেছেন। ক্যাশবাক্স নিয়ে বসা মোটাসোটা লোকটি হী করে তাকিয়ে রইল-যেন ভূত দেখছে। কবির সাহেব বললেন, স্লামালিকুম। লোকটি জবাব দিল না।পানি খাব। এক গ্রাস পানি দেওয়া যাবে? লোকটি লাফিয়ে উঠল। কবির সাহেব ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন না।স্যার, আমি আপনার ছাত্র।ভালো আছে বাবা?
আমার নাম স্যার, ফজল।ফজল পা ছুঁয়ে সালাম করল। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে, সে কী করবে: ভেবে পাচ্ছে না। পানির গ্লাসের জন্যে নিজেই ছুটে গেল। কিন্তু ফিরে এল পানি ছাড়াই।স্যার, বাড়িতে চলেন। বাড়িতে পানি খাবেন! কাছেই বাড়ি, দুই মিনিট লাগবে।ঢাকার গাড়ি ধরব ফজল! আমি স্যার গাড়িতে তুলে দেব।পানিটা এখানেই খেয়ে গেলে হত না? বাড়িতে খাবেন স্যার।ফজল, কবির সাহেবের হাত থেকে ব্যাগ প্রায় ছিনিয়ে নিল। কবির সাহেব হাঁটতে শুরু করলেন। এ জাতীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি তাঁকে হতে হয়। অদ্ভুত অদ্ভুত জায়গায় তাঁর ছাত্র বের হয়ে যায়। মাঝে মাঝে তাকে বেশ অস্বস্তিতে পড়তে হয়।
এক বার সান্তাহার যাচ্ছিলেন-ট্রেনে প্রচণ্ড ভিড়। টিকেট চেকার উঠেছে। টিকিট-নেই যাত্রীর সংখ্যাই বেশি। টিকিট চেকার দিব্যি বিনা টিকিটের যাত্রীদের কাছ থেকে এক টাকা দুটাকা করে নিয়ে নিচ্ছে। তার ভাব দেখে মনেই হচ্ছে না যে কাজটা অন্যায় এবং এ-রকম প্রকাশ্যে করাটা ঠিক হচ্ছে না। এক পর্যায়ে কবির সাহেব বললেন, আপনি কী করছেন এসব? টিকিট চেকার রাগী মুখে তাঁর দিকে তাকাল, সে থেমে থেমে বলল, স্যার, আপনি! সে এগিয়ে এসে সালাম করল।তুমি কি বাবা আমার ছাত্র? জ্বি স্যার।তুমি তো আমাকেও লজ্জা দিলে। তোমার মতো ছাত্র তৈরি করল যে মাস্টার, সে কেমন মাস্টার?
টিকিট চেকার গাড়ির দরজার কাছে মুখ কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি দেখে কবির সাহেবের নিজেরই একটু খারাপ লগতে লাগল। কিছু না বললেই হত। মুখের কথায় কি আর অন্যায় বন্ধ হয়? দোষ তো তার একার নয়। লোকগুলি বিনা টিকিটে উঠল কেন? প্রথম অন্যায় তো করেছে। যাত্রীরা। দেশের সব মানুষই কি অসৎ হয়ে যাচ্ছে? নীতিবোধ নেই? ন্যায়-অন্যায় বিচার নেই? সন্তাহার স্টেশনে টেন বদলের জন্যে কবির সাহেব নামলেন। টিকিট চেকার ছাত্র এসে উপস্থিত। কথা নেই বার্তা নেই, সুটকেস উঠিয়ে নিল হা05! ব্যাপার কি! বাসায় যেতে হবে স্যার।আমি তো রংপুর যাব। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি।রাতের বেলা যাবেন স্যার। রাতে একটা টেন আছে।আজ বাবা বাদ দেওয়া যায় না?
না স্যার। আমার অনেক দিনের শখ, আপনাকে সাথে নিয়ে এক বেলা চারটা ভাত খাই। স্যার, আপনি বোধ হয় আমাকে চিনতে পারেন নি।না।আপনি স্যার পুরো এক বছর আমার কলেজের পড়ার খরচ দিয়েছেন! প্রতি মাসের তিন তারিখে আপনার কাছ থেকে নিয়ে আসতাম।যেতে হল তাঁকে। গিয়ে মনে হল, ছেলেটি তাঁকে ইচ্ছা করেই বোধহয় এনেছে। বিশাল পরিবার। নিজের স্ত্রী এবং ছেলেমেয়ে ছাড়াও তিনটি বড়ো বড়ো বোন, দুটি ভাই, বাবা এবং মা। সবাই মিলে দু কামরার রেলের কোয়ার্টারে আছে। কবির সাহেবের বেশ মন খারাপ হয়ে গেল।ছেলেটি রাতে তাঁকে টেনে তুলে দিল। মৃদুস্বরে বলল, স্যার, বড়ো কষ্টে আছি। আপনি স্যার আমাকে বলেন, আমি কী করব।তিনি কিছু বলতে পারলেন না। মাঝে মাঝে দারুণ সব অস্বস্তিতে পড়তে হয়।ভৈরবেও এই জাতীয় অবস্থা হল। পানি খেতে গিয়ে তিনি আটকা পড়ে গেলেন। কোনো কিছুর বাড়াবাড়ি তাঁর পছন্দ নয়।
ফজল সেই জিনিসটিই করতে লাগল। তাঁকে বসিয়ে রেখে—একটু আসি স্যার বলেই উধাও হয়ে গেল এবং ফিরে এল প্রকাণ্ড একটা রুই মাছ নিয়ে। কবির সাহেবের বিরক্তির সীমা রইল না। তাঁর ঢাকা যাবার দরকার।দুপুরবেলা পিওন একটি রেজিস্ট্রি চিঠি দিয়ে গেছে।খামের উপর লেখা-নীলুফার ইয়াসমিন। ইংরেজিতে টাইপ করা ঠিকানা। নীলু খুবই অবাক হল। কে তাকে রেজিস্ট্রি চিঠি দেবো? বিয়ের আগে এরকম চিঠি আসত। আজেবাজে সব কথার চিঠি–তোমাকে আজ দেখলাম কলেজে যাচ্ছ যেন কোনো রাজকন্যা পথ ভুলে এসেছে। জান, তোমার কথা ভেবে ভেবে রাত্রে আমার ঘুম হয় না। রাত জেগে জেগে জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়ি-চুল তার কবেকার। এই চিঠিও সে-রকম কিছু নাকি?
নীলু ভয়ে ভয়ে খাম খুলল। ইংরেজিতে টাইপ করা একটা চিঠি। মার্কস এণ্ড ফিশার-এর জেনারেল ম্যানেজার লিখেছেন, তোমাকে জানানো যাচ্ছে যে, মার্কস এণ্ড ফিশার-এর পারচেজ ডিভিশনে জুনিয়র এ্যাপ্রেনিটিস অফিসার হিসেবে তোমাকে নিয়োগপত্র দেয়া হচ্ছে। চাকরির শর্তাবলী নিম্নরূপ। শর্ত পছন্দ হলে অগাষ্টি মাসের প্রথম সপ্তাহে তোমাকে কাজে যোগ দেবার জন্যে অনুরোধ করা হচ্ছে।সহজ ইংরেজি, অর্থ না বোঝার কিছু নয়, তবু নীলুর মাথায় কিছু ঢুকছে না। সে পরপর চার বার চিঠিটা পড়ল।মার্কস এণ্ড ফিশারে চাকরির জন্যে সে কোনো দরখাস্ত করে নি। মার্কস এণ্ড ফিশার কেন, কোথাও করে নি! বন্যার চাপাচাপিতে সে তার মামার কাছে গিয়েছিল। চাকরির চেষ্টা বলতে এইটুকুই বন্যা অবশ্যি এক দিন এসে সাদা কাগজে তার দস্তখত নিয়ে গেছে।
সার্টিফিকেট মার্কশীট নিয়েছে ফটোকপি করবার জন্যে! কোথায় কোথায়, নাকি পাঠাবে। তাই দেখেই চাকরি হয়ে যাবে? ইন্টারভ্যু টিন্টারভ্যু কিচ্ছু লাগবে না? বাংলাদেশ এ রকম সোনার দেশ হয়ে গেছে? নাকি কোনো রহস্য আছে এর মধ্যে। হয়তো এই নীলুফার ইয়াসমিন সে নয়, অন্য কেউ। ভুল ঠিকানায় এসেছে। কিংবা ফাঁদ-টাব্দ পেতেছে। কেউ; সে জয়েন করতে যাবে, অমনি তাকে ধরে নিয়ে পাচার করে দেবে পাকিস্তানে কিংবা সিঙ্গাপুরে। গতকালের পত্রিকাতেই আছে, দশটি মেয়েকে পাচার করেছে পাকিস্তানে। ধরা পড়ে তারা এখন আছে লাহোরের এজেল-হাজতে। একটি মেয়ের ছবিও ছাপা হয়েছে। কেমন বৌ-বৌ চেহার দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে করে। রুমা নাম।সারাটা দুপুর নীলুর কাটল অস্বস্তিতে। চিঠিটা কাউকে দেখানো যাচ্ছে না।
বাসায় রফিক অবশ্যি আছে! তাকে এখনি কিছু বলা ঠিক হবে না হেৈ চেঁচামেচি শুরু করবে। ব্যাপারটা পুরোপুরি না জেনে কাউকে কিছু না বল। ভালো। বন্যাকে টেলিফোন করা যায় অবশ্যি! সে সবচে ভালো বলতে পারবে রশীদ সাহেবের বাসায় নতুন টেলিফোন এসেছে। বন্যার টেলিফোন নাম্বারও লেখা আছে। কিন্তু দুপুরবেলায় বেরুতে গেলেই মনোয়ারা হাজারটা প্রশ্ন করবেন, কোথায় যাচ্ছ? কেন যাচ্ছ? দরকারটা কী? তবে মনোয়ারা খাওয়াদাওয়া শেষ হলেই ঘুমুতে যাবেন। সেই সময় যাওয়া যায়। নীলুতার শাশুড়ির ঘুমের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল।বন্যাকে পাওয়া গেল। মার্কস এণ্ড ফিশারের কথা শুনেই বলল, সেই অফিসেই তো তোকে নিয়ে গিয়েছিলাম। মামার অফিস। নামটাও মনে নেই? গাধা নাকি তুই? জয়েন করব?
করবি না। মানে! এত ঝামেলা শুধু শুধু করলাম? কত বার যে আমি মামার কাছে গিয়েছি, সেটা আমি আমি আর মামা জানে।আমার কেন জানি শুধু ভয়-ভয় লাগছে।ভয়-ভয় লাগার কী আছে। এর মধ্যে? অফিসের চাকরি, পারব টারব না, সবার বকা খাব।বাজে কথা বলিস না। চড় খাবি।বাসার সবাই কীভাবে নেবে, কে জানে।যেভাবে ইচ্ছানিক। কিছুই যায়-আসে না।শাশুড়ি হয়তো রেগে যাবেন।বেতন পেয়ে তাঁকে একটা গরদের শাড়ি কিনে দিস, দেখবি সব রাগ জল হয়ে গেছে। উঠতে-বসতে তখন শুধু বৌমা বৌমা করবে।বন্যা খুব হাসতে লাগল। এটা কোনো হাসির ব্যাপার না। হয়তো শেষ পর্যন্ত শফিকই বলে বসবে-এত ছোট বাচ্চাকে রেখে চাকরি করবে কী? ওকে কে দেখবে? তাছাড়া সে রাজি হলেও নীলু কি পারবে টুনীকে রেখে অফিস করতে?
