কৃষ্ণপক্ষ শেষ – পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

কৃষ্ণপক্ষ শেষ – পর্ব

অরু বলল, মা, আমি আর বসে থাকতে পারছি না। তুমি তোমার গেস্টকে যতড়ব করে চা খাওয়াও। আমি আমার ঘরে যাচ্ছি। শরীর খুব খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে খুব ভালমত জ্বর আসছে।মুহিবের অবস্থা মনে হয় খারাপ। একজন ডাক্তার ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট থেকে হঠাৎ ছুটে বের হলেন। দু‘জন ডাক্তার নিয়ে ফিরলেন। জেবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছে। কাউকে কিছু জিজ্ঞেসও করছে না।বজলু এসে বলল, আপা ঘরে গিয়ে বসুন। বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছেন।জেবা একটু সরে দাঁড়াল। বৃষ্টির ছাটে শাড়ির অনেকখানি ভিজেছে, খেয়ালই হয় নি।

‘শীত লাগছে আপা?‘ ‘একটু লাগছে। তোমার স্ত্রী কোথায়?‘ ‘ওকে ভাইয়ের বাসায় রেখে এসেছি। খুব কানড়বাকাটি করছিল।‘ ‘ভাল করেছ। সবাই মিলে কষ্ট করার কোন অর্থ হয় না।‘ ‘আপা, আপনি কি কিছু খেয়েছেন?‘ ‘না। তোমরা খেয়েছ?‘ ‘জ্বি। লেয়াকত টিফিন কেরিয়ারে করে বাসা থেকে খাবার নিয়ে এসেছিল। এমন ক্ষিধে লেগেছিল …‘ ‘ক্ষিধে লাগাই স্বাভাবিক। ক্রাইসিসের সময় ক্ষিধে পায়।‘ ‘লিয়াকত চা-ও নিয়ে এসেছে। আপনাকে একটু চা দেব আপা?‘

জেবা স্বাভাবিক গলায় বলল, দাও। বজলু খুব অবাক হচ্ছে। কি শক্ত মেয়ে। কত সহজভাবে সমস্যা গ্রহণ করেছে। এখন পর্যন্ত একবারও কাঁদেনি। ‘বজলু।‘ ‘জ্বি আপা।‘ ‘মৃত্যু দেখে আমার অভ্যাস আছে। মা মারা গেলেন, বাবা মারা গেলেন, আমার ছোট একটা বোন ছিল রেবা, সেও মারা গেল। এরা তিনজনই সারারাত মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করে ভোরবেলা মারা গেল। সবার প্র মে মারা গেলেন মা। মা‘র মৃত্যুতে কেঁদেছিলাম। তারপর আর কাঁদিনি। কানড়বা আসেনি।‘ জেবা চায়ের কাপে ছোট ছোট চুমুক দিচ্ছে। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে চা-টা ভাল লাগছে।‘আমার কি মনে হয় জান বজলু?

আমার মনে হয় মা-বাবা মৃত্যুর পর পরকালে একটা সংসার পেতেছেন। এক এক করে আমাদের সব ভাইবোনকে নিয়ে যাচ্ছেন। সবার আগে নিলেন রেবাকে। কারণ রেবা ছিল বাবা-মা‘র খুব পছন্দের মেয়ে। এখন অপেক্ষা করছেন মুহিবের জন্যে। ‘এইসব আলোচনা থাক আপা।‘ ‘কেন? তোমার শুনতে কি খারাপ লাগছে? আমার বলতে কিন্তু খারাপ লাগছে না। রেবার মৃত্যুর সময় কি হল শোন – খুব কষ্ট পাচ্ছিল। রাত দু‘টার সময় হঠাৎ করে যেন তার কষ্ট কমে গেল। স্বাভাবিকভাবে স্বাস নিতে লাগল। আমি তার মাথার কাছে বসে আছি। সে হঠাৎ শক্ত করে আমার দু‘হাত ধরে উত্তেজিত গলায় বলল, আপা দেখ দেখ। আম্মু এসেছে। আম্মু। সে আঙ্গুল দিয়ে দরজার দিকে দেখাতে লাগল।‘

জেবা চায়ের কাপ বজলুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, আমকে আরেকটু চা দাও। আপনি টুলটায় বসুন।জেবা বসতে বসতে বলল, আমার কি ধারণা জান বজলু? আমার ধারণা, আজও বাবা-মা, রেবা এসেছে। তারা মুহিবের খাটের পাশে বসে আছে। ‘এসব আলোচনা থাক আপা।‘ ‘আচ্ছা থাক। বজলু একটা কথা বল – মুহিব তো তোমার অনেক দিনের বন্ধু -‘ ‘জ্বি।‘ ‘আমার সম্পর্কে নিশ্চয়ই সে অনেক কিছু তোমাদের বলতো। কি বলতো বলতো?‘ ‘সব সময় বলত এই পৃথিবীতে আপনার মত ভাল মেয়ে অতীতে কখনো জন্মায়নি। বর্তমানে নেই – ভবিষ্যতেও জন্মাবে না।‘ জেবার চোখে পানি এসে গেল। সে চোখ মুছতে মুছতে বলল, আমি জানতাম সে এই কথাই বলবে। তবু তোমার কাছে শুনতে চেয়েছি ভালই করেছি। অনেকক্ষণ ধরেই কাঁদতে চাচ্ছিলাম, পারছিলাম না। এখন পারছি। তুমি ভাগ্য বিশ্বাস কর বজলু? বজলু কিছু বলল না।

জেবা বলল, আমি বিশ্বাস করি। এত বড় একসিডেন্ট হল। এতগুলি মানুষ গাড়িতে, কারোই কিছু হল না – মারা যাচ্ছে শুধু একজন। সেই একজন মাত্র একদিন আগে তার বিয়ে হয়েছে। মৃত্যুটা দু‘দিন আগে কেন হল না বলতো? ওর মৃত্যুর পর কি হবে জান? –চারদিক থেকে শুধু সান্ত্বনার বাণী শুনব। সুন্দর সুন্দর সব বাণী, চমৎকার সব কথা। “ইহকাল কিছুই না। ইহকাল হচ্ছে মায়া। আসল হচ্ছে পরকাল। প্রকৃতির নিয়ম-কানুন মানুষের বোঝার উপায় নেই।“ কি কি কথা শুনব সব আমি তোমাকে লিখে দিতে পারি। আগেও তিনবার শুনেছি। জেবা হয়ত আরো কিছু বলত – কথা থামিয়ে দিল। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট থেকে দু‘জন ডাক্তার বেরুচ্ছেন। দু‘জনের মুখই জ্যোতিহীন। তাঁদের মুখের দিকে তাকিয়ে পরিষ্কার বলে দেয়া যায় – মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধে এরা পরাজিত।

জেবা উঠে দাঁড়াল। ক্লান্ত গলায় বলল, আমি ওকে দেখে আসি।নার্স ছাড়াও একজন ডাক্তার মুহিবের পাশে আছেন। জেবা পায়ের কাছে দাঁড়াল। ক্ষীণ স্বরে বলল, ওর নিঃশ্বাসে এ-রকম শব্দ হচ্ছে কেন? ডাক্তার সাহেব ওর কি নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে? ডাক্তার সাহেব কিছু বললেন না।জেবা বের হয়ে এল।শফিকুর রহমান সাহেব এসেছেন। বাবার হাত ধরে প্রিয়দর্শিনী দাঁড়িয়ে আছে। দু‘জনই চুপচাপ বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। জেবা তাদের দেখল, কিছু বলল না।শফিকুর রহমান সাহেব বললেন, প্রিয়দর্শিনী তার মামাকে দেখার জন্যে খুব কানড়বাকাটি করছিল। ওকে নিয়ে এসেছি। এই প্রথম শফিকুর রহমান তাঁর মেয়েকে প্রিয়দর্শিনী নামে ডাকলেন। নাম উচ্চারণ করলেন স্পষ্ট করে, সুন্দর করে।

জেবা বলল, তোমার মামাকে এখন দেখে তোমার ভাল লাগবে না মা। না দেখাই ভাল। প্রিদর্শিনী কঠিন স্বরে বলল, আমি দেখব। ‘এসো আমার সঙ্গে।‘ ‘আমি একা যাব।‘ প্রিয়দর্শিনী ছোট ছোট পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের দরজায় হাত রেখে মিষ্টি রিণরিণে গলায় বলল, আমি কি দু‘মিনিটের জন্যে ভেতরে আসতে পারি? শফিকুর রহমান সাহেব ভয়ংকর অস্বস্তি বোধ করছেন। স্ত্রীর দিকে চোখ তুলে তাকাতেও পারছেন না। স্বাভাবিক থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করতে করতে বললেন, জেবা, ওর অবস্থা কেমন?

জেবা বলল, অবস্থা ভাল না। ডাক্তাররা কিছু বলছেন না, কিন্তু আমি বুঝতে পারছি। ওর গলা দিয়ে ঘড় ঘড় শব্দ হচ্ছে। প্রিয়দর্শিনী একা একা গিয়েছে। ও ভয় পাবে। শফিকুর রহমান বললেন, ও শক্ত মেয়ে, এতটুকুও ভয় পাবে না। আরেকটা কথা জেবা, তুমি নাকি চাও যে মেয়েটার সঙ্গে মুহিবের বিয়ে হয়েছে তাকে এখানে নিয়ে আসতে? ‘হ্যাঁ।‘ ‘সেটা কি ঠিক হবে জেবা? এই ভয়ংকর ঘটনাটা মেয়ের আড়ালেই হওয়া কি ভাল না? মেয়েটাকে তো একটা নতুন জীবন শুরু করতে হবে। তাকে যদি এখন এখানে নিয়ে আস তাহলে নতুন করে জীবন শুরু করা তার জন্যে খুব সহজ হবে না। সবচে‘ ভাল হয় কি জান?

যদি কেউ কোনদিন না জানে যে মেয়েটার বিয়ে হয়েছিল। আমি খুব প্রাকটিক্যাল কথা বললাম জেবা। লিভ হার এলোন।‘ জেবা বলল, তুমি মুহিবের দিকটা দেখবে না? তুমি কি মনে কর না মৃত্যুর সময় স্ত্রীকে পাশে পাবার অধিকার তার আছে? শফিকুর রহমান জবাব দিলেন না। কোন জবাব তাঁর মাথায় এল না।অরু জেগেই ছিল।সে জানত আবরার যাবার আগে তার ঘরে একবার উঁকি দেবে। জ্বর কেমন জানতে চাইবে। কপালে হাত রেখে উত্তাপ দেখবে। সেটাই তো স্বাভাবিক। যা স্বাভাবিক আবরার তা করল না। জ্বর দেখতে চাইল না। লাজুক মুখে বলল, তোমাকে একটা কথা বলতে এসেছি –

আজ আমার জন্মদিন। খুব ইচ্ছা ছিল তোমাকে নিয়ে বেড়াতে যাব।অরু বলল, আগে বললেন না কেন? বললেই হত। কোথাও বেড়াতে যেতাম। ‘লজ্জা লাগল।‘ ‘তখন লজ্জা লাগল তো এখন লাগছে না কেন?‘ আবরার বলল, বুঝতে পারছি না। একটু বসি তোমার ঘরে? ‘বসুন।‘ মীরু এসে বলল, অরু তোর টেলিফোন।অরু বলল, কে? ‘জানি না কে? একজন মহিলা। বললাম তোর অসুখ। শুয়ে আছিস। তারপরেও চাচ্ছেন। খুব না-কি জরুরি।‘ অরু উঠে দাঁড়াল। আবরারকে বলল, আপনি কিন্তু নড়বেন না। আমি এক্ষুনি আসছি।

‘হ্যালো, কে?‘ ‘আমাকে তুমি চিনবে না। আমার নাম জেবা। আমি মুহিবের বড় বোন?‘ অরু হকচকিয়ে গিয়ে বলল, স−ামালেকুম আপা।‘তুমি কি এক্ষুণি, এই মুহূর্তে আসতে পারবে?‘ ‘কোথায়?‘ ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।‘ ‘কি ব্যাপার আপা?‘ ‘মুহিব একসিডেন্ট করেছে।‘ ‘অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর অরু বলল, ওর কি জ্ঞান আছে?‘ ‘না, জ্ঞান নেই।‘ ‘অরু ক্ষীণ গলায় প্রায় অস্পষ্ট ভাবে বলল, ওর অবস্থা খুব খারাপ, তাই না আপা?‘ ‘হ্যাঁ।‘ ‘আমি আসছি।‘ ‘আমি কি আসব তোমাকে নিতে?‘ ‘আপনাকে আসতে হবে না।‘

জামিল সাহেব শোবার আয়োজন করছিলেন। অরু এসে দরজা ধরে দাঁড়াল। জামিল সাহেব বললেন, কি হয়েছে মা? অরু ছুটে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল, তুমি আমাকে নিয়ে চল বাবা। আমি একা যেতে পারব না। আমি কিছুতেই একা যেতে পারব না।অরু হাঁটু গেড়ে মুহিবের পাশে বসে আছে। তার সমস- শরীর থর থর করে কাঁপছে। সে চাপা গলায় বলল, ডাক্তার সাহেব, আমি কি ওর হাত একটু ধরতে পারি? বৃদ্ধ ডাক্তার কোমল গলায় বললেন, অবশ্যই ধরতে পার মা, অবশ্যই পার।‘আমি যদি ওকে কোন কথা বলি তাহলে ওকি তা শুনবে?‘

‘জানি না মা। কোমার ভেতর আছে, তবে মস্তিষ্ক সচল শুনতেও পারে। মৃত্যু এবং জীবনের মাঝামাঝি জায়গাটা খুব রহস্যময়। আমরা ডাক্তাররা এই জায়গা সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না।‘ ডাক্তার সাহেব আমি ওকে কয়েকটা কথা বলব। আপনি কি আমকে কিছুক্ষণের জন্যে ওর পাশে থাকতে দেবেন? ডাক্তার সাহেব ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ঘরে অরু একা। ছোট্ট ঘরটাকে তার সমুদ্রের মত বড় মনে হচ্ছে। মুহিবের বিছানায় সাদা চাদরের জন্যে বিছানাটাকে মনে হচ্ছে সমুদ্রের ফেনা। সেই ফেনা অবিকল ঢেউয়ের মত দুলছে।অরু দুহাতে মুহিবের ডান হাত ধরে আছে। সে খুব স্পষ্ট করে ডাকল, এই তুমি তাকাও। তোমকে তাকাতেই হবে। আমি সব কিছুর বিনিময়ে তোমাকে চেয়েছিলাম। তোমাকে পেয়েছি। আমি তোমাকে চলে যেতে দেব না।তোমাকে তাকাতেই হবে। তাকাতেই হবে।

পঁচিশ বছর পরের কথা।অরুর বড় মেয়ে রুচির আজ বিয়ে। বিরাট আয়োজন। ছাদে প্যাণ্ডেল হয়েছে। পাঁচশ‘র মত মানুষ দাওয়াত করা হয়েছিল – ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে হাজারের ওপর দাওয়াতী মেহমান এসে পড়েছে। সমস্যা হচ্ছে আকাশের অবস্থা ভাল না। সারাদিন ঝকঝকে রোদ গিয়েছে। সন্ধ্যা থেকেই আকাশ মেঘলা। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। অরুর স্বামী আবরার সাহেব চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়েছেন। খাওয়া কম পড়ে গেলে সমস্যা হবে। হোটেলে লোক পাঠিয়েছেন। খবর দিয়ে রাখা – প্রয়োজনে যাতে খাবার চলে আসে।

কিছু মেহমান খাইয়ে দিলে ভিড় পাতলা হত। খাওয়ানো যাচ্ছে না। কারণ বর এখনো আসেনি। বড় দেরি করছে। সন্ধ্যা সাত‘টার সময় চলে আসার কথা – এখন বাজছে আটটা। আকাশের অবস্থাও আরো খারাপ করেছে। বৈশাখ মাস, ঝড়ুবৃষ্টির কাল। তিরপল দেয়া আছে।ভারি বর্ষণ হলে তিরপলে কাজ হবে বলে মনে হয় না। এই নিয়েও আবরার সাহেব দুঃশ্চিন্তা করছেন। তাঁর প্রেসারের সমস্যা আছে। সামান্য দুঃশ্চিন্তাতেও তাঁর প্রেসার বেড়ে যায়। বর আসতে এত দেরি হবার কথা নয়। এত দেরি হচ্ছে কেন?

বর এল রাত সাড়ে আটটায়।অরুর মেজো মেয়ে কান্তা ছুটে এসে তার মা‘কে বলল, বর এসেছে মা। কি কুৎসিত রুচি দেখলে তুমি বমি করে দেবে। কটকটের হলুদ রঙের একটা পাঞ্জাবী পরে এসেছে। গরম খুব, এই জন্যে না-কি সে আচকান পড়ে নি। পাঞ্জাবী দেখে আমার সব বন্ধুরা হাসাহাসি করছে।অরু হাতের কাজ ফেলে বর দেখতে গেলেন। বরে মুখের দিকে তিনি তাকালেন না। তাকিয়ে রইলেন কটকটে হলুদ রঙের পাঞ্জাবীর দিকে। তাঁর মাথা ঝিম ঝিম করতে লাগল। কান্তা বলল, কি হয়েছে মা, এ রকম করছ কেন?

তিনি অস্পষ্ট স্বরে বললেন, শরীরটা ভালো লাগছে না মা। আমাকে বিছানায় নিয়ে শুইয়ে দে তো।বিয়েবাড়ির আনন্দ কোলাহল থেকে তিনি দূরে সরে গেলেন। ঘর অন্ধকার করে শুইয়ে রইলেন চুপচাপ। আবরার সাহেব খবর শুনে স্ত্রীর পাশে এসে বসলেন। হাত রাখলেন মাথায়।অরু বললেন, হাজারো কাজের সময় তুমি এখানে বসে আছ কেন? আমি ভাল আছি। মাথাটা কেন জানি একটু ঘুরে উঠল।আবরার সাহেব বললেন, কোন অসুবিধা নেই। আমি না গেলে কাজ আটকে থাকবে না।‘ঝড়ুবৃষ্টি হচ্ছে। তিরপল না-কি ঝড়ে উড়ে গেছে। তুমি খোঁজ-খবর করবে না?‘

‘খোঁজ-খবর করার লোক আছে। তুমি চুপচাপ শুয়ে থাকো তো।‘ ‘এত সব সমস্যা আর তুমি বসে আছ আমার ঘরে। লোকে হাসাহাসি করবে তো।‘ ‘করুক হাসাহাসি।‘ রাত একটার মত বাজে। বিয়েবাড়ি মোটামুটি শান্ত হয়েছে। বরযাত্রীরা চলে গেছে। শুধু বর আর তার কিছু বন্ধু-বান্ধব রয়ে গেছে। এই বাড়িতে বাসর হবে। অল্পবয়স্ক মেয়েদের উৎসাহের সীমা নেই। তারা অকারণে চিৎকার ছোটাছুটি করছে।কান্তার উৎসাহই সবচে‘ বেশি। যেন বাসরের যাবতীয় খুটি-নাটি সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে দেবার পুরো দায়িত্ব তার উপর।

তার বার বছরের জীবনে এমন উত্তেজনার মুহূর্ত আসেনি। সে ছুটতে ছুটতে মা‘র ঘরে এসে ঢুকল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, এখন খুব মজা হবে মা। আপা করছে কি দুলাভাইয়ের পাঞ্জাবী আগুন দিয়ে পুড়াচ্ছে। ‘বন ফায়ার‘ হবে। সবার সামনে আগুন দিয়ে পুড়ানো হবে।অরুর চোখে জল এসে যাচ্ছে। তিনি সেই জল সামলাবার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। আজ তাঁর মেয়ের বিয়ে। এমন আনন্দের দিনে কি আর চোখের জল ফেলতে আছে?

 

Read more

প্রিয়তমেষু পর্ব:০১ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.