এই আমি শেষ – পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

এই আমি শেষ – পর্ব

বছর পাঁচেক পরের কথা। আমার দেশের বাইরে যাওয়া ঠিক হয়েছে। আমি সবার কাছ থেকে বিদায় নেবার জন্যে নানার বাড়ি দিয়ে দেখি, আলাউদ্দিনের অবস্থা খুব খারাপ। শরীর ভেঙে পড়েছে। মাথাও সম্ভবত খানিকটা খারাপ হয়েছে। দিনরাত উঠোনে বসে পাটের দড়ি পাকায়। দড়ির সঙ্গে বিড়বিড় করে কথা বলে। খুবই উচ্চশ্রেণীর দার্শনিক কথাবার্তা। তার একটি চোখ আগেই নষ্ট ছিল। দ্বিতীয়টিতেও ছানি পড়েছে। কিছু দেখে বলে মনে হয় না। চোখে না। দেখলেও সে চান্নিপসর সম্পর্কে এখনো খুব সজাগ। এক সন্ধ্যায় হাসিমুখে আমাকে বলল, ও ভাইগ্না ব্যাটা, আইজ যে পুরা চান্নি হেই খিয়াল আছে? চান্নি দেখতে যাবা না? যত পার দেইখ্যা লও। এই জিনিস বেহেশতেও পাইবা না।

সেই আমার আলাউদ্দিনের সঙ্গে শেষ চাঁদনি দেখতে যাওয়া। সে আমাকে মাইল তিনেক হটিয়ে একটা বিলের কাছে নিয়ে এল। বিলের ওপর চানি নাকি অপূর্ব জিনিস। আমাদের চান্নি দেখা হলো না। আকাশ ছিল ঘন মেঘে ঢাকা। মেঘ কাটল না। একসময় টুপটুপ করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। আলাউদ্দিন দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলল, চান্নি আমরার ভাগ্যে নাই। ভাগ্য খুব বড় ব্যাপার ভাইগ্না ব্যাটা। ভাগ্যে না থাকলে হয় না।

আমরা ভিজতে ভিজতে ফিরছি। আলাউদ্দিন নিচুস্বরে কথা বলে যাচ্ছে, ভাগ্যবান মানুষ এই জীবনে একজন দেখছি। তোমার মামির কথা বলতেছি। নাম ছিল দুলারী। তার মরণ হইলে চান্নিপসর রাইতে। কী চান্নি যে নামল ভাইগ্না! না দেখলে বিশ্বাস করবা না। শইল্যের সব লোম দেহা যায় এমন পসর। চান্নিপসরে মরণ তো সহজে হয় না। বেশির ভাগ মানুষ মরে দিনে। বাকিগুলো মরে অমাবস্যায়। তোমার মামির মতো দুই-একজন ভাগ্যবতী মরে চান্নিপসরে। জানি না আল্লাপাক আমার কপালে কী রাখছে। চান্নিপসরে মরণের বড় ইচ্ছা।আলাউদ্দিনের মৃত্যুর খবর আমি পাই আমেরিকায়। তার মরণ চাঁদনিপসরে হয়েছিল কি-না তা চিঠিতে লেখা ছিল না, থাকার কথাও নয়। কার কী যায় আসে তার মৃত্যুতে?

রাত দশটার দিকে হঠাৎ করেই গাড়ি নিয়ে বের হলাম। পেছনের সিটে বড় মেয়ে নোভাকে শুইয়ে দিয়েছি। গাড়ি চলছে উল্কার বেগে। নোভা অবাক হয়ে বলল, আমরা যাচ্ছি কোথায়? আমি হাসতে হাসতে বললাম, মন্টানার দিকে। মন্টানার জঙ্গলে জোছনা দেখব। সে যে কী সুন্দর দৃশ্য তুমি না দেখলে বিশ্বাস করবে না।গাড়ির ক্যাসেট চালু করে দিয়েছি। গান হচ্ছে—‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে’। আমার কেন জানি মনে হলো, আলাউদ্দিন আমার কাছেই আছে। গাড়ির পেছনের সিটে আমার বড়মেয়ের পাশে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। গভীর আগ্রহ ও আনন্দ নিয়ে সে আমার কাণ্ডকারখানা লক্ষ করছে।

ভদ্রলোকের বয়স সত্তুরের মত। মাথার চুল টকটকে লাল।মাথার লাল চুলের জন্যই হয়তো তাকে রাগী রাগী দেখাচ্ছে।তাছাড়া কোমরের মাংশপেশিতে টান পড়ায় তিনি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছেন না। বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ভঙ্গিটা অনেকটা সাপের ফণা তোলার মত।যেন এক্ষুনি ছোবল দেবেন। আমি বললাম, আসসালামুয়ালাইকুম।তিনি বললেন,হুঁ।সালামের উত্তরে সালাম দেওয়াটাই প্রচলিত বিধি। তিনি হুঁ বলে এড়িয়ে গেলেন।তবে অধ্যায়ন বা শিষ্টতার কোনো অভাব হল না। আমাকে হাত ধরে বসালেন। কাজের ছেলেকে চা দিতে বললেন।

আমার কাছে মনে হলো ভদ্রলোক অসুস্থ।তার চুল যেমন লাল চোখ দুটোও লাল।খুব ঘন ঘন চোখের পাতা ফেলছেন।আমি এত দ্রুত কাউকে চোখের পাতা ফেলতে দেখি নি। বয়স বাড়লে মানুষ ঘন ঘন পাতা ফেলে কি না তাও লক্ষ করিনি। আমি কিছু জিঙ্গাসা করার আগেই ভদ্রলোক বললেন,আমার চোখে সমস্যা আছে। চোখে অশ্রুগ্রন্থি বলে কিছু ব্যাপার আছে। সেখান থেকে জলীয় পদার্থ বের হয়ে সব সময় চোখ ভিজিয়ে রাখে। আমার ঐসব গ্রন্থি নষ্ট হয়ে গেছে।আমি বললাম,আপনার চুল এতো লাল কেন?

উনি বললেন,রং দিয়ে লাল করেছি।মেন্দী পাতা এবং কাঁচা হলুদের সঙ্গে সামান্য থানকুনি পাতা বেটে মিশিয়ে একটা পেষ্টের মতো তৈরী করে চলে মাখলেই চুল এমন লাল হয়।আপনি যখন আমার মতো বুড়ো হবেন,মাথার চুল সব পেকে যাবে,তখন মাথায় রং ব্যবহার করতে পারেন।মাথায় রং ব্যবহার করা ইসলাম ধর্মে নিষেধ নয়। নবী-এ-করিমের হাদিস আছে।তিনি খেজাব ব্যবহার করার পক্ষে মত দিয়েছেন। খেজাব হচ্ছে এক ধরনের রং যা চুলে লাগানো হয়।ও আচ্ছা।মাথা ভর্তি সাদা চুল আমার পছন্দ না।সাদা চুল হল ঙাইটএ লৈঅগ যা মনে করিয়ে দেয় খেলা শেষ হয়ে গেছে।তৈরী হয়ে নাও।দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি,বেলা শেষ প্রহর।

আপনি তৈরী হতে চাচ্ছে না!তৈরী তো হয়েই আছি।শাদা ফ্ল্যাগ উড়িয়ে সবাইকে জানতে চাচ্ছি না।ভদ্রলোক বাড়ি প্রকান্ড।বেশির ভাগ প্রকান্ড বাড়ির মতো এ বাড়িটিও খালি।তার দুই মেয়ে।দুজনৃরই বিয়ে হয়ে গিয়েছে।তারা স্বামীর সঙ্গে বাইরে থাকে।পত্নী বিয়োগ হয়েছে চার বছর আগে। এগারো কামরার বিশাল বাড়িতে ভদ্রলোক কিছু কাজের লোকজন নিয়ে থাকেন।পুরোপুরি নিঃসঙ্গ মানুষেরা নানান ধরনের জটিলতায় ভুগেন।বিচিত্র সব কাজ কর্মে তারা থাকতে চেষ্টা করেন। সঙ্গী হিসেবে এরা কখনোই খুব ভালো হয় না।কারণ তারাই সঙ্গী হিসাবে কেউকে গ্রহণ করতে চান না।

এই ভদ্রলোক ও তার ব্যতিক্রম নন।তাকে দেখলাম এক জায়গায় বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারছেন না।জায়গা বদল করছেন।এবং কিছুক্ষণ পরপর ঘরের ছাদের দিকে ভ্রু কুচকে তাকাচ্ছেন।ভাবটা এ রকম যেন ঘরের ছাদটা কিছুক্ষণের মধ্যে ভেঙে তার মাথায় পড়ে যাবে।আমি যে কাজের জন্য এসেছিলাম সেই কাজ সারলাম। ভদ্রলোকের ছোট মেয়ের স্বামীর ঠিকানা দরকার ছিল।তিনি ঠিকানা দিতে পারছেন না,তবে টেলিফোন নম্বর দিলেন।আমি চা খেয়ে উঠে যাচ্ছি,তিনি বললেন,আহা,বসুন না।বসুন। অল্পক্ষণ বসুন।গল্প করুন।

নিঃসঙ্গ একজন বৃদ্ধের অনুরোধ এড়ানো মুশকিল।আমি বসলাম,কিন্তু কি বলব ভেবে পেলাম না।এই বয়সের মানুষ কি ধরনের গল্প পছন্দ করে?পরকালের গল্প?ধর্ম?আমি জানি একটা বিশেষ বয়সের পর মানুষজন ঘোর আস্তিক হয়ে যায়।কঠিনভাবে ধর্মকর্ম পালন করে। ধর্মের কথা শুনতে ভালোবাসে।মৃত্যুতেই সব শেষ না।মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকার সম্ভাবনাই তাদের জন্য মৃত্যু নামক অমোঘ বিধান মেনে নিতে সাহায্য করে।আমি বললাম,আপনি বলুন আমি শুনি।পরকাল সম্বন্ধে বলুন।মৃত্যুর পর কি হবে? তিনি চোখ টিপটিপ করে বললেন,মৃত্যুর পর কি হবে মানে?কিছুই হবে না।শরীর পচে গলে যাবে। শরীরের যে ফান্ডামেন্টাল পার্টিকেলস আছে- প্রোটন,নিউট্রন,ইলেক্ট্রন এরা ছড়িয়ে প ড়বে চারিদিকে। ফান্ডামেন্টাল পার্টিকেলসের ক্ষয় নেই।কাজেই এদেরও ক্ষয় নেই।আপনি কি ধর্ম-টর্ম বিশ্বাস করেন না?

তিনি উত্তরে এমন সব কথা বলতে লাগলেন যা শুনলে ঘোর নাস্তিকরাও  নড়ে চড়ে বসবে এবং বলবে -বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।এতো বাড়াবাড়ি ভালো না। সালমান রুশদী তার কাছে কিছুই না।একটু আগে যিনি নবীজির খেজাব ব্যবহারের হাদিস দিলেন সেই তিনিই তার সম্পর্কে এমন সব উক্তি করতে লাগলেন যা শুনলে নিরীহ টাইপের মুসলমানরাও চাকু হাতে তার পায়ের রগ খুঁজতে বের হয়ে যাবে।এই আলোচনা আমার তেমন পছন্দ হচ্ছিলোনা। আরবের মরুভূমির একজন নিরক্ষর ধর্মপ্রচারক হয়েও যিনি সেই সময়কার ভয়ংকর আইয়ামে জাহেলিয়াত লোকজনদের মন মানসিকতাই শুধু পরিবর্তন করেননি সারা পৃথিবীতে এই ধর্মের বানী ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁকে তুচ্ছ করা ঠিক না।সমাজে অবিশ্বাস তো থাকতেই পারে।

অবিশ্বাসীদের যে কুৎসা ছড়াতে হবে তা তো না।আমি লক্ষ্য করেছি, অবিশ্বাসীরা কুৎসা ছড়ানো তাদের পবিত্র কর্তব্য বলে মনে করেন।বছর দু-এক আগে যিশু খ্রিস্ট সম্পর্কে জনৈক আমেরিকান স্কানার(?)-এর একটা লেখা পড়েছিলাম,যাতে তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে,যিশু খ্রিস্ট ছিলেন একজন হমোসেক্সচুয়াল।আমি লালচুল এই ভদ্রলোকের সঙ্গে তর্কে যেতে পারতাম।ইচ্ছা করলো না।তার চেয়ে বড় কথা,ধর্ম সম্পর্কে আমার পড়াশোনাও তেমন নেই। ভদ্রলোকের দেখলাম পড়াশোনা ব্যাপক।কোরআন শরীফ থেকে মূল আরবী এবং সেখান থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ যেভাবে স্মৃতি থেকে বের করতে লাগলেন তা আমার মতো মানুষকে ভড়কে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে,আমার ওঠা দরকার।উসখূস করছি। ভদ্রলোক সে উৎসাহের সঙ্গে কথা বলছেন তাতে তাকে থামাতেও মন সায় দিচ্ছে না।তিনি এর মধ্যে চায়ের কথা বলেছেন। আমি তাতেও আগ্রহ বোধ করছি না।এ বাড়িতে কাজের মানুষ চা বানানো এখনো শিখেনি।আগের চা টা দু চুমুক দিয়ে রেখে দিয়েছি।নতুন চা এর চেয়ে ভালো হবে এই আশা করা বৃথা।এমন সময় এক কান্ড হলো,লালচুল ভদ্রলোক হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,একটু বসুন।মাগরেবের নামাজের সময় হয়েছে। নামাজটা শেষ করে আসি। মাগরেবের নামাজের জন্য নির্ধারিত সময় আবার অল্প।আমি মনে মনে বললাম -হলি কান্ড।

ভদ্রলোক নামাজ পড়ার জন্য সময় বেশি নিলেন না।কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে এসে বসলেন। হাসিমুখে বললেন,সরি আপনাকে বসিয়ে রাখলাম।তাহলে আবার ডিসকাশন শুরু করা যাক-তিনি আবারও কথা বলা শুরু করলেন।কথার মূল বিষয় হচ্ছে -ধর্ম মানুষের তৈরি, আল্লাহ মানুষ তৈরি করেননি।মানুষই আল্লাহ,তৈরী করেছে।আমি বললাম,আপনি ঘোর নাস্তিক।কিন্তু একটু আগে নামাজ পড়তে দেখলাম।নামাজ পড়েন।হ্যাঁ পড়ি।গত পঁচিশ বছর যাবত পড়ছি।খুব কমই নামাজ ক্বাজা হয়েছে।রোজাও রাখেন? অবশ্যই।পঁচিশ বছর ধরে রাখছেন?

হবে,তবে দুবার রাখতে পারিনি।একবার গল ব্ল্যাডারের জন্য অপারেশন হল তখন,আরেকবার হার্নিয়া অপারেশনের সময়।দুটাই পড়ে গেল রমজান মাসে।ঘোর নাস্তিক একজন মানুষ নামাজ রোজা পড়ছেন এটা আপনি ব্যাখ্যা করবেন কিভাবে?আপনি তো মন থেকে কিছু বিশ্বাস করছেন না। অভ্যাসের মতো করে যাচ্ছেন।তাই না-কি !ভদ্রলোক জবাব দিলেন না।আমি বললাম নাকি আপনার মনে সামান্য তম হলেও সংশয় আছে?

না আমার মনে কোনো সংশয় নেই।আমার নামাজ রোজার পেছনে একটা গল্প আছে।শুনতে চাইলে বলতে পারি।বলুন।আমি জজীয়তি করতাম।তখন আমি বরিশালের সেসান ও দায়রা জর্জ।আমি কঠিন প্রকৃতির মানুষ।খানিকটা বোধহয় নির্দয়।অপরাধ প্রমাণিত হলে কম শাস্তি দেওয়ার মানসিকতা আমার ছিল না।অপরাধ করেছে শাস্তি ভোগ করবে।এই আমার নীতি।দয়া যদি কেউ দেখাতে চায় তাহলে আল্লাহ বলে যদি কেউ থাকে সে দেখাবে। আল্লাহ দয়ালু।আমি দয়ালু নই।

এই সময় আমার কোর্টে একটা মামলা এলো।খুনের মামলা।সাত বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে খুন হয়েছে।পাশের বাড়ির ভদ্রমহিলা মেয়েটিকে ডেকে নিয়ে গেছে,তারপর সে আর তার স্বামী মিলে দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে।জমিজমা নিয়ে শত্রুতার জের।সাক্ষ্য প্রমাণ সবই আছে। আমার মনটা খারাপ হল! শত্রুতা থাকতে পারে। তার জন্য বাচ্চা একটা মেয়ে কেন প্রাণ হারাবে? মেয়েটার বাবা সাক্ষ্য দিতে এসে কাঁদতে কাঁদতে কাঠগড়াতে অজ্ঞান হয়ে গেল।

মামলা বেশি দিন চলল না।আমি মামলার রায় দেওয়ার দিন ঠিক করলাম।যেদিন রায় হবে তার আগের রাতে রায় লিখলাম।সময় লাগল। হত্যার মামলার রায় খুব সাবধানে লিখতে হয়।এমনভাবে লিখতে হয় যেন আপিল হলে রায় না পাল্টায়।আমি মৃত্যুদন্ড দেব, আপিলে তা খারিজ হয়ে যাবে,তা হয় না।আমি স্বামীকে মৃত্যুদন্ড দিলাম।তার স্ত্রীকেও মৃত্যুদন্ড দেবার ইচ্ছা ছিল।এই মহিলাই বাচ্চা মেয়েটিকে ডেকে নিয়ে এসেছে।প্রধান আসামি সে। আইনের হাত সবার জন্য সমান হলেও মেয়েদের ব্যাপারে কিছু নমনীয় থাকে।আমি মহিলাকে দিলাম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

রায় লেখা শেষ হল রাত তিনটার দিকে।আমি হাত মুখ ধুয়ে নিজেই লেবুর শরবত বানিয়ে খেলাম।খুব ক্লান্ত ছিলাম। বিছানায় শোয়া মাত্র ঘুমিয়ে পড়লাম। গভীর ঘুম।এমন গাঢ় নিদ্রা আমার এর আগে কখনো হয়নি।আমি একটা স্বপ্ন দেখলাম।স্বপ্নের অংশটি মন দিয়ে শুনুন। স্বপ্নে দেখলাম ৭/৮ বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে।কোঁকড়ানো চুল।মেয়েটি আমার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।সে তার নাম-টাম কিছুই বলল না।কিন্তু মেয়েটিকে দেখেই বুঝলাম -এ হল সেই মেয়ে যার হত্যার জন্য আমি রায় লিখেছি।একজনের ফাঁসি এবং অন্যজনের যাবজ্জীবন।আমি বললাম,কি খুকী,ভালো আছ?

মেয়েটি বলল, হুঁ।

কিছু বলবে খুকী?

হুঁ।

বল।

মেয়েটি খুব স্পষ্ট করে বলল,আপনি ভুল বিচার করেছেন।এরা আমাকে মারেনি।মেরেছে আমার বাবা।বাবা দা দিয়ে কুপিয়ে আমাকে মেরে দা টা ওদের খড়ের গাদায় লুকিয়ে রেখেছি।যাতে ওদেরকে মামলায় জড়ানো যায়।ওদের শাস্তি দেওয়া যায়।আমাকে মেরে বাবা ওদের শাস্তি দিতে চায়।তুমি এসব কি বলছো?অন্যকে শাস্তি দেওয়ার জন্য কেউ নিজের মেয়েকে মারবে?

মেয়েটি জবাব দিল না।সে তার ফ্রকের কোণা দিয়ে চোখ মুছতে লাগলো।আমার স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল।দেখলাম ভোর প্রায় হচ্ছে।কিছুক্ষণের মধ্যে ফজরের আযান হল।আমি রান্নাঘরে ঢুকে নিজেই এক কাপ চা বানিয়ে খেলাম।স্বপ্নের ব্যাপারটিকে তেমন গুরুত্ব দিলাম না।স্বপ্ন গুরুত্ব দেয়ার মত কোন বিষয় না। দুশ্চিন্তা,উদ্বেগ এইসবই স্বপ্ন হয়ে দেখা দেয়।আমি মামলাটা নিয়ে অনেক চিন্তা ভাবনা করেছি।স্বপ্ন হচ্ছে সেই চিন্তারই ফসল।আর কিছু না।স্বপ্নের উপর নির্ভর করে বিচার চলে না।রায় নিয়ে কোর্টে গেলাম।কোর্ট ভর্তি মানুষ।সবাই এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় শুনতে চায়।

রায় প্রায় পড়তেই যাচ্ছিলাম হটাৎ কি মনে হল- বলে বললাম,এই মামলার তদন্তে আমি সন্তুষ্ট নই। আবার তদন্তের নির্দেশ দিচ্ছি।কোর্টে বিরাট হৈচৈ হলো। আমি কোর্ট এডজর্নড করে বাসায় চলে এলাম।আমার কিছু বদনামও হল।কেউ কেউ বলতে লাগল।আমি টাকা খেয়েছি।আমি নিজে আমার দূর্বলতার জন্যে মানসিকভাবে খানিকটা বিপর্যস্তও হলাম।আমার মত মানুষ স্বপ্নের মতো অতি তুচ্ছ একটা ব্যাপার দ্বারা প্রচালিত হবে,তা হতে পারে না।আমার উচিত জজীয়তি ছেড়ে দিয়ে আলুর ব্যবসা করা।

যাই হোক,সেই মামলার পুনঃ তদন্ত হল। আশ্চর্যের ব্যাপার,মেয়েটির বাবা নিজেই হত্যাপরাধ স্বীকার করল।এবং আদালতের কাছে শাস্তি প্রার্থনা করল।আমি তার ফাঁসির হুকুম দিলাম। বরিশাল সেন্টার জেলে ফাঁসি কার্যকর হল।ঘটনার পর আমার মধ্যে সংশয় ঢুকে গেল।তাহলে পরকাল বলে কিছু আছে? মৃত্যুর পর আরেকটি জগত আছে?ঘোর অবিশ্বাস নিয়ে ধর্মগ্রন্থ পাঠ করা শুরু করলাম।নামাজ রোজা আরম্ভ হল।আশা ছিল,এতে আমার সংশয় দূর হবে।যতই পড়ি ততই আমার সংশয় বাড়ে।ততই মনে হয় God is created by man. তারপর নামাজ পড়ি এবং প্রার্থনা করি -বলি হে মহাশক্তি,তুমি আমার সংশয় দূর কর। কিন্তু এই সংশ য় দূর হবার নয়।

কেন ন য়?

কারণ আমাদের পবিত্র গ্রন্থে আছে -সূরা বাকারার সপ্তম অধ্যায়ে বলা আছে-

Allah hath set a seal

On their hearts and on their hearing

And their eyes is a veil

আল্লাহ তাদের হৃদয় এবং শ্রবণেন্দ্রিয়কে ঢেকে দিয়েছেন,

এবং টেনে দিয়েছেন চোখের উপর পর্দা।

আমি তাদেরই একজন।আমি বিদায় নেওয়ার জন্য উঠলাম।তিনি আমাকে বাড়ির গেট পযর্ন্ত এগিয়ে দিলেন।আমি বললাম,আপনি আসছেন কেন?আপনি আসবেন না।তিনি মুখ কুচকে বললেন,আমাদের নবীর একটা হাদীস আছে।নবীজী বলেছেন-কোনো অতিথি এলে তাঁকে বিদাইয়ের সময় বাড়ির গেট পযর্ন্ত এগিয়ে দিও।এই বলে তিনি বিড়বিড় করে নবী সম্পর্কে অত্যন্ত আপত্তিকর কিছু কথা বলে বাড়ির দিকে রওনা হলেন। সম্ভবত এশার নামাজের সময় হয়ে গেছে।

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *