কম্পিউটারের ইতিহাস জেনে নিন বিস্তারিত

১৭০৩ সালে গটফ্রিড উইলহেম লিবনিজ তাঁর লেখায় বাইনারি সংখ্যা সিস্টেমের একটি প্রথাগত গাণিতিক অর্থে যুক্তির উন্নতি করেন । তাঁর সিস্টেমে এক এবং শূন্য সত্য এবং মিথ্যার মানের প্রতিনিধিত্ব করে । কিন্তু ১৮৫৪ সালে প্রকাশিত জর্জ বোল এর গাণিতিকভাবে স্থাপিত গণনীয় প্রসেসের একটি বুলিয়ান এলজেবরা প্রকাশ করতে এক শতাব্দীরও বেশি সময় লেগেছিল । এই সময়ে বাইনারি প্যাটার্নে পরিচালিত একটি যান্ত্রিক ডিভাইস উদ্ভাবিত হয়েছিল । এর অগ্রগতিতে শিল্পবিপ্লব আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল । ১৮০১ সালে জোসেফ মেরি জ্যাকুয়ার্ড-এর তাঁত পাঞ্চা কার্ড ব্যবহৃত হয় যেখানে একটি গর্ত একটি বাইনারি এক এবং একটি স্পট কার্ড একটি বাইনারি শূন্য নির্দেশ করে ।computer

চার্লস ব্যাবেজ – কম্পিউটারের জনক

প্রযুক্তির ইতিহাসে এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব চার্লস ব্যাবেজ । তিনি ছিলেন একাধারে গণিতবিদ, দার্শনিক, আবিষ্কারক এবং যন্ত্রপ্রকৌশলী ।

১৭৯১ সালের ২৬ ডিসেম্বর লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন গণিতবিদ চার্লস ব্যাবেজ । ধনী পিতার সন্তান ব্যাবেজের পড়াশোনা শুরু গৃহশিক্ষকের কাছে । পরে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন কিং এডওয়ার্ড ষষ্ঠ গ্রামার স্কুল, ট্রিনিটি কলেজ, কেমব্রিজে । ব্যাবেজ ১৮১৪ সালে জরজিনা হোয়াইটমোরকে বিয়ে করেন । তিনি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের অধ্যাপক ছিলেন ।

চার্লস ব্যাবেজ সর্বপ্রথম প্রোগ্রামযোগ্য কম্পিউটারের ধারণার সূচনা করেন । ১৮২২ সালে তিনি লগারিদমসহ গাণিতিক হিসাব নিকাশ সহজ করার জন্য সরকারের অনুদানে একটি যন্ত্র ‘ডিফারেন্স ইঞ্জিন’ (Difference Engine) তৈরি করেন । তাঁর এই যন্ত্রটি কিছু সমস্যার কারণে পূর্ণাঙ্গভাবে তৈরি করা যায়নি । তিনি পরে সব গণনাকারী যন্ত্রে স্মৃতিভান্ডারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন । এই প্রয়োজনীয়তার কারণে ১৮৩৩ সালে তিনি যান্ত্রিক কম্পিউটার তৈরির মৌলিক রূপরেখা সম্বলিত ‘অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন’ (Analitical Engine) তৈরির পরিকল্পনা ও নকশা করেন । এ ইঞ্জিনের পরিকল্পনায় আধুনিক কম্পিউটারের বৈশিষ্ট্য ছিল । এজন্য তাকে আধুনিক কম্পিউটারের জনক বা আদি পিতা বলা হয় । ব্যাবেজের স্বপ্ন ছিল- এই যন্ত্রে থাকবে সংযুক্ত একটি পাঞ্চ কার্ড ইনপুট, স্মৃতি অথবা সংরক্ষণ অংশ, একটি গাণিতিক অংশ অথবা মিল (Mill), স্বয়ংক্রিয় মুদ্রণ ব্যবস্থা, আনুক্রমিক কার্যক্রম (প্রোগ্রাম) নিয়ন্ত্রন এবং ২০- প্লেস নির্ভুলতা । তবে প্রয়োজনীয় যন্ত্র ও অর্থের অভাবে এটিরও কাজ শেষ করতে পারেন নি তিনি । তার এই ডিজাইনের উপর ভিত্তি করে আজকের কম্পিউটার তৈরি হচ্ছে । তার অনুপ্রেরণা ছিলেন রবার্ট উডহাউস, জ্যাসর্পাস ম্যাঙ্গে ও জন হার্সচেল । পরের প্রজন্মের কার্ল মার্কস, জন স্টুয়ার্ট মিল এবং অ্যাডা লাভলাসের অনুপ্রেরণা ছিলেন চার্লস ব্যাবেজ । ১৮ অক্টোবর ১৮৭১ সালে ৮৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন চার্লস ব্যাবেজ । ব্যাবেজের মৃত্যুর পর ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত কম্পিউটারের উন্নয়ন থেমে গিয়েছিল । আর পাঞ্চ কার্ড উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণের কাজে রাজত্ব করতে থাকে সারাবিশ্বে ।

অ্যাডা লাভলেস – প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার

তাঁর পুরো নাম অ্যাডা অগাস্টা কিং, ডাকা হতো অ্যাডা লাভলেস নামে । তিনি বিখ্যাত কবি লর্ড বায়রনের কন্যা ও একমাত্র সন্তান । জন্ম ১৮১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর । মাত্র ৩৬ বছর বয়সে ১৮৫২ সালের ২৭ নভেম্বর মারা যান জরায়ুর ক্যান্সার ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ।

ছেলেবেলায় অ্যাডা কিছুটা অসুস্থ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছিলেন । এরপরও তিনি পড়ালেখা চালিয়ে গিয়েছিলেন । মায়ের কারণে অ্যাডা ছোটকাল থেকে বিজ্ঞান ও গণিতে আগ্রহী হলে ওঠেন । ১৭ বছর বয়সে তাঁর বিশেষ গাণিতিক স্ফুরণ ঘটে । অ্যাডা ছিলেন মেধাবী আর গাণিতবিদ ডি মরগ্যান ছিলেন তাঁর শিক্ষক । চার্লস ডিকেন্স, চার্লস হুইটস্টোন এবং মাইকেল ফ্যারাডের সাথে তাঁর জানাশোনা ছিল । ১৮৩৩ সালের ৫ জুন তাঁর সাথে পরিচয় হয় চার্লস ব্যাবেজের । তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ ও রোমান্টিক সম্পর্ক ছিল । সময়ের লোকদের কাছে পাগল হিসেবে বিবেচিত ব্যাবেজের ধ্যান ধারণা যে গুটিকয়েক বুঝতে পেরেছিলেন অ্যাডা তাদের অন্যতম ।

চার্লস ব্যাবেজের অ্যানালাইটিক্যাল ইঞ্জিনের প্রচেষ্টায় সাহায্য করেছিলেন লেডি অগাস্টা অ্যাডা লাভলেস (১৮১৫-১৮৫২) । তিনি তাঁর গণিত বিষয়ক বিশ্লেষণী ক্ষমতার দ্বারা বুঝতে পেরেছিলেন এই মেশিনের নাম্বার ক্র্যাকিং এর অমিত সম্ভাবনা সম্পর্কে । অ্যাডা ব্যাবেজের কাজের কিছু ক্রটি সংশোধন করেন এবং পাঞ্চ কার্ড ব্যবহারের নিমিত্তে প্রোগ্রাম তৈরির নতুন পন্থা আবিস্কার করেন । ব্যাবেজের অ্যানালাইটিক্যাল ইঞ্জিনে সাধারণ এসেম্বলি ভাষার প্রেগ্রাম করার ব্যবস্থা ছিল । লেডি অড্যা এ ইঞ্জিনের জন্য প্রোগ্রাম তৈরি করেন । এ কারণে অ্যাডাকে প্রোগ্রামিং ধারণার প্রবর্তক হিসেবে সম্মানিত করা হয় ।

১৮৪২ সালে ব্যাবেজ তুরিন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ইঞ্জিন সম্পর্কে  বক্তব্য দেন । সে সময় অ্যাডা ব্যাবেজের সহায়তা নিয়ে পুরো বক্তব্যের সঙ্গে ইঞ্জিনের কাজের ধারণাটি বর্ণনা করার সময় তিনি এটিকে ধাপ অনুসারে ক্রমাঙ্কিত করেন । অ্যাডার মৃত্যুর ১০০ বছর পর ১৯৫৩ সালে সেই নোট আবারও প্রকাশিত হলে বিজ্ঞানিরা বুঝতে পারেন অ্যাডা এলগরিদম প্রোগ্রামিং এর ধারণাটা আসলে প্রকাশ করেছিলেন ।

আধুনিক যুগ :

১৮৮০ সালেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পেন্সিল, কলম এবং মাপকাঠির মাধ্যমে উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণ সম্পন্ন হতো । সেই সময়ে উপাত্তের বড় সংখ্যাগুলো দ্রুত বিশালাকৃতির রূপ ধারণ করতে থাকে এবং হস্তলিখিত এই পদ্ধতি একেবারে নির্ভুল ছিল না । তাছাড়া এই পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াকরণে লাগতো দীর্ঘ সময় । এ থেকে উত্তরণের মাধ্যমে কম্পিউটারের আধুনিক যুগের সূত্রপাত ।

মার্ক-১ – প্রথম বৈদ্যুতিক কম্পিউটার

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাওয়ার্ড আইকেন ১৯৩৭ সালে হলেরিথের পাঞ্চ কার্ডের কৌশলগুলো নিয়ে ইলেক্ট্রিক্যাল এবং মেকানিক্যাল প্রযুক্তির সমন্বয়ে একটি ক্যালকুলেটিং মেশিন তৈরির কাজ শুরু করেন । ১৯৩৭-১৯৪৪ সালে হাওর্য়াড আইকিনের নেতৃত্বে এটি তৈরিতে কাজ করেছিলেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও বিখ্যাত আইবিএম কোম্পানির চারজন প্রকৌশলী । এই প্রকল্পের ফলস্বরূপ আবিস্কৃত হয় মার্ক-১ নামক ডিজিটাল কম্পিউটার । এটি ছিল পৃথিবীর প্রথম স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র বা কম্পিউটার । এর অভ্যন্তরীণ অপারেশনগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রিলের সঙ্গে এবং গাণিতিক প্রক্রিয়া ছিল মেকানিক্যাল । মার্ক-১ ছিল একটি ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল কম্পিউটার এবং এটি চার্লজ ব্যাবেজের স্বপ্নের যথাযোগ্য বাস্তবায়ন । এটি ছিল লম্বায় ৫১ ফুট, উচ্চতায় ৪৮ ফুট, ওজন ছিল ৫ টন । এ কম্পিউটারে প্রায় ৩ হাজার ইলেকট্রিক সুইচ ব্যবহার করা হয়েছিল । এতে প্রায় ৭ লক্ষাধিক যন্ত্রপাতির জন্য প্রায় ৫০০ মাইল তার ব্যবহার করা হয়েছিল । এর জীবনকাল ছিল প্রায় ১৫ বছর । মার্ক-১ দ্বারা গণিতের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা যেত । এগুলো হলো – যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ ও টেবিল বা সারণী সংশ্লিষ্ট গণনা । মার্ক-১ দ্বারা দুটি সংখ্যার যোগ ও গুণ করতে সময় লাগত যথাক্রমে ০.৩ ও ৪.৫ সেকেন্ড । মধ্যযুগীয় এই যন্ত্রটি বর্তমানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান যাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য সংরক্ষিত আছে ।

 

 

 

 

Leave a comment

Your email address will not be published.