এই শুভ্র এই পর্ব:৪ হুমায়ূন আহমেদ

এই শুভ্র এই পর্ব:৪

মনজু মনে মনে বলল, এই পুচকি, তোর ভালো লাগার উপরে দুনিয়া চলবে না। এই দুনিয়ায় সত্য-মিথ্যা দুই ভাই। দুনিয়া চলে দুই ভাইয়ের ইশারায়। তুই আরেকটু বড় হ। প্রেমে ফ্রেমে পড়। তারপর দেখবি কী রকম হড়বড় করে মিথ্যা বলবি। তখন একটা সত্যি কথা বললে বিশটা বলবি মিথ্যা।মামা-ভাগ্নে সিগারেটের পর মনজু আরেকটা সিগারেট ধরাল। এই সিগারেটের নাম চিন্তা সিগারেট। ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করার সিগারেট। চিন্তা সিগারেট এক জায়গায় বসে টানার সিগারেট না। এই সিগারেট হাঁটাহাটি করতে করতে টানতে হয়।

এখন মনজুর প্রধান চিন্তা সে কী করবে? মেগাবাস তাকে বসতে বলেছিলেন। সে কি অফিসে ফিরে যাবে? মেগাবাস যদি তাকে পুলিশে দিতে চাইতেন তাহলে তখনই দিতে পারতেন। বসতে বলতেন না। লাক ট্রাই করতে অসুবিধা কী? মেগাবাস যদি তাকে ডেকে পাঠান। তাহলে সে বলবে- স্যার, আপনার কাছ থেকে খালি হাতে যদি ফিরি। তাহলে মৃত্যু ছাড়া আমার পথ নেই। এই দেখেন স্যার, আমি বিশটা ঘুমের ট্যাবলেট কিনে পকেটে রেখে দিয়েছি। এক পাতা ঘুমের ট্যাবলেট কিনতে কত টাকা লাগবে কে জানে। তার কাছে এই মুহুর্তে আছে সাতান্ন টাকা এবং সাতটা সিগারেট।

সাতটা সিগারেটে আজকের দিন চলবে না। আরেক প্যাকেট কিনতে হবে। ঘুমের ওষুধ কেনার চিন্তা বাদ দিতে হবে। মেগাবাসকে অন্য কিছু বলতে হবে। যেমন… স্যার, আপনার কাছ থেকে যদি খালি হাতে ফিরি। তাহলে চলন্ত ট্রাণের সামনে লোফ দিয়ে পড়া ছাড়া আমার পথ নেই।মোতাহার হোসেন মনজুকে ডেকে পাঠিয়েছেন। মনজু এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে একমনে দোয়া ইউনুস পড়ে যাচ্ছে। মহাবিপদের সময় এই দোয়া পড়তে হয়। তার কাছে মনে হচ্ছে সে মহাবিপদেই আছে।

মনজু! জি স্যার। আমার ছেলের নাম তুমি জানো। শুভ্ৰ! চিঠিতে এই নামের উল্লেখ আছে। আমার ছেলেটা শারীরিক এবং মানসিক দুইভাবেই অন্য দশজনের থেকে আলাদা। তার চোখ খুব খারাপ। চশমা পরেও সে যে খুব ভালো দেখে তা আমার মনে হয় না।মনজু মনে মনে বলল, বক্তৃতা বন্ধ করে আসল কথা বল। তোর ছেলে চোখে দেখে না তাতে আমার কী? সে আন্ধা হয়ে গেলেও কোনো সমস্যা নাই। বাপের টাকার বিছানায় হাগা-মুতা করবে। দশটা থাকবে নার্স। প্রত্যেকটা দেখতে সুন্দর। এরা তোর ছেলেকে শুচু করাবে।মোতাহার হোসেন বললেন, চোখের সমস্যা ছাড়াও তার শরীর দুর্বল। ছোটবেলা থেকেই অসুখবিসুখে ভোগে। তার মা তাকে আলাদা করে বড় করেছেন বলে পৃথিবীর জটিলতা সে কিছুই জানে না। তার জগৎটা হলো বইপত্রের।

সে দিনরাত বই পড়ে। আমি আমার ছেলের জন্যে একজন সার্বক্ষণিক চালাক চতুর সঙ্গী খুঁজছি। শুভ্র যখন বাইরে যাবে ওই সঙ্গী থাকবে তার সঙ্গে।আমার চেহারা কি দেখতে চাকরের মতো? তুই কি আমাকে টাকার গরম দেখাস? মনজু! জি স্যার।তুমি চালাক ছেলে। তোমার মতোই একজনকে আমার দরকার। করবে এই চাকরি? স্যার, বেতন কী? যদি চাকরি কর— তুমি থাকবে আমার ওয়ারির বাড়িতে। খাওয়াদাওয়া ফ্রি। মাসে তোমাকে ছয় হাজার করে টাকা দেয়া হবে। অফিসের অন্যান্য সুবিধা যা আছে পাবে। করতে চাও এই চাকরি?

জি স্যার। অবশ্যই করব।তুমি আমার সঙ্গে শুরুতে যে চালাকি করেছ, সে-রকম চালাকি আমার ছেলের সঙ্গে করবে না। শুভ্র চালাকি ধরতে পারে না।মনজু বলল, স্যার, মানুষ ভুল একবারই করে।মোতাহার হোসেন বললেন, মানুষ বার বারই ভুল করে। তুমিও করবে। তবে মনে রেখ— আমার ছেলের সঙ্গে যদি কোনো ভুল কর আমি তোমাকে কঠিন শাস্তি দেব।মনজু বলল, স্যার ভুল হবে না। মোতাহার হোসেন বললেন, এখন কানে ধর। মনজু হতভম্ব হয়ে তাকাল। এই শুয়োর কী বলে? আমি কানো ধরব কী জন্যে?

মোতাহার হোসেন বললেন, আমার সঙ্গে যে চালাকি করেছ তার শাস্তি হিসেবে আমি না বলা পর্যন্ত তুমি কানো ধর উঠবোস করতে থাকবে। চাকরি পাবার এটা হলো পূর্বশর্ত।মনজু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এটা কি কোনো ঠাট্টা? কোনো রসিকতা? মোতাহার হোসেনও তাকিয়ে আছেন। তার চোখের দৃষ্টি শান্ত। শান্ত দৃষ্টি বলে দিচ্ছে মনজুকে ছয় হাজার টাকা বেতনের চাকরি নিতে হলে সত্যি সত্যি তাকে কানে ধরে উঠবোস করতে হবে। এটা কি আসলেই সম্ভব? রাস্তায় ভিক্ষুকদের সঙ্গে পড়ে থাকলেও সম্ভব না। মনজুর বাবা একজন স্কুলশিক্ষক ছিলেন। গ্রামে তিনি সম্মান নিয়ে বাস করেছেন। বাবার পুরনো ছাত্রের সঙ্গে যখন দেখা হয় তারা আন্তরিক ভঙ্গিতে বলে, তুমি জালাল সাহেবের ছেলে। তোমার বাবা তো ফেরেশতার মতো মানুষ ছিলেন।

মনজু কানে ধরে উঠবোস করছে। এর মধ্যেই মোতাহার হোসেন অফিসের ম্যানেজারকে ডেকেছেন। ম্যানেজারকে খুবই সহজ ভঙ্গিতে বলেছেন- এই ছেলেটাকে একটা অ্যাপিয়েন্টমেন্ট লেটার দাও। বেতন সব মিলিয়ে ছয় হাজার টাকা। আজ তাকে এক মাসের বেতন অ্যাডভান্স দেবে। মনে হয় টাকা তার খুবই দরকার। মাসে মাসে কেটে রাখবে।মনজু যাত্রাবাড়িতে ফিরল রাত আটটায়। সে তার মামির জন্যে সবুজ রঙের একটা শাড়ি, ইকবাল সাহেবের জন্যে সিল্কের পাঞ্জাবি কিনে এনেছে। বাজারের বড় ব্যাগে করে দুই কেজি খাসির মাংস, একটা ইলিশ মাছ, পোলাওয়ের চাল এবং ঘি এনেছে। দই এবং এক কেজি কুমিল্লার মাতৃভাণ্ডারের রসমালাই এনেছে। রাতে যাতে মামার বাসায় আজ ভালো খাওয়া-দাওয়া হয়।রুনু সব দেখে অবাক হয়ে বলল, কী ব্যাপার?

মনজু বলল, বড় সাহেব জাপান থেকে ফিরেছেন। আমার ঢাকাতেই পোস্টিং হয়েছে। আমি কাল ভোরবেলা কাজে জয়েন করব।রুনু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।মনজু তার মামির পা ছুঁয়ে বলল, মা, আপনার জন্যে শাড়িটা এনেছি। আমার নিজের মা আমার তিন বছর বয়সে মারা গেছেন। তাকে কিছু দিতে পারি নি। আপনাকে দিলাম।কথাটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। মনজুর বাবা নেই, তবে মা বেঁচে আছেন। বিয়ে শাদিও করেছেন।মনজুর মামি এতই খুশি হলেন যে তার চোখে পানি এসে গেল। তিনি বললেন, তুমি কাল সকালে চলে যাবে। এইসব কী বলছ? তুমি আমার এইখানেই থাকবে।

মনজু বলল, আমি মাঝে মাঝে এসে দেখা করে যাব। কোম্পানি আমাকে থাকার জায়গা দিয়েছে। আমাকে সেইখানেই থাকতে হবে।বাড়িতে রান্নার বিপুল আয়োজন চলছে। ইকবাল সাহেব গেছেন দোকান থেকে ঠাণ্ডা কোক আনতে। ফিস্টটা যেন সৰ্বাঙ্গ সুন্দর হয়। নতুন পাঞ্জাবিটা গায়ে দিয়ে গিয়েছেন। পাঞ্জাবিটা সুন্দর ফিট করেছে।মনজু বসার ঘরে একা বসে আছে। রুনু এক সময় বসার ঘরে ঢুকে অবাক হয়ে দেখল— মনজু ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে। রুনু অবাক হয়ে বলল, কী হয়েছে? মনজু বলল, আমি আজ খুবই মনে কষ্ট পেয়েছি। আমার মরে যেতে ইচ্ছা করছে।রুনু বলল, ঘটনাটা বলবেন?

মনজু ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, একজন আমাকে সবার সামনে কানে ধরে উঠবোস করিয়েছে।রুনু বলল, সেই একজনটা কে?মনজু জবাব দিল না। শব্দ করে কাঁদতে লাগল। রুনু গিয়ে তার মাকে ডেকে নিয়ে এলো। তিনি এসে মনজুকে জড়িয়ে ধরে বসে রইলেন।মনজু মায়া লজের দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। যার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তিনি যে ছোট সাহেবের মা, এই বাড়ির কত্রী– তা কেউ না বলে দিলেও বোঝা যায়। ভদ্রমহিলার মুখটা ছোট এবং নিখুঁত গোলাকার বলেই মুখে বিড়াল বিড়াল ভাব চলে এসেছে। পরেছেন কালো সিস্কের শাড়ি। তাকে দেখে মনে হচ্ছে একটা সাদা-কালো বিড়াল বসে ফোস ফোস করছে। তার সামনে একটা টেবিল। টেবিলের ওপাশে একটা চেয়ার আছে। মনজু খালি চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে বসতে বলা হয় নি। তাকে বসতে বলা হবে এমন কোনো সম্ভাবনাও সে দেখছে না। ভদ্রমহিলা তাকে চাকরিবোকর হিসেবেই দেখছেন।তোমার নাম কী বললে?

মনজু! মনজু না মজনু? স্পষ্ট করে বলো। বিড়বিড় করছি কেন? ম্যাডাম আমার নাম মনজু।জাহানারা টেবিলে রাখা চশমা চোখে দিলেন। পরীক্ষকের ভঙ্গিতে তাকালেন। তাকে দেখে মনে হলো না মনজুকে তার পছন্দ হয়েছে।দেশের বাড়ি কোথায়? নেত্রকোনা।জাহানারা হতাশ গলায় বললেন, বুঝেছি— আইছুন খাইছুনের দেশ। শোন ছেলে, শুভ্রর সঙ্গে এ জাতীয় ভাষা ব্যবহার করবে না। পরে দেখা যাবে সেও আইছুন খাইছুন শুরু করেছে। শুদ্ধ ভাষায় কথা বলবে, বুঝেছ?

জি আচ্ছা ম্যাডাম।আজ আমার শরীরটা খারাপ বলে তোমাকে উপরে ডেকে পাঠিয়েছি। তোমার জায়গা হচ্ছে একতলা। সেখানেই থাকবে, উপরে আসবে না। শুভ্রর ঘরে তোমার যাবার দরকার নেই। বুঝেছ? জি।তুমি সবসময় একটা হ্যান্ডব্যাগ ক্যারি করবে। সেখানে শুভ্রর জন্যে বাড়তি চশমা রাখবে। শুভ্রর চোখ খারাপ জানো তো? জি জানি।শেভ কর নি কেন? প্রতিদিন সকালে শেভ করবে। খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে ঘুরবে না।জি আচ্ছা।বয়স কত? চব্বিশ।

চব্বিশ বলে তো মনে হয় না। আমার কাছে সাতাশ আঠাশ মনে হচ্ছে। বয়স কমাও কেন? বয়স কমাবার কী আছে? শুভ্রর বয়স চব্বিশ, তাকে দেখে আঠার উনিশের বেশি মনে হয় না। যাই হোক, শুভ্ৰকে তুমি ভাইজান ডাকবে। আপনি আপনি করে কথা বলবে। মাথার মধ্যে রাখবে যে তুমি তার ইয়ার বন্ধু না।জি আচ্ছা।একটা মোটা খাতা কিনবে। রাতে ঘুমুতে যাবার আগে শুভ্র সারাদিন কী করল না-করল গুছিয়ে লিখে রাখবে। আমি যে-কোনোদিন দেখতে চাইব। কি বলছি মনে থাকবে? জি।শুভ্রর সঙ্গে দেখা হয়েছে?

জি-না।যাও দেখা করে আস। হ্যান্ডব্যাগ আর খাতা কেনার টাকা রহমতুল্লাহর কাছ থেকে নিয়ে নিও। রহমতুল্লাহর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে না? কেয়ারটেকার।মনজু হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়তে নাড়তে মনে মনে বলল, তুই যে শুধু দেখতেই বিড়ালের মতো তা-না। তুই বিড়ালের মতো মিউমিউ করে কথা বলিস। তোর উচিত ছিল মানুষ বিয়ে না করে একটা হুলো বিড়াল বিয়ে করা। এখনো সময় আছে। দেশের বাড়ি থেকে তোর জন্যে একটা বিড়াল আনব?

জাহানারা বললেন, ঠিক আছে এখন যাও। বারান্দা ধরে সোজা হাঁট, শেষ মাথায় শুভ্রর ঘর। শুভ্ৰকে তোমার কথা বলা আছে। আরেকটা কথা বলতে ভুলে গেছি। — গাড়িতে করে যখন যাবে তুমি সবসময় বসবে ড্রাইভারের পাশের সিটে। শুভ্রর সঙ্গে বসবে না। ড্রাইভার কত স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছে লক্ষ রাখবে। স্পিড কখনো যেন চল্লিশ কিলোমিটারের বেশি না হয়। ড্রাইভার যেন কখনো কোনো গাড়ি ওভারটেক না করে। আচ্ছা তুমি এখন যাও।

মনজু শুভ্রর ঘরের দিকে রওনা হয়েছে। পেছনে না ফিরেও সে বুঝতে পারছে বিড়ালনি তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে শুভ্ৰ নামক জিনিসটার ঘরে না ঢোকা পর্যন্ত তাকিয়েই থাকবে। মনজু ঘর থেকে যখন বের হবে তখনো দেখবে বিড়ালনি তার জায়গায় বসে আছে। তাকে দেখতে পেয়েই হাত ইশারায় ডাকবে। সে যখন বিড়ালনির কাছে এসে দাঁড়াবে তখন বলবে, এই ছেলে তোমার নাম যেন কী? নামটা ভুলে গেছি। (বিড়ালনির নাম ঠিকই মনে আছে। তারপরেও নাম ভুলে গেছি বলবে তাকে তুচ্ছ করার জন্যে।) কঠিন কোনো গালি এই মহিলাকে দিতে পারলে মন শান্তি হতো।

শুভ্ৰ নামক জিনিসটার ঘরে ঢুকবে এই নিয়ে টেনশান হচ্ছে। বিড়ালনি যেমন সারাক্ষণ তাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন শুভ্ৰ ছাগলটাও তাই করবে। ছাগলটাকে শুরুতে সে কী বলবে- স্যার, আমি এসেছি। না, স্যার বলা যাবে না— বলতে হবে ভাইজান। চাকর-বাকরের মুখে ভাইজান মানায়। অন্য কিছু মানায় না। সে যদি ঘরে ঢুকে ছাগলটার পা ছয়ে সালাম করে বলতে পারত— ভাইজান গো! আমি আইছি। অখন কী করমুকন। শইল্যে তেল মালিশ কইরা দেই? হবে না। গেরাইম্যা ভাষা বলা যাবে না। শান্তি নিকেতনের গুরুদেবের ভাষা বলতে হবে— ভাইজান, আমি এসেচি। (এসেছি চলবে না— ছ বাতিল, শুধুই চ) আমি আপনার সেবক। আপনার সোনার অঙ্গে তেল ডলে দেব খন।

শুভ্রর হাতে ফুটখানিক লম্বা একটা দড়ি। সে দড়ি দিয়ে গিন্টুর মতো কী একটা বানিয়ে গভীর মনোযোগে গিটুর দিকে তাকিয়ে আছে। যেন এটা কোনো গিন্টু না, মহৎ কোনো শিল্পকর্ম। মনজু দরজার ওপাশ থেকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। বিড়ালনির গর্ভে এ কী জিনিস? এমন সুন্দর কোনো পুরুষ মানুষ তো সে আগে কখনো দেখে নি। শুধু যে দেখতেই সুন্দর তা-না। চেহারার মধ্যে মায়া মায়া ভাব। যেন অসম্ভব রূপবান একজন যুবক বালক বালক চেহারা নিয়ে বসে আছে।মনজু বলল, ভাইজান, আমি আসব?

শুভ্র গিন্টু থেকে চোখ না সরিয়ে বলল, এসো। মা তোমার কথা আমাকে বলেছেন। তুমি মনজু। চট করে বাথরুমে ঢুকে বাথরুমের বেসিন থেকে একটা কাঁচি নিয়ে এসো। তোমাকে খুবই মজার একটা জিনিস দেখাব।মনজু বাথরুম থেকে কাঁচি নিয়ে এলো। খুবই আশ্চর্যজনক ব্যাপার, শুভ্র নামের জিনিসটা তার সঙ্গে অতি পরিচিতজনের মতো কথা বলছে। বিড়ালনি অতি ভদ্র একটা ছেলে পয়দা করেছে।কাঁচি এনেছ?

জি।এখন খুব সাবধানে গিট্টুটা কাট।মনজু গিট্টু কাটল। শুভ্র বলল, আমি তোমাকে এখন খুবই বিস্ময়কর একটা ব্যাপার দেখাব। কাটা দড়িটা তোমার চোখের সামনে জোড়া লাগিয়ে দেব।মনজু তাকিয়ে আছে। কাটা দড়ি কীভাবে জোড়া লাগবে সে বুঝতে পারছে না। দড়িটা যে দু টুকরা হয়েছে এটা বুঝা যাচ্ছে। দড়ির চারটা মাথা বের হয়ে আছে।মনজু!জি ভাইজান।শুভ্র বলল, দেখ আমি কী করছি— দুটা দড়ি হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলাম। হাতের মুঠো খুলব, দেখবে দড়ি জোড়া লেগে গেছে। আমাকে কিছুক্ষণ হাতের মুঠোয় নিয়ে বসে থাকতে হবে। কারণ কাটা দড়ি জোড়া লাগানোর সময় দিতে হবে। এক কাজ করা যােক- তুমি বরং হাত মুঠো কর, তোমার হাতে দিয়ে দেই। কাটা দড়ি হাতের মুঠোয় নিয়ে বসে থাক।

আমি না বলা পর্যন্ত হাতের মুঠো খুলবে না। ভালো কথা— তুমি দাঁড়িয়ে আছ কেন? বসে। সামনের চেয়ারটায় বসো।মনজু বসল। তার হাতের মুঠোয় কাটা দড়ি। শুভ্ৰ হাসছে তার দিকে তাকিয়ে। কিশোরের সহজ-সরল হাসি। নেত্রকোনার ভাষায় এই হাসির নামঅন্তরি হাসি। অন্তর থেকে যে হাসি আসে। সেই হাসি।মনজু!জি ভাইজান।শুভ্র মনজুর দিকে ঝুঁকে এসে বলল, তুমি যদি শুভ্র হতে আর তোমার বাবা যদি তোমার জন্যে একজন অ্যাসিসটেন্ট ভাড়া করে নিয়ে আসত, যে অ্যাসিসটেন্টের কাজ হচ্ছে তোমাকে পাহারা দেয়া— তুমি রাগ করতে না?

করতাম।আমিও রাগ করেছি। খুবই রাগ করেছি। আমি অথর্ব কেউ না। আমার বুদ্ধিবৃত্তিও নিম্ন পর্যায়ের তা না। আমার সঙ্গে একজন চড়নদার কেন লাগবে? বাবা তোমাকে চড়নদারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়েছেন। মা কী করবেন জানো? মা চেষ্টা করবেন গোপনে তোমাকে স্পাই বানিয়ে ফেলতে। তোমার কাজ হবে। আমি কোথায় যাচ্ছি, কার কাছে যাচ্ছি, কী কথা বলছি। সব মাকে জানানো। আমার ধারণা ইতিমধ্যেই এই দায়িত্ব তোমাকে দেয়া হয়েছে। হয় নি?

উনি বলেছেন প্রতিদিন রাতে ঘুমাবার সময় আপনি কোথায় যান, কী করেন সব একটা খাতায় লিখে রাখতে।বাহ ভালো তো। Written report. মজার ব্যাপার হচ্ছে। আমি ঘর থেকেই বের হই না। দিনের পর দিন এই ঘরে বসে থাকি। বই পড়ি। কম্পিউটার নিয়ে ঘটঘট করি। ইন্টারনেটে অপরিচিত সব মানুষদের সঙ্গে গল্প করি।মনজু বলল, ভাইজান, দড়ি কি জোড়া লেগেছে?

না, এখনো লাগে নি। হাতের মুঠোয় নিয়ে বসে থাক। যখন লাগবে আমি বলব। মনজু শোন, তুমি যে আমার প্রথম চড়নদার তা কিন্তু না। তোমার আগে আরো চারজন ছিল। ওদের প্রত্যেককেই আমার পছন্দ হয়েছিল। কেউ বেশিদিন থাকে না। বড়জোর তিন মাস, তারপরই এদের চাকরি চলে যায়। কী জন্যে চলে যায় আমি নিজেও জানি না। তোমার ক্ষেত্রেও একই জিনিস ঘটবে। কাজেই তোমার উচিত হবে গোপনে চাকরি খোজা।মনজু হঠাৎ আন্তরিক ভঙ্গিতে বলল, ভাইজান, আপনাকে আমার পছন্দ হয়েছে।শুভ্র বলল, আমাকে পছন্দ হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমি খুবই ভালোমানুষ। মন্দ হবার জন্যে মন্দ মানুষদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করতে হয়। আমি তা করি না। আচ্ছা তুমি এখন যাও।হাতের মুঠ খুলব ভাইজান?

নিজের ঘরে গিয়ে খোল।মনজু শুভ্রর ঘর থেকে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েই থমকে গেল। জাহানারা ঠিকই আগের জায়গায় বসে আছেন। তাকিয়ে আছেন তার দিকে। তবে তিনি তাকে ডাকলেন না। মনজু নিজের ঘরে ঢুকে হাতের মুঠা খুলল— সত্যি সত্যি দড়ি জোড়া লেগেছে। মনজু বুঝতে পারছে দড়ি জোড়া লাগার ঘটনা ঘটেছে অনেক আগেই, যখন তার হাতে দড়ি দেয়া হয়েছে তখনই। শুভ্ৰ নামের মানুষটা এতক্ষণ শুধু শুধু তাকে মুঠো বন্ধ করে রেখেছে। সে তার সঙ্গে মজার একটা খেলা খেলেছে।

মনজুকে যে ঘরে থাকতে দেয়া হয়েছে সেই ঘরটা বেশ বড়। দুটা সিঙ্গেল খাট পাতা আছে। একটাতে সে বিছানা করেছে, অন্যটা খালি। ঘরে দুটা চেয়ার আছে, একটা টেবিল আছে। বেশ বড় একটা ওয়ারড্রোব আছে। আলনা আছে। কালো রঙের বিশাল একটা ট্রাংক আছে। ট্রাংক তালাবন্ধ। ছোট্ট পিচকা তালা, চাপ দিলেই খুলে যাবে। ট্রাংকটার দিকে তাকালেই মনজুর ইচ্ছা করে তালা ভেঙে দেখতে ভেতরে কী আছে।

এই বাড়ির দোতলাটা যেমন ফাঁকা একতলা ফাঁকা না। অনেক লোকজন বাস। করে। মনজুর পাশের ঘরেই থাকেন রহমতুল্লাহ। শুভ্রলোকের বয়স যাটের মতো। তিনি এ বাড়ির ম্যানেজার। শক্ত সমর্থ চেহারা। সারাদিনই ছোটাছুটির মধ্যে আছেন। তার প্রধান ডিউটি প্রতিদিন সকালে বাজার করা। তার একজন অ্যাসিসটেন্ট আছে, ছাগীর নাম। তার ডিউটি কী বোঝা যাচ্ছে না। বেশিরভাগ সময়েই দেখা যায়। সে বারান্দার বেঞ্চিতে কুজো হয়ে বসে আছে। এই সময় যেই বারান্দায় থাকে ছগীর সরু চোখে তার দিকেই তাকিয়ে থাকে। প্রথমবার এই দৃশ্য দেখে শঙ্কিত হয়ে মনজু জিজ্ঞেস করেছিল— কিছু বলবেন? ছগীর না-সূচক মাথা নেড়েছে কিন্তু দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় নি।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *