এই আমি পর্ব – ৭ হুমায়ূন আহমেদ

এই আমি পর্ব – ৭

কিশোর বয়সে সুবোধ ঘোষের একটা উপন্যাস পড়েছিলাম -শুন বরনারী। উপন্যাসের মূল চরিত্র একজন হোমিওপ্যাথি ডাক্তার, হিমাদ্রী। অনেকদিন সেই ডাক্তারের ছবি আমার চোখে আসত।মাঝে মাঝে রাস্তায় কাউকে দেখে চমকে উঠে ভাবতাম,আরে ইনি তো অবিকল হিমাদ্রীর মত। কিশোর বয়সে অনেক পাগলামি ভর করে। সেই পাগলামির কারণেই হয়তো এক সন্ধ্যাবেলায় হিমাদ্রীবাবুর কাছে এক পাতার একটা চিঠি লিখে ফেললক। চিঠিতে অনেক সমবেদনার কথা বলা হল।চিঠি পাঠানো যায় কি করে? হিমাদ্রীবাবুর ঠিকানা আমি জানি না।সুবোধ ঘোষের ঠিকানাও জানা নেই। চিঠিটা অনেক দিন অংক খাতায় বন্দী পড়ে রইল।এক সময় হারিয়ে গেল।একজন মুগ্ধ কিশোরের আবেগ ও ভালোবাসা হিমাদ্রী কিংবা সুবোধ ঘোষ জানতে পারলেন না।

চিঠিটি কিন্তু হারায়নি। প্রকৃতি কিছু হারাতে দেয় না।যত্ন করে তুলে রাখে।কোনো এক বিশেষ সময়ে বিশেষ মুহূর্তে সেই হারানো জিনিস বের করে এনে সবাইকে হকচকিত করে দেয়।আমার বেলায় এই ব্যাপারটি ঘটল। লক্ষ্মীপুর থেকে সপ্তম শ্রেণির জনৈক বালক মিসির আলীকে একটা একপাতার চিঠি লিখল। মিসির আলীর প্রতি সমবেদনায় সেই চিঠি পূর্ণ।আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম।এই চিঠির ভাষা এবং আমার চিঠির ভাষা একই রকম।যেন প্রকৃতি পয়ত্রিশ বছর পর আমার চিঠিই আমাকে ফেরত পাঠাল।আমার উপন্যাসে বারবার ফিরে আসা চরিত্রগুলোকে নিয়ে একটা লেখা তৈরি করতে বলা হয়েছে। লিখতে গিয়ে তাই মিসির আলির কথাই প্রথম মনে পড়ল।তাঁকে দিয়েই শুরু করি।

মিসির আলী

মিসির আলী মানুষটা দেখতে কেমন?আমি ঠিক জানি না।জানলে বই-এ তার চেহারার বর্ণনা থাকতো।তেমন কোনো বর্ণনা নেই।চশমা পরেন এইটা বলা হয়েছে। চশমা তো আর চেহারার বর্ণনা হবে না। চশমা অনেকেই পরেন।বলা হয়েছে, তীক্ষ্ম চোখে তিনি তাকান।সেই তীক্ষ্ম চোখও তো কারোর বোঝার উপায় নেই কারণ চোখ ঢাকা থাকে চশমার মোটা কাচের আড়ালে। লোকটার কি মাথাভর্তি চুল?না কি টাক মাথা?চুলের কথা কোনো উপন্যাসে বলিনি, তবে চুল আছে।চুল যে আছে তা বুঝলাম মিসির আলীকে নিয়ে প্রচালিত দুটি টিভি নাটকে।নাটক দুটিতে মিসির আলী চরিত্রে অভিনয় করেছেন আবুল হায়াত।টেকো মিসির আলীকে দেখে চমকে উঠলাম।চেচিয়ে বলতে ইচ্ছা করল না না মিসির আলীর মাথায় টাক নেই।তার মাথা ভর্তি ঘন চুল।এখন বললে তো কিছু হবে না। বইয়ে কিছুই বলিনি।

মিসির আলীকে নিয়ে যখন কিছু লিখি তখন কি কোনো চেহারা আমার মনে আসে?সচেতন ভাবে কিছু ভাসে না। অবচেতন মনে নিশ্চয় ছবি আঁকা থাকে।সেই ছবি সাধারণ মানুষের ছবি। অন্তর্মুখী একজন মানুষ,যিনি বই পড়তে ভালোবাসেন। অন্তর্মুখী মানুষেরা অন্যদের সাথে কথা বলতে পছন্দ করেন না। কিন্তু মিসির আলী পছন্দ করেন।প্রায়ই দেখা যায় আগ্রহ নিয়ে তিনি অনেককে অনেক কিন্তু জিঙ্গাসা করেন। অন্তর্মুখী মানুষ এই কাজটি কখন করবে না।এই মানুষটির প্রধান গুণ কি?আমার মতে কৌতূহল এবং বিস্ময়বোধ করার অসাধারন ক্ষমতা। কৌতূহল আমাদের সবারই আছে,কিন্তু কৌতূহল মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় পরিশ্রমটি আমরা করি না।করতে চাই না। অন্তর্মুখী মানুষ হয়েও মিসির আলী কিন্তু এই পরিশ্রমটা করেন। উদাহরণ দেওয়া যাক। উদাহরণ থেকে মিসির আলীর কৌতূহলের ধরণ পরিষ্কার হবে। আমরা প্রায়ই ইউনানী তিব্বিয়া দাওয়াখানা জাতীয় সাইনবোর্ড দেখি।খুব কি কৌতূহলী হই? মিসির আলী কিন্তু হন।যেমন

মুগদাপাড়া থেকে যে রাস্তাটা মান্ডার দিকে গিয়েছে তার প্রথম ডানদিকের বেশ কয়টা দোকান।একটা স্টেশনারী সপ,দুটা সাইকেল টায়ারের দোকান,একটা সেলুন এবং একটি হেকিমী ঔষধের দোকান। সাইনবোর্ডে লেখা- ইউনানী তিব্বিয়া দাওয়াখানা। হেকিম আবদুর রব।মিসির আলী ইদানিং এই পথে যাওয়া আসা করেন।কারণ তিনি বাসা নিয়েছেন মান্ডায়। ঢাকায় আসতে হলে তাকে অতীশ দিপংকর রোড ধরতে হয়।এই পথেসআসা ছাড়া উপায় নেই। দোকানগুলির সামনে এসে তিনি থমকে দাঁড়ান। আগ্রহ এবং কৌতূহল নিয়ে ইউনানী তিব্বিয়া দাওয়াখানার দিকে তাকান।

মানুষের কৌতূহল জাগ্রত করার মত তেমন কিছু দোকানে নেই। ভেতরটা অন্ধকার।ঘরের অর্ধেকটা জুড়ে পুরোনো ভারী আলমারি। আলমারির পাল্লা কাঠের বলে ভেতরের কিছু দেখা যাচ্ছে না।দুপাশে বইয়ের র‍্যাকের মত বেশ কিছু র‍্যাক।র‍্যাক ভর্তি কাঁচের ও চিনামাটির বৈয়ম।সব দোকানেই টেবিল বা টেবিল জাতীয় কিছু থাকে।এখানে নেই। দুটো বেতের চেয়ার পাশাপাশি বসানো। একটিতে সারাক্ষণ ভয়ংকর রোগা,লম্বা এবং অস্বাভাবিক ফর্সা একজন মানুষ বসে থাকেন। সম্ভাবত তিনি হেকিম আব্দুর রব।তার হাতে একটা পত্রিকা থাকে,সব সময় তবে সবসময় পত্রিকা পড়ে না। বেশি ভাগ সময় দেখা যায় হাতে পত্রিকা আছে ঠিকই কিন্তু ভদ্রলোক তাকিয়ে আছে রাস্তার দিকে। মিসির আলী এখন পযর্ন্ত এই দোকানে দ্বিতীয় কোনো মানুষ দেখেনি।

সঙ্গত কারণেই হেকিমী, আয়ুবেদিক জাতীয় চিকিৎসার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে আসছে।এই দোকানের সামনে এলেই মিসির আলীর জানতে ইচ্ছা করে এই লোকটির সংসার কিভাবে চলে।অনেক ব্যাপার আছে জানতে ইচ্ছা করলেও জানা যায় না। মিসির আলীর পক্ষে সম্ভব নয়। দোকানে ঢুকে হেকিম সাহেবকে জিঙ্গাসা করবেন আপনার কাছে তো কখনো কাউকে আসতে দেখি না। আপনার সংসার কিভাবে চলে।মানুষটা দিনের পর দিন খবরের কাগজ হাতে নিয়ে কিভাবেন, তাও মিসির আলীর জানতে ইচ্ছা হয়। নিজে নিঃসঙ্গ বলেই বোধহয় আরেকজন নিঃসঙ্গ মানুষের প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন।এবং প্রায় ভাবেন কোনো একদিন দোকানটির সামনে রিকশা থেকে নেমে পড়বেন।

কৌতূহল মিটিয়ে নেবেন।সেই কোনো একদিন এখানো আসছে না। কেন আসছে না এই নিয়েও মিসির আলী ভেবেছেন।তার ধারণা মানুষের কৌতূহলের একটি থ্রেসহোল্ড লিমিট আছে। কৌতূহল স্রই লিমিটের নিচে হলে মানুষ কখনো তা মেটাতে চেষ্টা করে না।যখন লিমিট ক্রস করে কেবল তখনই কৌতূহল মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ড শুরু করে। রাস্তায় কোনো ভিক্ষারী শিশুকে একা কাঁদতে দেখলে আমাদের কৌতূহল হয়। জানতে ইচ্ছা করে কেন সে কাঁদছে? কিন্তু সেই কৌতূহল থ্রেসহোল্ড লিমিটের নিচে বলে কখনো জিঙ্গাসা করা হয় না।এই মেয়ে কাঁদছো কেন?

পৌস মাসের এক বিকেলে মিসির আলীর কৌতূহল থ্রেসহোল্ড লিমিট অতিক্রম করল। তিনি দাওয়া খানার সামনে রিকশা থেকে নামলেন। এমনিতেই হাকিম সাহেবের ঘর থাকে অন্ধকার। আজ আরো অন্ধকার লাগছে কারণ সন্ধ্যা হয় হয় করছে। আকাশ মেঘলা।ঘরে এখনো বাতি জ্বালানো হয় নি। খবরের কাগজ হাতে নিয়ে চেয়ারে থাকা ভদ্রলোক চোখ তুলে মিসির আলীর দিকে তাকালেন।তার চোখের দৃষ্টি নিস্পৃহ।সেখানে আগ্রহ বা অনাগ্রহ কোনো কিছুরই ছোঁয়া নেই। দূর থেকে ভদ্রলোকের বয়স বোঝা যাচ্ছে না। এখন বুঝা যাচ্ছে বয়স ষাট ছাড়িয়ে গেছে। তবে হালকা পাতলা গড়ন বলে বুঝা যাচ্ছে না।এ বয়সে মানুষের মাথার চুল কমে যায় কিন্তু ভদ্রলোকের বেলায় তা হয়নি।তার মাথা ভর্তি ধবধবে সাদা চুল।

মিসির আলী অসস্থীর সঙ্গে বললেন,আমি একটা সামান্য জিনিস আপনার কাছে জানতে এসেছি। আমি আপনার কাছেই থাকি। মান্ডার মায়া বাজারে।বসুন।মিসির আলি বসলেন।ভদ্রলোক খানিকটা ঝুকে এসে বলল,কি জানতে চান বলুন? ভদ্রলোকের গলার আওয়াজ পরিষ্কার। মানুষের গলার শব্দে ও বয়সের ছাপ পড়ে।এই ভদ্রলোকের তা পড়েনি। ভদ্রলোক তীক্ষ চোখে তাকিয়ে আছেন।মনে হচ্ছে খানিকটা বিরক্ত হচ্ছেন। মিসির আলীর অস্বস্তি আরো বেড়ে গেল।কি জানার জন্য এসেছেন বলুন ? আপনার দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা ইউনানী তিব্বিয়া দাওয়াখানা। ইউনানী তিব্বিয়া শব্দ দুটির মানে কি? এটা জানার জন্য এসেছেন?

জ্বি।কেন জানতে চান।কৌতূহল,আর কিছু না।আপনি কি করেন? তেমন কিন্তু করি না।এক সময় অধ্যাপনা করতাম।এখন সাইকোলজির উপর একটা বই লেখার চেষ্টা করছি। আপনিই কি হেকিম আবদুর রব? না।হেকিম আবদুর রব আমার দাদা।আমরা চার পুরুষের হেকিম।আমি হচ্ছি শেষ পুরুষ।আপনি শুধুমাত্র ইউনানী আর তিব্বিয়া এই শব্দ দুটির অর্থের জন্য আমার কাছে এসেছেন দেখে বিস্ময়বোধ করছি।অর্থ বলছি। আপনি কি চা খাবেন? সন্ধ্যাবেলা আমি এক কাপ চা খাই।চা কি দোকান থেকে আনবেন? না আমি নিজেই বানাব।ভালো কথা আপনার নাম জানা হয়নি।আমার নাম মিসির আলী।মিসির আলী সাহেব আপনি কি ধুমপান করেন?

জ্বি করি।আমার নাম আবদুল গনি। হেকিম আবদুল গনি। আপনি বসুন আমি চা বানাচ্ছি।মিসির আলী সাহেব বসে রইলেন।আবদুল গনি সাহেব উঠে দাঁড়ালেন।দোকানের পেছনে র‍্যাকগুলির ওপাশে খানিকটা ফাঁকা জায়গা। চায়ের সরঞ্জাম সেখানেই রাখা।মিসির আলী লক্ষ করলেন,বেশ দামী একটা ইলেকট্রিক কেতলিতে চায়ের পানি গরম হচ্ছে।চা দৃওয়াও হল দামি কাপে। ভদ্রলোক সিগারেটের টিন বের করলেন। আব্দুল্লাহ নামের মিশরীয় সিগারেট। ড্যাম্প যাতে না হয় সে জন্য বাজারজাত করা হয় টিনের কৌটায়। বাংলাদেশে এই বস্তু সচরাচর চোখে পড়ে না।আবদুল গনি সাহেব চেয়ারে বসতে বসতে বললেন আমার বড় মেয়ে কায়রোতে থাকে।সে মাঝে মধ্যে উপহার হিসাবে এটা সেটা পাঠায়। চায়ে চিনি হয়েছে?

জ্বি।এখন আপনার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি। ইউনানী শব্দটা এসেছে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ – পঞ্চম শতাব্দীর ইউনান থেকে।ইউনান হল -গ্রীস দেশ। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ-পঞ্চম শতাব্দীর ইউনান বা গ্রীস ছিল চিকিৎসা শাস্ত্রের লীলাভূমি। হিপোক্রেটিসের মত পন্ডিত এবং গ্যালেনের মত  চিকিৎসকের কারণে চিকিৎসা শাস্ত্রের চরম উন্নতি হয়।গ্রীস থেকে এই বিদ্যা মুসলমানদের হাতে আসে।যেহেতু ইউনান হচ্ছে এই শাস্ত্রের কেন্দ্রভূমি,কাজেই তারা এর নাম দেন ইউনানী।আর তিব্বিয়া। তিব্বিয়াটা কি? তিব্বিয়া এসেছে তিব্ব্ থেকে।আরবিতে তিব্ব মানে চিকিৎসা সম্পর্কিত।আপনার কৌতূহল কি মিটেছে?

জ্বি।আরো কিছু জানতে চাইলে আসবেন।এই বিষয়ে আরো কিছু পড়াশোনা আছে।আজ তাহলে উঠুন। সন্ধ্যার পরে আমি দোকান বন্ধ করে দি। আমার চোখের অসুবিধা আছে।রাতে আমি ভালো দেখি না।মিসির আলী উঠে দাড়াতে  দাঁড়াতে বললেন,রোগী আপনার কাছে কেমন আছে? আসে না,আসার কথাও না। বর্তমান আধুনিক চিকিৎসা বিদ্যা অনেক দূর এগিয়েছে।এদের হাতে  আছে  শক্তিশালী এন্টিবায়টিক, সালফা ড্রাগ। চিকিৎসা পদ্ধতি সহজ হয়েছে,দ্রুত হয়েছে।হেকিমি বিদ্যা আগে যেখানে ছিল এখনো সেখানে আছে।আপনার কথা থেকে তো মনে হচ্ছে বর্তমান আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার শুরুটা হচ্ছে ইউনানী।

হ্যাঁ তাই।বর্তমান কালের ডাক্তাররা হিপোক্রেটিস শপথ নেন।ইউনানী শাস্ত্রের উন্নতি হয় হিপোক্রেটিসের পৃষ্ঠপোষকতায়। মিসির আলী সাহেব, সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে।আজ তাহলে আপনি আসুন।রাতে আমি একেবারেই চোখে দেখি না। রিকশা এসে আমাকে বাড়িতে নিয়ে যায়।মিসির আলী ঘর থেকে বের হয়ে এলেন।তার কৌতূহল শুধু ইউনানী তিব্বিয়া দাওয়াখানায় নয়-তার কৌতূহল পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপনেও।তিনি এই সব বিজ্ঞাপন গভীর আগ্রহ নিয়ে পড়েন।শুধু পড়েই ভুলে যান না।ভাবেন।আবারও উদাহরণ –

পত্রিকায় ছোট্ট একটি বিজ্ঞাপন বের হয়েছে।সব পত্রিকায় নয়। একটি মাত্র পত্রিকায়।হারানো বিজ্ঞপ্তি,বাড়ি ভাড়া,ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে নতুন ধরনের একটি বিজ্ঞাপন। শিরোনামে-পুরষ্কৃত করা হবে। পুরষ্কার শব্দেটির আলাদা একটা মোহ আছে। বিজ্ঞাপনটা অনেকেই পড়ল।কেউ মাথা ঘামালো না।কারণ একটা অংকের ধাঁধা দেওয়া।বলি হয়েছে,কেউ এটা পারলে তাকে পুরষ্কৃত করা হবে।কোনো ঠিকানা নেই, বক্স নম্বর দেওয়া।অল্প বয়সী কিছু উৎসাহী ছেলেপুলে ধাঁধাটি নিয়ে কিছু চিন্তা ভাবনা করল।কেউ মনে হয় সমাধান করতে পারল না।কারণ পরের সপ্তাহে আবার বিজ্ঞাপনটি বেরুল।তার পরের সপ্তাহে আবার।পরপর চার সপ্তাহ ছাপা হবার পর অন্য একটি পত্রিকায়  আবার ছাপা হল।সেই পত্রিকায় পরপর চার সপ্তাহ ছাপা হবার পর অন্য একটা পত্রিকায়। 

ছমাস ধরে বিজ্ঞাপন ঘুরে ঘুরে সবকটি বড় বড় পত্রিকায় ছাপা হল।পত্র পত্রিকায় বিচিত্র সব জিনিস ছাপা হয়।দেশে বাতিলগ্রস্তের পরিমাণ আশংকাজনক ভাবে বাড়ছে। বাতিলগ্রস্তরা নিজেদের বাতিল অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চায়।এ জন্যে পয়সা খরচ করতে তাদের বাধে না। অংকের বিজ্ঞাপনটি নিশ্চয়ই এ রকম অংকের বাতিলওয়ালা কেউ দিয়েছে।কিছুদিন পর আবার নতুন কোনো ধাঁধা তার মাথায় আসবে।আবার পয়সা খরচ করে বিজ্ঞাপন দেবে।মিসির আলী এক সকালে বিজ্ঞাপনটি পড়লেন।কাগজ কলম নিয়ে বসলেন,যদি অঙ্ক সমস্যার কোনো সমাধান করা যায়।

মজার ব্যাপার হচ্ছে,মিসির আলী সব সমস্যার সমাধান করতে পারেন না।কারণ তিনি অতিমানব নন।সাধারণ একজন মানুষ।সুন্দর যুক্তি দাঁড় করাতে পারেন।তিনি  বিশ্বাস করেন এই পৃথিবীতে কোনো রহস্য নেই। কারণ প্রকৃতি রহস্য পছন্দ করে না।তারপরেও বারবার তিনি প্রকৃতির রহস্যের কাছে তিনি পরাজিত হন।এই পরাজয়ে আনন্দ আছে।সে আনন্দ মিসির আলী পান না।পাঠক হিসাবে আমরা পাই।মিসির আলী চরিত্রটির ধারণা  কোথেকে পেলাম,কিভাবে পেলাম সেই প্রসঙ্গে একটি গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছি।নতুন করে সেই প্রসঙ্গে লিখতে ইচ্ছা করছে না বরং ভূমিকার অংশবিশেষ তুলে দি –

তখন থাকি নর্থ ডাকোটার ফার্গ শহরে।এক রাতে গাড়ি নিয়ে যাচ্ছি মন্টানায়।গাড়ি চালাচ্ছে আমার স্ত্রী গুলতেকিন।পেছনের সিটে আমি আমার বড় মেয়েকে নিয়ে গুটিসুটি মেরে বসে আছি।গুলতেকিন তখন নতুন ড্রাইভিং শিখেছে। হাইওয়েতে এই প্রথম বের হওয়া।কাজেই কথাবার্তা বলে তাকে বিরক্ত করছি না।চুপ করে বসে আছি এবং খানিকটা আতঙ্কিত বোধ করছি।শুধু মনে হচ্ছে অ্যাকসিডেন্ট হবে না তো।গাড়ির রেডিও অন করা।কান্ট্রি মিউজিক হচ্ছে। ইংরেজি গানের কথা মন দিয়ে শুনতে ইচ্ছা করছে না।কিছু শুনছি,কিছু শুনছিনা এই অবস্থা। হটাৎ গানের একটা কলি শুনে চমকে উঠলাম – close your eyes and try to see

বাহ,মজার কথা তো।আমি নিশ্চিত, মিসির আলী চরিত্রের ধারণা সেই রাতেই আমি পেয়ে যাই। মিসির আলী এমন একজন মানুষ যিনি দেখার চেষ্টা করেন চোখ বন্ধ করে।চোখ খুলেই যেখানে কেউ দেখেনা সেখানে চোখ বন্ধ করে পৃথিবী দেখার এক আশ্চর্য ফলবতী চেষ্টা।মিসির আলীকে নিয়ে লেখলাম অবশ্যি আরো অনেক পরে।প্রথম লেখা উপন্যাস দেবী।মিসির আলী নামের অতি সাধারণ মোড়কে একজন অসাধারণ মানুষ তৈরির চেষ্টা প্রথম দেবী-তে করা হয়।মিসির আলী এমন একজন মানুষ যার কাছে প্রকৃতির নিয়ম- শৃংখলাই একমাত্র সত্য। রহস্যময়তার অস্পষ্ট জগৎ ইনি স্বীকার করেন না। সাধারণত যুক্তিবাদী মানুষ আবেগবর্জিত হন। যুক্তি এবং আবেগ পাশাপাশি চলতে পারে না।মিসির আলীর ব্যাপারে একটু ব্যতিক্রমের চেষ্টা করা হল।যুক্তি ও আবেগকে হাত ধরাধরি করে হাঁটতে দিলাম।

মিসির আলীকে নিয়ে আর কি লিখি।সবই তো মনে হয় লেখা হয়ে গেছে।একটা কথা না বললে লেখা অপূর্ণ থাকবে।কথাটা হলো- মিসির আলী আমার প্রিয় চরিত্রের একটা।তাকে নিয়ে লিখতে আমার সব সময়ই ভালো লাগে।এই নিঃসঙ্গ, হৃদয়বান,তীক্ষ্ণ ধীশক্তির মানুষটি আমাকে সব সময় অভিভূত করেন।যতক্ষণ লিখি, ততক্ষণই তার সঙ্গ পাই।বড় ভালো লাগে।

হিমু

হিমুর ভালো নাম হিমালয়।বাবা খুব আদর করে ছেলের নাম হিমালয় রাখলেন,যাতে ছেলের হৃদয় হিমালয়ের মত বড় হয়।আকাশ রাখতে পারতেন।আকাশ হিমালয়ের চেয়েও বড়, বিস্তৃত।আকাশ রাখলেন না।কারণ আকাশ স্পর্শ করা যায় না।হিমালয় স্পর্শ করা যায়।বাবা হিমালয়কে মহাপুরুষ বানাতে চেয়েছিলেন।তার ধারণা বিষয় ভিত্তিক পড়াশোনা করে যদি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বানানো যায়,তাহলে মহাপুরুষ যাবে না কেন?ট্রেনিং এ মহাপুরুষ কেন হবে না?তিনি ছেলেকে মহাপুরুষ বানানোর বিশেষ ট্রেনিং দেওয়া শুরু করলেন। হিমালয় কি মহাপুরুষ হল?না হয়নি।সে যা হয়েছে তা হচ্ছে – হিমু।

হিমুকে নিয়ে প্রথম লেখা ময়ূরাক্ষী। ময়ূরাক্ষীর পর দরজার ওপাশে – সর্বশেষ গ্রন্থের নাম -হিমু।আসলে হিমু কে?খুব সচেতন পাঠক চট করে হিমুকে চিনে ফেলবেন,কারণ হিমু হল মিসির আলীর উল্ট পিঠ। বিজ্ঞানের ভাষায় এন্টি মিসির আলী।হিমুর কাজ কর্ম রহস্যময় জগৎ নিয়ে।সে চলে এন্টি লজিকে।সে বেশিরভাগ সময়ই বাইরে বাইরে ঘুরে।রাত জেগে পথে পথে হাঁটে কিন্তু সেই সবচে বেশি অন্তর্মুখী।মিসির আলী চোখ বন্ধ করে পৃথিবী দেখেন।সে চোখ খোলা রাখে কিন্তু কিছুই দেখে না।

মিসির আলী দেখতে কেমন আমি যেমন জানি না,হিমু দেখতে কেমন তাও জানি না।কোন বইয়ে হিমুর চেহারার বর্ণনা নেই।যা আছে তাও খুব সামান্য।সে বর্ণনা থেকে চরিত্রের ছবি আঁকা যায় না।আমার নিজের মনে যে ছবিটা ভাসে তা হল- হাসি খুশি ধরনের একজন যুবকের ছবি।যে যুবকের মুখে আছে কিশোরের সারল্য।শুধু চোখ দুটি মিসির আলীর চোখের মতই তীক্ষ্ণ।তবে এই দুটি তীক্ষ্ণ চোখে কৌতুক ঝিকমিক করে।যেন সে সবকিছুতেই মজা পায়।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *