কালো পাথর (৩য় পর্ব) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

কালো পাথর – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

কর্নেল চিঠিটায় চোখ বুলিয়ে চমকে উঠলেন। ইংরেজিতে টাইপ করা ছোট্ট চিঠি। সরলার্থ করলে দাঁড়ায় : ২৬ অক্টোবর বিকেল পাঁচটায় ফুলঝরিয়া লেকের পূর্বদিকে টিলায় গোর্পনে : গিয়ে অপেক্ষা করবে। সুদীপ্তের হারানো জিনিসটার খোঁজ দেব। ইতি, তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী।

কর্নেল বললেন, খুনী ওকে ফাঁদে ফেলেছিল। কিন্তু সুদীপ্তের হারানো জিনিস কী, সে সম্পর্কে আপনি কি কিছু জানেন? পরিতোষবাবু বললেন, অনুর কাছে শুনেছিলুম মনে পড়ছে। সুদীপ্ত কী একটা নতুন মিশ্ৰধাতু আবিষ্কার করেছিল নাকি। একটা ফর্মুলার আকারে সেটা লিখে ব্রিফ কেসে রেখেছিল। ওর ল্যাবরেটরি থেকেই সেটা চুরি যায়।

এটা কতদিন আগের ঘটনা, জানেন? এই তো গতমাসের। সুদীপ্ত যেদিন খুন হল, তার পরদিন অনু ওর মাকে বলছিল। আমার কানে এসেছিল কথাটা। তাই ওকে জিজ্ঞেস করলুম। অনু বলল, যে মিশ্ৰধাতু সুদীপ্ত আবিষ্কার করেছিল, তা নাকি যুগান্তকারী। অসম্ভব হালকা, অথচ ভীষণ শক্তিশালী। ওই দিয়ে মহাকাশযান তৈরি করা যাবে ভবিষ্যতে। সুদীপ্ত ওকে কথাটা গোপন রাখতে বলেছিল।

কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, আর কিছু বলছিল মনে পড়ছে কি?পরিতোষবাবু একটু ভেবে নিয়ে বললেন, হ্যাঁ–অনু বলেছিল, মিশ্ৰধাতুর একটা নমুনা তাকে দেখিয়েছে সুদীপ্ত। জিনিসটা দেখতে কালো পাথরের মতো! ওটার কোডনাম দিয়েছিল নাকি ব্ল্যাকস্টোনকালো পাথর! কালো পাথর? কর্নেল চমকে উঠলেন এবার।আজ্ঞে হ্যাঁ। তাই বলেছিল মনে পড়ছে। ব্ল্যাকস্টোন।ঠিক আছে পরিতোষবাবু! আপনি তাহলে আসুন। আমি দেখছি, কী করা যায়।

আর একটা কথা, এসব কথা আর কাউকে বলবেন না যেন। পুলিসকে যা বলার আমিই বলব।পরিতোষবাবু কর্নেলের হাত ধরে বললেন, আমার বংশে বাতি দিতে কেউ রইল কর্নেল! এই অভিশপ্ত জীবনে অন্তত একটা সান্ত্বনা পাব, যদি অনুর খুনী ধরা পড়ে এবং শাস্তি পায়।কর্নেল তাকে আশ্বাস দিয়ে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এলেন।তাহলে কালো পাথর-এর প্রকৃত রহস্য এটাই। ফুলঝরিয়া লেকের পূর্বদিকের টিলায় যে কালো পাথরটা দেখে এলেন, সেটার কোনো তাই রইল না।

কিন্তু ওখানে যে জিনিসটা পোঁতা ছিল, সেটাই বা কি? কে তুলে নিয়ে গেল ওটা? কিছুক্ষণ পরে জিপের শব্দে কর্নেল দেখলেন পুলিশ ইন্সপেক্টর শর্মাজী আসছেন।মিঃ শর্মা এসে হাসতে হাসতে বললেন, পার্বতীমন্দিরের মোহান্তজী আমার কাছে নালিশ করতে গিয়েছিল একটু আগে। আমাদের গোয়েন্দা নাকি ওকে উত্যক্ত করতে গিয়েছিল। যে বর্ণনা দিল, বুঝলুম আপনি ছাড়া আর কেউ নন। বিশেষ করে কেশরলাল শান্তপ্রসাদজীর মেয়ে ভাবনাও যখন সঙ্গে ছিল।

কর্নেল অবাক হয়ে বললেন, মোহান্তজীর কী ব্যাপার বলুন তো মিঃ শর্মা? পার্বতীমন্দিরের ভেতরে যে মূর্তিটি আছে তার তলায় একটা ছোট্ট বেদী ছিল। ওটা নাকি উল্কা পাথর, নিশ্চয় খুব দামী জিনিস। মোহান্তজীর দুই ষণ্ডামার্কা চ্যালা আছে ভোলা আর রামু। স্বভাবত তাদের সন্দেহ করে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তারা জেরার চাপে বলেছিল, পাথরের বেদীটা নাকি রিসার্চ সেন্টারের সুদীপ্ত মিত্রকে বেচেছে।

সুদীপ্ত মিত্র তার কদিন আগে খুন হয়ে গেছেন। ডেড মাইন এলাকায় ওঁর বডি পাওয়া গিয়েছিল। পেছন থেকে কেউ ছুরি মেরেছিল। যাইহোক, তার বাড়ি সার্চ করে পাথরের বেদীটা আমরা পাইনি।কিন্তু কালো পাথরের কথা শুনে মোহান্তজী ক্ষেপে যান কেন? রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে মাঝে মাঝে আমাদের লোক গিয়ে ওঁকে জেরা করে। প্রথম প্রথম অত চটতেন না। পরে ভীষণ চটে যান। বারাহিয়ার প্রভাবশালী লোকেদের ধরে উনি পুলিশের জেরা করতে যাওয়া ঠেকিয়েছেন।

হাসতে লাগলেন মিঃ শর্মা। কর্নেল বললেন, তার মানে মোহান্তজীর প্রতি আপনাদের সন্দেহ আছে বেদী চুরির ব্যাপারে? নিশ্চয় আছে। আমার অন্তত দৃঢ় বিশ্বাস, মোহান্তজীই ওটা কাউকে বেচেছেন।আপনি কি জানেন, সুদীপ্তবাবু একটা আশ্চর্য মিশ্ৰধাতু আবিষ্কার করেছিলেন?মিঃ শর্মা অবাক হয়ে বললেন, না তো। কে বলল আপনাকে? কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট আবার জ্বেলে ধোঁয়ার ভেতর বললেন, তাহলে সবটাই এবার বলা দরকার আপনাকে। মন দিয়ে শুনুন।…

আগাগোড়া সবটা শোনার পর মিঃ শর্মা গম্ভীর মুখে বললেন, আমি ভেবেছিলাম সাধারণ কেস–এই শিল্প এলাকায় যা আকছার হয়। আসলে আপনার পথে কতকগুলো সুবিধে আছে–অন্তত যে দুটো কেস প্রতাপগড়ে থাকার সময় দেখেছি। আপনার পদ্ধতিও অবশ্য আলাদা। তাছাড়া আজকাল লোকে বিশ্বাস করে পুলিসের কাছে মুখ খুলতে চায় না। লোকের দোষ কী? রাজনীতির চাপে পুলিসও তেমনি বিপর্যস্ত।

কর্নেল বললেন, খুরপির বাঁটে হাতের ছাপটা তুলতে ফরেন্সিক ডিপার্টমেন্টে আজই পাঠিয়ে দিন। একটু তাগিদ দিয়ে কাজটা করতে হবে। আর আজই ডেড মাইন এলাকায় ৩৪৭ নং পিটের ওখানে যাওয়া যাক। বিকেল তিনটেয় বেরুব। আপনি তার আগে আগেই আসুন।

মিঃ শর্মা চিন্তিত মুখে বললেন, ঠিক সময়ে এসে আপনাকে নিয়ে যাব। কিন্তু একটা কথা আমার মাথায় এল এই মাত্র। ফুলঝরিয়ার টিলায় যে গর্তটা দেখেছেন, সেই উল্কাপাথরের বেদীটা লুকোনো ছিল না তো? গর্তের তলায় যে ঘাটের কথা বললেন, তার সঙ্গে চুরি যাওয়া বেদীর মাপটা কিন্তু মিলে যাচ্ছে।

তাহলে এখানে বেদীটাই লুকোনো ছিল!মিঃ শর্মা উঠলেন। নাঃ! আর ভাবলে মাথা ঘুলিয়ে যাবে। হাসতে হাসতে বললেন আপনি লাঞ্চ সেরে নিন। দুটো বাজে প্রায়। আমি পৌনে তিনটের মধ্যে এসে পড়ছি। তারপর উনি খবরের কাগজে জড়ানো খুরপিটা সাবধানে তুলে নিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন।…

০৬.

ডেড মাইন এলাকা ঢিবি খানাখন্দ আর জঙ্গল গজিয়ে দুর্গম হয়ে আছে। জিপ এখানে রেখে কর্নেল ইন্সপেক্টর শর্মাজী আর দুজন সশস্ত্র কনস্টেবল ৩৪৭ নং পিটের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকারের আমলেই এইসব খনি পরিত্যক্ত হয়ে ছিল। তারপর থেকে আর মানুষজন এদিকে চলাফেরা করে না। শৰ্মাজী গত মাসে একবার মাত্র এসেছিলেন এখানে। সুদীপ্তের লাশ পড়েছিল যেখানে, সেই জায়গাটা দেখিয়ে বললেন, এখান থেকে ৩৪৭ নং পিট সম্ভবত বেশি দূরে নয়।

কর্নেল ম্যাপটা আবার দেখা যাক। না হলে খুঁজে বের করা কঠিন হবে।ম্যাপ খুলে দেখা গেল, তারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন–এ জোনের ৩০০ একর খনি সেটা, আর একটু ডাইনে এগোতে হবে। কিছুটা গিয়ে ঘন কাঁটাবন পড়ল। পাশ কাটিয়ে বাঁদিকে ঘুরে কর্নেল থমকে দাঁড়ালেন। শৰ্মাজী ছিলেন পেছনে। বললেন, কী হল কর্নেল?কর্নেল ঠোঁটে আঙুল রেখে বললেন, চুপ!একটা ঢিবির সামনে কয়েকটা পাথরের চাঁই পড়ে আছে।

তার আড়ালে হুমড়ি খেয়ে বসে কেউ কিছু করছে। তার মাথাটা শুধু দেখা যাচ্ছে। চাপা খস্ খস্ ঠং ঠং শব্দও কানে এল। কেউ খোঁড়াখুঁড়ি করছে।কর্নেলের ইশারায় শৰ্মাজী আর কনস্টেবল দুজন তিনদিক থেকে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে গেল। কর্নেল একটু অপেক্ষা করছিলেন। ডাইনে ও বাঁয়ে ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে ঘুরে পুলিশের ছোট্ট দলটি ঢিবির পেছনে গেলে কর্নেল সোজা এগিয়ে গেলেন। তারপর পাথরের চাঁইগুলোর ওপর এক লাফে উঠে একটু কাশলেন।

একটা প্রকাণ্ড গর্তে জলকাদা আর ঘাসের ভেতর বসে একটা বেলচা দিয়ে খোঁড়াখুড়ি করছিল যে, তার জামাকাপড়ে যথেষ্ট কাদা লেগেছে। সে চমকে গিয়ে ঘুরল। তারপর কাঁচুমাচু হেসে উঠে দাঁড়াল।অত্যন্ত ভদ্র চেহারার এক যুবক। কর্নেল অবাক হয়ে বললেন, কে আপনি! এখানে কী করছেন?যুবকটি এবার পুলিশদেরও দেখতে পেয়ে আরও হকচকিয়ে গেল। শৰ্মাজী তার দিকে রিভলভার তাক করে গর্জে বললেন, উঠে এস! ওঠো বলছি।

যুবকটি বলল, কী দোষ করেছি আমি? আপনারা আমাকে মিছিমিছি– কর্নেল ভুরু কুঁচকে তাকে দেখছিলনে। তার কথায় বাধা দিয়ে বললেন, কী নাম আপনার?অরুণেন্দু মুখার্জি। ডঃ কুসুমবিহারী রায় আমার মামা হন।শর্মজী ধমক দিয়ে বললেন, বিপদে পড়লে অনেকেই অনেকের ভাগ্নে হয়ে যায়! উঠে না এলে ঠ্যাং ভেঙে দেব গুলি করে।অরুণেন্দু বিরক্তমুখে বেলচাটা নিয়ে গর্ত থেকে উঠে এল। তারপর বলল, অন্যায়টা কী করেছি, বুঝতে পারছি না, আমি যা করছিলুম, তাতে গভর্নমেন্টেরই লাভ হতো।

মিঃ শর্মাকে ইশারায় থামতে বলে কর্নেল জিগ্যেস করলেন, কী ব্যাপার অরুণেন্দুবাবু? আপনি ভূতপ্রেত ছেড়ে হঠাৎ এখানে এসে জলকাদা ঘাঁটছেন কেন? অরুণেন্দু কর্নেলকে দেখে নিয়ে বলল, ও! আপনিই তাহলে সেই কর্নেলসায়েব? ভাবনা আমাকে আপনার কথা বলছিল কিছুক্ষণ আগে। দাঁড়ান ওকে ডাকি আগে।সে পাথরের চাঁইগুলোর উপর উঠে চেঁচিয়ে ডাকল, ভাবনা! ভাবনা! একটু দূরে জঙ্গলের ভেতর থেকে সাড়া এল, যাচ্ছি!

ছেড়ে দাও! চলে এস এখানে! ডানদিকের ঘন ঝোপজঙ্গল থেকে জলকাদা মাখা ভাবনাকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল। তার হাতেও একটা খন্তা এবং কোমরে আঁচল জড়ানো। চুলেও যথেষ্ট কাদা লেগেছে। সে কর্নেলদের দেখেই অপ্রস্তুত হেসে থমকে দাঁড়াল।কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, এস ভাবনা! বুঝতে পারছি, তুমি এ বুড়োর ওপর ভরসা না করে নিজেই গোয়েন্দাগিরি করতে নেমেছে।ভাবনা এসে ক্লান্তভাবে বসে পড়ল পাথরে। তারপর বলল, অরুদা, তুমিই বলল ব্যাপারটা। আমি হাঁপিয়ে গেছি।

অরুণেন্দু বলল, আপনি আর ভাবনা সকালে যখন মোহান্তজীর কাছে গেলেন, তখন আমি বটগাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিলুম। সিয়াসের আসরে সুদীপ্তের আত্মা মোহান্তজী কথাটা লিখেছিল। সেই থেকে মোহান্তজীর ওপর চোখ রেখেছিলুম। আমার সঙ্গে তো ওঁর বহুদিনের আলাপ। যাই হোক, আপনারা চলে গেলেন মোহান্তজীর তাড়া খেয়ে, তার একটু পরে দেখি, মোহান্তজী ওঁর চ্যালা দুটোকে কী বলছেন। বলার পর ভোলা নামে চ্যালাটা একটা খুরপি নিয়ে বেরিয়ে গেল মন্দিরের পেছন দিকে।

ভোলাকে ফলো করলুম। ফুলঝরিয়া লেকের পূর্বদিকে টিলার ঢালে একটা মস্তবড় কালোপাথর আছে। সেখানে ভোলা খোঁড়াখুঁড়ি করে কী একটা জিনিস বের করল। তারপর সেটা লাল একটা কাপড়ে বাঁধছে, এমন সময় দেখি আপনি টিলার নিচে লাফালাফি করছেন। তখন তো চিনি না আপনাকে। তাই কর্নেল হাসলেন। হ্যাঁ–পরীক্ষা করছিলুম বালিতে দৌঁডুলে কতটা পা দেবে যায়।

আমি ভেবেছিলুম পাগলটাগল হবে। অরুণেন্দু হাসল।তো আপনাকে দেখতে পেয়েই ভোলা পালিয়ে গেল। ওকে ফলো করে আবার মন্দিরে চলে এলুম। আড়াল থেকে দেখলুম, মোহান্তজী ভোলাকে আবার কী নির্দেশ দিচ্ছে। এবার ভোলা আর রামু দুজনেই বেরুল মন্দিরের পেছন দিয়ে। ভোলার হাতে লাল কাপড়ে বাঁধা সেই জিনিসটা। ওদের ফলো করে দেড় মাইল এলাকায় এলুম। কিন্তু এখানে এসে ওদের হারিয়ে ফললুম। ঝোপের আড়ালে গুঁড়ি মেরে অনেক খুঁজলুম ওদের।

কিছুক্ষণ পরে দেখি, দুজনে জলকাদা মেখে ভূত হয়ে বেরুচ্ছে এই ঢিবির কাছ থেকে। ওরা চলে যাওয়ার পর খুব খোঁজাখুঁজি করেও জিনিসটা কোথায় পুঁতে রেখে গেল বুঝতে পারি নি। বাড়ি ফিরলুম তখন প্রায় বারোটা বাজে। স্নান-খাওয়া সেরে আমার মামাতো বোন মঞ্জুশ্রীকে বললুম– ব্যাপারটা। তারপর বললুম– তুমি যদি ঢিবির ওপর উঠে চারদিকে নজর রাখো, আমি আশেপাশে গর্তগুলো খুঁজে দেখব। মঞ্জুশ্রী ভীষণ ভীতু। ও যাবে না।

শেষে বলল, দাঁড়াও, তাহলে ভাবনাকে ডেকে দিই। ও খুব সাহসী মেয়ে। একটু পরে ভাবনাকে ও ডেকে নিয়ে এল। ভাবনা সঙ্গে সঙ্গে রাজি হল। অরুণেন্দু একটু দম নিয়ে ফের বলল, আসার পথে এই হাল্কা বস্তাদুটো একটা বস্তি থেকে ভাড়া করে আনলুম। কারণ ভাবনা বলল, তুমি একদিকে আমি আরেক দিকে খোঁজখুঁজি করব। মাঝে-মাঝে ঢিবিতে উঠে গিয়ে লক্ষ রাখব। আমার এতে আপত্তি ছিল কিন্তু।

দেখলে তো ভাবনা, যদি কর্নেলসায়েবদের বদলে মোহান্তজীর চ্যালারা এসে হাজির হতো, কী সাংঘাতিক বিপদে না পড়তুম।— ভাবনা বলল, আমি ঝোপের আড়ালে ছিলুম। আমাকে দেখতে পেত না। আমি আড়াল থেকে ঢিল ছুঁড়ে ওদের ভয় পাইয়ে দিতুম দেখতে। ওদের ভূতের ভয় কি আর নেই? সে খিলখিল করে হেসে উঠল। মিঃ শর্মা এদিক ওদিক ঘুরে কী দেখছিলেন। হঠাৎ বলে উঠলেন, আরে। এটাই তো দেখছি পিট নম্বর ৩৪৭। ওই তো ঢিবির তলায় কাঠের ফলকে লেখা আছে।

ফলকের ওপর ঘাস হাত বাড়িয়ে আছে। তবু পড়া যায়। অরুণেন্দু বলল, ফলকটা চোখে পড়েনি আমার। তবে অনুমান করেছিলুম এটাই ৩৪৭ নম্বর পিট।কর্নেল গর্তটা ঘুরে ঢিবির নিচে ফলকটার কাছে গেলেন। তারপর জায়গাটা পরীক্ষা করে বললেন, কংক্রিটের স্ল্যাব দিয়ে সিল করা ছিল বটে কিন্তু স্ল্যাবটা উপড়েছিল মনে হচ্ছে। মিঃ শর্মা, আসুন তো। খন্তা দিয়ে স্ল্যাবটা ওপড়ানো যায় নাকি দেখি। ওপরের দিকটায় সূক্ষ্ম ফাটল দেখতে পাচ্ছি।

কনস্টেবল দুজন রাইফেল রেখে এগিয়ে গেল মিঃ শর্মার নির্দেশে। দুজনে খস্তাদুটো দিয়ে চাড় দিতেই বিরাট কংক্রিটের চাবড়া সরে কাত হয়ে পড়ল। ভেতড়ে সুড়ঙ্গের মতো প্রকাণ্ড হ। কর্নেল কিটব্যাগ থেকে টর্চ বের করে ঝুঁকে গেলেন সুড়ঙ্গের ভেতরে। তারপর টর্চ জ্বেলে বললেন, হু লালকাপড় বাঁধা জিনিসটা দেখতে পাচ্ছি। আরও একটা কী দেখা যাচ্ছে যেন।কর্নেল গুঁড়ি মেরে ভেতরে ঢুকে গেলেন। একটু পরে সুড়ঙ্গের মুখে ফিরে এসে বললেন, মিঃ শর্মা। ধরুন।

প্রথমে লালকাপড়ে বাঁধা জিনিসটা, তারপর একটা ব্রিফকেস–পুরনো, ইষৎ তোবড়ানো।কর্নেল বেরিয়ে এলেন। লালকাপড়ের গিঁট খুললে বেরিয়ে পড়ল কাদামাখা একটা কালো চৌকো পাথর–অত্যন্ত হাল্কা ওজন। আন্দাজ আটইঞ্চি চওড়া এবং চার ইঞ্চি মতো পুরু। পার্বতীমন্দিরের চুরি যাওয়া সেই উল্কাপাথরের বেদীটাই বটে।ব্রিফকেসটা অনেক চেষ্টায় খোলা হল। তার ভেতর প্যাকেট করা একগাদা কাগজ–দুর্বোধ্য সব আঁকজোক, নকশা, অঙ্ক, জ্যামিতি।

একটা মোড়ক থেকে বেরুলো কয়েক টুকরো কালো অসম্ভব হাল্কা চাকতির মতো জিনিস। অরুণেন্দু ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস-প্রশ্বাস ফেলছিল উত্তেজনায়। বলল, এসব কী? কর্নেল বললেন, দীপ্তেন্দু মিত্রের ব্রিফকেস। সম্ভবত তার আবিষ্কৃত সেই আশ্চর্য মিশ্র ধাতুর ফর্মুলা আর নমুনা আমরা উদ্ধার করতে পেরেছি। এই ব্রিফকেসটা চুরি গিয়েছিল তার ল্যাবরেটরি থেকে।মিঃ শর্মা বললেন, আর এখানে নয়। এখনই মোহান্তজীকে গ্রেফতার করতে হবে।…

০৭.

পরদিন সকালে পুলিশ ইন্সপেক্টর শর্মাজী এলেন সেচবাংলোয়। কর্নেল তখন ছিপ আর প্রজাপতি ধরা জাল নিয়ে বেরোবেন বলে তৈরি হচ্ছেন। বললেন, কী মিঃ শর্মা? আসামী কবুল করল কিছু।শৰ্মাজী বললেন, মোহান্তজী ভীষণ ধূর্ত লোক। পেট থেকে কথা আদায় করা গেল না। তার ওপর প্রভাবশালী মহল থেকে ভীষণ চাপ শুরু হয়েছে। ওঁকে ছেড়ে দিতে হবে বলে চাপ দেওয়া হচ্ছে।

ভোলা আর রামুকে পাওয়া যায়নি এখনও? নাঃ। বেমালুম গা ঢেকে দিয়েছে। শৰ্মাজী হতাশভঙ্গিতে বললেন, তবে মোহান্তজীর পেছনের লোকটি কে, সেটা যতক্ষণ না জানা যাচ্ছে, ততক্ষণ কালোপাথর ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে না। বেদীর পাথরটা আর বিজ্ঞানী দীপ্তেন্দু। মিত্রের উদ্ভাবিত মিশ্র ধাতু–যার কোড নেম দিয়েছিলেন ব্ল্যাকস্টোন–উভয়ের মধ্যে সম্পর্কটা বোঝা যাচ্ছে না।

কর্নেল একটু হাসলেন। বোঝা গেছে খানিকটা। কাল রাত্রে দীপ্তেন্দুবাবুর ব্রিফকেসের গবেষণাপত্র ওল্টাচ্ছিলুম। আমি বিজ্ঞানী নই ঠিকই, কিন্তু প্রাথমিক কতকগুলো ব্যাপার আমার জানা আছে। পল্লবগ্রাহিতা বলতে পারেন।বিলক্ষণ জানি। আপনি সর্বশাস্ত্রবিদ, পণ্ডিত মানুষ!কর্নেল হো হো করে হেসে ফেললেন। দেখুন মিঃ শর্মা। পণ্ডিত এবং শিং ওয়ালা প্রাণীর কাছ থেকে আমি সব সময় একশো হাত দূরে থাকি।

যাইহোক, দীপ্তেন্দুবাবুর নোটগুলোতে দেখছিলুম, একখানে মন্তব্য লেখা আছে : এক ধরনের কালো উল্কাপাথর পাওয়া গেছে বহু জায়গায়। বারাহিয়ার পার্বতীমন্দিরের ভেতর একটা বেদী আছে। সেটাও ওই শ্রেণীর পাথর। এ আসলে পাথরই নয়। একজাতের। মিশ্র ধাতু। খুব হাল্কা এবং শক্তিশালী।.কর্নেল উঠে গিয়ে ব্রিফকেসটা নিয়ে এলেন। এটা আর কাছে রাখা নিরাপদ নয়। আমার পরীক্ষা শেষ। আপনি নিয়ে যান এবার। তাছাড়া এটা কোর্ট এভিডেন্স।

শৰ্মাজী ব্রিফকেসটা নিয়ে বললেন, কিন্তু ব্যাপারটা এখনও পরিষ্কার হল না কর্নেল! বেদীর পাথরটা দেখেই দীপ্তেন্দু মৈত্র ওইরকম ধাতু কৃত্রিম উপায়ে তৈরির অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন এটুকু অনুমান করতে পেরেছি। এবার বুঝতে আশা করি অসুবিধে হবে না মিঃ শর্মা, যিনি দীপ্তেন্দুবাবুর এই ব্রিফকেস চুরি, তাকে হত্যা এবং পরে অনুরাধাকে হত্যা–এতসব কাণ্ড করিয়েছেন, তাঁরই ওই বেদীটা হাতানোর চেষ্টা করা স্বাভাবিক। মোহান্তজীর পেছনের যে লোকটির কথা আপনি বলছিলেন, তিনি মূল অপরাধী। মেহান্তজী টাকার লোভে চেলাদের সাহায্যে তাঁরই হুকুম তামিল করেছেন।

মোহান্তজীকে কবুল করানো প্রায় অসম্ভব কর্নেল।কর্নেল চুরুট ধরিয়ে একটু ভেবে নিয়ে বললেন, একটা ব্যাপার পরিষ্কার যে দীপ্তেন্দু যেভাবে হোক, টের পেয়েছিল তার ব্রিফকেস চুরি করে ডেড মাইনের ৩৪৭ নং পিটে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। হা–মোহান্তজীই লুকিয়ে রেখেছিলেন ভোলা ও রামুর সাহায্যে। নিশ্চয় দরাদরি চলছিল। তাই ওই ব্যবস্থা।

বেশি টাকা চেয়েছিলেন হয়তো।তাই মনে হচ্ছে। তবে একজায়গায় ব্রিফকেস, অন্য জায়গায় বেদীর পাথর লুকিয়ে রাখার অতিরিক্ত সতর্কতা। দীপ্তেন্দুবাবু রাত্রে পিট নং ৩৪৭-এ ব্রিফকেস উদ্ধার করতে গিয়ে খুন হলেন। তার আগে ব্যাপারটা তার প্রেমিকা অনুরাধাকে বলে থাকবেন। তা না হলে অনুরাধা জানবে কেমন করে? ঠিক, ঠিক।

শৰ্মাজী বললেন। এ-ও বোঝা যাচ্ছে আপনি মোহান্তজীকে কাল সকালে কালোপাথরের কথা বলার পর উনি ভয় পেয়েছিলেন তাই ওটা ফুলঝরিয়ার টিলা থেকে সরিয়ে পিট নং ৩৪৭-এ লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেন। এ পর্যন্ত সব স্বচ্ছ।এই সময় একজন পুলিশ অফিসার সঙ্গে কনস্টেবল সহ হন্তদন্ত হাজির হলেন।

শৰ্মাজী বললেন, কী ব্যাপার মিঃ সিং? সাব ইন্সপেক্টর সুরেশ সিং বললেন, স্যার! ভোলা আর রামুর ডেড বডি পাওয়া গেছে রেল লাইনের ধারে। গুলি করে মারা হয়েছে দুজনকে। দুজনেরই মাথার পেছনে দিকে গুলি লেগেছিল।শৰ্মাজী লাফিয়ে উঠলেন। কী সাংঘাতিক কাণ্ড! কর্নেল বললেন, লোকটা এবার মরিয়া হয়ে উঠেছে, মিঃ শর্মা! ভোলা আর রামুর মুখ চিরকালের মতো বন্ধ করে দিয়েছে।কিন্তু কে সে?এখন জানি না আমরা।

শুধু এটুকু জানি, দীপ্তেন্দুর উদ্ভাবিত মিশ্ৰধাতুর ফর্মুলা আর কালো বেদীটা সে হাতাতে চেয়েছিল। ভেবে দেখুন মিঃ শৰ্মা, এ দুটো জিনিস যে-কোনও ধনী দেশকে বিক্রি করতে পারলে কোটিপতি হয়ে যেত।মোহন্তজীকে কবুল করাতেই হবে তাতে আমার ভাগ্যে যা ঘটে ঘটুক। বলে শর্মজী সদলবলে বেরিয়ে গেলেন বাংলো থেকে। ওঁদের জিপ দুটো সবেগে নেমে গেল উতরাইয়ের রাস্তায়।…

 

Read more

কালো পাথর (শেষ পর্ব) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

Leave a comment

Your email address will not be published.