মনোয়ারা ফিরলেন সন্ধু্যা মেলাবার পর। নীলুকে দেখেও কিছু বললেন না। তাঁর মুখ গভীর। রাগী-রাগী চোখ। হোসেন সাহেবও কেমন যেন বিপর্যন্ত। নীলু বলল, ঝামেলায় এত দেরি হল মা। আপনারা ভালো ছিলেন তো? তিনি জবাব না-দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলেন। হোসেন সাহেব বললেন, আজ আর তোমার শাশুড়িকে কিছু জিজ্ঞেস করোনামা, জবাব পাবে না।নীলু বিস্মিত হয়ে তাকাল। হোসেন সাহেব দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তোমার শাশুড়ির সামনের দুটা দাঁত ডাক্তার ফেলে দিয়েছেন। আগে পড়েছে একটা। বিশ্ৰী দেখাচ্ছে। তাকান যাচ্ছে না।হোসেন সাহেবের মুখ করুণ হয়ে গেল। যেন তাঁর নিজেরই সামনের দুটি দাঁত নেই।মেয়েদের সৌন্দর্যই হচ্ছে দাঁত, বুঝলে মা? বাঁধিয়ে নিলেই হবে বাবা।বাঁধান দাঁত কি আগের মতো হয়? তুমি ভালো ছিলে তো মা?
জ্বি, ভলোই ছিলাম।তুমি দূরে থেকে বেঁচে গেছ, তোমার শাশুড়ি দাঁতের যন্ত্রণায় চিৎকার-চেঁচামেচি শুরে সবার মাথাখারাপ করিয়ে দিয়েছে।শফিক এবং রফিক দু জন একই সঙ্গে এল-রাত এগারটায়। নীলুর চোখ ঘুমে বন্ধ হয়ে আসছে। তবু সে জেগে আছে। মনোয়ারাও জেগে। ডেনটিষ্ট যে তাঁকে কী পরিমাণ কষ্ট দিয়েছে, এটা তিনি চতুৰ্থ বারের মতো বলছেন।ব্যাটা গৰ্ধভ কিছুই জানে না। আমার মনে হয় নকল করে পাশ করেছে। অবশ্য না করেই দাঁত তুলে ফেলেছে।বলেন কী মা! মহা হারামজাদা। উল্টা আমাকে ধমক দেয়।সে কি!হ্যাঁ, বলে কি-আপনি শুধু-শুধু এত হৈচৈ করছেন কেন?
খুব অন্যায়!আপনি শুয়ে পড়ুন মা। দাঁতের ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছেন।মনোয়ারা ঘুমুতে যেতে রাজি নন। তিনি আজকের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তাঁর দুই ছেলেকে না-শুনিয়ে ঘুমুতে যেতে রাজি নন। সেই সুযোগ তাঁর হল না। রফিক ঘরে ঢুকেই বলল, বাহ্মা, তোমাকে তো সুন্দর লাগছে! কেমন যেন ড্রাকুলার মতো দেখাচ্ছে।মনোয়ারা কিছুক্ষণ অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। রফিক বলল, ভাবী, তাড়াতাড়ি ভাত দাও। খিদে লেগেছে।এত দিন পর এলাম, প্রথম কথাটাই এই? কেমন ছিলাম, কী, জিজ্ঞেস করা। সাধারণ ভদ্রতাটা দেখাও।কেমন ছিলে ভাবী?
প্রশ্ন করে রফিক উত্তরের জন্যে অপেক্ষা করল না। বাথরুমে ঢুকে গেল।রাতে ঘুমুতে যাবার আগে আগে শফিক তার অভ্যাসমতো এক কাপ চা খেতে চাইল বলল, তোমার যাবার দরকার নেই। কাজের মেয়েটাকে বল ও দেবে।আমিই বানিয়ে আনি।নীলু রাতে শোবার আগে কখনো চা খায় না। আজ সে নিজের জন্যেও এক কাপ বানাল। শফিককে চায়ের কাপ এগিয়ে দিতে—দিতে বলল, তুমি কি আমার উপর রাগ করেছ? রাগ করব কেন? দু দিনের কথা বলে ছ দিন কাটিয়ে এলাম, এই জন্যে।প্রয়োজন হয়েছে থেকেছ, এই নিয়ে রাগ করব কেন? তোমার কথা শুনে মনে হয়, আমার স্বভাব হচ্ছে অকারণে রাগ করা। আমি কি সে রকম?
না।শফিক হাতের সিগারেট ফেলে দিয়ে বলল, এক বার ভাবছিলাম তোমাকে কোনো খবর না দিয়ে হঠাৎ টুনিকে নিয়ে চিটাগাং উপস্থিত হব। দেখব। তুমি কী কর।এলে না কেন? তোমরা এলে আমার কত ভালো লাগত।বলতে-বলতে কী যে হল, নীলু ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। শফিক অবাক হয়ে বলল, কী ব্যাপার? কী যে ব্যাপার, তা কি নীলু নিজেও জানে? আমরা আমাদের কতটুকুই-বা জানি? শফিক আবার বলল, কী হয়েছে নীলু? তার গলার স্বর আশ্চর্য কোমল শোনাল। নীলু বলল, কিছু হয় নি, এস ঘুমুতে যাই।বিছানার মাঝামাঝি টুনি শুয়ে আছে। নীলু নিজেই তাকে এক পাশে সরিয়ে দিল। সরিয়ে দিতে গিয়ে লক্ষ করল, টুনির বা চোখের নিচে ছোট একটা কালো বিন্দু উঁচু হয়ে আছে। নীলু বলল, ওর এখানে কী হয়েছে?
উলের কাঁটা দিয়ে খোঁচা লাগিয়েছে। আরেকটু হলে চোখে লাগত।নীলুর গা দিয়ে ঠাণ্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল। সে তার মেয়ের কপালে হাত রাখল। গা কেমন যেন গরম-গরম লাগছে। নীলু বলল, দেখ তো, ওর শরীরটা কি গরম? শফিক গা করল না। সহজ স্বরে বলল, এই ঠাণ্ডায় পাতলা একটা জামা গায়ে দিয়ে ঘুরে জ্বরজারি হয়েছে আর কি। বাচ্চাদের মাঝে-মাঝে অসুখবিসুখ হওয়া ভালো-এতে শরীরে এন্টিবডি তৈরি হয়।কে বলেছে তোমাকে?
কেউ বলেনি। কোথায় যেন পড়েছি।এস, ঘুমুতে এস। নীলু আবার মেয়ের কপালে হাত রাখল। গা গরম। নাকের উপর বিন্দু বিন্দু ঘাম। বাচ্চাদের জ্বরজারি সব সময়ই হয়। কত বার এমন হয়েছে, কিন্তু আজ নীলুর এ-রকম লাগছে কেন? শারমিন বিকেলে বাগানে হাঁটছিল।তার গায়ে আকাশী রঙের একটা চাদর। এইমাত্র ঘুম থেকে উঠেছে বলে চোখ-মুখ ফোলা-ফোলা। তার দুপুরে ঘুমানোর অভ্যেস নেই। আজ কেন জানি ঘুমিয়ে পড়েছিল। বিকেলে ঘুম থেকে উঠলে মন কেমন করে। অজানা এক ধরনের কষ্ট হয়। কেন হয় কে জানে।সে হাঁটতে-হাঁটতে কুল গাছের নিচে এসে দাঁড়াল। পেকে সব টসটস করছে। খাওয়ার মানুষ নেই।আপা, বরই পেড়ে দেই, খান।না। তোমার নাম কী?
আমার নাম কুদ্দুস।এই ছেলেটিকে সে আগে দেখে নি। সতের-আঠার বছর বয়স। দেখলে মনে হয়। কলেজে-টলেজে পড়ে। ঝকঝকে পরিষ্কার দাঁত। টুথপেস্ট্রের সুন্দর একটা বিজ্ঞাপন হয় একে দিয়ে।কুদ্দুস, তুমি আমাকে চা খাওয়াতে পারবো? এক্ষুণি আনছি আপা। বড়ো সাহেবের সঙ্গে চা খাবেন না? বাবা কি বাসায় নাকি? জ্বি, দোতলার বারান্দায়।না, আমি বাগানে হাঁটতে-হাঁটতে চা খাব। তুমি এখানে নিয়ে এস।চেয়ার দেই। আপা? চেয়ার দিতে হবে না। হাঁটতে ভালো লাগছে।ছেলেটি প্রায় দৌড়াতে-দৌড়াতে গেল। নতুন যারা আসে, প্রথম দিকে তাদের কাজের উৎসাহের কোনো সীমা থাকে না। কিছু দিন পার হলে উ ৎসাহে ভাঁটা পড়ে। তখন আর ডাকাডাকি করেও পাওয়া যায় না।
অবশ্যি এবার সবাই তার দিকে একটু বেশি নজর দিচ্ছে। কেউ-না-কেউ আশপাশে আছেই। এত যত্ব না-করলেই সে ভালো থাকত। নিজের মতো থাকতে ইচ্ছা করে। নিজের মতো থাকা সম্ভব হয় না।মালী খুন্তি দিয়ে মাটি ঠিক করছিল। খুন্তি রেখে সে শারমিনের দিকে আসছে। সেও এখন দীর্ঘসময় ধরে নানান কথা বলবে। অপ্রয়োজনীয় অর্থহীন কথা।গোলাপের গাছের কী অবস্থা হইছে দেখছেন আফা? না, দেখি নি। কী অবস্থা? ছোট ফুল। এক দিনের বেশি থাকে না।এ-রকম হল কেন? সেইটাই তো আফা বুঝি না। সার দেই। পোকা-মারা অষুধ দেই।শারমিন চুপ করে রইল। মালী খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, মানুষজন বাগানে না-আসলে ফুল হয় না আফা।তাই নাকি? জ্বি আফা। মানুষের মায়া মুহাৰ্বত গাছ পছন্দ করে।
যে—বাড়িতে দেখবেন মানুষজনে ভর্তি, সেই বাড়ির বাগানভর্তি ফুল। যে—বাড়িতে মানুষজন নাই, সেই বাড়িত ফুলও নাই।বেশ মজা তো!অখন আপনে আইছেন, দেখেন কেমুন ফুল ফোটে।ঠিক আছে, দেখব।কয় দিন থাকবেন, আফা? শারমিন জবাব দিল না। সে কদিন থাকবে এটা নিয়ে সবাই বেশ উদ্বিগ্ন। সরাসরি কিংবা একটু বাঁকা পথে। এ বাড়ির সবাই কিছু একটা সন্দেহ করছে। সন্দেহ করাই স্বাভাবিক। এ বাড়িতে সে একা এসেছে। রফিক তার সুরে মুস নি। প্রায় ন দিন হয়ে গেল, এর মধ্যে এক বার দেখা করতেও।রহমান সাহেব ডাইনিং টেবিলে রফিকের প্রসঙ্গ এক বার তুলেছিলেন। শারমিন কোনো আগ্রহ দেখায় নি। ঠাণ্ডা স্বরে বলেছে, কাজটাজ নিয়ে থাকে, না।
রহমান সাহেব বললেন, এমন কোনো কাজ তো থাকার কথা নয়।শারমিন বলল, তাহলে হয়তো এ বাড়িতে আসতে লজ্জা পায়।এ বাড়ির মেয়ে বিয়ে করতে লজ্জা নেই, এ বাড়িতে আসতে লজ্জা? অন্য কোনো ব্যাপার কি আছে? তা আমি কী করে জানব বাবা? আমি আমার নিজের কথা বলতে পারি! ওর কথা কী করে বলব? তোর কথাই না হয় শুনি।কোন কথাটা শুনতে চাও? Are you happy? আমি জানি না বাবা।জানি না মানে? সত্যি জানি না। আমার মনে হয়, আমার মধ্যে সুখী হবার তেমন কোনো ক্ষমতা নেই। যারা সুখী হয়, তাদের মধ্যে সুখী হবার বীজ থাকে। জল-হাওয়া এবং ভালবাসায় সেই বীজ থেকে গাছ হয়।
এই পর্যন্ত বলেই শারমিন থেমে গেল। উঁচুদরের ফিলসফি হয়ে যাচ্ছে-খাবার টেবিলে যা মানাচ্ছে না। প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্যে রহমান সাহেব বললেন, তোর শ্বশুরবাড়ির অন্য লোকদের সম্পর্কে বল।কী বলব? কে কেমন মানুষ।জানতে চাও কেন? পরিবেশটি কেমন জানতে চাচ্ছি।পরিবেশ চমৎকার!এককথায় সারছিস কেন? প্রত্যেকের সম্বন্ধে আলাদা করে বল।এখন থাক বাবা।থাকবে কেন? এখনি বল। তোর শ্বশুর সাহেব কেমন মানুষ? ঐ বাড়ির সবচে ভালো মানুষ। পাগলা ধরনের কিছু লোক থাকে না। বৈাবা, যারা মনে করে পৃথিবী খুবই সুন্দর জায়গা? উনি সেই রকম একজন মানুষ। খুব সুখী মানুষ। এবং তাঁর ধারণা, পৃথিবীর সবাই তাঁর মতো সুখী।
আর তোর শাশুড়ি।খিটখিটে ধরনের মহিলা। চেঁচামেচি না-করলে তাঁর ভালো লাগে না। অকারণে চেঁচান। কেউ তাঁকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় না বলে আরো রেগে যান। তাঁর ধারণা, সবাই তাঁকে অগ্রাহ্য করছে। সংসারের কর্তৃত্ব তাঁর হাত থেকে চলে যাচ্ছে।সংসারের কর্তৃত্ব কার কাছে? ভাবীর কাছে। পুরো সংস্থার তাঁর মুঠোয়, অথচ আমার শাশুড়ি তা জানেন না। কারণ ভাবী যে কী চালাক, তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। রোজ জিজ্ঞেস করবে–মা, আজ কী রান্না হবে? আমার শাশুড়ি হয়তো একটা কিছু বলবেন, কিন্তু রান্না হয়তো তার আগেই হয়ে গেছে। শুধু শ্বাশুড়কে খুশি করার জন্যে বলা।মেয়েটার নাম কি যেন?
নীলু, নীলু ভাবী।তোর সঙ্গে ভাব আছে? ওনার সঙ্গে আমার খুব একটা ভাব নেই। উনি অতিরিক্ত রকমের বুদ্ধিমতী। এত বুদ্ধিমতী কাউকে আমার ভালো লাগে না। তবে তাঁর আমার কোনো অভিযোগ নেই।মেয়েটি বুদ্ধিমতী, শুধু এই কারণেই তুই তাকে পছন্দ করিস না, নাকি অন্য কোনো কারণ আছে? অন্য কোনো কারণ নেই। তা ছাড়া ওনাকে পছন্দ করি না, এই কথা কিন্তু আমি বলি নি। ওনাকে পছন্দ না-করে উপায় নেই।মেয়েটির হাসবেণ্ড সম্পর্কে বল। শফিক বোধ হয় ছেলেটির নাম, তাই না?
হ্যাঁ। ওনার সঙ্গে আমার কথাই হয় না।কেন? উনি কথা খুব কম বলেন। বাবলু বলে একটা ছেলে ছিল, ওর সঙ্গে মাঝে-মাঝে কথা বলতেন। এখন বাবলু নেই, ওনারও মুখ বন্ধ।দুভাই তা হলে দু রকম? হ্যাঁ, উত্তর মেরু আর দক্ষিণ মেরু। বাবা, আমি উঠি? খাওয়া শেষ? হ্যাঁ, শেষ।শারমিন উঠে গেল। রহমান সাহেবের সঙ্গে বেশিক্ষণ বসতে তার ভালো লাগে না। একটা অস্বস্তি মনের উপর চাপ ফেলতে থাকে। মনে হয়, এই বুঝি বাবা তাদের দুজনকে নিয়ে এমন এক প্রশ্ন করবেন, যার জবাব দেওয়া যাবে না।এই যে এক-একা বাগানে হাঁটছে, সে জানে রহমান সাহেব তাকে লক্ষ করছেন। হয়তো নিজেই বাগানে নেমে আসবেন।আপা, চা।কুদ্দুস এ বাড়ির নিয়মকানুন জানে না। চা খাবার জন্যে শারমিনের আলাদা কাপ আছে। নিজের কাপ ছাড়া শারমিন খেতে পারে না। কুদ্দুস পেটমোটা একটা কাঁপে চা এনেছে। দেখেই রাগ লাগছে।মিষ্টি হয়েছে। আপা?
হ্যাঁ হয়েছে, তুমি এখন যাও।কুদ্দুস গেল না। দূর থেকে শারমিনকে লক্ষ করতে লাগল। শারমিন ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলল। কিছু ভালো লাগছে না। জীবন যদি নতুনভাবে শুরু করা যেত, তাহলে সে কী করত? রফিককে কি বিয়ে করত? রহমান সাহেব নেমে এসেছেন। হাতের ইশারায় শারমিনকে ডাকছেন। শারমিন এগিয়ে গেল।টেলিফোন এসেছে।কে বাবা? জিজ্ঞেস করি নি, মনে হচ্ছে রফিক।শারমিন টেলিফোনের কাছে এগিয়ে গেল। হ্যাঁ, রফিকই-তবে গলার স্বরটা কেমন অন্য রকম। ঠাণ্ডা লেগেছে হয়তো।হ্যালো, শারমিন? হ্যাঁ।সুখে আছ কিনা জানার জন্যে টেলিফোন করলাম।তার মানে? আছ কেমন?
ভালোই আছি।বাড়ি ফিরে আসার কোনো পরিকল্পনা কি আছে? বাড়িতেই তো আছি।এই বাড়ি নয়, তোমার নিজের বাড়ির কথা বলছি।শারমিন ঠাণ্ডা গলায় বলল, আমার তো মনে হয় এটা আমার নিজেরই বাড়ি, অন্য কারোর নয়।আজকাল তাহলে জীবন সম্পর্কে নতুনভাবে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছ।যা বলতে চাও সহজ করে বল, এত পেঁচিও না। কী বলতে চাও তুমি? কিছু বলতে চাই না।বেশ, তাহলে টেলিফোন রেখে দিই।তুমি কবে আসবে? জানি না কবে আসব। ইচ্ছে হলেই আসব।মনে হচ্ছে খুব সহজে ইচ্ছে হবে না।শারমিন কথা বলল না। রফিক বলল, তোমার বিদেশীযাত্রার কত দূর? বেশ অনেক দূর।যাচ্ছেই। তাহলে? সে তো তুমি জান। তোমাকে আগেই বলেছি।
আমার ইচ্ছা নয় তুমি যাও।তোমার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কথা এখানে উঠছে কেন? যাচ্ছি। তো আমি? তুমি তো যাচ্ছ না।তোমার যাবার ব্যাপারে আমার কিছু বলার থাকবে না? না, থাকবে না!তুমি বোধহয় ভুলে যাচ্ছ, তুমি আমার স্ত্রী।না, ভুলি নি। তুমি আমাকে ভুলতে দিচ্ছ না। সারাক্ষণই মনে করিয়ে দেবার চেষ্টা করছি।মনে হচ্ছে ভূমি আমাকে ভুলে যেতে চাও? শারমিন জবাব না-দিয়ে টেলিফোন নামিয়ে রাখল। তার মনে হল সামনের সময়টা খুব খারাপ। এই সময় পার করা সহজ হবে না। সে নিঃশব্দে ছাদে উঠে গেল। নিজেকে খুব একা লাগছে। এ-রকম কখনো লাগে না। আজ মনে হচ্ছে এই বিরাট বাড়িতে সে ছাড়া আর কেউ নেই।
নীলগঞ্জ থেকে সোভাহানের চিঠি এসেছে। দীর্ঘ চিঠি। নীলুর কাছে লেখা। চিঠি পড়ে নীলু হাসবে না। কাঁদবে বুঝতে পারছে না। এই লোকটির নির্বুদ্ধিতার কোনো সীমা নেই। একটা মানুষ এতটা নির্বোধ হয় কেন? গুটিগুটি হরফে লিখেছে–
কল্যাণীয়াসু নীলু/
আশা করি সবাইকে নিয়ে তুমি তোমার স্বভাবমতো ভালো আছ। কদিন থেকেই ভাবছি। এখানকার পরিস্থিতি নিয়ে তোমাকে লিখব। বাবলুপ্রসঙ্গে যাতে কোনো দুশ্চিন্তা করতে না পার।
বাবলু ভালো আছে এবং বলা যেতে পারে সুখে আছে। গ্রাম তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করেছে। খোলা মাঠ, নদী, বনজঙ্গল এসব তো সে কখনো দেখে নি। সে দেখেছে মানুষ-মানুষের মধ্যে যে-সব খারাপ ব্যাপার আছে, সেইসব। মানুষের বাইরেও যে আরেকটি সুন্দর শান্ত জগৎ আছে, তা সে জানত না। এখন জানল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেখি নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছে। বনের ভেতর থেকেও কয়েক বার তাকে লোক পাঠিয়ে খুঁজে আনতে হয়েছে। ও তার নিজের একটি পৃথিবী খুঁজে পেয়েছে। সেই পৃথিবী থেকে তাকে সরিয়ে আনতে মন চাচ্ছে না। আমি তাকে এখানের একটি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছি।
আমি জানি তুমি আমার নির্বুদ্ধিতায় হাসছ। আমি সামনে থাকলে হয়তো খুব কড়া-কড়া কিছু কথা শুনিয়ে দিতে, তবু তুমি একটু ভাবলেই বুঝবে, আমি যা করছি তার ফল শুভ হবার সম্ভাবনা আছে। আমি নিজেও এখানে থেকে গেলাম। নীলগঞ্জ স্কুলে একটা মাস্টারি জুটে গেছে। সুখী নীলগঞ্জের যে-কাজ শুরু হয়েছিল, তা শেষ করা যায়। কিনা তাও দেখছি। দূর থেকে যে-কাজটি অসম্ভব বলে মনে হত, এখন তেমন অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে না।
মজার ব্যাপার কী জানি, নীলগঞ্জের লোকজন কেন জানি আমাকে বেশ পছন্দ করছে। আমাকে আড়ালে ডাকে পাগলা মাস্টার। যদিও পাগলামির কিছুই আমি করছি না। নামটা আমার পছন্দ হয়েছে, কারণ এরা কবির মামাকেও পাগলা মাস্টার ডাকত। যে-কোনোভাবেই হোক, গ্রামের মানুষদের উপর আমি কিছুটা প্রভাব ফেলেছি বলে মনে হয়। গত শুক্রবারে বড়ো রকমের একটা গ্ৰাম্য বিবাদ হল। সবাই দল বেধে এল আমার কাছে। আমি যেন একটা মীমাংসা করে দিই। আমি যা বলব, তাই নাকি তার?
