এপিটাফ পর্ব:১৩ হুমায়ূন আহমেদ

এপিটাফ পর্ব:১৩

বাবা সে-রাতে আর ফিরলেন না। পরদিন নটার দিকে এলেন। গতদিনের অসুখ নিয়ে আমি এবং বাবা দুজনেই কেউ কোনো কথা বললাম না। দুজনই এমন ভাব করলাম যেন গতদিন কী ঘটেছিল আমরা ভুলে গেছি।বাবার পরিকল্পনা শুনলাম। খুব হাস্যকর পরিকল্পনা, তবে আমার মনে হচ্ছে কাজ করবে। পরিকল্পনা কাজ করার জন্যে ঝড়বৃষ্টি দরকার এবং ইলেকট্রিসিটি চলে যাওয়া দরকার। ঝড় যদি নাও হয় ভালো বৃষ্টি হলেও চলবে, তবে ইলেকট্রিসিটি চলে যেতে হবে।

পুরো ঢাকা শহরের ইলেকট্রিসিটি চলে যাবার দরকার নেই আমাদের ফ্ল্যাট বাড়ির ইলেকট্রিসিটি চলে গেলেই হবে। এই সমস্যার সমাধান ফ্ল্যাটবাড়ির কেয়ারটেকারকে দিয়ে করানো যায়। তাকে চা-টা খাবার জন্যে কিছু টাকা দিলেই সে নিশ্চয়ই কিছুক্ষণের জন্যে মেইন সুইচ অফ করে রাখবে। এখন অপেক্ষা শুধু বৃষ্টির।বাবা বললেন, আজ আকাশের অবস্থা বেশি সুবিধার না। মনে হচ্ছে আজই বৃষ্টি হবে। একসাথে নেমে পড়া যাক কী বলিস।

আমি বললাম, হুঁ।ফুলির মাকে দলে টানতে হবে। নয়তো সে ফাঁস করে দেবে।ফুলির মাকে নিয়ে ভয় নেই বাবা। আমি ওকে বুঝিয়ে সুজিয়ে ঠিক করে রাখব।বাবা চলে গেলেন মোমবাতি এবং মোটা দড়ি কিনতে। এই পরিকল্পনায় খুব শক্ত এবং মোটা দশ গজের মতো দড়ি লাগে। মোমবাতি লাগে।আমি উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করছি। মাঝে মাঝেই জানালা দিয়ে তাকাচ্ছি আর ভাবছি- ইস, আকাশটা যদি আরেকটু কালো হতো বাবা দড়ি-টড়ি নিয়ে ফিরে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই মা অফিস থেকে ফিরলেন। বাবাকে সবকিছু তড়িঘড়ি করে আমার খাটের নিচে লুকিয়ে ফেলতে হলো।বাবা বললেন, আজ টিকিট কাটার কথা ছিল না? কেটেছ?

মা জবাব দিলেন না। কঠিন এবং রাগী চোখে বাবার দিকে তাকালেন। তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আমার সেই ভয়ঙ্কর, কুৎসিত এবং নোংরা ব্যথাটা শুরু হয়ে গেল।আমার ব্যথার এই তীব্রতা মা আগে কখনো দেখেন নি। এই প্রথম দেখেছেন। তিনিও বাবার মতোই করলেন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগলেন। আমি বললাম, মা, তুমি আমার দিকে তাকিয়ে থেকো না। তুমি চলে যাও। চলে যাও।বাবা যেভাবে পালিয়ে গিয়েছিলেন, মাও ঠিক সেই ভাবেই পালিয়ে গেলেন। কোরান শরীফ নিয়ে দৌড়ে এলো ফুলির মা। আর তখন ঝম ঝম করে বৃষ্টি নামল। শুধু যে বৃষ্টি তা না– বৃষ্টির সঙ্গে ঝড়ও শুরু হলো।

প্রচণ্ড বর্ষণ হচ্ছে। বর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ো হাওয়া। এই ঝড়-বাদল মাথায় নিয়ে দিলশাদ এগুচ্ছে। রিকশাওয়ালার পর্দাটা ফুটো। বৃষ্টির পানিতে তার শাড়ি মাখামাখি। বৃষ্টির পানিতে গা ভেজানো যায় কিন্তু দ্রুতগামী ট্রাকের চাকা থেকে ছিটকে আসা পানিতে ভিজলে গা ঘিন ঘিন করে।একটা ট্রাক এসে দিলশাদকে ভিজিয়ে দিয়ে গেছে। তবে দিলশাদের গা ঘিন ঘিন করছে না। সে মূর্তির মতোই রিকশায় বসে আছে। রিকশাওয়ালা মাথায় গামছা বেঁধে নিয়েছে। এতে তার কী উপকার হচ্ছে কে জানে। গামছা থেকে চুঁইয়ে পানি পড়ছে। সে পেছন ফিরে বলল, এমুন দিনে ঘর থাইক্যা বাইর হওন ঠিক না আম্মা। আসমান ভাইঙ্গা পড়ছে। দেহেন অবস্থা।

অনেকক্ষণ কলিংবেল বাজার পর দরজা খুলল। ওয়াদুদুর রহমান বলল, আরে তুমি। বৃষ্টিতে একেবারে দেখি মাখামাখি।দিলশাদ বলল, আসব দুলাভাই? এসো এসো। তুমি আসবে না তো কে আসবে।আপনার কার্পেট বোধহয় ভিজিয়ে ফেললাম।ভিজুক না কত ভিজবে।দিলশাদ ঘরে ঢুকল। ওয়াদুদুর রহমানের দিকে তাকাল। শান্ত সহজ গলায় বলল, আমি টাকাটার জন্যে এসেছি। আসুন আপনার বাথটাব উদ্বোধন করা যাক।ওয়াদুদুর রহমান বলল, ও।

ওয়াদুদুর রহমান চোখ সরু করে তাকাচ্ছে। তার ভুরু একটু যেন ঝুঁকে এসেছে। দিলশাদ নিজেই বসার ঘরের খোলা দরজা বন্ধ করতে করতে বলল, আসুন, আপনার বাথটাব উদ্বোধন করা যাক। ময়লা পানিতে শরীর নোংরা হয়ে আছে। নোংরা শরীর নিশ্চয়ই আপনার ভালো লাগবে না। আগে সাবান মেখে ভালো করে গোসল করে নেই।

আজ বৃহস্পতিবার।শুক্র-শনি-রবি, এই তিনদিন আমার হাতে আছে। সোমবার আমি চলে যাচ্ছি। সোমবার রাত দুটায় আমাদের বিমান। মজার ব্যাপার হচ্ছে আমার সঙ্গে মা যাচ্ছেন না। যাচ্ছেন বাবা। বাবার জন্যেই টিকিট কাটা হয়েছে।এরকম একটা কাণ্ড যে শেষ মুহূর্তে মা করবেন তা আর কেউ না জানলেও আমি জানতাম। যেদিন বাবা খুব ব্যস্ত হয়ে তার পাসপোর্ট নিয়ে এসে মাকে বললেন— দিলশাদ, আমিও তোমাদের সঙ্গে ভিসা করিয়ে রাখি। যদি টাকাপয়সা বেশি জোগাড় হয়ে যায় আমিও যাব।আমি মার দিকে তাকালাম। মা চোখ-মুখ কঠিন করে বললেন, টাকাটা আসবে কোত্থেকে? আকাশ থেকে?

বাবা আমতা আমতা করতে লাগলেন। তার এক বন্ধু আছে জার্মানিতে, তাকে চিঠি লিখবেন– এইসব কী হাবিজাবি বলতে লাগলেন। মা বাবার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন। মার চোখ দেখেই বুঝলাম শেষ মুহূর্তে মা বাবার জন্যেই টিকিট কাটবেন। কারণ মা’র কঠিন চোখে মমতার ছায়া পড়ছিল। বাবা যখন খুব বেশিরকম আমতা আমতা করতে লাগলেন– তখন মার চোখে একধরনের রসিকতা ঝলমলিয়ে উঠল। সেদিন আমি ডায়েরিতে লিখলাম–আমার ধারণা, আমেরিকায় মা আমার সঙ্গে যাবেন না। বাবা যাবেন।

ডায়েরিতে লিখে আমি মনে মনে অপেক্ষা করছি– দেখি আমার কথা ঠিক হয় কি-না। তারপর একদিন মা টিকিট কেটে দুপুরবেলা বাসায় এলেন। বাবা বাসাতেই ছিলেন। তিনি কোত্থেকে যেন একটা ধাঁধা শিখে এসেছেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি পারলাম না। ফুলির মাকে জিজ্ঞেস করলেন- ফুলির মাও পারল না। আমি তখন বাবাকে বললাম, মাকে জিজ্ঞেস কর। মা পারবে। মা’র বুদ্ধি অনেক বেশি। বাবা বললেন, তোর মা পারবে না। যাদের বুদ্ধি বেশি তারা এটা পারে না। যাদের বুদ্ধি বেশি তারা চট করে জবাব দিতে গিয়ে ভুল করে।যাই হোক, আমি খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি কখন মা আসবে, বাবা মা’কে ধাঁধাটা জিজ্ঞেস করবে।

মা এলেন। খুব ক্লান্ত হয়ে এলেন। এসেই বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে আমার ঘরে এলেন। আমি বললাম, মা, বাবা তোমাকে একটা ধাঁধা জিজ্ঞেস করবে।মা বললেন, ধাঁধা জিজ্ঞেস করার দরকার নেই।আমি বললাম, প্লিজ মা। প্লিজ।মা বাবার দিকে তাকাতেই বাবা ধাঁধা শুরু করলেন– এক বোবা-কালা গিয়েছে পেরেক কিনতে। দোকানদারকে সে হাতে হাতুড়ির মতো ইশারা করে পেরেকের কথা বলল। দোকানদার পেরেকের বদলে হাতুড়ি এনে দিল। তখন সেই বোবা-কালা একহাতে পেরেক ধরার ভঙ্গি করে অন্যহাতে হাতুড়ি মারার মতো করল। তখন দোকানদার বুঝতে পেরে পেরেক এনে দিল। তার কিছুক্ষণ পর দোকানে এক অন্ধ এসে উপস্থিত। তার দরকার একটা কেঁচি। এখন বলো দেখি ঐ অন্ধ কেঁচির কথাটা কীভাবে দোকানদারকে বুঝাবে?

আমি মার দিকে তাকিয়ে আছি। মা কী বলেন- শোনার জন্যে ছটফট করছি। মা ডানহাত উপরে তুলে আঙুল দিয়ে কেঁচির মতো কাটার ভঙ্গি করলেন। আমি এবং বাবা দুজনই হো হো করে হেসে ফেললাম। আমি বললাম, মা, ঐ অন্ধ লোক তো মুখেই বলবে– আমার কেঁচি দরকার। সে আঙুল দিয়ে দেখাবে কেন? মা চমকে উঠে বললেন, আরে তাই তো? আমি এবং বাবা দুজনই আবারো হেসে উঠলাম। মা নিজেও সেই হাসিতে যোগ দিলেন। আমার এত ভালো লাগল। কত বছর পর তিনজন মিলে হাসছি। আশ্চর্য!

আমাদের হাসি থামার পর মা হ্যান্ডব্যাগ থেকে টিকিট বের করে বাবাকে বললেন, নাতাশার সঙ্গে তুমি আমেরিকা যাচ্ছে। আমি তোমার টিকিট কেটেছি। কাজেই ওর সব কাগজপত্র তোমাকে খুব ভালো করে বুঝে নিতে হবে। বাবা এমনভাবে মার দিকে তাকাচ্ছেন যেন মার কথা তিনি বুঝতে পারছেন না। যেন মা একজন বিদেশিনী। অদ্ভুত কোনো ভাষায় কথা বলছেন। যে ভাষা বাবার জানা নেই। মা বললেন, তুমি কাপড়চোপড় কী নেবে গুছিয়ে নাও। সময় তো বেশি নেই।বাবা বিড়বিড় করে বললেন, তুমি যাচ্ছ না? বললাম তো না। একটা কথা ক’বার করে বলব?

না–মানে, মানে…।মা উঠে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লেন এবং দরজা বন্ধ করে দিলেন। বাবা হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ বসে থেকে আমাকে কিছু না বলেই দ্রুত বের হয়ে গেলেন। কোথায় গেলেন কে জানে। হয়তো নিজের জিনিসপত্র গোছাতে গেলেন। কিংবা অন্যকিছু। আমি একা একা শুয়ে আছি। আমার ভালো লাগছে না, আবার খারাপও লাগছে না। এটা বেশ অদ্ভুত অবস্থা। আমাদের জীবনটা হয় ভালো লাগায়, নয় খারাপ লাগায় কেটে যায়। ভালোও লাগে না, খারাপও লাগে না এরকম কখনো হয় না। হলেও খুব অল্প সময়ের জন্যে হয়।

আমি আমার খাতাটা হাতে নিলাম। চিঠিগুলি লিখে ফেলা দরকার। কাকে কাকে লিখব? মাকে, বাবাকে, নানিজানকে এবং ফুলির মাকে। ফুলির মা চিঠি পড়তে পারবে না। অন্যকে দিয়ে সেই চিঠি সে পড়িয়ে নেবে। হয়তো মাকে দিয়ে পড়াবে। কেউ যখন চিঠি পড়ে শোনায় তখন ফুলির মা গালে হাত দিয়ে গম্ভীর মুখে বসে থাকে। তখন তাকে দেখে মনে হয় জগতের সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সে করছে। এতদিন দেশ থেকে আসা তার সব চিঠি আমি পড়ে শুনিয়েছি। তার হয়ে চিঠি লিখে দিয়েছি আমি। ফুলির মা লেখাপড়া না জানলেও চিঠি লেখার সব কায়দাকানুন জানে। খুব ভালো করে জানে।

আফা, চিডির উফরে সুন্দর কইরা লেহেন সাতশ ছিয়াশি।সাতশ ছিয়াশি লিখব কেন? এইটা আফা চিডির দস্তুর। লেহেন সাতশ ছিয়াশি।লিখলাম।এহন লেখেন– পাক জনাবেষু, বাদ সমাচার…। হুঁ লিখলাম।ফুলির মা’র জন্যে চিঠি লেখা খুবই সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কত কী যে সেই চিঠিতে থাকে! তার দেশের কে কেমন আছে সব জানতে চাওয়া হয়। কার অসুখ হয়েছে, কোন মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে… ফুলির মা’র জন্যে চিঠি লিখতে লিখতে সব আমার জানা হয়ে গেছে।তার গ্রামে আমি যদি কখনো বেড়াতে যাই তাহলে সবাইকেই আমি চিনব।

ফুলির মা’র প্রতিটি চিঠি লেখা হবার পর তাকে পড়ে শুনাতে হয়। সে প্রায় দম বন্ধ করে চিঠি শুনে, তারপর শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে। সাদামাটা চিঠি পড়ে তার চোখে পানি আসে কেন কে জানে।আমি ঠিক করেছি আমি প্রতিটি চিঠি শেষ করে ফুলির মা’র মতো একটু কাঁদব। এক ফোঁটা হলেও চোখের পানি চিঠির কোনো এক কোনায় মাখিয়ে রাখব। চোখের পানি শুকিয়ে যাবে, কেউ বুঝতে পারবে না। সেই ভালো। আমি চিঠি লিখা শুরু করলাম।আগে আমি খুব দ্রুত লিখতে পারতাম– এখন পারি না। প্রায় সময়ই চোখ ঝাঁপসা হয়ে আসে- আন্দাজে লিখতে হয়। হাতের লেখা খারাপ হয়ে যায়। একসময় আমার হাতের লেখা খুব সুন্দর ছিল। আমি নিজে যেমন অসুন্দর হচ্ছি। আমার লেখাও তেমনি অসুন্দর হচ্ছে।

৭৮৬

প্রিয় ফুলির মা বুয়া,

তুমি আমার ভালোবাসা নাও।

তুমি যখন আমার এই চিঠি পড়বে তখন আমি বেঁচে থাকব না। মৃত্যুর পর পর মৃত মানুষটিকে সবাই দ্রুত ভুলে যেতে চেষ্টা করে। সেটাই স্বাভাবিক। যে নেই– বার বার তার কথা মনে করে কষ্ট পাবার কোনো কারণ নেই। তারপরেও যারা অতি প্রিয়জন তারা মৃত মানুষকে সবসময়ই মনে রাখে। এক মুহূর্তের জন্যেও ভুলতে পারে না। মৃত মানুষও হয়তো জীবিতদের মনে রাখে।তুমি আমার অতি প্রিয়জনের একজন। প্রিয়জন কে হয় তা কি তুমি জানো? প্রিয়জন হচ্ছে সে যে দুঃখ ও কষ্টের সময় পাশে থাকে।

Leave a comment

Your email address will not be published.