চলে যায় বসন্তের দিন পর্ব:০২ হুমায়ূন আহমেদ

চলে যায় বসন্তের দিন পর্ব:০২

আমরা বসে আছি কারণ আমরা বসে বসে গল্প করছিলাম। যদি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করতাম তাহলে— বসে না থেকে দাঁড়িয়ে থাকতাম।ততক্ষণে মাজেদা খালার বাড়িতে ভূতের তাণ্ডব শুরু হয়েছে। মাজেদা খালা চিৎকার করছেন। তার কাজের তিনটি মেয়ের দুটি চিৎকার করছে। একটি গলা ছেড়ে কাঁদছে। খালু সাহেব ইংরেজিতে সবাইকে ধমকাচ্ছেন।

(দারুণ টেনশনের মুহুর্তে খালু সাহেব বাংলা ভুলে যান।) মাজেদা খালা এন্ড ফ্যামিলি আটকা পড়ে গেছে। বাড়ি থেকে বের হতে পারছে না। কারণ দরজা খোলার চাবি পাওয়া যাচ্ছে না। মাজেদা খালা সম্প্রতি তাঁর পুরো বাড়ির দরজা তালা বদলে আমেরিকান তালা লাগিয়েছেন। এই তালাগুলো বাইরে থেকে লাগানো যায় আবার ভেতর থেকেও লাগান যায়।জহির বলল, ভাইজান বাড়িঘর ভেঙে মাথার উপর পড়বে না?

আমি বললাম, পড়তে পারে।আমাদের তো রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ানো উচিত। রাস্তায় যাবি কীভাবে? দরজা খোলার চাবি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।ভূমিকম্প থেমে গেছে তাই না ভাইজান? প্রথম ধাক্কাটা গেছে। আসলটা বাকি আছে।আসলটা বাকি আছে মানে? ভূমিকম্পের নিয়ম হচ্ছে প্রথম একটা ছোট ধাক্কা দেয়। সবাইকে জানিয়ে দেয় যে সে আসছে। তারপর দেয় বড় ধাক্কাটা।বড় ধাক্কাটা কখন দেবে?

তার কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। পাঁচ মিনিট পরে দিতে পারে, পাঁচ ঘণ্টা পরে দিতে পারে। আবার ধর পাঁচ দিন পরেও দিতে পারে।ভাইজান আমার খুবই টেনশন লাগছে।ফুলফুলিয়ার সঙ্গে কীভাবে পরিচয় হলো সেই গল্পটা শুরু করা। টেনশন কমবে। দরজায় ধরাম করে শব্দ হলো। মাজেদা খালা ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকলেন। কন্দো কন্দাে গলায় বললেন, ভূমিকম্প হচ্ছে তোরা জনিস না?

আমি বললাম, জানি।জেনেশুনে চুপচাপ বসে আছিস কীভাবে? রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াবি না? রাস্তায় যাব কীভাবে? তুমি তো চাবিই খুঁজে পাচ্ছ না।এতক্ষণ খালা কাঁদোকাঁদো ছিলেন। এইবার কেঁদে ফেললেন। ফোপাতে ফোঁপাতে বললেন–চাবিটা আমি নিজের হাতে ড্রেসিংটেবিলের ফাস্ট ড্রয়ারে রাখি। আজও রেখেছি, আমার পরিষ্কার মনে আছে। ড্রেসিংটেবিলের সব ড্রয়ার খুঁজেছি। চাবি নেই।

আমি বললাম, তোমার শোবার ঘরের বালিশের নিচে দেখ তো।খালা রাগী গলায় বললেন, বালিশের নিচে চাবি রাখি নি বালিশের নিচে কেন দেখব।খোঁজাখুঁজির মধ্যে থাকলে তোমার টেনশনটা কমবে এইজন্যে দেখতে বলছি। কোনো একটা কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাক। ভালো কথা, ডিজিটাল ভয়েস রেকর্ডারটার কাজ শেষ। তোমার কাছে কি হ্যান্ডওভার করব? পনেরো মিনিটের মতো রেকর্ড হয়েছে।খালা যেভাবে ঝড়ের মতো এসেছিলেন ঠিক সেইভাবে ঝড়ের মতো বের হয়ে গেলেন।

তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চাবি পাওয়া গেছে, চাবি পাওয়া গেছে শব্দ শোনা গেল। দরজা খোলার শব্দ হলো। সিড়ি দিয়ে ধুপধ্যাপ শব্দে নামার শব্দ পাওয়া গেল এবং আমাকে চমকে দিয়ে জহির বিছানা থেকে লাফ দিয়ে নেমে বন্দুকের গুলির মতো দরজা দিয়ে বের হয়ে গেল। তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ধারণী দ্বিতীয়বার কোঁপে উঠল। ততক্ষণে ঢাকা শহর জেগে গেছে। চারদিকে হৈচৈ চিৎকার শুরু হয়েছে। রাস্তা ভর্তি মানুষ। এর মধ্যে একজন আবার আজান দিচ্ছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় আজান দিতে হয়।

আমি জানোলা দিয়ে তাকিয়ে আছি। আতঙ্কে অস্থির হওয়া লোকজন দেখতে ভালো লাগছে। তীব্র আতঙ্কেরও কিছু পর্যায় আছে। প্রাথমিক পর্যায়ে তীব্র আতঙ্কগ্ৰস্ত মানুষ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। ক্ষুদ্র একটা এলাকার ভেতর ছোটাছুটি করে। আতঙ্ক যত বাড়তে থাকে ছোটাছুটির মাত্রা তত কমতে থাকে। তীব্র আতঙ্কের শেষ পর্যায়ে কোনো ছোটাছুটি নেই।— স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা। তখন চোখের মণিও নড়বে না।মাজেদা খালাকে দেখা যাচ্ছে।

তিনি তাঁর পরিবার নিয়ে বাড়ির সামনের লনে ছোটাছুটি করছেন। তিনি যেদিকে যাচ্ছেন তার কাজের তিন মেয়েও সেদিকে যাচ্ছে। শুধু খালু সাহেব এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন। তার হাতে ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ম্যাগাজিন। তাঁর ঠোঁটে সিগারেট। তবে সিগারেটে আগুন নেই। ছুটে নিচে নামার সময় নিশ্চয়ই লাইটার নিয়ে যেতে ভুলে গেছেন। জহিরকে দেখতে পাচ্ছি না। সে কি গেট খুলে বাইরে চলে গেছে? এক দৌড়ে ফুলফুলিয়ার কাছে চলে যায় নি তো?

ফুলফুলিয়া যখন দেখবে খালি গায়ে একজন যুবক দৌড়াতে দৌড়াতে তার কাছে আসছে তখন সে ভালোই মজা পাবে।মাজেদা খালার বাড়ির মূল লোহার গোটটা বন্ধ। তবে মূল গেটের সঙ্গে বাচ্চা গোটটা খোলা। সেই গেটের ভেতর দিয়ে মাঝে মাঝেই লোকজন উঁকি দিচ্ছে। খালার বাড়ির গেটে চব্বিশ ঘণ্টা দারোয়ান থাকার কথা। কোনো দারোয়ান নেই। যে-কোনো বিপর্যয়ের সময় প্রথম যারা দায়িত্ব ফেলে পালিয়ে যায়। তারা হলো দারোয়ান এবং সিকিউরিটি গার্ড।

হিমু এই হিমু! মাজেদা খালা আমাকে দেখতে পেয়েছেন। মনে হয় তার আতঙ্ক সহনীয় পর্যায়ে চলে এসেছে। তীব্র আতঙ্কগ্ৰস্ত মানুষ কাউকে চিনতে পারে না। মস্তিষ্কের যে অংশে পরিচিতিমূলক তথ্য থাকে। সেই অংশ কাজ করে না। মাজেদা খালা ক্ষিপ্ত গলায় চোঁচালেন–এই হিমু, কথা বলছিস না কেন? আমি বললাম, খালা কেমন আছ? গাধা তুই ফাজলামি করছিস কেন? এখন কেমন আছি জিজ্ঞেস করার মানে কী? নেমে আয়।তোমরা কি চা খাবে? চায়ের পানি বসিয়ে দেই?

নেমে আয় তো। এক্ষুণি নাম।মাজেদা খালার পাশে খালু সাহেব এসে দাঁড়ালেন। ভাঙা ভাঙা গলায় বললেন— Himu bring me a lighter, খালু সাহেবের গলা ভাঙা ছিল না। মনে হচ্ছে ভূমিকম্পে তাঁর গলা ভেঙে গেছে। ভূমিকম্পে ঘর বাড়ি ভাঙে বলে জানি, মানুষের গলা ভাঙে এটা শুনি নি।আমি বললাম, খালু সাহেব পোর্চের লাইটটা কি জ্বলিয়ে দিব? খালু সাহেব বললেন, কেন?

আমি বললাম, ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ম্যাগাজিনটা পড়তে পারতেন। লনে কতক্ষণ থাকতে হয় তার তো ঠিক নেই।খালু সাহেব বিড়বিড় করে কী যেন বলছেন। নিশ্চয়ই ইংরেজিতে গালাগালি।দোতলা থেকে শোনা যাচ্ছে না।রাত বারটা।ভূমিকম্প ভীতি সামলে মাজেদা খালা বাড়িতে উঠে এসেছেন। রান্নাবান্না কিছু হয় নি। তাঁর তিন কাজের মেয়ে রান্নাঘরে ঢুকে গেছে। খালা খালু দুজনই বসার ঘরের সোফায় পাশাপাশি বসে আছেন।

আমি বসে আছি তাদের ডানপাশের সোফায়। খালু সাহেব ভাঙা গলায় স্ত্রীর সঙ্গে গল্প করছেন। গল্পের বিষয়বস্তু— ভূমিকম্প।বুঝলে মাজেদা— বিরাট কোইনসিডেন্স। যখন ভূমিকম্প হচ্ছিল তখন আমি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে ভূমিকম্প নিয়েই একটা আর্টিকেল পড়ছিলাম। আর্টিকেলের নাম— Untamed Nature, আর্টিকেলের একটা চেপ্টার ভূমিকম্পের বর্ণনা দিয়ে শুরু হয়েছে। ঐ চেপ্টারটা পড়তে শুরু করেছি তখনই ভূমিকম্প শুরু হলো। ইন্টারেস্টিং কেইনসিডেন্স না?

খালা জবাব দিলেন না। তিনি ভাবলেশহীন মুখে টিভির দিকে তাকিয়ে আছেন। টিভিতে এখনো সিএনএন। এখনো টিভি শব্দহীন। মাজেদা খালাকে দেখে মনে হচ্ছে তাঁর আতঙ্ক এখনো পুরোপুরি যায় নি। স্বামীর প্রশ্নের জবাব তো তিনি দিলেনই না, উঠে নিজের ঘরে চলে গেলেন। খালু সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, হিমু তোমার কাছে কোইনসিডেন্সটা ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে না?

কোনো আর্টিকেল পড়বেন না।কেন? বজ্রপাতের উপরে আর্টিকেল পড়লেন–সঙ্গে সঙ্গে আপনার উপর বজ্রপাত হলো। পুড়ে কয়লা হয়ে গেলেন।তুমি কি রসিকতা করার চেষ্টা করছ? জ্বি।তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক রসিকতার না। রসিকতা করবে না।জ্বি আচ্ছা।একটা জিনিস খেয়াল রাখবে। তোমার নাম হিমু। তুমি একজন ভ্যাগাবল্ড। তুমি চার্লি চ্যাপলিন না।

জ্বি আমি খেয়াল রাখব।তুমি জহিরের ঘরে যাও। ওকে বিরক্ত করা। ওর সঙ্গে হিউমার করার চেষ্টা কর। আমার সঙ্গে না।জি আচ্ছা।আমি উঠে দাঁড়ালাম। খালু সাহেব থমথমে গলায় বললেন, তোমাকে আরেকটা বিষয় বলি। দয়া করে সহজ উত্তর দেবে, প্যাচানো উত্তর দেবে না।জ্বি আচ্ছা।ভূমিকম্প হচ্ছে। সবাই দৌড়ে নেমে খোলা জায়গায় চলে গেল। তুমি ঘরে বসে রইলো। খুব ভালো কথা, থাক ঘরে বসে, কিন্তু জহিরকে আটকে রাখলে কেন?

খালু সাহেব, আমি জহিরকে আটকে রাখি নি। ও হঠাৎ খালি গায়ে দৌড় দিল। যাকে বলে ভো দৌড়।দৌড়ে কোথায় গেল? প্রথম বুঝতে পারি নি কোথায় গেছে। পরে ওকে আবিষ্কার করলাম ছাদে। সে ভাষায় আকাশে লেখা ভাসে। সত্যি কি-না দেখতে গেছে।যে ছেলে ফিজিক্স পড়ছে সে ভূমিকম্পে আকাশে হাবিজাবি লেখা হয়। এইসব বিশ্বাস করে?

ওকে তো কানে ধরে উঠবোস করানো দরকার। ওকে আমার কাছে পাঠাও তো। তার সঙ্গে কথা বলা দরকার।খালু সাহেব আজ কথা না বলে আরেকদিন বলুন। এখন সে একটু ব্যস্ত আছে। ব্যস্ত বলেই আমি আপনার কাছে বসে আছি। আপনি বিরক্ত হচ্ছেন জেনেও বসে আছি।কী নিয়ে ব্যস্ত?

সে টেলিপ্যাথির মাধ্যমে একজনের কাছে খবর পাঠাবার চেষ্টা করছে। জানার চেষ্টা করছে ভূমিকম্পে তাদের কোনো ক্ষতি হয়েছে কি-না। পদ্ধতিটা খুব সহজ। শবাসন হয়ে চোখ বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়…

চুপ কর।

জ্বি আচ্ছা।

খালু সাহেব থমথমে মুখে জহিরের ঘরের দিকে এগুলেন। আমিও তাঁর পেছনে পেছনে গেলাম। ইন্টারেস্টিং কোনো পরিস্থিতি হয় কি-না দেখার জন্যে যাওয়া। তেমন কিছু হলো না। খালু সাহেব হতভম্ব হয়ে দেখলেন, তাঁর পুত্র চোখ বন্ধ করে সরল রেখা হয়ে শুয়ে আছে। মুখে বিড়বিড় করছে। খালু সাহেব যেভাবে নিঃশব্দে ছেলের ঘরে ঢুকেছেন সেইভাবে নিঃশব্দেই ছেলের ঘর থেকে বের হলেন। আমাকে ইশারায় তার পেছনে পেছনে আসতে বললেন।

আমিও বাধ্য ছেলের মতো তাকে অনুসরণ করলাম। তিনি আমাকে সিঁড়ির কাছে নিয়ে গিয়ে কঠিন গলায় বললেন, হিমু তুমি নানাবিধ যন্ত্রণা তৈরি করা। আমি আমার পরিবারে কোন যন্ত্রণা চাই না। তুমি আর এ বাড়িতে আসবে না। তুমি এক্ষুণি বিদেয় হও।আমি বিনীত ভঙ্গিতে বললাম, আমার রাতে খাওয়ার কথা। ইলিশ মাছ ভাজা হচ্ছে।কথা বাড়াবে না। বিদেয় হও। আমি সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলাম। খালু সাহেব দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর মুখ থমথম করছে।

হিমু,

তুই রাতে কাউকে কিছু না বলে চলে গেলি কেন? তুই নিজেকে কী ভাবিস? যা মনে আসে করে বেড়াবি? তোকে কেউ কিছু বলতে পারবে না।? বাংলাদেশের সব মানুষের মাথা কি তুই কিনে নিয়েছিস?

ঐ রাতে কী ঘটেছিল আমার কাছে শোন। আমার প্রচণ্ড মাথা ধরেছিল। আমি বাতি বন্ধ করে শুয়েছিলাম। এতে মাথা ধরা আরো বাড়ল। তুই বোধহয় জানিস না শুয়ে থাকলে আমার মাথা ধরা বাড়ে। আমার সবই উল্টা। যাই হোক মাথা ধরা যখন খুব বাড়ল তখন মাথা ধরার টেবলেটের খোঁজে গেলাম তোর খালুর কাছে। দেখি সে একা মুখ আমসি করে বসে আছে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, হিমু কোথায়? তোর খালু বলল, জানি না কোথায়।

আমি বললাম, সে চলে গেছে না কি? তোর খালু বলল, জানি না। যেতেও পারে, খবর না দিয়ে যে আসে সে খবর না দিয়ে চলে যায়। তখন আমি গোলাম জহিরের ঘরে। সেখানেও তুই নেই। কাজের মেয়েরাও কেউ কিছু বলতে পারে না। গেটের দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলাম। সেও বলল, গেট দিয়ে কাউকে যেতে দেখে নি। তোর খালু বলল, চলে গেছে— গেছে। এত হৈচৈ করছ, কেন? টেবিলে খাবার দিতে বলো।

হিমু, কাউকে কিছু না বলে চলে যাওয়াটা ঠিক না। আমি রাগ করেছি এবং মনে কষ্ট পেয়েছি। আমি যাদেরকে বেশি স্নেহ করি। তারাই আমাকে কষ্ট দেয়। জহিরের কথাই মনে করে দেখ।ডিজিটাল ভয়েস রেকর্ডারে জহিরের সব কথাবার্তা এই নিয়ে পাঁচবার শুনলাম। আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। এইসব কী ধরনের কথাবার্তা? আমার তো মনে হয় ছেলেটা পাগল হয়ে গেছে। তার ডাক্তারি চিকিৎসা দরকার।

কোনো সুস্থ মাথার ছেলে এ ধরনের কথা বলতে পারে না। ভূমিকম্পের রাতে সে তার বাবার সঙ্গে যে কথাবার্তা বলেছে সেটা শুনলেই যে কেউ বলবে, ছেলেকে পাবনা মেন্টাল হসপিটালে পাঠিয়ে দাও। ঐটাই তার জন্যে উপযুক্ত জায়গা। ঘটনা কী হয়েছে শোন। বাপ-ছেলে খেতে বসেছে। আমি বসি নি। প্রথমত, আমার মাথার যন্ত্রণা; দ্বিতীয়ত, তোর জন্য রান্না-বান্না করিয়েছি। আর তুই না বলে পালিয়ে গেছিস; যাই হোক মূল ঘটনা শোন। জহিরের বাবা বলল, পড়াশোনা কেমন হচ্ছে?

জহির বলল, ভালোই হচ্ছিল। তবে এখন হচ্ছে না।

জহিরের বাবা বলল, হচ্ছে না কেন?

জহির বলল, ফিজিক্স পড়ে কোনো লাভ নেই বাবা।

লাভ নেই কেন?

প্রকৃতিকে বোঝার জন্যেই ফিজিক্স পড়া। আমি চিন্তা করে দেখেছি। এখন পর্যন্ত ফিজিক্সের যে উন্নতি হয়েছে তা দিয়ে প্রকৃতিকে কিছুতেই বোঝা যাবে না। বরং উল্টো হবে। ফিজিক্সের জ্ঞান আমাদের চিন্তাকে আরো ধোঁয়াটে করে ফেলবে।জহিরের বাবা তখন শান্ত গলায় বলল, আমি ফিজিক্স জানি না। আমি ইতিহাসের ছাত্র। তুই কী বলছিস বুঝিয়ে বল।

জহির বলল, সব কিছু বোঝাতে পারব না। একটা শুধু বলি, ফিজিক্স বলছে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে বিগ ব্যাং থেকে। প্রচণ্ড শব্দে কসমিক ডিম ফেটে মহাবিশ্ব তৈরি হলো। যে মুহুর্তে কসমিক ডিম ফাটল সেই মুহূর্ত থেকে সময়ের শুরু। কসমিক আগে কী ছিল কিছুই বলতে পারছে না।ডিম ফাটার আগে কী ছিল ফিজিক্স তা বলতে পারছে না বলে তুই ফিজিক্স পড়বি না?

না। আমার কাছে ফিজিক্স পড়া অর্থহীন মনে হচ্ছে।

কী করবি বলে ঠিক করেছিস?

বাবা, আমি একটা কফিশপ চালাব।

বুঝতে পারছি না। কী বলছিস। কী চালাবি?

কফিশপ। ছোট্ট ঘরোয়া ধরনের কফিশপ। দোকান সারাদিন বন্ধ থাকবে। খুলবে সন্ধ্যার পর। কাটায় কাটায় বারটার সময় কফিশপ বন্ধ হবে।রসিকতা করছিস নাকি? না, রসিকতা কেন করব? কফিশপের নাম ঠিক হয়ে গেছে— শুধুই কফিতা।নাম শুধুই কফিতা? হ্যাঁ, আমার কফিশপের নাম কফিতা। এখন কী করছি জানো বাবা? যে মাগে করে কফি দেয়া হবে সেই মগের ডিজাইন করছি।মগের ডিজাইন করছিস?

হ্যাঁ। কোন রঙের মাগে কফির গেরুয়া রঙ ভালো ফুটে সেটা দেখা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে গাঢ় সবুজ রঙের মাগে কফির রঙ ভালো ফুটে। কাজেই আমাদের মগের রঙ হলো গাঢ় সবুজ। এই মগ হবে গ্রাসের মতো। মাগে চায়ের কাপের মতো কোনো বোটা থাকবে না।

বোটা থাকবে না?

জ্বি না। কেন থাকবে না শুনতে চাও?

শুনি কেন থাকবে না।

পানির গ্রাস আমরা হাত দিয়ে ধরি। ঠাণ্ডা পানির গ্রাস হাত দিয়ে ধরেই পানির শীতলতা আমরা টের পাই। আমাদের ভালো লাগে। গরম কফির উষ্ণতাও ঠিক একইভাবে আমরা কফির মগ হাত দিয়ে ধরা মাত্র টের পাব।

আমাদের ভালো লাগবে।

তুই তাহলে কফির দোকান দিচ্ছিস?

জ্বি।

তোর নেক্সট পরীক্ষা যেন কবে?

নয় তারিখ–সাত দিন আছে। পরীক্ষা তো দিচ্ছি না!

পরীক্ষা দিচ্ছিস না?

না। কফিশপের আইডিয়া মাথায় আসামাত্র পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছি।জহিরের বাবা এরপরেও বেশ সহজভাবে খাওয়া শেষ করল। বেসিনে হাত ধুয়ে এসে আবার খাবার টেবিলে বসল। জহিরের খাওয়া তখনো শেষ হয় নি। জহিরের বাবা শান্তমুখে ছেলের খাওয়া দেখতে লাগল। খাওয়া শেষ হবার পর জহিরের বাবা বলল, নয় তারিখে তুই পরীক্ষা দিতে যাবি। যদি না যাস তাহলে ঐ দিনই এক বিস্ত্ৰে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাবি। কথা চালাচালি আমার পছন্দ না।

আমি আমার কথা বলে শেষ করলাম। এই বিষয়ে নয়। তারিখ পর্যন্ত আর কোনো কথা বলব না।জহির বলল, আচ্ছা।হিমু, এই হলো ঘটনা। জহিরের বাবাকে আমি মোটেই দোষ দিচ্ছি। না। সে তো তাও ধৈর্য ধরে ছেলের কথা শুনেছে। আমার ইচ্ছা করছিল–খাবার টেবিলেই ঠাস করে ছেলের গালে এক চড় মারি। যাতে এক চড়ে মাথার সব আইডিয়া নাকের ফুটো দিয়ে বের হয়ে যায়।

Leave a comment

Your email address will not be published.