এই শুভ্র এই পর্ব:৭ হুমায়ূন আহমেদ

এগারোটার পর শুরু হয় ড্রাইভারদের ক্যারাম খেলা। ঘণ্টা দুই ক্যারাম খেলা দেখা। সবচে ভালো খেলে চশমা পরা দারোয়ান। সে আবার সিঙ্গেল খেলে না। বাজি ছাড়াও খেলে না। দশ টাকা বাজি রেখে তার সাথে খেলতে হয়। দুপুরের খাওয়ার পর ঘুম। ঘুম থেকে উঠে বাড়ির সামনের চায়ের দোকানে ঘণ্টা দুএক বসে থাকা। রাত দশটা থেকে শুরু হয় ড্রাইভারদের তাস খেলা। খেলার নাম কাচু। ঘণ্টা দুই খেলা দেখে ঘুমাতে যাওয়া।বাড়ির কেয়ারটেকার রহমতুল্লাহ সাহেবের ঘরে টেলিভিশন আছে। কোনো কোনো রাতে নাটক থাকলে নাটক দেখা। এক জোড়া নায়ক-নায়িকা প্ৰেম করে। কেন করে তারা জানে না। তাদের মধ্যে মিলন হয়।

কেন হয় কে জানে! আবার মাঝে মাঝে বিরহ হয়। কী জন্যে হয় তাও বোঝা যায় না।রহমতুল্লাহ সাহেবের ঘরে টিভি দেখতে যাওয়াও শাস্তির মতো। তিনি সারাক্ষণ শরীর চুলকান এবং কথা বলেন। তার কথাও টিভির নাটকের মতো। কেন বলেন, কী জন্যে বলেন, তিনি জানেন না। তার কমন ডায়ালগ হচ্ছে— মন দিয়ে কাজ কর। কাজে দিবে মন মিলিবে ধন। বাঙালির কোনো আয়-উন্নতি নাই কারণ তাদের কাজে মন নাই। তাদের মন কোথায়? তাদের মন অজুহাতে। কাজ না করার অজুহাত। বাঙালির তিন হাত। ডানহাত, বামহাত আর অজুহাত। তিনটা হাতের মধ্যে সে ডানহাত-বামহাত কোনোটাই ব্যবহার করে না। ব্যবহার করে শুধু অজুহাতটা।

বুড়ো যখন বকবক করতে থাকে, তখন মনজু এমন ভাব করে যেন সে বুড়োর প্রতিটা কথা গিলে খাচ্ছে। আসলে সে তখন মনে মনে বলে, এই বুড়া, চুপ করবি? চুপ না করলে টান দিয়ে তোর জিব ছিড়ে ফেলব। তুই যখন কথা বলিস, তখন তোর মুখ দিয়ে থুথু বের হয় এটা জানিস? তোর থুথু খাওয়ার জন্যে বসেছি? রহমতুল্লাহ আবার হঠাৎ হঠাৎ কোথেকে মদ খেয়ে আসে। এই সময় তার।্যবহার হয় অতি মধুর। হাসি ছাড়া মুখে কথা নেই। কথা বলবে গায়ে হাত দিয়ে। মাতালের নেশা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমে— এই বুড়োর উল্টো নিয়ম। রাত যতই গভীর হয়, তার নেশা ততই বাড়ে। এক পর্যায়ে শুরু হয় কেচ্ছা কাহিনী। সব কেচ্ছা কাহিনীই মায়া লজ কেন্দ্ৰিক।

এই যে মনজুমিয়া, এই বাড়িতে ভূত আছে জানো? ভূত ঠিক না, পেত্নী। অনেকেই দেখেছে। আমি নিজে দেখেছি দুইবার। প্রথমবার দেখি চৈত্র মাসে। হয়েছে কী, সেবার গরম পড়েছে বেজায়। ফ্যানের বাতাসে কোনো কাজ হয় না। উল্টা শরীর জ্বালাপোড়া করে। রােত তখন দুটা-আড়াইটা বাজে। আমি ভাবলাম বাগানে গিয়া বসি। শরীরটা ঠাণ্ডা করে আসি। রওনা হয়েছি বাগানের দিকে, কিছুদূর যাবার পরে দেখি, দোলনায় একটা মেয়েছেলে আপন মনে দোল খাচ্ছে। আমি থমকে দাঁড়ালাম। প্রথমে মনে হলো ছোট সাহেবের মা। উনি এত রাতে দোলনায় বসে আছেন কেন— এটা বুঝলাম না। বাগানে উনার আসার কথা না। উনি কুত্তা ভয় পান। তাহলে কি কাজের মেয়েদের কেউ?

কাজের মেয়েদের এত সাহস হবার কথা না। আমি ধান্ধায় পড়ে গেলাম। তখন দেখি, দোলনায় বসা মেয়ে হাত ইশারায় আমাকে ডাকল। আমি আগায়ে গিয়েছি। রাত দুটার সময় দোলনায় বসে থাকে, হাত ইশারায় আমাকে ডাকে, মেয়েটা কে আমার দেখা দরকার। আমার সন্দেহ হলো, ড্রাইভার-দারোয়ান এদের কেউ বাজারের মেয়ে ভিতরে পাচার করেছে কি-না। আগে একবার এইরকম ঘটনা ঘটেছিল, তাতে তিনজনের চাকরি চলে যায়। তবে দোলনায় বসা মেয়েটাকে বাজারের মেয়ের মতো মনে হচ্ছে না। মাথায় ঘোমটা দিয়ে শাড়ি পরেছে। নিজেকে ঢেকে-ঢুকে খুবই ভদ্রভাবে বসেছে। চুল খোঁপা করা। বাজারের মেয়েরা চুল খোঁপা করে না। ছেড়ে রাখে।

আমি আরো কয়েক কদম আগায়েছি। হাসির শব্দ শুনলাম। মানুষের হাসি না। জন্তু-জানোয়ারের হাসি। ভকভক শব্দ। মেয়েটা হাসছে নাকি? এটা কী রকম হাসি? আমি বললাম, তুমি কে? বলে তাকিয়েছি, দেখি মেয়েটা ঠিকই দোলনায় বসে আছে, তবে তার গায়ে একটা সুতা নাই। ঘটনা এইখানে শেষ না। মেয়েটা তখন কথা বলা শুরু করল। মিষ্টি গলার স্বর। আমাকে বলল, গরম বেশি বলে কাপড়-চোপড় খুলে ফেললাম। তুই মনে কিছু নিস না। তুই আমার ছেলের মতো। ছেলের সামনে মায়ের আবার লজ্জা কী? আমার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম। আমার জ্ঞান ফিরল পরদিন সকালে।… আমার কথা তোমার বিশ্বাস হয় না? যদি আমি একটা শব্দ মিথ্যা বলি, তাহলে আমি সতী মায়ের গর্ভের সন্তান না। আমি জারজ, আমার পিতা জারজ। এখন বিশ্বাস হয়?

নতুন চাকরি করতে এসেছি। মনে অনেক রঙ ঢঙে। শোন মজনু মিয়া, এই বাড়ি কোনো সহজ বাড়ি না। এই বাড়ি জটিল বাড়ি। এই বাড়ির হিসােব জটিল হিসাব। তুমি ভাবতেছ। আমি এক মাতাল লোক। মাতালের কথার হিসাব নাই। ভুল ভাবতেছ। বেহিসেবি কথা কয় সুস্থ মানুষ। মাতাল বলে হিসাবের কথা। সমস্যা একটাই, তোমাদের মুখে ছাকনি আছে। মাতালের মুখে ছাকনি নাই।এই বাড়ির আরেকটা হিসাব একটু বিবেচনা কর— ছোট সাহেবরে তো দেখেছ, তোমার শুভ্ৰ ভাইজান। তার মতো সুন্দর চেহারার যুবক দেখেছ? দেখ নাই। দেখার উপায় নাই। তার মতো সুন্দর আরেকটা পুরুষ জন্মেছিল। তার নাম জানো?

হাদিস-কোরান পড়বা না, নাম জানিবা কীভাবে? তিনিও একজন নবী। তার নাম ইউসুফ। যার প্রেমে পাগল হয়েছিলেন জুলেখা বিবি। এখন কথা হলো, আমাদের ছোট সাহেবের চেহারা রূপকথার রাজপুত্রের চেয়েও সুন্দর। তার পিতার চেহারা ছবি কী? পোড়া কাঠ। লঙ্কার হনুমান। আর মার চেহারা কী? বিড়ালমুখি। দেখলে মনে হয় সাদা হুতা বিড়াল। Cat women। এত সুন্দর একটা ছেলে যে তাদের হয়েছে হিসাবটা কী? মাঝে-মধ্যে চিন্তা করব। চিন্তার খোরা দিয়া দিলাম। Food for thought.

চিন্তায় মিলে বস্তু, না চিন্তায় নাই। জাগরণে দেখি না যারে, নিদ্রায় পাই।তোমারে পছন্দ হয়েছে বলেই ভিতরের দুএকটা কথা বললাম। আরো যদি পছন্দ হয় আরো বলব। বুঝেছি? এখন আর কথা বলতে পারতেছি না। বমি চাপাচ্ছে। আমাকে বাথরুমে নিয়ে যাও। বমি করব। পিছন দিক দিয়া ধর। সামনে থাকবা না। সামনে থাকলে তোমার শরীরে বমি করতে পারি। বমির পরে আমার হাত-মুখ ধোয়াইয়া বিছানায় শোয়ায়ে দিবা। এবং দুই পায়ের চিপায় দিবা কোলবালিশ।

আমি তোমারে পুত্রের মতো দেখি, তুমি আমারে দেখবা পিতার মতো। এটাই হলো হিসাবের কথা। জগৎ চলে হিসাবে। যিনি জগৎ চালান, আমরা যাকে বলি আল্লাহ, খ্রিষ্টানের পুতরা বলে God, মালাউনরা বলে ঈশ্বর, তিনি অংকে বড়ই পাকা। সবসময় দশে দশ। বুঝেছি? জ্ঞানের কথা বললাম। সব সময় বলি না। তোমাকে স্নেহ করি বলে বলেছি। ওয়াক ওয়াক ওয়াক! শালার বমি। তুই থাকাস কই?

মায়া লজের স্টাফদের বেতন হয় মাস পুরা হবার একদিন আগে। ত্ৰিশ মাস হলে ত্ৰিশ তারিখে, একত্ৰিশ মাস হলে একত্রিশ তারিখে। বেতন দেন রহমতুল্লাহ। রেভিনিউ স্ট্যাম্পে সই করে বেতন নিতে হয়। মনজু তার জীবনের প্রথম বেতন নিল। ছয় হাজার টাকা অ্যাডভান্সের কিছু বেতন থেকে কাটার কথা। দেখা গেল বেতন কাটা হয় নি। রহমতুল্লাহ বললেন, বেতন আসে হেড অফিস থেকে। তারা কাটে নাই। হেড অফিস কোনোদিন ভুল করবে না। তোমাকে যে অ্যাডভান্স দেয়া ওয়েছিল সেটা মাফ হয়ে গেছে। মনজু বলল, মাফ হবে কেন?

রহমতুল্লাহ বললেন, কোম্পানিতে যারা চাকরিতে ঢুকে, তাদের সবাইকে প্রথমে এক মাসের বেতন লোন হিসেবে দেওয়া হয়। মাসে মাসে কাটা হবে। এরকম বলা থাকে। শেষপর্যন্ত কাটা হয় না। এই কোম্পানিতে চাকরির এটা এক সুবিধা।মনজু আনন্দিত গলায় বলল, বলেন কী? রহমতউল্লাহ বললেন, অত খুশির কিছু নাই। সুবিধা যেমন আছে অসুবিধাও আছে।মনজু বলল, অসুবিধা কী?রহমতউল্লাহ বললেন, এত প্যাচাল তোমার সঙ্গে পারতে পারব না। সুবিধাঅসুবিধা নিজেই জানবা।মনজু বলল, চাচাজি, আমি কি ঘণ্টা দুই তিনের জন্যে ছুটি পাব? এতদিন ধরে এক জায়গায় পড়ে আছি, দম বন্ধ হয়ে আসছে।

রহমতউল্লাহ বললেন, চাকরির অসুবিধার কথা জানতে চেয়েছিলা। এই হলো এক অসুবিধা। দম বন্ধ হয়ে আসে। দম ফেলার জন্যে যেখানে যাবে দেখবে সেখানেও দম বন্ধ। ঘর বাহির সমান। খবর পেয়েছি ছোট সাহেবের শরীর খারাপ, তাকে দেখতে ডাক্তার এসেছে। কাজেই যেখানে ইচ্ছা যাও। রাত এগারোটার আগে ফিরব। এগারোটায় গোট বন্ধ।রুনু সবসময় লক্ষ করেছে সে যখন খুব মন দিয়ে কিছু করে তখনি কলিংবেল বাজতে থাকে। সেই কলিংবেলের শব্দ বাড়ির আর কেউ শোনে না। শুধু সে একা শুনতে পায়।

রুনু তার বান্ধবীর নোট কপি করছিল। একগাদা নোট সকালে ফেরত দিতে হবে। এই সময। কলিংবেল বাজছে। বাসায় বাবা আছে, মা আছে, একটা কাজের মেয়ে আছে। কলিংবেলের শব্দ কেউ শুনছে না। রুনু ঠিক করল, কলিংবেল বাজতে থাকুক, সে দরজা খুলবে না। বাসায় দরজা খোলার দায়িত্ব শুধু তার একার কেন হবে? বাড়ির অন্য সদস্যরা যদি সময় সময় বধির হতে পারে, তাহলে সেও পারে।শেষপর্যন্ত রুনুকেই উঠতে হলো। মহাবিরক্ত হয়ে সে দরজা খুলল। দুই হাতে দুই বাজারের ব্যাগ নিয়ে মনজু দাঁড়িয়ে আছে। রুনু বলল, একী!মনজু বলল, রুনু, ভালো আছ?

রুনু চিৎকার দিয়ে বলল, মা, মনজু ভাই এসেছে।চিৎকার দিয়ে সে নিজে খুবই লজ্জিত হয়ে পড়ল। সে ভেবেই পাচ্ছে না। এত জোরে সে চিৎকারটা কেন দিল! মনজু ভাই কি এমন কেউ যে তাকে দেখে কানের পর্দা ফাটিয়ে চিৎকার দিতে হবে? শায়লা রান্নাঘরে মাছ কুটছিলেন, তিনি সেখান থেকে ছুটে এলেন। ইকবাল সাহেব ভেতরের বারান্দায় খবরের কাগজ পড়ছিলেন। তিনি চলে এলেন কাগজ হাতে। সবার ব্যস্ততা এমন যে এই বাড়ির অতি প্রিয় একজন দীর্ঘ নিরুদ্দেশের পর ফিরে এসেছে। শায়লা বললেন, বাবা, তুমি এতদিন কোথায় ছিলে? আমাদের একটা খোঁজ দিবে না?

ইকবাল সাহেব বললেন, একটা ফরওয়ার্ডিং অ্যাড্রেস রেখে গেলে আমিই খুঁজে বের করতাম। কিছুই রেখে যাও নাই। তোমার তো দেখি কাণ্ডজ্ঞান বলে কিছু নাই।রুনু বলল, ব্যাগে করে কী এনেছেন বের করেন।মনজু বলল, সামান্য কাচাবাজার। মাছ-মাংস।রুনু বলল, লোকজন আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে এলে মিষ্টি আনে, দই আনে। আপনি আনেন কাচাবাজার। আপনার এই অদ্ভুত অভ্যাস কেন? মনজু বলল, মাকে খুশি করার জন্যে কাঁচাবাজার আনি। পৃথিবীর সমস্ত মায়েরা কাচাবাজার দেখলে খুশি হয়।রুনু বলল, পৃথিবীর সমস্ত মায়েদের খবর আপনি জেনে গেছেন? আপনি কাচাবাজার আনেন। কারণ আপনি পেটুক মানুষ, খেতে পছন্দ করেন।

মনজু ব্যাগ থেকে জিনিসপত্র বের করছে। সবাই আগ্রহ করে দেখছে। প্রথমে বের হলো মাঝারি সাইজের একটা কাতল মাছ। ইকবাল সাহেব বললেন, মাছটা ফেস আছে। বিলের কাতল। টেস্ট ভালো।তারপর বের হলো একটা ইলিশ মাছ। মোটামুটি বড় সাইজের গলদা চিংড়ি। বড় বড় শিং, মাছ। কিছু মলা মাছ। খাসির একটা আস্ত পা।শায়লা আনন্দিত গলায় বললেন, এত কিছু এনেছ কেন? তোমার কি মাথাটা খারাপ হয়েছে? রাতে কী খাবে বলো? রাতে কী রান্না করব? মনজু বলল, ঝাল দিয়ে শিং মাছের ঝোল রান্না করেন। শিং মাছের ঝোল খেতে ইচ্ছা করছে।আর কী খাবে? ভাপে ইলিশ করব?

করেন।তোমার মামা এনেছে পাবদা মাছ। আজ তিন রকম মাছ থাকুক।রুনু বলল, ভাপে ইলিশ আমি রান্না করব মা।শায়লা বললেন, তোর রান্না করতে হবে না। তুই মনজুর সঙ্গে গল্প কর।রুনু বলল, দুই দিন পরে আমার পরীক্ষা, এখন আমি উনার সঙ্গে গল্প করব? তোমার ছেলে তুমি গল্প কর। আমার এত গল্প করার শখ নাই।শায়লা রান্না বসিয়েছেন। ইকবাল সাহেব মোড়া পেতে রান্নাঘরে বসে আছেন। আয়োজনের রান্না-বান্না দেখতে তার ভালো লাগে। তার হাতে চায়ের কাপ। খুবই আরাম করে তিনি চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। শায়লা বললেন, আমি একটা বিষয়ে মনস্থির করেছি। তুমি কোনো আপত্তি করতে পারবে না।ইকবাল সাহেব বললেন, কোন বিষয়ে? শায়লা বললেন, কোন বিষয় তা তুমি অনুমান করতে পারছি। পারছি না?

হুঁ।তোমার কিছু বলার আছে? ইকবাল সাহেব বললেন, ছেলে খুবই ভালো কিন্তু মেয়ের মতামতের একটা বিষয় আছে।শায়লা বললেন, তার আবার কিসের মতামত? ইকবাল সাহেব বললেন, আমার অবশ্য ধারণা মেয়ে ছেলেটাকে খুব পছন্দ করে। যে চিৎকার দিয়েছিল এখনো কানে তালা লেগে আছে। তবে সমস্যা একটা আছে।কী সমস্যা? ইকবাল সাহেব বললেন, ছেলের মা নাই বাবা নাই— অনাথ ছেলে। শায়লা বললেন, ছেলের মা-বাবা থাকবে না। কী জন্যে? আমি মা-না? তুমি এই বিষয়ে কোনো উল্টা কথা বলব না। অন্য কোনো বিষয়ে কথা বলতে চাও বলো। এই বিষয়ে না।

ইকবাল সাহেব প্রসঙ্গ পাল্টালেন। খুশি খুশি গলায় বললেন, এক কাজ করি, খাসির মাংসটা আমি রান্না করে ফেলি। টাটকা টাটকা খাওয়ার একটা আলাদা আনন্দ আছে।শায়লা বললেন, তুমি রাঁধতে চাইলে রাধ। কাটা মসলার মাংস করা। এটা তোমার ভালো হয়। মাংস রাঁধতে হলে কিন্তু আদা-পেঁয়াজ আনতে হবে। ঘরে আদা-পেঁয়াজ নেই।রান্নাবান্নায় এই ভদ্রলোকের খুবই শখ। মাঝে-মধ্যেই এটা-সেটা রান্না করেন। তিনি খুবই আগ্রহ নিয়ে আদা-পেঁয়াজ আনতে রওনা হলেন।

রুনু অতি মনযোগে বান্ধবীর নোটবুক কপি করছে। তার সামনেই মনজু বসে আছে। মনজুর সঙ্গে তার কোনো কথা হচ্ছে না। মনজুর দিকে না তাকিয়েও সে পরিষ্কার বুঝতে পারছে, মনজু তাকিয়ে আছে তার দিকে। কোনো পুরুষমানুষ তার দিকে তাকিয়ে থাকলে তার একেবারেই ভালো লাগে না। গা ঘিনঘিন করে। এখন করছে না। বরং ভালো লাগছে। লাজ্জাও লাগছে। এই লজ্জার মধ্যেও আনন্দ মিশে আছে।রুনু বলল, আপনি চুপচাপ বসে আছেন কেন? মনজু বলল, তুমি কাজ করছ, চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া আমার গতি কী!আপনার অফিস কেমন চলছে?

ভালো, তবে খুবই কাজের চাপ। এতদিন আসতে পার নি কাজের চাপে। আমার যে ইমিডিয়েট বাস উনি হঠাৎ ছুটিতে গেলেন। স্ত্রীর ক্যানসার হয়েছে, স্ত্রীকে নিয়ে তাকে যেতে হলো সিঙ্গাপুর। তার সমস্ত কাজ এসে পড়ল আমার ঘাড়ে। আমি নতুন মানুষ, আমি কি এতসব জানি? পনেরো দিনে একবার গেলাম চিটাগাং। আর ছবার গেলাম খুলনায়। বিমানে যাতায়াত করেছি, তারপরেও ধকল কম না।রুনু বলল, মনজু ভাই, আপনার কথা বলার মধ্যে মনে হয় কোনো সমস্যা আছে। আপনি যখন কথা বলেন তখন মনে হয় মিথ্যা বলছেন।কী বলো?

আসলেই তাই। আপনার প্রতিটি কথা মিথ্যার মতো শোনাচ্ছে। যদিও আমি জানি আপনি মিথ্যা বলছেন না। আগেও এরকম মনে হয়েছিল। চাকরি নিয়ে কথা বলেছিলেন, আমার কাছে মনে হয়েছিল মিথ্যা। পরে দেখা গেল সত্যি।মনজু চিন্তিত গলায় বলল, এরকম কেন হয় বলো তো? রুনু বলল, জানি না কেন হয়। মনে হচ্ছে আপনার কথা বলার ভঙ্গির মধ্যে কোনো সমস্যা আছে। আপনি একটা কাজ করুন— ভয়ঙ্কর কোনো মিথ্যা বলুন, দেখি মিথ্যাটা সত্যির মতো মনে হয় কি-না।মিথ্যা বলব?

হুঁ।বেশ তাহলে শোন, আগে বলেছিলাম না। আমার মা মারা গেছেন? আসলে মা বেঁচে আছেন। ভালো মতো বেঁচে আছেন। ইসমাইল সর্দার নামে অতি বদলোককে বিয়ে করেছেন। এই স্বামীর প্রতিভায় আমার মা মুগ্ধ।রুনু বলল, আপনার মিথ্যাগুলি আমার কাছে সত্যি মনে হচ্ছে। আশ্চর্য ব্যাপার তো!মনজু চিন্তিত গলায় বলল, আশ্চর্য তো বটেই।রাতে মনজু চলে যাবে। এগারোটায় গোট বন্ধ হয়। তার আগেই যেতে হবে। শােয়লা বললেন, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, এই বৃষ্টির মধ্যে তোমাকে আমি ছাড়ব না। মনজু বলল, রাত এগারোটার মধ্যে উপস্থিত না হলে আমার চাকরি চলে যাবে মা।

রুনু বলল, চাকরি চলে গেলে চলে যাবে, আপনি যেতে পারবেন না।মনজু বলল, আচ্ছা ঠিক আছে, থাকব।শায়লা স্বামীর দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি হাসলেন। তাকে তখন মনে হচ্ছিল তিনি এই পৃথিবীর সুখী মাদের একজন।ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি পড়ছে। মনজুকে বিছানা করে দেয়া হয়েছে বসার ঘরের সোফায়। সে বেশ আয়েশ করে শুয়েছে। পায়ের কাছের জানালা খোলা। জানালা দিয়ে ঠাণ্ড বাতাস আসছে। মাঝে মাঝে বৃষ্টির ছাট আসছে। মনজুর ভালো লাগছে। ঘুম ঘুম লাগছে, আবার ঘুম আসছে না- এমন অবস্থা।মনজু ভাই, পান খাবেন?

রুনু হাতে পানের খিলি নিয়ে ঢুকেছে। তার মুখেও পান। পানের লাল রঙ ঠোট বেয়ে নেমে এসেছে। দেখতে খুব ভালো লাগছে। মনজুর মনে হলো এই মেয়েটা যদি তার স্ত্রী হতো তাহলে সে অবশ্যই হাত দিয়ে ঠোঁটের লাল রঙ মুছিয়ে দিত।মনজু বলল, রুনু বস।রুনু বলল, বসব কেন? আপনি কি ভেবেছেন আমি পান হাতে নিয়ে আপনার সঙ্গে গল্প করতে এসেছি। আমি এক্ষুণি পড়তে বসবা। আজ রাত তিনটা পর্যন্ত আমার পড়ার প্ল্যান।মনজু বলল, সবসময় কি আর প্ল্যান মতো কাজ হয়?

রুনু বলল, অন্যদের হয় না। আমার হয়।বলতে বলতে রুনু সোফায় বসল। মনজুর হাতে পান দিতে দিতে মাথা ঘুরিয়ে খোলা জানালার দিকে তাকিয়ে হাসল।মনজু বলল, হাসছ কেন? রুনু বলল, বাবা মা আমাকে হঠাৎ বিয়ে দেবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। পাত্রও খুঁজতে হয় নি। পাত্র নিজেই এসে ধরা দিয়েছে। এই জন্যে হাসছি।মনজু বিস্মিত গলায় বলল, পাত্র কে?

রুনু শব্দ করে হেসে ফেলে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল, পাত্র আমার পাশে বসে পান খাচ্ছে।মনজু অবাক হয়ে বলল, বলো কী? রুনু বলল, এত খুশি হবেন না। সব নির্ভর করছে আমার উপর। পাত্র আমার পছন্দ হতে হবে।মনজু অবাক হয়ে ভাবছে মেয়েটা কী সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলে যাচ্ছে। কোনো দ্বিধা নেই, কোনো সংকোচ নেই। মনজু বলল, পাত্র তোমার পছন্দ না?

রুনু বলল, না।মনজু বলল, আমি অবশ্যি পছন্দ করার মতো কেউ না। চেহারা ভালো না। সর্ট। গায়ের রঙও ময়লা।রুনু বলল, আপনার চেহারা ঠিকই আছে। আপনার যেটার অভাব তার নাম বুদ্ধি।তোমার ধারণা আমার বুদ্ধি কম? হ্যাঁ। আমি সারাজীবন কল্পনা করেছি। আমি যাকে বিয়ে করব তার খুব বুদ্ধি থাকবে। চেহারা হবে রাজপুত্রের মতো।মনজু বলল, কল্পনার মানুষ কল্পনাতেই থাকে, বাস্তবে তাদের পাওয়া যায় না।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *