কালো পাথর (শেষ পর্ব) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

কালো পাথর – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

সন্ধ্যায় ডঃ রায় তার কোয়ার্টারের বারান্দায় বসে গল্প করছিলেন স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে। একটু পরে সুমন এসে গেল। তারপর এল ভাবনা। আড্ডা জমে উঠল। অরুণেন্দু নেই। ওর টো টো করে ঘোরা স্বভাব। মঞ্জুশ্রী পরিহাস করে বলল, অরুদা ভূত খুঁজতে গেছে। ভূত সঙ্গে নিয়ে তবে ফিরবে দেখে নিও।

গেটের কাছে লম্বা চওড়া একটা মূর্তি ভেসে উঠল আবছা আলোয়। ডঃ রায় বললেন, কে ওখানে? গম্ভীর গলায় সাড়া এল–আসতে পারি ডঃ রায়? আরে! কর্নেল সাহেব! আসুন, আসুন! ডঃ রায় উঠে গিয়ে অভ্যর্থনা করে নিয়ে এলেন কর্নেলকে।কর্নেলকে দেখে ভাবনা মুখ টিপে হেসে বলল, আজ মাছ ধরতে যাননি কর্নেল? গিয়েছিলুম।

আজ দুটো মাছ ধরেছি। কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন। ইয়ে–একটা প্রয়োজনে এলুম ডঃ রায়। সকালে আপনার ঘরে টাইপরাইটার দেখেছিলুম। একটা জরুরী চিঠি টাইপ করা দরকার। প্লিজ যদি ডঃ রায় বললেন, স্বচ্ছন্দে! আসুন, ভেতরে আসুন।ডাইনিং-কাম-ড্রয়িংরুমের একপাশে টেবিলের উপর ছোট্ট টাইপরাইটার। কর্নেল চিঠি টাইপ করতে বসলেন। ডঃ রায় বললেন, আপনি কাজ সেরে নিন।

আমরা বাইরে আড্ডা দিই।কিছুক্ষণ পরে চিঠি টাইপ করে বেরিয়ে এলেন কর্নেল। ততক্ষণে পটভর্তি কফি আর স্ন্যাক্স এসে গেছে। মীনাক্ষীদেবী সবাইকে কফি পরিবেশন করলেন। কর্নেল বললেন, অরুণেন্দুবাবুকে দেখছি না! মঞ্জুশ্রী হেসে উঠল। অরুদা ভূত ধরে আনতে গেছে। এখনই এসে পড়বে দেখবেন।

কথায় কথায় মোহান্তজীকে গ্রেফতারের প্রসঙ্গ এল। তারপর দীপ্তেন্দুর ফর্মুলার কথা। ডঃ রায় বললেন, দীপ্তেন্দু গোপনে কী একটা রিসার্চ করছে, আভাস পেয়েছিলাম। কিন্তু খুলে কিছু বলেনি। ওর প্রতিভার পরিচয় পেয়েছি বহুবার। আমাকে যদি ব্যাপারটা বলত, গভমেন্ট থেকে ওর সেফটির ব্যবস্থা করতে পারতুম। বোকামি করে নিজের প্রাণটা খোয়ালো।

মীনাক্ষী বললেন, আর একটা প্রাণও গেল বোকামি করে। অরু কেন চেপে রেখেছিল, বুঝতে পারি না। তোমাকে জানিয়ে দিলেও তো পারত! সুমন বলল, প্রেতশক্তিতে বিশ্বাস করতুম না। কিন্তু এখন করি। আমার ধারণা, অনুরাধা জানত, না কিছু। দীপ্তেন্দুর আত্মাই ওর হাত দিয়ে মঞ্জুশ্রী বাধা দিয়ে বলল, শাট আপ! আবার আত্মা-টাত্মা আনা হচ্ছে? আবার কী সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে যাবে, দেখবে।

এইসব আলোচনা হতে হতে অরুণেন্দু এসে গেল। কর্নেলকে দেখে সে বলল, আরে আপনি! কতক্ষণ? কর্নেল একটু হেসে বললেন, অরণেন্দুবাবু মঞ্জুশ্রীর যদি আপত্তি হবে, আমি কিন্তু সিয়াসের ব্যাপারে ভীষণ আগ্রহী। আজ রাতে যদিও আকাশ পরিষ্কার! তবুও তিথিটা অমাবস্যার।সুমন বলল, ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়া! শুরু হোক তাহলে।ডঃ রায় হাসতে হাসতে বললেন, আজ আমিও আসরে যোগ দিতে রাজি।

মঞ্জুশ্রী বলল, বাবা যদি পার্টিসিপেট করেন, আমার আপত্তি নেই।অরুণেন্দু কঁচুমাচু মুখে বলল, কিন্তু মিডিয়াম কে হবে; তেমন কাউকে তো দেখছি না।ভাবনা বলল, আমি হবো।তুমি– ভাবনা জোর দিয়ে বলল, দেখ না বাবা মিডিয়ামের উপযুক্ত কি না আমি। পরীক্ষা করে দেখতে দোষ কী? না হলে মঞ্জু তো আছেই।মঞ্জুশ্রী আপত্তি করে বলল, আমি ওসবে নেই।

অরুণেন্দু একটু ভেবে বলল, ঠিক আছে। দেখা যাক।সেদিনকার মতো ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসল সবাই। দরজা জানালা বন্ধ করে আলো নিভিয়ে মোম জ্বালানো হল। ভাবনা বসল একদিকে, অন্যদিকে অরুণেন্দু, কর্নেল, ডঃ রায় মঞ্জুশ্রী, মীনাক্ষী ও সুমন।অরুণেন্দু তার অভ্যাসমতো বক্তৃতা দিয়ে ব্যাপারটা বুঝিয়ে কলম ও কাগজ দিল ভাবনাকে। তারপর বলল, আজকের আসরে আমরা গান্ধীজীর আত্মাকে চাইব।

রেডি! সে টেবিলে সংকেত করলে সবাই চুপচাপ গান্ধিজীর সম্পর্কে চিন্তা করতে থাকলেন। মিনিট দুয়েক পরে ভাবনার কলম কেঁপে উঠল। অরুণেন্দু আলতোভাবে কাগজটা টেনে নিয়ে লিখল, আপনি কি গান্ধীজী?

এরপর সে রাতের মতো প্রশ্ন ও জবাব যা লেখা হল, তা এই : আমি অনুরাধা।….তোমাকে ডাকিনি। তুমি যাও।…. আমার বলার আছে।… কী?….. কালো পাথর।……আবার এসব কী?…… মোহান্তজী।…… অরুণেন্দু মুখার্জী।…… আমার নাম লিখছ কেন?…… অনুরাধা, তামাশা কোরো না।…… অরুণেন্দু মুখার্জী।

অরুণেন্দু কাগজটা নিয়ে খাপ্পা হয়ে বলল, নিকুচি করেছে! বললুম– ভাবনাকে দিয়ে হবে না। ভাবনা দুষ্টুমি করছে। সে কাগজটা ফেলে দিতে যাচ্ছিল রাগ করে। কর্নেল তার হাত থেকে ওটা টেনে নিলেন। সবাই হেসে উঠল। অরুণেন্দু উঠে গিয়ে আলো জ্বেলে দিল।

সেই সময় ভাবনা হঠাৎ টেবিলের ওপর মাথা খুঁজে পড়ে গেল–অনুরাধার যেমনটি হয়েছিল।অবাক হয়ে মীনাক্ষী বললেন, ও কী! অজ্ঞান হয়ে গেছে নাকি ভাবনা? মঞ্জু, শীগগির জল নিয়ে আয়!জল আনবার আগেই ভাবনা মাথা তুলে একটু হাসল। আস্তে হঠাৎ মাথাটা ঘুরে উঠেছিল যেন।অরুণেন্দু বিস্মিত দৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে বলল, সত্যি বলছ?

সত্যি!…….. কিন্তু……. কিন্তু কি? তাহলে আমার নাম বারবার লেখার মানে কি? অরুণেন্দু ক্রুদ্ধস্বরে বলল।আমি তো জানি না, কী লিখেছি! অরুণেন্দু গুম হয়ে ভেতরে চলে গেল। মঞ্জুশ্রী হাসতে হাসতে বলল, অরুদা খুব চটে গেছে। কর্নেল, কাগজে কী লেখা হয়েছে, পড়ুন না আমরা শুনি? কর্নেল প্রশ্নোত্তর গুলো পড়লেন। খুব হাসাহাসি পড়ে গেল। ডঃ রায় বললেন, অরুর চটে যাওয়ার কারণ আছে। ভাবনা তুমি নিশ্চয় দুষ্টুমি করছিলে।

ভাবনা সিরিয়াস হয়ে বলল, না মেসোমশাই! সত্যি বলছি, আমি জানি না কী লিখেছি। আমার হাত দিয়ে আপনা আপনি লেখা হয়ে গেছে।সুমন বলল, যদি সত্যি অনুরাধার আত্মা এসে থাকে, তাহলে একটা ব্যাখ্যা দওয়া যায়।মীনাক্ষী বললেন, কী ব্যাখ্যা? অরুণেন্দু মোহান্তজীর চেলা। মোহান্তজীর নামের সঙ্গে তাই ওর নামটাও এসে যায়। অরুণেন্দু আর একটু ধৈর্য ধরলে পারতো। তারপর কী লেখা হচ্ছে বোঝা যেত কোথায় গড়াচ্ছে ব্যাপারটা।কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। এবার ওঠা যাক, ডঃ রায়। প্রায় নটা বাজে।

ভাবনাও উঠল। মীনাক্ষী বললেন, একটু দাঁড়াও, ভাবনা। তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে সুশীলা।ভাবনা বলল, থাক! আমি একা যেতে পারব।কর্নেল বললেন, বরং আমি তোমাকে পৌঁছে দিতে পারি, ভাবনা।বেশ তো! ভাবনা পা বাড়াল।কর্নেল দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ ঘুরে বললেন, একটা কথা, ডঃ রায়! আপনার কি রিভলভার আছে?ডঃ রায় চমকে গেলেন। কেন বলুন তো? এমনি জানতে টাইছি।

ডঃ রায় বললেন, আছে। লাইসেন্সড আর্ম। ইণ্ডাস্ট্রিয়াল এলাকায় গুণ্ডা ডাকাতদের খুব প্রতাপ। তাই রাখতে হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ একথা জানতে চাইছেন কেন? প্লিজ! অন্যভাবে নেবেন না। কর্নেল দ্বিধাগ্রস্ত ভাবে বললেন। যদি কিছু মনে করেন, অস্ত্রটা একটু দেখতে চাই। দেখার অধিকার আইনত আমার নেই। তবু জাস্ট এ রিকোয়েস্ট।ডঃ রায় অবাক হয়ে দ্রুত ভেতরে গেলেন। মীনাক্ষী, মঞ্জুশ্রী সুমন উদ্বিগ্নমুখে কর্নেলের দিকে তাকিয়ে রইল। ভাবনা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

একটু পরেই ডাঃ রায় হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন। স্ত্রীকে বললেন, মিনু রিভলভারটা অন্য কোথাও রেখেছ নাকি? আমার ড্রয়ারে তো নেই ওটা। আলমারির লকারেও নেই।মীনাক্ষী উদ্বিগ্নমুখে বললেন, সে কী! আমি তো কোথাও রাখিনি।এস তো, ভাল করে খুঁজে দেখি। আশ্চর্য! ওটা যাবে কোথায়? কর্নেল বললেন, ঠিক আছে! চলি ডঃ রায়।

আমার ধারণা, আপনার রিভলভারটা চুরি গেছে। আপনি এখনই পুলিশে ফোন করে জানান।বলে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। রাস্তায় পৌঁছে মৃদুস্বরে বললেন, ভাবনা, ওদিকে নয়। এদিকে এস।ভাবনার মুখে হাসি ঝিলিক দিচ্ছিল। বলল, ওদিকে কেন? আমাদের বাড়ি তো উল্টোদিকে।ওই গাছের পেছনে পুলিসের গাড়ি আছে। ওরা তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে।ভাবনা বলল, এক সাহস হবে না করুর, আমি অনুরাধার মতো বোকা নই।

বোকা বুদ্ধিমানের ব্যাপার নয়, ডার্লিং! আজ সকাল থেকে অনুরাধার খুনীর হাতে একটা রিভলভার এসে গেছে। মরিয়া হয়েই এবার সে রিভলভার জোগাড় করেছে। ভোলা ও রামু তোরবেলা পুলিশের ভয়ে ট্রেনে চেপে কোথাও পালাবে। ভেবেছিল। সে ওদের গুলি করে মেরেছে।গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টার মিঃ সিং কর্নেলকে নমস্কার করলেন। কর্নেল ভাবনাকে বললেন, যাও ডার্লিং! মিঃ সিং তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবেন। সাবধানে থেক কিন্তু!

০৮.

বাংলোয় ফিরে কর্নেল ডিনারে বসেছেন, ডঃ কুসুমবিহারী রায় হন্তদন্ত এসে পৌঁছুলেন। মুখে স্বস্তির হাসি। বললেন, কি ভাবনায় পড়ে গিয়েছিলুম বলার নয়। আসলে হয়েছিল কী, রিভলভারটা সবদিন সঙ্গে নিয়ে ঘুরি না। আমার টেবিলের ড্রয়ারেই থাকে। পরশুদিন অফিস থেকে ফিরে ওটা অন্যমনস্কভাবে টেবিলের ওপর রেখে দিয়েছিলুম। আমার গিন্নি সেটা কখন তুলে আমার কোটের পকেটে রেখে দিয়েছিলেন। আর বলবেন না! ওঁর যা ভুলো মন!

কোটের পকেটে পাওয়া গেছে তাহলে? হ্যাঁ, কোট তো সবদিন পরি না। হ্যাঁঙ্গারে ভোলা থাকে। গিন্নি ঠিক আছে। পাওয়া গেছে যখন, আর কথা কী? ডঃ রায় একটু ইতস্তত করে বললেন, কিন্তু হঠাৎ আপনি আবার রিভলভার চুরি যাওয়ার কথা ভাবলেন কেন, প্লিজ যদি সেটা বলেন ধাঁধা কেটে যায়? কর্নেল একটু হাসলেন।

আচ্ছা ডঃ রায়, আপনার রিভলভারে গুলি পোরা ছিল কি? গুলি বের করে ড্রয়ারে রাখি। তবে পরশু গুলি বের করে রাখতেও ভুলে গিয়েছিলুম।আশা করি গুলিভরা রিভলভারই পেয়েছেন কোটের পকেটে! ডঃ রায় ঢোক গিলে বললেন, হ্যাঁ।আপনার রিভলভারটা কত ক্যালিবারের? পয়েন্ট থার্টি এইট। কোল্ট।পরপর ছটা গুলি ছোঁড়া যায় তাহলে? হ্যাঁ।

ছটা গুলিই পেয়েছেন? ডঃ রায় ঠোঁট ফাঁক করে রইলেন এবার। কর্নেলের খাওয়া ততক্ষণে শেষ হয়েছে। বেসিনে হাত ধুয়ে এসে সামনে দাঁড়ালেন ডঃ রায়ের। ডঃ রায় ওঁর দিকে তাকিয়ে মুখ নামিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে সিগারেট বের করে আস্তে বললেন, দুটো গুলি নেই চেম্বারে।কর্নেল বললেন, অরুণেন্দু কোথায় এখন, ডঃ রায়? ডঃ রায় ফেটে পড়লেন এবার। ওই শুওরের বাচ্চার মতলব আমি আঁচ করেছিলুম ইদানিং ঘন-ঘন আসা এবং মোহান্তজীর আড্ডায় যাওয়া দেখে।

ওঃ! শেষে আমাকেও ফাঁসিয়ে ছাড়ল! কর্নেল! বিশ্বাস করুন–আমি ভাবতেও পারিনে যে ও এতদূর এগোবে!অরুণেন্দু কি এখনও আছে আপনারা কোয়ার্টারে? না। তখনই কেটে পড়েছে। ওকে সামনে পেলে তো গুলি করে মারতুম।উত্তেজিত হয়ে আর লাভ নেই, উঃ রায়! কর্নেল ইজিচেয়ারে বসে চুরুট বের করলেন। লাইটার জ্বেলে প্রথমে ডঃ রায়ের সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে নিজের চুরুট ধরালেন।

কাল ডেড মাইন এলাকায় ৩৪৭ নং পিটের কাছে অরুণেন্দু যখন গর্তে জলকাদার ভেতর খন্তা চালাচ্ছিল, গর্তের ধারে নরম মাটিতে ওর জুতোর স্পষ্ট ছাপ পড়েছিল। ফুলঝরিয়া লেকের টিলার নিচে বালির ওপর যে জুতোর ছাপ দেখেছিলুম, তার সঙ্গে হুবহু এক। এ বয়সেও আমার স্মৃতি প্রখর, ডঃ রায়। জুতোর ছাপের মিলটা না দেখা পর্যন্ত আমার অরুণেন্দুকে সন্দেহ হয়নি, তা নয়। মোহান্তজীর সঙ্গে ওঠাবাসা করে জানার পর থেকে সন্দেহ অবশ্যই হয়েছিল। তবে জুতোর ছাপ দেখে নিঃসংশয় হয়ে বুঝলুম কে অনুরাধার খুনী।

একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে কর্নেল ফের বললেন, কাল বিকেলে আমরা না গিয়ে পৌঁছলে ভাবনার দশাও অনুরাধার মতো হতো। অরুণেন্দু জানত মঞ্জুশ্রীকে তার সঙ্গে ডেড মাইন এলাকায় যেতে বললেও সে যাবে না। তার আসল উদ্দেশ্য ছিল ভাবনাকে ডেকে পাঠানো মঞ্জুশ্রীর মারফত। ভাবনাকে খুন করাটা ভোলা ও রামুর ওপর চাপানো সহজ ছিল।ডঃ রায় বললেন, ভাবনাকে খুন করার উদ্দেশ্য কী? ভাবনা তার বন্ধুর মৃত্যুতে আঘাত পেয়ে বড্ড বেশি নাক গলাতে শুরু করেছিল।

আমার কাছে তার যাতায়াত, আমাকে সঙ্গে নিয়ে মোহান্তজীর কাছে যাওয়া–সবই সে লক্ষ করে থাকবে। তার চেয়ে বড় কথা, অরুণেন্দুর সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক যে, অনুরাধা ভাবনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, অতএব যা জানে, তা ভাবনারও জানার কথা। তাই ভাবনাকে খুন করার জন্য একটা মিথ্যা গল্প ফেঁদেছিল। ফুলঝরিয়া লেকের টিলা থেকে ভোলা বেদীর পাথর আনতে যায়নি–আসলে অরুণেন্দুই ওটা চুরি করে ওখানে পুঁতে রেখে এসেছিল।

বেগতিক দেখে সরিয়ে এনে পিট নং ৩৪৭-এ ঢুকিয়ে রেখেছিল। তার চোখের সামনে পিট নং ৩৪৭ এর ফলক। অথচ সে ন্যাকা সেজে খোঁড়াখুঁড়ির ভান করছিল। ভাগ্যিস, ভাবনা অন্য জায়গা খুঁড়তে গিয়েছিল এবং দৈবাৎ আমরা গিয়ে পড়লাম ওখানে।কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, ভোলা ও রামুর মুখ বন্ধ করতে আপনার রিভলভার চুরি করেছিল অরুণেন্দু। তাদের সঙ্গে তার এঁটে ওঠা অসম্ভব। কিন্তু রিভলভার পেলে আর চিন্তা থাকে না।

কিন্তু ওদের মুখ বন্ধ করার দরকার হল কেন? বেদীটা ওদের সাহায্যেই চুরি করেছিল বলে। ওরা পুলিশের জেরার চোটে কবুল করত। সেই ভয়ে সম্ভবত ওদের পালাতে পরামর্শ দিয়েছিল এবং ট্রেনে চাপিয়ে দেবার ছুতো করে এসে নিয়ে গিয়ে গুলি করে মেরেছিল। খাটালের একজন লোক দেখেছে অরুণেন্দু, ভোলা ও রামু একসঙ্গে রেললাইনের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল। পুলিশকে বলেছে সেই লোকটা।

মোহান্তজী কিছু জানতেন না? জানলেও অক্ষম স্থবির মানুষ। ভোলা ও রামুর বিরুদ্ধে কিছু করার ক্ষমতা তার নেই।ডঃ রায় শ্বাস ছেড়ে বললেন, একটা কথা বুঝতে পারছি না। সুদীপ্ত খুন হবার সময় অরুণেন্দু এখানে ছিল। ওই সময় বেদীটাও চুরি যায়। বুঝতে পারছি, তার আগে সুদীপ্তের ফর্মুলাও সে হাতিয়ে নিয়েছে– এবং ৩২৭ নং পিটে লুকিয়ে রেখেছে।……হ্যাঁ।

কিন্তু ওগুলো নিয়ে চলে যায়নি কেন? কেন ও এতদিন অপেক্ষা করছিল। কলকাতা ফিরে গিয়েছিল গত ৩০ সেপ্টেম্বর। এল আবার ২৪ অক্টোবর বিকেলে।কর্নেল হাসলেন। খদ্দের ঠিক করতে গিয়েছি। তাছাড়া আর কোনও কারণ থাকতে পারে না। কোনও বিদেশী রাষ্ট্রের এজেন্ট ঠিক করে সে আবার এসেছিল। যাই হোক, এজেন্ট ভদ্রলোক বেগতিক দেখে আজ বিকেলের ট্রেনে কেটে পড়েছেন।

ডঃ রায় চমকে উঠলেন। বলেন কি? পুলিশ তাকে গ্রেফতার করল না কেন?………..প্রমাণ করা যাবে না কিছু। কর্নেল জোরালো হেসে বললেন। আমার পাশের ঘরেই ছিলেন ভদ্রলোক……………………………..বিদেশী?………………মোটেও না এসব ক্ষেত্রে অত বোকামি করা হয় না।

আলাপ হয়েছিল আপনার সঙ্গে?………………না। আলাপের সুযোগ পেলুম কই?……..আবার গাড়ির গরগর শব্দ হল বাইরে। তারপর পুলিশ ইন্সপেক্টর মোহন শর্মা এলেন হাসিমুখে। ডঃ রায়কে দেখে ভুরু কুঁচকে তাকালেন। কর্নেল পরিচয় করিয়ে দেবার আগেই শৰ্মাজী বললেন, ডঃ রায়কে আমি চিনি। দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, ডঃ রায়ের ভাগ্নে অরুণেন্দুকে একটু আগে আমরা রেলস্টেশনে গ্রেফতার করেছি।

ডঃ রায় গম্ভীর মুখে বললেন, আমার কোনও দুঃখ নেই। ওর শাস্তি হোক।…………কর্নেল পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে বললেন, এই নিন মিঃ শর্মা! টাইপ করা চার ছত্র কবিতা আছে এতে। আমি নিজে টাইপ করেছি। তবে টাইপরাইটার ডঃ রায়ের। এবার অনুরাধাকে যে টাইপ করা চিঠি লিখে ফাঁদে ফেলা হয়েছিল, তার টাইপ কেসের সঙ্গে মিলিয়ে নেবেন। দুটো একই টাইপরাইটারে টাইপ করা। অরুণেন্দু আমার টাইপরাইটারটাই ব্যবহার করেছিল।

ডঃ রায় রাগে দুঃখে অস্থির হয়ে বললেন, শুওরের বাচ্চা! ওর ফাঁসি হোক।………..শর্মাজী হাসতে হাসতে বললেন, সে কী ডঃ রায়! নিজের ভাগ্নেকে শুওরের বাচ্চা বলছেন?……ডঃ রায় উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, কে নিজের ভাগ্নে? কোনও রক্তের সম্পর্ক আছে ভাবছেন নাকি? কলকাতায় আমার দিদির পাড়ায় থাকে। তাকে মাসি বলে সেই পাতানোর সম্পর্কে আমাকে মামা বলেছে। দিদির বয়স হয়েছে। একা মানুষ। ওই হতচ্ছাড়াকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল একবার। সেই থেকে আমি ওর মামা হয়ে গেলুম। মামা!

ডঃ রায় রেগেমেগে বেরিয়ে গেলেন।……………………………….শৰ্মাজী বললেন, কাল আপনার প্রোগ্রাম কী, কর্নেল?…………..ফুলঝরিয়া লেকে ছিপ ফেলা এবং বাগে পেলে দুটো অন্তত প্রজাপতি ধরা। বলে কর্নেল বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন।শৰ্মাজী বেরিয়ে বললেন, খামোকা বুড়ো-মানুষ মোহান্তজীকে টানাটানি করা হল। পরিণামে হয়তো বরাতে বদলি আছে।

ওঁর মুরুব্বিরা প্রভাবশালী। তবে বারাহিয়া আর আমার সহ্য হচ্ছে না, কর্নেল! বদলিটা প্রয়োজন বলেই মনে করব। এমন হুজ্জুতে জায়গা আর কোথাও দেখিনি।কর্নেল বললেন, আমার অবশ্য বারাহিয়াকে ভালই লাগে।………পুলিশ হলে ভাল লাগত না। কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, সেজন্যই পুলিশ হইনি। মিলিটারিতে ঢুকেছিলুম।

 

Read more

ঘুড়ি ও দৈববাণী – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

Leave a comment

Your email address will not be published.