এই আমি পর্ব – ৬ হুমায়ূন আহমেদ

এই আমি পর্ব – ৬

কিন্তু তা বলা হল না।মা দেশে চলে গেলেন।আর ফেরার নাম নেই।সাত দিনের বেশি যে মহিলা ছেলেমেয়েদের না দেখে থাকতে পারেন না তিনি একমাস কাটিয়ে দিলেন।ভাবলেন, ছেলেমেয়েরা খোঁজখবর করবে। আসতে না পারলেও চিঠি দেবে।না,কেউ চিঠিও দিল না।তিনি নিজেই লজ্জার মাথা খেয়ে সবার কাছে চিঠি লিখলেন। অতি সংক্ষিপ্ত পত্র।আমি ভালো আছি।আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করবে না।নামাজ পড়বে। সর্বদা আল্লাহপাককে স্মরণ করবে।ইতি তোমার মা।আমরা কেউ চিঠির জবাব দিলাম না।আসলে মার অভিমানের গুরুত্বটাই কেউ ধরতে পারলাম না।এই বয়সে তিনি যে ছেলেমেয়েদের এক জটিল পরীক্ষায় ফেলবেন সেটা কে অনুমান করবে?আমরা ভাবলাম,নিজের বাড়িতে থাকতে  মার নিশ্চ।য় খুব ভালো লাগছে।ভালো না লাগলে তো চলেই আসবেন।

দুমাস কেটে গেল। আমার ছোট মেয়ে একদিন বলল,আজ রাতে দাদিকে স্বপ্নে দেখেছি।দাদিকে দেখতে ইচ্ছা করছে।তখন আমার মনে হল,আরে তাইতো- অনেক দিন মাকে দেখি না।বাসাটা খালি।আচ্ছা চল মাকে ধরে নিয়ে আসি। মাইক্রোবাস নিয়ে চলে যায় ময়মনসিংহ। সবাইকে খবর দেওয়া যাক।ক্ষীণ একটা অাপত্তি উঠল।এই গভীর রাতে বাস নিয়ে এতোদূর যাওয়া কি ঠিক হবে?সেই আপত্তি বাচ্চাদের উৎসাহের কাছে টিকল না।এক্ষুনি যেতে হবে। এক্ষুণি।রাত এগারোটায় বাস ভর্তি করে আমরা সব ভাই বোন তাদের বাচ্চারা রওনা হলাম।

ময়মনসিংহ পৌছালাম রাত দুইটাই।মা তার এক ভাইয়ের বাসায় আছেন।সেই বাসার ঠিকানা জানা নেই।ঠিকানা খুজে বাসা বের করতে করতে রাত তিনটা ভেজে গেছে।রাত তিনটায় কড়া নেড়ে মার ঘুম ভাঙ্গানো হল।বাচ্চা কাচ্চারা চেচিয়ে বলল,দাদিমা তোমাকে নিতে এসেছি।মার চোখ ভিজে উঠল।তিনি কপট বিরক্তিতে বললেন,এদের যন্ত্রণায় অস্থির হয়ৃছি।কোথাও গিয়ে যে শান্তিমত দু একদিন থাকব সেই উপায় নেই।রাত তিনটার সময় উপস্থিত হয়েছে। ছেলেমেয়েগুলোর কান্ড জ্ঞান বলে কিছু নেই।রাত তিনটায় দুধের বাচ্চা নিয়ে সব উপস্থিত হয়েছে।রাস্তায় যদি বিপদ আপদ কিছু ঘটতো? এদের বুদ্ধি শুদ্ধি কি কোনো কালেই হবে না?

মা তার বুদ্ধি শুদ্ধি এবং কান্ডজ্ঞানহীন ছেলেমেয়েদের বকা ঝকা করতে করতে নিজের ব্যাগ গুছাতে শুরু করেছেন। ছেলেমেয়েদের ভালোবাসা টের পাবার যে কঠিন পরীক্ষা মা শুরু করেছিলেন আমরা সবাই পরীক্ষায় ফেল করতে করতে ভাগ্যক্রমে লেটার মার্ক পেয়ে পাশ করে গেলাম।ঢাকায় ফেরার পথে মনে হল,এই দিন খুব দূরে নয় যখন ভালোবাসার পরীক্ষা নেবার কেউ থাকবে না। পরীক্ষায় পাশ ফেল নিয়ে আমাদের চিন্তিত হতে হবে না।আমরা সবাই নিজের নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকার অফুরন্ত সুযোগ পাব।বাসের পেছনের সিটে দাদির পাশে কে বসবে তাই নিয়ে ঝগড়া হচ্ছে।মার গলা শুনতে পাচ্ছি-তোরা কি যে যন্ত্রণা করিস।এই জন্যই মাঝে মধ্যে তোদের ছেড়ে চলে যাই।

 ইদানিং পুরোনো বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে দেখা হলে বড় ধরনের ধাক্কা খাই-কি চেহারা একেকজনের -দাঁত পড়ে গেছে,গালের চামড়া গেছে কুচকে, মাথায় অল্প কিছু ফিনফিনে চুল।কলপ দিয়ে সেই চুলের বয়স কমানো হয়েছে কিন্তু সাদা সাদা গোড়া উকি দিচ্ছে।ওদের দিকে তাকালে মনে হয় হায় হায়, আমার এতো বয়স হয়ে গেছে?এখন কি তাহলে যাবার প্রস্তুতি নিতে শুরু করব? মিরপুর গোরস্থানে জায়গা দেখতে যাব?আয়নায় যখন নিজেকে দেখি তখন এতোটা বয়স মনে হয় না। হাস্যকর হলেও সত্য,নিজেকে যুবক যুবকই লাগে।ঐ তো কি সুন্দর চোখ।চোখের নিচে কালি পড়েছে।এটা এমন কিছু না, রাত জাগি,কালিতো পড়বেই।কয়েক রাত ঠিকমত ঘুমাতে পারলে চোখের কালি দূর হয়ে যাবে।মুখের চামড়ার বলিরেখা?

ও কিছুনা। অনেক যুবক ছেলেদের ও মুখে এমন দাগ দেখা যায়।মাথার চুল সাদা হয়ে গেছে?এটা কোনো ব্যাপারই না।চুল পাকা বয়সের লক্ষণ নয়। মানুষের বয়স শরীরে না মনে।আমাদের মত বয়সীদের হটাৎ রঙিন কাপড়ের দিকে ঝুকে যেতে দেখা যায়। চক্রাবক্রা শার্ট পড়ে এরা তেজী তরুণের মত হাঁটতে চেষ্টা করে- জরাকে অগ্রাহ্য করার হাস্যকর চেষ্টা।চোখে মুখে এমন একটা ভাব যেন এইমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া চুকিয়ে রাস্তায় নেমেছি। বান্ধবীকে নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই কোনো কাফেতে চা খেতে যাব কিংবা বাদাম ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে রাস্তায় হাটব।

এরকম একদিনের কথা।নাপিতের দোকান থেকে চুল কেটে বের হয়েছি।চুল কাটার ফলে গোড়ার সাদা চুল বের হয়ে এসেছে।বিশ্রী দেখাচ্ছে।মেজাজ খারাপ করে এক পান সিগারেটের দোকানের সামনে দাঁড়িয়েছি। সিগারেট কিনে বাসায় ফিরব। হটাৎ দেখি যুবক একটা ছেলে কদবেল কিনছে।সে বসেছে উবুর হয়ে।বেল শুঁকে শুঁকে দেখছে।তার পেছনেই শাড়ি পরা এক তরুণী। তরুণী লজ্জা পাচ্ছে বলে মনে হল। ছেলেটাকে চেনা চেনা বলে মনে হচ্ছে।আবার চিনতেও পারছি না।সে দুটা কদবেল কিনে উঠে দাঁড়ালো।আমাকে দেখে চেচিয়ে বলল,আরে তুই। আমি আকাশ থেকে পড়লাম।এ হচ্ছে আমাদের সফিক।ঢাকা কলেজে একসাথে পড়েছি, ইউনিভার্সিটিতে পড়েছি।তারপর যোগাযোগ নষ্ট হয়ে গেছে।

সফিক বলল তুই এতো বিশ্রী করে চুল কেটেছিস। তোকে দেখাচ্ছে পকেটমারের মত।আমার হতভম্ব ভাব তখনও কাটেনি।আমি অবাক হয়ে সফিককে দেখছি।ব্যাটার বয়স বাড়েনি।জরা তাকে স্পর্শ করেনি।তাকে ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র বললে কেউ অবিশ্বাস করবে না।সফিক বলল, দোস্ত এ হচ্ছে আমার বড় মেয়ে। ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে।ওর নাম শাপলা।শাপলা মা,চাচাকে পা ছুয়ে সালাম কর।আমি বললাম,বাজারের মধ্যে কিসের সালাম? বাজার টাজার বুঝি না সালাম করতে হবে।মেয়ে একগাদা লোকের সামনেই সালাম করল। সফিক আমার হাত ধরে বলল,চল আমার সাথে।কোথায়?

আমার বাসায়, আবার কোথায়।আরে না- চুল কেটেছি গোসল করব।কোনো কথা না। শাপলা মা তুই শক্ত করে চাচার একটা হাত ধর।আমি আরেক হাত ধরছি।দুজন মিলে টেনে নিয়ে যাব।আমাকে ওদের সাথে যেতে হল।ছোট ফ্ল্যাটবাড়ি। বোঝাই যাচ্ছে আর্থিক অবস্থা নড়বড়ে।বসার ঘরে বার ইঞ্চি ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট টিভি।ইদানিং টিভির মাপ থেকে অর্থনৈতিক অবস্থা আচঁ করার একটা সুবিধা আছে।সফিক আমাকে চানতে টানতে একেবারে রান্নাঘরে নিয়ে উপস্থিত।দাঁড়া বৌকে অবাক করে দেই।সে তোর নাটক দেখে গ্যালন গ্যালন চোখের পানি ফেলে।চোখের পানির মূল মালিক ধরে নিয়ে এসেছি।

রান্নাঘরে আমাকে দেখে সফিকের স্ত্রী অত্যন্ত বিব্রত হল এবং দারুণ অস্বস্তির মধ্যে পড়ল। স্বামীর পাগলামির সঙ্গে বেচারি বোধহয় এতদিনেও মানিয়ে নিতে পারেনি।ছিঃ ছিঃ কি অবস্থা রানাঘরের।এর মধ্যে আপনাকে নিয়ে এসেছে।এর কোনোদিন কান্ডজ্ঞান হবে না।ও কি ছাত্র জীবনে ও এরকম ছিল? আমি উত্তর দিতে পারলাম না।ছাত্র জীবনে সফিক কেমন ছিল আমার মনে নেই।ডিম সিদ্ধ তার খুব পছন্দের খাবার ছিল- এইটুকুই মনে আছে।সিদ্ধ ডিমের খোসা ছাড়িয়ে আস্ত মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে দিত।এই সময় তার আরামে চোখ বন্ধ হয়ে যেত।আমি লক্ষ্য করলাম সফিকের বয়স না বাড়লেও তার স্ত্রীর ঠিকই বেড়েছে।

ভদ্রমহিলাকে দেখে মনে হয়,জীবন যুদ্ধে তিনি পরাজিত। ক্লান্তি ও হতাশ তাকে পুরোপুরি গ্রাস করেছে। অসুখ বিসুখেও মনে হয় ভুগছেন। যতক্ষণ কথা বললেন, ক্রমগত কাঁশতে থাকলেন।  কাঁশতে কাঁশতে বললেন, আপনি এসেছেন আমি খুশি হয়েছি। আপনাকে যে যত্ন টত্ন করব সে সামর্থ নেই। সংসারের অবস্থা ভাঙা নৌকার মত। কোনোমতে টেনে নিচ্ছি। ইভিনিং সিপ্টে একটা স্কুলে কাজ করি।ঐ বেতনাই ভরসা।কাজটা না থাকলে বাচ্চা  কাচ্চা নিয়ে রাস্তায় ভিক্ষা করতে হত।আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, সফিক কিছু করে না? করে।ও একটা ব্যাংকের ম্যানেজার।তাতে লাভ কিছু নেই।আপনি আপনার বন্ধুকে জিঙ্গাসা করুন তো পুরো বেতন কখনো সে আমার হাতে দিয়েছে কি না।এমনও মাস যায় একটা পয়সাও আমাকে দেয় না।আপনি বলুন,আমি কি বাচ্চাদের পানি খাইয়ে মানুষ করব?

সফিক বলল,চুপ কর। প্রথম দিনেই অভিযোগ শুরু করলে।এসব বলার সুযোগ আরো পাবে।আজ না বললেও চলবে।ফাইন করে চা বানাও। হুমায়ূন খুব চা খায়।স্র আগের জন্মে চা বাগানের কুলি ছিল।সফিকের স্ত্রী কঠিন গলায় বলল,ভাই চা আমি আপনাকে খাওয়াচ্ছি কিন্তু আমার কথা আপনাকে শুনতেই হবে।এবং যাবার আগে আপনার বন্ধুকে বুঝিয়ে বলে যেতে হবে-তার নিজের সংসারটাই আসল।আগে সংসার দেখতে হবে…….. অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, ভদ্রমহিলার চোখ দিয়ে চপ চপ করে পানি পড়ছে।বেড়াতে এসে এ কি সাংসারিক সমস্যার মধ্যে পড়লাম। সফিক প্রায় জোর করেই তার স্ত্রীকে রান্নাঘরে পাঠিয়ে দিল।আমি বললাম,তোর সমস্যাটা কি? আরেক দিন বলব।আজই শুনে যাই।

সফিক খানিকক্ষণ ইতস্ত করে সমস্যা বলা শুরু করল।সফিকের জবানিতেই তার সমস্যা শুনি।বুঝলা দোস্ত তখন সবে চাকুরী পেয়েছি।বিয়ে টিয়ে করিনি।নিউ পল্টন লাইনে এক কামরার বাস নিয়ে থাকি।দেশে টাকা পাঠাতে হয় না।বেতন যা পাই নিজেই খরচ করি।বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে হৈচৈ।এখানে ওখানে বেড়ানো খানিকটা বদ অভ্যাসও হয়ে গেল। মাঝে মধ্যে মদ্যপান করা। বন্ধু বান্ধব এসে ধরে -একটা হুইস্কির বোতল কিনে আন।বেতন পেয়েছিস সেলিব্রেট কর।কিন্র ফেলি। অভ্যাস স্থায়ী হল না।কারণ আমার বডিসিস্টেম এলকোহল সহ্য করে না।সামান্য খেলেও সারা রাত জেগে থাকতে হয়। এবং অবধারিত ভাবে শেষ রাতে হড় হড় করে বমি  হয়।

এক রাতের কথা -সামান্য মদ্যপান করে বাসায় ফিরেছি। সামান্যতেই নেশা হয়ে গেল।একটা রিকশা নিয়েছি।মাথা ঘুরছে। মনে হচ্ছে রিকশা থেকে পড়ে যাব। অনেক কষ্টে হুড ধরে বসে আছি।এমন সময় এক লোক তার ছেলেকে নিয়ে ভিক্ষা চাইতে এল।তার ছেলের চিকিৎসার জন্য খরচ।আমি ছেলেকে দেখে চমকে উঠলাম।সাত আট বছর বয়স। ফুটফুটে চেহারা। সম্পূর্ণ নগ্ন। নগ্ন থাকার কারণ হল তার অসুখের ডিসপ্লে নগ্ন না হলে দেখানো সম্ভব না। ছেলেটির অন্ডুকোষ ফুটবলের মত প্রকাণ্ড। দেখলেই ঘৃণা হয়।আমি দ্রুত একটা একশ টাকার নোট বের করে দিলাম। ছেলেটির বাবা আনন্দের হাসি হাসল।এই হাসি দেখেই মনে হল এই লোকতো ছেলেকে চিকিৎসা করাবে না ভিক্ষা করাই তার পেশা। ছেলে সুস্থ হলেই বরং তার সমস্যা।আমি বললাম রোজ ভিক্ষা করলে কত পাওয়া যায়? সে গা ছাড়া ভাব করে বলল ঠিক নেই। কোনোদিন বেশি কোনোদিন কম।আজ কত পেয়েছ?আমারটা বাদ দিয়ে কত?

আছে কিছু।কিছু টিছু না।বল কত।লোকটি বলতে চায় না।কেটে পড়তে চায়।আমি তখন নেশাগ্রস্ত।মাথা ঠিক নেই।আমি হুংকার দিলাম,যাচ্ছ কোথায়?এক পা গেছ তো খুন করে ফেলব।বল আজ কত পেয়েছ ধরেন দুশ।তুমি কি এই ছেলের চিকিৎসার জন্য কোনো দিন হাসপাতালে নিয়ে গেছ?বল ঠিক করে। মিথ্যা কথা বললে খুন করে ফেলব।সে পুরোপুরি হকচকিয়ে গেল।আমি বললাম, এখনি চল আমার সাথে হাসপাতালে। মেডিকেল কলেজে আমার এক বন্ধু আছে ডাক্তার -তাকে দিয়ে চিকিৎসা ব্যবস্থা করব।বাচ্চা কলে নিয়ে রিকশায় উঠে আস।

সে কিছুতেই আমার সঙ্গে যাবে না।আমি নিয়ে যাবই। মাতালদের মাথায় একটা কিছু ঢুকে পড়লে সহজে বের হতে চায় না।আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা- চিকিৎসা করাবই।এর মধ্যে আমার চারিদিকে লোকজন জমে গেছে।সবাই আমাকে সমর্থন করছে। লোকটা কাদো কাদো হয়ে গেছে। সে মিন মিন করে বলল, ডাক্তার অপারেশন করব। অপারেশন করলে আমার পোলা মারা যাইব।আমি আবারও হুংকার দিলাম,ব্যাটা ফাজিল। ছেলের অসুখের চিকিৎসা করাবে না। অসুখ দিয়ে ফাইদা লুফবে- চল হাসপাতালে।অসাধ্য সাধন করলাম।দুপুর রাতে ওদের হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। বন্ধুকে খুঁজে বের করলাম।সে বিরক্ত হয়ে বলল,এই রাত দুপুরে রোগী ভর্তি করব কিভাবে?তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেল?এই যন্ত্রণা কোথা থেকে জুটাইছিস?

আমি বললাম,কিছু জানতে চাই না।তুই এর ব্যবস্থা করবি।খরচ যা লাগে আমি দেব।ব্যবস্থা একটা হল।দেখা গেল অসুখ তেমন জটিল নয়। খাদ্যনালীর অংশবিশেষ মূত্রথলিতে নেমে গেছে। ডাক্তার খাদ্যনালীটা উপরে তুলে দেবে। মূত্রনালীর ফুটো ছোট করে দিবে। অসুখটা হল খারাপ ধরনের হার্নিয়া।অপারেশনের তারিখ ঠিক হল।আমি মহাখুশী। শুধু ছেলেটার বাবা কেঁদে কেটে অস্থির।তার ধারণা ছেলে মারা যাচ্ছে।থার একটাই ছেলে। স্ত্রী মারা গেছে। ছেলেকে নিয়ে সে দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায়।একটাই তার মাত্র শখ।মনে মনে বললাম, হারামজাদা।ছেলের অসুখ হওয়ায় মজা পেয়ে গেছিস?দেশে দেশে ঘুরে বেড়ানো বার করছি। শুয়ার কা বাচ্চা। ঘুঘু দেখেছ ফাঁদ দেখনি।ছেলেকে শুধু যে ভালো করব তাই না, স্কুলে ও ভর্তি করাব। মজা বুঝবি।অপারেশন হয়ে গেল। সাকসেসফুল অপারেশন। ছেলেটাকে অপারেশন টেবিল থেকে ইনটেনসিভ কেয়ারে নেওয়া হল।

আশ্চর্যের ব্যাপার, ইনটেনসিভ কেয়ারে নেওয়ার এক ঘন্টার মধ্যে ছেলেটি মারা গেল।আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। হায় হায়।এ কি সর্বনাশ।আমার কারণে ছেলেটি মারা গেল?ছেলের বাবার সঙ্গে দেখা করার সাহসও হল না।আমি হাসপাতাল থেকে পালিয়ে চলে এলাম।আমি প্রতিজ্ঞা করলাম,আর পরোপকার করতে যাব না। যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে।সারা রাত এক ফোটাও ঘুম হল না।কেন ছেলেটা মারা গেল?কেন? বুঝলি দোস্ত ছেলেটা মারা যাবার পর আমার আসল সমস্যা শুরু হল। আমার রাগ চেপে গেল। যখন যেখানে অসুস্থ ছেলেপুলো দেখব, চিকিৎসা করাব।দেখি কি হয়।দেখি এরা বাঁচে না মরে। সেই থেকে শুরু।রাস্তায় অসুখ বিসুখে কাতর কাউকে দেখলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করি। টাকা পয়সা সব এতেই চলে যায়।

তারপর বিয়ে করলাম। সংসারটা হল। কিন্তু অভ্যাসটা গেল না। চিকিৎসার খরচ আছে। আমি বেতনও তো তেমন কিছু পাই না। সংসারে টানাটানি লেখেই থাকে। বিয়ের সময় তোর ভাবী বেশ কিছু গয়না টয়না পেয়েছিল।সব বেঁচে খেয়ে ফেলেছি।এই নিয়েও সংসারে অশান্তি। হা হা হা।কতজন রোগী একভাবে সুস্থ করেছিস? অনেক।আর কেউ মারা যায় নি? না।আর একজনও না। প্রথমজনই শুধু মারা গেল আর কেউ না।এই মুহূর্তে কারো চিকিৎসা করছিস? হ্যাঁ। এখনো একজন আছে।জয়দেবপুরের একটা মেয়ে। ঠোঁট কাটা। প্লাস্টিক সার্জারি করে ঠোঁট ঠিক করা হবে।আমি মুগ্ধ গলায় বললাম,তুই যে কত বড় কাজ করছিস তুই কি তা জানিস?

সফিক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,বড় কাজ করছি না ছোট কাজ করছি তা জানি না।তবে আমার একেকটা রোগী যখন সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে, সেদিন যে আমার কত আনন্দ হয় তা শুধু আমিই জানি।এই অনন্দের কোনো তুলনা নেই। প্রতিবারই আমি আনন্দ সামলাতে না পেরে হাউ মাউ করে কাঁদি। লোকজন, ডাক্তার, নার্স সবার সামনেই কাঁদি।বলতে বলতে সফিকের চোখে পানি এসে গেল। পানি মুছে সে স্বাভাবিক গলায় বলল, তারপর দোস্ত,তোর খবর বল। তুই কেমন আছিস? আমি মনে মনে বললাম, শারীরিকভাবে আমি ভালো আছি। কিন্তু আমার মনটা অসুস্থ হয়ে আছে-তুই আমার মনটা সুস্থ করে দে। এই ক্ষমতা অল্প কিছু সৌভাগ্যবানদের থাকে।তুই তাদের একজন।

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *