কৃষ্ণপক্ষ পর্ব – ৬ হুমায়ূন আহমেদ

কৃষ্ণপক্ষ পর্ব – ৬

মহসিন বলল, শালা হারামী।এই-জাতীয় গালি সে কিছুক্ষণ পর পর দিচ্ছে। যাকে দেয়া হচ্ছে সে অবশ্যি শুনছে না। সে দশটনি ট্রাক নিয়ে ছুটে যাচ্ছে। যার পেছনে বাম্পারে লেখা – মায়ের দোয়া।এই ট্রাক ড্রাইভার মহসিনকে সাইড দিচ্ছে না। অন্যদের দিচ্ছে কিন্তু মহসিনের পিকআপকে দিচ্ছে না।ট্রাক ভর্তি করোগেটেড টিনের শীট। টিনের শীটের উপর দুজন কুলী মাথায় গামছা বেঁধে বসে আছে। দু‘জনের হাতেই বিড়ি। তারা খুব মজা পাচ্ছে। সাইড চেয়ে যে কোন গাড়ি হর্ণ দেয়া মাত্র ট্রাক তাকে সাইড দিয়ে দিচ্ছে। শুধু যখন মহসিন হর্ণ দিচ্ছে তখন ট্রাক চলে যাচ্ছে মাঝ রাস্তায়। ট্রাকে বসে থাকা কুলী দু‘জন দাঁত বের করে হাসছে। তারা খুব মজা পাচ্ছে।

মুহিব বলল, পাল্লা দিয়ে লাভ নেই ড্রাইভার সাহেব। ও সাইড দিবে না।মহসিন ক্রুদ্ধ গলায় বলল, সবেরে দিতেছে, আমারে দিব না কেন? ‘কে জানে কেন? কোন একটা তামাশা করছে। আমাদের আগে যাবার দরকার নেই, আমরা পেছনে পেছনেই যাই।‘ ‘ট্রাকের পেছনে থাকলে রাস্তা দেখা যায় না। চালাতে অসুবিধা।‘ ‘তাহলে আসুন এক কাজ করি। চায়ের দোকান দেখে গাড়ি থামান। আমরা চা খাই। ট্রাক এর মধ্যে চলে যাক।‘ ‘এই হারামজাদাকে ওভারটেক না করতে পারলে আমি বাপের ঘরের না।‘ ‘কোনই দরকার নেই ভাই। আপনি গাড়িটা থামান, আমরা চা খাই। চায়ের তৃষ্ণা হচ্ছে।‘

মহসিন নিতান্ত অনিচ্ছায় গাড়ি থামাল। মুহিব প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি সময় নিয়ে চা খেল। লীনাও মুহিবের সঙ্গে নেমেছে। সেও চা খাবে। তাকে পিরিচে করে চা দেয়া হয়েছে। সে চা খাচ্ছে। লম্বা ঘুম দেওয়ায় তার নিজস্ব ব্যাটারী চার্জ হয়ে গেছে। সে ক্লাস টু‘র বাংলা বইয়ের সব ছড়া একের পর এক শুনিয়ে যাচ্ছে। ছড়া বলছে হাত পা নেড়ে। ছড়া বলার ফাঁকে ফাঁকে পিরিচে চা ঢেলে তার মুখে ধরে খাইয়ে দিতে হচ্ছে। মুহিবকে লীনা এখন ডাকছে – ছোট মামা। ছোট মামা কেন ডাকছে সেই জানে।

‘ছোট মামা?‘

‘কি?‘

‘রং তুলি কবিতা শুনবে?‘

‘বল।‘

‘রং তুলিতে ছোপ ছাপ

মাঠের পাশে ঝোপ ঝাপ।

ঝোপের পাশে সোনার গাঁও

একটুখানি বসে যাও।‘

মহসিন গম্ভীর মুখে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। তার মেজাজ ভয়ংকর খারাপ। কেন জানি তার ধারণা হয়েছে যে তাদের পেছনে না দেখে ট্রাকটাও থেমেছে। অপেক্ষা করছে কখন আবার আসে। যেই সে পিক-আপ নিয়ে দেখা দেবে ওমনি ট্রাক ড্রাইভার আগের ফাজলামী শুরু করবে। হারামজাদা।

লীনা চা শেষ করে বলল, নাচ দেখবে ছোট মামা?

‘এখানে নাচবে?‘

‘হুঁ। আমি সব জায়গায় নাচতে পারি।‘

‘এখন তো আমরা রওনা হব। আমরা বরং চিটাগাং পৌঁছে নাচ দেখব।‘

‘তাহলে কবিতা বলি?‘

‘বল।‘

‘খোকন খোকন ময়না

পরিয়ে দেব গয়না

খোকন যাবে মামার বাড়ি

আর যে দেরি সয় না …‘

মহসিন যা ভেবেছিল তাই।

তারা রওনা হয়েছে পনেরো মিনিট পর। এই পনেরো মিনিটে ট্রাকের অনেক দূর চলে যাওয়ার কথা। তা যায়নি। মহসিন পিক-আপ নিয়ে কিছুদূর এগোতেই দেখল ট্রাক। কুলী দু‘জন পিক-আপের দেখা পাওয়া মাত্র আনন্দে হেসে ফেলল। মহসিন বলল, হারামজাদা, কুত্তা। মুহিব বলল, ড্রাইভার সাহেব আপনি ওদের লক্ষ্য করবেন না, নিজের মত চালান।মহসিনের চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। চোখ লালচে। সে বিড় বিড় করে কি যেন বলল।ট্রাকে বসে থাকা কুলী দু‘জন দাঁত বের করে হাসছে। একজন আঙ্গুল দিয়ে দেখাচ্ছে। মহসিন দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘শুয়োরের বাচ্চা।‘ আর ঠিক তখনি ট্রাক সাইড দিল। ট্রাক ড্রাইভার জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে ইশারা করল চলে যেতে।

মহসিন তাই করল। নিমিষে ট্রাকের পাশাপাশি চলে এল। ভুল যা করার তা এর মধ্যেই হয়ে গেছে। মহসিনের সামনে কোকাকোলা কোম্পানীর মাইক্রোবাস। পেছনে যাবার উপায় নেই। পেছনে ঢাকা-চিটাগাং লাইনের বিরাট একটা হিনো বাস। বাস ড্রাইভার μমাগত হর্ণ দিচ্ছে। কান ঝাঝা করছে। ট্রাক ড্রাইভার কি ইচ্ছে করে তাকে এই বিপদে ফেলেছে? না রসিকতা? মহসিনের ত্রিশ বছরের গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা কোন কাজে লাগছে না। মাথা কাজ করছে না। চোখের দৃষ্টিও ধোঁয়াটে হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে হঠাৎ ঘন হয়ে কুয়াশা পড়েছে, স্টিয়ারিং হুইল হয়ে গেছে পাথরের মত শক্ত। মহসিন চোখ বন্ধ করে ফেলল।

লীনা শক্ত করে মুহিবের গলা জড়িয়ে ধরে আছে। কিন্তু তাকিয়ে আছে চোখ বড় বড় করে।মাইক্রোবাস মুখোমুখি ধাক্কা দিয়ে মুহিবদের পিক-আপকে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলল।মীরুর মুখ শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। আবীর দুপুর থেকে কিছু মুখে দিচ্ছে না। ঠোঁট শক্ত করে বন্ধ করে আছে। গা একটু গরম। সেই উত্তাপ অবশ্যি থার্মোমিটারে ধরা পড়ছে না। মীরুর ধারণা জ্বর আছে। সে খানিকক্ষণ পর পর ছেলের কপালে এবং বুকে হাত রাখছে।মীরুর মা বেশ বিরক্ত হচ্ছেন। সেই বিরক্তি প্রকাশ করছেন না। মেয়ের আহ্লাদি প্রশ্রয় দিচ্ছেন না। সহ্য করার চেষ্টা করছেন। মীরু মার ঘরে ঢুকে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, কি করি মা বলতো? রাহেলা আবেগশূন্য গলায় বললেন, আবার কি হয়েছে?

‘বাবুর গা গরম।‘ ‘জ্বর-জ্বারি হয়েছে বোধহয়। বাচ্চাদের তো জ্বর-টর হবেই।‘ ‘শ্বাস নেবার সময় কেমন যেন শাঁ শাঁ শব্দ হয়। বুকে বোধ হয় ঠাণ্ডা বসে গেছে।‘ ‘আবরার আসবে বলেছে। ও এলে ওকে দেখা -‘ ‘সে তো আর চাইল্ড স্পেশালিস্ট না।‘ ‘চাইল্ড স্পেশালিস্ট খোঁজার মত কিছু হয় নি মীরু।‘ ‘দুপুর থেকে কিছু মুখে দিচ্ছে না।‘ ‘ক্ষিধে হচ্ছে না তাই মুখে দিচ্ছে না। তুই শুধু শুধু ব্যস- হচ্ছিস।‘ ‘আবীরের বাবাকে একটা ট্রাংক কল করব মা?‘ ‘করতে চাইলে কর।

তবে ছেলের অসুখের কথা না বলাই ভাল। চিন্তা করবে।‘ মীরুর চোখ-মুখ মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে হাসিমুখে বলল, টেলিফোনটা তোমার ঘরে নিয়ে আসি মা।রাহেলা বললেন, নিয়ে আয়।বাবার ঘর থেকে টেলিফোন করা বিরাট যন্ত্রনা। তিন মিনিটের বেশি কথা বললেই তিনি রেগে যান। পৃথিবীর কোন স্বামী-স্ত্রী কি পারে তিন মিনিটে তাদের কথা শেষ করতে? রাহেলার দাঁত ব্যাথা করছে। তিনি চাদর মুড়ি দিয়ে বিছানায় বসে আছেন। মীরু আবীরকে তাঁর পাশে বসিয়ে টেলিফোন আনতে গেছে। রাহেলা হাত বাড়িয়ে আবীরকে কোলে নিতে নিতে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এই মাসে মীরুর এটা দ্বিতীয় দফায় লং ডিসটেন্স কল। এক একটা কলে হাজার বার শ‘ করে বিল হয়। আজ এই মেয়ে কতক্ষণ কথা বলবে কে জানে।

গত মাসে টেলিফোন বিল এসেছে ছয় হাজার টাকা। ছ‘ হাজার টাকা টেলিফোন বিল দেয়ার মত অবস্থা সংসারের নাই। তা এই মেয়ে বুঝবে না। তাঁর মেয়ে এত বোকা কখনো ছিল না। বিয়ের পর বোকা হয়ে গেছে। মনে হয় আরো হবে। মানুষ নষ্ট হয় সঙ্গ দোষে। মীরুর স্বামী মুখলেসুর রহমানই মেয়েটার বুদ্ধিসুদ্ধি গুলিয়ে দিচ্ছে।মুখলেসুর রহমান স্বভাব-কৃপণ। চালিয়াত ধরনের ছেলে। এক বছরের মত বাইরে আছে, একবারও টেলিফোন করেনি। ডলার নষ্ট হবে। স্ত্রীর হাতখরচের টাকাও আসছে না। চিঠি লিখেছে – কষ্ট-টষ্ট করে চালিয়ে নাও।

ডলার জমাচ্ছি। পরে কাজে লাগবে। তোমার বাবার কাছ থেকে কিছু ধার নাও। আমি দেশে এসে শোধ করব।আবীরের জন্মের সময়ও এই ব্যাপার। ক্লিনিকে বাচ্চা হল। নরমাল ডেলিভারী নয়, সিজারিয়ান। সতেরো হাজার টাকা বিল। সেই টাকা তাঁদেরকে দিতে হয়েছে। কারণ জামাই হাসিমুখে বলেছে – টাকাটা কি আপনারা দেবেন না আমি দেব? আপনার মেয়ে বলছিল, আমি দিলে আপনারা মাইণ্ড করবেন। এই জন্যে জিজ্ঞেস করছি।রাহেলা বললেন, আমিই দেব। তোমাকে ভাবতে হবে না। ‘ভাবছি না তো মা। মোটেও ভাবছি না। তবে এই সব পুরনো নিয়ম-কানুন বদলানো উচিত। বিয়ের পর মেয়ের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব স্বামীর। বাবা-মা‘র এই সব নিয়ে ভাবা উচিত না।‘

এক বৎসর ধরে স্ত্রী, পুত্র ফেলে সে নিউ জার্সিতে আছে। ইচ্ছা করলেই দুজনকে নিয়ে যেতে পারে। তা নেবে না। তাতে ডলার ‘সেভ‘ হবে না।মীরু বাবার ঘরে ঢুকল। বাবা চোখ বন্ধ করে ইজি চেয়ারে শুয়ে আছেন। ঘুমিয়ে পড়েছেন বলেই মনে হচ্ছে। মীরু ভয়ে ভয়ে টেলিফোনের প−্যাগ খুলল। জামিল সাহেব কড়া গলায় বললেন, টেলিফোন নিচ্ছিস কোথায়? মীরু ক্ষীণস্বরে বলল, মা জানি কোথায় টেলিফোন করবে। ‘সেটা আমার ঘর থেকে করতে পারে না? গোপনে করতে হবে? সব জিনিসের একটা নির্দিষ্ট জায়গা আছে। আলনা থাকবে আলনার জায়গায়। টেলিফোন থাকবে টেলিফোনের জায়গায়। টেলিফোন তো মানুষ না যে একেক সময় একেক জায়গায় ঘুরে বেড়াবে। যা তোর মা‘কে আসতে বল।‘ ‘আচ্ছা।‘

মীরু এসে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, তুমি টেলিফোনটা এ ঘরে এনে দাও মা। বাবা আনতে দিচ্ছে না।রাহেলা টেলিফোন এনে দিলেন। মীরু তৎক্ষণাৎ নিউ জার্সিতে কল বুক করল।রাহেলা লক্ষ্য করলেন, মীরু টেলিফোন সেটের পাশে মূর্তির মত বসে আছে। আগ্রহে এবং আনন্দে তার চেহারাটাই অন্য রকম হয়ে গেছে। রাহেলার খুব মায়া লাগছে। তাঁর কাছে টাকা থাকলে তিনি টিকিট কেটে মেয়েকে স্বামীর কাছে পাঠিয়ে দিতেন। মীরু বলল, মা আজ কিন্তু একটু বেশিক্ষণ কথা বলব।

‘আচ্ছা।‘ ‘তুমি আবীরকে নিয়ে একটু অন্য ঘরে যাও তো মা।‘ রাহেলা আবীরকে নিয়ে উঠে গেলেন আর তার সঙ্গে সঙ্গেই টেলিফোন বাজল। না নিউ জার্সি থেকে কোন কল না। মগবাজার থেকে বজলু নামের একটা লোক টেলিফোন করছে। অরুকে চাচ্ছে।মীরু বলল, ওকে তো এখন দেয়া যাবে না। আপনার যা বলার আমাকে বলুন।‘তাকেই দরকার। জরুরী একটা খবর দেব।‘ ‘বললাম তো তাকে দেয়া যাবে না। সে ঘুমুচ্ছে। শরীর ভাল না। আপনি পরে টেলিফোন করুন। আমি এখন আমেরিকা থেকে একটা কল এক্সপেক্ট করছি।‘

‘আপনি কি দয়া করে উনাকে বলবেন যে মুহিব এক্সিডেন্ট করেছে। অবস্থা খুব খারাপ। ঢাকা মেডিক্যালে ইনটেনসিভ কেয়ারে আছে।‘ ‘মুহিবটা কে?‘ উনাকে বললেই চিনবেন।‘আচ্ছা বলব। আপনি লাইনটা ছাড়ুন। আমিও খুব জরুরী একটা কল এক্সপেক্ট করছি।‘ ‘আপনি দয়া করে খবরটা দেবেন। বলবেন বজলু টেলিফোন করেছিল।‘ ‘বলব।‘ বজলু নামের অপরিচিত এই মানুষটা টেলিফোন রাখার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নিউ জার্সির কল পাওয়া গেল। মীরু দশ মিনিট কথা বলল। এই দশ মিনিটে তিনবার কাঁদল। দু‘বার ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, বুঝতে পারছি তুমি আমাকে ভালবাস না।

অরুকে যে খবরটা দেয়ার কথা মীরু সেই খবর দিল না। কারণ তার কিছুই মনে নেই। প্রবাসী স্বামীর সঙ্গে কথা বললে তার এরকম হয় – সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। শরীর ঝন ঝন করতে থাকে। সেই রাতে এক ফোঁটা ঘুম আসে না। গলার কাছে কি যেন একটা দলা পাকিয়ে থাকে।অরুর ঘুম ভাঙল সন্ধ্যাবেলা। ঘর অন্ধকার। জানালা দিয়ে শীতের হাওয়া আসছে। আকাশ মেঘে মেঘে কাল। শীতের সময় আকাশে মেঘ করলে কেন জানি খুব বিষনড়ব লাগে। অরু বিছানা থেকে নামল। বারান্দায় এসে দাঁড়াল। বারান্দায় খুব হাওয়া। গায়ে কাঁপন লাগছে।

মীরু বাটি ভর্তি দুধ নিয়ে রানড়বাঘর থেকে আসছে। অরুকে দেখে কিশোরীর মত পরিষ্কার গলায় বলল, তোর দুলাভাইয়ের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হল। দশ মিনিট কথা বললাম।অরু হাই তুলতে তুলতে বলল, দুলাভাই টেলিফোন করলেন, না তুমি করলে? ‘আমি করলাম। আমেরিকা থেকে কল করা খুব খরচান্ত ব্যাপার। তাছাড়া লাইনও সহজে পাওয়া যায় না।‘ ‘দুলাভাই শুধু লাইন পান না, আর সবাই পায়।‘ ‘এই সব কি ধরনের কথা অরু?‘ ‘ঠাট্টার কথা আপা। দুলাভাইয়ের সঙ্গে ঠাট্টা করব না?‘ ‘তোর কথা টেলিফোনে জিজ্ঞেস করছিল।‘ ‘বল কি? কি সৌভাগ্য!‘ ‘তোর বিয়ের তারিখ হয়েছে কি-না জানতে চাইল। আমি বললাম পৌষ মাসের মাঝামাঝি হবে।‘

অরু হাসতে হাসতে বলল, দুলাভাই বড় বাঁচা বেঁচে গেলেন। যেহেতু বাইরে আছেন গিফট-টিফট কিছু দিতে হবে না। সুন্দর একটা কার্ড পাঠালেই হবে।মীরু কঠিন চোখে তাকিয়ে আছে। অরু বলল, তুমি রাগ করছ না-কি? দুলাভাইয়ের সঙ্গে ঠাট্টা করব না? ‘এই জাতীয় ঠাট্টা আমার ভাল লাগে না। তোদের জন্যে দুলাভাইয়ের যে দরদ তার শতাংশের এক অংশ দরদও তোদের নেই।‘ ‘তাই না-কি?‘ এক বছর ধরে বেচারা বাইরে পড়ে আছে। আমি ছাড়া একবার কেউ কি তার সঙ্গে কথা বলেছে? বাবার জন্মদিনে সে কার্ড পাঠিয়েছে। বেচারার জন্মদিন গেল। বাবা কি তাকে একটা কার্ড পাঠিয়েছেন, না এক লাইনের একটা টিঠি লিখেছেন?‘

‘বাবা জানতেন না কবে জন্মদিন।‘ ‘কেন জানবে না? আম বাবাকে গিয়ে বললাম, বাবা পঁচিশে অক্টোবর আবীরের বাবার জন্মদিন। বাবা বললেন, বুড়ো ধাড়ির আবার জন্মদিন কি? এইভাবে কেউ কথা বলে? বলা উচিত?‘ ‘মোটেই বলা উচিত না।‘ মীরুর চোখে পানি এসে গেল। অরু বলল, এইসব কথা বাদ দাও আপা। দুলাভাই কেমন আছে বল।‘ভাল আছে। একটু ঠাণ্ডা লেগেছিল, এখন ভাল।‘ ‘আপা শোন। খুব সিনসিয়ারলি একটা প্রশ্নের জবাব দাও তো। খুব সিনসিয়ারলি – তোমার সবচে‘ প্রিয় মানুষটি কে?‘ ‘তোর দুলাভাই, আবার কে?‘ ‘আচ্ছা আপা, পৃথিবীর সব মেয়েরাই কি তাদের স্বামীকে তোমার মত ভালবাসে?‘

মীরু বিরক্ত হয়ে বলল, স্বামীকে ভালোবাসবে না তো কি রাস্তার মানুষকে ভালবাসবে? মাঝে মাঝে তুই এমন পাগলের মত কথা বলিস! অরু অস্পষ্ট স্বরে বলল, পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষ যেমন আলাদা তাদের ভালবাসাও কি আলাদা? একজনের ভালবাসা নিশ্চয়ই অন্য একজনের ভালবাসার মত নয়।মীরু বলল, বিড় বিড় করে কি বলছিস? অরু বলল, কিছু বলছি না।বলতে বলতেই সে লক্ষ্য করল তার কেমন যেন লাগছে। মুহিবের পাশে থাকার জন্যে এক ধরনের তীব্র ব্যাকুলতায় সে আচ্ছনড়ব হয়ে যাচ্ছে। চিটাগাং মুহিব কোথায় উঠেছে এটা কি খোঁজ নিয়ে জানা যায় না? সে যদি রাতের ট্রেনে চিটাগাং চলে যায়, ভোরবেলা মুহিবকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বলে – ‘তুমি কেমন আছ? …

মুহিব কি করবে? খানিকক্ষণ তোতলাবে। বেশি রকম চমকালে সে তোতলাতে শুরু করে। কুৎসিৎ লাগে। বয়স্ক একজন মানুষ তো তো তো করছে … জঘন্য।কেমন হয় চিটাগাং চলে গেলে? ট্রেনে করে একা একা চলে যাওয়া খুব কি সাহসের কাজ? গোপনে বিয়ে করে এরচে‘ অনেক বেশি সাহস কি সে দেখায়নি? আচ্ছা ধরা যাক, একা যাওয়া সম্ভব না। সে তো অনায়াসে বজলুকে বলতে পারে – ভাই, আপনি আমাকে চিটাগাং নিয়ে চলুন। আমার খুব যেতে ইচ্ছা করছে। উনি নিশ্চয়ই রাজী হবেন।ময়নার মা এসে বলল, আফা, আম্মা আপনারে ডাকে। অরু মার ঘরের দিকে রওনা হল।রাহেলার দাঁতব্যাথা তীব্র হয়েছে। ওষুধপত্র এখনো কিছু খাচ্ছেন না। আবরার আসবে। তাকে জিজ্ঞেস করে খাবেন। অরু ঘরে ঢুকে বলল, মা ডেকেছ?

‘হুঁ।‘ ‘দাঁতব্যাথা কি খুব বেশি?‘ ‘হুঁ।‘ ‘কি জন্যে ডেকেছো মা?‘ ‘বাতি নিভিয়ে আমার পাশে বোস।‘ অরু তাই করল। রাহেলা মেয়ের পিঠে হাত রেখে বললেন, তোর কি কোন সমস্যা আছে মা? অরু বিস্মিত হয়ে বলল, এই কথা কেন বলছ? ‘কোন কারণ নাই। হঠাৎ মনে হল। আছে কোন সমস্যা?‘

‘না।‘ ‘আজ কলেজ থেকে ফিরে শুনি তুই ঘুমাচ্ছিস। বলে দিয়েছিস তোর ঘুম যেন ভাঙ্গানো না হয়। আমি ভাবলাম, অসুখ-বিসুখ হয়েছে। তোর কাছে খানিকক্ষণ বসলাম। দেখি, ঘুমের মধ্যে তুই খুব কাঁদছিস।‘ ‘দুঃস্বপড়ব দেখছিলাম মা।‘ ‘কি দুঃস্বপড়ব?‘ ‘আমি একটা পাঞ্জাবীতে সুতার কাজ করছি। সূঁচ বার বার আমার আঙ্গুলে ফুটে যাচ্ছে। রক্ত বেরুচ্ছে। সেই রক্তে পাঞ্জাবীটা মাখামাখি হয়ে গেল।‘ ‘পাঞ্জাবীটা কার জন্যে বানাচ্ছিস?‘

রাহেলা শান্ত দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। অরু চোখ ফিরিয়ে নিল। রাহেলা বললেন, ঠিক করে বলতো দেখি মা – আবরার ছেলেটিকে কি তোর পছন্দ না? ‘উনি চমৎকার একজন মানুষ।‘ ‘অনেক সময় চমৎকার মানুষও মনে ধরে না। আমি লক্ষ্য করেছি বিয়ে ঠিক হয়ে যাবার পর থেকে তোর মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা। ঘুমের মধ্যে তোকে যে আজই কাঁদতে দেখলাম তা না – আগেও দেখেছি।‘

অরু কিছু বলতে যাচ্ছিল ঠিক তখন মীরু এসে বলল, আবরার সাহেব এসেছেন। একগাদা খাবার-দাবার নিয়ে এসেছেন। রাহেলা বললেন, ওকে এইখানেই নিয়ে আয়। তিনি অরুর চোখের দিকে তাকালেন। অরুর চোখ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। তিনি আশ্বস- হলেন – যা আশংকা করেছিলেন তা নয়।

 

Read more

কৃষ্ণপক্ষ পর্ব – ৭ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.