আমি নিজে মনে করি পারুল মারা গেছে–রঙ কী সেটা একবারের জন্যে হলে ও দেখতে গিয়ে। আমার এই ধারণার কথা আমি বাবাকে বলিনি। বললে তিনি খুব কষ্ট পেতেন।পারুলের মৃত্যুর পর বাবা এমন ভাব করলেন যেন তিনি খুশি হয়েছেন। পারুলকে কবর দেয়া হল পুকুর পাড়ে। কবর দেয়ার পরে বাবা আর আমি চুপচাপ বারান্দায় বসে আছি। বাবা বললেন—ভালই হয়েছে বুঝলি উগর। মেয়েটা মরে গিয়ে বেঁচেছে। আমি আসলে খুশিই হয়েছি। আই এম এ হ্যাপী ম্যান। মেয়েটার বিয়ে দিতে পারতাম না, কষ্টে কষ্টে জীবন কাটত। তাই না?
আমি বললাম, হ্যাঁ।আমি যতদিন থাকতাম মেয়েটাকে দেখতাম। তারপর আমি যখন মারা যেতাম তখন কী হত? তুই থাকতি তোর নিজের সংসারে নিয়ে। পারুল তোর সঙ্গে থাকলে তোর বৌ হয়ত সেটা পছন্দ করত না। ঠিক না? হ্যাঁ।যা হয়েছে ভালই হয়েছে। ঠিক না টগর? হুঁ ঠিক।চুপচাপ বারান্দায় বসে থেকে কী করবি? যা ঘুমুতে যা।আমি ঘুমুতে গেলাম। বাবাও ঘুমুতে গেলেন। কিছুক্ষণ পরই শুনি বাবা। বিকট চিৎকার করে কাঁদছেন। আমি বললাম, কী হয়েছে বাবা? বাবা বললেন, মেয়েটা একা একা ভয় পাচ্ছে।আমি বললাম, চল আমরা দু’জন কবরের পাশে বসে থাকি।বাবা তৎক্ষণাৎ বিছানা থেকে নেমে বললেন, চল যাই।
আমরা দু’জন বাকি রাতটা পারুলের কবরের পাশে চুপচাপ বসে কাটিয়ে দিলাম। ভোরবেলা আমি ঘরে ফিরলাম জ্বর নিয়ে। তেমন জ্বর না, সামান্য শরীর গরম। মাথা ঝিমঝিম। সেই জ্বর আর কাটে না। এক দু’দিন ভাল থাকি আবার জ্বর আসে।শরীর দুর্বল হতে থাকল। এক সময় চোখ ঘোলাটে হয়ে গেল। কিছুদিন পর এমন অবস্থা হল যে আমি বিছানা থেকে মাথা তুলতে পারি না। কিছুই খেতে পারি না। সামান্য পানি মুখে দিলেও বমি হয়ে যায়। নানান ধরণের চিকিৎসা হতে থাকল। এলোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, কবিরাজী, ইউনানী। আধি ভৌতিক চিকিৎসাও হল। কেউ কেউ বললেন আমাকে জ্বীনে ধরেছে। সেই জ্বীন তাড়াবার ব্যবস্থাও হল। হলুদ পুড়িয়ে নাকের কাছে ধরা।
শুকনো মরিচ পুড়িয়ে ধোয়া দেয়া। ভয়াবহ ব্যাপার। কোন লাভ হল না। বাবা আমাকে ঢাকায় নিয়ে গেলেন। ঢাকার ডাক্তাররা অনেক পরীক্ষা নীরিক্ষা করে বললেন—আমার যা হয়েছে তার নাম জন্ডিস। খুব খারাপ ধরনের জন্ডিস। হেপাটাইটিস বি। লিভার পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। ডাক্তারদের নাকি করার কিছু নেই। বাবা আমাকে দেশের বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে এলেন।এক রাতে আমার অবস্থা খুব খারাপ হল। রহিমা খালা কান্নাকাটি শুরু করলেন। আমি বাবাকে ডেকে বললাম, আমার খুবই খারাপ লাগছে। নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। দম আটকে আসছে। তুমি আমাকে কোলে করে বারান্দায় নিয়ে যাও। খোলা বাতাসে আমি বোধ হয় নিঃশ্বাস নিতে পারব।
বাবা আমাকে কোলে তুলে নিলেন। তবে আমাকে বারান্দায় নিয়ে গেলেন না। বাড়ির পেছনে নিয়ে গেলেন। আমাদের বাড়ির পেছনে পুকুর পাড়ে বড় একটা শিউলি গাছ ছিল। প্রতি বছর এই গাছে অসংখ্য ফুল ফুটতো। বাবা সরাসরি গাছের কাছে নিয়ে গেলেন এবং আমাকে অদ্ভুত একটা কথা বললেন—বাবা বললেন, টগর তোর যে অসুখ হয়েছে সেই অসুখ সারাবার সাধ্য মানুষের নেই। আমি একটা শেষ চেষ্টা করব। অন্য রকম এক চিকিৎসা। সাধু ধরনের একজন মানুষ এই চিকিৎসায় ভাল হয়েছেন। তাঁর মুখ থেকে শোনা। সব চেষ্টাই তো করা হল—এটাও এক ধরনের চেষ্টা।আমি ক্ষীণ স্বরে বললাম, কী চেষ্টা?
তোকে আমি শিউলি গাছের নীচে বসিয়ে দিব। তুই দুই হাতে শক্ত করে গাছটাকে জড়িয়ে ধরে থাকবি আর মনে মনে বলবি, গাছ তুমি আমার অসুখটা তোমার নিজের শরীরে নিয়ে আমাকে সুস্থ করে দাও। পারবি না? আমি বললাম, পারব। বাবাকে খুশি করার জন্যেই বললাম পারব।ডুবন্তু মানুষ বাঁচার জন্যে খরকুটো ধরে। বাবাও তাই করছেন। কিছু না পেয়ে গাছের হাতে আমাকে তুলে দিচ্ছেন। বাবা যে ভাবে গাছ ধরতে বললেন, সেই ভাবে ধরলাম এবং মনে মনে বললাম, হে গাছ তুমি আমার রোগ তোমার নিজের শরীরে নিয়ে আমাকে সুস্থ করে দাও।বাবা বললেন, টগর। তোকে এই যে আমি গাছের সঙ্গে জুড়ে দিলাম আর তুলব না। তুই খুব মন লাগিয়ে গাছকে বল তোকে সারিয়ে দিতে।
আমি গাছ জড়িয়ে ধরে বসে আছি। আমার অসম্ভব দুর্বল শরীরে কিছু না ধারে বসে থাকাও সম্ভব না। আমি যা করছি তা যে খুব অস্বাভাবিক কিছু তাও মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে যা করছি, ঠিকই করছি।রহিমা খালা বাবাকে বললেন—আপনের কি মাথাটা খারাপ হইছে? আপনে করতাছেন কী? এইটা কেমন চিকিৎসা? অসুখ হইছে পুলার। মাথা খারাপ হইছে আপনের।বাবা বললেন, তুমি কথা বলবে না রহিমার মা। একটা কথাও না।এই অবস্থায় কতক্ষণ থাকব?
জানি না।আমার অসুখ এই পর্যায়ের ছিল যে আমি বেশির ভাগ সময়ই ঘোরের মধ্যে থাকতাম। চারপাশে কী হচ্ছে না হচ্ছে বুঝতে পারতাম না।গাছ জড়িয়ে ধরার পর পরই আমি ঘোরর মধ্যে চলে গেলাম। প্রবল ঘোর। মাঝে মাঝে ঘোর কমে, আমি আবছা ভাবে দেখি বাবা পাশেই বসে আছেন। আমি যতবারই চোখ মেলি ততবারই বাবা বললেন—কথা বল। গাছের সঙ্গে কথা বল।আমি ফিস ফিস করে বলি—হে গাছ তুমি আমার রোগ তোমার শরীরে নিয়ে আমাকে সারিয়ে দাও। হে গাছ তুমি আমার রোগ তোমার শরীরে নিয়ে আমাকে সারিয়ে দাও। হে গাছ তুমি…
বাবা আমাকে গভীর রাতে গাছের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলেন। রাত কেটে ভোর হল আমি সেইভাবেই রইলাম। বেলা বাড়তে থাকল। এক সময় মাথায় রোদ এসে পড়ল—আমি নড়লাম না। আমার সময় কাটতে লাগল প্রবল ঘোর এবং প্রবল অবসাদের মধ্যে। আশেপাশে কি হচ্ছে না হচ্ছে সেই বোধ ক্রমেই লুপ্ত হতে থাকল। কেউ যেন আমাকে আমার চেনা জগৎ থেকে খুব ধীরে ধীরে আলাদা করে নিচ্ছে। আমি প্রবেশ করছি অন্য এক ভুবনে। সেই ভুবন ছায়াময়, আনন্দময় এবং নিস্তরঙ্গ জলের মতো শান্ত। সেই জলে ছায়া পড়ে, কিন্তু ছায়া স্থায়ী হয় না।
একটা ছায়া মিলিয়ে যায় অন্য ছায়া আসে। নিস্তরঙ্গ জলে চলমান গতিময়। জীবন।এক সময় আমি চোখ মেললাম, দেখলাম সন্ধ্যা মিলিয়েছে। আকাশে শেষ সূর্যের আলো। আমি গাছ জড়িয়ে ধরে বসে আছি। বাবা আমার পাশেই। তার মুখে রাজ্যের ক্লান্তি। তিনি আগ্রহ নিয়ে বললেন, টগর শরীরটা কী একটু ভাল লাগছে? আমি বললাম, হ্যাঁ।নিঃশ্বাসে কষ্ট হচ্ছে না? আমি বললাম, না। কষ্ট হচ্ছে না।খিদে পেয়েছে? কিছু খাবি? হুঁ।শরীরটা কী সত্যি ভাল মনে হচ্ছে? হুঁ।বাবা মহাবিষ্ময় নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি গাছ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। বাবা বললেন, একি গাছ ছেড়ে দিলি কেন?
আমি বললাম, আমি ভাল হয়ে গেছি। কথাটা যে আমি নিজে বললাম তা। আমার ভেতর থেকে অন্য কেউ যেন বলল। দীর্ঘদিন পর প্রথমবারের মতো আমি কারও সাহায্য ছাড়াই নিজে হেঁটে বাড়ি ফিরলাম। জলচৌকিতে বসিয়ে গরম পানিতে আমাকে গোসল করানো হল। রহিমা খালা বার বার বলতে লাগলেন, বড় আচানক ঘটনা। বড়ই আচানক।আমার জন্যে আলোচালের ভাত এবং শিং মাছ রান্না করা হল। তৃপ্তি করে ভাত খেলাম। আগের মতো বমি করে ভাত উল্টে ফেলে দিলাম না।বাবা বললেন, এখনও কি ক্লান্ত ভাব আছে? আমি বললাম, আছে।বাবা বললেন, চল যাই গাছ জড়িয়ে ধরে বসে থাক। একটু কষ্ট কর।আমি বললাম, আর গাছ জড়িয়ে ধরে বসে থাকতে হবে না। আমি সেরে গেছি। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। আমি ঘুমাব।
বাবা আমাকে শুইয়ে দিলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আমি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। এমন শান্তিময় ঘুম আমি আগে কখনো ঘুমাই নি। ভবিষ্যতেও যে ঘুমাব তা মনে হয় না। যেন আমার শরীর পাখির পালকের মতো হয়ে গেছে। সেই পালক ভেসে বেড়াচ্ছে হিম হিম হাওয়ায়। সেই গভীর শান্তিময় ঘুমে আমি অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখলাম। গহীন কোনো বনের ঠিক মাঝামাঝি আমি দাঁড়িয়ে আছি। আমার চারপাশে গাছ। সেই গাছের শাখা প্রশাখা প্রায় আকাশ স্পর্শ করছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি স্থির হয়ে। আমার নিজেকেও একটা গাছের মতই মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমি তাদেরই একজন। সমস্ত বনভূমি শব্দহীন। বাতাসে গাছের পাতা কাঁপার শব্দও আসছে না। যেন সমগ্র বনভূমি কোন কিছুর জন্যে অপেক্ষা করছে। কোন বিশেষ ঘটনা ঘটবে। সবাই অপেক্ষা করছে বিশেষ সেই ঘটনার জন্যে।
বিশেষ ঘটনাটা শেষ পর্যন্ত ঘটল। গাছ আমার সঙ্গে কথা বলল, কোন একটি বিশেষ গাছ না—বনভূমির সব গাছই কথা বলল। প্রতিটি মানুষ যেমন আলাদা, তাদের চিন্তা ভাবনা আলাদা। গাছরা সে রকম না। তারা সবাই মিলে এক। তাদের সবার চিন্তা ভাবনাই এক। প্রতিটি গাছ, প্রতিটি লতা ও গুল্ম একে অন্যের অংশ। গাছরা বলল, তুমি কি আমাদের কথা শুনতে পাচ্ছ? আমি বললাম, পাচ্ছি।তুমি কি বুঝতে পারছ–এখন তুমি আমাদেরই একটা অংশ? বুঝতে পারছি।আমরা তোমার রোগ নিয়ে নিয়েছি।আপনাদের ধন্যবাদ।সেই সঙ্গে আমরা আমাদের একটা অংশও তোমার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছি। এছাড়া অন্য উপায় ছিল না।ও আচ্ছা।এখন তুমি পুরোপুরি মানুষ নও।আমি কি এখন গাছ?
না তুমি পাছও নয়। গাছদের চেতনার একটা অংশ তোমার মধ্যে চলে গেছে। সেটা যে খুব আনন্দময় তা-না।ও আচ্ছা।চেতনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা তোমাকে আমাদের ক্ষমতার কিছু অংশও তোমাকে দিলাম। বলতে পার তোমার জন্যে এ হল আমাদের সামান্য উপহার।আপনাদের কি অনেক ক্ষমতা? হ্যাঁ আমরা মহাশক্তিধর। আমরা এই পৃথিবীর সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করি। মানুষ তা বুঝতে পারে না। তবে এখন থেকে তুমি খানিকটা বুঝতে পারবে। ভাল কথা, কিছুটা কি বুঝতে পারছ না? পারছি।নতুন জীবনের শুরুতে তোমার কষ্ট হবে। নিজেকে অসম্ভব নিঃসঙ্গ মনে হবে। তবে এক সময় সেই কষ্ট সহনীয় হয়ে যাবে। তাছাড়া তুমি নিঃসঙ্গ নও!আমার মতো কি আরো অনেক আছে?
না, অনেক নেই। খুব অল্প সংখ্যকই আছে। গাছের চেতনার অংশ সবাইকে দেয়া হয় না। কাউকে কাউকে দেয়া হয়।আমার স্বপ্ন এইখানেই শেষ হল। সাধারণত অদ্ভুত বা ভয়ংকর স্বপ্ন দেখার পরপরই ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমার ঘুম ভাঙ্গল না—আমি আরো আনন্দময় ঘুমের ভুবনে তলিয়ে গেলাম। কোথায় যেন অপার্থিব সুরে গান হচ্ছে। আমি কিছু শুনতে পারছি আবার কিছু পারছি না।পরদিন আমার ঘুম ভাঙ্গল সম্পূর্ণ নতুন মানুষ বা মানুষ না অন্যকিছু হিসেবে। শরীরে কোন রোগ নেই। কোন ক্লান্তি নেই।বাবার সঙ্গে দেখা হতেই বাবা বললেন, কিরে তোর শরীরটা এখনও ভাল আমি বললাম, হ্যাঁ।বাবা উৎসাহের সঙ্গে বললেন, অদ্ভুত কাও। শিউলি গাছটা মনে হয় মারা যাচ্ছে। আমি কিছুক্ষণ আগে দেখে এসেছি। বেশির ভাগ পাতা হলুদ হয়ে গেছে।
তোর অসুখ গাছটা সত্যি সত্যি নিয়ে নিয়েছে। জগৎ বড়ই রহস্যময়।আমি বাবার দিকে তাকিয়ে আছি। আমি বুঝতে পারছি—জগংটা বাবার কাছে যতটা রহস্যময় মনে হচ্ছে এই জগৎ তার চেয়েও অনেক অনেক রহস্যময়।এই মুহূর্তে আমি নতুন এক রহস্যের মুখোমুখি হয়েছি। কারণ আমি বাবার মনের কথা পরিষ্কার বুঝতে পারছি। তিনি কি ভাবছেন, না ভাবছেন তা খোলা বইয়ের মতো পড়তে পারছি। বাবা বললেন, কিরে তুই এমন অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? কী দেখছিস? আমি কিছুই দেখছি না, আবার অনেক কিছুই দেখছি।এই টগর তুই এইভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? তোর কি শরীর খারাপ লাগছে? শরীর খারাপ লাগলে বোস।
