কিছু শৈশব-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ

ঈদের নামাজের সময়ও দেখেছি শিশুদেরকে কষ্ট দেয়া হয়। বাবার পাশে নামাজ পড়তে দাঁড়ালাম। চারদিকে এত মানুষ, ভয় ভয় লাগছে । হঠাৎ মওলানা সাহেব ঘােষণা করলেন, বড়দের মাঝে বাচ্চারা থাকলে নামাজের ক্ষতি। বাচ্চাদের পেছনে যেতে হবে। অনেক বাচ্চা বাবাকে ধরে শুরু করে কান্না। বাবারাও বিব্রত, কী করবেন বুঝতে পারছেন না। 

কিছু শৈশবপ্রসঙ্গক্রমে বলি, নবীজীর (দ.) প্রথম জীবনীকার আবু ইসহাক লিখেছেন অনেক সময় দেখা যেত নবীজী (দ.) নামাজ পড়ছেন। তার কাঁধে ঝুলে আছেন তাঁর আদরের নাতি। সেজদার সময় নাতি পড়ে যাবে ভেবে তিনি নাতিকে কাঁধ থেকে নামাতেন। সেজদার পর আবার কাঁধে তুলে নিতেন। | গরম পীর (দাদা পীর)–এর মাজারের বর্তমান চিত্র। 

শিশুদের প্রতি নবীজীর (দ.) এই গভীর মমতার কথা কি আমাদের মৌলানারা জানেন না ? 

থাকুক এই প্রসঙ্গ, অন্য কথা বলি। এক দুপুরে আমরা বাচ্চারা লুকোচুরি খেলছি। টু‘ দেয়ার পর লুকাতে হবে । কেউ যেন খুঁজে না পায়। আমি অসীম সাহসে দৌড় দিয়ে মাজারে ঢুকে ঘাপটি মেরে রইলাম। জোহরের নামাজ হয়ে গেছে, মাজারে কেউ নেই। লুকোচুরির সাথিরা কেউ আমাকে পেল না। লুকিয়ে থাকার জন্যে আমি একটা চমক্কার জায়গার সন্ধান পেয়ে গেলাম। এরপর থেকে লুকোচুরি খেলা হলেই কেউ আমার খোঁজ পায় না। আমি কোথায় যাই, এই রহস্য ভেদ হয় না। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ

একদিনের কথা— মাজারে লুকিয়ে আছি। প্রচণ্ড প্রস্রাবের বেগ হয়েছে। বাথরুম করার জন্যে বের হতে পারছি না। বের হলেই ধরা পড়ব। আমি এদিক–ওদিক তাকিয়ে কাজ সেরে ফেললাম। ঘটনাটা একজন মুসুল্লি দেখে ফেললেন। কয়েকটা চড় থাপ্পড় মেরে বললেন, তুই মাজারে পেসাব করেছিস, তুই তাে এখন রক্ত পেসাব করতে করতে মারা যাবি। তুই জানিস না এটা কার মাজার ? 

ভয়ে আমার আত্মা শুকিয়ে গেল । বিস্ময়ের ঘটনা হলাে আমার পেসাব বন্ধ হয়ে গেল। বাকি দিনে এবং রাতে এক ফোঁটা পেসাব হলাে না। কয়েকবার বাথরুমে গেলাম, বাথরুম করতে গেলেই প্রচণ্ড যন্ত্রণা। কাকে এই সমস্যার কথা বলব ? বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে করতে একসময় ঘুমিয়ে গেলাম। গভীর রাতে প্রচণ্ড ব্যথায় ঘুম ভাঙল। আমি কাদছি, কান্নার শব্দে বাবার ঘুম ভাঙল। বাবা বললেন, কী সমস্যা? 

পিসাব করব । পিসাব করলে করাে, কঁদছ কেন ? পিসাব হয় না। কেন হবে না ? 

আমি ঘটনাটা বললাম। জানি তিনি খুব রাগ করবেন। প্রচণ্ড ধমক দেবেন, তবে চড় থাপ্পড় মারবেন না। ছেলেমেয়েদের গায়ে এই মানুষটা জীবনে কখনাে হাত তােলেন নি।

কিছু শৈশব-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ

বাবা গম্ভীর মুখে ঘটনা শুনে বললেন, কাজটা তুমি অন্যায় করেছ। ভুল করেছ। তবে এই কাজের শাস্তি হিসেবে তুমি রক্ত পেসাব করতে করতে মারা যাবে না। কারণটা মন দিয়ে শােন— যে মাজারের যে মানুষকে তুমি অসম্মান 

করেছ তিনি সাধারণ মানুষ না। অনেক উপরের স্তরের মানুষ। একটা শিশু কী ভুল করেছে তা নিয়ে তিনি মাথা ঘামান না। শিশুকে শাস্তি দেবার প্রশ্নই উঠে।

বুঝেছ ? 

জি। যাও, এক গ্লাস পানি খাও। আমি এক গ্লাস পানি খেলাম। বাবা বললেন, এখন বাথরুমে যাও, পিসাব করাে। 

আমি বাথরুমে গেলাম। স্বাভাবিকভাবে বাথরুম করে বিছানায় শুয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়লাম। 

বছর দুই আগে গরম পীরের মাজারে গিয়েছি। মাজারের বাইরে দাঁড়িয়ে শিশুকালের অপরাধের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছি। ক্ষমা প্রার্থনার সময় বাবার কথাও মনে পড়েছে। সব বাবাকেই ছেলেমেয়েদের সাইকিয়াট্রিস্টের ভূমিকা পালন করতে হয়। কিছু বাবা সেই দায়িত্ব পালন করতে পারেন। আবার অনেকেই পারেন না। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে বলছি— সাইকিয়াট্রিস্টের ভূমিকা আমি ভালােই পালন করতে পারি। কারণ আমার শিক্ষক ভালাে ছিলেন । 

নানাজানের আগমন। শুভেচ্ছা স্বাগতম আমাদের বাসায় একটা ফর্সি হুক্কা ছিল। হুক্কার তুলাটা ছিল পিতলের । হুক্কাটা খাটের নিচে থাকত, তার উপর ধুলা ময়লা জমত। বছরের কোনাে একদিন দেখা যেত আমার মা’র হাতে হুক্কা। তাঁর মুখভর্তি হাসি। তিনি আনন্দে ঝলমল করতে করতে বলবেন, ওরে তােরা কই ? হুক্কা পরিষ্কার কর। পিতল যেন ঝকঝক করে।

কিছু শৈশব-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ

আমরা আনন্দে দিশাহারা; কারণ ঘটনা বুঝে গেছি। নানাজান আসছেন। মা’র কাছে খবর এসে গেছে। হুক্কা পরিষ্কারের ধুম পড়ে গেল। বালি দিয়ে ঘষা হচ্ছে, লেবুর রস দিয়ে ঘষা হচ্ছে। তবু মন ভরছে না। আরাে পরিষ্কার হতে হবে। আরাে ঝকমকে। 

পিতল পরিষ্কার হবার পর হুক্কার দায়িত্ব চলে যেত বাবার হাতে। তিনি পানি ভরতেন। নল টেনে দেখতেন সব ঠিক আছে কি না। বাতাস লিক করছে কি ।

টিক্কা তামাক কেনা হতাে। বাবা ফাইনাল টান দিয়ে বলতেন, সব ঠিক আছে। তাঁকে আনন্দিত মনে হতাে। | আমার বাবা শ্বশুর–শাশুড়ির ভক্ত ছিলেন। সারাজীবনই তিনি তাঁদের শ্রদ্ধা ও সম্মান দেখিয়েছেন। কথা বলেছেন অতি বিনয়ের সাথে। তাদের আব্বা–আম্মা বলে যে সম্বােধন করতেন তাতে কোনাে খাদ ছিল না। তিনি তার নিজের বাবা মাকে যে চোখে দেখেছেন শ্বশুর–শাশুড়িকেও সেই চোখেই দেখেছেন। সে সময়ে এটাই ছিল মূলধারা। তার কারণও অবশ্যি ছিল। পঞ্চাশ বছর আগে সব শ্বশুর–শাশুড়ির কাছে জামাই শুধু যে তাদের কন্যার স্বামী তা–না, তাদের পুত্রের চেয়েও কাছের একজন। জামাই আসার সংবাদেই সাজ সাজ রব পড়ে যেত । সেই সাজ শুধু এক বাড়িতে না, অঞ্চলের সব বাড়িতে। জামাই তাে এক বাড়ির , অঞ্চলের সবার। সব বিশিষ্ট ব্যক্তির বাড়িতে জামাইকে খানা খেতে হবে।

কিছু শৈশব-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ

করা যাবে না। যদি সবাই মিলে জামাইকে আদরযত্ব না করে, তাহলে অঞ্চলের বিরাট বদনাম হবে। 

খুব ছােটবেলায় বাবার সাথে নানার বাড়িতে যেতাম। জামাই আদরের নমুনা দেখেছি। একটা উদাহরণ দেই। জামাইয়ের দাওয়াত পড়েছে অন্য এক বাড়িতে। সেই বাড়ির প্রধান দাওয়াতের আগের দিন উপস্থিত। বাবার সঙ্গে কথাবার্তা হচ্ছে। 

জামাই, আপনার কী মাছ পছন্দ? আমার সব মাছই পছন্দ। সব মাছ পছন্দ বুঝলাম।

 

Read more

কিছু শৈশব-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *