এই শুভ্র এই পর্ব:৬ হুমায়ূন আহমেদ

এই শুভ্র এই পর্ব:৬

জাহানারা মাইগ্রেনের ব্যথায় কাতর হয়েছিলেন। ব্যথা প্ৰবল হলে তিনি দরজাজানালা বন্ধ করে শুয়ে থাকেন। ঘর থাকে অন্ধকার। এই সময় তার ঘরে কারোরই আসার হুকুম নেই। শুধু সকিনা আসতে পারে। সে বাটি ভর্তি বরফ মেশানো পানি নিয়ে আসে। সেই হিমশীতল পানি দিয়ে তার পায়ের তালু মুছিয়ে দেয়। এতে মাইগ্রেনের ব্যথা সামান্য আরাম হয়।সকিনা বাটি ভর্তি পানি এনেছে। পায়ের তালু মুছিয়ে দিচ্ছে। জাহানারা আরাম পাচ্ছেন। সকিনা নিচু গলায় বলল, মা, উত্তরের জানালাটা একটু খুলব? জাহানারা বিস্মিত হয়ে বললেন, বাইরে ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে, তুমি জানালা খুলবে কেন?

তাছাড়া জানালা কেন বন্ধ করা হয়েছে তুমি জানো। মাইগ্রেনের ব্যথা উঠলে আমি জানালা বন্ধ করি। মাঝে-মাঝে তুমি যে উদ্ভট কথা বলো, আমার খুব রাগ লাগে।সকিনা বলল, মা, আমার ভুল হয়েছে। ক্ষমা করে দেন।জাহানারা বললেন, হঠাৎ জানালা খোলার কথাটা তোমার মনে এসেছে কেন— এটা বলো।জানালা খুললে একটা মজার দৃশ্য দেখতে পেতেন।কী মজার দৃশ্য? সকিনা জবাব দিল না। জাহানারার পায়ে হাত বুলাতে থাকল। জাহানারার ইচ্ছা করছে মেয়েটাকে পা দিয়ে একটা লাথি দিতে। এই মেয়ে মাঝে-মাঝে রাগ দেখায়। রাগ দেখিয়ে কথা বন্ধ করে দেয়। তুই দুই পয়সার চাকরানি, তোর আবার রাগ কী? সকিনা! জি মা।জানালা খুললে কী মজার দৃশ্য দেখব?

সকিনা জবাব দিল না। জাহানারার পায়ে ঠাণ্ডা হাত ঘষতে লাগল। জাহানারা উঠে বসতে বসতে কঠিন গলায় বললেন, যাও জানালা খোল। দেখি কী দৃশ্য। আর একটা কথা মন দিয়ে শোন সকিনা। আমি যে-কোনো দিন তোমাকে বিদায় করে দেব। তোমাকে দিয়ে আমার পোযাচ্ছে না। তুমি গাট্টি-বোচক নিয়ে চলে যাবে। যে গর্ত থেকে এসেছিলে সেই গর্তে ঢুকবে। সেটা কাল সকালেও হতে পারে, আবার একমাস পরেও হতে পারে।

জাহানারা এসে জানালার পাশে দাঁড়ালেন এবং হতভম্ব হয়ে গেলেন। শুভ্র এবং শুভ্রর বাবা দোলনায় বসে আছে। তাদের দুজনের হাতেই মগ। তারা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে মাগে চুমুক দিচ্ছে। জাহানারা বললেন, কী হচ্ছে এসব? সকিনা বলল, দুজনে মজা করছেন।এটা কী রকম মজা? শুভ্রর বাবা কি জানে না যে শুভ্রর ঠাণ্ডার ধাত? সকিনা যাও, আমার জন্যে ছাতা নিয়ে আসা। আমি জিজ্ঞেস করব। এই ফাজলামির মানে কী? সকিনা ক্ষীণ স্বরে বলল, মজা করছে করুক না মা।জাহানারা তীব্র গলায় বললেন, এটার নাম মজা? একে মজা বলে?

সকিনা জবাব দিল না। রাগে-দুঃখে জাহানারার চোখে পানি এসে গেছে। তিনি চোখের পানি লুকানোর চেষ্টাও করছেন না। দুজনে মিলে বৃষ্টিতে মজা করে ভিজছে, তাকে কিছু বলেও নি। তিনিও নিশ্চয়ই কফির মগ হাতে নিয়ে তাদের সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজতে পারতেন।সকিনা! – জি মা।শুভ্র এবং শুভ্রর বাবা এরা আমাকে দেখতে পারে না— এটা তুমি জানো? এই বাড়িতে তোমার যে অবস্থান আমার অবস্থান তারচে আলাদা কিছু না।শুধু শুধু মন খারাপ করবেন না মা।শুধু শুধু মন খারাপ করছি না, আমি সত্যি কথা বলছি। আমার ছেলে সবাইকে ম্যাজিক দেখিয়ে বেড়াচ্ছে। রাম, শ্যাম, যদু, মধু, আধু, বন্ধু, গদু কেউ বাদ নেই, শুধু আমি বাদ।ভাইজান ভেবেছেন। আপনি ম্যাজিক দেখলে মজা পাবেন না— এই জন্যে আপনাকে দেখান নি।তুমি উল্টা-পাল্টা কথা বলবে না। থাপ্পর খাবে। তোমাকে ছেলের হয়ে উকালতি করতে হবে না। তুমি হাইকোর্টের ব্যারিস্টার না। তুমি দুই পয়সার চাকরানি। বুঝেছি?

জি মা বুঝেছি।একটা টাওয়েল রেডি করে রাখ। শুভ্রর বৃষ্টি-বৃষ্টি খেলা শেষ হলেই নিজে উপস্থিত থেকে তাকে মাথা মোছানোর ব্যবস্থা করবে। গরম চা বানিয়ে দেবে। টাওয়েল দিয়ে মাথা পুরোপুরি শুকানো যাবে না। হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে শুকাবে। কাজটা আমিই করতাম। কিন্তু আমি আগামী দুদিন ছেলের মুখ দেখব না।মা, আপনি শুয়ে পড়ুন।আমাকে নিয়ে তোমার ব্যস্ত হতে হবে না। ওরা যতক্ষণ বাগানে বসে। থাকবে, ততক্ষণ আমি ওদের দিকে তাকিয়ে থাকব। আচ্ছা, ওরা কি আমাকে দেখতে পাচ্ছে?

জি-না, দেখতে পাচ্ছে না। ঘর তো অন্ধকার, এই জন্যে দেখতে পাচ্ছে না।দেখতে পাচ্ছে না। এইটুকু বললেই হবে। কেন দেখতে পাচ্ছে না— সেই ব্যাখ্যা তোমাকে দিতে হবে না। তুমি সায়েনটিস্ট না। তুমি আইনস্টাইনের ভাতিজি না। তুমি দুই পয়সা দামের চাকরানি। এই কথাটা তো তোমার মনে থাকে না। তুমি মনে রাখবে।সকিনা বলল, মা, আমার মনে থাকে।জাহানারা বললেন, আবার মুখে মুখে কথা? তিনি সকিনার দিকে ঘুরে তাকালেন এবং শরীরের সব শক্তি দিয়ে তার গালে চড় মারলেন। সকিনা চমকাল না। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। জাহানারা খুবই স্বাভাবিক গলায় বললেন, ওরা তো কোনো কথা বলছে না। চুপচাপ বসে আছে। ঠিক না সকিনা?

সকিনা জবাব দিল না। জাহানারা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলেন, তার মাইগ্রেনের ব্যথা সেরে গেছে।বৃষ্টি কমে এসেছে। ঝিরঝির করে এখনো পড়ছে, সেটা না পড়ারই শামিল। তবে বাতাস আছে। বাতাস অসম্ভব শীতল। হাড়ে কাপন লাগিয়ে দেয়। মোতাহার হোসেন বললেন, ঠাণ্ডা কেমন দেখেছিস? এক্কেবারে সাইবেরিয়ার ঠাণ্ডা। চল উঠে পড়ি।শুভ্ৰ জবাব দিল না। মোতাহার হোসেন বললেন, তোর যদি ঠাণ্ডা লাগে, তোর মা আমাকে জ্যান্ত পুতে ফেলবে। তোর শীত লাগছে না?

শুভ্র বলল, লাগছে। আবার বসে থাকতেও ভালো লাগছে।মোতাহার হোসেন বললেন, তাহলে বরং আরো কিছুক্ষণ বসে ঠাণ্ডা খাই। আচ্ছা শোন, আমাদের ধর্মে যে সাতটা দোজখের কথা আছে- এর মধ্যে একটা না-কি ঠাণ্ডা দোজখ? ঠাণ্ডা দোজখ বলে কিছু নেই। তবে একটা দোজখ আছে যেখানে শারীরিক শাস্তি দেয়া হয় না। মানসিক শাস্তি দেয়া হয়।দোজখটার নাম কী?

হোতামা।আমার মনে হয় আমার স্থান হবে হোতামায়।শুভ্র বলল, তুমি কোনো দোজখেই যাবে না। You are a good man. তুমি কোনো অন্যায় কর নি।মোতাহার হোসেন বললেন, Thank you my son. আমি বড় অন্যায় আসলেই করি নি, তবে ছোটখাটো অন্যায় করেছি।শুভ্র বলল, ছোটখাটো অন্যায় করে থাকলে বড় অন্যায়ও করেছ।মোতাহার হোসেন বললেন, তার মানে কী? অন্যায়ের ব্যাপারটা রিলেটিভ। আইনস্টাইনের দুটা থিওরি আছে- থিওরি অব রিলেটিভিটি এবং স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি। এই থিওরি বস্তুজগতের জন্যে যেমন সত্যি, আমার ধারণা মনোজগতের জন্যেও সত্যি। উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে বলব বাবা? বল।

মনে কর তুমি তোমার অফিসের একজন লোককে চাকরি থেকে ছাটাই করে দিলে। তোমার দিক থেকে ছোট একটা অন্যায় করলে। চাকরি ছাঁটাই হয়ে যাওয়ার কারণে লোকটা পড়ল। মহাবিপদে। সে দ্বিতীয় চাকরি জোগাড় করতে পারল না। তার ছেলেমেয়েরা না খেয়ে দিন কাটাতে শুরু করল। একটা ছেলে মারা গেল বিনা চিকিৎসায়। তার বড় মেয়েটি প্রসটিটিউট হয়ে গেল। এখন তুমি বলো, এই লোকটির কাছে তোমার সামান্য অপরাধটাই কি অনেক বড় অপরাধ না?

হ্যাঁ, আবার তৃতীয় একজনের কাছে কী মনে হবে? এই হচ্ছে থিওরি অব রিলেটিভিটি। Absolute বলে কিছু নেই, সবই রিলেটিভ। এই আমি অন্ধ হয়ে যাচ্ছি- এই ব্যাপারটা আমার কাছে এক রকম। তোমার কাছে আরেক রকম। আবার অন্য একজন অবজারভারের কাছে অন্য রকম।মোতাহার হোসেন বললেন, প্রসঙ্গটা থাক।শুভ্ৰ ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আচ্ছা থাক।শুভ্র টাওয়েল দিয়ে মাথা মুছছে। সকিনা পিরিচে ঢাকা চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে আছে। শুভ্র বলল, চা খাব না।সকিনা বলল, একটা চুমুক হলেও দিন। নয়তো মা রাগ করবেন।শুভ্ৰ চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চুমুক দিল। চুমুক দিয়ে বলল, মসলা চা না-কি? গরম মসলার গন্ধ। চা-টা ভালো হয়েছে। আমি পুরোটাই খাব।সকিনা ইতস্তত করে বলল, ভাইজান, আপনাকে একটা কথা বলব। যদি রাগ না করেন।শুভ্ৰ বিস্মিত হয়ে বলল, কী কথা?

সকিনা বলল, আমাদের গ্রামে একটা অদ্ভুত গাছ আছে। লোকে বলে বহু কাল আগে কুমিরের পিঠে চড়ে এক সাধু এসেছিলেন। তিনি এই গাছ পুঁতেছেন। সাত বছর পরে পরে সেই গাছে ফুল ফোটে। সবুজ আর নীল রঙের মিশাল দেয়া ফুল। আমি খবর পেয়েছি গাছে ফুল ফোটা শুরু হয়েছে। আমার খুবই শখ আপনারে এই গাছের ফুলগুলো দেখাব। গাছটার নাম কী? কেউ নাম জানে না ভাইজান। সবাই বলে অচিনবৃক্ষ।বাহ কী সুন্দর নাম— অচিনবৃক্ষ! সবাই বলে গাছে যখন ফুল ফুটে, তখন গাছে হাত দিয়ে আল্লাহপাকের কাছে যা চাওয়া যায়। তাই পাওয়া যায়।কত বড় গাছ? অনেক বড় ভাইজান। রেন্টি গাছের মতো বড়। তেঁতুল গাছের পাতার মতো চিরল চিরল পাতা।তুমি কি এই গাছের কাছে কখনো কিছু চেয়েছ? সাত বছর আগে যখন ফুল ফুটিল তখন?

ভাইজান, তখন তো আমার বিচার-বুদ্ধি ছিল না।শুভ্র আগ্রহ নিয়ে বলল, এখন তো তোমার বিচার-বুদ্ধি হয়েছে। এখন তুমি গাছের কাছে কী চাইবে? সকিনা জবাব দিল না। শুভ্র বলল, তোমাদের গ্রামের বাড়ি কোথায়? সকিনা বলল, কুষ্টিয়ার মেহেরপুর। গ্রামের নাম নিমতলি, পোস্টাফিস নিমতলি।শুভ্র বলল, আমি অবশ্যই তোমাদের গ্রামের অচিনবৃক্ষ দেখতে যাব।বর্ষার মধ্যে যেতে হবে ভাইজান। আষাঢ়-শ্রাবণ— এই দুই মাস ফুল থাকে।শুভ্র বলল, আমি এই বর্ষার মধ্যেই যাব। তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাব।সকিনা দাঁড়িয়ে আছে। তার মনে হয় আরো কিছু বলার আছে। শুভ্র বলল, আর কিছু বলবে?

সকিনা না-সূচক মাথা নাড়ল। তারপর অতিরিক্ত ব্যস্ততায় ঘর থেকে বের হতে গিয়ে দরজায় ধাক্কা খেল।শুভ্ৰ কম্পিউটার খুলল। নোটবুকে লিখে রাখতে হবে অচিনবৃক্ষের ব্যাপারটা।নিমাতলি গ্রামের অচিনবৃক্ষ দেখতে যাব। বর্ষাকালে এই বৃক্ষে সবুজ আর নীল রঙের ফুল ফোটে। এই গাছটির পাতা তেঁতুল পাতার মতো চিরল বিরল।শুভ্রর নোট বই ভর্তি নানান পরিকল্পনা। যার কোনোটিই এখনো করা হয় নি।বনের ভেতর আষাঢ়ি পূর্ণিমা দেখতে যাব। আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা-অমাবস্যায় সবসময় বৃষ্টি হয়। যদি বৃষ্টি না হয় তাহলে বনের জোছনা খুব সুন্দর হওয়া উচিত। বৃষ্টি হলেও বা ক্ষতি কী! বনের মধ্যে বৃষ্টির শব্দ শোনাও ইন্টারেস্টিং হবার কথা। আচ্ছা গৌতম বুদ্ধ যে গৃহত্যাগ করেছিলেন তার সঙ্গে কি পূর্ণিমার কোনো সম্পর্ক ছিল? পূর্ণিমা কি তাঁকে গৃহত্যাগে প্রভাবিত করেছে?

বরফের দেশে জোছনা দেখতে যেতে হবে। বরফের দেশে আমি অনেকবার গিয়েছি। সবই সামারে। আমার ধারণা বরফে জোছনা খুব সুন্দর হবে। শীতের সময় জোছনার খবরাখবর নিয়ে ভুটান গেলে ভালো হবে।শুভ্র ফাইল বন্ধ করে ইন্টারনেটে গেল। আত্রলিতার সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করতে ইচ্ছা করছে। বৃষ্টিতে ভেজার অদ্ভুত সুন্দর অভিজ্ঞতাটা আত্রলিতাকে বলতে ইচ্ছা করছে।কেমন আছ আত্রলিতা? ভালো। খুব ভালো। অসম্ভব ভালো।বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ঝামেলা মিটে গেছে? হ্যাঁ।দুজন একসঙ্গে কনসার্টে বাজনা বাজাচ্ছ? হ্যাঁ।কী বাজনা?

নাচের বাজনা ওয়াল্টজ।তোমার আনন্দে আমি আনন্দিত।তোমার চোখ কেমন? এখনো দেখতে পাচ্ছি।আজ সারাদিনের সবচে সুন্দর দৃশ্য কী? দোলনায় দোল খেতে খেতে বৃষ্টিতে ভেজার দৃশ্য।তোমার মা কি এসে জানালার পাশে দাঁড়িয়েছেন? এখনো দাঁড়ান নি। তবে দাঁড়াবেন।তোমার প্রতি তোমার মা যে ভালোবাসা দেখাচ্ছেন, তোমার কি মনে হয় না। তাতে বাড়াবাড়ি আছে? হ্যাঁ মনে হয়।বাড়াবাড়ি ভালোবাসার কারণ কী তুমি জানো? জানি।আমাকে বলবো? শুভ্র ক্যাপিটাল লেটারে অনেক বড় অক্ষরে লিখল- NO.

আজ নিয়ে আঠারো দিন পার হলো মনজু মায়া লজের এক তলায় বাস করছে। আঠারো দিনে তার কোনো ডিউটি পড়ে নি। ছোট সাহেব বাড়ি থেকে বের হন নি। সেও আটকা পড়ে আছে। তার কোথাও যাবার কোনো উপায় নেই। কখন ডাক পড়ে! মায়া লজের সামনের রাস্তার পাশে চায়ের দোকান পর্যন্ত সে যেতে পারে। ডিউটির ডাক পড়লে দারোয়ান এসে ডেকে নিয়ে যাবে। চায়ের দোকানে তো। সারাদিন বসে থাকা যায় না।

গত আঠারো দিনে তিনবার তার মনে হয়েছে– ধুত্ত্বরি! চাকরিতে পিসাব করি। আমি চললাম। যেটা মনে হয় সেটা করা কখনোই সম্ভব হয় না। চাকরিটা তার খুবই দরকার। যদিও সে সবাইকে বলে বেড়ায় বাবা-মা কেউ নেই, সেটা ঠিক না। বাবা মারা গেছেন ঠিকই। মা আছেন এবং মার ঘাড়ে সিন্দাবাদের ভূতের মতন আছে। সৎবাবা। সৎবাবার কোনো কাজ-কর্ম নাই। তবে নানাবিধ কু-নেশা আছে। তাকে নিয়মিত গাজা খেতে হয়। গাজা খেলে শরীর ঠিক রাখার জন্যে দুধ খেতে হয়। বলকারক খাওয়া-দাওয়াও খেতে হয়।

মনজুর মা রহিমা বেগম এইসব বলকারক খাওয়া এবং নেশার জোগান দেয়ার জন্যে অতি ব্যস্ত থাকেন। নিম্নশ্রেণীর এই মানুষটির প্রতি তার মার সীমাহীন মমতার (কিংবা প্ৰেম) কোনো কারণ মনজু জানে না।মনজুর দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। সবচে ভালো বিয়ে যার হয়েছে, তার স্বামী ইতালিতে জুতার দোকানে কাজ করত। যখন সব ঠিকঠাক সে তার স্ত্রী এবং দুই পুত্রকে ইতালিতে নিয়ে যাবে, তখনই খবর পাওয়া গেল বাবাজি জনৈকা স্প্যানিশ কন্যা বিয়ে করে ফেলেছে।

মনজুর সেই বোন এখন দুই বাচ্চা নিয়ে তার মার কাছে উঠে এসেছে। মনজুর সৎবাবা ইসমাইল সর্দার প্রথম কিছু দিন খুব লাফালাফি ঝাপঝাঁপি করেছেন— তালাক না দিয়ে দ্বিতীয় বিবাহ? আমারে তুমি চিন না? তোমারে আমি ইতালির কুত্তার গু চেটে খাওয়াব। এম্বেসির মাধ্যমে যখন মামলা শুরু হবে, তখন পাতলা পায়খানা করতে করতে তোমার জীবন যাবে। স্ত্রীর পায়ে তো ধরবোই, দুই শিশুপুত্রের পায়ে ধরেও মাফ চাইতে হবে। ইসমাইল সর্দারের ঝাপঝাপি লাফালাফি দুই-তিনের মধ্যেই স্তিমিত হয়ে পড়ল। তার সময় কাটতে লাগল স্বামী-পরিত্যক্ত অনজুর দুই যমজ পুত্রের সঙ্গে চিৎকার চেঁচামেচি করে। এদের সর্বশেষ খবর মনজু তার মার চিঠিতে পেয়েছে। মা লিখেছেন—

মনজু

দোয়াগো।

বাপজান, পর সংবাদ তোমার চাকরিপ্রাপ্তির সংবাদ শুনিয়া অত্যন্ত খুশি হইয়াছি। আল্লাহপাকের দরবারে লাখো শুকরিয়া। তুমি যে ভালো চাকরি পাইবে, ইহা তোমার সৎবাবা আগেই খোয়াবে পাইয়াছেন। তিনি শেষরাত্রে স্বপ্নে দেখেছিলেন তুমি অতি বৃহৎ একটি কাতল মাছ হাতে নিয়া বাড়ি ফিরিতেছ। তোমার সৎবাবা মানুষটা গাঁজা-ভাঙ যাই খাক, তাহার ভিতরে কিছু পীরাতি আছে। সাক্ষাতে তোমার সৎবাবার পীরীতির কিছু টুকটাক কথা তোমাকে বলিব। তুমি বিস্মিত হইবে।

এখন ঘরের সংবাদ শোন। সংসারের অবস্থা বেহাল। বলা চলে প্রায় উপবাসের সম্মুখীন হইয়াছি। বর্গাদাররা ধানচাল কিছুই ঠিকমতো দিতেছে না। বাড়ির যে এক অংশ জনৈক এনজিও কমীকে ভাড়া দিয়াছি, সেও নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করিতেছে না। প্রতিমাসেই নানান টালবাহানা করে। অন্যজু তার দুই পুত্র নিয়া উপস্থিত হওয়াতে আরো ঝামেলায় পড়িয়াছি। অনঙ্গুর স্বামী ইতালি হইতে তাহার স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়া কাগজপত্র পাঠাইয়াছে। সব কাগজপত্ৰ আমি লুকাইয়া রাখিয়াছি। অন্যজু এখনো আশায় আশায় আছে যে ডিভোর্স হয় নাই। যদি জানে ডিভোর্সের কাগজ চলিয়া আসিয়াছে, তাহা হইলে সে কী করিবে তার নাই ঠিক। গলায় ফাস দেয়া বা বিষ খাওয়া বিচিত্র কিছু না।

তোমার সৎবাবা অনজুর পুত্র দুইটির খোরপোষ আদায়ের জন্যে মামলা করিতে চান। এই বিষয়ে তিনি অনজুর শ্বশুরের সঙ্গেও পরামর্শ করিতে চান। তুমি তো জানো, এইসব বিষয়ে তোমার সৎবাবার চিকন বুদ্ধি। তিনি অবশ্যই খোরপোষের ব্যবস্থা করিতে পরিবেন, তবে তার জন্যও টাকার প্রয়োজন। তুমি অতি শীঘ্রই ব্যবস্থা কর।উনার শরীরও ভালো যাইতেছে না। এই বয়সে বিছানায় পড়িয়া গেলে আর উঠিতে পারিবে না। আমি কবিরাজের পরামর্শে তার জন্যে ছাগ-দুগ্ধের ব্যবস্থা করিয়াছি। হাত একেবারেই খালি। সমস্ত ব্যবস্থাই ধার-দেনা করিয়া করিতে হইতেছে। তুমি অতি শীঘ্রই ব্যবস্থা কর।

এদিকে অনজুর দুই ছেলে বড় উৎপাত করিতেছে। আমি আমার জীবনে এরকম গুণ্ডাপ্রকৃতির শিশু দেখি নাই। ঘটনা কী হইয়াছে শোন। তোমার সৎবাবার শরীরটা ভালো যাইতেছে না। আগেই বলিয়াছি। গত সোমবার দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর তিনি ঘুমাইতেছিলেন। তখনই এই দুই গুণ্ডা ঘুমের মধ্যেই তাহাকে কামড়াইয়া ধরে। একজন ঘাড়ে কামড় দেয়। অন্যজন ডান পায়ের হাঁটুতে। রক্তারক্তি কাণ্ড। আমি এবং অন্যজু আমরা দুইজনে মিলিয়া এই দুই বজ্জাতকে ছুটাইতে পারি না এমন অবস্থা। উনাকে এটিএস ইনজেকশন দেওয়া হইয়াছে। আমি দুই বজ্জাতকে কিঞ্চিৎ শাসন করিয়াছি বলিয়া অনজু আমার সহিত বাক্যালাপ বন্ধ করিয়া দিয়াছে। আমার হইয়াছে উভয়সংকট।

যাই হোক বাবা, সংসারের এইসব টুকিটাকি নিয়া তুমি উদ্বিগ্ন থাকিও না। মন লােগাইয়া কাজ করা যেন মালিক সন্তুষ্ট থাকেন।নিশ্চয়ই এক তারিখে তোমার বেতন হইবে। বেতন হওয়া মাত্র তোমার পক্ষে যতটা পাঠানো সম্ভব ততটা পাঠাইবে। সংসারের অবস্থা ভয়াবহ। সব কথা খুলিয়া বলা যাইতেছে না। এই বিষয়ে আরেকটি জরুরি কথা বলি। পোস্ট অফিসে ইদানীং টাকা মারা যাইতেছে। মনিঅৰ্ডার ঠিকমতো পৌঁছিতেছে না। তোমার সৎবাবা একটি ভালো বুদ্ধি দিয়াছেন। উনি বলিয়াছেন প্রতি মাসের এক তারিখে ঢাকা গিয়া তোমার নিকট হইতে টাকা নিয়া আসিবেন। তাহার আসা-যাওয়াতে কিছু বাড়তি খরচ হইলেও টাকা মার যাইবে না। এসব বিষয়ে উনার বুদ্ধি অতি পরিষ্কার। তুমি কী বলো? উনার নিজের জন্যেও ঘোরাঘুরির কিছু প্রয়োজন আছে। একটা মানুষ তো আর দিনরাত ঘরে বসিয়া থাকিতে পারে না। বেচারার এমিতেও ভ্রমণের শখ। বয়সকালে দার্জিলিং বোম্বাই এইসব জায়গায় বেড়াইয়াছে। এখন টাকাপয়সার অভাবে গৃহবন্দি।

কাগজ শেষ হইয়া গিয়াছে বলিয়া আর কিছু লিখিতে পারিতেছি না। সংসারের এমন হাল যে চিঠি লেখার কাগজ পর্যন্ত নাই। সবই আল্লাহপাকের পরীক্ষা। উনি দুঃসময় দেন, আবার উনিই সুসময় দেন। বাবাগো, আল্লাহপাককে সর্বদা স্মরণ রাখিও। শুক্রবারের জুম্মার নামাজ যেন কখনো মিস না হয়। তোমার সৎবাবাকেও দেখি অন্য নামাজ পড়তে পারেন বা না পারেন। জুম্মার নামাজ মিস হয় না।

ইতি

তোমার মা রহিমা বেগম

মার চিঠি মনজু কখনো দ্বিতীয়বার পড়ে না। দ্বিতীয়বার পড়ার মতো কোনো বস্তু চিঠিতে থাকে না। তার সব চিঠি একরকম— অভাবের ঘ্যানঘ্যাননি, প্যানপ্যাননি। মাঝে মাঝে তরকারিতে লবণের মতো ইসমাইল সর্দারের চিকন বুদ্ধির প্রশংসা। মনজু অবশ্যি মায়ের এবারকার চিঠি পাঁচবার পড়ল। ইসমাইল সর্দার কামড় খেয়ে কুপোকাৎ— এই অংশটা পড়ার জন্যেই পাঁচবার পড়া। বাচ্চা দুটার জন্যে অবশ্যই ভালো কোনো উপহার কিনে পাঠাতে হবে। দাঁতের জন্যে আলাদা ভিটামিন। এদের নামও বদলে দিতে হবে। একজনের নাম হবে টুং, আরেকজনের নাম টাং।

মায়ের চিঠির জবাব এখনো লেখা হয় নি। একেক সময় একেক জবাব মাথায় আসছে। যত সময় যাচ্ছে চিঠির জবাবের ভাষা পাল্টে যাচ্ছে। ভাষা নরম হয়ে আসছে। চিঠি পড়ার পর পর যে জবাবটা মাথায় এসেছিল সেটা এক লাইনের জবাব এবং ইংরেজিতে—

Everybody go to hell.

পরদিন মাথায় জবাবটা এলো বাংলায়। ভাষা এত কঠিন না। তবে নরমও না। মাঝামাঝি।মা শোন, তোমার ইসমাইল সর্দারের প্যানপ্যাননি বন্ধ করবে? অবশ্যই তুমি তাকে আমার কাছে পাঠাবে না। চিকন বুদ্ধির লোক আমার পছন্দ না। তার চিকন বুদ্ধি তোমার জন্য তোলা থাকুক। আমার দুই ভাগ্নেকে আদর ও দোয়া দিবে। তারা উত্তমকর্ম করেছে। এবং শরীর ভালো কয়ারর জন্যে তাদেরকে এই পরামর্শ দিবে। এবং শরীর ভালো করার জন্যে তাদেরকেও ছাগ-দুগ্ধ খাওয়াবে। আরেকটা কথা, আমি কোনো টাকা-পয়সা পাঠাতে পারব না। আমার চাকরির কোনো ঠিক নেই। যে-কোনো মুহুর্তে চাকরি চলে যাবে। আর যদি নাও যায়, আমি নিজেই ছেড়ে দেব।

চাকরি ছেড়ে দিব কারণ এই চাকরি আমি করতে পারছি না। আমার কাজ কী জানো? আমার কাজ- চব্বিশ ঘণ্টা ঘরে বসে থাকা। যদি ডিউটিতে ডাক পড়ে তাহলে ডিউটিতে যাব। ডিউটির ডাকের জন্যে অপেক্ষা— কী যে কষ্টের ব্যাপার তুমি বুঝবে না। যাদের যাবজীবন হয়েছে, আমার মনে হয় তারাও আমার চেয়ে সুখী…।

এই চিঠিও শেষপর্যন্ত লেখা হয় নি এবং পাঠানো হয় নি। মনজুর আসলে কোনো কিছুতেই মন বসছে না। দিন কাটছে না। প্রতিদিন একই রুটিন— সকালে নাস্তা (নাস্তাও এক রকম, খিচুড়ি ডিম ভাজি), নাস্তার পর ঘরের সামনে সকাল এগারোটা পর্যন্ত বসে থাকা।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *