এই আমি পর্ব – ২ হুমায়ূন আহমেদ

এই আমি পর্ব – ২

এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা বলি। সন্ধ্যা থেকেই কাজ করছি। খাটের পাশে ছোট টেবিল নিয়ে মাথা গুজে লিখে যাচ্ছি। এক মুহূর্তের জন্যেও মাথা তুলছি না। হঠাৎ কি যেন হল। মনে হল কিছু একটা হয়েছে। অদ্ভুত কিছু ঘটে গেছে। বিরাট কোনো ঘটনা, আর আমি তাতে অংশগ্রহণ না করে বোকার মত মাথা গুজে লিখে যাচ্ছি। লেখার খাতা বন্ধ করে উঠে পড়লাম, কিন্তু বুঝতে পারলাম না ব্যাপারটা কি। অস্থিরতা বাড়লো। একবার মনে হল, এইসব মাথা খারাপের পূর্ব লক্ষণ। মাথা খারাপের আগে আগে নিশ্চয় মানুষের এমন ভয়ংকর অস্থিরতা হয়। বারান্দায় এসে দাঁড়ানোর সাথে সাথে অস্থিরতার কারণ স্পষ্ট হল। আজ পূর্ণিমা। আকাশ ভরা জোছনা। প্রকৃতির এই অসাধারন সৌন্দর্য উপেক্ষা করে আমি কি না ঘরের অন্ধকার কোণে বসে আছি?

অনেকেই বলে এটা এমন কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা না। যেহেতু জোছনা আমার প্রিয় আমার অবচেতন মন খেয়াল রেখেছে কবে জোছনা। সেই অবচেতন মনই মনে করিয়ে দিচ্ছে। আর কিছু না। অবচেতন মনের উপর দিয়ে আমরা অনেক কিছু পার করে দেই। ডাক্তারদের যেমন এলার্জি। মনবিজ্ঞানের অবচেতন মন। যখন রোগ ধরতে পারেন না তখন ডাক্তাররা গম্ভীর মুখে বলেন এলার্জি। মনবিজ্ঞানী যখন সমস্যা ধরতে পারে না তখন বিজ্ঞের মত মাথা ঝাকিয়ে বলেন অবচেতন মনের কারসাজি।আর কিছু না।সেই অবচেতন মনটাই বা কি? কতটুকু তার ক্ষমতা। লেখকদের লেখালেখি কি অবচেতন মন নামক সমুদ্র ভেসে ওঠে?

সেখান থেকে চলে আসে চেতনা জগতে। ইন্দ্রিয় অগ্রাহ্য জগত থেকে ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য জগতে তার আগমন।সেই ইন্দ্রিয় আগ্রহ্য জগতটি আমার জানতে ইচ্ছা করে, বুঝতে ইচ্ছা করে।অনার্স ক্লাসে আমি কোয়ান্টাম বলবিদ্যা পড়াই। আমাকে পড়তে হয় ভারনার হাইজেনবার্গের অনিশ্চিয়তার সূত্র। আমি বলি শুন ছেলেমেয়েরা,কোনো বস্তুর অবস্থান ও গতি একই সময় নির্ণয় করা যায় না।এই দুইয়ের ভেতর সবসময় থাকে অনিশ্চয়তা।তুমি স্থান পুরোপুরি জানলে গতিতে অনিশ্চয়তা চলে আসবে। আবার গতি জানলে অনিশ্চয়তা চলে আসবে অবস্থানে।ছাত্ররা প্রশ্ন করে, স্যার কেন?

আমি নির্বিকার থাকার চেষ্টা করতে করতে বলি-এটা প্রকৃতির বেঁধে দেওয়া নিয়ম। প্রকৃতি চায় না আমরা গতি ও অবস্থান ঠিকঠাক জানি। জ্ঞানের অনেক খানি প্রকৃতি নিজের কাছে রেখে দেয়। প্রকাশ করে না।কেন স্যার? জানিনা।কোয়ান্টাম বলবিদ্যার শিক্ষক হিসেবে ছাত্রদের অনেক প্রশ্নের উত্তরে আমাকে বলতে হয় জানি না।জ্ঞানের তীব্র পিপাসা দিয়ে মানুষকে যিনি পাঠিয়েছেন তিনিই আবার জ্ঞানের একটি অংশ মানুষের কাছ থেকে সরিয়ে রেখেছেন।কেন? উত্তর জানা নেই।এই মহাবিশ্বের বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তরই আমাদের জানা নেই। আমরা জানতে চেষ্টা করছি।যতই জানি ততই বিচলিত হচ্ছি। আরো নতুন সব প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা নিদারুণ আতঙ্কের সঙ্গে লক্ষ্য করেছে তাদের সামনে কঠিন কালো পর্দা।যা কোনদিনই উঠানো সম্ভব নয়।কি আছে এই পর্দার আড়ালে তা জানা যাবে না।

আমার যাবতীয় রচনায় আমি ওই কালো পর্দার ইঙ্গিত দিয়ে থাকি। আমি জানিনা আমার পাঠক পাঠিকারা সেই ইঙ্গিত ধরতে পারেন,না-কি তারা গল্প পড়েই আনন্দ পান। উদাহরণ দেই।কৃষ্ণপক্ষ উপন্যাসের নায়ক মুহিবের বিয়ের দিন। একটা কটকটে হলুদ রঙের পাঞ্জাবী পরে এসেছিল। সবাই তাই নিয়ে খুব হাসাহাসি করলো। ছেলেটি মারা গেল বিয়ের পরদিন। তার স্ত্রী অরুর বিয়ে হল অন্য এক জায়গায়। কেটে গেল দীর্ঘ কুড়ি বছর। কুড়ি বছর পর সেই অরুর মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। বাড়িতে তুমুল উত্তেজনা।বর এসেছে,বর এসেছে।অরু আগ্রহ করে নিজেও তার কন্যার বর দেখতে গেলেন।ছেলেকে দেখেই তিনি চমকে উঠলেন।তার গায়েও কটকটে হলুদ রঙের পাঞ্জাবী।যেন এই ছেলেটা কুড়ি বছর আগের মুহিবের পাঞ্জাবীটা পরে এসেছে।

অনেকেই আমাকে বলেছেন,কৃষ্ণপক্ষ উপন্যাস থেকে হলুদ পাঞ্জাবীর অংশটা বাদ দিলে উপন্যাসটা সুন্দর হত। উপন্যাসের এই অংশটুকুই দূর্বল। হিন্দি ছবির মত মেলোড্রামা।অথচ উপন্যাসটি লেখাই হয়েছে হলুদ পাঞ্জাবীর ব্যাপারটির জন্য। আমি কি আমার বোধ পাঠকদের কাছে ছড়িয়ে দিতে ব্যর্থ হচ্ছি?এরা হিমুর বাইরের রুপটি দেখে।তার উদ্ভট কর্মকারখানায় মজা পায়-কিন্তু এর বাইরেও তো হিমুর অনেক কিছু বলার আছে।হিমু ক্রমগত বলেও যাচ্ছে।কেন কেউ তা ধরতে পারছে না?লেখক হয়ে এরচেয়ে বড় ব্যর্থতা আর কি হতে পারে?

আমি আমার গল্পটা লিখে শেষ করেছি।মতির চোখ উপড়ে ফেলার গল্প। সাধারণত গল্পগুলি আমি গভীর রাতে শেষ করি।এই প্রথম শেষ করলাম বিকেলে। আনন্দে চোখে পানি এসে গেছে। চোখ মুছে শোবার ঘরে এসে দেখি-আমার মেয়েরা সব সাজ পোশাক পরছে। একেকজনকে পরীর মত দেখাচ্ছে।আমি বললাম,কি ব্যাপার? ওরা ঝলমল করে বলল,তুমি কাপড় পরে নাও।দেরি করছ কেন?আমরা বিয়েতে যাব না? ওদের মা বলল,তোর বাবার চোখ দেখে বুঝছিস না সে যাবে না।সে ঘরে চুপচাপ একা বসে থাকবে।বড় মেয়ে দুঃখিত গলায় বলল,বাবা তুমি যাবে না? আমি বললাম, অবশ্যই যাব?কে বলেছে যাব না?

শার্ট প্যান্ট ইস্ত্রি করা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। বিয়েবাড়িতেও সবার সাথে হৈচৈ করলাম।গল্প গুজব,রসিকতা। সবাই ভাবল,লোকটা বেশ মজার তো।কেউ আমার নিঃসঙ্গতা বুঝতে পারলো না।শুধু এক ফাঁকে গুলতেকিন এসে বলল,তোমার কি হয়েছে? আমি জবাব দিলাম না।আমার কি হয়েছে আমি নিজেই কি ছাঁই জানি?শুধু জানি মতি মিয়ার গশ্প লিখে শেষ করেছি মতি মিয়া এখন আর আমার দিকে তাকিয়ে থেকে কাতর অনুনয় করবে না-স্যার আমার ব্যাপারটা লিকে ফেলুন।জীবনের গভীরতম বোধকে আমি অনুভব করতে পারি। জোছনার অপূর্ব ফুলকে আমি দেখতে পাই। কিন্তু তারা অন্তরের এতই গভীরে যে,আমি তুলে আনতে পারি না। বার বার হাত ফসকে যায়। দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী জেগে আমি অপেক্ষা করি।কোন দিন কি পারব সেই মহান বোধকে স্পর্শ করতে?

নিজেকে বুঝায়,ভাগ্যে যা আছে তা হবে।

               Every man’s fate

               We have fastened

               On his own neek

                (সূরা বনি ইসরাইল)

আমরা কি করব না করব সব পূর্ব নির্ধারিত।কি হবে চিন্তা করে? নিয়তির উপর সব ছেড়ে ছুঁড়ে দিয়ে অপেক্ষা করাই ভালো।আমি অপেক্ষা করি।

আজ বাদ আছর খেজুর কাঁটা দিয়ে মতি মিয়ার চোখ তুলে ফেলা হবে।চোখ তুলবে নবীনগরের ইদরিস।এই কাজ সে আগেও একবার করেছে।মতি মিয়াকে আটকে রাখা হয়েছে বরকত সাহেবের বাংলা ঘরে।তার হাত পা বাঁধা।একদল মানুষ তাকে পাহারা দিচ্ছে।যদিও তার প্রয়োজন ছিল না।পালিয়ে যাওয়া দূরের কথা মতির উঠে বসার শক্তি পযর্ন্ত নেই।তার পাঁজরের হাঁড় ভেঙেছে।ডান হাতের সব কয়টা আঙুল থেতলে ফেলা হয়েছে।নাকের কাছে সিকনির মতো রক্ত ঝুলে আছে।পরনের সাদা পাঞ্জাবী রক্তে মাখামাখি হয়ে গায়ের সঙ্গে লেগে গেছে।ঘন্টা খানিক আগেও তার জ্ঞান ছিল না।এখন জ্ঞান আছে,তবে বোধশক্তি ফিরেছে বলে মনে হয় না।তার চোখ তুলে ফেলা হবে এই খবরেও সে বিচলিত হয় নি।ছোট করে নিঃশ্বাস নিয়ে বলেছে,নয়ন কখন তুলবেন?

এই পর্ব বাদ-আছর সমাধা শুনে সে মনে হয় নিশ্চিন্ত হল।সহজ গলায় বলল,পানি খামু পানি দেন।পানি চাইলে পানি দিতে হয়। না দিলে গৃহস্থের দোষ লাগে।রোজ হাশরের মাঠে পানির পিপাসায়  বুক যখন শুকিয়ে যায় তখন পানি পাওয়া যায় না।কাজেই এক বদনা পানি এনে মতির সামনে রাখা হল।মতি বিরক্ত গলায় বলল,মুখের উপরে পানি ঢাইল্যা না দিলে খামু ক্যামনে? আমার দুই হাত বান্ধা।আপনেরার এইটা কেমুন বিবেচনা? যে বদনা এনেছে সে মোড়ায় বসে থাকা একজনের দিকে তাকিয়ে বলল, পানি ঢাইল্যা দিমু হাসান ভাই?

হাসান আলী মতিকে কেন্দুয়া বাজার থেকে ধরে এনেছে।মতির উপর এই কারণেই তার অধিকার সবাই স্বীকার করে নিয়েছে।মতির বিষয় যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে হলে হাসান আলীর মতামত জানা দরকার।হাসান আলী পানির বিষয়ে কোনো মতামত দিল না, বিস্মিত হয়ে বলল, হারামজাদা কেমন ঢং-এর কথা কয় শুনছেন?তার চোউক তোলা হইবো এইটা নিয়ে কোনো চিন্তা নাই।ক্যাটক্যাট কইরা কথা বলতেছে।কি আচানক বিষয়।ঐ হারামজাদা তোর মনে ভয় ডর নাই?

মতি জবাব দিল না,থু করে থুথু ফেলল।থুথুর সঙ্গে রক্ত বের হয়ে এল।তাকে ঘিরে ভিড় বাড়ছে।খবর ছড়িয়ে পড়েছে। একজন জীবিত মানুষের চোখ খেজুর কাটা দিয়ে তুলে ফেলা হবে এমন উত্তেজক ঘটনা সচরাচর ঘটে না।আশা করা যাচ্ছে আছর ওয়াক্ত নাগাদ লোক লোকারণ্য হবে।মতিকে দেখতে যে সাধারন লোকজন আসছে তা না, বিশিষ্ট্য লোকজন ও আসছে।কেন্দুয়া থেকে এসেছেন রিটায়ার্ড স্টেশন মাস্টার মোবারাক হোসেন।নয়াপাড়া স্কুলের হেড মাস্টারও এসেছেন। হাসান আলী নিজের চেয়ার ছেড়ে দিয়ে তাকে বসতে দিল।তিনি পাঞ্জাবীর পকেট থেকে চশমা বের করতে করতে বললেন,এর নাম মতি?

হাসান আলী বলল,জ্বে হেডমাস্টার সাব।এই হারামজাদাই মতি।বাদ আছর হারামজাদার চোখ তোলা হইবো।এরে ধরলে ক্যামনে? সেইটা আপনের এক ইতিহাস।পানদানিতে পান চলে এসেছে।হেডমাষ্টার সাহেব পান মোখে দিতে দিতে উৎসাহের সঙ্গে বললেন,ঘটনাটা বল শুনি। সংক্ষেপে বলবা।হাসান আলী এগিয়ে এল।মতিকে ধরে আনার গল্প সে এ পযর্ন্ত এগারবার বলেছে।আরো অনেক বার বলতে হবে।বিশিষ্ট লোকজন এখনো অনেকে আসেননি।সবাই আলাদা আলাদা করে শুনতে চাইবেন।তাতে অসুবিধা নেই।এই গল্প লক্ষবার বলা যায়।হাসান আলী কেশে গলা পরিষ্কার করে নিল।

*ঘরে কেরাচি ছিল না।আমার পরিবার বলল কেরাচি নাই।আমার মেজাজ গেল খারাপ হইয়া। হাটবার কেরাচি আনলাম,আর আজ বলে কেরাচি নাই,বিষয় কি। যাই হোক,কেরাচির বোতল হাতে লইয়া রওনা দিলাম।পথে সুলেমানের সাথে দেখা।সুলেমান কিইলো চাচাজি জান কোই?….

মতি নিজেও হাসানের গল্প আগ্রহ নিয়ে শুনছে। প্রতিবারই গল্পের শাখা পেশাখা বের হচ্ছে। সুলেমানের কথা এর আগে কোনো গল্পে আসেনি।এইবার এল।সুলেমানের ভূমিকা কি কিছু বুঝা যাচ্ছে না।হাসান আশী গল্প শেষ করল।হেডমাস্টার সাহেব মুগ্ধ গলায় বললেন,বিরাট সাহসের কাম করছ হাসান।বিরাট সাহস দেখাইছ।কামের কাম করছ।মতির সাথে অস্ত্রপাতি কিছু ছিল না? জ্বে না।আল্লাহ তোমারে বাঁচাইছে। অস্ত্রপাতি থাকলে উপায় ছিল না।তোমারে জানে শেষ কইরা দিত।উপস্থিত সবাই মাথা নাড়ল।হেডমাষ্টার সাহেব বললেন,চোউক তোলা হইব, কথাটা কি সত্য?

জ্বে সত্য।এইটা সকলের সিদ্ধান্ত।চোউক তুললেই জন্মের মত অচল হইব।থানা পুলিশ কইরা তো কোন ফাইদা নাই।অতি সত্য কথা।কোনো ফাইদা নাই।তবে থানাওয়ালা ঝামেলা করে কি না এইটা বিবেচনায় রাখা দরকার।আছে।সব বিবেচনার মইধ্য আছে।মেম্বার সাব থানাওয়ালার কাছে গেছে।মতি লক্ষ্যে করল,হেডমাষ্টার সাহেব তার দিকে তাকিয়ে আছেন।হেডমাস্টার সাহেবের চোখ শিশুসূলভ বিস্ময় ও আনন্দ।মনে হচ্ছে,চোখ তোলার ঘটনা দেখার জন্য তিনি আছর পযর্ন্ত থেকে যাবেন।মতি তেমন ভয় পাচ্ছে না। প্রাথমিক ঝড় কেটে গেছে এটাই বড় কথা। প্রথম ধাক্কায় চোখ চলে যেতে পারত সেটা যখন যায়নি তখন আশা আছে।

আছরের আগেই কেউ না কেউ দয়াপরবশ হয়ে ফেলবে থাউক বাদ দেন।চউক তুইলা লাভ নাই।শক্ত মাইর দিয়া ছাইড়া দেন। একজন বললেই অনেকে তাকে সমর্থন করবে।তবে একজন কেউকে বলতে হবে।মতি নিজে ক্ষমা চাইলে হবে না।এতে এরা আরো রেগে যাবে।সে দূর্বল হলে সর্বনাশ। দূর্বলকে মানুষ করুণা করে না,ঘৃণা করে।মতি ঠান্ডা মাথায় ভাবে।চোখ বাঁচানোর পথ বের করতে হবে।হাতে অবশ্যি সময় আছে।আছরের এখনো অনেক দেরি।ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করাও সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।সারা শরীরে যন্ত্রণা,পিপাসায় বুক শুকিয়ে যাচ্ছে। পানির বদনা সামনে আছে কিন্তু কেউ মুখে ঢেলে না দিলে খাবে কিভাবে? হেডমাস্টার সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন,কি রে মতি সিগ্রেট খাবি?

সবাই হো হো করে হেসে ফেলল।মতি চিন্তিত বতধ করছে।এটা ভালো লক্ষণ না।এরা তাকে দেখে মজা পেতে শুরু করেছে।মানুষ মজা পায় জন্তু জানোয়ার দেখে।এরা তাকে জন্তু জানোয়ার ভাবতে শুরু করেছে।হাত পা বাঁধা এক ভয়াবহ প্রাণী। ভয়াবহ প্রাণীর চোখ উঠানো কঠিন কিছু না। তাছাড়া দূর দূর থেকে লোকজন মজা পাবার জন্য আসছে।মজা না পেয়ে তারা যাবে না। মতি হেডমাস্টার সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, স্যার পানি খাব।একজন বদনার পুরো পানি তার মুখের উপর ঢেলে দিল।সবাই আবার হো হো করে হেসে উঠল।মতির বুক ধক করে উঠল।অবস্থা ভালো না।তাকে দ্রুত এমন কিছু করতে হবে যেন সে পশুস্তর থেকে উঠে আসত্র পারে।কি করা যায় কিছু মাথায় আসছে না।চোখ দুটি কি আজ চলেই যাবে?

মায়া মততা দুনিয়া থেকে উঠে যাচ্ছে।একসময় ছিল যখন তার মত লোকের শাস্তি ছিল মাথা কামিয়ে গলায় জুতার মালা ঝুলানো।থারপর এল ঠ্যাং ভাঙা শাস্তি। ঠ্যাং ভেঙে লুলা করে দেয়া।আর এখন চোখ তুলে দেয়া।একটা খেঁজুর কাঁটা দিয়ে পুট করে চোখ বের করে আনা।এতোগুলো লোক তাকে ঘিরে আছে,কারো চোখে কোন মমতা নেই।অবশ্য হাতে এখনো সময় আছে।মমতা চট করে তৈরী হয় না।মমতা তৈরী হতেও সময় লাগে।মতি হাসান আলীর দিকে তাকিয়ে হাসল।মানুষের হাসি খুব অদ্ভুত জিনিস।জন্তু জানোয়ার হাসতে পারে না।মানুষ হাসে।একজন হাসন্ত মানুষের উপর রাগ থাকে না।

হাসান আলী চেচিয়ে উঠল,দেখ হারাম * হাসে।ভয়ের চিহ্নটা নাই।কিছুক্ষণের মধ্যে চউখ চইলা যাইতেছে তারপরও হাসে।দেখি এর গালে একটা চড় দাও দেখি।

প্রচণ্ড চড়ে মতি দলা পাকিয়ে গেল।হাত পা বাধা না হলে চার পাঁচ হাত দূরে চলে যেত। কিছুক্ষণের জন্য মতির বোধশক্তি লোপ পেল।মাথার ভেতর ভোঁ ভোঁ শব্দ হচ্ছে।চারদিকে অন্ধকার।এরা কি চোখ তুলে ফেলেছে?মনে হয় তাই।পানির পিপাসা দূর হয়েছে।পিপাসা নেই।এটা মন্দ না।মাথার ভেতর পাক দিচ্ছে। মনে হয় সে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে।অজ্ঞান হবার আগে আগে এরকম হয়।অজঞান হওয়া খুব আনন্দদায়ক ব্যাপার।দ্রুত শরীরের ব্যাথা বেদনা চলে যায়।শরীর হালকা হতে থাকে।না,চোখ যায়নি।চোখ এখনো আছে।এই তো সবকিছু দেখা যাচ্ছে।মতি মনে মনে বলল,শালার লোক কি হইছে।মেলা বইশ্যা গেছে।বেলা পড়ে এসেছে।আছর ওয়াক্ত হয়ে গেছে না কি?না মনে হয়।আলো খুব বেশি।তাকে বাংলা ঘর থেকে বের করে উঠানে শুইয়ে রাখা হয়েছে।এই জন্যই আলো বেশি লাগছে।মতি বলল,কয়টা বাজে?

কয়টা বাজে তা দিয়ে দরকার নাই।সময় হইয়া আসছে।যা দেখনের দেইখা নে রে মতি।মতি চারিদিকে তাকালো।তার আশেপাশে কোনো ছোট ছেলেমেয়ে নেই।মহিলা নেই।এদর বোধহয় সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। লোকজন তাকে ঘিরে গোল হয় আছে।তার সামনে জনচৌকির উপর নীল গেঞ্জি এবং সাদা লুঙ্গি পরে যে বসে আছে সে-ই কি তার চোখ তুলবে?সে-ই কি নবীনগরের ইদরিস?কখন এসেছে ইদরিস?লোকটার ভাব ভঙ্গি দশজনের মত না।তাকাচ্ছে অন্যরকম করে।তার চেয়েও বড় কথা, আশেপাশের লোকজন এখন নীল গেঞ্জিওয়ালাকেই দেখছে।

মতির প্রতি তাদের এখন আর কোনো আগ্রহ নেই।তারা অপেক্ষা করছে বড় ঘটনার জন্য।নীল গেঞ্জি পরা লোকটার সাথে কথা বলে ব্যাপারটা জেনে নেওয়া য়ায়।মতি অপেক্ষা করছে কখন লোকটি তাকায় তার দিকে।যেই তাকাবে ওম্নি মতি কথা বলবে তার দিকে।চোখের দিকে না তাকিয়ে কথা বললে কোনো আরাম নেই।কিন্তু লোকটা তাকাচ্ছে না।ভাইজান,ও ভাইজান।নীল গেঞ্জি তাকালো মতির দিকে।মতি সঙ্গে সঙ্গে বলল,আপনার নাম কি ইদরিস মিয়া?নীল গেঞ্জি জবাব দিল না।মাথা ঘুরিয়ে নিল।মতি আরো আন্তরিক ভঙ্গিতে বলল,ভাইজান আপনেই কি আমার চউখ তুলবেন?

পেছন থেকে একজন বলল,হারামজাদা কয় কি? সঙ্গে সঙ্গে সবাই হেসে উঠল।এই কথায় হাসার কি আছে মতি বুঝতে পারছে না।কথাটা কি সে বিশেষ কোনো ভঙ্গিতে বলেছে?সাধারন কথায়ও কেউ কেউ খুব মজা করে বলতে পারে।তার বৌ পারত।অতি সাধারন কথা এমনভাবে বলত যে হাসতে হাসতে চোখে পানি এসে যেত।ভাত বেড়ে ডাকতে এসে বলত,ভাত দিছি আসেন।কষ্ট কইরা তিন+চারটা ভাত খান।না, বৌয়ের কথা ভাবার এখন সময় না।নয়ন বাঁচলে বৌয়ের কথা ভাবা যাবে। নয়ন না বাঁচলেও ভাবা যাবে। ভাবার জন্য নয়ন লাগে না।বৌয়ের কথা সে অবশ্যি এমনিও ভাবে না।

শুধু জেলখানা বা হাজতে থাকলেই তার কথা মনে আসে।তখন তার কথা ভাবতেও ভালো লাগে।মেয়েটার অবশ্য কষ্টের সীমা ছিল না।সে জেলে গেলেই চৌকিদার,খানাওয়ালা বাড়িতে উপস্থিত হত।বিষয় কি?খোঁজ নিতে আসছে মতি ঘরে আছে কি না।সুন্দর একটা মেয়ে।খালি বাড়িতে থাকে। খানাওয়ালারা তো রাতদুপুরে সেই যাবেই।বাড়িতে যাবে।পান খাবে।আরো কত কি করবে।ডাকাতের বৌ হল সবার বৌ।এই অবস্থায় কোনো মেয়ে থাকে না।তার বৌটা তারপরও অনেক দিন ছিল।মতি প্রতিবারই বাড়ি ফিরতো আতঙ্ক নিয়ে।বাড়ির সামনে এসে মনে হত এইবার বাড়িতে ঢুকে দেখবে,বাড়ি খালি।কেউ নেই।

বৌ চলে গেছে গত বৈশাখ মাসে।কোথায় গেছে কেউ জানে না।পাড়ার কয়েকজনকে জিঙ্গাসা করেছিল।কেউ বলতে পারে না।একজন বলল,অনেক দিন তো থাকল,আর কত?বাজারে গিয়া খোঁজ নাও।মনে হয় বাজারে ঘর নিছে।জগতের অনেক সত্যের মত এই সত্যকে সে গ্রহণ করেছে সহজভাবে।চোর ডাকাতের বৌয়ের শেষ আশ্রয় হয়  বাজার।বাজারে তারা মোটামুটি শুখেই থাকে।মুখে রং চং মেখে সন্ধ্যাকালে চিকন গলায় ডাকে,ও ব্যাপারি আহেন,পান তামুক খাইয়া যান।শীতের দিন শইলডা গরম করন দরকার আছে।

অবসর পেলেই মতি আজকাল বাজারে বাজারে ঘুরে।বৌটারে পাওয়া গেলে মনে শান্তি।তাকে নিয়ে ঘর সংসার করবে না।তাতে লিভ কি?বৌটা কোন এক জায়গায় থিতু হয়েছে এটা জানা থাকলেও মনে আনন্দ।মাঝে মাঝে আসা যাবে।আপনার মানুষের কাছে কিছুক্ষণ বসলেও ভাল লাগে।আপনার মানুষ সংসারে থাকলেও আপনার,বাজারে থাকলেও আপনার।বৌ কেন্দুয়া বাজারে আছে এরকম একটা উড়ো খবর শুনে মতি কেন্দুয়া আসেছিল।উড়ো খবর কখনো ঠিক হয় না।তার বেলায় ঠিক হয়ে গেল।বৌ এখানেই আছে।নাম দিয়েছে মর্জিনা।বাজারে ঘর নিলে নতুন নাম নিতে হয়। মর্জিনার সাথে দেখা করতে যাবার মুখে এই বিপদ।

আজান দিচ্ছে।আছরের ওয়াক্ত হয়ে গেছে।মতি অনেক কষ্টে পাশ ফিরল।তারা চোখ কখন তুলবে?নামাজের নিশ্চয়ই না।কিছুটা সময় এখনো হাতে আছে।এর মধ্যে কত কিছু হয়ে যেতে পারে।মহাখালি রেল স্টেশনে সে একবার ধরা পড়ল।তাকে মেরেই ফেলত। ট্রেনের কামরা থেকে একটা মেয়ে ছুটে নেমে এল।চিৎকার করে বলল,আপনারা কি মানুষটাকে মেরে ফেলবেন? খর্বদার আর না। খর্বদার।মেয়েটির মূর্তি দেখেই লোকজন হকচকিয়ে গেল। লোকজনের কথা বাদ থাক সে নিজেই হতবম্ভ হয়ে গেল।জীবন বাঁচানোর জন্য মেয়েটিকে সামান্য ধন্যবাদ ও দেওয়া হয় নি।ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে।সেই মেয়ে চলে গেছে কোথায় না কোথায়।

আজ এই যে এতো লোক চারপাশে ভিড় করে আছে।এদের মধ্যে ও কেউ না কেউ আছে ঐ মেয়েটির মত।সে অবশ্যই শেষ মুহূর্তে ছুটে এসে বলবে করেন কি।করৈন কি।আর এতেই মতির নয়ন রক্ষা পাবে।একটুকু বিশ্বাস তো মানুষের প্রতি রাখতেই হবে।মতি মিয়া অপেক্ষা করে।কে হবে সেই লোকটি।না জানি সে দেখতে কেমন।সেই লোকটির চোখ কি ট্রেনের মেয়েটির চোখের মত মমতামাখা হবে?যে চোখের দিকে তাকালেই ভালো হয়ে যেতে ইচ্ছা করে।মতি মিয়া চাপা উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করে,অপেক্ষা করতে তার ভালোই লাগে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *