এইসব দিনরাত্রি শেষ – পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

এইসব দিনরাত্রি শেষ – পর্ব

সে চোখ বড়ো-বড়ো করে ভয়াত চোখে তাকিয়ে আছে। তার ফর্সা গালে আঙুলের দাগ ফুটে উঠেছে। যেন সেখানে রক্ত জমে গিয়েছে। নীলুকিয়েক সেকেণ্ড তাকিয়ে রইল তার দিকে, তারপর একটি কথা না বলে নিচে নেমে গেল। জহিরকে বলল, তুমি এখন শাহানার কাছে যাও। আমি চলে যাচ্ছি।আসুন, আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসছি।তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে না। তোমাকে যা করতে বললাম, কর।জহির দোতলায় উঠে এল। শাহানা চুপচাপ খাটে বসে আছে। মাথায় ঘোমটা। শাড়ির আঁচল এমনভাবে টানা যে মুখ দেখা যাচ্ছে না। জহিরকে দেখে সে বিব্রত ভঙ্গিতে হাসল। হাসিমুখেই বলল, ভাবী আমাকে মেরেছে। জহির বিস্মিত হয়ে বলল, সে কি?

দেখ না, গালে দাগ বসে গেছে।গালের দাগ দেখাতে গিয়ে শাহানা আবার হাসল। মৃদুস্বরে বলল, ভাবী এর আগে আরো এক বার আমাকে চড় দিয়েছিল। তখন আমি ক্লাস এইটে পড়ি। আমার এক বান্ধবী খুব খারাপ একটা বই দিয়েছিল আমাকে। কুৎসিত সব ছবি ছিল সেই বইটাতে। আমি লুকিয়ে—লুকিয়ে পড়ছিলাম। আমার হাতে এই বই দেখে ভাবী কী যে অবাক হল। কেমন অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকাচ্ছিল। তারপর আমি কিছু বোঝার আগেই একটা চড় মোরল আমাকে। হাত থেকে বই কেড়ে নিল না বা কিছু বলল না। এই ঘটনার কথা কাউকে বললও না। আমি কী যে লজ্জা পেয়েছিলাম। আজ আবার সেদিনের মতো লজ্জা পেলাম।জহির লক্ষ করল শাহানা কাঁদছে। খুব সহজেই সেই কান্নাও তার থেমে গেল। চোখ মুছে বলল, আমাকে ভাবী।

ডাক্তার সাহেবের চেহারা রাশভারী। মাথাভর্তি নজরুল ইসলামের মতো বাবরি চুল। কথাও বলেন খুব কম। ঘন-ঘন নিজের মাথার চুল টানেন। দেখে মনে হয়, কোনো কারণে খুব রেগে আছেন। কণ্ঠস্বরটি খুব সুন্দর। শুনতে ভালো লাগে। এই জন্যেই বোধ হয় নিজের গলার স্বর বেশি শোনাতে চান না।তিনি দীর্ঘ সময় নিয়ে টুনিকে দেখলেন। আজকালকার ব্যস্ত ডাক্তাররা এত সময় রোগীদের দেন না। ইনিও ব্যস্ত। এর ওয়েটিং রুমে রোগী গিজগিজ করছে। তবু প্রতিটি রোগীকে অনেকখানি সময় দিচ্ছেন।ওর জ্বর-জ্বর ভাব, এটা প্রায়ই হয় বলছেন?

জ্বি।এর আগে কোনো ডাক্তার দেখিয়েছেন? না। বাবা হোমিওপ্যাথি করেন। টুকটাক ওষুধ দেন, সেরে যায়।ও, আচ্ছা। আপনার মেয়ে তো খুব রূপবতী। পুতুল-পুতুল দেখাচ্ছে। কি খুকি, তুমি কি পুতুল? টুনি হেসে ফেলল। ডাক্তার সাহেব কাগজে অতি মনোযোগের সঙ্গে কী-যেন লিখতে লাগলেন। আগের মতো সুরেলা মিষ্টি স্বরে বললেন, আমি এখানে কিছু স্পেসিফিক টেস্টের কথা লিখে দিচ্ছি। টেস্টগুলি করাতে হবে। সব জায়গায় টেস্ট ভালো হয় না। কোথায় করাবেন তাও লিখে দিচ্ছি।আপনার সঙ্গে আবার তাহলে কখন দেখা করব?

আপনি আজই দেখা করবেন। রাত আটটা পর্যন্ত আমি বাসায় থাকব। আপনি রিপোর্টগুলি নিয়ে বাসায় চলে আসবেন।শফিক অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ডাক্তার সাহেব বললেন, বাসার ঠিকানা লিখে দিচ্ছি। টেস্টগুলি জরুরি ভিত্তিতে করানোর জন্যে যা প্রয়োজন, আপনি অবশ্যই করবেন।আপনি কী আশঙ্কা করছেন? কিছুই আশঙ্কা করছি না। যা বলার রিপোর্টগুলি দেখে তারপর বলব।ওর তো তেমন কিছু না, সামান্য জ্বরাজুরি সর্দি।আমি খুবই আশা করছি। ওর কিছু না, সামান্য ব্যাপার। তবু আপনাকে যা করতে বললাম করবেন। মেয়েকে সন্ধ্যাবেলা আনার দরকার নেই।আপনার কথায় কেমন জানি ভয়-ভয় লাগছে।সরি। আপনাকে যা করতে বললাম করবেন।

ডাক্তার সাহেবের বাসায় পৌঁছাতে-পৌঁছাতে সাড়ে আটটা বেজে গেল। তিনি তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে কোথায় যেন বেরুচ্ছিলেন। শফিককে দেখে বললেন, আমি ভাবছিলাম, আসবেন নাবুঝি।ব্লাড রিপোর্টটা পেতে একটু দেরি হয়ে গেল।বসুন আপনি।ডাক্তারের স্ত্রী তীক্ষ্ণকণ্ঠে বললেন, কতক্ষণ লাগাবে তুমি? অল্প কিছুক্ষণ। পাঁচ মিনিট। তুমি গাড়িতে অপেক্ষা কর।ভদ্রমহিলা তিক্ত গলায় বললেন, বাসাতেও যদি তুমি এসব ঝামেলা কর, তাহলে আমি যাব কোথায়? বললাম তো, পাঁচ মিনিট।ডাক্তার সাহেব সব কটি রিপোর্ট টেবিলে বিছিয়ে দিলেন। তিনি কিছু দেখছেন বলে মনে হল না। রিপোটিগুলি আবার একটির উপর একটি সাজিয়ে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে মাথার চুল টানলেন। শফিক বলল, কী দেখলেন? ডাক্তার কিছু বললেন না। শফিক আবার বলল, কী দেখলেন?

আপনার মেয়ের একটা খুব খারাপ অসুখ হয়েছে। হজকিন্স ডিজিজ। এক ধরনের লিউকেমিয়া। লোহিত রক্তকণিকাঘঠিত সমস্যা। অসুখটা খুবই খারাপ। এর বিরুদ্ধে আমাদের হাতে এখনও তেমন কোনো অস্ত্রশস্ত্র নেই। তবে বিদেশে প্রচুর কাজ হচ্ছে, ইফেকটিভ কেমি থেরাপি ডেভেলপ করেছে। এতে লাইফ এক্সপেকটেনসি অনেকখানি বাড়িয়ে দেওয়া গেছে। এই ফিল্ডে প্রচুর গবেষণাও হচ্ছে। যে-কোনো মুহুর্তে মোক্ষম ওষুধ বেরিয়ে আসবে। সেই আগামী কালও হতে পারে।বাইরে ভদ্রমহিলা ক্রমাগত গাড়ির হর্ন দিচ্ছেন। পাঁচ মিনিট সম্ভবত হয়ে গেছে। তিনি আর দেরি সহ্য করতে পারছেন না। ডাক্তার সাহেব বললেন, আপনাকে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি এনে দিই?

তিনি পানি এনে দিলেন। শান্ত স্বরে বললেন, আপনার যদি টাকা পয়সা থাকে, মেয়েকে জার্মানি পাঠিয়ে দিন। জার্মানির এক হাসপাতালে। আমি দীর্ঘ দিন পোস্টডক করেছি, আমি সব ব্যবস্থা করব।আমার মেয়ে ভালো হবে?হতে পারে। তবে এটা কালান্তক ব্যাধি, এটা আপনাকে মনে রেখেই এগুতে হবে। মেডিক্যাল সায়েন্স প্রাণপণ করছে। আমার মন বলছে খুব শিগগিরই কিছু একটা হবে। আগামী কাল, আগামী পরশু, আগামী মাস কিংবা আগামী বৎসর। আশা হারাবার মতো কিছু নয়।ডাক্তার সাহেবের স্ত্রী এসে ঢুকলেন। তীব্র গলায় বললেন, তুমি কি যাবে-না যাবে না?

যাব। চল, আমার দায়িত্ব শেষ হয়েছে।শফিক উঠে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ঠিকমতো পা ফেলতে পারছে না। ডাক্তার সাহেব গভীর মমতায় শফিকের হাত ধরলেন। বললেন, আসুন, আমি আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেব।দরকার নেই। আপনাদের দেরি হয়ে যাবে।হোক দেরি।ডাক্তার সাহেবের স্ত্রী বিড়বিড় করে কী বললেন। শফিক তা শুনল না, শুধু শুনল ডাক্তার সাহেব বলছেন, আমি প্রথম একে বাসায় পৌঁছে দেব। তোমার পছন্দ হোক না-হোক, আমার কিছু করার নেই।কিছু কিছু গল্প আছে, যা কখনো শেষ হয় না। এই সব দিনরাত্রির গল্প তেমনি এক শেষ না-হওয়া গল্প। এই গল্প দিনের পর দিন, বৎসরের পর বৎসর চলতেই থাকে। ঘরের চার দেয়ালে সুখ-দুঃখের কত কাব্যই না রচিত হয়। কত গোপন আনন্দ, কত লুকানো অশ্রু। শিশুরা বড়ো হয়।

বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা যাত্রা করে অনির্দিষ্টর পথে। আবার নতুন সব শিশুরা জন্মায়।আজ এই বাড়িতে নতুন একটি শিশু জন্মাবে। সে রহস্যময় এই পৃথিবীতে পা রাখার জন্যে চঞ্চল হয়ে উঠেছে। মাতৃগর্ভের অন্ধকার তার অসহ্য বোধ হয়েছে।শিশুটি শাহানার। শাহানা এই বিরাট খবরটা এখনও টের পায় নি। তার বোধহয় ধারণা, এমনিতেই তার খারাপ লাগছে। তবু সে নীলুকে এসে বলল, ভাবী, আমার শরীরটা ভালো লাগছে না। নীলু আঁৎকে উঠে বলল, ভালো লাগছে না। মানে? কেমন লাগছে? বুঝতে পারছি না ভাবী, কেমন যেন পিপাসা লাগছে। আর…

আর কী? জানি না ভাবী, বড়ো ভয় লাগছে।নীলু পাশের বাড়ি থেকে জহিরকে টেলিফোন করল। সে তার চেম্বারে নেই, বাসায়ও নেই। বাসায় ফিরবে সন্ধ্যার পর। কিংবা কে জানে হয়তো সরাসরি চলে আসবে। এ বাড়িতেই। কী সর্বনাশা। কাণ্ড! নীলু, অস্থির হয়ে পড়ল। হোসেন সাহেব এবং মনোয়ারা—দু জনের কেউই বাসায় নেই। যাত্রাবাড়ি গিয়েছেন। ফিরতে-ফিরতে রাত নটা।শাহানা বলল, ভাবী, আমার কি সময় হয়ে গেছে? বুঝতে পারছিনা। শুয়ে থােক। এখনো কি আগের মতো খারাপ লাগছে? না, এখন আর আগের মতো খারাপ লাগছে না। তুমি আমার পাশে বসে থাক।নীলু বসল। তার পাশে। শাহানা লাজুক স্বরে বলল, আমি জানি আজই সেইদিন।কী করে জানলে?

দেখছ না, বাসায় একটা মানুষ নেই, শুধু তুমি আর আমি। টুনির জন্মের সময়ও তো এ রকম হল। তোমার মনে নেই, ভাবী? নীলু জবাব দিল না। বিকেলের স্নান আলোয় তার চেহারাটা দ্রুত অন্য রকম হয়ে গেল। টুনির কোনো কথা সে মনে করতে চায় না। কিন্তু কেউ তা বুঝতে পারে না। কারণে-অকারণে এই প্রসঙ্গ নিয়ে আসে।টুনি দু বছর আগে জার্মানির এক হাসপাতালে মারা গেছে। নিঃসঙ্গ মৃত্যু অবশ্যি হয় নি। রুইনবাৰ্গ শহরের সব কটি বাঙালি পরিবার হাসপাতালে উপস্থিত হয়েছিলেন। আত্মীয়-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ছোট্ট বালিকাটিকে ঘিরে বসে ছিলেন। টুনি যত বার বলেছে আমার আমি, আমার আমি, ততবারই তাঁদের চোখে অশ্রুর বন্যা নেমেছে। এইসব প্রবাসী বাঙালিরা চাঁদা তুলে নীলুর জার্মানি আসার টিকিট পাঠিয়েছিলেন, যাতে নীলু তার মেয়েটির পাশে থাকতে পারে।

অহঙ্কারী নীলু তাতে রাজি হয় নি। বারবার বলেছে, ভিক্ষার টাকায় আমি যাব না। নীলু এবং শফিক এই দু জনের জার্মানী যাওয়া-আসা এবং থাকার যাবতীয় খরচ শারমিনের বাবা দিতে চেয়েছিলেন। তাতেও কেউ রাজি হয় নি। ওর টাকা কেন নেবে? শারমিন এবং রফিকের ডিভোর্স হয়ে গেছে। এই পরিবারটির সঙ্গে তাদের এখন আর কী সম্পর্ক? কিন্তু একেবারেই কি সম্পর্ক নেই? শারমিন থাকে আমেরিকায়। টুনির মৃত্যুর আগের দিন আমেরিকা থেকে সে জার্মানি চলে এল। টুনি মারা গেল শারমিনের কোলে মাথা রেখে। তার ছোট-ছোট হাতে সে সারাক্ষণই তার ছোট চাচীকে জড়িয়ে ধরে ছিল। যেন হাত ছাড়লেই চাচী কোথায়ও চলে যাবে। সেইসব হৃদয় ভেঙে-দেওয়া কাহিনী খুব গুছিয়ে শারমিন লিখেছিল। নীলু প্রায়ই ঐ চিঠি বের করে পড়ে।

পড়তে-পড়তে তার কাঁদতে ইচ্ছে করে, কিন্তু কান্না আসে না। টুনির মৃত্যুর পর কী-যে হয়েছে, সে কাঁদতে পারে না। স্মদিও প্রায়ই তার কাঁদতে ইচ্ছে করে।কত দিন হয়ে গেল টুনি নেই, তবু তার ছোট্ট ফুল-আঁকা বালিশ প্রতি রাতেই বিছানায় পাতা হয়। বালিশটা মাঝখানে রেখে একপাশে শোয় শফিক, অন্য পাশে নীলু তারা দু জনই কল্পনা করে, মেয়েটি দুজনের মাঝখানেই শুয়ে আছে। শফিক মেয়ের গায়ে হাত রাখতে যায়। নীলুও হাত বাড়িয়ে দেয়। টুনিকে তারা খুঁজে পায় না। একজন হাত রাখে অন্য জনের হাতে। শব্দহীন ভাষায় দু জন দু জনকে সান্ত্বনার কথা বলে।

কত বদলে গেছে সব কিছু। সবচে বেশি বদলেছে। রফিক। প্রায় রাতেই মদ খেয়ে বাড়ি ফেরে। কারো চোখের দিকে তাকায় না। মাথা নিচু করে নিজের ঘরে ঢুকে যায়। সারা রাত তার ঘরে বাতি জ্বলে। বাতি নেভালেই সে নাকি কী-সব দেখে। কবির মামা নাকি তার ঘরে হাঁটাহাঁটি করেন। এক দিন নাকি টুনিকেও দেখেছে। টুনি তাকে বলেছে, তুমি এমন হয়ে গেছ কেন, সবাই তোমাকে খারাপ বলে! কী করব রে মা, আমি মানুষটাই খারাপ।তোমাকে খারাপ বললে আমার খুব খারাপ লাগে।না, আর খারাপ হব না। তোকে কথা দিলাম। মদ ছেড়ে দিলাম। নো লিকার।

কিন্তু পরদিন আরো বেশি করে খায়, ঘোর মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরে ফিসফিস করে বলে, সব বাতি জ্বেলে রাখবে ভাবী। বাতি নেভালেই ওরা আসে। বড়ো বিরক্ত করে। সবচে বেশি বিরক্ত করে টুনি। কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান অসহ্য।টুনির কথা নীলু মনে করতে চায় না। তবু বারবার সবাই তাকে টুনির কথা মনে করিয়ে দেয়। হোসেন সাহেব প্রায় রাতেই ঘুমের ঘোরে চেঁচান-ও টুনি, টুনি। নিজের চিৎকারে তাঁর নিজেরই ঘুম ভেঙে যায়। বাকি রাতটা তিনি ছেলেমানুষের মতো চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে কাঁদেন। নীলু ও শফিক সেই কান্না শোনে। আহ, কী কষ্ট! কী কষ্ট! বেঁচে থাকা বড়ো কষ্টের।

শাহানা বলল, ও ভাবী, আবার যেন কেমন লাগছে। ওরা তো কেউ এল না। আমার বড়ো ভয় লাগছে। আমাকে তুমি হাসপাতালে নিয়ে যাও।নীলু উদ্বিগ্ন হয়ে ঘর থেকে বেরুল আনিস কোত্থেকে যেন ফিরছে। নীলু বলল, আনিস, একটা অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আস তো, মনে হচ্ছে শাহানাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।আমি এক্ষুণি নিয়ে আসছি। আপনি ওর কাছে গিয়ে বসুন।শাহানার কাছে বসতে ইচ্ছা করছে না। নীলু বারান্দায় এসে দাঁড়াল। রফিকের ঘর হাট করে খোলা। এই সময় সে কখনও ঘরে থাকে না থাকলে ভালুড় প্রয়োজনের সময় কাউকেই পাওয়া যায় না।ভাবী!নীলু চমকে তাকাল। রফিক দাঁড়িয়ে আছে। কখন যে সে নিঃশব্দে ঘরে ঢুকেছে।হচ্ছে কী ভাবী?

শাহানার পেইন উঠেছে। তুমি সবাইকে খবর দাও।অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আসব? অ্যাম্বুলেন্স লাগবে না। আনিস আনতে গেছে। তুমি জহিরকে খবর দেবার ব্যবস্থা করে যাত্রাবাড়িতে চলে যাও। বাবা-মাকে নিয়ে এস।রফিক চলে যেতে গিয়ে থমকেও দাঁড়িয়ে লাজুক গলায় বলল, শারমিন এগার তারিখে দেশে ফিরছে। ভাবী। আমাকে চিঠি লিখেছে।হঠাৎ তোমাকে চিঠি? আমার কাছে আবার ফিরে আসবে। চিঠিতে তাই লেখা। আবার সব আগের মতো হয়ে যাবে।ভালো, খুব ভালো।রফিক হাসছে। কত দীর্ঘ দিন পর নীলু ওর মুখে হাসি দেখল। নীলু ভুলেই গিয়েছিল রফিক হাসতে পারে ভেতর থেকে শাহানা ভয়ার্ত গলায় ডাকছে, ভাবী, তাবী। নীলু নড়ছে না। অবাক হয়ে দেখছে, অনেক দিন পর তাদের পাশের জলা জায়গাটায় বীকে বীকে বালিহাঁস নামছে।

পাখিরা শহর পছন্দ করে না। এবার কী হল তাদের। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি নামছে কেন? বিদ্যুৎ চমকের মত নীলুর মনে হল, টুনির জন্মের সময়ও ঝাঁকে ঝাঁকে হাঁস নেমেছিল।নীলু ঘরে ঢুকল। নতুন শিশু আসছে। কত দীর্ঘ দিন সে এই থাকবে। হাসবে, খেলবে, গাইবে। তার আগমনের সমস্ত প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। আয়োজনের কোনো ত্রুটি থাকা চলবে না।শাহানা কাঁপা-কাঁপা গলায় বলল, তুমি বারবার কোথায় চলে যাচ্ছ, ভাবী? আর যাব না। এই বসলাম তোমার পাশে।

বড়ো ভয় লাগছে, ভাবী।নীলু কোমল স্বরে বলল, কোনো ভয় নেই।ঘরের জানালা খোলা। ঘন হয়ে সন্ধ্যা নামছে। বালিহাঁসের পাখার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। অনেক দিন পর ওরা আবার এল।নীলু লক্ষ করল, তার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। ভুলে যাওয়া কান্না সে আবার ফিরে পেয়েছে। ব্যথায় ছটফট করছে শাহানা। মাতৃগর্ভে বন্দী শিশু মুক্তির জন্যে অস্থির হয়ে উঠেছে। কত না বিস্ময় অপেক্ষা করছে শিশুটির জন্যে!

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *