এই আমি পর্ব – ৯ হুমায়ূন আহমেদ

এই আমি পর্ব – ৯

এই অধ্যাপিকা আমাকে জানালেন, শেক্সপিয়ারের রোমিও জুলিয়েট বিয়োগান্তক লেখা।কিন্তু যখন রোমিও জুলিয়েট ছবি করা হল তখন নায়ক নায়িকার মিল দেখানো হল।আপনি কেন দেখাবেন না?আপনাকে দেখাতেই হবে।একি যন্ত্রণা !তবে এটা যন্ত্রণার শুধু শুরু।তবলার ঠুকঠাক।মূল বাদ্য শুরু হল নবম পর্ব প্রচারের পর।আমি দশ বছর ধরে টিভিতে নাটক লিখছি এই ব্যাপার আগে দেখিনি।পোষ্টার,মিটিং,মিছিল- হুমায়ূনের চামড়া তুলে নেব আমরা।রাতে ঘুমতে পারি না।দুটা তিনটাই টেলিফোন।

কিছু টেলিফোন তো রীতিমতো ভয়াবহ।বাকের ভাইয়ের কিছু হলে রাস্তায় লাশ পড়ে যাবে।আপাত দৃষ্টিতে এইসব কান্ড কারখানা আমার খারাপ লাগার কথা না।বরং ভালো লাগাই স্বাভাবিক।আমার একটি নাটক নিয়ে এতসব হচ্ছে এতে অহংবোধ তৃপ্তি হওয়ারই কথা। আমার তেমন ভালো লাগল না।আমার মনে হল একটা কিছু ব্যাপার আমি ধরতে পারছি।দর্শক রূপকথা দেখতে চাচ্ছে কেন?তারা কেন তাদের মতামত আমার উপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে?আমি কি লিখবসবা না লিখব সেটা তো আমি ঠিক করব।অন্য কেউ আমাকে বলৃ দেবৃ কেন?

বাকেরের মতো মানুষদের কি ফাঁসি হচ্ছে না? এ দেশে কি সাজানো মামলা হয় না? নিরপরাধ মানুষ কি ফাঁসির দড়িতে ঝুলে না? ঐ তো সেদিনই পত্রিকায় দেখলাম ৯০ বছর পর প্রমাণিত হল লোকটি নির্দোষ।অথচ হত্যার দায়ে ৪০ বছর আগেই তার ফাঁসি হয়ে গেছে।সাহিত্যের একটি প্রচলিত ধারা আছে যেখানে সত্যের জয় দেখানো হয়। অত্যাচারী মোড়ল শেষ পর্যায়ে এসে মৃত্যুবরণ করেন জাগ্রত জনতার কাছে।বাস্তব কিন্তু সেরকম নয়। বাস্তবে অধিকাংশ মোড়লরা মৃত্যুবরণ করেন না।বরং বেশ সুখে শান্তিতেই থাকেন।৭১-এর রাজাকাররা এখন কি খুব খারাপ আছেন?আমার তো মনে হয় না।কুত্তাওয়ালীরা মরেন না,তাদের কেউ মারতে পারে না। ক্ষমতাবান লোকদের নিয়ে তারা মচ্ছব বসায়। দূর থেকে আমাদের তারা নিয়ন্ত্রণ করে।

আমি আমার নাটকে কুত্তাওয়ালির প্রতি ঘৃণা তৈরি করতে চেয়েছি। তৈরি করেছিও। কুত্তিওয়ালীকে মেরে ফেলে কিন্তু সেই ঘৃণা আবারও কমিয়ে দিয়েছি। আমরা হাফ সেড়ে ভেবেছি-যাক দুষ্টু শাস্তি পেয়েছে।কিন্তু কুত্তিওয়ালী যদি বেঁচে থাকতো তাহলে আমাদের ঘৃণা থেমে যেত না।প্রবহমান থাকত। দর্শকরা এক ধরনের চাপ নিয়ে ঘুমতে যেতেন।আমার মূল উপন্যাসে কুত্তিওয়ালীর মৃত্যু হয়নি, উপন্যাসে হয়েছে।কেন হয়েছে? হয়েছে কারণ মানুষের দাবীর কাছে আমি মাথা নত করেছি। কেনই বা করব না? মানুষই তো সব।তাদের জন্যই তো আমার লেখালেখি।তাদের তীব্র আবেগকে আমি মূল্য দেব না তা তো হয় না।তবে তাদের আবেগকে মূল্য দিতে গিয়ে আমার কষ্ট হয়েছে।কারণ আমি জানি,আমি যা করেছি তা ভুল।

আমার লক্ষ্য মানুষের বিবেকের চাপ সৃষ্টি করা।সেই চাপ সৃষ্টি করতে হলে দেখাতে হবে যে কুত্তাওয়ালীর বেচে থাকা।মারা যায় বাকেররা।যে কারণে নাটকে কুত্তাওয়ালীর বেঁচে থাকা প্রয়োজন ছিল ঠিক সেই কারণেই বাকেরের মৃত্যুর প্রয়োজন ছিল।বাকেরের মৃত্যু না হলে আমি কিছুতেই দেখাতে পারতাম না যে এই সমাজে কত ভয়াবহ অন্যায় হয়।আপনাদের কি মনে আছে যে একজন মানুষ (?) পনেরো বছর জেলে ছিল যার কোনো বিচারই হয়নি। কোর্টে তার মামলাই ওঠেনি।ভিন দেশের কোনো কথা না। আমাদের দেশেরই কথা।ভয়াবহ অন্যায়গুলো আমরাই করি। আমাদের মতো মানুষরাই করে এবং করায়।কিছু কিছু মামলায় দেখা গেছে পুলিশ অন্যায় করে, পোস্টমর্টেম যে ডাক্তার করেন তিনি অন্যায় করেন, ধুরন্ধর উকিল করেন।রহিমের গামছা চলে যায় করিমের কাঁধে।

পত্রিকায় দেখলাম,১৮০ জন আইনজীবী আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন আমি নাকি এই নাটকে খারাপ উকিল দেখিয়ে তাদের মর্যাদাহানি করেছি।আমি ক্ষমা প্রার্থনা না করলে তারা আদালতের আশ্রয় নেবেন।উকিল সাহেবদের অতি বিনয়ের সঙ্গে বলছি,এই নাটকে একজন অসম্ভব ভালো উকিলও ছিলেন।মুনার উকিল। যিনি প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন সত্যি প্রতিষ্ঠার।একশত আশি জন আইনজীবী নিজেদেরকে সেই উকিলের সঙ্গে সম্পর্কিত না করে বদ উকিলের সঙ্গে করলেন কেন?

আমাদের সমাজে কি কুত্তাওয়ালীর উকিলের মত উকিল নেই?এমন আইনজীবী কি একজনও নেই যারা দিনকে রাত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন না? মিথ্যা সাক্ষী কি আইনজীবীদেরই কেউ কেউ তৈরী করে দেন না?যদি না দেন,তা হলে বিচারের বানী নিরবে নিভৃতে কেন কাঁদে? অতি অল্পতেই দেখা যাচ্ছে সবার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।আমরা কি করি না করি তাতে কিছু যায় আসে না।আমাদের ভাবমূর্তি বজায় থাকলেই হল। হায়রে ভাবমূর্তি !

আমি মনে হয় মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে যাচ্ছি।মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি।নাটকটির শেষ পর্যায়ে আমি টেলিভিশন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি আবেদন করলাম।শেষ পর্বের জন্য আমি দুই ঘন্টা সময় চাইলাম।আমার পরিকল্পনা ছিল প্রথম এক ঘন্টায় শুধু কোর্ট দেখাব,পরের এক ঘন্টা যাবে বাকি নাটক। কোর্ট দৃশ্যের পর পনেরো দিন অপেক্ষা করা দর্শকদের জন্য কষ্টকর,নাটকের জন্যও শুভ নয়।যে টেনশন কোর্ট দৃশ্য শুরু হবে,পনেরো দিনের বিরতিতে তা নিচে নেমে যাবে। টেনশন তৈরি করতে হবে আবার গোড়া থেকে।আমার বিশ্বাস ছিল টেলিভিশন আমার যুক্তি মেনে নিবে।

অতীতে আমার ‘অয়োময়’ নাটকের শেষ পর্বের জন্য দুঘন্টা সময় দেওয়া হয়েছিল।তাছাড়া আমার সবসময় মনে হয়েছে,টেলিভিশানের উপর আমার খানিকটা দাবী আছে।গত দশ বছরে টিভির জন্য তো কম সময় দেই নি।আবেদনে লাভ হলো না।টিভি জানিয়ে দিল-এই নাটকের জন্য বাড়তি সময় দেওয়া হবে না। দর্শকদের জন্য টিভি,টিভির জন্য দর্শক নয়-এই কথাটা টিভির কর্তাব্যক্তিরা কবে বুঝবেন কে জানে।আমি ৭০ মিনিটে গল্পের শেষ অংশ বলার প্রস্তুতি নিলাম।কোর্টের দৃশ্য, কুত্তাওয়ালীর হত্যার দৃশ্য,বাকেরের ফাঁসি সব এর মধ্যেই দেখাতে হবে।শুধু দেখালেই হবে না-সুন্দর করে দেখাতে হবে।দর্শকদের মনে জাগিয়ে তুলতে হবে গভীর বেদনাবোধ।

সন্ধ্যাবেলা হাত মুখ ধুয়ে লিখতে বসলাম,রাতে ভাত খেতে গেলাম না।পুরোটা এক বৈঠকে বসে শেষ করতে হবে।রাত তিনটায় লেখা শেষ হলো।আমি পড়তে দিলাম আমার স্ত্রী গুলতেকিনকে।সে বলল,তোমার কোনো একটা সমস্যা আছে। মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা।আমি লক্ষ করেছি তুমি অনেকখানি মমতা দিয়ে একটা চরিত্র তৈরি করো।তারপর তাকে মেরে ফেল।তুমি এই সবদিন রাত্রিতে টুনিকে মেরেছ।এবার মারলে বাকেরকে।আমি তাকে কোনো যুক্তি দিলাম না। ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।ঘুম হল না।আবার উঠে এসে বারান্দায় বসলাম অনেকদিন পর ভোর হওয়া দেখলাম। ভোরের প্রথম আলো মনের অস্পষ্টতা কাটাতে সাহায্য করে।আমার বেলাতেও করলো।আমার মন বলল,আমি যা করছি ঠিকই করছি।এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে বাকেরকে মারতেই হবে।

যে দিন নাটক প্রচারিত হবে তার আগের দিন রাতে দৈনিক বাংলার আমার সাংবাদিক বন্ধু হাসান হাফিজ ব্যস্ত হয়ে টেলিফোন করলেন। আমাকে বললেন,আগামীকাল প্রেসক্লাবের সামনে বাকের ভাইয়ের মুক্তির দাবিতে সমাবেশ হবে।সেখান থেকে তারা আপনার এবং বরকতউল্লাহ সাহেবের বাড়ি ঘেরাও করবে। পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে আপনি সরে যান।নিজের ঘরে বসে সবাইকে নিয়ে আমার নাটক দেখার অভ্যাস।এই প্রথমবার নাটক প্রচারের দিন বাড়ি ঘর ছেড়ে চলে যেতে হল।খবর নিয়ে জানলাম,বাড়ির সামনের রাস্তায় কয়েকটা ককটেল ফাটানো হয়েছে।রাগী কিছু ছেলে ঘোরাফেরা করছে।পুলিশ চলে এসেছে।বাসায় ফিরলাম রাত একটায়।দরজার ফাঁক দিয়ে কারা যেন দুটা চিঠি রেখে গেছে।

একটা চিঠিতে লেখা, বাকেরের যেভাবে মৃত্যু হলো আপনার মৃত্যুও সেভাবেই হবে।আমরা আপনাকে ক্ষমা করলেও আল্লাহ ক্ষমা করবেন না।রাত দুইটার সময় ধানমন্ডি থানার সাব ইন্সপেক্টার সাহেব আমাকে জানালেন,আপনি কোনো ভয় পাবেন না।আমরা আছি।প্রচণ্ড মাথার যন্ত্রণা নিয়ে রাতে ঘুমতে গেলাম।এপাশ ওপাশ করছি।কিছুতেই ঘুম আসছে না।আমার ছোট মেয়েটাও জেগে আছে।সেও ঘুমতে পারছে না।তার নাকি বাকের ভাইয়ের জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে।আমি মেয়েকে নিয়ে বারান্দায় এসে বসলাম।মেয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,বাবা তুমি ওনাকে কেন মেরে ফেললে?

আমি মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললাম,গল্পের একজন বাকের মারা গেছে যাতে সত্যিকারে বাকেররা কখনো মারা না যায়।কথাটা হয়তো আমার ক্লাস ফোরে পড়া মেয়ের জন্য একটু ভারী হয়ে গেল।ভারী হলেও এটাই আমার কথা।এই কথা নাটকের ভেতর দিয়ে যদি বুঝতে না পেরে থাকি তবে তা আমার ব্যর্থতা। আমি আমার সীমাবদ্ধ ক্ষমতা দিয়ে চেষ্টা করেছি। আমার চেষ্টার কোনো খাদ ছিল না।এইটুকু আমি আপনাদের বলতে চাই।বাকেরের মৃত্যুতে আপনারা যেমন ব্যথিত আমিও ব্যথিত।আমার ব্যাথা আপনাদের ব্যাথার চেয়েও অনেক অনেক তীব্র।

বিজ্ঞানী ডঃ ফ্রাংকেনস্টাইন নিজের তৈরি দানবটাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন।কিন্তু তার আগে নিজেই ধ্বংস হলেন নিজের সৃষ্টির হাতে।আমি বেঁচে আছি।কিন্তু বাকের নামের একটি চরিত্রও তৈরি করেছিলাম।আজ সে নেই।মুনা আছে,সে কোনো দিনই বাকেরকে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে পারবে না।মুনার এই কষ্ট আমি বুকে ধারণ করে আছি।আপনারা ভুলে যাবেন। আমি তো ভুলবো না।আমাকে বেঁচে থাকতে হবে মুনার কষ্ট হৃদয়ে ধারণ করে।

আলাউদ্দিন নামে আমার নানাজানের একজন কমলা ছিল। তাকে ডাকা হতো আলাদ্দি। কামলাশ্রেণীর লোকদের পুরো নামে ডাকার চল ছিল না। পুরো নাম ভদ্রলোকদের জন্যে। এদের আবার নাম কী? একটা কিছু ডাকলেই হলো। ‘আলাদ্দি’ যে ডাকা হচ্ছে এই-ই যথেষ্ট।আলাউদ্দিনের গায়ের রঙ ছিল কুচকুচে কালো। এমন ঘন কৃষ্ণবর্ণ সচরাচর দেখা যায় না। মাথাভর্তি ছিল বাবরি চুল। তার চুলের যত্ন ছিল দেখার মতো। জবজবে করে তেল মেখে মাথাটাকে সে চকচকে রাখত। আমাকে সে একবার কানে কানে বলল, বুঝলা ভাইগ্না ব্যাটা, মানুষের পরিচয় হইল চুলে। যার চুল ঠিক তার সব ঠিক।

কামলাদের মধ্যে আলাউদ্দিন ছিল মহা ফাঁকিবাজ। কোনো কাজে তাকে পাওয়া যেত না। শীতের সময় গ্রামে যাত্রা বা গানের দল আসত, তখন সে অবধারিতভাবে গানের দলের সঙ্গে চলে যেত। মাসখানিক তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যেত না। অথচ শীতের মরশুম হচ্ছে আসল কাজের সময়। এমন ফাঁকিবাজকে কেউ জেনে-শুনে কামলী নেবে না। নানাজান নিতেন, কারণ তার। উপায় ছিল না। আলাউদ্দিন বৈশাখ মাসের শুরুতে পরিষ্কার জামাকাপড় পরে। চোখে সুরমা দিয়ে উপস্থিত হতো। নানাজানের পা ছুঁয়ে সালাম করে তৃপ্ত গলায় বলত, মামুজী, দাখিল হইলাম।নানাজান চেঁচিয়ে বলতেন, যা হারামজাদা, ভাগ।আলাউদ্দিন উদাস গলায় বলত, ভাইগ্যা যামু কই?

আল্লাপাক কি আমার যাওনের জায়গা রাখছে? রাখে নাই। তার উপরে একটা নয়ন নাই। নয়ন দুইটা ঠিক থাকলে হাঁটা দিতাম। অফমান আর সহ্য হয় না।এর ওপর কথা চলে না। তাকে আবারো এক বছরের জন্যে রাখা হতো। বারবার সাবধান করে দেয়া হতো যেন গানের দলের সঙ্গে পালিয়ে না যায়। সে আল্লার নামে, পাক কোরানের নামে, নবীজীর নামে কসম কাটত আর যাবে না।মামুজী, আর যদি যাই তাইলে আপনের গু খাই।সবই কথার কথা। গানের দলের সঙ্গে তার গৃহত্যাগ ছিল নিয়তির মতো। ফেরানোর উপায় নেই। নানাজান তা ভালোমতোই জানতেন। বড় সংসারে অকর্মা কিছু লোক থাকেই। এদের উপদ্রব সহ্য করতেই হয়।

আলাউদ্দিনের সঙ্গে আমার পরিচয় নানার বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে। আমরা থাকতাম শহরে। বাবা ছুটিছাটায় আমাদের নানার বাড়ি নিয়ে যেতেন। আমরা অল্প কিছুদিন থাকতাম। এই সময়টা সে আমাদের সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে থাকত। রাতে গল্প শোনাত। সবই তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্প। তার চেয়েও যা মজার তী হলো, তার প্রতিটি গল্পের শুরু চান্নিপসর রাইতে।বুঝলা ভাইগ্না ব্যাটা, সেইটা ছেল চান্নিপসর রাইত। আহারে কী চান্নি। আসমান যেন ফাইট্যা টুকরা টুকরা হইয়া গেছে। শইলের লোম দেহা যায় এমুন চান্দের তেজ।

সাধারণত ভূত-প্রেতের গল্পে অমাবস্যার রাত থাকে। গল্পের পরিবেশ সৃষ্টির জন্যে অন্ধকার রাতের দরকার হয়। কিন্তু আলাউদ্দিনের ভূতগুলিও বের হয় চান্নিপসর রাতে। যখন সে বাঘের গল্প বলে, তখন দেখা যায় তার বাঘও চান্নিপসর রাতে পানি খেতে বের হয়।ছোটবেলায় আমার ধারণা হয়েছিল, এটা তার মুদ্রাদোষ। গল্পে পরিবেশ তৈরির এই একটি কৌশলই সে জানে। দুর্বল গল্পকারের মতো একই টেকনিক সে বারবার ব্যবহার করে। একটু যখন বয়স হলো তখন বুঝলাম চাঁদনিপসর রাত আলাউদ্দিনের অত্যন্ত প্রিয়। প্রিয় বলেই এই প্রসঙ্গে সে বারবার ফিরে আসে। সবকিছুই সে বিচার করতে চায় চান্নিপসর রাতের আলোকে। একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করি। নানাজানদের গ্রামের স্কুলের সাহায্যের জন্য একটা গানের আসর হলো।

কেন্দুয়া থেকে দু’জন বিখ্যাত বয়াতী আনা হলো। হ্যাজাক লাইট-টাইট জ্বালিয়ে বিরাট ব্যাপার। গান হলো খুব সুন্দর। সবাই মুগ্ধ। শুধু আলাউদ্দিন দুঃখিত গলায় জনে জনে বলে বেড়াতে লাগল, হ্যাজাক বাত্তি দিয়া কি আর গান হয়? এই গান হওয়া উচিত ছিল চান্নিপসর রাইতে। বিরাট বেকুবি হইছে।সৌন্দর্য আবিষ্কার ও উপলব্ধির জন্যে উন্নত চেতনার প্রয়োজন। তাহলে কি ধরে নিতে হবে আমাদের আলাউদ্দিন উন্নত চেতনার অধিকারী ছিল? যে সৌন্দর্যের উপাসক সে সবকিছুতেই সৌন্দর্য খুঁজে পায়। আলাউদ্দিন তো তা পায় নি। তার সৌন্দর্যবোধ চান্নিপসর রাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। এমন তো হবার কথা না।

মনোবিজ্ঞানীরা হয়তো আলাউদ্দিনের জোছনা-প্রীতির অন্য ব্যাখ্যা দেবেন। তারা বলবেন, এই লোকের অন্ধকার-ভীতি আছে। চাঁদের আলোর জন্যে তার এই আকুলতার পেছনে আছে তার আঁধার-ভীতি, Dark Fobia. যে যাই বলুন, আমাকে জোছনা দেখাতে শিখিয়েছে আলাউদ্দিন। রূপ শুধু দেখলেই হয় না, তীব্র অনুভূতি নিয়ে দেখতে হয়। এই পরম সত্য আমি জানতে পারি মহামূর্খ বলে পরিচিত বোকাসোকা একজন মানুষের কাছে। আমার মনে আছে, সে আমাকে এক জোছনা রাতে নৌকা করে বড় গাঙে নিয়ে গেল। যাবার পথে ফিসফিস করে বলল, চান্নিপসর দেখন লাগে পানির উফরে, বুঝলা ভাইগ্নী ব্যাটা। পানির উফরে চান্নির খেলাই অন্যরকম।

সেবার নদীর ওপর চাঁদের ছায়া দেখে তেমন অভিভূত হই নি, বরং নৌকা ডুবে যাবে কি-না এই ভয়েই অস্থির হয়েছিলাম। কারণ নৌকা ছিল ফুটো, গলগল করে তলা দিয়ে পানি ঢুকছিল। ভীত গলায় আমি বললাম, পানি ঢুকছে মামা।আরে থও ফালাইয়া পানি, চান্নি কেমন হেইডা কও।খুব সুন্দর।খাইয়া ফেলতে মনে লয় না কও দেহি? জোছনা খেয়ে ফেলার তেমন কোনো ইচ্ছা হচ্ছিল না, তবু তাকে খুশি করার জন্যে বললাম, হ্যাঁ। আলাউদ্দিন মহাখুশি হয়ে বলল, আও, তাইলে চান্নিপসর। খাই। বলেই সে আকাশের দিকে তাকিয়ে চাঁদের আলো খাওয়ার ভঙ্গি করতে লাগল। সে এক বিচিত্র দৃশ্য। আমি আমার একটি উপন্যাসে (অচিনপুর) এই দৃশ্য ব্যবহার করেছি। উপন্যাসের একটি চরিত্র নবু মামা জোছনা খেত।

আলাউদ্দিন যে একজন বিচিত্র মানুষ ছিল তা তার আশেপাশের কেউ ধরতে পারে নি। সে পরিচিত ছিল অকর্মা বেকুব হিসেবে। তার জোছনা-প্রীতিও অন্যকেউ লক্ষ করেছে বলে মনে হয় না। তার ব্যাপারে সবাই আগ্রহী হলো যখন সে এক শীতে গানের দলের সঙ্গে চলে গেল, এবং ফিরে এল এক রূপবতী তরুণীকে নিয়ে। তরুণীর নাম দুলারী। তার রূপ চোখ-ঝলসানো রূপ।নানাজী গম্ভীর গলায় বললেন, এই মেয়ে কে? আলাউদ্দিন মাথা চুলকে বলল, বিবাহ করেছি মামুজী। বয়স হইছে। সংসারধর্ম করা লাগে। নবীজী সবেরে সংসারধর্ম করতে বলছেন।সেইটা বুঝলাম। কিন্তু এই মেয়ে কে? হেইটা মামুজী এক বিরাট ইতিহাস।ইতিহাসটা শুনি।ইতিহাস শুনে নানাজান গম্ভীর হয়ে গেলেন। শুকনো গলায় বললেন, এরে নিয়া বিদায় হ! আমার বাড়িতে জায়গা নাই। 

আলাউদ্দিন স্টেশনের কাছে ছাপড়া ঘর তুলে বাস করতে লাগল। ট্রেনের টাইমে স্টেশনে চলে আসে, কুলিগিরি করে। ছোটখাটো চুরিতেও সে অভ্যস্ত হয়ে পড়ল। থানাওয়ালারা প্রায়ই তাকে ধরে নিয়ে যায়। তার বৌ নানাজানের কাছে ছুটে আসে। নানাজান বিরক্তমুখে তাকে ছাড়িয়ে আনতে যান। নিজের মনে গজগজ করেন, এই যন্ত্রণা আর সহ্য হয় না।নানাজানকে যন্ত্রণা বেশিদিন সহ্য করতে হলো না। আলাউদ্দিনের বৌ এক শীতে এসেছিল, আরেক শীতের আগেই মারা গেল। আলাউদ্দিন স্ত্রীর লাশ কবরে নামিয়ে নানাজানকে এসে কদমবুসি করে ক্ষীণগলায় বলল, দাখিল হইলাম মামুজী।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *