এই শুভ্র এই পর্ব:৯ হুমায়ূন আহমেদ

এই শুভ্র এই পর্ব:৯

মানুষটা শুয়ে আছে নৌকার পাটাতনে। শোয়ার ভঙ্গিটাও কী সুন্দর। এত মন দিয়ে দেখার মতো কী আছে আকাশে? রুনুর এখন খুব একটা বাজে ইচ্ছা হচ্ছে। তার ইচ্ছা করছে মানুষটার পাশে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে। সে নিশ্চয়ই খুব খারাপ একটা মেয়ে। এরকম চিন্তা খারাপ মেয়ে ছাড়া কারোর মাথায় আসবে না। সে অবশ্যই খারাপ মেয়ে। ভয়ঙ্কর খারাপ মেয়ে।

রুনুর কান্না পাচ্ছে। সে প্রাণপণ চেষ্টা করছে কান্না আটকে রাখতে। কতক্ষণ পারবে কে জানে! মনজু ভাই তার দিকে তাকিয়ে আছেন। সে যদি কাঁদতে শুরু করে তাহলে মনজু ভাই কী ভাববেন কে জানে! শুভ্ৰ হঠাৎ রুনুর দিকে তাকিয়ে বলল, রুনু, একটা কাজ কর। আমি যেভাবে শুয়ে আছি ঠিক এইভাবে শুয়ে আকাশের দিকে তাকাও। অদ্ভুত একটা ফিলিং হবে। মনে হবে মেঘের সঙ্গে সঙ্গে তুমিও ভাসছ।রুনু সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়ল। সে তাকিয়ে আছে মেঘের দিকে। কিন্তু সে মেঘ দেখতে পাচ্ছে না। কারণ তার চোখ ভর্তি জল। আকাশের কালো মেঘের দিকে তাকিয়ে তার কাঁদতে ভালো লাগছে।

তালতলার পীর সাহেবের নাম কামাল উদ্দিন কাশেমপুরী। পীর সাহেব ছোটখাটো মানুষ। গলার স্বর মধুর। তিনি সবার সঙ্গেই হাসিমুখে কথা বলেন। তাঁর ছোট ভাই জামাল উদ্দিন কাশেমপুরীও পীর ছিলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল কৰ্কশ। মুরিদানদের সঙ্গে তাঁর ব্যবহারও ছিল খারাপ। এমনও শোনা যায় তিনি কোনো মুরিদানের উপর রাগ করে লাথি মেরেছেন। দুই ভাই দুই তরিকার পীর। একজন গরম পীর, একজন নরম পীর। বছর ছয়েক আগে ছোট ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে। তার মুরিদানরা বড় ভাইয়ের কাছে ছুটে এসেছে। বড় ভাই হাসিমুখে বলেছেন, বাবারা, তোমরা আমার কাছে এসো না। আমার ভাইয়ের পথ আর আমার পথ এক না। এক পুকুরেই আমরা অজু করি। কিন্তু আমাদের ঘাট ভিন্ন।

জাহানারা পীর সাহেবের সামনে ঘোমটা দিয়ে বসে আছেন। পীর সাহেব বললেন, মাগো, বাম হাতটা একটু বাড়ান।জাহানারা হাত বাড়ালেন। পীর সাহেব জাহানারার হাতে আন্তর মাখিয়ে দিলেন। জাহানারা বললেন, বাবা আমার জন্যে দোয়া করবেন, আমি খুবই কষ্টে আছি।পীর সাহেব বললেন, কেউ যখন আমাকে বলে আমি কষ্টে আছি তখন বড় আনন্দ হয় গো মা। কারণ আল্লাহপাক তার পিয়ারাবান্দাদের কষ্টে রাখেন। তিনি যাদের উপর নাখোশ তারাই ইহকালে সুখে থাকে। আপনার মাথাব্যথা রোগের কি কিছু আরাম হয়েছে?

জি-না।চোখে সুরমা দিবেন। সুরমা দিয়ে জায়নামাজে বসে বলবেন– হে আল্লাহপাক, তুমি আমাকে রোগ দিয়েছ। এই রোগ নিয়াও আমি সবুর করলাম। এই রোগই আমার বান্ধব। খাস দিলে এটা বলতে পারলে আল্লাহপাক রোগ তুলে নিবেন।জাহানারা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আমি খাস দিলে কিছুই বলতে পারি না বাবা। আমার মন সবসময় অস্থির থাকে। ছেলে সকালবেলা বের হয়েছে, এখনো ফিরে নাই। কোথায় গিয়েছে কিছুই জানি না। ড্রাইভার বদমাশটা মোবাইল টেলিফোন বন্ধ করে রেখেছে।

পীর সাহেব কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রাখলেন। তারপর চোখ মেলে বললেন, ছেলে বাড়িতে ফিরেছে গো মা। টেলিফোন করে দেখেন। আর যদি নাও ফিরে–কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরবে। ধ্যানে পেয়েছি।জাহানার সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোন করলেন। টেলিফোন ধরল। সকিনা। সে জানাল, শুভ্ৰ ভাইজান কিছুক্ষণ আগে ফিরেছে। তার সারা শরীর ভেজা। চোখ লাল। মনে হয় জ্বর এসেছে।জাহানারা বললেন, ডাক্তার খবর দিয়েছ? সকিনা বলল, দিয়েছি মা।জাহানারা বললেন, ওর জ্বর কত থার্মোমিটার দিয়ে এক্ষুণি আমাকে জানাও। আমার ফিরতে দেরি হবে, আমি পীর সাহেবের কাছে আছি।জি আচ্ছা।তোমাকে তো আমি চলে যেতে বলেছিলাম, তুমি চলে যাও নি কেন?

কাল সকালে যাব। মা।অবশ্যই সকালে বিদায় হবে। আমি ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে যেন তোমাকে দেখতে না পাই।… আমি টেলিফোন ধরে আছি। তুমি শুভ্রর জ্বর কত সেটা থার্মোমিটারে দেখে আমাকে জানাও।জি আচ্ছা।আর ড্রাইভার হারামজাদাটাকে জেগে থাকতে বলবে, তার সঙ্গে আমার কথা আছে।জি আচ্ছা।সকিনা জ্বর দেখে ভীত গলায় বলল, ভাইজানের জ্বর অনেক বেশি মা। একশ তিন।

ভালুক জ্বর বলে একটা কথা আছে। হঠাৎ হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই সারা শরীর কাঁপিয়ে ভালুকের জ্বর আসে। সে কুকড়ি-মুকড়ি হয়ে পড়ে থাকে। জুরের তড়াসে তার শরীর কাঁপতে থাকে। দেখতে দেখতে হুট করে জ্বর চলে যায়। সে গা ঝাড়া দিয়ে দুপায়ে উঠে দাঁড়ায়।শুভ্রর জ্বর সম্ভবত ভালুকগোত্রীয়। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সে বিছানায় উঠে বসল। খুশি খুশি গলায় সকিনাকে ডেকে চা দিতে বলল। তার কাছে মনে হচ্ছে জ্বর এসে চলে যাওয়ায় ভালো হয়েছে। মাথাটা পরিষ্কার লাগছে। এখন ঠাণ্ডা মাথায় সফটওয়্যারটা নিয়ে বসা যায়। যুক্তাক্ষরের সমস্যাটার সমাধান করা যায়।

তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে উপস্থিত রাখতে পারলে ভালো হতো। সে শব্দ শুনে বলতে পারত কোন শব্দটা কানে শুনতে ভালো লাগে। রুনু মেয়েটাকে খবর দিয়ে নিয়ে আসতে পারলে ভালো হতো। সেটা তো সম্ভব না।জাহানারা বাড়িতে ফিরে দেখেন, শুভ্র কম্পিউটারের সামনে উবু হয়ে বসে আছে। কী-বোর্ডে চাপ দিচ্ছে। পো পি শব্দ হচ্ছে। শুভ্ৰ শব্দ শুনছে। চোখ বন্ধ করে। তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, এই তোর না জ্বর? শুভ্ৰ হাসিমুখে বলল, জ্বর নেই মা। কপালে হাত দিয়ে দেখ।জাহানারা ছেলের কপালে হাত দিলেন। আসলেই জ্বর নেই। শরীর ঠাণ্ডা। শুভ্র বলল, তুমিই বলো জ্বর কি আছে?

জাহানারা বললেন, জ্বর নেই। তবে তোর জ্বর কীভাবে চলে গেছে সেটা শুনলে তুই চমকে উঠবি।শুভ্র বলল, বলো তো শুনি।জাহানারা বললেন, তোর জ্বর শোনার পর আমি পীর সাহেবকে বললাম। উনি চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ দোয়া পড়লেন। তারপর চোখ মেলে আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। তখনি বুঝেছি। কাজ হয়েছে। তুই হাসছিস কেন? আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না? তোকে একদিন আমি হুজুরের কাছে নিয়ে যাব।আচ্ছা।আজকের বেড়ানো কেমন হয়েছে?

খুবই ভালো হয়েছে। ঝমোঝম করে বৃষ্টি হচ্ছিল। ভিজে দারুন মজা পেয়েছি।জাহানারা ছেলের কাঁধে হাত রাখতে রাখতে বললেন, এখন থেকে তুই যখন বাইরে কোথাও যাবি- আমি সঙ্গে যাব।বেশ তো যাবে। আগামীকাল আমি যাব অচিনবৃক্ষ দেখতে। তুমি তোমার ব্যাগ গুছিয়ে নাও। তুমি যাবে, সকিনা মেয়েটিও যাবে। সকিনা পথ-ঘাট দেখিয়ে নিয়ে যাবে।জাহানারার মুখ শক্ত হয়ে গেল। ঘাড় ব্যথা করতে লাগল। প্রেসারের লক্ষণ। চট করে প্রেসার বেড়েছে।

প্রেসার বাড়লেই তার ঘাড় ব্যথা করতে থাকে। হাতের তালু ঘামে। হাতের তালু ঘামা এখনো শুরু হয় নি, তবে শুরু হবে। আজ ভোরে প্রেসারের ওষুধ খেয়েছেন কি-না। তিনি মনে করতে পারলেন না। নাশতা খাবার পর পর প্রেসারের ওষুধ তার হাতে তুলে দেয়ার দায়িত্ব সকিনার। সে কি দিয়েছে? শুভ্র বলল, কী হয়েছে মা? জাহানারা বললেন, কাল যেতে পারবি না। কাল তোর জন্মদিনের উৎসব করব। আমি নিজের হাতে পোলাও রান্না করব।শুভ্র বলল, কাল আমার জন্মদিন না-কি?

কাল জন্মদিন না, কিন্তু আমি উৎসবটা কাল করব। সন্ধ্যার পর তোকে আমি পীর সাহেবের কাছে নিয়ে যাব। উনি তোর মাথায় ফুঁ দিয়ে দেবেন।শুভ্র বলল, একটা খালি বোতল নিয়ে যাও মা। বোতলে করে উনার ফু নিয়ে এসো। তারপর সেই ফু আমার মাথায় ঢেলে দিও।উনাকে নিয়ে ঠাট্টা ফাজলামি করবি না।আচ্ছা যাও করব না।জাহানারা উঠে দাঁড়ালেন। তিনি চলে যাবার জন্যে পা বাড়িয়েছেন, শুভ্ৰ খাপ করে তার হাত ধরে তাকে টেনে বসিয়ে দিল। জাহানারার মন ভারী হয়েছিল, শুভ্রর এই কাণ্ডে হঠাৎ করে মন ভালো হয়ে গেল। ঘাড়ের ব্যথা কমে গেল।

শুভ্র বলল, তোমাকে একটা জরুরি কথা জিজ্ঞেস করা হয় নি। ছোটবেলায় একবার আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম, তোমার মনে আছে? তখন আমাকে উদ্ধারের জন্যে এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হলো। তোমার মনে আছে মা? জাহানারা বললেন, মনে থাকবে না কেন? শুভ্র বলল, ঐ পুরস্কারের টাকাটা কে পেয়েছিল? সেটা জেনে কী করবি? শুভ্র বলল, রুনুকে খবরটা দিতে হবে। রুনু জানতে চাচ্ছিল।জাহানারা বিস্মিত হয়ে বললেন, রুনু কে? শুভ্র বলল, রুনু হচ্ছে মনজুর বোন। অসম্ভব বুদ্ধিমতি একটা মেয়ে।জাহানারা বললেন, ওর সঙ্গে দেখা হলো কোথায়?

শুভ্র আগ্রহের সঙ্গে বলল, ও তো সারাদিন নৌকায় আমাদের সঙ্গেই ছিল। একসঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজলাম।জাহানারা একদৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি কিছুই বুঝতে পারছেন না। রুনু নামের একটা মেয়ে আবার কোথেকে উদয় হলো। শুভ্ৰ কি তার সঙ্গে ঠাট্টা করছে? মার সঙ্গে ঠাট্টা করার অভ্যাস অবশ্যি শুভ্রর আছে।শুভ্র বলল, মা, তুমি এমন রাগ রাগ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে কেন? মেয়েটাকে দেখলে তোমার ভালো লাগবে। তার গলার স্বর মিষ্টি। ভাইব্রফোনের আওয়াজের সঙ্গে মিল আছে।জাহানারা বললেন, মেয়েটাকে কে নিয়ে গিয়েছিল, মনজু? শুভ্র বলল, না, আমিই মেয়ের মাকে বলে সঙ্গে নিয়ে গেছি। মা শোন, আমরা কিন্তু মূল প্রসঙ্গ থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছি- এক লাখ টাকা কে পেয়েছিল? আমি জানি না কে পেয়েছিল।কে জানে? বাবা জানেন?

জানি না তোর বাবা জানে কি-না।শুভ্র বলল, বাবা না জানলেও একজন অবশ্যই জানবে। সুলেমান চাচা। মা, তাকে খবর পাঠাও তো।জাহানারা কঠিন মুখে বললেন, এত রাতে তাকে খবর পাঠানো যাবে না। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে অস্থির হবার কিছু নাই।কোনো বিষয়ই তুচ্ছ না মা।

জাহানারা উঠে দাঁড়ালেন। তার ঘাড়ের ব্যাথা আবার শুরু হয়েছে। হাতের তালু ঘামছে। তার উচিত ঘর অন্ধকার করে শুয়ে থাকা। সেটা সম্ভব না। আগে তাকে দুটা জরুরি কাজ করতে হবে। মনজু নামের বদমাশটাকে বিদায় করতে হবে। সকিনাকে দেশের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে হবে। কাজটা করতে হবে। আজ রাতেই। শুভ্রর বাবার সঙ্গে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করতে পারলে ভালো হতো। তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। জাপানি কোনো এক কোম্পানির ডিরেক্টরের সঙ্গে আজ তার ডিনার আছে। ফিরতে অনেক রাত হবে।

মনজু বিছানায় শুয়ে আছে। তার হাতে মায়ের চিঠি। চিঠিটা আজ দুপুরে এসেছে। এখনো পড়া হয় নি। মায়ের চিঠি এমন কোনো ব্যাপার না যে বিছানায় শুয়ে আয়েশ করে পড়তে হবে। মনজুর খুবই ক্লান্তি লাগছে- বসে থাকতে পারছে না। আজ সারা দিন তার উপর ভালো ধকল গিয়েছে। রুনুকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া বড় রকমের ভুল হয়েছে। মেয়েটা ফেরার পথে একটু পরপর চোখ মুছছিল। চোখের পানি ফেলার মতো কোনো ঘটনা তো ঘটে নি। শুভ্ৰ ভাইজান তার স্বভাবমতো রুনুর সঙ্গে অতি ভদ্র ব্যবহার করেছেন। রুনু কি তার অতি ভদ্র ব্যবহারকেই অন্য কিছু ভেবেছে? এত বোকা মেয়ে তো রুনু না।মনজু ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে মার চিঠি পড়তে শুরু করল। চিঠি পড়ার আগেই তার মন ভারী হয়ে গেল। দীর্ঘ চিঠিতে আনন্দ পাওয়ার মতো কিছুই থাকবে না। মার চিঠি মানেই ধারাবাহিক ঘ্যানঘ্যাননি।

বাবা মনজু,

দোয়া পরসমাচার তোমার পাঠানো টাকা পাইয়াছি। মাত্র চার হাজার টাকা পাঠাইয়াছ কেন বুঝিলাম না। তুমি জানাইয়াছিলে তোমার বেতন ছয় হাজার টাকা। থাকা-খাওয়া ফ্রি। সেই ক্ষেত্রে ইচ্ছা করিলেই তুমি আরো কিছু পাঠাইতে পারিতে। সংসারের অবস্থা অতি শোচনীয়। বাবা, তুমি যেভাবেই পার প্রয়োজনে ঋণ করিয়া হইলেও দুই একদিনের ভিতর আরো দুই হাজার টাকা পাঠাও। নিতান্তই অপারগ। হইয়া তোমাকে জানাইতেছি।

মূল ঘটনা না জানিলে তুমি বিপদের মাত্রা বুঝিতে পরিবে না। তোমার সৎবাবার সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস আছে। তিনি আবার ভালো সিগারেট ছাড়া খাইতে পারেন না। পুরানা দিনের অভ্যাস। তিনি একটা দোকান থেকে বাকিতে সিগারেট নিতেন। সেখানে একুশ শ টাকা বাকি পড়িয়া গেল। দোকানদারের এক ভাই আছে মাস্তান। নাম জহিরুল। অঞ্চলে হাতকাটা জহিরুল নামে তার পরিচয়। সকলেই তার ভয়ে অস্থির থাকে। থানায় তার নামে কয়েকটি মামলা আছে। তারপরও থানাওয়ালারা তাহাকে কিছুই বলে না। উল্টা খাতির করে। চা-সিগ্রেট খাওয়ায়। ঐ বদমায়েশ হাতকাটা জহিরুল অনেক লোকজনের সামনে তোমার সৎবাবার শার্টের কলার চাপিয়া ধরিয়াছে। চড়-থাপ্নড় দিয়াছে। সে তোমার সৎবাবাকে বলিয়াছে— এক সপ্তাহের মধ্যে দোকানের বাকি শোধ না করিলে সে তোমার সৎবাবার বাম হাতের কজি কাটিয়া ফেলিবে।

বাবা মনজু, হাতকাটা জহিরুলের পক্ষে সবই সম্ভব। তোমার সৎবাবা ভয়ে দিনরাত এখন ঘরে থাকেন। তাহার রাতে ঘুম হয় না। বাবা, এই বিপদ থেকে উদ্ধারের ব্যবস্থা তোমাকে যেভাবেই হউক। করিতে হইবে।তোমার বোনের হাতে কিছু টাকা আছে। পরিমাণ কত আমি জানি না। সে এই বিষয়ে কিছুই বলে না। গত মঙ্গলবার চায়ের পাতা কিনিবার জন্যে তাহার নিকট পঞ্চাশটা টাকা চাহিয়াছি। সে বলিল, টাকা নাই। অথচ সেই দিনই সন্ধ্যায় সে জিলাপি কিনিয়া আনিয়া তাহার দুই পুত্রকে খাওয়াইছে। আমার মনে খুবই দুঃখ হইয়াছে। আমি কেমন সন্তান গর্ভে ধারণা করিয়াছি যে আমার সহিত মিথ্যাচার করে?

আরেক দিনের ঘটনা শুনিলে তুমি অবাক হইবে। তোমার সৎবাবা বাজার হইতে শখ করিয়া একটা কালো বাউস মাছ কিনিয়া আনিয়াছেন। দুপুরে খাইতে তাহার বিলম্ব হয়। কারণ তিনি এই সময় স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে পত্রিকা পড়িতে যান। দুপুরের দিকে লাইব্রেরিতে ভিড় থাকে না। সব পত্রিকা হাতের কাছে পাওয়া যায়। উনার ফিরিতে বিলম্ব হইবে জানি বলিয়া আমি একটা বাটিতে কয়েক পিস মাছ তুলিয়া মিটাসেফে রাখিয়া গোসল করিতে ঢুকিয়াছি, এই ফাকে তোমার ভগ্নি বাটির সবগুলি মাছ তাহার দুই পুত্রকে খাওয়াইয়া দিয়াছে। যে শাখা করিয়া মাছ কিনিয়াছে তাহার ভাগ্যে মাছের একটা ভালো পিস জুটে নাই। ইহাকে শক্ৰতা ছাড়া আর কী বলা যায়! নিজের পেটের সন্তান যদি শত্রু হয় তখন বুঝিতে হইবে কিয়ামতের আর দেরি নাই।

বাবাগো, সংসারের এইসব বিষয় নিয়া মন খারাপ করিও না। সবই আমার কপাল। এখন তুমি শুধু তোমার সৎবাবাকে বিপদ হইতে উদ্ধার করা। তুমি জানো না যে তিনি তোমাকে কী পরিমাণ স্নেহ করেন। প্রায়শই তোমার কথা বলেন। বাবাগো, পত্রপাঠ শেষ হইবা মাত্ৰ তুমি মানি অর্ডার যোগে টাকা পাঠাইবার ব্যবস্থা কর।

ইতি

তোমার মা

চিঠি পড়তে গিয়ে মনজুর মাথা ধরে গেছে। মাথা ধরা সারানোর উপায় হলো, গরম পানি নিয়ে হেভি গোসল দেয়া। গোসলের পর কড়া এক কাপ চা। সঙ্গে মামা-ভাগ্নে সিগারেট। বাড়িতে টাকা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারলে মাথা ধরা সঙ্গে সঙ্গে কমে যেত। এই সিদ্ধান্ত নেয়া যাচ্ছে না। হাতে টাকা আছে মোট চারশ এগারো। এক জোড়া জুতা আর একটা হালকা সবুজ রঙের। হাফ শার্ট কিনে সে টাকা নষ্ট করেছে। জুতা জোড়া কিনতেই হতো। শার্টটা না। কিনলেও চলত। শার্টটা কেনা হয়েছে লোভে পড়ে। শার্টটা এখনো পরা হয় নি। দোকানে নিয়ে গেলে টাকা ফেরত দেবে বলে মনে হয় না। টাকা। এমন জিনিস যে হাত থেকে বের হলে আর ফেরত আসে না।

মনজু বালিশের নিচ থেকে সিগারেট ধরাল। খালি পেটে সিগারেট ধরালে মাথা ধরা আরো বাড়বে। বাড়ুক। মাথার যন্ত্রণায় সে ছটফট করুক। মাথা যন্ত্রণা নিয়ে মার চিঠির জবাব দিতে পারলে ভালো হতো। মনজু সিগারেটে টান দিয়ে মনে মনে চিঠির জবাব দিতে শুরু করল–

মা, তোমার চিঠি পেয়েছি। সন্ত্রাসী হাতকাটা জহিরুলকে আমার অভিনন্দন পৌছে দেবার ব্যবস্থা করবে। সে যে আমার সৎপিতার বাম হাতের কজি কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এতে আমি আনন্দিত। বাম হাতের কজি না কেটে ডান হাতেরটা কাটা কি সম্ভব? এই বিষয়ে তুমি তার সঙ্গে আলোচনা করে দেখতে পার। আমার ধারণা অনুরোধ করলে সে রাখবে। তোমার অনুরোধ তো সে ফেলবেই না। তোমার মতো মিষ্টি করে অনুরোধ কেউ করতে পারে বলে আমি মনে করি না। একটাই শুধু আফসোস— আমার আসল বাবার সঙ্গে তোমার মিষ্টি গলা কখনো বের কর নি।

মা, তোমার কি মনে আছে বাবা তার কোনো এক বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে গিয়ে দেরি করে ফিরেছিল বলে তুমি তাকে শাস্তি দিয়েছিলে? পৌষ মাসের প্রচণ্ড শীতে তুমি দরজা খুলো নি। বেচারাকে সারারাত বাইরে বসে থাকতে হয়েছে। যাই হোক, কী আর করা! প্রত্যেকেই প্ৰত্যেকের কপাল নিয়ে আসে। আমার সৎবাবা ভালো কপাল নিয়ে এসেছেন।মা, উনার কব্জি কাটা নিয়ে তুমি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হইও না। প্রতিটি খারাপ জিনিসের মধ্যেও ভালো কিছু থাকে। উনার কজি কাটায় নিশ্চয়ই কোনো মঙ্গল নিহিত আছে। আমরা সেটা ধরতে পারছি না।

এই মুহূর্তে আমার যেটা মাথায় আসছে তা হলো— ভিক্ষাবৃত্তিতে সুবিধা। শেষ জীবনে উনাকে যদি ভিক্ষা করে খেতে হয় তাহলে কজি কাটা খুবই কাজে আসবে। মানুষের দয়া আকর্ষণের জন্যে কাটা কজি কাজে আসবে। রোজ সকালে একটা থালা হাতে তুমি উনাকে মসজিদের পাশে বসিয়ে দিয়ে আসবে। এশার নামাজের পর নিয়ে আসবে। বুদ্ধিটা ভালো না?

আমার খবর হচ্ছে- আমি ভালো আছি। চাকরিতে অতি দ্রুত একটা প্রমোশন হয়েছে। এখন আমি একটা সেকশনের ইনচার্জ। বেতন সব মিলিয়ে পনের হাজার পাচ্ছি। তারপরেও আমার পক্ষে তোমাদের কোনো টাকা-পয়সা পাঠানো সম্ভব না। কারণ আমি বিয়ে করছি। বিয়ের খরচ তো আমাকে কেউ দিবে না। নিজেকেই জোগাড় করতে হবে। মেয়ের নাম রুনু। তুমি চিনতেও পার— ইকবাল মামার মেয়ে। বিয়ের পর হানিমুন করতে নেপাল যাব। সেখানেও টাকা দরকার। আগামী এক-দুই বছর একটা টাকাও তোমাদের পাঠাতে পারব না।

আসলে তোমার গর্ভই খারাপ। গর্ভে যেমন বিছু-মেয়ে ধারণ করেছ, সে-রকম কুলাঙ্গার ছেলেও ধারণ করেছ। কজিকাটা মানুষটাকে নিয়ে সুখে দিন কাটাও— এই তোমার প্রতি আমার শুভকামনা।

ইতি

তোমার কুপুত্র মনজু

মনে মনে চিঠিটা লিখে মনজু আরাম পেয়েছে। এরকম আরেকটা চিঠি সৎবাবাকে লিখতে পারলে আরামটা আরো প্রবল হতো। চিঠির শুরু হবে এইভাবে– ঐ ব্যাটা কব্জিকাটা, ….

শুরুটাতে কবিতার ছন্দের মতো ছন্দ আছে। মিলও আছে। ব্যাটার সঙ্গে কাটার মিল।চিঠিটা শুরু করা গেল না।রহমতুল্লাহ এসে ঢুকল। তার পরনে ইস্ত্রি করা পায়জামা-পাঞ্জাবি। চুল আঁচড়ানো। মুখ দিয়ে মিষ্টি গন্ধ বের হচ্ছে। আজ তার বিশেষ দিন। মদ্যপান করেছেন। যেদিন এই কাজটা করেন সেদিন তার সাজগোজ ভালো থাকে। মেজাজও ভালো থাকে। তিনি মনজুর দিকে তাকিয়ে বললেন, আছ কেমন? মনজু বলল, ভালো।খাওয়া-দাওয়া করেছি? জি-না।খাওয়া-দাওয়া করে নাও। আজ ভালো খাওয়া আছে। মেজবানির গরুর মাংস। হেড অফিসে রান্না হয়েছে। চিটাগাং থেকে বাবুর্চি এসেছে। মেজবানির মাংস গরম গরম খাওয়া ভালো।মনজু বলল, আজ কি কোনো উপলক্ষ?

রহমতুল্লাহ হাই তুলতে তুলতে বললেন, আছে নিশ্চয়ই কিছু। হেড অফিসের সব খবর তো পাই না। আমি পচা আদার ব্যাপারি। জাহাজের খবর কী রাখব? হেড অফিস হলো জাহাজ। এইটাই ভাবতেছিলাম– আমাদের বড় সাহেব ঢাকা শহরে এসেছিলেন এক জোড়া স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরে। তার কাঁধে একটা কাপড়ের ব্যাগ ছিল। সেই ব্যাগে ছিল একটা লুঙি আর একটা পাঞ্জাবি। সঙ্গে ছিল ক্যাশ আটশ পচিশ টাকা। টাকাটা এনেছিলেন মায়ের গলার চেইন বিক্রি করে। আর দেখ আজ তার অবস্থা। শুনেছি বড় সাহেব না-কি আস্ত একটা দ্বীপ কিনবেন। একটা কেন, চার-পাঁচটা দ্বীপ কেনাও তার কাছে কোনো বিষয় না।

মনজু ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলল। রহমতুল্লাহ বললেন, পাক কোরান মজিদে একটা আয়াত আছে, সেখানে আল্লাহপাক বলেছেন– আমি যাহাকে দেই তাহাকে কোনো হিসাব ছাড়াই দেই। আবার যাহাকে দেই না। তাহাকে কিছুই দেই না। ইহা আমার ইচ্ছা। নাপাক মুখে কোরান মজিদের আয়াত বলেছি, বিরাট গুনাহর কাজ করেছি। আল্লাহগো, বান্দাকে মাফ করা। মনজু, তোমার কাছে সিগারেট আছে? থাকলে একটা সিগারেট দাও। নেশার সময় সিগারেটটা ভালো লাগে।মনজু সিগারেট দিল। রহমতুল্লাহ আয়েশ করে সিগারেটে টান দিয়ে বললেন- আল্লাহপাক যে বলেছেন যাহাকে দেই না তাহাকে কিছুই দেই না— এটা অতি সত্যি কথা। তোমার আমার কথাই বিবেচনা কর। সত্যি না?

মনজু বলল, জ্বি সত্যি।মাতালের জ্ঞানী জ্ঞানী কথা শুনতে ভালো লাগছে না। তারপরেও শুনতে হবে। মাতালরা অন্যের কথা শুনতে চায় না। নিজের কথা বলতে চায়। মনজু! জি।তোমার জন্যে একটা সংবাদ আছে। সংবাদটা ভালো না মন্দ বুঝতে পারছি না। অনেক মন্দ সংবাদও সূক্ষ্মভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায় সংবাদটা আসলে মন্দ না, ভালো। আবার অনেক ভালো সংবাদ ঠিকমতো বিবেচনা…।

সংবাদটা কী বলেন।রহমতুল্লাহ সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বললেন— ম্যাডাম তোমাকে আজ রাতেই চলে যেতে বলেছেন। খাওয়া-দাওয়া কর, তারপর চলে যাও। তোমার কয়েক দিনের পাওনা বেতন আমার কাছ থেকে নিয়ে যাবে। তাড়াহুড়ার কিছু নাই। রাত এগারোটার সময় গোট বন্ধ হবে। গোট বন্ধ হবার আগে আগে চলে যাবে।মনজু বিড়বিড় করে বলল, ভাইজানের সঙ্গে কি একবার দেখা করা যাবে?

রহমতুল্লাহ সিগারেটের ছাই টোকা দিয়ে ফেলতে ফেলতে কঠিন গলায় বললেন, না।রুনুদের বাসায় রাতের খাবার নটার আগেই শেষ হয়ে যায়। ইকবাল সাহেব রাত সাড়ে দশটায় একটা ঘুমের ট্যাবলেট খান। ঘুমের ট্যাবলেট খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিছানায় যেতে নেই। ত্ৰিশ মিনিট অপেক্ষা করার নিয়ম। এই ত্ৰিশ মিনিট তিনি মেয়ের সঙ্গে গল্প করেন। গল্প করতে খুব ভালো লাগে। মেয়েটা মাঝে মাঝে মাথা ঝাকায়, তখন বেণী করা চুল মুখের উপর এসে পড়ে। এই দৃশ্যও দেখতে ভালো লাগে।আজও রুনুর সঙ্গে গল্প করতে এসেছেন। গল্প জমছে না। রুনু চোখ-মুখ শক্ত করে বসে আছে। প্রশ্ন করলে কাটা কাটা জবাব দিচ্ছে। ইকবাল সাহেব চিন্তিত গলায় বললেন, তোর শরীর খারাপ না-কি রে?

রুনু বলল, না।ইকবাল সাহেব বললেন, দেখে তো মনে হচ্ছে শরীর খারাপ। চোখ লাল। দেখি কাছে আয়, কপালে হাত দিয়ে জ্বরটা দেখি।রুনু বলল, জ্বর দেখতে হবে না। আমার জ্বর আসে নি। শরীর ঠিক আছে।তাহলে কি মন খারাপ? মনও ঠিক আছে। আমার তোমাদের মতো হুটহাট করে মন খারাপ হয় না।তোদের বেড়ানো কেমন হলো শুনি। মনজুর বসের ছেলে না-কি নিজেই আমাদের বাসায় এসেছিলেন? তোর মার কাছে শুনলাম ছেলে অসম্ভব ভদ্ৰ, অসম্ভব বিনয়ী। আবার না-কি খুবই সুন্দর?

রুনু বলল, বাবা, উনি ভদ্র হলেও আমাদের কিছু যায় আসে না। অভদ্র হলেও আমাদের কিছু যায় আসে না।ইকবাল সাহেব চিন্তিত চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। সে এরকম করছে কেন বুঝতে পারছেন না। তিনি আলাপ চালিয়ে যাবার জন্যে বললেন, তোরা সারাদিন কী করলি? রুনু বলল, নৌকায় করে বুড়িগঙ্গায় ঘুরলাম। যেখানে নৌকাড়ুবি হয়ে ঘসেটি বেগম মারা গিয়েছিলেন, উনি সেই জায়গাটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করলেন। খুঁজে পাওয়া গেল না।ইকবাল সাহেব বললেন, ঘসেটি বেগমটা কে? নবাব সিরাজদ্দৌলার খালা। বাবা শোন, আমার কথা বলতে ভালো লাগছে। না। তোমার আধাঘণ্টা নিশ্চয় পার হয়েছে। ঘুমুতে যাও।তুই কী করবি?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *