এই শুভ্র এই পর্ব:৫ হুমায়ূন আহমেদ

এই শুভ্র এই পর্ব:৫

ড্রাইভার আছে তিনজন, দারোয়ান চারজন। তারা পাশাপাশি ঘরে থাকে এবং সারাক্ষণই ক্যারাম খেলে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ক্যারামের ঘুটির খটাস খটাস শব্দ হতে থাকে। সন্ধ্যার পর থেকে তাদের ঘরে টিভি চালু হয়। তখন শুরু হয় তাস খেলা। তাস খেলা চলে গভীর রাত পর্যন্ত। একদিকে তাস খেলা চলছে। অন্যদিকে চলছে টিভি। মনজুর মনে হয়। এরাই এ বাড়ির সবচে সুখী মানুষ।রান্না করা এবং কোটাবাছার লোক সব মিলিয়ে কয়জন মনজু এখনো জানে না। তারা থাকে একতলার ভেতরের দিকে। খানিকটা খোলা বারান্দা পার হয়ে সেখানে পৌঁছতে হয়। তবে ভেতরের বাড়িতে যাওয়া নিষেধ। রহমতুল্লাহ প্রথম দিনেই নিয়মকানুন বলে দিয়েছেন। গলাখ্যাকারি দিয়ে বলেছেন (তিনি প্রতিটি বাক্য গলাখাকারি দিয়ে শুরু করেন)— মনজু শোন, ভিতরের বাড়িতে যাওয়া নিষেধ। মেয়েছেলেরা কাজ করে। কাজের সময় তাদের কাপড়াচোপড় ঠিক থাকে না, বুঝেছ? মাথা নাড়লে হবে না। মুখে বলো— বুঝেছ।

মনজু বলল, বুঝেছি।তিনবেলা খাওয়া তোমার ঘরের সামনে টিফিন ক্যারিয়ারে দিয়ে যাবে। খাওয়ার পরে টিফিন ক্যারিয়ার ধোয়ামোছা করে ঘরের সামনে রেখে দিতে হবে। এই ব্যবস্থা করা হয়েছে, কার কখন ডিউটি তার নাই ঠিক। বুঝেছ? জি বুঝেছি।ধর সকালে টিফিন ক্যারিয়ারে তোমারে নাশতা দেয়া হলো। তুমি নাশতা খেলে না। নাশতা ভরা টিফিন ক্যারিয়ার তোমার ঘরের সামনে পড়ে রইল। তখন কিন্তু তোমাকে দুপুরের খাবার দেওয়া হবে না। নাশতা যদি নাও খাও— টিফিন ক্যারিয়ার ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে রাখতে হবে। বুঝেছ?

জি বুঝেছি।মাসে একদিন প্রথম বিষু্যদবার সন্ধ্যায় ফিস্ট হয়। সেদিন আমরা চেষ্টা করি সবাই মিলে একত্রে খাওয়াদাওয়া করতে। পোলাও রোস্ট, খাসির মাংসের কালিয়া আর দৈ মিষ্টি। যেদিন দৈ মিষ্টি থাকে না সেদিন থাকে কোক ফান্টা। তোমার আর কিছু জিজ্ঞাস করার আছে? জি-না।বাড়ির চারদিকে বিরাট বাগান আছে। বাগানে ঘুরতে চাইলে ঘুরতে পার, শুধু রাত বারটার পরে না। রাত বারটার পরে কুত্তা ছেড়ে দেয়া হয়। স্যারের দুটা কুত্তা আছে- সরাইলের কুত্তা। ভয়ঙ্কর। কুত্তার সঙ্গে তোমাকে পরিচয় করানো হয়েছে? জি-না।যাও গার্ডের কাছে যাও, সে পরিচয় করায়ে দেবে। তোমার গায়ের গন্ধ শুকাবে। কুকুরের স্মৃতিশক্তি ভালো। একবার কারোর গায়ের গন্ধ শুকলে বাকি জীবন মনে রাখে। তারপরেও প্রথম এক সপ্তাহ রোজ তোমার গায়ের গন্ধ শুকায়ে আসবে। এদের নামও মনে রাখবে। একজনের নাম টুং, আরেকজনের নাম টাং।

কুকুরের নাম টুং টাং? ছোট সাহেব নাম রেখেছেন। কুকুর দুটাই নিজেদের নাম খুব ভালো মতো চেনে। টুং ডাকলে টুং ছুটে আসে, টাং ডাকলে টাং ছুটে আসে। তোমার কি আর কিছু জিজ্ঞেস করার আছে? জি-না।আমাদের এইখানের নিয়মে মাসে দুই দিন ছুটি। ছুটি কবে নিতে হবে সেটা আগেই বলে দিতে হবে। ইচ্ছা করলে ছুটি জমাতে পার। কোনো মাসে যদি ছুটি না নাও তাহলে পরের মাসে চারদিন ছুটি পাবে। এই বাড়িতে চাকরির আরাম আছে। ভালো আরাম।মনজু বলল, আপনাকে কী ডাকব? রহমুতুল্লাহ বললেন, যা ইচ্ছা হয় ডাকবে, শুধু স্যার ডাকবে না। আমরা এখানে শুধু বড় সাহেবকে স্যার ডাকি।চাচাজি ডাকব?

ডাকতে পার। ও আচ্ছা, আরেকটা কথা তো বলতে ভুলে গেছি। মাসে এক দুই দিন আমার শরাব খাওয়ার অভ্যাস আছে। সবাই জানে। বড় স্যারও জানেন। মাতাল অবস্থায় একদিন উনার সামনে পড়ে গিয়েছিলাম। উনি কিছু বলেন নাই। যাই হোক আসল কথা হচ্ছে— ফিস্টের রাতে একতলার লোকজন চান্দা তুলে আমাকে একটা বোতল কিনে দেয়। বোতল কেনার চান্দা তুমিও দিবে। তোমার ভাগে ত্ৰিশ চল্লিশ টাকার বেশি পড়বে না।মনজু বলল, জ্বি আচ্ছা।তোমার কি এইসব অভ্যাস আছে? জি-না।না থাকাই ভালো। অতি বদঅভ্যাস। আমি হজু করব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। হজ্বের পর তওবা করে এইসব ছেড়ে দেব।

জাহানারা ছেলের ঘরে এসে বসেছেন। শুভ্ৰ হাসিমুখে মার দিকে তাকিয়ে আছে, তবে সে মাকে দেখতে পাচ্ছে না। কারণ তার চোখে চশমা নেই। সে দেখছে। নাক-মুখবিহীন ফর্সা একটা গোলাকার মুখ। শুভ্র বলল, মা, তুমি কেমন আছ? জাহানারা বললেন, আমি কেমন আছি তা দিয়ে তো তোর কোনো দরকার নেই। আমাকে ছাড়াই তো তুই সুখে আছিস। আমি একবার পনেরো ঘণ্টা তোর সঙ্গে কথা বলি নি। তুই বুঝতেই পারিস নি।শুভ্র বলল, বুঝতে পারব না কেন। ঠিকই বুঝেছি। আমি ভাবলাম কোনো কারণে তুমি কারো সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছি না। একা একা থাকতে চাচ্ছি। তাই তোমাকে বিরক্ত করি নি।ছেলেটাকে কেমন দেখলি? কোন ছেলেটা?

ঐ যে তোর সঙ্গে সঙ্গে যে ঘুরবে। তোর টেক কেয়ার করবে। মিজান না। কী যেন নাম।ও, মনজুর কথা বলছ? ভালো ছেলে। বুদ্ধিমান, সরল সোজা।তোর কাছে তো সবাই বুদ্ধিমান। সবাই সরল সোজা। ও তোর কাছ থেকে হাতে মুঠো করে কী নিয়ে যাচ্ছিল? দড়ি নিয়ে যাচ্ছিল। জাহানারা অবাক হয়ে বললেন, দড়ি নিয়ে যাচ্ছিল মানে কী?মানে হলো মা, আমি ওকে একটা ম্যাজিক দেখাচ্ছিলাম। চায়নিজ রোপ ট্রিক। একটা দড়ি কেটে দু টুকরা করে তার হাতে দিয়েছি। দশ মিনিট মুঠো বন্ধ করে রাখলে কাটা দড়ি জোড়া লেগে যায়। এই ট্ৰিক।জোড়া লেগেছে?

জানি না জোড়া লেগেছে কি-না। তার সঙ্গে পরে আমার আর দেখা হয় নি।তুই দুনিয়ার সবাইকে ম্যাজিক দেখিয়ে বেড়াচ্ছিস, কই আমাকে তো এখনো দেখালি না।এইসব ব্যাপারে তোমার আগ্রহ নেই, সেই জন্যে তোমাকে দেখাই নি।আগ্রহ নেই তোকে কে বলল? ছোটবেলায় কত ম্যাজিক দেখেছি। আমি নিজেও একটা ম্যাজিক পারতাম- রাবারব্যান্ড দিয়ে করতে হয়। এখন অবশ্যি ভুলে গেছি। দেখি তুই আমাকে একটা ম্যাজিক দেখা। ঐ ছোড়াটাকে যেটা দেখিয়েছিস সেটা না। অন্য কিছু।অন্য কিছু তো মা পারব না। আমি একটাই ভালোমতো শিখেছি। কাটা দড়ি জোড়া লাগানো। এটা দেখাব?

আচ্ছা দেখা।তাহলে মা তুমি চট করে বাথরুমে যাও। কাঁচিটা নিয়ে আস। জাহানারা ছেলের বাথরুমে ঢুকে হতভম্ব হয়ে গেলেন। বাথরুমের আয়নায় বড় বড় করে একটা ইংরেজি কবিতা লেখা। কবিতাটা লেখা হয়েছে লাল লিপস্টিক দিয়ে। শুভ্ৰ লিপস্টিক পাবে কোথায়? তিনি কয়েকবার কবিতাটা পড়লেন। যে লিপস্টিক দিয়ে কবিতাটা লেখা হয়েছে সেটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করলেন। লিপস্টিক পাওয়া গেল না।

বাথরুমের আয়নায় লেখা

I often see flowers from a passing car

That are gone before I can tell what they are.

Heaven gives its glimpses only to those

Not in position to look too close.

জাহানারা কাঁচি হাতে ছেলের সামনে বসলেন। ম্যাজিকে এখন তার মন নেই। তার মাথায় ঘুরছে বাথরুমের আয়নায় লেখা কবিতা। যে লিপস্টিক দিয়ে কবিতাটা লেখা হয়েছে সেই লিপষ্টিক।জাহানারা বললেন, বাথরুমের আয়নায় হাবিজাবি এইসব কী লিখেছিস? শুভ্র বলল, রবার্ট ফ্রস্টের একটা কবিতার প্রথম দু লাইন এবং শেষ দু লাইন।মানে কী?

শুভ্র বলল, মানে হচ্ছে যে মানুষ গভীর আগ্রহে কিছু দেখতে চায় প্রকৃতি তাকে দেখায়, তবে খুব সামান্যই দেখায়।জাহানারা বললেন, কিছুই তো বুঝলাম না। আচ্ছা বাদ দে। আমার কবিতা বোঝার দরকার নেই। তুই কী দেখাবি দেখা।শুভ্র বলল, এই দেখ মা, দেড় ফুট লম্বা একটা দড়ি। তুমি মাঝখান দিয়ে কেটে দাও। এখন বলো— দুটুকরা হয়েছে না? এখন এই দুটা টুকরা হাতের মুঠোয় নিয়ে নিজের ঘরে যাও। ঘড়ি দেখে পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করে মুঠো খুলবে। দেখবে দড়ি জোড়া লেগে গেছে।সেটা কী করে সম্ভব?

ম্যাজিক মানেই তো অসম্ভবকে সম্ভব করা।জাহানারা মুঠোয় করে দড়ি নিয়ে এলেন। পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করে মুঠো খুললেন। দড়ি জোড়া লাগে নি। যেমন ছিল তেমনি আছে।শুভ্ৰ কি তার সঙ্গে ফাজলামি করেছে? ম্যাজিকই তাকে দেখায় নি? দড়ি কেটে তার হাতে দিয়ে দিয়েছে? হয়তো সে এই ম্যাজিক জানে না। মজা করেছে। মিজান না। ফিজন নামের ছেলেটার সঙ্গেও হয়তো তাই করেছে। তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করার কোনো মানে হয় না। চাকরিবোকর শ্রেণীর মানুষদের লাই দিতে নাই। লাই দিলেই এর চেষ্টা করে কোলে বসে পড়তে।

জাহানারা সকিনাকে ডেকে পাঠালেন। ম্যাজিক দেখিয়ে বেড়ানো যদি শুভ্ৰর বর্তমান খেলা হয় তাহলে সে সকিনাকেও ম্যাজিক দেখিয়েছে। সেও নিশ্চয়ই কাটা ছিল সে-রকম কাটাই আছে। এপ্ৰিল ফুল হয়েছে।সকিনা! জি মা।শুভ্ৰ কি তোমাকে কোনো ম্যাজিক দেখিয়েছে? জি।দড়ি কাটার ম্যাজিক? জি। উনি আমার সামনে একটা দড়ি কেটে দুভাগ করলেন। আমাকে বললেন মুঠি বন্ধ করে পাঁচ মিনিট রাখতে। আমি রাখলাম। তারপর দড়ি জোড়া লেগে গেল। মা, আমি যে কী অবাক হয়েছি।জাহানারা গম্ভীর গলায় বললেন, তুমি যখন-তখন তার ঘরে যাও কেন? সকিনা ভীত গলায় বলল, আমি তো যখন-তখন যাই না। ঘর ঝাঁট দেবার জন্যে সকালে একবার যাই, বিকালে একবার যাই।আর যাবে না।জি আচ্ছা।

জাহানারা থমথমে গলায় বললেন, অল্পবয়েসি মেয়ের শরীরের গন্ধ খুব খারাপ। এই গন্ধে মহাপুরুষরাও অন্যরকম হয়ে যান। তুমি যখন-তখন ঝাড়ু দেবার নাম করে আমার ছেলের ঘরে ঢুকবে, শরীরের গন্ধ ছড়াবে। ঝাড়ু দেবার জন্যে কায়দা করে মাথা নিচু করবে যাতে বুক দেখা যায়। এতে যদি আমার ছেলের কোনো সমস্যা হয় তখন? পেট বাধালে তোমাদের কিছু যায় আসে না। তোমাদের পেট বাঁধিয়ে অভ্যাস আছে। আজকে পেট বাধাবে, কাল ফেলে দেবে। কাঁদছ কী জন্যে? এইসব মরাকান্না আমার সামনে কাঁদবে না। যাও সামনে থেকে।

সকিনা প্ৰায় দৌড়ে ঘর থেকে বের হলো। জাহানারা নিজেই তার ঘরের পর্দা টেনে ঘর অন্ধকার করলেন। তিনি বুঝতে পারছেন কিছুক্ষণের মধ্যেই মাইগ্রেনের ব্যথা শুরু হবে। তার জন্যে প্রস্তুতি দরকার।তারও আগো জানা দরকার শুভ্ৰ লিপষ্টিক কোথেকে পেয়েছে। সকিনার কাছ থেকে নিয়েছে? কটকটা লালরঙের লিপস্টিক চাকরানী টাইপ মেয়েদের কাছেই থাকে। মেয়েটাকে যখন শুভ্র ম্যাজিক দেখাচ্ছিল তখনই হয়তো শুভ্র বলেছে— তোমার কাছে লাল লিপস্টিক আছে? নিয়ে এসো। তাতেই সকিনা মনের আনন্দে লাফাতে লাফাতে লিপষ্টিক আনতে গেছে। হারামজাদী ভেবেছে- ভাইজানের সঙ্গে প্রেম হয়ে গেছে।

জাহানারা উঠে দাঁড়ালেন। লিপষ্টিক সমস্যার সমাধান করতে হবে। শুভ্ৰকে সরাসরি জিজ্ঞেস করতে হবে। সন্দেহ নিয়ে বসে থাকার কোনো মানে হয় না।শুভ্ৰর ঘরের সব বাতি নেভানো। তবে সে জেগে আছে। কম্পিউটারের সামনে বসে আছে। কম্পিউটারের পর্দার হালকা সবুজ আলো পড়েছে তার চোখেমুখে। কী সুন্দর লাগছে। জাহানারা জানালার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছেন। শুভ্র গভীর মনোযোগ কী যেন টাইপ করছে। জাহানারার ছেলের মনোযোগ নষ্ট করার ইচ্ছা করল না।

শুভ্র ইন্টারনেটে একজনের সঙ্গে শব্দহীন কথা বলাবলি করছে। সেই একজনের নাম আত্রলিতা। শুভ্রর ধারণা নামটা আসল না। ছদ্মনাম। ইন্টারনেটে গল্পগুজবের সময় বেশিরভাগ ছেলেমেয়েই ছদ্মনাম ব্যবহার করে।আত্রলিতার বাড়ি নরওয়েতে। সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লিনিক্যাল সাইকলজির ছাত্রী। বয়স উনিশ। শুভ্রর সঙ্গে সে মাঝে মধ্যেই গল্প করে।শুভ্ৰ কম্পিউটার কী-বোর্ডে দ্রুত লিখল- কেমন আছ আত্রলিতা? আত্রলিতা জবাব দিল- ভালো না।ভালো না কেন? আমার মন ভালো নেই।মন ভালো নেই কেন? আমার বয়ফ্রেন্ড আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে।বকা দিয়েছে?

না, বকা দেয় নি। হাসি হাসি মুখে বলেছে— তোমার সঙ্গে আমার মিশ খাচ্ছে না। তুমি দক্ষিণ মেরুর মেয়ে আর আমি উত্তর মেরুর ছেলে। দুই মেরুর দুজন একসঙ্গে কনসার্টে বাজনা বাজাতে পারে না।তোমার বয়ফ্রেন্ড তো খুব গুছিয়ে কথা বলে! সে মোটেই গুছিয়ে কথা বলে না। তার কিছু মুখস্ত কথা আছে। আমাকে সে যে কথাগুলি বলেছে এরকম কথা সে আগেও তার অন্য বান্ধবীদের বলেছে।তাহলে তো এমন একজনের সঙ্গে কনসাটে বাজনা বাজানোই উচিত না। তুমি বরং একাই বাজনা বাজাও।একা একা কি কনসার্ট হয়? হ্যাঁ হয়। একটা বাজনা তুমি সত্যি সত্যি বাজাবে। অন্য বাজনাগুলি কল্পনা করে নেবে।শুভ্ৰ, তুমি কিন্তু খুব গুছিয়ে কথা বলো। তুমি কেমন আছ? ভালো আছি।তোমার চোখের অবস্থা কী? এখনো দেখতে পাচ্ছি।আজ সারাদিনে সবচে সুন্দর দৃশ্য কী দেখেছ?

আজ সারাদিনের সবচে সুন্দর দৃশ্যটি এখন দেখছি।এখন কীভাবে দেখবে? এখন তো তুমি কম্পিউটারের স্ক্রিনের সামনে বসে আছে।দাঁড়িয়ে আছেন। মাঝে মাঝে তিনি এই কাজটা করেন— জানালার পাশে এসে দাঁড়ান। আমি কী করছি আড়াল থেকে দেখেন।বাহ ভালো তো! তুমি একটা কাজ কর। কম্পিউটার অফ করে তোমার মায়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প কর।ঠিক আছে, তাই করব। আচ্ছা আত্রলিতা, এটা কি তোমার সত্যি নাম? অবশ্যই সত্যি নাম। আমি মিথ্যা বলি না।মিথ্যা বলো না কেন? প্রয়োজন হয় না বলে বলি না।প্রয়োজন হলে কি বলতে?

না।

আত্রলিতা! বিদায়।

বিদায়।

শুভ্ৰ কম্পিউটার বন্ধ করে চেয়ার ঘুরিয়ে মার দিকে তাকিয়ে বলল, কেমন আছে মা? জাহানারা হকচাকিয়ে গেলেন। শুভ্র বলল, কী দেখছিলে? জাহানারা বললেন, তোকে দেখছিলাম। এত রাত পর্যন্ত জেগে থাকিস কেন? এখন ঘুমিয়ে পড়ব। ভেতরে এসো মা। গল্প করি।গল্প করতে হবে না। ঘুমুতে যা। আচ্ছা শুভ্ৰ, তুই আয়নায় যে কবিতাটা লিখেছিস সেটা যেন কার লেখা? রবার্ট ফ্রাষ্টের।যে লিপস্টিক দিয়ে কবিতাটা লিখেছিস সেটা কোথায়? শুভ্র বলল, লিপষ্টিক দিয়ে লিখি নি তো মা! ক্ৰেয়ন দিয়ে লিখেছি। কেন বলে তো?

আমাকে দিস তো! আমিও মাঝে মাঝে আয়নায় লিখব।এসো, নিয়ে যাও।জাহানারা চাররঙের চারটা ক্ৰেয়ন নিয়ে নিজের ঘরে ফিরলেন। সবুজ রঙ দিয়ে আয়নায় লিখলেন— শুভ্ৰ, তুই এত ভালো কেন?সারাদিন আকাশে মেঘের ছিটেফোটাও ছিল না। সন্ধ্যায় আকাশ কালো করে মেঘ করল। বৃষ্টি এবং ঝড়ো বাতাস বইতে শুরু করল রাত আটটা থেকে। একেকবার বাতাসের ঝাপ্টা আসে, বাগানের লোহার দোলনা দুলে উঠে কটকট শব্দ হয়। শহরের বাড়ি-ঘরে বৃষ্টির শব্দ পাওয়া যায় না। মায়া লজে পাওয়া যায়। টিনের চালে বৃষ্টির যে শব্দ ওঠে, কোনো এক অদ্ভুত কারণে এ বাড়িতেও ওঠে।

মোতাহার হোসেন শুভ্রর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। ঘরের সবকটিা জানালা খোলা। বাতাসে জানালার পর্দা উড়ছে। বৃষ্টির ছাট ঘরে ঢুকছে। শুভ্র বসে আছে কম্পিউটারের সামনে। তাকে দেখে মনেই হচ্ছে না বাইরের প্রকৃতির সঙ্গে তার কোনো যোগ আছে। বাইরের ঝড়-বৃষ্টির খবরই হয়তো সে জানে না। মোতাহার হোসেন খুশি খুশি গলায় বললেন, Hello young man! শুভ্ৰ কম্পিউটার থেকে চোখ ফেরাল বাবার দিকে। তার মুখও হাসি হাসি। সে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল, Hello old man and the sea! মোতাহার হোসেন বললেন, সিরিয়াস বৃষ্টি-বাদলার দিনে তুই কম্পিউটারের সামনে বসে আছিস কেন? শুভ্র বলল, বৃষ্টি-বাদলার দিনে আমার কী করা উচিত?

বৃষ্টিতে ভিজবি? আয় বৃষ্টিতে ভিজি। আগে কম্পিউটার অফ কর। বৃষ্টির সঙ্গে কম্পিউটার যায় না।শুভ্ৰ কম্পিউটার অফ করতে করতে বলল, বাবা, ভেতরে এসো। গল্প করি। মোতাহার হোসেন ঘরে ঢুকলেন। ছেলের মুখোমুখি না বসে তার পাশে বসলেন। পাশাপাশি বসলে মাঝে-মধ্যে ছেলের গায়ে হাত রেখে কথা বলা যায়। মুখোমুখি বসলে সেটা সম্ভব হয় না।শুভ্ৰ! জ্বি বাবা।প্রবল বৃষ্টিকে ইংরেজিতে বলে Raining cats and dogs. কুকুর-বিড়ালের সঙ্গে বৃষ্টির সম্পর্ক কী তুই জানিস? শুভ্র বলল, কুকুর এবং বিড়াল- এরা হলো একজন আরেকজনের শত্রু। এরা যখন ঝগড়া শুরু করে, তখন একজন অন্যজনের উপর প্রবল বেগে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই জন্যেই প্রবল বেগের বৃষ্টি হলো ক্যাটস অ্যান্ড ডগস।মোতাহার হোসেন মুগ্ধ গলায় বললেন, এমন কোনো বিষয় কি আছে যা তোর জানা নেই? শুভ্র বলল, তুমি এত মুগ্ধ হয়ো না। বাবা। Cats and Dogs-এর যে ব্যাখ্যাটা দিয়েছি সেটা বানিয়ে দিয়েছি। আমি আসল ব্যাখ্যা জানি না।তুই জানিস না? না।

ব্যাখ্যাটা কিন্তু ইন্টারেস্টিং। আমার পছন্দ হয়েছে। তোর মা যে তোর উপর ভয়ঙ্কর রেগে আছে— এটা কি তুই জানিস? তুই না-কি ম্যাজিকের কথা বলে একটা দড়ি কেটে তার হাতে দিয়ে দিয়েছিস? দড়ি যে-রকম ছিল সে-রকম আছে। সে খুবই অপমানিত বোধ করছে। হা-হা-হা।মার অপমান হয়েছে- তুমি তাতে এত খুশি কেন? তাকে বোকা বানানো গেছে— এতেই মনে হয়। আমি খুশি।শুভ্র বলল, মাকে বোকা বানানোর তো কিছু নেই। বেচারি তো বোকাই।মোতাহার হোসেন আগ্রহ নিয়ে বললেন, তোর মা বোকা? শুভ্র বলল, হ্যাঁ।বুদ্ধির স্কেল যদি এক থেকে দশ হয়, তুই তোর মাকে কত দিবি? তিন দেব।আর আমাকে? তোমাকে নয় দেব।নয় কেন? দিশ না কেন?

শুভ্র বলল, নিজের বুদ্ধি নিয়ে তোমার অহঙ্কার আছে, এই জন্যেই এক পয়েন্ট কাটলাম। যাদের বুদ্ধি দশে দশ— তারা তাদের বুদ্ধি নিয়ে অহঙ্কার করবে না। অস্বস্তি বোধ করবে।অস্বস্তি বোধ করবে। কেন? বুদ্ধি বেশি কেন— এই নিয়ে অস্বস্তি।তোর বুদ্ধি কি দশে দশ? হ্যাঁ। তোর কথার মধ্যেও তো অহঙ্কার প্রকাশ পাচ্ছে।তুমি জিজ্ঞেস করেছ বলেই অহঙ্কারের কথাটা বলেছি। জিজ্ঞেস না করলে বলতাম না।তোর বুদ্ধি যে দশে দশ- তার কিছু প্রমাণ দে।

শুভ্র বলল, যে আমাকে যে-রকম দেখতে চায়, আমি তার কাছে সে-রকম থাকি। মা আমাকে একটা অসহায় ছেলে হিসেবে দেখতে চায়, যে ছেলে নিজের কোনো কাজই গুছিয়ে করতে পারে না। দাঁত ব্ৰাশ করে টুথপেস্টের মুখ লাগাতে ভুলে যায়। বাইরে বের হবার সময় চুল আঁচড়াতে ভুলে যায়। রোজ শেভ করার কথা ভুলে যায়। মাকে খুশি করার জন্যে এই কাজগুলি আমি ইচ্ছা করে করি। আর তুমি আমাকে একজন সুপার ইন্টেলিজেন্ট ছেলে হিসেবে দেখতে চাও! এখন তুমিই বলো, তোমার কাছে কি আমি সুপার ইন্টেলিজেন্ট ছেলে হিসেবে নিজেকে উপস্থিত করি নি? তুই বলতে চাচ্ছিস যে, তুই আসলে ইন্টেলিজেন্ট না, অথচ ভান করছিস ইন্টেলিজেন্ট। ইন্টেলিজেন্স কি ভান করা যায়?

একেবারেই যে করা যায় না তা-না। স্যার আলেক গিনিসের মতো বড় অভিনেতারা বোকার অভিনয় যেমন করতে পারেন, বুদ্ধিমানের অভিনয়ও পারেন। পারেন না? সেই ক্ষেত্রে তোকে আমি অভিনয়ে দশে দশ দিতে পারি। বুদ্ধিতে কেন দেব? শুভ্র বলল, আচ্ছা দিও না। মোতাহার হোসেন বললেন, রোজ সকালে তুই কম্পিউটারে কি বাজনা বাজাস? শুভ্র আগ্রহ নিয়ে বলল, তোমার কাছে কি বাজনার মতো মনে হয়? না-কি Noise-এর মতো লাগে? বাজনার মতোই লাগে, তবে উল্টাপাল্টা বাজনা। তুই কি কোনো বাজনা শিখতে চাস? পিয়ানো, বেহালা? শুভ্র বলল, না।মোতাহার হোসেন ছেলের গায়ে হাত রাখলেন।

শুভ্র বলল, বাবা, কফি খাবে? আমার ঘরে কফি-মেশিন বসিয়েছি। এই দেখ। কফি খেতে চাইলে আমি তোমাকে এক্সপ্রেসো কফি বানিয়ে খাওয়াতে পারি। এই মেশিনে এক্সপ্রেসো কফি হয়।কফি খাব না।একটা ছবিতে আমি দেখেছিলাম— ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। ছবির নায়ক গরম এক মগ কফি নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে-ভিজতে কফি খাচ্ছে। ছবিটা দেখার পর আমি ঠিক করেছিলাম— কোনো একদিন যদি সিরিয়াস বৃষ্টি নামে, তাহলে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে কফি খাব।মোতাহার হোসেন বললেন, ঠিক আছে, কফি খাওয়া যাক।শুভ্র আগ্রহ নিয়ে বলল, কোথায় ভিজবে বাবা, ছাদে না বাগানে?

তোর যেখানে ইচ্ছা।তাহলে বাগানে চল। দোলনায় বসে দোল খেতে খেতে কফি-উৎসব। AS you wish. বৃষ্টি ভালোই নেমেছে। কফির মাগে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। শুভ্র বলল, বাবা, মগে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে কিন্তু কফি ঠাণ্ডা হচ্ছে না কেন বলে তো? মোতাহার হোসেন বললেন, জানি না।শুভ্র বলল, সব কিছুই রিলেটিভ। কফি যে হারে ঠাণ্ডা হচ্ছে। আমরাও হচ্ছি। কাজেই টেম্পারেচার ডিফারেন্স থেকেই যাচ্ছে।ও আচ্ছা।বাবা, তুমি কি জানো মাঝে-মাঝে অন্ধকারেও বৃষ্টি দেখা যায়?

না জানি না।প্রকৃতি নানান মজা করে। সমুদ্র-ফেনায় ফ্লোরেসেন্ট আলো দিয়ে দেয় বলে অন্ধকারে সমুদ্র-ফেনা দেখা যায়। একইভাবে বৃষ্টির পানিতেও হঠাৎ হঠাৎ ফ্লোরেসেন্ট দিয়ে দেয়, তখন অন্ধকারে বৃষ্টি দেখা যায়।ও আচ্ছা।বাবা, আমি এখন কী করছি জানো? সুন্দর সুন্দর দৃশ্য গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছি— যাতে অন্ধ হয়ে যাবার পরেও স্মৃতি থেকে দৃশ্যগুলি দেখতে পারি।মোতাহার হোসেন জবাব দিলেন না। চুপ করে রইলেন।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *