এই আমি পর্ব – ৪ হুমায়ূন আহমেদ

এই আমি পর্ব – ৪

উমেশের সঙ্গে আমার পরিচয় নর্থ ডাকোটার ফার্গো সিটিতে।মাদ্রাজের ছেলে।বানরের মত চেহারা। স্বভাব চরিত্রও বানরের মত। সারাক্ষণ তিড়িং বিড়িং করছে।গলা খাকাড়ি দিয়ে থুথু ফেলছে।হাসেও বিচিত্র ভঙ্গিতে খিক খিক করে। থেমে থেমে শব্দ হয়।সমস্ত শরীর তখন বিশ্রী ভাবে দুলতে থাকে।সে এসেছে জৈব রসায়নে M.S. ডিগ্রী নিতে।আমি তখন পড়াশোনার পার্ট শেষ করে ফেলেছি।একটা ইলেকট্রিক টাইপ রাইটার কিনেছি।দিন রাত খট খট শব্দে থিসিস টাইপ করি।এক একটা  চ্যাপ্টার লেখা শেষ হয় আমি আমার প্রফেসরের কাছে নিয়ে যায়।তিনি পড়েন এবং হাসিমুখে বলেন,অতি চমৎকার হয়েছে।তুই এই চ্যাপ্টারটা আবার লিখ।

আমি হতাশ হয়ে বলি অতি চমৎকার হলে নতুন করে লেখার কি দরকার? প্রফেসরের মুখে হাসি আরো বিস্তৃত হয়ে।তিনি বলেন অতি চমৎকার তো শেষ কথা নয়।অতি চমৎকারের পরে আছে অতি অতি চমৎকার।আমি তার জন্য অপেক্ষা করছি।আমি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে আবার লিখতে বসি।এই সময়ে উমেশের আবির্ভাব মূর্তিয়মান উপদ্রবের মত।তার প্রধান কাজ হল’আরে ইয়ার’বলে আমার রুমে ঢুকে পড়া।এবং আমাকে বিরক্ত করা।আমেরিকায় সে পড়াশোনার জন্য আসেনি।তার মূল উদ্দেশ্য সিটিজেনশীপ।অন্য কোনভাবে আমেরিকা আসার ভিসা পাওয়া যাচ্ছিলনা বলেই সে স্টুডেন্ট ভিসায় এসেছে।এখন তার দরকার গ্রীন কার্ড বা সবুজপত্র।

ঐ বস্তু কি করে পাওয়া যায় সেই পরামর্শ করতেই সে আমার কাছে আসে।আমি প্রথম দিকেই তাকে বলে দিলাম,আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না।জানার আগ্রহ বোধ করিনি।আমি এসেছি পড়াশোনা করতে।ঐ পর্ব শেষ হয়েছে এখন দেশে চলে যাব।উমেশ চোখমুখ কুচকে ‘আরে বুরবাক’…….শব্দ দুটি দিয়ে একগাদা কথা বলল,যার কিছুই আমি বুঝলাম না।হিন্দি আমি বুঝতে পারি না।তাছাড়া উমেশ কথা বলে দ্রুত।তবে তার মূল বক্তব্য ধরতে অসুবিধা হল না।মূল বক্তব্য হচ্ছে -হুমায়ূন তুমি মহা বূরবাক।এমমন সোনার দেশ ছেড়ে কেউ যায়?

কাজের সময় কেউ বিরক্ত করলে আমার অসহ্য বোধ হয়।এই কথা আমি উমেশকে বুঝিয়ে বললাম।সে বিস্মিত হয়ে বলল,আমি তো বিরক্ত করছি না।চুপচাপ বসে আছি।তুমি তোমার কাজ কর।সে চুপচাপ মোটেও বসে থাকে না।সারাক্ষণ তিড়িং বিড়িং করে।এই বসে আছে,এই লাফ দিয়ে উঠেছে।তাছাড়া তার শিস দিয়ে গান গাওয়ার শখও আছে।সে শিস দিয়ে নানান ধরনের সুর তৈরির চেষ্টা করে।সেই সুরের তালে পা নিজেই মুগ্ধ হয়ে নাচায়।সব মানুষের জীবনেই কিছু উপগ্রহ জুটে যায়।উমেশ হল আমার উপগ্রহ।সে জৈব রসায়নের তিনটে কোর্স দিয়েছে।এর মধ্যে একটা ল্যাব কোর্স।কাজ করে আমার ঘরের ঠিক সামনের ঘরে।কাজ বলতে জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করা, ধোয়াধুয়ি করা,তারপর আমার সামনে এসে বসে থাকা।পা নাচানো এবং শিস দেওয়া।

আমি তাকে বললাম কোর্স যখন নিয়েছ মন দিয়ে কোর্সগুলো করা দরকার।তুমি তো সারাক্ষণ আমার সামনে বসে থাক।সে হাসি মুখে বলল,M.S ডিগ্রির আমার কোনো শখ নেই।আমার দরকার সিটিজেনশীপ।স্টুডেন্ট ভিসা যাতে বজায় থাকে এই জন্যেই কোর্স নিলাম। পড়াশোনা করে হবেটা কি ছাতা? আমি বললাম, অনেক কিছুই হবে।একটা আমেরিকান ডিগ্রি পেলে এ দেশে চাকরি পেতে তোমার সুবিধা হবে।চাকরি পেলে গ্রীনকার্ড পাবে।আরে ইয়ার,সাচ বাত।উমেশকে এই উপদেশ দেওয়ার মূল কারণ অন্য। আমি চাচ্ছিলাম তাকে পড়াশোনায় ব্যস্ত করে তুলতে।যাতে সে আমাকে মুক্তি দেয়। সিন্দাবাদের ভূতের মত সে কেন আমার উপর ভর করল কে জানে।এমন না যে,এই নর্থ ডাকোটায় আমি একমাত্র কালো চামড়া।কালো চামড়া প্রচুর আছে।

ভারতীয় ছাত্রই আছে দশ- বারো জন। অনেকে পরিবার নিয়ে আছে।নর্থ ডাকোটা ইউনিভার্সিটির ইন্ডিয়ান স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন বেশ বড় এসোসিয়েশন।তারা প্রতিমাসেই টিকিট কেটে হিন্দি ছবি দেখানোর ব্যবস্থা করে।দোল উৎসব হয়।এর বাড়ি,ওর বাড়ি পার্টি লেগে থাকে।উমেশ এদের সঙ্গে থাকতে পারে।তা কেন সে থাকছে না?কেন চেপে আছে আমার কাঁধে।যে কোনো কারণেই হোক তার ধারণা হয়েছে,এই বিদেশে আমিই হচ্ছি তার নিকটজন।কাজেই আমার সময় নষ্ট করার পূর্ণ অধিকার তার আছে।একদিন না পেরে তাকে কফিশপে নিয়ে কফি খাওয়ালাম এবং শীতল গলায় বললামে, উমেশ একটা কথা শুনলে তোমার হয়তো খারাপ লাগবে,তবুও কথাটা বলা দরকার।

বল।আমি তোমাকে খুব অপছন্দ করি।উমেশ বলল,আমার চেহারা খারাপ বলে? আমি কি বলব বুঝতে পারলাম না।উমেশ বলল,আমার চেহারা খুব খারাপ তা আমি জানি।স্কুলে আমার নাম ছিল ছোট হনুমান।কিন্তু চেহারা তো বন্ধুত্বের অন্তরায় হতে পারে না।ভুল বলেছি? না,ভুল বলনি।আমি তোমাকে খুব বিরক্ত করি তা আমি জানি।কি করব বল,আমার ভালো লাগে না।ল্যাবে কাজ করতে ভালো লাগে না। পড়াশোনা ভালো লাগে না।আমার সামনে বসে শিস দিয়ে গান গাইতে ভালো লাগে।হু।শোন উমেশ।আমি একা একা কাজ করতে পছন্দ করি।তুমি যে আমার সামনে বসে থাক,এতে আমার কাজ করতে অসুবিধা হয়।

ও আচ্ছা।আমাকে থিসিস লেখার কাজটা দ্রুত শেষ করতে হবে।আচ্ছা।তুমি যদি আর আমাকে বিরক্ত না কর তাহলে ভালো হয়।উমেশ কফির মগ হাত দিয়ে সরিয়ে উঠে চলে গেল।একবার ফিরেও তাকালো না। আমার খানিকটা খারাপ লাগলেও মুক্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। আসলেই মুক্তি পেয়েছি কি না সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত হতে পারছিলাম না।মুক্তি পেলাম।উমেশ আর আমার ঘরে আসে না।তার সঙ্গে দেখা হলে সে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে নেয়। আমার সামনের ল্যাবে সে রোজই আসে।একা একা কাজ করে। করিডোরে দাঁড়িয়ে উদাস মুখে সিগারেট খায়। আমার সাড়া পেলে চট করে ল্যাবে ঢুকে যায়। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় এতোটা কঠিন না হলেও পারতাম।

মাসখানেক পরের কথা।নিজের ঘরে বসে কাজ করছি।হটাৎ ফায়ার অ্যালার্ম বেজে উঠল।আমি বিচলিত হলাম না।এখানে কিছুদিন পর পর ফায়ার ড্রিল হয়।অ্যালার্ম বেজে উঠে।তখন ছুটে ঘর থেকে বের হয়ে মাঠে দাঁড়তে হয়।ফায়ার মার্শাল আসেন -পরীক্ষা করে দেখেষ জরুরি অবস্থায় সব ঠিকঠাক থাকবে কি না।আজও নিশ্চয় তেমন কিছু হচ্ছে। আমি বিরক্ত মুখে ঘর থেকে বের হলাম।অকারণে খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।প্রচন্ড শীতে মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো সুখকর অভিজ্ঞতা নয়।করিডোরে এসে আমাকে থমকে দাঁড়াতে হল।কারণ আজকেরটা ফায়ার ড্রিল নয়।পালে বাঘ পড়েছে।এবার সত্যি সত্যি আগুন লেগেছে। ধোঁয়ার কুন্ডলি বের হচ্ছে উমেশের ল্যাব থেকে। সাদা ও কালো ধোঁয়ার জটিল মিশ্রণে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে উমেশ।

আমি আতংকে জমে গেলাম।ল্যাবে আগুন মানেই ভয়াবহ ব্যাপার।বিভিন্ন দাহ্যবস্তুতে ল্যাব থাকে ভর্তি।বোতলে ভরা থাকে ফসফরাস।জারে ভরা তীব্র গাঢ়ত্বের এসিড।আছে ননা ধরনের অক্সিডাইজার এরা মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে দেবে।ল্যাব অগ্নিকাণ্ড সবসময়ই  ভয়াবহ হয়।প্রায়ই দেখা যায় এসব ক্ষেত্রে শুধু ল্যাবই না পুরো বিল্ডিং উড়ে যায়।আমি লক্ষ করলাম, আমেরিকান ছাত্র ছাত্রী, শিক্ষকরা সব ছুটে বের হয়ে যাচ্ছে।চারিদিকে তীব্র আতঙ্ক।বিল্ডিং এর বৈদ্যুতিক দরজা আপনা আপনিই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।আমার নিজেরও ইচ্ছা হল ছুটে বের হয়ে যায়।কিন্তু ল্যাবে উমেশ একা। সে গরুর মত বড় বড় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।আমি চিৎকার করে বললাম,দেখছ কি বের হয়ে এস।

উমেশ বিড়বিড় করে বলল,আমি নড়তে পাচ্ছি না।উমেশের কি  হয়েছে সঙ্গে সঙ্গে বুঝলাম।তীব্র আতঙ্কে বিগরাস মার্টির মত হয়। শরীরের সমস্ত মাংসপেশী শক্ত হয়ে যায়। মানুষের নড়াচড়ার ক্ষমতা থাকে না।আমি চিরকাল ভীত মানুষ।কিন্তু সেদিন অসীম সাহসের কিংবা অসীম বোকামির পরিচয় দিয়ে ল্যাবে ঢুকে পড়লাম।প্রথম চেষ্টা করলাম উমেশকে টেনে বের করতে।পারলাম না-তার শরীর পাথরের মত ভারী।উমেশ বলল তুমি থেক না।তুমি বের হও।এখনি এক্সপ্লোশন হবে।প্রাণী হিসেবে মানুষের অবস্থান আসলেই অনেক উপরে।আমি এই অসহায় ছেলেটাকে একা ফেলে রেখে বের হতে পারলাম না।আমার বুকের ভেতর থেকে কেউ একজন বলল,না তুমি পারবে না। অথচ বাসায় আমার স্ত্রী আছে।ছোট দুটি মেয়ে। নোভা ও শীলা।

ছোট মেয়েটি কেবল কথা শিখেছে।তাদের কথা মনে পড়ল না।প্রচন্ড বিপদে আল্লাহকে ডাকতে হয়।আমার কোনো সূরা মনে পড়েছে না।বিল্ডিং এর ইলেকট্রিক লাইন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।পুরো বিল্ডিং অন্ধকার।আগুনের হালকায় অস্পষ্টভাবে সবকিছু চোখে আসছে।আমি চলে গিয়েছি এক ধরনের ঘোরের মধ্যে।হুস করে বড় একটা আগুন ধরল।তার আলোয় চোখে পড়ল,দেওয়ালে বড় একটা কেমিক্যাল ফায়ার এক্সটিংগুইসার।সাধারণত ল্যাবের আগুনে এদের ব্যবহার করতে হয়।কিভাবে এদের ব্যবহার করতে হয় তাও জানি না।গায়ে বড় বড় করে নির্দেশনামা আছে।চেষ্টা করা যাক।আমি ছুটে গৃলাম ফায়ার এক্সটিংগুইসারের দিকে। নির্দেশ নম্বর এক- বড় লিভারটি টেনে নিচে নামাও।কোনটি বড় লিভার?

দুটিই তো এক রকম লাগচে। নির্দেশ নম্বর দুই-ছোট লিভারটির কাউন্টার ক্লক ঘুরাও।কাউন্টার ক্লক মানে কি? ঘড়ির কাটার উল্ট দিকে?ঘড়ির কাটা কোন দিকে ঘুরে? আশ্চর্যের ব্যাপার,ফায়ার এক্সটিংগুইসার চালু করতে পারলাম।এই অদ্ভুত যন্ত্রটি মুহূর্তে মধ্যে পুরো ল্যাব সূক্ষ্ম সাদা ফেনায় ঢেকে গেল।আমরা ঢেকে গেলাম ফেনার ভেতর।আগুন নিভে গেল। তারও মিনিট দশেক পর লোকজন আমাদের দুজনকে উদ্ধার করল।উমেশকে নিয়ে গেল হাসপাতালে।তার কথাও বন্ধ হয়ে গেছে।কথা বলতে পারছে না।জিহ্বাও শক্ত হয়ে গেছে।উমেশকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছি।আমি ভেবেছিলাম,সে আমাকে দেখে আনন্দিত হবে।তা হল না।মুখ কালো করে বলল,তুমি কেন এসেছ? তুমি তো আমাকে দেখতে পার না।আমি শুধু তোমাকে বিরক্ত করি।তুমি চলে যাও।

আমি হাসলাম।উমেশ হাসল না।চোখ বন্ধ করে পাশ ফিরল।সে আসলেই আমার সঙ্গে কথা বলতে চায় না।সে যে আমার ব্যবহারে কি পরিমাণে আঘাত পেয়েছিল তা বুঝলাম যখন দেখলাম -তাকে আগুন থেকে উদ্ধারের মত ঘটনাতেও সে অভিভূত হয় নি।আমাকে  দেখলে আগের মতই হনহন করে হেঁটে চলে যায়।সে নর্থ ডাকোটা থেকে চলে গেল মুরহেড স্টেটে।যাবার আগের দিন আমাকে একটা খামবদ্ধ চিঠি দেওয়া হল। চিঠি তার লেখা না।তার বাবার লেখা। ভদ্রলোক লিখেছেন –

জনাব

আপনি আমার মা-হারা পুত্রের জীবন রক্ষা কর্রছেন।এর প্রতিদান আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব না।ঈশ্বর আপনাকে তার প্রতিদান দিবেন। ঈশ্বর কোনো সৎকর্ম অবহেলা করেন না। উমেশ লিখেছে,আপনি তার জন্য আপনার জীবন বিপন্ন করেছেন।আপনার থিসিসের কাগজপত্র আগুনে নষ্ট হয়েছে।আপনাকে আবার নতুন করে লিখতে হয়েছে।আমি নিজেই একজন পাপী মানুষ।পাপী মানুষের প্রার্থনার ফল হয় না।তবুও আমি প্রতিদিন ঈশ্বরের কাছে আপনার জন্য প্রার্থনা করি।যতদিন বাঁচব করব।আপনি আমার ভক্তিপূর্ণ প্রণাম গ্রহণ করুণ।

আমেরিকার পর্ব শেষ করে দেশে ফিরছি।হেক্টর এয়ারপোর্টে অনেকেই আমাকে বিদায় দিতে এসেছে।হটাৎ দেখি দূরে উমেশ দাঁড়িয়ে।আমাকে দেখেই সে চোখ নামিয়ে নিল।দ্রুত চলে গেল ভেল্ডিং মেশিনের আড়ালে।আমি এগিয়ে গেলাম।উমেশ বলল,আমি তো তোমাকে বিদায় দিতে আসিনি।আমি যাব লস এঞ্জেলস।তার টিকিট কাটতে এসেছি।ঠিক আছে।যাবার আগে তোমার সঙ্গে দেখা হল।খুব ভালো লাগছে।একদিন তোমার মনে কষ্ট দিয়েছি।তার জন্য আমি ক্ষমা চাচ্ছি।প্লেনে উঠার আগে তোমার হাসিমুখ দেখে যেতে চাই।উমেশ বলল,আমি তোমাকে মিথ্যা কথা বলেছি।আমি আসলে তোমাকে বিদায় দিতে এসেছি।

উমেশ আমাকে জড়িয়ে ধরল।সে ভেউ ভেউ করে কাঁদছে।প্লেনে ওঠার আগে সিকিউরিটি চেকিং এ যাচ্ছি।বন্ধু বান্ধবীরা হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছে।রুমাল উড়াচ্ছে।শুধু উমেশ দুহাতে তার মুখ ঢেকে আছে।সে তার কান্নায় বিকৃতি মুখ কেউকে দেখাতে চাচ্ছে না।এরশাদ সাহেবের সময়কার কথা।সরকারী পর্যায়ে শিলাইদহে রবীন্দ্রজয়ন্তী হবে।আমার কাছে জানতে চাওয়া হল আমি সেই উৎসবে যোগ দিব কি-না।আমি বললাম, রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে যে কোনো নিমন্ত্রণে আমি আছি। এরশাদ সাহেবের উদ্যোগে অনুষ্ঠান হচ্ছে।হোক না,আমি কোনো সমস্যা দেখছি না। রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসার অধিকার সবারই আছে।

যথাসময়ে শিলাইদহে উপস্থিত হলাম। কুঠিবাড়িতে পা দিয়ে গায়ে রোমাঞ্চ হল।মনে হল পবিত্র তীর্থস্থানে এসেছি।এক ধরনের অস্বস্তি হতে লাগল।মনে হল -এই যে নিজের মনে ঘুরে বেড়াচ্ছি,তা বোধহয় ঠিক হচ্ছে না।চারিদিকে রবীন্দ্রনাথের পায়ের ধূলা ছড়িয়ে আছে।কবির কত স্মৃতি,কত বেদনা মিশে আছে প্রতিটি ধূলিকণায়।সেই ধূলার উপর দিয়ে আমি হেঁটে যাব,তা কি হয়?এত স্পর্ধা কি আমার মত অভাজনের থাকা উচিত?

নিজের মনে ঘুরে বেড়াতে এত ভালো লাগছে।কুঠিবাড়ির একটা ঘরে দেখলাম কবির লেখার চেয়ার টেবিল।এই চেয়ারে বসেই কবি কত-না বিখ্যাত গল্প লিখেছেন। কুঠিবাড়ির বারান্দায় চোখে পড়ল কবির প্রিয় প্রমত্তা পদ্মা।১২৯৮ সনের এক ফাল্গুনে এই পদ্মার দুলনি খেতে খেতে  বজরায় অধশোয়া হয়ে কবি লিখেছেন,

               শ্রবণ গগন ঘিরে

               ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে

               শূন্য নদীর তীরে

               রহিনু পড়ি

               যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।

একদিকে উৎসব হচ্ছে,কবিতা আলোচনা,গান, অন্যদিকে আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি নিজের মনে। সন্ধ্যাবেলা কুঠিবাড়িতে গানের অনুষ্ঠানে আমি নিমন্ত্রিত অতিথি।না থাকলে ভালো দেখায় না বলে প্যান্ডেলের নিচেয় গিয়ে বসেছি।শুরু হল বৃষ্টি,ভয়াবহ বৃষ্টি।সেই সঙ্গে দমকা বাতাস।বাতাসে সরকারি প্যান্ডেলের অর্ধেক উড়ে গেল। আমি রওনা হলাম পদ্মার দিকে।এমন ঝমঝমে বৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথ ও নিশ্চয়ই ভিজতেন।আমি যদি না ভিজি তাহলে কবির প্রতি অসম্মান করা হবে। বৃষ্টিতে ভেজা আমার জন্য নতুন কিছু না। কিন্তু সে দিনকার বৃষ্টি বরফের মত ঠান্ডা।আর হাওয়া?মনে হচ্ছে সাইবেরিয়া থেকে উড়ে আসছে।আমি ঠক ঠক করে কাঁপছি।নব ধারা জনে স্নানের আনন্দ ধুয়ে মুছে গেছে।রেস্ট হাউজে ফিরে শুকনো কাপড় পরতে পরলেই বাঁচি।

কাঁপতে কাঁপতে ফিরছি।পদ্মা থেকে কুঠিকাড়ি থেকে পদ্মা অনেকটা দূরে। কাঁচা রাস্তা। বৃষ্টির পানিতে সেই রাস্তা কাঁদা হয়ে গেছে।দ্রুত হাঁটা যাচ্ছে না।জায়গাটাও অন্ধকার।আধাআধি পথ এসে থমকে দাঁড়ালাম।কে যেন রাস্তার পাশে গাছের নিচে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।চারিদিক আলো করে বিদ্যুৎ চমকালো।আর তখনি আমার সারা শরীর দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল।আমি স্পষ্ট দেখলাম যুবক বয়সের রবীন্দ্রনাথ দাঁড়িয়ে আছেন।এটা কি কোনো মায়া?কোনো ভ্রান্তি?বিচিত্র কোনো হেলুসিনেশন?আমার চিন্তা চেতনা জুড়ে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বলেই তাকে দেখছি?

আমি চিৎকার করতে যাচ্ছিলাম।তার আগেই ছায়ামূর্তি বলল,কে হুমায়ূন ভাই না? নিজকে চট করে সামলে নিলাম। রবীন্দ্রনাথের প্রেতাত্মা নিশ্চয় আমাকে হুমায়ূন ভাই বলবেনা।আমি ভৌতিক কিছু দেখছি না।এমন একজনকে দেখছি যে আমাকে চেনে,এবং যাকে অন্ধকারে রবীন্দ্রনাথের মত দেখায়।ছায়ামূর্তি বলল, হুমায়ূন ভাই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে কোথায় যাচ্ছেন? আমি বললাম, কুঠিবাড়ির দিকে যাচ্ছি।আমি কি আপনাকে চিনি? জ্বি না আপনি আমাকে চেনেন না। হুমায়ূন ভাই আমি আপনার অনেক ছোট। আমাকে তুমি করে বলবেন।

তোমার নাম কি? রবি।ও আচ্ছা রবি।আমি আবার বিভ্রান্তের মধ্যে পড়ে গেলাম।নাম রবি মানে? হচ্ছেটা কি? রবি বলল,চলুন আমি আপনার সঙ্গে যাই।চল।ভিজতে ভিজতে আমরা কুঠিবাড়িতে উপস্থিত হলাম। ঝড়ের প্রথম ঝাপটিয় ইলেকট্রিসিটি চলে গিয়েছিল।এখন আবার এসেছে। চারিদিকে আলো ঝলমল করছে।আলোতে আমি আমার সঙ্গীকে দেখলাম।আবারও চমকে গেলাম।অবিকল যুবক বয়সের রবীন্দ্রনাথ।তোমাকে দেখে যে আমি বারবার চমকাচ্ছি তা কি তুমি বুঝতে পারছ? পারছি। আপনার মত অনেকেই চমকায়।তবে আপনি অনেক বেশি চমকাচ্ছেন।তোমার নাম নিশ্চয় রবি না?

জ্বি না যারা যারা আমাকে দেখে চমকায় তাদের আমি এই নাম বলি।এসো আমারা কোথাও বসে গল্প করি।আপনি ভেজা কাপড় বদলাবেন না?আপনার তো ঠান্ডা লেগে যাবে।লাগুক ঠান্ডা।আমরা একটা বাঁধানো আমগাছের নিচে গিয়ে বসলাম।রবি উঠে গিয়ে কোথেকে একটা চা ওয়ালাকে ধরে নিয়ে এল। গাছের পাতার ফাঁকা দিয়ে বৃষ্টি পড়ছে।আমি আধভেজা সিগারেট ধরিয়ে টানছি। চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছি।সেই চাও বৃষ্টির পানির মত ঠান্ডা।খুবই লৌকিক পরিবেশ।তারপরেও আমি লক্ষ্যে করলাম, আমার বিস্ময়বোধ দূর হচ্ছে না।রবি হাসিমুখে বলল, হুমায়ূন ভাই।আমি শুনেছিলাম আপনি খুব সিরিয়াস ধরনের মানুষ।আপনি যে বাচ্চাদের মত বৃষ্টিতে ভিজে আনন্দ করে তা ভাবিনি। আপনাকে দেখে আমার খুব মজা লাগছে।আমি বললাম,তোমাকে দেখে শুরুতে আমার লেগেছিল ভয়।এখন লাগছে বিস্ময়।আপনি এতো বিস্ময় হচ্ছেন কেন? মানুষের চেহারার সঙ্গে মানুষের মিল থাকে না?

থাকে।এতো থাকে না।রবির সাথে আমার আরো কিছুক্ষণ গল্প করার ইচ্ছা ছিল।সম্ভব হল না। সরকারি বাস কুষ্টিয়ার দিকে রওনা হচ্ছে।বাস মিস করলে সমস্যা।রবি আমার সঙ্গে এল না।সে আরো কিছুক্ষণ থাকবে।পরে রিকশায় করে যাবে।তবে সে যে কদিন অনুষ্ঠান চলবে,রোজই আসবে।কাজেই তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ রয়ে গেল।রাতে রেস্ট হাউসে ফিরে আমার কেন যেন মনে হল পুরো ব্যাপারটাই মায়া। ছেলেটির সঙ্গে আর কখনোই আমার দেখা হবে না।রাতে ভালো ঘুমও হল না।আশ্চর্যের ব্যাপার। পরেরদিন সত্যি সত্যি ছেলেটির দেখা পেলাম না। অনেক খুঁজলাম। কয়েকজনকে বললাম দেখতে অবিকল রবীন্দ্রনাথের মত এমন একজনকে দেখেছেন?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *