এই আমি পর্ব – ৩ হুমায়ূন আহমেদ

এই আমি পর্ব – ৩

অভিশাপে পাথর হয়ে যাবার ব্যাপারে রূপকথার বইয়ে পাওয়া যায়। ঐ যে দুষ্টু যাদুকর রাজকন্যাকে পাথর বানিয়ে ফেলল। বছরের পর বছর রোদ বৃষ্টিতে পড়ে রইল সেই পাথরের মূর্তি। তারপর এক শুভক্ষণে রাজকুমার এসে তাকে অভিশপ্ত মুক্ত করল। পাথরের মূর্তি প্রাণ ফিরে পেল।তারা দুজন সুখে শান্তিতে জীবন কাটাতে লাগল।শৈশবের রূপকথার গল্পকে গুরুত্ব দেবার কোন কারণ নেই,কিন্তু যৌবনে আবার শৈশবের গল্প নতুন করে পড়লাম। উপন্যাসটির নাম ‘পেট্রিফায়েড ফরেস্ট’ অর্থাৎ প্রস্তরীভূত অরণ্য। এই উপন্যাসের তরুণ নায়ক সন্ধ্যাবেলা বিষণ্ন মুখে ‘পেট্রিফায়েড ফরেস্ট-এ ঘুরে বেড়ায়। চারিদিকে পাথরের গাছ।তার মাঝে পাথরের মত মুখ করে এই যুগের নায়ক বসে থাকে। আমার কাছে মনে হয় এ-কি ছেলেমানুষি। রূপকথার পাথরের অরণ্য এ যুগে কোথেকে আসবে?

পাথরের অরণ্য থাকতে পারে না।আমার অনেক ধারণার মত এই ধারণাও পরবর্তীতে ভ্রান্ত বলে প্রমাণীত হয়। প্রস্তরীভূত অরণ্য দেখার দূর্লভ সৌভাগ্য হয়।সেই গল্প বলা যেতে পারে।তখন থাকি আমেরিকার নর্থ ডাকোটায়।সংসার ছোট -আমি,আমার স্ত্রী আর একমাত্র মেয়ে নোভা।টিচিং অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে মাসে চারশ ডলারের মত পাই।দিনে আনি দিনে খাই অবস্থা।ঘুরে বেড়ানোর প্রচণ্ড শখ।শখ মেটানোর উপায় নেই।খুবই খরচান্ত ব্যাপার। আমেরিকা বিশাল দেশ।দেখার জিনিস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।তখনও কিছু দেখা হয় নি।ছ’শ টাকা দিয়ে একটা লক্কর মার্ক ফোর্ড গাড়ি কিনেছি।সেই গাড়ি নিয়ে বেরুতে সাহস হয় না। ইঞ্জিন গরম হলেই এই গাড়ি মহিষের মত বিচিত্র শব্দ করে।

এই অবস্থায় বেড়াতে যাবার নিমন্ত্রণে পেলাম। আমার পাশের ফ্লাটের মালয়েশিয়ান ছাত্র এক সকালে এসে বলল,আহমাদ,আমি গতকাল একটা নতুন গাড়ি কিনেছি-শেব্রলেট।পাঁচ হাজার ডলার পড়ল।আমি বললাম,বাহ,ভালো তো!আমি ঠিক করেছি গাড়িটি লং রুটে টেষ্ট করব।গাড়ি হচ্ছে স্ত্রীর মত। স্ত্রীকে যেমন পোষ মানাতে হয়,গাড়িকেও পোষ মানাতে হয়।আমি আজ সন্ধ্যায় রওনা হচ্ছি সাউথ ডাকোটায়।খুব ভালো।তুমি ও আমার সঙ্গে যাচ্ছ।তোমার সঙ্গে যদিও আমার তেমন পরিচয় নেই,তবুও তুমি আমার প্রতিবেশী।তুমি যেমন মুসলিম,আমিও মুসলিম।অবশ্য আমি খারাপ মুসলমান,নিয়মিত মদ খাই।আমি মালয়েশিয়ান ছেলেটির কথায় চমৎকৃত হলাম।সে বলল,আমি তোমার নাম জানি।কিন্তু তুমি আমার নাম জান না।দশ ডলার বাজি।বল দেখি আমার নাম কি?

আমি বললাম,আইজেক।আইজেক হচ্ছে আমার ছেলের নাম।আমার নাম আবদাল।যাই হোক তুমি তৈরী থেকো।ঠিক সন্ধ্যায় আমরা রওনা হব।আমি বললাম নতুন গাড়িতে যাচ্ছ,তোমার স্ত্রী এবং ছেলেকে সঙ্গে নিলেই তো ভালো হবে।মোটেও ভালো হবে না।তুমি আমার স্ত্রীকে চেন না।ওকে আমি সহ্য করতে পারি না।তাছাড়া তোমাকে আগেই বলেছি,গাড়ি হচ্ছে স্ত্রীর মত।দু’জন স্ত্রীকে নিয়ে বের হওয়া কি ঠিক।আমি আবদালের লজিকে আবারও চমৎকৃত হলাম।তাকে বিনীত ভাবে বললাম,আমার পক্ষে আমার স্ত্রী ও কন্যাকে একা একা রেখে বেড়াতে যাওয়া সম্ভব না।ওদের মন খারাপ হবে।আমার ও ভালো লাগবে না।

আবদাল বিমর্ষ মুখে চলে গেল।আমার স্ত্রী গুলতেকিন বলল,তর সাথে যেতে রাজি না হয়ে খুব ভালো কাজ করেছ।পাগল ধরনের লোক।তবে ওর বৌটা খুব ভালো।তার নাম রোওজি।এমন ভালো মেয়ে আমি কম দেখেছি। চেহারা ও রাজকন্যাদের মত।বিকেলে আবদার আবার এল।তার মুখের বিমর্ষ ভাব দূর হয়েছে।সে হাসিখুখে বলল,ঠিক আছে তুমি তোমার স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে নাও।আমি আমারটা নিচ্ছি।ঘুরে আসি।আমি বললাম,এতো মানুষ রেখে তুমি আমাকে নিতে আগ্রহী কেন? আবদাল বলল,অনেক গুলো কারণ আছে-তুমি আমার প্রতিবেশী,তুমি মুসলমান এবং তুমি রোজ বিকেলে তোমার মেয়েকে কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াও।দেখতে বড় ভালো লাগে।আমারও ইচ্ছা করে আমার ছেলেকে কাঁখধে নিয়ে ঘুরতে।তবে আমার ছেলটা হল মহাশয়তান।

মার কাছ থেকে সব শয়তানি বুদ্ধি পেয়েছে।এজন্যে ওকে কাঁধে নেই না।তাও একদিন নিয়েছিল।কাঁধে তোলা মাত্র পেসাব করে দিল।প্রাকৃতিক কারণে করেছে তা না ইচ্ছা করেই করৃছে।রাতে রওনা হওয়ার দরকার কি?আমরা বরং ভোরবেলা রওনা হল।দৃশ্য দেখতে দেখতে যাই।আমেরিকায় দেখার মত কোন দৃশ্য নেই।মাইলের পর মাইল ধু ধু মাঠ।ঐ মাঠগুলি গরু পায়খানা করার জন্য উত্তম।কাজেই রাতে যাচ্ছি।তাছাড়া স্ত্রীকে যেমন রাতে পোষ মানাতে হয়,গাড়িকেও তেমন রাতে পোষ মানাতে হয়।সন্ধ্যা মিলাবার পর আমরা রওনা হলাম।গ্যাস স্টেশনে গ্যাস নেওয়ার জন্য গাড়ি দাঁড়ালো।আবদাল নেমে গেল,গ্যাস নিল।দু একটা টুকিটাকি জিনিস কিনবে।আবদালের স্ত্রী আমার দিকে তাকিয়ে পরিষ্কার ইংরেজিতে বলল,ভাইজান আমি কি আপনার সাথে দুটি কথা বলার অনুমতি পেতে পারি?

আমি মেয়েটার পরিষ্কার ইংরেজি শুনে যেমন মুগ্ধ হলাম,তেমনি মুগ্ধ হলাম তার রূপ দেখ।মালয়েশিয়ান চামড়া আমাদের মত শ্যামলা।এই মেয়েটির গায়ের রঙ দুধে আলতা মেশানো।মিশরী মেয়েদের মত টানা টানা চোখ,লম্বা চুল।লাল টকটকে কমলার কোয়ার মত ঠোঁট।আমি বললাম,বলুন কি বলবেন।আমি শুনছি।আপনি যে আপনার স্ত্রী কন্যা নিয়ে আমাদের সাথে যাচ্ছেন আমি খুশি হয়েছি।আল্লাহর কাছে শুকরিয়া।আপনি থাকায় আমি একটু ভরসা পাচ্ছি।আমার স্বামী খুব দ্রুত গাড়ি চালায়।আপনি একটু লক্ষ রাখবেন।অবশ্যই লক্ষ রাখব।তার চেয়েও বড় সমস্যা,রাতের বেলায় হাইওয়েতে গাড়ি চালানোর সময় সে প্রায় স্টিয়ারিং হুইল ধরে ঘুমিয়ে পড়ে।সে কি।জ্বী।অনেকবার বড় ধরনের অ্যাকসিডেন্ট থেকে বেঁচে গেছি।আরো কিছু বলার আছে?

এখন বলব না।এখন বললে আপনি ভয় পাবেন।আল্লাহ আল্লাহ করে ট্রিপ শেষ করে আসি, তারপর আপনাকে বলব।সাউথ ডাকোটায় অনেক দেখার জিনিস আছে।টুরিস্টরা প্রথম দেখে পাথরের গায়ে খোদাই করা চার প্রেসিডেন্টের মাথা।দল নিয়ে দেখতে গেলাম।আবদাল ভ্রু কুচকে বলল,এর মধ্যে দেখার কি আছে বুঝলাম না।হাতুড়ি বাটাল দিয়ে  পাহাড় গুলি নষ্ট করেছে।এখানে দাঁড়িয়ে থেকে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয়? রোওজি বলল,আমার কাছে বেশ সুন্দর লাগছে।আবদাল বলল,তোমার কাছে তো সুন্দর লাগবেই।তুমি হলে বুদ্ধিহীন নারী।বুদ্ধিহীন নারী যা দেখে তাতেই মুগ্ধ হয়।আমি রোওজিকে অপমান থেকে বাঁচানোর জন্য বললাম,আমি বুদ্ধিহীন নারী নই।আমার কাছেও সুন্দর লাগছে।ভালো লাগলে ভালো।

তোমরা থাক এখানে,আমি দেখি কোনো পাব টাব পাওয়া যায় কি না।কয়েকটি বিয়ার না খেলে চলে না।আবদাল বিয়ারের খোঁজে চলে গেল।আমরা অনেক ছবি তুললাম।খাঁটি টুরিস্টের মত ঘুরলাম।তারপর আবদালের খোঁজে গিয়ে দখি সে পাঁড় মাতাল।টেবিল থেকে মাথা তুলতে পারছে না এমন অবস্থা।আমাকে দেখেই হাসিমুখে বলল,খবর সব ভালো? আমি বললাম,ভালো।তোমার এ কি অবস্থা।কোনো চিন্তা করবে না।মাতাল অবস্থায় আমি সবচেয়ে ভালো গাড়ি চালাই।চল রওনি হওয়া যাক।এখনি রওনা হওয়া যাবে না।আরো অনেক কিছু দেখার আছে।তাছাড়া তোমার ও মনে হয় বিশ্রাম দরকার।আমার কোনোই বিশ্রাম দরকার নেই এবং এখানে কিছুই দেখার নেই।

স্ফটিক গুহার খুব নাম শুনেছি।না দেখে গেলে আফসোস থাকবে।আবদাল বলল,গুহা দেখার কোনো দরকার নেই।গুহা জন্তু জানোয়ারের জন্য।মানুষের জন্য না।তাকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে স্ফটিক গুহা দেখতে নিয়ে গেলাম।সারা পৃথিবীতে সত্তরের মত স্ফটিক গুহা আছে।সেই সত্তরটির মধ্যে ষাটটিই আছে সাউথ ডাকোটায়।পাঁচ ডলারের টিকিট কেটে আমরা স্ফটিক গুহায় ঢুকলাম।সে এক ভয়াবহ সৌন্দর্য।লক্ষ লক্ষ স্ফটিক ঝলমল করছে।প্রকৃতি যেন পাথরের ফুল ফুটিয়েছে। বিস্ময়ে হতবাক হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।রোওজি মুগ্ধ কন্ঠে বলল,আহ!কি সুন্দর।আবদাল বলল, ন্যাকামি করবে না।তোমার ন্যাকামি অসহ্য।পাথর আগে দেখনি?পাথর দেখে আহ !সুন্দর বলে নেচে উঠার কি আছে? ন্যাকামি না করলে ভালো লাগে না?

রোওজির মন খারাপ হল।আমারো মন খারাপ হল।এদের সঙ্গে না এলেই ভালো হত।কিছুক্ষণ পর পর একটা মেয়ে অকারণেই অপমানিত হচ্ছে।এই দৃশ্য সহ্য করা মুশকিল।মেয়েটি মনে হচ্ছে স্বামীর ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।খানিকক্ষণ মন খারাপ করে থাকে।তারপর আবার আনন্দে ঝলমল করে ওঠে।গুহা থেকে বেরুবার পর গুহার কেয়ারটেকার বলল,কেমন দেখলে? আমি বললাম,অপূর্ব।আবদাল বলল,বোগাস।পাথল দেখিয়ে টাকা রোজগার।শাস্তি হওয়া উচিত।কেয়ারটেকার বলল,স্ফটিক আপনাকে মুগ্ধ করতে পারে নি।এখান থেকে দশ কিলোমিটার দূরে আছে পেট্রিফায়েড ফরেস্ট।পুরো অরণ্যক পাথর হয়ে গেছে।ঐটা দেখেন।

আবদাল বলল,আমি আর দেখাদেখির মধ্যে নেই।তাকে ছেড়ে গেলে সে আবার কোনো একটা পাবে ডুকে পড়বে।আমাদের আর বাড়ি ফেরা হবে না।কাজেই জোর করেই তাকে ধরে নিয়ে গেলাম।দেখলাম পেট্রিফায়েড ফরেস্ট।অবিশ্বাস্য ব্যাপার।গাছপালা পোকামাকড় সবই পাথর হয়ে গেছে।এমন অস্বাভাবিক ব্যাপার যে প্রকৃতিতে ঘটতে পারে তা-ই আমার মাথায় ছিল না।আমি আবদালকে বলল,কেমন লাগল? সে বলল,দূর দূর।পেটইফায়েড ফরেস্টে ছোট একটা দোকানের মত আছে।সেখানে স্যুভেনির বিক্রি হচ্ছে। পাথর হওয়া পোকা,পাথর হওয়া গাছের পাতা।কোনটার দাম কুড়ি ডলার কোনটা পঁচিশ।

রোওজি ক্ষীণ স্বরে তার স্বামীকে বলল,সে একটা পোকা কিনতে চায়।তার খুব শখ।আবদাল চোখ লাল করে বলল,খবরর্দার এই কথা দ্বিতীয় বার বলবে না।পোকা কিনবে কুড়ি ডলার দিয়ে?ডলার খরচ করে কিনতে হবে পোকা? পাথরের পোকা।পাথর হোক আর কাঠের হোক।পোকা হল পোকা।ভুলেও কেনার নাম মুখে আনবে না।অদ্ভুত এই ব্যাপার কি তোমার কাছে মোটেও ভালো লাগছে না? ভালো লাগার কি আছে?আমার বমি করে ফেলার ইচ্ছা হচ্ছে।তোমরা ঘুরে বেড়াও।আমি সুভ্যেনির দোকানে গিয়ে বসি।ওদের কাছে বিয়ার পাওয়া যায় কিনা কে জানে?

আমরা ঘন্টাখানেক ঘুরলাম।রোওজি বলল,চলুন ফেরা যাক।ও আবার দেরি হলে রেগে যাবে।আবদাল রেগে টং হয়ে আছে।আমাকে দেখেই বলল, কুৎসিত একটা জায়গা।বিয়ার পাওয়া যায় না।চল তো আমার সাথে,একটা পাব খুঁজে বের করি।ওরা এখানে থাকুক।আমি বললাম,না খেলে হয় না? আবদাল বলল,বিয়ার না খেলে বাঁচব কিভাবে? আমি আবদালকে নিয়ে পাবের সন্ধানে বের হলাম।যাবার আগে সে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে কয়েকটি হুঙ্কার দিল,খবরর্দার,কিছু কিনবে না।পোকা মাকড় বাসায় নিয়ে গেলে খুনোখুনি হয়ে যাবে।চুলের মুঠি ধরে গেট আউট করে দেব।পাবে দুজন মুখমুখি বসলাম।আবদাল বলল,আমি তোমাকে আলাদা নিয়ে এসেছি একটা গোপন কথা বলার জন্য।গোপন কথাটা কি?

রোওজির জন্য কিছু পাথরের পোকা মাকড় কিনেছি।আমি এইসব তাকে দিতে পারি না।তুমি দেবে।তুমি বলবে যে,তুমি তাকে উপহার দিচ্ছ।আমি তাকিয়ে আছি। ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না।ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না।আবদাল বলল,আমি আমার স্তীকে পাগলের মত ভালোবাসি।কিন্তু ব্যাপারটা তাকে জানতে দিতে চাই না।জানলেই লাই পেয়ে যাবে।এ কারণেই তার সাথে খারাপ ব্যবহার করি।ও আচ্ছা।মেয়েটা যে কত ভালো তা তুমি দূর থেকে বুঝতে পারবে না।তুমি লোকটাও মন্দ না।আমি অতি মন্দ।ইবলিশ শয়তানের কাছাকাছি।সেটা কোনো ব্যাপার না।দুনিয়াতে ভালো মন্দ দুধরনের মানুষ থাকে।থাকে না? হ্যাঁ থাকে।এখন তুমি কি আমার স্ত্রীকে এইসব পোকামাকড় গুলো উপহার হিসেবে দিবে?

তুমি চাইলে অবশ্যই দেব।কিন্তু আমার ধারনা তোমার স্ত্রী সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে ফেলবে -এইসব উপহার আসলে তোমারই কেনা।না বুঝতে পারবে না।আমি আমার ভালোবাসা সবসময় আড়াল করে রেখেছি।ওর ধারণা হয়ে গেছে,আমি ওকে দুচোখে দেখতে পারি না।এতে লাভ কি হচ্ছে আমি কিন্তু বুঝতে পারছি না।লাভটা বলি-কোনো একদিন রোওজি হটাৎ করে সবকিছু বুঝতে পারবে।বুঝতে পারবে আমার সবই ছিল ভান।তখন কি গভীর আনন্দই না পাবে।আমি সেই দিনটির জন্য অপেক্ষা করছি।আবদাল বিয়ারের অর্ডার দিয়েছে।দুই জগ ভর্তি বিয়ার।নিমিষের মধ্যে একজগ শেষ করে সে বলল,জিনিসটা মন্দ না।

আমরা আবার পেট্রিফায়েড ফরেস্টে ফিরে গেলাম।রোওজি ক্ষীণ স্বরে তার স্বামীকে বলল,সে ছোট একটা গোবরে পোকা কিনতে চায়।কি সুন্দর জিনিস।আবদাল চোখ লাল করে বলল,আবার!আবার ন্যাকামি ধরনের কথা? আমরা প্রস্তরীভূত অরণ্য দেখে ফিরে যাচ্ছি।আবদাল ঝড়ের গতীতে গাড়ি চালাচ্ছে।মাতাল অবস্থায় সে আসলেই ভালো গাড়ি চালায়। পেছনের সীটে বিষণ্ন মুখে বসে আছে।কারণ গাড়িতে উঠার সময় সে আবদালের কাছ থেকে একটা কঠিন ধমক খেয়েছে।

ঈদের আগের দিন বিকেলে আমাদের বাসায় একটা দূঘটনা ঘটে গেল।বেশ বড় রকমের দূর্ঘটনা।আমার মেয়ের ঈদের জামাটা তার এক বান্ধবী দৈখে ফেলল।দেখার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। বক্সে তালাবদ্ধ করে একটা কাগজের প্যাকেটে মুড়ে রাখা হয়েছিল।কপাল খারাপ থাকলে যা হয়।বোতাম লাগাবার জন্য জামা বের করা হয়েছে ওমনি বান্ধবী এসে হাজির। আমার মেয়ে প্রাণপণ চেষ্টা করেও তার জামা লুকতে পারল না।সে আকাশ ফাটিয়ে কাঁদতে লাগল-জামা পুরোন হয়ে গেছে।জামা পুরোন হয়ে গেছে।সবকিছু পুরোন করা চলে।ঈদের জামা জুতা পুরোন করা চলে না।জুতোর প্যাকেট বুকের কাছে নিয়ে ঘুমতে হয়।জামাটা খুব কম করে হলেও পাঁচবার ইস্ত্রি করতে হয়।এবং দিনের মধ্যে অন্তত তিনবার দেখতে হয় সব ঠিক আছে কি না।

কিন্তু অন্য কেউ দেখে ফেললেই সর্বনাশ।ঈদের আনন্দের পনেরো আনাই মাটি।বান্ধবী জামা দেখে ফেলেছে এই দুঃখে আমার মেয়ে যখন কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে ফেলল,তখন বললাম,চল যাই আরেকটা কিনে দেব।রাত দশটায় তাকে নিয়ে জামা কিনতে বেরুলাম।চারিদিকে কি আনন্দ।কি উল্লাস।শিশুদের হাতে বেলুন।মায়েদের মুখ ভর্তি হাসি।হাতে কেনাকাটার ফর্দ।বাবারা সিগারেট ধরিয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে হাঁটছেন।আগে যেসব ছোট ছোট শিশু শুকনো মুখে পলিথিন বিক্রি করতো,তারা আজ খুবই হাসছে। খুব বিক্রি হচ্ছে ব্যাগ।এক ভদ্রলোককে দেখলাম তিনটি ব্যাগ কিনলেন।তিন টাকা দাম।তিনি একটা চকচকে পাঁচ টাকার নোট দিয়ে বললেন,যা দুটাকা তোর বকশিস।ছোট বাচাটি পাঁচ টাকার নোটটি নিশানের মত এক হাতে উচুঁ  করে ধরে ছুটে চলে গেল।

আমার মনে হল আজ রাতে কোথাও কোনো দুঃখ নাই।আজ কোনো স্বামী স্ত্রীর মধ্যে কোনো ঝগড়া হবে না।প্রেমিকারা আজ সুন্দর সুন্দর চিঠি লিখবে ভুলে যাওয়া প্রেমিকদের।একজন ভিখারিও হয়তো তার শখ মেটানোর জন্য দেড় টাকা খরচ করে একটা ৫৫৫ সিগারেট কিনে ফেলবে।উড়ির চরে আজ রাতে কোনো বৃষ্টি হবেনা।শিশুদের আনন্দ আমাদের সব দুঃখ ঢেকে ফেলবে।বাস্তব অবশ্যই অন্য রকম।অনেক বাড়িতে অন্য সব রাতের মত হাঁড়ি জ্বলবে না।উপোসী ছেলে মেয়েরা মুখ কালো করে ঘুরে বেড়াবে।যাদের বাড়িতে হাঁড়ি জ্বলবে,তাদের দুঃখ ও কি কম?হয়তো কারো একটা ছোট ছেলে ছিল,আজ স নেই।সে তার বাবা মার কাছে নতুন শার্ট প্যান্টেএর বায়না ধরে নি।ঘুমতে যাবার সময় মাকে জড়িয়ে ধরে বলেনি,আম্মু খুব ভোরে ডেকে দিও।আজ রাত ওই পরিবারটির বড় দুঃখের রাত।বিবা মা আজ রাতে তাদের আদরের খোকনের ছবি বের করবে।

শূন্য ঘরে চারিদিকে তাকিয়ে দেখবে।এখনো খোকনের ছোট জুত জোড়া সাজানো।তার ছোট শার্ট ছোট প্যান্ট আলনায় ঝুলছে।শুধু সে নেই।আগামীকাল ভোরে হৈহৈ করে সে ঘর থেকে বেরুবে না।ঈদের নামাজ পড়লাম নিউ মার্কেটের মসজিদে।ফিরবার পথে দেখি আজিমপুর কবরস্থানের গেট খুলে দেওয়া হয়েছে।হাজার হাজার মানুষ সেখানে।একজন বাহা তার তিনটি ছেলে মেয়্র নিয়ে কবরস্থানে এসেছে।ছেলেমেয়েদের গায়ে ঝলমলে পোশাক।তারা একটা কবরের পাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

কবরটির উপর কটি ময়লা কাগজ পড়ে ছিল।বড় মেয়েটি সে কাগজটি তুলে ফেলে গভীর মমতায় কবরের গায়ে হাত রাখল।বাবাকে দেখলাম রুমাল বের করে চোখ মুছছেন।এটি কার কবর?বাচ্ছাগুলির মার?আজকের এক আনন্দের দিনে এই মা ফিন্নি রান্না করে নি।গভীর মমতায় শিশুদের নতুন জামা পরিয়ে দেননি।নতুন শাড়ি পড়ে তিনি আজ  লজ্জিত ভঙ্গিতে স্বামীর পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলেননি -কি তোমাকে সালাম করতে হবে নাকি? আসলে আমাদের সবচেয়ে দুঃখের দিনগুলিই হচ্ছে উৎসবের দিন।

***এই লেখাটি ঈদের লেখা হিসেবে দৈনিক বাংলায় ছাপা হয়।তার কিছুদিন পর আমার ছোট ছেলেটি মারা যায়।আমি অবিকল এক রচনাটির মত আমার তিন বাচ্চা এবং স্ত্রীকে নিয়ে ঈদের দিন আমার বাচ্চার কবর দেখতে যাই।আমার বাচ্চারা ব্যকুল হয়ে কাঁদতে থাকে………।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *