চলে যায় বসন্তের দিন পর্ব:০৮ হুমায়ূন আহমেদ

চলে যায় বসন্তের দিন পর্ব:০৮

রাস্তায় নেমে মনে হলো আমার কাজকর্ম গুছিয়ে ফেলা উচিত। খালু সাহেব এবার আমাকে ছাড়বে না। জেলখানায় ঢুকাবে। এটা এক অর্থে মন্দ না। নিশ্চিত মনে কিছুদিন কাটানো যায়। খাওয়া দাওয়ার ঝামেলা নেই। ঘুমানোর সমস্যা নেই। সব দায়দায়িত্ব সরকারের। আমার মতো মানুষদের জন্যে জেলখানার মতো ভালো থাকার জায়গা আর কী হতে পারে। মৎস্য মারিব খাইব সুখে-র মতো— জেলখানায় থাকিব, খাইব সুখে।জেলে ঢোকার আগে করণীয় কাজকর্মের লিষ্ট মনে মনে করে ফেললাম।

ক. খাঁ সাহেবের গানের সিডি। (ভুজুং ভাজং দিয়ে খালার কাছ থেকে টাকা আদায় করতে হবে)

খ. খালার সঙ্গে ভুজুং ভাজং টাকা আদায় পর্ব। (টেলিফোনে কথা বলা, খাঁ সাহেবের সঙ্গে খালার পরিচয় করিয়ে দেয়া)

গ. রাধাচুড়া গাছের সঙ্গে শেষ দেখা। (সেটা আজই হতে পারে)

ঘ. জহিরের সঙ্গে কথা বলা। (মনে হচ্ছে সেটা সম্ভব হবে না। জহিরের মিশন শেষ হতে হতে তিন মাস লাগবে। তিন মাস সময় আমার হাতে নেই।)

ঙ. ফুলফুলিয়া! (ফুলফুলিয়ার বিষয়ে কিছুই মাথায় আসছে না। কিন্তু নামটা লিখে রাখা দরকার।) এখন এক এক করে আগানো যাক।

ক. খাঁ সাহেবের গানের সিডি।

সব ব্যবস্থা করা আছে। শুধু টাকার জোগাড় হয় নি। এবং সিডির কভার ডিজাইন বাকি আছে। কভার ডিজাইনের জন্যে ধ্রুব এষকে ধরতে হবে। কী কারণে যেন সে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। যে ফ্ল্যাট বাড়িতে সে থাকে তার দরজায় এ4 সাইজের একটা কাগজ। সেখানে একটা উড়ন্ত কাকের ছবি, তার নিচে ধ্ৰুবের হাতে লেখা— পাখি উড়ে গেছে।

আমাকে যা করতে হবে তা হলো এই কাগজ ফেলে দিয়ে অন্য একটা কাগজ সাটতে হবে। সেই কাগজে লেখা থাকবে–পাখি ফিরে এসো।ধ্রুব হয়তো জানে না, যে পাখি উড়ে যায়। তাকে ফিরে আসতে হয়। খাঁচায় বন্দি পাখিরই শুধু উড়ে যাওয়া বাঁ ফিরে আসার ব্যাপার থাকে না। তার শুধুই অবস্থান।

দোকান থেকে এ4 সাইজের কাগজ এবং লাল মার্কার কিনে ধ্রুবের ফ্ল্যাটে উপস্থিত হলাম। দরজায় পাখি উড়ে গেছে স্লোগান নেই। তার বদলে একটা কাকের ছবি। কাকটা লাল চোখে তাকিয়ে আছে, তার পয়ে লোহার শিকল। অদ্ভুত সুন্দর ছবি।আমি ধ্রুবের দরজার কলিংবেল টিপলাম। ভেতর থেকে ধ্রুব ঘুম মাখা গলায় বলল, কে?

আমি হিমু। আমার ব্যাঞ্জোর কভার কোথায়?

টাকা এনেছেন?

না।

টাকা আনেন নি কেন?

এখনো জোগাড় করতে পারি নি।

জোগাড় হবে?

বুঝতে পারছি না।

আমার দরজায় যে শিকল পরা কাকের ছবি আছে। ঐটা নিয়ে যান। ফটোসেটে সিডির নামটা বসিয়ে দেবেন। কাকের চোখে যে লাল রঙ আছে। ঐ লাল রঙে সিডির নামটা হবে। সিডির নাম কী?

নাম–একলা পাখি।

নামটা কি এখন ঠিক করলেন?

জ্বি। দরজাটা খুলুন সুন্দর একটা ডিজাইন করেছেন, আপনাকে ধন্যবাদ দিয়ে যাই।দরজা খুলতে পারব না। আমি সারা রাত ঘুমাই নি, এখন ঘুমুচ্ছি। আপনি দরজার বাইরে থেকেই ধন্যবাদ দিন।

ধন্যবাদ।আচ্ছা ঠিক আছে। এখন বিদেয় হোন। প্লিজ। আর বিরক্ত করবেন না। আরেকটা কথা–কভার ডিজাইনের জন্যে টাকা নিয়ে আসার দরকার নেই। কাকের ছবিটা আমি সিডির কভারের জন্যে আঁকি নি। কাজেই এর জন্যে টাকা নেয়া অন্যায় হবে।

খ. ভুজুং ভাজুং টাকা আদায় পর্ব।

আমার পরিচিত টেলিফোনের দোকান থেকে (আগেরবার –এই লোক টেলিফোনের টাকা নেয় নি) খালাকে টেলিফোন করলাম। টেলিফোনওয়ালা ঐ দিনের মতোই হাসি মুখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছে এই লোক আজও টাকা নেবে না।স্নামালিকুম, খালা আমি হিমু।বুঝতে পারছি। কী চাস? টাকা চাই খালা। আজ ছাব্বিশ হাজার দিলেই হবে। স্টুডিও এবং হ্যান্ডস-এর খরচ।কীসের স্টুডিও, কীসের হ্যান্ডস?

আমাদের সিডি বের হবে। শুক্রবারে রেকর্ডিং। প্ৰধান অতিথিকে দাওয়াত দেয়া হয়ে গেছে। তিনি এপয়েন্টমেন্ট ডায়রিতে দিন এবং সময় লিখে রেখেছেন। ঐ দিন তাকে গাড়ি করে আনতে হবে এবং বাসায় দিয়ে আসতে হবে। খালা, শুক্রবারে তোমার গাড়িটাও লাগবে।হিমু, তুই পুরো ব্যাপারটা ভুলে যা। আমি এর মধ্যে নেই।সে-কী? সে-কী ফে-কী বলে লাভ নেই। তোর খালু আমার উপর খুব রাগ করেছে।লোকে গাছে তুলে মই কেড়ে নেয়। তুমি তো আমাকে চাঁদে পাঠিয়ে রকেট কেড়ে নিয়েছ।

কেড়ে নিয়েছি। ভালো করেছি— তুই থাক চাঁদে বসে। আমার ছেলের কোনো খোঁজ নেই। আর আমি খুলব সিডি কোম্পানি! এইগুলো তো তোমার কথা না। খালু সাহেবের কথা।যার কথাই হোক সত্যি কথা। হিমু আমার মাথা ধরেছে— আমি তোর সঙ্গে গজগজ করতে পারব না।আমি খাঁ সাহেবকে কী বলব? তুই তাকে কী বলবি সেটা তুই জানিস। উনি বিখ্যাত মানুষ, অন্য সিডি কোম্পানি তাঁকে লুফে নেবে। এটা নিয়ে তোর সঙ্গে আমি আর কথা বলব না।আচ্ছা বেশ কথা শেষ। শুক্রবারটা ফ্রি রেখো।কেন?

বললাম না। শুক্রবারে সিডির রেকর্ডিং। তুমি অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি।আরে গাধা আমি এক কথা কতবার বলব! আমি সিডির মধ্যে নেই।সিডিতে তো থাকতে বলছি না। বিশেষ অতিথিতে থাকতে বলছি। তোমার কাজ হবে সঙ্গীতের উপর একটা বক্তৃতা দেবে, তারপর খাঁ সাহেবের হাতে ফুলের তোড়া তুলে দেবে।জীবনে আমি বক্তৃতা দেই নি।বক্তৃতা না দিতে পারলে নাই। ফুলের তোড়াটা দিতে পারবে। না কি সেটাও পারবে না?

আসুক শুক্রবার। তারপর দেখা যাবে।খালা খট করে টেলিফোন নামিয়ে রাখলেন। আমি টেলিফোনওয়ালার দিকে তাকিয়ে বললাম, ভাই কত হয়েছে? টেলিফোনওয়ালা ঐ দিনের মতো বলল, স্যার আপনার কাছ থেকে পয়সা নেব না।আমি বললাম, কেন?

আপনি একবার আমাকে খুব বড় একটা উপকার করেছিলেন। মানুষ উপকারের কথা মনে রাখে না। আমি দরিদ্র মানুষ কিন্তু আমি উপকারের কথা মনে রাখি।কী উপকার করেছিলাম? সেটা আপনাকে বলব না। আপনার যেহেতু মনে নাই আমি মনে করায়ে দিব না।শুক্রবার কি আপনার কাজকর্ম আছে?

দোকানে বসে থাকা— এছাড়া আর কাজকর্ম কী! শুক্রবারে আপনার দাওয়াত। বাজনা শোনার দাওয়াত। ব্যাঞ্জো বাজনা! গান বাজনা আমার ভালো লাগে না। কিন্তু আপনি দাওয়াত দিয়েছেন। আমি অবশ্যই যাব। শুক্রবার আমার দোকান থাকবে বন্ধ।

গ. রাধাচুড়া গাছের সঙ্গে শেষ দেখা।

যা মনে মনে ভেবেছিলাম। তাই। রাধাচুড়া গাছের নিচে গম্ভীর মুখে খাঁ সাহেব বসে আছেন। তিনি আমাকে দেখে সামান্য লজ্জা পেলেন বলে মনে হলো। খুকধুক করে শুকনা কাশি কাশতে লাগলেন। আমি বললাম, কখন এসেছেন? খাঁ সাহেব অস্বস্তির সঙ্গে বললেন, এই তো কিছুক্ষণ আগে। পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম গাছটা দেখে যাই।কী দেখলেন?

অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। আগে তিনটা ডালে পাতা ছিল। এখন মাত্ৰ দুটা ডালে আছে। তার মধ্যে একটার পাতা হলুদ হওয়া ধরেছে। আমি কোনো আশা দেখছি না।আপনার মনে হয় মন খারাপ।মন খারাপ টারাপ না, এতগুলা মানুষ গাছটাকে বাঁচাবার চেষ্টা করছে। চেষ্টা কাজে লাগছে না। এইটা দেখে খারাপ লাগছে। রুগ্ন গাছের গোড়ায় তুতে দিলে উপকার হয় শুনেছি। আজ কিছু তুতে দিয়েছি। আর কী করা যায় মাথায় আসছে না।আপনি কি রোজই এখানে আসেন?

রোজ না হলেও প্রায়ই আসি।… কথাটা ঠিক বললাম না, রোজই আসি। কী জন্যে জানি গাছটার উপর মায়া পড়ে গেছে।আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে গাছের উপর মায়া পড়ে যাওয়াতে আপনি লজ্জা পাচ্ছেন। লজ্জা পাচ্ছেন কেন? মানুষের উপর কোনোদিন মায়া পড়ল না। গাছের উপর মায়া। এই জন্যেই লজ্জা লাগে। আচ্ছা হিমু, কয়েকদিন থেকে একটা ব্যাপার। আমার মাথার মধ্যে ঘুরছে। ঐটা করলে কেমন হয়?

ঐটা মানে কী?

মোঘল সম্রাট বাবরের ব্যাপারটা।

খুলে না বললে বুঝতে পারছি না।

ঐ যে সম্রাট বাবরের পুত্র হুমায়ূন অসুস্থ হয়ে পড়লেন। জীবন সংশয়। চিকিৎসকরা জবাব দিয়ে দিয়েছেন। তখন এক গভীর রাতে সম্রাট বাবর তার ছেলের বিছানার চারদিকে ঘুরতে লাগলেন আর বলতে লাগলেন, হে আল্লাহপাক, আমার জীবনের বিনিময়ে আমার পুত্রের জীবন রক্ষা কর। সকালেই ছেলে সুস্থ হতে শুরু করল আর সম্রাট বাবর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কয়েকদিনের মধ্যেই হুমায়ূন সুস্থ হয়ে উঠলেন, সম্রাট বাবর মারা গেলেন।

আপনার মাথায় কি এরকম কিছু আছে নাকি? নিজের জীবন দিয়ে গাছের জীবন রক্ষা করা।আরে না। কথার কথা বলেছি। আমার তো মাথা খারাপ হয় নি।চলুন বাসায় যাই।তুমি যাও। মওলানা সাহেব আছর ওয়াক্ত আসবেন। দরুদে শেফার খতম তিনি শেষ করেছেন। আজ দোয়া হবে। দোয়ায় সামিল হব।ঠিক আছে আপনি থাকুন। আমি রাধাচুড়া গাছের দিকে তাকিয়ে বললাম, হে বৃক্ষ বিদায়।

ঘ. জহিরের সঙ্গে কথা বলা।

কথা বলা সম্ভব হলো না। সে কোথায় আছে কে জানে। হাঁটো পথিক হাঁটো।

হন্টন শুধু হন্টন

নিজ দুঃখ

পথ মাঝে

করিও বণ্টন।

ঙ. ফুলফুলিয়া।

মেয়েটার কোনো একটা সমস্যা হয়েছে। সমস্যা ধরতে পারছি না। সে যে মাঝে মাঝে লুকিয়ে কাঁদে তা তার চোখ দেখে বোঝা যায়। আমার প্রতি তার ব্যবহার খুব আন্তরিক ছিল, সেই আন্তরিকতায় ভাটা পড়েছে। এখন মনে হয় সে বিরক্তও হয়। ঐ দিন জিজ্ঞেস করলাম, জহিরের চিঠিটা কি এসেছে? সে তার জবাবে কঠিন গলায় বলেছে, আপনার কথা আমার মনে আছে। চিঠি তুলে রেখেছি। যেদিন পড়তে বলবেন—পড়ব।

মেয়েটার কি তার স্বামীর সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না? স্বামীর প্রসঙ্গে ফুলফুলিয়া কখনো কিছু বলে না। প্রবাসী স্বামীর প্রসঙ্গ একবারও আসবে না— সেটা কেমন কথা? একবার আমি জিজ্ঞেস করলাম, ফুলফুলিয়া স্বামীর কাছে কবে যাবে? ফুলফুলিয়া বলল, কেন জানতে চাচ্ছেন?

আমি বললাম, পাহাড় জঙ্গলের দেশ আমার কখনো দেখা হয় নি। ঠিক করেছি আমিও তোমার সঙ্গে যাব। পাহাড় জঙ্গলে ঘুরব।ফুলফুলিয়া বলল, ঠিক আছে।সে মুখে বলল, ঠিক আছে, কিন্তু আমার মনে হলো ঠিক নেই। সব কিছুই এলোমেলো। ফুলফুলিয়ার বাবার গানের সিডি বের হচ্ছে। এ বিষয়েও তার কোনো উৎসাহ নেই, অথচ মেয়েটা এমন ছিল না। ফুলফুলিয়ার সঙ্গে একদিন বসতে হবে। প্রাইভেট সিটিং।

অনেক উল্টাপাল্টা কথা বলে ফুলফুলিয়ার মনের চারদিকে যে শক্ত আবরণটি তৈরি হয়েছে সেটা ভেঙে দিতে হবে। পাঁচ প্রশ্নের খেলা, খেলা যেতে পারে। পাঁচটি প্রশ্ন করে উত্তর বের করতে হবে। উত্তর বের করতে না পারলে আমার যেকোনো পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। ভালো না লাগলেও উত্তর দিতে হবে।বলো তো ফুলি জিনিসটা কী? সে ঝিকমিক করে। তাকে দেখা যায় প্রবল শোকে ও প্ৰবল আনন্দে।

সে দেখতে কেমন?

তার কোনো আকৃতি নেই, কিন্তু সে ঝিকমিক করে।

তার বর্ণ কি?

তার কোনো বর্ণ নেই, কিন্তু সে ঝিকমিক করে।

সে কোথায় থাকে?

সে সব জায়গায় নানান ভঙ্গিমায় আছে। আকাশে আছে বাতাসে আছে, সমুদ্রে আছে, মরুভূমিতে আছে। আর মাত্র দুটি প্রশ্নের সুযোগ আছে। দুটি প্রশ্ন করে জেনে নাও জিনিসটা কী।পারছি না।জিনিসটা— চোখের জল। এখন আমার পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দাও। পাঁচটা প্রশ্নের একই উত্তর হলে চলবে না। পাঁচ ধরনের উত্তর হতে হবে।

প্ৰথম প্রশ্ন— মন বিষণ্ণ কেন?

দ্বিতীয় প্রশ্ন— মন বিষণ্ণ কেন?

তৃতীয় প্রশ্ন—মন বিষণ্ণ কেন?

চতুর্থ প্রশ্ন— মন বিষণ্ণ কেন?

পঞ্চম প্রশ্ন— মন বিষণ্ণ কেন?

মাজেদা খালা বলল, ঐ বুড়োই কি তোর বিখ্যাত ওস্তাদ? আমি বললাম, হুঁ। ব্যাঞ্জোরাজ ওস্তাদ শামসের উদ্দিন খাঁ।খাঁ সাহেব রেকর্ডিংরুমে কার্পেটের উপর মাথা নিচু করে বসে আছেন। তাঁর ডানপাশে ফুলফুলিয়া। খাঁ সাহেব কিছুক্ষণ পরপর কাশছেন। জটিল ধরনের কাশি। কাশির সময় ফুলফুলিয়া বাবার পিঠে হাত রাখছে। রেকর্ডিংরুমের বিশাল জানালাটা কাচের। বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে। আমি বললাম, খালা ভালো করে দেখো। ইনিই তোমার বিছানায় বসে ছিলেন না?

খালা প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললেন, মানুষটাকে তো দেখে মনে হচ্ছে অসুস্থ।বকর বকর করে কাশছে।হুঁ। কাল রাত থেকেই কাশছে। জ্বরও আছে। থার্মেমিটার ধরলে একশ দুই টুই পাওয়া যাবে বলে ধারণা। আমি বলেছিলাম আজকের রেকর্ডিং শিডিউল বাতিল করতে, বুড়ো রাজি হয় নি।বকর বকর কাশি নিয়ে গান-বাজনা করবে। কীভাবে?

গান তো করবে না। যন্ত্র বাজাবে।

কোন যন্ত্ৰ— হাতে যেটা নিয়ে বসে আছে সেটা?

হুঁ।

খেলনা খেলনা মনে হচ্ছে।

বাজনা শুরু হলে বুঝবে খেলনা না। রবীন্দ্রনাথের কবিতা—

এত ক্ষুদ্র যন্ত্র হতে এত শব্দ হয়।

দেখিয়া জগতের লাগে পরম বিস্ময়।

খালা অস্বস্তির সঙ্গে বললেন, হিমু তোর সঙ্গে একটা ব্যাপার ক্লিয়ার করে নেই।আমি কিন্তু বক্তৃতা দেব না। হাতে ফুলটুলও তুলে দিতে পারব না।আচ্ছা দিতে হবে না।তুই আবার কায়দা করে টাকা পয়সার ব্যাপারে আমাকে ফাঁসাবি না। আমি একটা পয়সাও দেব না।আচ্ছা দিও না।তুই তো টাকা পয়সার জোগাড় করেছিস?

এখনো করি নি। তবে ব্যবস্থা হয়ে যাবে। এসো তোমার সঙ্গে ওস্তাদজীর পরিচয় করিয়ে দেই।কোনো দরকার নেই। আমি কিন্তু দশ পনেরো মিনিট থেকেই চলে যাব। বাজনা ফাজনা আমার ভালো লাগে না। এখানে এসেছি জানতে পারলেও তোর খালু রাগ করবে।ঠিক আছে। চলে যেও।

ওস্তাদজীর পাশে যে মেয়েটা বসে আছে সে কে? উনার মেয়ে। দেখতে সুন্দর না? খুবই সুন্দর। মেয়েটাকে এত চিন্তিত লাগছে কেন? জানি না। জিজ্ঞেস করে আসব? তুই কী যে কথা বলিস। কী জিজ্ঞেস করবি? জিজ্ঞেস করব যে, আমার খালা জানতে চাচ্ছেন–তুমি এত চিন্তিত কেন? তুই কি মেয়েটাকে চিনিস? সামান্য চিনি। কোনো মেয়েকেই পুরোপুরি চেনা সম্ভব না। সেই চেষ্টাও করা উচিত না। একমাত্র রবীন্দ্রনাথই মেয়েদের পুরোপুরি চিনতেন। তাও দেশী মেয়ে না। বিদেশী মেয়ে।তাই না-কি?

উনার গান শুন নি।চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী।হিমু আমার সঙ্গে ফাজলামি করবি না। ওস্তাদজীর মেয়েটার কি বিয়ে হয়েছে? হুঁ।হাসবেন্ড কী করে? ডাক বিভাগে কাজ করে।মেয়েটার চুল সুন্দর না। কোঁকড়ানো চুলে মেয়েদের ভালো লাগে না। পার্লারে গিয়ে কোঁকড়ানো চুল ঠিক করা যায়।মেয়েটার সঙ্গে কি কথা বলতে চাও? কী উল্টাপাল্টা কথা বলছিস? আমি কী কথা বলব?

পার্লারে গিয়ে চুল ঠিক করার কথা বলবে।হিমু তুই খুবই বিরক্ত করছিস। আমার সামনে থেকে যা। বাজনা ফাজনা কী করার শুরু কর, ঘড়ি ধরে দশ মিনিট থাকব। তারপর চলে যাব। আমাকে শিকল দিয়ে বেঁধেও রাখতে পারবি না।আমি ওস্তাদজীর কাছে গেলাম।

ওস্তাদজীর শরীর যতটা খারাপ ভেবেছিলাম, দেখা গেল শরীর তার চেয়েও খারাপ। চোখের মণি ছোট হয়ে গেছে এবং মণি চকচক করছে। হাত কাঁপছে। তার হাতে এক লিটারের পানির বোতল। একটু পর পর গ্লাসে পানি ঢেলে পানি খাচ্ছেন। ফুলফুলিয়া চিন্তিত গলায় বলল, বাবার শরীর বেশি খারাপ। উনার বিছানায় শুয়ে থাকা দরকার।

শমসের উদ্দিন খাঁ সাহেব জ্বলজ্বলে চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, যন্ত্রণা করিস না। আমার যন্ত্রণা ভালো লাগে না।ফুলফুলিয়া বলল, যন্ত্রণা আমারও ভালো লাগে না। আমি সারাজীবন তোমার যন্ত্রণা মুখ বুজে সহ্য করেছি। এখন তুমি কিছুক্ষণ আমার যন্ত্রণা সহ্য করবে।তুই কী করবি?

আমি তোমাকে বাসায় নিয়ে যাব।

জোর করে বাসায় নিয়ে যাবি?

হ্যাঁ জোর করে বাসায় নিয়ে যাব।

Leave a comment

Your email address will not be published.