কৃষ্ণপক্ষ পর্ব – ৪ হুমায়ূন আহমেদ

কৃষ্ণপক্ষ পর্ব – ৪

গাড়ি রওনা হল দুপুর একটায়। মুহিব বসেছে ড্রাইভারের পাশের সীটে। সীটটা ঢালু, বসে আরাম পাওয়া যাচ্ছে না। গাড়ি ভর্তি মানুষ। দুটি পরিবার মালামাল নিয়ে উঠেছে। হৈ চৈ, চেচামেচি হচ্ছে। সবার জায়গাও হচ্ছে না। ছ‘সাত বছরের একটা বালিকা μমাগত বলছে, সামনে বসব, সামনে বসব। বাধ্য হয়ে মুহিবকে বলতে হল, আস সামনে আস। মেয়েটিকে কোলে নিয়ে মুহিবকে বসতে হয়েছে। মেয়েটি তার গলা জড়িয়ে বসেছে। কথাবার্তা এমনভাবে বলছে যেন মুহিব দীর্ঘদিনের পরিচিত।

‘কি নাম তোমার খুকী?‘ ‘আমার নাম লীনা। আমি ক্লাশ টুতে পড়ি।‘ ‘বাহ্‌।‘ ‘আমরা এই রকম একটা গাড়ি কিনব।‘ ‘এত বড় গাড়ি কিনবে?‘ ‘এরচেয়েও বড় কিনব। লাল রঙ-এর।‘ ‘খুব ভাল।‘ ‘আব্বু কিনে দিবে। আব্বুর অনেক টাকা আছে।‘ পেছনের সিটে বসা লীনার আব্বু বিরক্ত হয়ে ধমক দিল, চুপ কর লীনা। বেশি কথা বলে। আব্বু টাকার গাছ পুতেছে।লীনা সাময়িকভাবে চুপ করল। লীনার বাবা মুহিবের দিকে তাকিয়ে বললেন, স্যার একটা সিগারেট খাবেন? বেনসন আছে।মুহিব বলল, এখন ইচ্ছা করছে না।

‘যখন ইচ্ছা করে আমাকে বলবেন। লম্বা জার্নি, সিগারেট ছাড়া হয় না। আমি দশটা বেনসন কিনেছি হা-হা-হা। আর স্যার মেয়ে যদি বেশি বিরক্ত করে চড় দিবেন ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। বিচ্ছু মেয়ে। সাথে নিয়ে বের হই না। বাধ্য হয়ে ঢাকায় গিয়েছিলাম। আমার ছোট শ্যালকের বিবাহ ছিল। পরিবার নিয়ে যেতে হল। তিন হাজার টাকা গচ্চা। হাত একেবারে খালি। স্যারের গাড়ি পাওয়ায় রক্ষা হয়েছে।‘ মুহিব লক্ষ্য করল লীনার বাবারও কথা বলার রোগ আছে। মেয়ে সম্ভবত বাবার কাছ থেকেই কথা বলার বিদ্যা আয়ত্ব করেছে।

‘আমার শ্যালক ব্যাংকে কাজ করে। আরব বাংলাদেশ ব্যাংক।‘ ‘তাই না-কি?‘ ‘জ্বি স্যার। আর মেয়ের বাড়ি মেহেরপুর। অবশ্যি এখন তারা ঢাকায় সেটলড্‌। মেয়ে আপনার এম.এ. পাশ।‘ ‘খুবই ভাল।‘ ‘লীনা ঘুমিয়ে পড়েছে না-কি একটু দেখেন তো স্যার। ঘুমিয়ে পড়লে মুখের লালায় সার্ট ভিজিয়ে দেবে। একটু কেয়ারফুল থাকবেন স্যার।‘ গাড়ি প্রায় উড়ে চলছে। মহসিন একের পর এক গাড়ি ওভারটেক করছে। এখন পাল্লাপালি− চলছে একটা ট্রাকের সঙ্গে। ট্রাক কিছুতেই সাইড দিচ্ছে না। ট্রাকের পেছনে লেখা ‘মায়ের দোয়া‘।

অরুদের বাড়ির নাম রূপ নিলয়।দশ কাঠা জায়গা নিয়ে বেশ বড় বাড়ি। সামনে বাগান আছে। উল্লাসিত হবার মত বাগান না বরং বিরক্ত হবার মত বাগান। যে-কেউ এই বাগান দেখে ভুরু কুঁচকে বলবে এত সুন্দর জায়গাটাকে গর্ত-টর্ত খুঁড়ে এসব কি করেছে? আপাতদৃষ্টিতে যেগুলিকে গর্ত বলে মনে হচ্ছে তার কোনটাই গর্ত নয় – জলাধার। অরুর বাবা জামিল সাহেব এইসব জলাধারের পরিকল্পনা করেছেন, যেখানে ফুটে থাকবে জলপদ্ম। একেকটা জলাধার ঘিরে থাকবে মিনি ফুল বাগান। বাড়ি ঢেকে রাখবে নীল পাতার বাগান বিলাসে। বিশেষ ধরনের আকাশী নীল রঙের বাগান বিলাসের চারা আনানো হল শ্রীলংকা থেকে। চার বছরের মাথায় পাতা বেরুলে দেখা গেল পাতার রঙ নীল নয় গোলাপী। জামিল সাহেব মালীকে ডেকে বললেন, গাছ তিনটা কেটে ফেল। অরু বলল, সে কি বাবা! এত বড় গাছ কেটে ফেলবে?

জামিল সাহেব ভারী গলায় বললেন, অবশ্যই কাটব। এ-জাতীয় গাছে বাংলাদেশ ভর্তি। নীল পাতা চেয়েছিলাম – এগুলি কি নীল? ‘এখন নীল না, পরে হয়ত নীল হবে।‘ জামিল সাহেব আগের চেয়েও ভারী গলায় বললেন, হয়ত শব্দটা আমি অপছন্দ করি। হয়ত বলে পৃথিবীতে কিছু নেই। ইয়েস অথবা নো। তুমি যদি বল এই গাছের পাতা অবশ্যই নীল হবে, আমি মালীকে কাটতে নিষেধ করব।অরু চুপ করে গেল। তিনটা গাছই কেটে ফেলা হল।জলপদ্মের বেলাতেও এই ব্যাপার। জলাধারে জলপদ্ম ফুটল না। বিষেষজ্ঞ হার্টিকালচারিস্ট বললেন, পানির গভীরতা কম বলেই পদ্ম ফুটছে না। আরো দু‘ফুট গভীর করে দিন। তাহলেই হবে।জামিল সাহেব জলাধার আরো দু‘ফুট গভীর করলেন। পদ্ম ফুটল না। হার্টিকালচারারিস্টকে আবার ডেকে আনা হল। তিনি বললেন, বেশি গভীর হয়ে গেছে।

‘বেশী গভীর হয়েছে?‘ ‘জ্বি, অবশ্যই বেশি হয়েছে।‘ ‘জলপদ্মের বিষয়ে আপনি জানেন তো?‘ ‘জানব না মানে? কি বলছেন আপনি!‘ ‘আমার ধারণা আপনি একজন মহামূর্খ। জলপদ্ম কেন কোন পদ্ম সম্পর্কেই আপনি কিছু জানেন না। যেহেতু এটা মূর্খের দেশ সেহেতু করে খাচ্ছেন। আপনি দয়া করে বিদেয় হোন।‘ জলপদ্ম প্রোজেক্ট বাতিল হয়ে গেল। জলাধারের চারপাশে মিনি বাগানের প্রোজেক্টও বাতিল। জামিল সাহেব এখন পুরো বাগান নিয়ে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করছেন। চিন্তা-ভাবনা শেষ হয়নি বলে বাগান শুরু হয়নি। যেহেতু মালী একজন আছে – নিয়মিত বেতন নিচ্ছে, সেহেতু সে এলোমেলোভাবে কিছু গাছ লাগিয়েছে। বেশির ভাগই গোলাপ। গোলাপ জামিল সাহেবের অপছন্দের ফুল। কিন্তু তাঁর ছোট মেয়ে গোলাপ-পাগল বলে তিনি গাছগুলি এখন পর্যন্ত সহ্য করে যাচ্ছেন।

জামিল সাহেবের বয়স পঁয়ষট্টি। স্বাস্থ্য শুধু যে ভাল তা না অতিরিক্ত রকমের ভাল। দারোগা হয়ে চাকরিতে ঢুকেছিলেন, ডিআইজি হয়ে রিটায়ার করেছেন। সারদা পুলিশ একাডেমীতে ট্রেনিং নিতে যাবার আগের দিন তাঁর বাবা নবীগঞ্জ হাই স্কুলের এ্যাসিসটেন্ট হেড মাস্টার মুত্তালেব সাহেব তাঁকে নিয়ে বাড়ির পেছনে চলে গেলেন। সেখানে জামিল সাহেবের মায়ের কবর।মুত্তালেব সাহেব বললেন, তুমি তোমার মায়ের কবর ছুঁয়ে প্রতীজ্ঞা কর যে চাকরি জীবন সৎপথে কাটাবে। এমন চাকরিতে ঢুকেছ যেখানে সৎ থাকা খুবই কঠিন। প্রতীজ্ঞা কর।জামিল সাহেব বললেন, প্রতীজ্ঞা করার প্রয়োজন নেই।

‘জানি প্রয়োজন নেই। তবু কর।‘ তিনি প্রতীজ্ঞা করলেন। এই প্রতীজ্ঞা রিটায়ার করার দিন পর্যন্ত বহাল রেখেছেন। বেতনের প্রতিটি পয়সা হিসেব করে খরচ করেছেন। রিটায়ার করার পর জীবনের সমস- সঞ্চয় দিয়ে বাড়ি করলেন। দোতালা করার ইচ্ছা ছিল। একতলা করতেই সব শেষ হয়ে গেল। ভাগ্যিস সস্তার সময়ে দশ কাঠা জায়গা কেনা ছিল।জামিল সাহেবের আর্থিক অবস্থা এখন মোটেই সুবিধার না। সঞ্চয় কিছু নেই। পেনশনের অর্ধেক বিμি করে দিয়েছেন বলে প্রতিমাসে যা পান তার পরিমান নগণ্য। জামিল সাহেবের স্ত্রী রাহেলা একটি কলেজে অধ্যাপনা করেন। এই টাকাটা সংসারে লাগে।

মোটামুটি অভিজাত এলাকায় একটি চমৎকার বাড়ি। বাড়ির সামনের বাগান এবং চব্বিশ ঘণ্টার একজন মালী দেখে এই পরিবারের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে যে কেউ বিভ্রান্ত হতে পারে। বিভ্রান্ত হবার কিছু নেই। পরিবারটির আর্থিক অবস্থা শোচনীয়। জামিল সাহেবের ছোট মেয়ে অরুর বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। সেই বিয়ে কিভবে দেয়া যাবে তা জামিল সাহেব ভেবে পাচ্ছেন না। তাঁর মেজাজ খুব খারাপ যাচ্ছে। তাঁর ভয়ংকর মেজাজে বাড়ির সবাই আতংকগ্রস-। কারণ মানুষটির এর আগে দু‘বার স্ট্রোক হয়েছে। তৃতীয়বারের ধাক্কা সইতে না পারারই কথা।

অরু রিকশা থেকে খুব ভয়ে ভয়ে নামল।বাসায় কি হচ্ছে কে জানে। ভয়ংকর কিছু নিশ্চয়ই হচ্ছে, কিংবা হয়ে গেছে। বাবা খুব সম্ভব হাসপাতালে। মীরু তার ছোট বোনের গোপনে বিয়ে করার খবর বাবাকে দেবে আর তিনি স্বাভাবিক থাকবেন এই আশা দুরাশা মাত্র।বাড়িতে কাল রাতে কি ঘটেছে তা অরু খুব ভাল কল্পনা করতে পারছে। আপা বিয়েবাড়ি থেকে ফিরল রাত ন‘টায়। মা‘র সঙ্গে গল্প-টল্প করে রাত দশটায় ঘুমুতে গেল। তখন তার হাতে চিঠি পড়ল। চিঠি পড়ার পর খানিকক্ষণ মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকার পর সে একটা বিকট চিৎকার দিল। মা ছুটে এসে বললেন, কি হয়েছে? সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, কিছু না মা – ঘুমাও। মা বললেন, হাতে কার চিঠি?

মা চিঠি পড়লেন। বাবা পড়লেন। বাবার স্ট্রোক হল। তাঁকে নিয়ে দুপুর রাতে সবাই গেল হাসপাতালে। এখনো সবাই হাসপাতালে, কেউ ফিরেনি। এই কারণেই বাড়ি খালি। মালী মতি ভাইকেও দেখা যাচ্ছে না। সকালবেলা খুড়পি হাতে মতি ভাই সব সময়ই বাগানে থাকে। আজ কেন থাকবে না? অরু গেট খুলে বাগানে ঢুকল। মতি ভাইকে দেখা যাচ্ছে। ঝাঝড়ি করে পানি নিয়ে আসছে। অরু ভয়ে ভয়ে বলল, মতি ভাই বাসার খবর সব ভাল?

মতি বলল, হ।তার মানে সে কিছুই জানে না। মতিকে কিছু জিজ্ঞেস করাই ভুল হয়েছে। বাগান ছাড়া সে অন্য কিছু জানে না। জানার আগ্রহও নেই। এ-বাড়ির একটা মানুষ মরে গেলে সে যতটা কষ্ট পাবে তারচে‘ অনেক বেশি কষ্ট পাবে একটা গোলাপ গাছ মরো গেলে।‘মতি ভাই বাসায় কি কেউ নেই?‘ ‘আছে। খালি আম্মা গেছে কলেজে।‘ ‘বাবা আছেন?‘ ‘হ।‘ তার মানে কি? চিঠি পড়েও বাবা নিজেকে সামলে নিয়েছেন? অপেক্ষা করছেন তার জন্যে? বিশ্রী অবস্থাটা এড়াবার জন্যে মা চলে গেছেন বাইরে? অরু কলিং বেল টিপল। আজ কলিং বেলটাও যেন অন্য রকম করে বাজছে। কানড়বার মত শব্দ হচ্ছে।দরজা খুললেন জামিল সাহেব। তাঁর হাতে খবরের কাগজ। তিনি মেয়েকে কিছু না বলে আগের জায়গায় ফিরে গেলেন। অরু ভয়ে ভয়ে বলল, কেমন আছ বাবা?

তিনি বিরক্ত গলায় বললেন, যেমন সব সময় থাকি তেমন আছি। ভাল থাকার মত কিছু ঘটেনি, আবার খারাপ থাকার মত কিছু ঘটে নি। আজকের কাগজ পড়েছিস? ‘না বাবা।‘ ‘মন দিয়ে পড়।‘ ‘কি আছে কাগজে?‘ ‘কি আছে সেটা জানার জন্যেই তো পড়তে বলছি। নে কাগজটা হাতে করে নিয়ে যা।‘ কাগজ হাতে অরু বাড়ির ভেতর ঢুকল। বোঝাই যাচ্ছে বাবা এখনো কিছুই জানেন না। আপা তাকে বলেনি। বুদ্ধিমতীর মত চেপে গেছে। মীরু বারান্দায় মোড়ায় বসে ছেলেকে ডিমপোচ খাওয়াবার চেষ্টা করছে। চেষ্টার ফল হয়েছে ভয়াবহ। সারা মুখে, গায়ে, মেঝেতে ডিমের ছড়াছড়ি। মীরু বলল, তুই না বললি দুপুরের দিকে আসবি, এখন চলে এলি যে?

‘ভাল লাগছিল না। আপা তুমি কি চিঠিটা পড়েছ?‘ ‘কোন চিঠি?‘ ‘তোমার টেবিলের উপর একটা চিঠি ছিল না?‘ ‘ছিল না-কি? কই দেখিনি তো। কার চিঠি?‘ জবাব না দিয়ে অরু মীরুর ঘরে ঢুকে গেল। চিঠি সরিয়ে ফেলতে হবে। দু‘এক দিন পরে জানালেও কোন ক্ষতি নেই। ঘুমে তার শরীর ভেঙ্গে আসছে। অরু ঠিক করল গরম পানি দিয়ে সে দীর্ঘ একটা শাওয়ার নেবে। তারপর পর পর দু‘কাপ চা খেয়ে টানা ঘুম দেবে। তার আগে অবশ্যি খবরের কাগজটা পড়ে ফেলা দরকার। বাবা জেরা করবেন।

‘কলম্বোয় একদিনের সার্ক শীর্ষ বৈঠক।‘ ‘বাকেরগঞ্জ ৫ আসনে আজ ভোট। ত্রিমুখী লড়াই।‘ ‘সোভিয়েত ক্ষমতাকেন্দ্রগুলি ইয়েলৎসিনের দখলে।‘ ‘৪৮ ঘণ্টার ধর্মঘট পালন করুন : স্কপ নেতৃবৃন্দ।‘ ‘বগি লাইনচ্যুত। সাতজন যাত্রী আহত।‘ হেডিং পড়ার পর আর কিছু পড়তে ইচ্ছা করে না। হেডিং পড়তে গেলেই হাই ওঠে, খবর পড়বে কি।অরু ময়নার মাকে গরম পানি করতে বলে আবার বারান্দায় এল। আপা ডিম খাওয়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নতুন আরেকটা ডিম পোচ দেখা যাচ্ছে। আবীরের মুখের সামনে চামচ ধরে মীরু বলছে – একটু হা কর বাবু। একটু হা কর। আম্মু তোমার লাল টুক টুক ছোট্ট জিভটা দেখতে চায়। আমার বাবুর মত সুন্দর জিভ এই পৃথিবীতে আর কারোরই নেই।

অরু বলল, কেন যন্ত্রনা করছ আপা? ছেড়ে দাও না। ‘নিজের চোখে দেখছিস না স্বাসে’্যর হাল, তারপরেও বলছিস ছেড়ে দিতে?‘ ‘জোর করে খাওয়াবে, তারপর বমি করে সবটা ফেলে দিবে।‘ ‘ফেলুক। তোর বাচ্চাকে তুই তোর থিওরী মত মানুষ করিস।‘ ‘খেতে চাচ্ছে না তবু তুমি জোর করে খাওয়াবে। তোমাকে কেউ জোর করে খাওয়ালে ভাল লাগত?‘ ‘তুই আমার সামনে থেকে যা তো।‘ চিঠির ব্যাপারটা মীরু উল্লেখ করল না। কিছু জিজ্ঞেস করলে বানিয়ে বানিয়ে এক গাদা কথা বলতে হত। অল্প কথায় মিথ্যা বলা যায় না। সামান্য মিথ্যাও অনেক ফেনিয়ে ফানিয়ে বলতে হয়।মীরু বলল – কাল বিয়ে বাড়িতে দারুন মজার একটা ব্যাপার হয়েছে – আমি হাসতে হাসতে … ‘কি হয়েছে?‘

মীরু ‘কি হয়েছে‘ তা বলা বন্ধ রেখে বাবুকে ডিম খাওয়ানোয় ব্যস- হয়ে গেল। খাও লক্ষ্মীসোনা, খাও। হা কর। দেখি আমার বাবুর লাল টুকটুকে জিভটা? অরু বলল, কাল বিয়ে বাড়িতে কি হয়েছিল? ওমাগো কি সুন্দর আমার বাবুর।‘দেখছিস না বাবুকে খাওয়াচ্ছি, কেন বিরক্ত করছিস?‘ ‘আচ্ছা আচ্ছা আর বিরক্ত করব না।‘ ‘তুই বাবাকে এক কাপ চা দিয়ে আয় তো আমার কাছে চা চেয়েছিলেন, আমি বাবুর খাওয়া নিয়ে আটকা পড়ে গেলাম।‘ ‘ছাড়া পাবে কখন?‘ ‘কি জানি কখন। এতো হা করছে না।‘ ‘ঠাশ করে একটা চড় দাও। চড় খেলে হা করবে। তখন মুখে ডিম ঢুকিয়ে আরেকটা চড় দাও। ভয় পেয়ে ডিম গিলে ফেলবে।‘

মীরু কঠিন চোখে তাকাল। অরু চলে গেল রানড়বাঘরে বাবার জন্যে চা বানাতে। ময়নার মা চা বানানোর কাজটা ভালই পারে কিন্তু তার চা বাবা মুখে দেবেন না। তার রানড়বাকরা খাবার খেতে কোন অসুবিধা নেই, শুধু চা খাওয়া যাবে না।অরু বাবার সামনে চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে বলল, বাবা চা। জামিল সাহেব চোখ বন্ধ করে আধশোয়া হয়ে আছেন। তিনি চোখ খুললেন না। চোখ বন্ধ রেখেই বললেন – বোস মীরু।‘মীরু না বাবা, আমি অরু।‘ ‘তোকে তো চা বানাতে বলিনি। মীরুকে বলেছিলাম। দায়িত্ব ট্রান্সফার করে দেবার যে বদঅভ্যাস মীরুর হয়েছে তার ফলাফল সুদূরপ্রসারী। তাকে যখন যা করতে বলি তখনি সে তা অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়। এক সেকেণ্ড দেরি করে না। কাল তাকে বললাম সার্ট ইস্ত্রি করে দিতে। সে সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে বলল, মা বাবার সার্ট ইস্ত্রি করে দাও।

‘বাবুকে নিয়ে ব্যস- থাকে।‘ ‘তাই দেখছি। তুই বোস।‘ ‘আমি এখন গোসল করব বাবা। পানি গরম করা হয়েছে, দেরি করলে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।‘ ‘গোসল ঠাণ্ডা পানি দিয়েই করতে হয়। শীতকালে গোসল করতে হয় বরফ শীতল পানি দিয়ে।‘ ‘গরম কালে ফুটন্ত পানি দিয়ে?‘ ‘গরম কালে লিউকওয়ার্ম পানি দিয়ে। খবরের কাগজ পড়তে বলেছিলাম, পড়েছিস?‘ ‘হুঁ।‘ ‘চোখে পড়ার মত কি পেয়েছিস?‘ ‘তেমন কিছু পাইনি।‘

‘তোদের সমস্যা কি জানিস? তোদের সমস্যা হচ্ছে তোরা নিজেদের নিয়ে ব্যস-। আশে পাশে কি হচ্ছে না হচ্ছে সেদিকে কোন লক্ষ্য নেই। উৎসাহও নেই। আজকের খবরের কাগজের ফ্রণ্ট পেজে একজন কুষ্ঠরোগীর কথা ছাপা হয়েছে। সে আসলে কুষ্ঠরোগী নয়। মেকাপ নিয়ে রোগী সাজত। ফার্মগেটের ওভারব্রীজে শুয়ে ভিক্ষা করত। সে ধরা পড়েছে। সমস্ত কাগজের ফ্রণ্ট পেজে তার ছবি, বিশাল নিউজ।‘ ‘অরু ক্ষীণ স্বরে বলল, ভেরী ইন্টারেস্টিং।‘

জামিল সাহেব কড়া গলায় বললেন, মোটেই ইন্টারেস্টিং নয়। একজন অসহায় মানুষ রোগী সেজে মানুষকে ধোকা দিচ্ছে সেই খবর দেশের সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠার সংবাদ হতে পারে না।‘ ‘তা তো বটেই।‘ ‘তুই কোন কিছু না বুঝেই বললি, তা তো বটেই।‘ ‘গোসল করতে যাই বাবা। পানি ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।‘ জামিল সাহেব জবাব দিলেন না। বিরক্ত মুখে চায়ের কাপে চুমুক দিতে লাগলেন।

 

Read more

কৃষ্ণপক্ষ পর্ব – ৫ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.