এই আমি পর্ব – ৫ হুমায়ূন আহমেদ

এই আমি পর্ব – ৫

তারা সবাই আমার দিকে এমন ভাবে তাকালো যেন আমি কিছুক্ষণ আগেই গাঁজা খেয়ে এসেছি।ঐ জিনিস তখন কুঠিবাড়ির আশে পাশে খাওয়ি হচ্ছে।লালন শাহ-র কিছু অনুসারী এসেছেন। তারা গাঁজার উপরই আছেন।উৎকট গন্ধে তাদের কাছে যাওয়া যায় না।তাদের একজন আমাকে হাত ইশারা করে কাছে ডেকে বলেছেন,আচ্ছা স্যার, রবিঠাকুর যে লালন শাহ-র গানের খাতা চুরি করে নবেল পেল এ বিষয়ে ভদ্রসমাজে কিছু আলোচনা করবেন।এটা অধিনের নিবেদন।তৃতীয় দিনেও যখন ছেলেটির দেখা পেলাম না,তখন নিশ্চিত হলাম,ঝড় বৃষ্টির রাতে যা দেখেছি তার সবটা ভ্রান্তি। মধুর ভ্রান্তি।

নানার ধরনের যুক্তিও আমার মনে আসতে লাগল।যেমন আমি যখন জিঙ্গাসা করলাম,তুমি কি কর? সে তখন জবাব দেই নি।আমার সঙ্গে সরকারি বাসে আসতেও রাজি হয় নি।নিজের আসল নামও বলেনি।অনুষ্ঠানের শেষ দিনে দেখি সে প্যান্ডেলের এক কোণায় চুপচাপ বসে আছে।আমি এগিয়ে গেলাম।এই রবি এই।রবি হাসিমুখে তাকালো,এবং সঙ্গে সঙ্গে উঠে এল।আমি বললাম,এ কদিন আসনি কেন? শরীরটা খারাপ করেছিল।ঐ দিন বৃষ্টিতে ভিজে ঠান্ডা লেগে গেল।আজ শরীর কেমন?

আজ ভালো।এই কদিন আমি তোমাকে খুব খুঁজছি।আমি অনুমান করেছি।আচ্ছা হুমায়ূন ভাই দিনের আলোতেও কি আমাকে রবীন্দ্রনাথের মত লাগে? হ্যাঁ লাগে,বরং অনেক বেশি লাগে।সে ছোট্ট করে নিশ্বাস ফেলে বলল,দেখুন মানুষের ভাগ্য।আমি শুধু দেখতে রবীন্দ্রনাথের মত এই কারণে আপনি কত আগ্রহ করে আমার সঙ্গে কথা বলছেন।তার জন্য কি তোমার খারাপ লাগছে? না খারাপ লাগছে না।ভালো লাগছে। খুব ভালো লাগছে।নিজেকে মিথ্যামিথ্যি রবীন্দ্রনাথ ভাবতেও ভালো লাগে।তুমি টিভিতে কখনো নাটক করেছ? কেন বলুন তো? তোমাকে আমি টিভি নাটকে ব্যবহার করতে চাই।আমি কোনো দিন নাটক করিনি কিন্তু আপনি বললে খুব আগ্রহ নিয়ে করব।কি নাটক?

এই ধর, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নাটক।যৌবনের রবীন্দ্রনাথ। কুঠিবাড়িতে থাকেন। পদ্মার তীরে হাঁটেন।গান লেখেন,গান করেন।এইসব নিয়ে ডকুমেন্টারি নাটক।সত্যি নিখবেন? হ্যাঁ লিখব।একটা কাগজে তোমার ঠিকানা লিখে দাও।ঠিকানা আপনি হারিয়ে ফেলবেন।আমি বরং আপনাকে খুঁজে বের করব।ছুটির সময় মন সাধারণ তরল ও দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে।ছুটির সময়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পারে আর মনে থাকে না।আমার বেলায় সেরকম হল না।আমি ঢাকার ফিরেই টিভির নওয়াজিশ আলী খান সাহেবের সঙ্গে দেখা করলাম। আমার পরিকল্পনার কথা বললাম।তিনি এক কথায় বাতিল করে দিলেন।তিনি বললেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সরাসরি দেখতে গেলে অনেক সমস্যা হবে। সমালোচনা হবে। রবীন্দ্র ভক্তরা রেগে যাবেন।বাদ দিন।আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল।

মাস তিনেক পর ছেলেটার সঙ্গে আবার দেখা হল টিভি ভবনে।সে আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল-নাটকটা লিখেছেন কি না।আমি সত্যি কথাটা তাকে বলতে পারলাম না।আমি বললাম লিখব লিখব।তুমি তৈরী থেকো।আমি তৈরী আছি।আমি খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি।চেহারাটা ঠিক রাখ। চেহারাটা যেন নষ্ট না হয়।আমি টিভির আরো লোকজনের সাথে কথা বললাম।কোনো লাভ হল না।ছেলেটার সঙ্গে মাঝে মাঝে কথা হয়।আমি বলি হবে হবে, ধর্য্য ধর।এই মিথ্যা আশ্বাস যতবার দেই ততবারই খারাপ হয়ে যায়।মনে মনে বলি,কেন বারবার এর সঙ্গে দেখা হয়?আমি চাইনা দেখা হোক। তারপরে ও দেখা হয়।একদিন সে বলল, হুমায়ূন ভাই আপনি কি একটু তাড়াতাড়ি নাটকটা লিখতে পারবেন? কেন বল তো?

এমনি বললাম।হবে হবে তাড়াতাড়িই হবে।তারপর অনেক দিন ছেলেটির সঙ্গে দেখা নেই।নাটকের ব্যাপারটা ও প্রায় ভুলে গেছি। ব্যস্ত হয়ে পড়েছি অন্য কাজে।তখন ১৪০০ সিল নিয়ে খুব হৈচৈ শুরু হল।আমার মনে হল এ-ই হচ্ছে সুযোগ। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নিটকটি লিখে ফেলা যাক।নাটকের নাম হবে ১৪০০সাল। প্রথম দৃশ্য কবি একা একা পদ্মার পাড়ে হাঁটছেন,আবহ সঙ্গীত হিসেবে কবির বিখ্যাত কবিতাটি(আজি হতে শত বর্ষ পরে…..)পাঠ করা হবে।কবির মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাবে একঝাঁক পাখি।কবি আগ্রহ নিয়ে তাকাবেন পাখির দিকে,তারপর তাকাবেন আকাশের দিকে।

দ্রুত লিখে ফেললাম।আমার ধারণা খুব ভালো দাঁড়ালো।নিটকটা পড়ে শুনালে টিভির যে কোনো  প্রয়োজকই আগ্রহী হবে বলে মনে হল।একদিন ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করেছি টিভির বরকতউল্লাহ সাহেবের সাথে।পাশে আছেন জিয়া আনসারী সাহেব।তিনি কথার মাঝখানে আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, রবিঠাকুরের ভূমিকায় আপনি যে ছেলেটিকে নেবার কথা ভাবছেন তাকে আমি চিনতে পেরেছি।গুড চয়েজ।আমি বললাম, ছেলেটার চেহারা অবিকল রবীঠাকুরের মত না? হ্যাঁ। তবে ছেলেটাকে আপনি অভিনয়ের জন্য পাবেন না।কেন?

ওর লিউকোমিয়া ছিল।অনেক দিন থেকে ভুগছিল। বছরখানেক আগে মারা গেছে।আমি অনেকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলাম না। গভীর আনন্দ ও আগ্রহ নিয়ে ছেলেটা অপেক্ষা করছিল।তার সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল।সে কাউকে তা জানতে দেয় নি।বাসায় ফিরে নাটকের পান্ডুলিপি নষ্ট করে ফেললাম।এই নাটকটা আমি রবীন্দ্রনাথের জন্য লিখিনি।। ছেলেটার জন্য লিখেছিলাম।সে নেই, নাটকও নেই।

*ছেলেটির নাম নিয়ে আমি সমস্যায় পড়েছি।নাম মনে করতে পারছি না। ভোরের কাগজের সাংবাদিক জনাব সাজ্জাদ শরীফের ধারণা তার নাম হাফিজুর রশিদ।ডাকনাম রাজু।

তাঁর আসল নাম আমার মনে নেই।আমরা ডাকতাম নারকেল মামা। কারণ নারিকেল গাছে উঠে নারকেল পেড়ে আনার ব্যাপারে তাঁর অসাধারন দক্ষতা ছিল।পায়ে দড়ি টরি কিছু বাঁধতে হত না। নিমিষের মধ্যে তিনি উঠে যেতেন। নারকেল ছিড়তেন শুধু হাতে। তাঁর গাছে ওঠে,গাছ থেকে নামা,পুরো ব্যাপারটাই ছিল দেখার মত।তাঁর নৈপুণ্য যে কোনো পর্যায়ের তা দেখবার জন্যেই একদিন আমাকে বললেন,এই পিঠে ওঠ। শক্ত কইরা গলা চাইপা ধর।আমি তাই করলাম।তিনি আমাকে নিয়ে তরতর করে নারকেল গাছের মগডালে উঠে দুই হাত ছেড়ে নানান কায়দা দেখতে লাগলেন।ভয়ে আমার রক্ত জমে গেল।খবর পেয়ে আমার নানাজান ছুটে এলেন।হুঃকার দিয়ে বললেন, হারামজাদা নেমে আয়।

এই হচ্ছে আমাদের নারকেল মামা। আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই।নানার বাড়ির সব ছেলেরা যেমন মামা,ইনিও মামা।আমার নানার বাড়ি কামলা খাটেন। নির্বোধ প্রকৃতির মানুষ।খুব গরম পড়লে মাথা খানিকটা এলোমেলো হয়ে যায়। শুধু গরমের সময় অন্যরা তা বুঝতে পারে।নারকেল মামার মাথা এলোমেলো হবার প্রধান লক্ষণ হল-হটাৎ তাকে দেখা যাবে গোয়ালঘর থেকে দড়ি বের করে। হনহন করে যাচ্ছেন।পথে কারো সঙ্গে দেখা হল,সে জিঙ্গাসা করল,কই যাস?

নারিকেল মামা নির্বিকার ভঙ্গিতে বলবে, ফাঁস নিব।উচাঁ লম্বা একটা গাছ দেইখ্যা ঝুইল্যা পড়ব।প্রশ্নকর্তা তাতে বিশেষ বিচলিত হয় না।বিচলিত হবার তেমন কারণ নেই।এই দৃশ্য তার কাছে নতুন নয়।আগেও দেখেছে।একবার ন য়, অনেকবার দেখেছে।প্রশ্নকর্তা শুধু বলে আচ্ছা যা।একবার জিঙ্গেস করে না,ফাঁস নেবার ইচ্ছা কেন হল।তার আত্মহননের ইচ্ছা তূচ্ছ সব কারণে হয়।তাকে খেতে দেওয়া হয়েছে।ভাত তরকারি সব দেওয়া হয়েছে কিন্তু লবণ দিতে ভুলে গেছে।তিনি লবণ চেয়েছেন।যে ভাত দিচ্ছেন সে হয়তো শুনেনি।তিনি শান্ত মুখে খাওয়া শেষ করলেন।পানি খেলেন।পান মুখে দিয়ে গোয়ালঘরে ঢুকে গেলেন দড়ির খোঁজে।এই হল ব্যাপার।

সবই আমার শোনা কথা।আমরা বছরে একবার ছুটির সময় নানার বাড়ি বেড়াতে যেতাম।থাকতাম দশ পনেরো দিন।এই সময়ের মধ্যে নারিকেল মামার দড়ি নিয়ে ছুটাছুটির দৃশ্য দেখিনি।তাকে আমার মনে হয়েছে অতি ভালো একজন মানুষ।আমাদের মনোরঞ্জনের চেষ্টায় কোনো সীমা ছিল না।একটা গল্পই তিনি সম্ভাবত জানতেন।সেই গল্পই আমাদের শোনাবার জন্য তার ব্যস্ততার সীমা ছিল না।কাঁইক্যা মাছের গল্প।

এক দিঘিতে এক কাঁইক্যা মাছ বাস করতো।সেই দিঘির পাড়ে ছিল একটা চাইলতা গাছ। একদিন কাঁইক্যা মাছ চাইলতা গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছে।হটাৎ এক চাইলতা তার গায়ের পড়ল।সে দারুণ বিরক্ত হয়ে বলল, চাইলতারে চাইলতা তুই যে আমায় মারলি?

উত্তরে চাইলতা বলল, কাঁইক্যারে কাঁইক্যা তুই যে আমার কাছে আইলি।এই হল গল্প।কেন-ই বা এটা একটা গল্প,এর মানে কি আমি কিছুই জানি না।কিন্তু এই গল্প বলতে গিয়ে হাসতে হাসতে নারিকেল মামার চোখে পানি এসে যেত।আমি তার কাছে এই গল্প বারবার শুনতে চাইতাম তার কান্ড কারখানা দেখার জন্য।

সেবার রোজার ছুটিতে নানার বাড়ি গিয়েছি।তখন রোজা হত গরমের সময়।প্রচন্ড গরম।পুকুরে দাপাদাপি করে অনেকক্ষণ কাটায়।আমরা কেউই সাঁতার জানি না।নারিকেল মামাকে পুকুর পাড়ে বসিয়ে রাখা হত যাতে তিনি আমাদের দিকে লক্ষ্য রাখেন।তিনি চোখ কান খোলা রেখে মূর্তির মত বসে থাকেন।একদিন এইভাবে বসে আসেন।আমরা মহা আনন্দে পানিতে ঝাপাচ্ছি,হটাৎ শুনি বড়দের কোলাহল – ফাঁস নিছে। ফাঁস নিছে।পানি ছেড়ে উঠে এলাম।নারিকেল মামা নাকি ফাঁস নিয়েছে।সে এক অদ্ভুত দৃশ্য।নিনার বাড়ির পেছনের জঙ্গলে জামগাছের ডালে দঁড়ি হাতে নারিকেল মামা বসে আছেন।দড়ির একপ্রান্ত জামগাছের ডালের সঙ্গে বাঁধা।অন্য প্রান্ত তিনি তার গলায় বেঁধেছেন।তিনি ঘোড়ায় চড়ার মত ডালের দুইদিকে পা দিয়ে বেশ আয়েশ করে বসে আছেন।

আমরা ছোটরা খুব মজা পাচ্ছি। কিছুক্ষণের মধ্যে একটা লোক দঁড়িতে ঝুলে মরবে সেই দৃশ্য দেখতে পাব।এটা সে সময় আমাদের মধ্যে বেশ উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল।বড়রা অবশ্য ব্যাপারটার মোটেও পাত্তা দিল না।আমার নানাজান বললেন,আজ গরমটা অতিরিক্ত পড়েছে।মাথায় রক্ত উঠে গেছে।তিনি নারিকেল মামার দিকে তাকিয়ে বলল,নাম হারামজাদা।নারিকেল মামা তার দিকে তাকিয়ে বলল,জ্বে না মামুজি।ফাঁস নিব।তোরে মাইরা আজ হাড্ডি গুড়া করব।খেলা পাইছোস?দুদিন পরে পরে ফাঁস নিয়া।ফাঁস এতো সস্তা।রোজা রাখছস? রাখছি।রোজা রাইখা রে ফাঁস নেওয়া যায় না, এটা জানস?

জ্বে না।নাইম্যা আয়।ফাঁস নিতে চাস ইফতারের পরে নিবি।অসুবিধা কি? দঁড়ি তোর সাথে আছে।জাম গাছও আছে।নাম কইলাম। রোজা র‍াইখ্যা ফাঁস নিতে চায়।কত্ত বড় সাহস।নাম।নারিকেল মামা সুড়সুড় করে নেমে এলেন।মোটেও দেরি করলেন না।আমাদের মন কি যে খারাপ হল।মজির একটা দৃশ্য নানিজানের জন্য দেখা হল না। নানাজিনের উপর রাগে গা জ্বলথে লাগল।মনে ক্ষীণ আশা, ইফতারের পর যদি নারিকেল মামা আবার ফাঁস নিতে যায়।ইফতারের পর কিছু হল না। খাওয়া দাওয়ার পর নারিকেল মামা হৃষ্টচিত্তে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।

কোথেকে যেন একটা লাটিম জোগাড় করলেন।শহর থেকে আসা বাচ্চাদের খুশি করার জন্য উঠনে লাটিম খেলার ব্যবস্থা করা হল। আমি এক ফাঁকে বলেই ফেললাম,মামা ফাঁস নেবেন না? তিনি উদাস গলায় বললেন,যাউক রমজান মাসটা যাউক।এই মাসে ফাঁস নেয়া ঠিক না।রমজানের পর তো আমরা থিকবোনা চলে যাব।আমরা দেখতে পারবোনা।নারিকেল মামা উদাস গলায় বললেন, এইসব দেখা ভালো না গো ভাইগ্ন্যা ব্যাটা। জিহ্বা বাহির হইয়া যায়,চোউখ বাহির হইয়া যায় বড়ই ভয়ংকর।আপনি দেখেছেন? ভাইগ্ন্যা ব্যাটা কি কয়?আমি দেখবো নাএকটা ফাঁসের মরা নিজের হাতে কাইট্যা নামাইছি।নামাইয়া শইল্যে হাত দিয়ে দেখি তখনও শইল গরম।তখনও জান ভেতরে বইছে। পুরাপুরি কবজ হয় নাই।হয় নি কেন?

মেয়েছেলে ছিল।ঠিকমত ফাঁস নিতে পারে নাই। শাড়ি পেঁচাইয়্যা কি ফাঁস হয়?নিয়ম আছে না? সবকিছুর নিয়ম আছে।লম্বা একটা দঁড়ি নিবা।যত লম্বা হয় তত ভালো। দড়ির এক মাথা বানবা গাছের ডালে আরেক মাথা নিজের গলায়। ফাঁস গাট্টু বইলা একটা গিটু আছে।এইটা দিবি।তারপর আল্লাহ কাছে তওবা কইরা,সব গুণার জন্য মাপ নিবা।তারপর চোখ বন্ধ কইরা দিবা লাফ।দড়ি যদি বেশি লম্বা হয় তাহলে তো লাফ দিলে মাটিতে এসে পড়বেন।

মাপমত দড়ি নিবা।তোমার পা যদি মাটি থেকে এই ইঞ্চি উপলেও থাকে তাহলে হবে।দড়ি লম্বা হলে নানান দিক দিয়ে লাভ।দশের উপকার।দড়ি লম্বা।লে দশের উপকার কেন তা ও নারিকেল মামা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করলেন।ফাঁসের দড়ি নানা কাজে লাগে বুঝলা ভাইগ্ন্যা ব্যাটা।এই দড়ি সোনার দড়ির চেয়েও দামি।এক টুকরা কাইট্যা যদি কোমরে বাইন্দা থয় তা হইলে রাত বিরাতে আরাম হয়।ঘরের দরজার সামনে এক টুকরা বাইন্ধ্যা থুইলে ঘরে চোর ডাকাত ঢোকে না।এই দড়ি সন্তান পেসাবের সময় খুব কাজে লাগে।ধর সন্তানের পেসাব হইতেছে না – দড়ি অইন্যা পেটে ছোঁয়াইবা, সাথে সাথে সন্তান খালাস।সত্যি?

হ্যাঁ সত্যি। ফাসির দড়ি মহা মূল্যবান।অনেক ছোট ছোট পুলাপান আছে বিছানায় পেসাব কইরা দেয়।ফাঁসের দড়ি এক টুকরা ঘুনসির সাথে বাইন্ধ্যা দিলে আর বিছানায় পেসাব করবে না।এই জন্যই বলতেছি যত বড় হয়  ফাঁসের দড়ি ততই ভালো।দশজনের উপকার। ফাঁস নিলে পাপ হয়।আবার ফাঁসের দড়ি দশজনের কাজে লাগে বইল্যা পাপ কাঁটা যায়।দড়ি যত লম্বা হইব পাপ তত বেশি কাঁটা যাইবো।এইটা হল ঘটনা। মৃত্যুর পর পরই বেহেশত দাখিল।নারিকেল মামার মৃত্যু হয় পরিণত বয়সে। ফাঁস নিয়ে না -বিছানায় শুয়ে।শেষ জীবনে পক্ষাঘাত হয়েছিল।নড়তে চড়তে পারতেন না।চামচ দিয়ে খাইয়ে দেওয়া হত।মৃত্যুর আগে বিষাদের সঙ্গে বলেছিলেন, আল্লাহপাক আমার কোনো আশা পূরণ করে নাই। ঘর দেয় নাই, সংসার দেয় নাই। কিছুই দেয় নাই। ফাঁস নিয়ে মরণের ইচ্ছা ছিল এটাও হইল না।বড়ই আফসোস।

একটা নির্দিষ্ট বয়সের বাবা মা মনে করঙতে শুরু করেন তাদের ছেলেমেয়েরা বোধহয় তাদের ভালোবাসে না। বোধহয় তারা এমন ব্যস্ত হয়ে পড়েছে নিজেদের সংসার নিয়ে নিজেদের ছেলেমেয়ে নিয়ে।তবে এই ব্যাপারে তারা পুরোপুরি নিশ্চিত ও হতে পারেন না।ক এক ধরনের সন্দেহ থাকে -হয়তো এখনো ভালোবাসে।হয়তো বাবা মায়ের প্রতি এখনো ভালোবাসা নিঃশেষ হয়নি।এই সংশয় জড়ানো দোদুল্যমান সময়ে বাবা মারা নানান ধরনের ছোটখাট পরিক্ষা করতে থাকেন। ছেলেমেয়েদের ভালোবাসা এখনো আছে কি না তা নিয়ে পরীক্ষা। পরীক্ষার ফলাফল নিয়েও তারা সংশয়ে ভুগেন।কোনো ফলাফলই তাদের একশো ভাগ নিশ্চিত করতে পারে না।

আমার মা বর্তমানে এ জাতীয় মানসিক অস্থিরতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন।তিনি তার ছ’টি ছেলেমেয়েকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছেন। তাদের আচার আচরণ থেকে ধরার চেষ্টা করছেন – ছেলেমেয়েদের মধ্যে তার প্রতি ভালোবাসা কতটুকু অবশিষ্ট আছে।ভালোবাসা মাপার মতো কোন যন্ত্র আমাদের হাতে এখনো আসেনি। সমস্যাটা এখানেই। ভালোবাসা ধরতে হয় আচার আচরণে – হাফ ভাবে।একজনের আচার আচরণের সঙ্গে অন্যর আচার আচরণের কিছুমাত্রা মিল নেই বলে ভালোবাসা’র প্রমাণ সংগ্রহ করাও এক সমস্যা। কাজেই আমার মা নানা ধরনের পরীক্ষা শুরু করলেন।

 যেমন অনেকদিন পার করে আমার বাসায় এলেন।রাতে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।বললেন শরীর ভালো না। উদ্দেশ্য দেখা,এই খবরে তার ছেলেমেয়ে কতটা বিচলিত হয়।সে কি সাধাসাধি করে খেতে বসায়,নাকি নির্বিকার থাকে।না কি অতি ব্যস্ত হয়ে ডাক্তার ডেকে আনে।এই জাতীয় পরিক্ষায় আমি কখনো পাশ করতে পারি না।আমার অন্য ভাইবোনেরাও পারে না।সবাই ভাব করে, বয়স হয়েছে,এখন শরীর তো খারাপ করবেই।শুধু আমার সর্বকনিষ্ট ভাই মায়ের প্রতি অতি ভক্ত বলে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। জোর করে তাকে টেবিলে এনে খাওয়ায় – খাওয়াতে না পারলে তৎক্ষণাৎ ডাক্তার আনতে যায়।তার একজন প্রাকটিসহীন ডাক্তার আছেন।যাকে সে যে কোনো সময় কল দিয়ে চলে আসেন। আমাদের মধ্যে মার ভালোবাসা পরীক্ষায় সেই শুধু অনার্সসহ পাশ।আমরা ফেল।

 আমার বন্ধু মোজাম্মেল হোসেন সাহেবের মা ও এই আমার মা মতই ছেলেমেয়েদের ভালোবাসা আছে কি নেই পরীক্ষা শুরু করেছেন।তিনি শারীরিক ভাবে বেশ সুস্থ।তবু একদিন দেখা যায়,কোনো এক ছেলে বা মেয়ের কাছে গিয়ে অকারণেই অনেকক্ষণ কাশলেন, হাঁচলেন।নিজেই নিজের কপালের উত্তাপ দেখলেন।তার উদ্দেশ্য -ছেলে মেয়েরা কেউ তার আচার আচরণ দেখে জিঙ্গাসা করে কি না -মা তোমার শরীর খারাপ?কি আশ্চর্য?তোমার শরীর খারাপ আমাদের বলবে না?দেখি কাপড় পর, ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। তিনি বিরস গলায় বললেন,বাদ দে, ডাক্তারের কাছে কি নিবি?বয়স হয়েছে,গলায় রোগ ব্যাধি তো হব্রই।কথা বলে সময় নষ্ট করো না তো মা।কাপড় পর। ডাক্তারের কাছে নিতে হবে।তিনি আনন্দিত চিত্তে কাপড় পরতে চলে যান।ছেলেমেয়েরা তাকে ভালোবাসে এই ব্যাপারে নিশ্চিত হন।

আমার বন্ধু এবং বন্ধুর বোনেরা তাদের মায়ের ব্যাপারটা জানেন।তারা এখন নিয়ম করে তাদের মাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান।একেক জন একেক ডাক্তার।মা মহাখুশি।তার সময় কাটে ডাক্তারের কাছে ঘুরে ঘুরে।আমার মার প্রসঙ্গে ফিরে আসি।তিনি আমাদের নিয়ে অনেক ছোটখাট পরীক্ষা করলেন।বেশির ভাগ পরীক্ষার ফলাফল হল অনিশ্চিত। নিশ্চিত পরীক্ষা দরকার।কাজেই তিনি সেই পরীক্ষার জন্য তৈরী হলেন।এক সন্ধ্যায় শুনলাম তিনি বেশ কিছুদিন দেশের বাড়িতে গিয়ে থাকবেন।তিনি হয়তো ভেবেছিলেন,এটা শুনেই তার ছেলেমেয়েরা চেচিয়ে উঠবে।আরে না,অসম্ভব। আপনি দেশে যাবেন কি?না না,দেশে যেতে হবে না।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *