এই আমি পর্ব – ১ হুমায়ূন আহমেদ

এই আমি পর্ব – ১

ভূমিকা

ব্যক্তিগত রচনা শিরোনামে আমি একধরনের লেখা অনেক দিন থেকেই লিখছি।শুরু করেছিলাম”হোটেল গ্রেভার ইন”দিয়ে। প্রকাশ করেছিল কাকলী প্রকাশনী।এই ধারার সর্বশেষ রচনা”এই আমি”।এর প্রকাশকও কাকলী।যেখান থেকে শুরু সেখানেই শেষ।চক্র সম্পূর্ণ হল।

হুমায়ূন আহমেদ

১৩৫,এলিফেন্ট রোড

 ঢাকা।

আমার বড় মেয়ে তার কলেজে একটা কোয়েশ্চেনিয়ার জমা দেবে। সেখানে অনেক গুলি প্রশ্নের ভেতর একটি প্রশ্ন হলো- তোমার প্রিয় ব্যক্তি কে? সে লিখলো, আমার মা।আমি ভেবেছিলাম সে লিখবে,বাবা।আমার সব সময় ধারণা ছিল আমার ছেলে -মেয়েরা আমাকে অনেক পছন্দ করে। অন্তত তাদের মা’র চেয়ে বেশি তো বটে। করারই কথা আমি কখনো তাদের বকা-ঝকা করি না। অথচ তাদের মা এই কাজটা নিষ্ঠার সাথে করছে-

বাথরুম ভেজা কেন?

সন্ধ্যা হয়ে গেছে পড়তে বসনি কেন? পড়তে বসো।

টুথপেস্টের মুখ লাগানো নেই,এর মানে কি?

বন্ধুল সঙ্গে এতোক্ষণ টেলিফোনে কথা কেন?

ফ্রকে ময়লা কিভাবে লাগলো?

মাছ তো গোটাটাই ফেলে দিলে। বোন -প্লেট থেকে তুলে এনে খাও।তোল বলছি।তোল।এইসব যন্ত্রণা আমি তাদের দেই না। খাবার টেবিলে আমি ওদের সাথে মজার মজার গল্প করি। ভিডিও ক্লাবে কোন ভালো ছবি পাওয়া গেলে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে দেখি। তারচেয়েও বড় কথা,এমন সব কান্ড কারখানা মাঝে মাঝে করি যা বাচ্চাদের কল্পনাকে উজ্জীবিত করবেই। যেমন শহীদুল্লাহ্ হলে যখন থাকতাম তখন ভরা জোছনার রাতে বাচ্চাদের ঘুম থেকে তুলে -পুকুরে গোসল করতে নিয়ে যেতাম। বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে সবাইকে নিয়ে পানিতে ভেজা তো আমার চিরকালের নিয়ম। সবসময় করছি।যে মানুষটি সবসময় এমন সব কান্ড কারখানা করে সে কেন প্রিয় হবে না?আমার বড় মেয়ের কোয়েশ্চেনিয়ার দেখে হঠাৎ করে আমার মনে হলো-আমি কি এদের কাছে থেকে দূরে সরে গেছি? যদি দূরে সরে গিয়ে থাকি তা কখন ঘটল?

সারাদিন নানান কাজে ব্যস্ত থাকি। ইউনিভার্সিটির কাজ,নাটকের কাজ, লেখার কাজ।এর ফাঁকে ফাঁকে লোক আসছে। প্রকাশকরা আসছেন লেখার তাগাদা নিয়ে। এসেই চলে যাচ্ছেন না, বসছেন,গল্প করছেন।চা খাচ্ছেন।নাটকে অভিনয় করতে ইচ্ছুক তরুণ তরুণীরা আসছে।যে ভাবেই হোক তাদের টিভি নাটকে সুযোগ দিতে হবে। আমার গল্প উপন্যাস পড়ে খুশি হয়েছে এমন লোকজন আসছে। আসছে পত্রিকা অফিসের মানুষ। কেউ বুঝতে পারছে না আমি ক্লান্ত ও বিরক্ত। আমার বিশ্রাম। নিরিবিলি দরকার। আমার অনেক দূরে কোথাও চলে যাওয়া দরকার। আমার সবটুকু সময় বাইরের লোকজন নিয়ে নিচ্ছে। আমার ছেলে মেয়েদের জন্য, শরীরের জন্য একটুও সময় আলাদা নেই।

একটা শর্ট ফিল্ম বানাচ্ছি।সেই ছবির শুটিংয়ের কারণে একসপ্তাহের জন্য বাইরে যেতে হলো। যাবার আগ মুহূর্তেও লোকজন এসে উপস্থিত। তাদের বিদায় করতে করতে অনেক দেরি হয়ে গেল। ট্রেন মিস করবো। ছুটে গিয়ে গাড়িতে উঠলাম। ড্রাইভারকে বললাম,খুব স্পীডে চালাও। ড্রাইভার উল্কার গতিবেগে ছুটল।আর তখন মনে হল, আসার সময় বিদায় নিয়ে আসা হয় নি। বাচ্চারা হয়তো মনে মনে অপেক্ষা করছে, রওনা হবার আগে আমি বলব, বাবারা যাই কেমন? সেটা বলা হয় নি। তারা দেখছে অসম্ভব ব্যস্ত এক মানুষকে।একে তারা হয়তো ভালো মতো চেনেও না। একজন অতি চেনা মানুষ এম্নি করেই আস্তে আস্তে অচেনা হয়ে যায়। সম্ভাবত আমিও অচেনা হয়ে গেছি।তবু ক্ষীণ আশা নিয়ে একদিন মেঝো মেয়েকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গেলাম।গলা নিচু করে কথা বলছি যেন অন্য কেউ কিছু শুনতে না পায়।

কেমন আছো গো মা?

ভালো।

খুব ভালো,না মোটামুটি ভালো।

খুব ভালো।

এখন বল দেখি, তোমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ কে?

কোনো প্রিয় মানুষ নেই বাবা।

না থাকলেও তো এমন মানুষ আছে যাদের তোমার ভালো লাগে।আছে না?

হুঁ – মা।

মা তোমার সবচেয়ে প্রিয়?

হুঁ।

আর কেউ আছে?

আর আছে ছোট চাচী।

আর কেউ?

শাহীন চাচা।

আমি অবাক হয়ে লক্ষ্যে করলাম লিস্ট লম্বা হচ্ছে – কিন্তু সেই লম্বা লিস্টে আমার নাম নেই। আমাকে সে হিসেবের মধ্যেই আনছে না। এ রকম কেন হবে। দুদিন আমি খুব চিন্তা করলাম। ভেবেছিলাম ব্যাপারটা নিজের মধ্যেই রাখব। আমার স্ত্রী গুলতেকিন কে জানাবো না। এক রাতে তাকেও বললাম। সে বলল, কি অদ্ভুত কথা বলছো? বাচ্চারা তোমাকে অপছন্দ করবে কেন? তুমি ওদের খুবই প্রিয়।তুমি আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বলছো? মোটেও না। আমার ধারণা তোমার মতো ভালো বাবা কমই আছে।সত্যি বলছ? হ্যাঁ সত্যি। শীলার দুধ খাওয়ার ব্যাপারটা মনে কর। কজন বাবা এরকম করবে? শীলার দুধ খাওয়ার কথা মনে আছে?আছে।

আমার মেয়ের দুধ খাওয়ার গল্পটা বলি।তার কাছে এই পৃথিবীর সবচেয়ে অপছন্দের খাবার হলো দুধ। দুধের বদলে তাকে বিষ খেতে দেয়া হলেও সে হাসিমুখে খেয়ে ফেলবে।সেই ভয়াবহ পানীয় তাকে রোজ বিকেলে এক গ্লাস করে খেতে হয়। আমি আমার কন্যার কষ্ট দেখে,এক বিকেলে তার দুধ চুমুক দিয়ে খেয়ে ফেললাম।তাকে বললাম,মাকে বলিস না আমি খেয়ে ফেলেছি।এরপর থেকে রোজ তার দুধ খেতে হয়। একসময় নিজের কাছেও অসহ্য বোধ হল।তখন দুজনে যুক্তি করে বেসিনে ফেলে দিতে লাগলাম। বেশিদিন চালানো গেল না ধরা পড়ে গেলাম।

বাবা হিসেবে আমি যা করেছি তা আদর্শ বাবার কাজ না।তবে শিশুদের পছন্দের বাবার কাজতো বটেই।গুলতেকিন আমার কন্যার দুধের গল্প মনে করায় আমার উদ্বেগ দূর হল। আমি মোটামুটি নিশ্চিত হয়েই ঘুমতে গেলাম।যাক আমি খারাপ বাবা না।একজন ভালো বাবা। তবু সন্দেহ যায় না।পরেরদিন ছোট মেয়ে বিপাশাকে আইসক্রীম খাওয়াতে নিয়ে গেলাম। সে বিস্মিত তাকে একা নিয়ে যাচ্ছি। অন্য কেউকে নিচ্ছি না। ব্যাপারটা কি? তাকে ডলসি ভাটায় কোন আইসক্রীম কিনে ফিস ফিস করে বললাম,আচ্ছা মা বল তো কাকে তোমার বেশি পছন্দ? তোমার মাকে, না আমাকে? সে মুখ ভর্তি আইসক্রীম নিয়ে বলল, তোমাকে।তার বলার ভঙ্গি থেকে আমার সন্দেহ হল। আমি বললাম, তোমার মা শিখিয়ে দিয়েছে এইরকম বলার জন্য, তাই না? হুঁ।সে আর কি বলেছে?

বলেছে- বাবা যদি তোমাদের জিঙ্গাসা করে কে সবচেয়ে বেশি প্রিয় তাহলে আমার নাম বলবে না, তোমার বাবার নাম বলবে। না বললে সে মনে কষ্ট পাবে। লেখকদের মনে কষ্ট দিতে নেই।সত্যকে এড়ানো যায় না, পাশ কাটানো যায় না। সত্যকে স্বীকার করে নিতে হয়। আমি স্বীকার করে নিলাম। নিজকে বুঝালাম- আমার ক্ষেতে যা ঘটেছে তা যে কোনো ব্যস্ত বাবার ক্ষেত্রেই ঘটবে।একদিন এই ব্যস্ত বাবা অবাক হয়ে দেখবেন এই সংসারে তার কোনো স্থান নেই। তিনি সংসারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। সংসার ও তার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। এই এক আশ্চর্য খেলা।এই খেলা আমাকে নিয়েও শুরু হয়েছে। আমি একা হতে শুরু করেছি। বন্ধু বান্ধবী কখনোই  তেমন ছিল না। এখন আরো নেই। যারা আসেন কাজ নিয়ে আসেন।কাজ শেষ হয়, সম্পর্কও ফিকে হতে শুরু করে। পুরোনো বন্ধুদের কেউ কেউ আসেন – তখন হইতো লিখতে বসেছি। লেখা ছেড়ে উঠে আসতে মায়া লাগছে। তবু এলাম। গল্প জমাতে পারছি না। সারাক্ষণ মাথায় ঘুরছে এরা কখন যাবে? এরা কখন যাবে? এরা এখনো যাচ্ছে না কেন?

সে আন্তরিকতা, যে আবেগ নিয়ে তারা এসেছেন আমি তা ফেরত দিতে পারলাম না। তারা মন খারাপ করে চলে গেল। আমিও মন খারাপ করে লিখতে বসলাম। কিন্তু সুর কেটে গেছে। তবুও তাদের আনতে চেষ্টা করছি। অনেক কষ্টে কয়েক পৃষ্টা লেখা হলো। ভালো লাগলো না। ছিঁড়ে কুচি কুচি করে ঘুমতে গেলাম। মাথা দপ দপ করছে ঘুম আসছে না। চা খেলে হয়তো ভালো লাগবে। গভীর রাতে কে চা বানিয়ে দিবে? রান্নাঘরে নিজেই খুটখাট করছি। গুলতেকিন এসে দাঁড়ালো। ঘুম ঘুম চোখে বলল, তুমি বারান্দায় গিয়ে বস আমি চা বানিয়ে আনছি।সে শুধু আমার জন্য চা আনল না, নিজের জন্যও আনল। আটতলা ফ্লাটের বারান্দায় বসে দুজনে চুক চুক করে চা খাচ্ছি। আমি খানিকটা লজ্জিত বোধ করছি। আমার কারণে এতো রাতে গুলতেকিনকে উঠতে হল। লজ্জা কাটানোর জন্যে অকারণেই বললাম,চা খুব ভালো হয়েছে। একসেলেন্ট। সে কিছু বলল না।

আমি বললাম, একটা লেখা মাথায় চেপে বসে আছে কিছুতেই নামাতে পারছি না। কি করি বল তো? সে হালকা গলায় বলল, লাঠি দিয়ে তোমার মাথায় একটা বাড়ি দেই, তাতে যদি নামে তো নামলো। না নামলে কি আর করা।আমরা দুজন হেসে উঠলাম। এতে টেনশন খানিকটা কমল। আমি বললাম, গল্পটা কি শুনতে চাও? বল।আমি বুঝতে পারছি তার শুনার তেমন আগ্রহ নেই। সারাদিনের পরিশ্রমে সে ক্লান্ত। ঘুমে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। তারপরেও আমাকে খুশি করার জন্য তার জেগে থাকা। আমি প্রবল উৎসাহে গল্পটা বলতে শুরু করেছি।মতি নামের এক লোক। তাকে বেঁধে রাখা হয়েছে। গ্রামের লোকজন মিলে ঠিক করেছে খেঁজুরের কাঁটা দিয়ে তার দুইচোখ তুলে ফেলা হবে।মতির চোখ তুলে ফেলা হবে কেন? সে কি করেছে?

এখনো ঠিক করিনি সে কি করেছে। তবে গ্রামবাসীর চোখে সে অপরাধী তো বটেই, নয়তো তার চোখ তোলা হবে কেন? তাকে ভয়ংকর কোনো অপরাধী হিসাবে আমি দেখতে চাই না। ভয়ংকর অপরাধী হিসাবে দেখলে আমার পারপাস সার্বড হবে না।তোমার পারপাসটা কি? চোখ তোলা ব্যাপারটা যে কি পরিমাণ অমানবিক তা তুলে ধরা। এমনভাবে গল্পটা লিখব যেন…. যেন…… যেন কি? তোমাকে ঠিক বুঝতে পারছি না। মানে ব্যাপারটা হলো কি…….

গুলতেকিনকে বলতে বলতে গল্প লেখার আগ্রহ আবার বোধ করতে লাগলাম। আমার মনে হতে লাগল, এক্ষুণি লিখে ফেলতে হবে। এক্ষুণি না লিখলে আর লিখতে পারবো না। আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে বারান্দায় বসে আছি। আকাশে একফালি চাঁদ ও আছে। বারান্দায় সুন্দর জোসনা। অথচ এই জোসনায় আমি গুলতেকিনকে দেখছি না। দেখছি তার জায়গায় মতি মিয়া বসে আছে। তাকে দড়িঁ দিয়ে বাঁধা হয়েছে। সে অসহায় ভাবে তাকাচ্ছে আমার দিকে। চোখের দৃষ্টিতে বলছে, আমার ঘটনাটি লিখে ফেললে হয় না?কেন দেরি করছেন?

আমি ক্ষীণ  গলায় ডাকলাম, গুলতেকিন।কি? ইয়ে তুমি কি আর এককাপ চা বানিয়ে দিতে পারবে? শুবে না? না মানে ভাবছি গল্পটা শেষ করেই ঘুমুতে যাই।সকালে লিখলে হয় না? উহুঁ।সে উঠে চলে গেল। রান্নাঘরে বাতি জ্বলল।কিছুদূর লিখলাম।না ভালো হচ্ছে না। মতিকে আমি যে ভাবে দেখেছি সেভাবে লিখতে পারছি না। নিজের উপর রাগ লাগছে,সেই সাথে আশে পাশের সবার উপর রাগ লাগছে। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মনে হলো, পৃথিবীর কুৎসিত তম চায়ে চুমুক দিলাম। না হয়েছে লিকার না হয়েছে মিষ্টি। নিজের অজান্তেই বলে ফেললাম এটা কি বানিয়েছ?

ছোট ছেলে নুহাশের ঘুম ভেঙ্গে গেছে। ঘুম ভাঙ্গলেই সে খানিক্ষণ কাঁদে। সে কাঁদছে। আমি বিরক্ত হয়ে গুলতেকিনকে বললাম, দাঁড়িয়ে দেখছ কি কান্নাটা থামাও না।গুলতেকিন কান্না থামাতে গেল। সে কান্না থামাতে পারছে না। কান্না আরো বাড়ছে। কাঁদতে কাঁদতেই নুহাশ দুবার ডাকলো।বাবা। বাবা। সে নতুন কথা শিখেছে। কি সুন্দর লাগে তার কথা।আমার উচিত উঠে গিয়ে কোলে নিয়ে তাকে আদর করা। ইচ্ছে করছে না। বরং রাগে শরীর জ্বলছে। মনে হচ্ছে, এরা সবাই মিলে প্রাণপণ চেষ্টা করছে যেন আমি লিখতে না পারি। আমি ক্রুদ্ধ ও বিরক্ত হয়ে বললাম, সামান্য একটা কান্নাও থামাতে পারছ না? তুমি কি কর?

গুলতেকিন ছেলে কোলে নিয়ে দরজা খুলে বাইরে যাচ্ছে। খোলা বারান্দায় কিছুক্ষণ হাটবে। নুহাশ আমাকে দেখে আবারও কাঁদতে কাঁদতে ডাকল বাবা, বাবা। আমি বিচলিত হলাম না। আমার সামনে মতি। কিছুক্ষণের মধ্যে মতির চোখ উপড়ে ফেলা হবে। এমন ভয়াবহ সময়ে ছেলের কান্না কোনো ব্যাপারই না। বাচ্চারা অকারণেই কাঁদে। আবার অকারণেই তাদের কান্না থেমে যায়। এর কান্না থামবে। এর দুঃখের অবসান হবে, কিন্তু মতি মিয়ার কি হবে?

ছেলের কান্না থেমেছে। সে ঘুমিয়ে পড়েছে। তার মা তাকে বিছানায় শুইয়ে নিজে মুর্তির মত বসে আছে। আমার এখন খারাপ লাগতে শুরু করেছে। আমার মনে পড়েছে নুহাশের সকাল থেকে জ্বর। তার মা তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। আমি নিয়ে যায়নি। ডাক্তারের চেম্বারে তিন ঘন্টা বসে থেকে নষ্ট করার মতো আমার সময় নেই। তাছাড়া অসুখ বিসুখ আমার ভালো লাগে না। একগাদা রোগীর মাঝখানে বসে থাকা। হাতে নম্বর ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে  – বিয়াল্লিশ। ডাক্তার সাহেব দেখছেন সাত নম্বর। কখন বিয়াল্লিশ আসবে কে জানে?

ডাক্তার নিয়ে যা করার গুলতেকিন করবে। আমি এর মধ্যে নাই।বাজারে যেতে হবে? নোংরা মাছ, বাজারের থলি হাতে ঘোরা এবং প্রতিটা আইটেমে ঠকে আসা আমাকে দিয়ে হবে না। সেও গুলতেকিনের ডিপার্টমেন্ট।বাচ্চা কাচ্চাদের পড়ালেখা দেখা? অসম্ভব ব্যাপার। নিজের পড়া নিয়েই কুল পাচ্ছি না। এদের পড়া কখন দেখব? যা হবার হবে।সংসার জলে ভেসে যাচ্ছে? যাক ভেসে।খুব স্বার্থপরের মত কথা। আমি অবশ্যই স্বার্থপর। নিজেরটাই দেখি আর কিছু না। টিভিতে নাটক চলছে- আমার সমস্ত মমতা নাটকের জন্য। রেকর্ডিং করে রাত বারোটা একটায় ফিরি। কোনো রকম ক্লান্তি বোধ করি না।বাসার সবাই যে না খেয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছে তা আমার চোখে পড়ে না। নাটক ছাড়া তখন মাথায় আর কিছু ঢোকে না। এই মুহূর্তে নাটক ছাড়া আমার ভূবনে আর কিছু নেই।

মেয়ের জন্মদিন হবে। সে তার সব বান্ধবীকে দাওয়াত দিয়েছে। না, আমি তো থাকতে পারব না। নাটকের রির্হাসেল আছে। জম্মদিন প্রতি বছর একবার করে আসবে। রির্হাসেল তো প্রতি বছর একবার করে আসবে না। এরা বুঝতে পারছে না নাটকের রির্হাসেল আমার জন্য জরুরী কেন? আমি বোঝতে পারি না জন্মদিন এদের এতো জরুরী কেন? ক্রমে ক্রমেই আমরা দূরে হরে যায়। আমরা ব্যথিত হই। সেই ব্যাথা কেউ কাউরে বুঝতে পারিনা।অন্যসব ছেলেদের মত আমারও ইচ্ছা ছিল নিজেকে একজন আদর্শ মানুষ হিসাবে গড়ে তোলা। অন্য দশজনের মত হলে আমার চলবে না। আমাকে আলাদা হতে হবে। চারপাশের মানুষদের মধ্যে যা কিছু ভালো গুণ দেখেছি তাই নিজের মধ্যে আনার চেষ্টা করেছি। চেষ্টা পযর্ন্তই লাভ কিছু হয় নি।

মানুষ পরিবেশ দিয়ে পরিচালিত হয় না, মানুষের চালিকাশক্তি তার ডি এন এ। যা সে জন্মসূত্রে নিয়ে এসেছে। তার চারপাশের জগৎ তাকে সামান্যই প্রভাবিত করে। আমি আমার ডি এন এ অণুর গঠন কি জানি না। আমাদের জ্ঞান সেই পযর্ন্ত পৌছেনি। একদিন পৌছেবে, তখন সবাই ডি এন এ অণুর প্রিন্টআউট তাদের হাতে ধরিয়ে দেয়া হবে। তা দেখেই সে বুঝবে সে কেমন। অন্যরাও বুঝবে।সব রকম অস্পষ্টতার অবসান হবে।মায়েরা তখন বাচ্চার রেজাল্ট কেন খারাপ হয়েছে এ নিয়ে বাচ্চাকে বকা ঝকা করবেন না, কারণ তারা ডি এন এ প্রিন্ট আউট দেখেই বুঝবেন — এ পরিক্ষায় কখনোই তেমন ভালো করবে না। প্রতিদিন একটা করে প্রাইভেট টিউটর গুলে খাইয়ে দিলেও লাভ হবে না। সেই সময় একটি শিশুর জন্মের পর পরই সবাই জানবে।

বড় হয়ে এ হবে অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা। সে জোছনা দেখলে অভিভূত হবে,বৃষ্টি দেখলে অভিভূত হবে,সারাক্ষণ তার মাথায় খেলা করবে অন্য এক বোধ।ব্যাপারটা হয়তো খুব সুখকর হবে না। কারণ তখন মানুষের ভেতর রহস্য বলে কিছু থাকবে না। একজন অন্য একজনকে পড়ে ফেলবে খোলা বইয়ের মতো। মানুষের সবচেয়ে বড় অহংকার হলো সে বই নয়। তাকে কখনো পড়া যায় না। তারপরেও মানুষকে বই ভাবতে আমার ভালো লাগে। একেকজন মানুষ যেন এক একটা বই। কোন বই সহজ তড়তড় করে পড়া যায়। কোনো বই অসম্ভব জটিল। আবার কোনো কোনো বইয়ের হরফ অজানা। সেই বই পড়তে হলে আগে হরফ জানতে হবে। আবার কিছু কিছু বই আছে যার পাতাগুলি সাদা। কিছু সেখানে লেখা নেই। বড়ই রহস্যময় সে বই।আমার নিজের বইটা কেমন?খুব জটিল নয় বলেই আমার ধারণা। সরল ভাষায় বইটি লেখা। যে কেউ পড়েই বুঝতে পারবে।কিন্তু সত্যি কি পারবে?

সারল্যের ভেতরেও তো থাকে ভয়াবহ জটিলতা। সেখানে আমি নিজেই নিজকে বুঝতে পারি না সেখানে বাইরের কেউ আমাকে কি করে বুঝবে? আমার নিজের অনেকটাই আমার অজানা। কিছু কিছু কাজ আমি করি — কেন করি নিজেই জানি না। অন্য কেউ আমাকে দিয়ে করিয়ে নেয় বলে মাঝে মাঝে মনে হয়। আমার এই স্বীকারোক্তি থেকে কেউ মনে না করেন যে, আমি আমার কর্মকাণ্ডের দায় অন্য কোনো অজানা শক্তির উপর ফেলে দেয়ার চেষ্টা করি। আমি ভালো করেই জানি আমার প্রতিটি কর্ম কান্ডের দায় দায়িত্ব আমার। অন্য কারো নয়।

লেখালেখির ব্যাপারটাই ধরা যাক। অনেকবার আমার মনে হয়েছে লেখালেখির পুরো ব্যাপারটা আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। নিয়ন্ত্রণ করছে অন্য কেউ। যার নিয়ন্ত্রণ কঠিন। যে নিয়ন্ত্রণের আওতা থেকে বের হওয়ার কোনো ক্ষমতা আমার নেই। নিজের একটা লেখা থেকে উদাহরণ দেই –কৃষ্ণপক্ষ।

মিষ্টি প্রেমের উপন্যাস লিখব এই ভেবে শুরু করলাম। শুরুটা হল এই ভাবে —

নোটটা বদলাই দেন আফা, ছিঁড়া নোট।প্রথম বাক্যটি লিখে পুরো গল্প মাথায় সাজিয়ে নিলাম। সমস্যা দেখা দিল তখন। দ্বিতীয় বাক্যটি আর লিখতে পারি না। কত পৃষ্ঠা যে নষ্ট করলাম। প্রতিটিতে একটা বাক্য লেখা,নোটটা বদলাই দেন আফা, ছিঁড়া নোট। বাসার সবাই অস্থির, হচ্ছে কি এসব? এদের চেয়েও বেশি অস্থির আমি। পুরো গল্প আমি সাজিয়ে বসে আছি কিন্তু লিখতে পারছি না। এ কি যন্ত্রণা। শেষে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ঠিক করলাম,যা হবার হবে। আগের থেকে ঠিকঠাক করা গল্প লিখব না। যা আসে আসুক।

শুরু হল লেখা। পাতার পর পাতা লেখা হতে লাগল। এমন এক গল্প যা আমি লিখতে চাই নি। উপন্যাসের নায়কের ভাগ্য যেন পূর্ব নির্ধারিত। লেখক হিসেবে তা বদলানোর কোনো রকম ক্ষমতা আমাকে দেওয়া হয় নি। আমি একজন কপিরাইটার। কপি করছি এর বেশি কিছু না। কে করাচ্ছে কপি? আমার ডিএনএ অণু না অন্য কিছু? আমি জানিনা।মাঝে মাঝে এই ভেবে কষ্ট হয় – নিজের সম্পর্কে আমরা এতো কম জানি কেন? প্রকৃতি কি চায় না আমরা নিজকে জানি?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *