চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস পর্ব – ১৭ হুমায়ূন আহমেদ

চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস পর্ব – ১৭

রাণীর বড় ভাই তার কথা রেখেছিলেন। তাদের হিসাব মতে অতি অপদার্থ একজন ছেলের সঙ্গে বোনের বিয়ে দেবার চেষ্টা করেছেন। সেই চেষ্টায় কোন লাভ যে হয় নি তা না। একটা লাভ হয়েছে—রাণীর ভয়ংকর এক অসুখ হয়েছে। অসুখের লক্ষণ হল তাকে হঠাৎ হঠাৎ বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিতে ইচ্ছা করে। অতি সামান্য একটা ব্যাপার থেকে এত বড় অসুখ কেন হল সে জানে না। কোনদিন হয়ত জানবেও না।

রাণী গল্পের বইটা খুলল। বইয়ের ভেতর থেকে চিঠিটা আবার বের হয়ে এসেছে। তার কাছে মনে হচ্ছে—এমন একটা চিঠি যদি তার কাছে লেখা হত। কিংবা এমন যদি হত সে রাণী না, তার নাম আসমানী… রাণীর চোখ ভিজে উঠছে। কিছুক্ষণ আগেই সে অনেক হাসাহাসি করেছে এখন চোখে পানি আসবেই। কিচ্ছু করার নেই।

নান্টুর মন আজ অত্যন্ত ভাল।গত রাতে সে একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছিল। ঘুম ভাঙ্গার পর মনে হয়েছে তার জীবনে ভয়ংকর কিছু ঘটতে যাচ্ছে। এখন মনে হচ্ছে উল্টোটা ঘটবে। স্বপ্নের মধ্যে এই ব্যাপারটা আছে যা দেখা যায় তার উল্টোটা হয়। যদি কেউ দেখে সে মারা যাচ্ছে তাহলে তার হায়াত বাড়ে। নান্টু স্বপ্নের মধ্যে দেখেছে একটা ন্যাংটা পাগল তাকে তাড়া করেছে। পাগলের হাতে বর্শা।

সে কিছুক্ষণ পর পর বর্শা ছুঁড়ে মারছে। বর্শা নান্টুর গায়ে লাগছে না। ঘটনাটা বাস্তব হলে বর্শা ছুঁড়ে মারার পর পাগলের হাতে আর বর্শা থাকত না। স্বপ্নের ঘটনা বলেই বর্শার কোন অভাব হচ্ছে না।স্বপ্নের কারণেই সকালে চা খাবার সময় তার মনটা খুবই খারাপ ছিল। কিন্তু নটার দিকে তার মন অসম্ভব ভাল হয়ে গেল। শর্মিলা তাকে একটা চিঠি পাঠিয়েছে। সম্বােধনহীন চিঠি হলেও চিঠি পড়ে বোঝা যায় শর্মিলার মন গলেছে।

আমার দূর সম্পর্কের এক ভাই অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছেন। তিনি যে সব গিফট নিয়ে এসেছেন তার মধ্যে আছে এক কার্টুন অস্ট্রেলিয়ান সিগারেট। এ বাড়িতে সিগারেট খাবার লোক নেই বলে তোমাকে পাঠালাম।

ভাল কথা, তুমি কি আজ দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে একটু আসতে পারবে। তোমার সঙ্গে কিছু জরুরী কথা আছে।

ইতি—

শর্মিলা।

ক্যাঙ্গারুর দেশের সিগারেট বলেই হয়তো প্যাকেটে রূপালী রঙের ক্যাঙ্গারু। এমন অসাধারণ ঘটনা ঘটল অথচ ফরহাদকে দেখানো গেল না। সে সূর্য উঠা সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে চলে যায়। ফিরে রাত দশটার পর। মেসে এসে গোসল করে বিছানায় শুয়ে পড়ে। কোন কথা নেই, কিছু নেই। মানুষ না যেন রোবট।

যে রোবটের একটাই কাজ সকালবেলা বের হয়ে যাওয়া গভীর রাতে ফেরা। নান্টু। ধারণা সে রাতে ঘুমায়ও না। মাঝে মধ্যে নান্টু ঘুম ভেঙ্গে দেখেছে ফরহাদ চুপচাপ বিছানায় বসে আছে। সিগারেট খাচ্ছে। অন্ধকার ঘরে সিগারেটের আগুন উঠা নামা করছে।ফরহাদ থাকলে তাকে দু প্যাকেট সিগারেট দেয়া যেত।

নান্টু দশটার অনেক আগে বের হল। শহরে ট্রাফিক জ্যাম যে ভাবে বেড়েছে কোথাও যেতে হলে এক দু ঘন্টা আগে বের হতে হয়। তাছাড়া তাকে রসোমালাই কিনতে হবে। যে দোকানে ফ্রেশ রসোমালাই পাওয়া যায় সেটা আবার উল্টো দিকে। অর্ণবের জন্যেও কিছু একটা নিতে হবে। বাবাকে দেখলেই সে প্রথমে বাবার মুখের দিকে তাকায় না, তাকায় বাবার হাতের দিকে।

চট করে দেখে নেয় হাতে উপহারের কোন প্যাকেট আছে কি-না। খেলনার দোকানে পোকা মাকড় জাতীয় কোন খেলনা খোঁজ করতে হবে। বাচ্চাদের অদ্ভুত সাইকোলজি। যে সব জিনিশ তারা সবচে ভয় পায় তার খেলনা আবার তাদের জানের জান। অর্ণব সবচে ভয় পায় সাপ। অথচ রাবারের সাপ তার সবচে পছন্দের। গত জন্মদিনে তাকে একটা রাবারের সাপ দেয়া হয়েছিল সেই সাপের লেজ ধরে না থাকলে তার রাতে ঘুম হয় না। সাপ খোপ পাওয়া গেলে কিনতে হবে।দরজা খুলে দিল শর্মিলা। নান্টু বলল, কেমন আছ?

শর্মিলা বলল, ভাল।তার আজকের গলা অন্যদিনের মত বরফ শীতল না। মুখটাও মনে হচ্ছে হাসি হাসি। নান্টু বলল, সিগারেটের জন্যে ধন্যবাদ।তুমি কি চা খাবে? এক কাপ খেতে পারি। অর্ণব কোথায়? ওর জন্যে একটা প্লাস্টিকের মাকড়শা এনেছি।অর্ণব স্কুলে চলে গেছে।নান্টু সাহসে ভর করে বলে ফেলল—ওর সামারের ছুটি কবে? ওকে নিয়ে একটা প্ল্যান ছিল।কি প্ল্যান?

নান্টু হড়বড় করে বলল, ঠিক ওকে নিয়ে প্ল্যান না। তোমাদের দুজনকে নিয়েই প্ল্যান। ভাবছিলাম এই ছুটিতে তোমাদের নিয়ে নেপাল ঘুরে আসব। হিমালয় কন্যা নেপাল। ঢাকা থেকে যে খরচে কক্সবাজারে যাওয়া যায়, সেই খরচে নেপাল ঘুরে আসা যায়। বিদেশ দেখা হল। দেশ বিদেশ ঘুরলে শিশুদের জ্ঞান বৃদ্ধি হয়। নেপালের হোটেলে দুটা ঘর নিয়ে নিলাম। একটায় তোমরা মা-বেটা, একটায় আমি। ঘর পাশাপাশি নেয়ারও দরকার নেই। তোমরা থাকলে দোতলা বা তিনতলায়, আমি একতলায়।

নান্টু ভেবেছিল কথা শুনেই শর্মিলা রেগে যাবে। সে রাগল না। তবে মুখ সামান্য গম্ভীর করে ভেতরে চলে গেল। ফিরে এল চা নিয়ে। শুধু চা না। ফুট কেক আছে, রসোমালাই আছে। নান্টু এক পিস কেক হাতে নিল। মনের ভুলে কেক চায়ে ড়ুবিয়ে এক কামড় দিল। শর্মিলা দেখেও কিছু বলল না। অন্য সময় এমন একটা ব্যাপার দেখলে চোখ সরু করে তাকাতো।তুমি তাহলে আমাদের নেপাল নিতে চাচ্ছ?

দেশের ভেতরে কোথাও যদি যেতে চাও—সেখানেও নিতে পারি। কোন সমস্যা নেই।মনে হয় তোমার অনেক টাকা হয়েছে।আরে না। চাকরিই নেই। টাকা পাব কোথায়? তবে ব্যবস্থা একটা হবেই। চাকরি বাকরি আর করব না বলে ঠিক করেছি। ব্যবসা করব। ফুড বিজনেস।ফুড বিজনেস মানে?

বিরানীর দোকান দেব। বাবুর্চির সঙ্গে কথা হয়েছে। সকালে এক হাড়ি বিরানী হবে। বিকালে এক হাড়ি। মাস তিনেক বাবুর্চি রেখে রান্নার কৌশলটা শিখে ফেলব। তারপর বাবুর্চি বিদেয় করে নিজেরাই রাঁধব। বাবুর্চির খরচটা বেঁচে গেল। খুবই লাভের ব্যাপার।তাই না-কি? হাজির বিরিয়ানীতে বিরানী বিক্রি করে কোটিপতি হয়ে গেল।তোমার বিরিয়ানীর নাম কি হবে—পাজীর বিরিয়ানী?

নান্টু হা হা করে হেসে ফেলল। শর্মিলার রসিকতাটা তার খুব মনে ধরেছে। শর্মিলা যে তার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছে তার জন্যেও ভাল লাগছে। তার কোন ব্যাপারে শর্মিলা অনেক দিন এত আগ্রহ দেখায় নি। নান্টু চায়ে চুমুক দিয়ে আনন্দিত গলায় বলল, লাভটা কেমন হবে একটু বুঝিয়ে বলি——মিডিয়াম সাইজ একটা পাতিলে চাল ধরে বিশ কেজি। বেস্ট কোয়ালিটি বাসমতি চাল হল ত্রিশ টাকা কেজি। কাজেই চাল লাগছে ছয়শ টাকার। বিশ কেজি চালে লাগছে দশ কেজি মাংস। দশ কেজি খাসির মাংসের দাম পরে—কেজি একশ টাকা হিসেশে এক হাজার টাকা। হিসাবটা কি ফলো করছ?

চেষ্টা করছি।ঘি মশলাপাতি এইসব ধর পনেরোশ টাকা। কাজেই টোটেল খরচ হচ্ছে তিন হাজার টাকা। ফুল প্লেট পঞ্চাশ টাকা করে বিক্রি করলে নেট পাব ছয় হাজার টাকা। খরচ বাদ দিয়ে প্রতি পাতিলে লাভ থাকবে তিন হাজার টাকা। দুই পাতিলে ছয় হাজার টাকা। মাসে এক লক্ষ আশি হাজার টাকা। ইস্টাবলিশমেন্ট খরচ, বাবুর্চির বেতন, বয় বেয়ারা সব মিলিয়ে ধরলাম পঞ্চাশ হাজার টাকা তারপরেও মাসে নেট প্রফিট হবে এক লক্ষ ত্রিশ হাজার টাকা। ইনশাল্লাহ।

ভালতো। নান্টু আনন্দিত গলায় বলল, দোকানের নাম ঠিক করেছি অর্ণব বিরাণী হাউস।আমার ছেলের নামে বিরানীর নাম দিতে হবে না। তোমার নামে নাম দাও। নান্টু ভাইয়ের ভাই বিরানী। মামা হালিম আছে। ভাই বিরানীও হবে।নান্টু সামান্য দমে গেল। বোঝা যাচ্ছে ব্যাপারটা শর্মিলা ঠিক পছন্দ করছে না। তার চোখ সরু হয়ে গেছে। গলাও অনেক গম্ভীর শুনাচ্ছে।

শর্মিলা শীতল গলায় বলল, বাবুর্চির খরচওতো তোমার লাগবে না। তুমিতো কয়েকমাস পরে নিজেই রাঁধবে। এটা মন্দ না। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে অর্ণবের বাবা কি করেন? আমরা বলব, বাবুর্চি। আমাদের কোন খাওয়া দাওয়ার প্রয়োজন হলে তোমাকে বাবুর্চি হিসেবে ভাড়া করে নিয়ে আসব। তোমরা নিশ্চয়ই বাইরের রান্নার কাজও করবে, করবে না?

নান্টু অস্ট্রেলিয়ান সিগারেট ধরাল। ব্ৰিত গলায় বলল, তোমার পছন্দ না হলে বিরানী হাউসের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে দেব।শর্মিলা কঠিন গলায় বলল, আমার পছন্দ অপছন্দ দিয়ে দরকার কি? আমিতো তোমার কেউ না। তোমার যা ইচ্ছা তুমি করবে। তুমি বাবুর্চি হলেও কিছু না। জুতা পালিশওয়ালা হলেও কিছু না।নান্টু অনেক কষ্টে বলল, ও আচ্ছা।

শর্মিলা বলল, তোমাকে কি জন্যে ডেকেছি এখন শোন। তোমাকেতো বলে বলে আমি হয়রান হয়েছি। ইচ্ছা করেই তুমি গা করছ না। আজ আমি ঝামেলা চুকিয়ে ফেলব। রাজশাহী থেকে আমার বড় ভাই এসেছেন। উনি সব ব্যবস্থা করেছেন। আমাদের কোথাও যেতে হবে না। কিছু না। কাগজপত্র নিয়ে এখানে লোকজন আসবে। তুমি আমি একসঙ্গে সাইন করব।

নান্টু পুরোপুরি হকচকিয়ে গেল। আজকের দিনে এমন কোন ঘটনা ঘটাবে তা তার কল্পনাতেও ছিল না। নান্টু প্রায় ফিস ফিস করে বলল, তুমি কি বিয়ে করছ নাকি? শর্মিলা সহজ ভাবে বলল, হ্যাঁ করছি।তোমাদের বিয়ের পর অর্ণব কি আমার সঙ্গে থাকবে?

শর্মিলা বিরক্ত গলায় বলল, উদ্ভট কথা বলবে না। অর্ণব তোমার সঙ্গে মেসে গিয়ে উঠবে? অবসর সময়ে বিরানী হাউসের কাস্টমারদের বিরানী খাওয়াবে? প্লেট ধুয়ে দেবে। তুমি সারা জীবনে নানান ধরনের যন্ত্রণা করেছ। আর যন্ত্রণা করবে না। আরাম করে বোস। চা খেতে চাইলে বল আবার চা দিচ্ছি।

নান্টু তাকিয়ে আছে। সে কি বলবে বুঝতে পারছে না। বসার ঘরের দরজাটা খোলা। হঠাৎ উঠে দৌড়ে কি পালিয়ে যাবে? বা অন্য কিছু কি করা যায়? শর্মিলার পা চেপে ধরলে কেমন হয়? স্বামী যদি স্ত্রীর পায়ে ধরে তাতে দোষ হয় না।সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। ওরা মনে হয় চলে এসেছে। শর্মিলা বলল, দেব আরেক কাপ চা?

নান্টু বলল, দাও।রাতের স্বপ্নটার কথা মনে পড়ছে। স্বপ্নে পাগল দেখা যে এমন ভয়াবহ তা কে জানত। ঘরে একটা খোয়ব নামার বই রাখা দরকার। জটিল স্বপ্নগুলির অর্থ আগে ভাগে জানা থাকলে ধাক্কা খেতে হয় না। নান্টুর চোখে পানি এসে গেছে। শর্মিলা সামনে নেই, এটা ভাল হয়েছে। তাকে চোখের পানি দেখতে হল না।ঘরে লোকজন খাতাপত্র নিয়ে উপস্থিত হয়েছে।

নান্টু উঠে দাঁড়িয়ে হাসি মুখে বলল, আসুন আসুন।যেন সে এ বাড়িরই একজন, অতিথিকে সাদর আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।ফরহাদ আসমানীদের বসার ঘরে বসে আছে। একটা কাজের মেয়ে চা দিয়ে গেছে। সেই চা অনেকক্ষণ আগে শেষ হয়েছে। তার কাছে কেউ আসছে না। কলিংবেল টেপার পর নিশা দরজা খুলে দিয়েছে। সেই বলেছে—ভেতরে এসে বসুন। তার গলা অত্যন্ত শীতল। ফরহাদ সেই শীতল গলাকে গুরুত্ব দেয় নি। যার বোন ভয়াবহ রকম অসুস্থ তার গলায় কোন রকম উষ্ণতা থাকার কথা না।

ফরহাদ বলল, আসমানী কি বাসায়?

নিশা বলল, হুঁ।

বাসায় কখন এসেছে?

গতকাল সন্ধ্যায়।

আমি জানতাম না। আজ হাসপাতালে গিয়ে শুনি…।

আপাকে নিয়ে সিঙ্গাপুর যাওয়া হবে। এই জন্যেই চলে আসা।

কবে যাচ্ছ সিঙ্গাপুর?

এখনো ঠিক হয় নি। মামা চেষ্টা করছেন। যত তাড়াতাড়ি যাওয়া যায়।

আমি আসমানীর সঙ্গে একটু কথা বলব।

আপনি বসুন।

ফরহাদ বসেছে। এর মধ্যে এক ঘণ্টা সময় পার হয়েছে। তার চা খাওয়া হয়েছে। খবরের কাগজ পড়া হয়েছে। টেবিলে দুটা ম্যাগাজিন ছিল। সেই ম্যাগাজিনও শেষ হয়েছে। ভেতর থেকে কেউ আসে নি। চট করে ভেতরের ঘরে ঢুকে পরার অধিকার তার নেই। তাকে কেউ ডেকে না নিয়ে গেলে সে যেতে পারবে না। তাকে বাইরের গেস্টদের মত চুপচাপ বসে থাকতে হবে।

আসমানী নিশ্চয়ই তার ঘরে শুয়ে আছে। তার ঘরটা কখনো দেখা হয় নি। নিশ্চয়ই ঘরটা খুব সুন্দর করে সাজানো। আসমানী বলতো—তোমাকে আমার ঘরটা একদিন দেখাতে হবে। ঘরের মধ্যে একটা কুমারী গন্ধ আছে। যে কোন বুদ্ধিমান লোক ঘরে পা দিয়েই বুঝবে এখানে একটা কুমারী মেয়ে বাস করে।বিবাহিতা মেয়ের ঘর কি অন্যরকম?

অবশ্যই অন্যরকম। বিয়ের পর তোমাকে নিয়ে আমি যে ঘরে থাকব সেই ঘরতো আমিই সাজাব তখন ডিফারেন্সটা বুঝবে।ফরহাদ হাসতে হাসতে বলেছে, আমার তো ধারণা কোন প্রভেদ নেই। একটা হতে পারে তোমার এই ঘরে ছেলেদের কোন কাপড় নেই, এসট্রে নেই। বিয়ের পরে যে ঘরে থাকবে সেখানে আমার কাপড় থাকবে, একটা এসট্রে থাকবে।আসমানী গম্ভীর গলায় বলেছে—তুমি এখনো ধরতে পার নি।

আমি একটা ডিফারেন্সের কথা বলি——যেমন ধর কুমারী মেয়েদের দৃষ্টি থাকে ঘরের বাইরে। তারা আকাশ দেখতে পছন্দ করে। কিন্তু বিয়ের পর মেয়েদের দৃষ্টি ঘরের ভেতর কেন্দ্রীভূত হয়। কাজেই কুমারী মেয়ের খাটের অবস্থান এমন হবে যে খাটে শুয়ে আকাশ দেখা যায়। আর বিবাহিতা মেয়ের খাটটা হবে সিলিং ফ্যানের নিচে। খাটের পজিশন এমন যেন স্বামী-স্ত্রী দুজনই সমান বাতাস পায়। কেউ বেশি, কেউ কম তা যেন না হয়।ফরহাদ হাসতে হাসতে বলেছে—তুমি তুচ্ছ সব ব্যাপার নিয়ে দিনরাত ভাব তাই না?

আমি তুচ্ছ বা জটিল কোন বিষয় নিয়েই দিনরাত ভাবি না–তোমাকে নিয়ে দিনরাত ভাবি। আচ্ছা এই যে আমি দিনরাত তোমাকে নিয়ে ভাবি এই কথাটা কি তোমার বিশ্বাস হয়েছে? হ্যাঁ হয়েছে।আসমানী তখন ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে বলেছে—তোমার ব্যাপারটা কিন্তু অন্যরকম। তুমি সারাক্ষণ আমার কথা ভাব না।

তুমি নানান ধরনের ঝামেলার মধ্যে বাস কর বলে ঝামেলা নিয়ে ভাব। আমার কথা ভাব তখনই যখন আমি তোমার সামনে থাকি। এই জন্যেই তোমাকে বিয়ে করে ফেলার জন্যে আমি এত ব্যস্ত। বিয়ের পর তোমাকে বাধ্য হয়ে আমার সঙ্গে অনেক বেশি সময় থাকতে হবে। তখন বাধ্য হয়ে আমার কথা ভাবতে হবে। বলতো আমি ঠিক বললাম কি-না।

ফরহাদ উত্তর দেয় নি। তবে আসমানীর কথা সত্যি। এই যে সে এক ঘন্টা আসমানীদের বসার ঘরে বসে আছে। এই এক ঘন্টা সে শুধু আসমানীর কথা ভাবে নি। তাকে অনেক কিছু ভাবতে হয়েছে। যেমন সে বেশ কিছু সময় ধরেই তার মার কথা ভাবছে।

আসমানীদের ফ্ল্যাট বাড়ির দিকে রওনা হবার আগে ফরহাদ মা-বাবার খোঁজ নিতে গিয়েছিল। রাহেলা বেগম ছেলেকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলেছেন—নিউ মার্কেট থেকে খুব বড় একটা কাতল বা রুই মাছ কিনে দিতে পারবি? খুব দরকার। টাকা আমি দেব। এক হাজার টাকায় হবে না? এক হাজার টাকা দামের মাছ?

খুব বড় মাছ। যেন সবার চোখে পড়ে এ রকম মাছ।দরকার কি? আছে দরকার আছে। মাছটা বিকাল পাঁচটা ছটার দিকে আনবি। পারবি না।ফরহাদ শান্ত গলায় বলল, পারব কিন্তু হঠাৎ এক হাজার টাকা দামের মাছের দরকার পড়ল কেন? জামাইয়ের বাড়িতে পরে আছি, খরচ টরচ না করলে মান থাকে না।মান রক্ষার জন্যে এক হাজার টাকা দামের মাছ কত দিন কিনবে?

তোর সঙ্গে তর্কের ইসকুল খুলব না। তোকে যা করতে বলছি কর।বিকেলে আমি একটা প্রাইভেট টিউশ্যানি করি। মাছটা এখন কিনে দিয়ে যাই মা? এখন কিনলে এরা মাছটা কেটে বেঁধে ফেলবে। বড় মাছ কেটে ফেললে তার আর সৌন্দর্য কি? জামাই দেখতে পাবে না। সে অফিসে। সে বাসায় ফিরে সন্ধ্যায়।রাহেলা মাছের জন্যে এক হাজার টাকা দিলেন। গলা নামিয়ে বললেন, যদি কিছু বেশি লাগে তুই দিয়ে দিস।

ফরহাদের মন সামান্য খারাপ হয়েছে। তার মা জামাইয়ের বাড়িতে তার সম্মান নিয়ে ব্যস্ত। অন্য কিছুই এখন আর তাঁর চোখে পড়ছে না। একবার অন্তত বলতে পারতেন, তোর কি হয়েছে বলত? তোর চোখের নিচে কালি কেন? কিংবা জিজ্ঞেস করতে পারতেন, আসমানী মেয়েটা কেমন আছে? ওকে একবার দেখতে যাব। তুই আমাকে নিয়ে যা তো। খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার আসমানী সম্পর্কে কারোর কোন আগ্রহ নেই। তার বাবা এখন পর্যন্ত আসমানীর কথা কিছু জিজ্ঞেস করেন নি।

আসমানী যদি টবে লাগানো কোন জাপানী ফুলের গাছ হত, তার বাবা। নিশ্চয়ই প্রতিদিন তাকে দেখতে যেতেন।ফরহাদ ঘড়ি দেখল। দেড় ঘন্টার মত হয়েছে, সে বসে আছে। এদের সমস্যাটা কি? এরা তাকে বসিয়ে রেখেছে কেন? আসমানীর মামা বসার ঘরে ঢুকলেন। ফরহাদ উঠে দাঁড়াল। কামরুল ইসলাম সাহেবকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি সারারাত ঘুমাননি। চোখের নিচে কালি। ঠোট শুকিয়ে আছে। তিনি যে দাঁড়িয়ে আছেন সেই দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিটাও অস্বাভাবিক। কেমন যেন কুঁজো হয়ে আছেন। তাঁকে খুবই ক্লান্ত লাগছে।

ফরহাদ কেমন আছ? জি ভাল।কামরুল ইসলাম সাহেব নিজে বসলেন না, ফরহাদকেও বসতে বললেন না। কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলতে লাগলেন।অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছ, সরি। চা দিয়েছে? জি।আসমানীর শরীরটা বেশ খারাপ করেছে। এত দ্রুত এতটা খারাপ করার কথা। আমার মনে হয় —মন বিকল হয়ে গেছে। মন বিকল হলে এ রকম হয়। ভয়াবহ বিপদের সামনে দাঁড়ালে সাধারণ চিন্তাশক্তি নষ্ট হয়ে যায়…। ফরহাদ বলল, মামা আমি ওর সঙ্গে একটু কথা বলি?

কামরুল ইসলাম সাহেব ক্লান্ত নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, এইখানেই সমস্যাটা হয়েছে। ও তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছে না। এতক্ষণ তাকে বুঝাবার চেষ্টা করলাম। লাভ হয় নি।ও কি বলছে? তোমাকে তার অসুস্থ মুখ দেখাবে না। এইসব হাবিজাবি বলছে। যেহেতু সে চাচ্ছে না, আমার মনে হয় তোমার দেখা না করাই ভাল হবে। এম্নিতেই সে প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যে আছে। সেই চাপটা আর বাড়ানো ঠিক হবে না।আমি কি চলে যাব?

হ্যাঁ চলে যাও। দেশের বাইরে যাবার আগে সে যদি তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায় আমি তোমাকে খবর দেব।আমি কি বিকেলে একবার আসব? আসতে পার। তবে আমার মনে হয় না সে তোমার সঙ্গে কথা বলবে। আসমানী ভয়ংকর ধরনের জেদী মেয়ে। যা বলবে তাই।

এপার্টমেন্ট হাউসে লিফট আছে, ফরহাদ নামছে সিড়ি দিয়ে। তার কাছে মনে হচ্ছে সে নেমেই যাচ্ছে নেমেই যাচ্ছে, সিড়ি শেষ হচ্ছে না। সিড়ি দিয়ে উঠতে কষ্ট, নামতে কষ্ট না, কিন্তু এখন নামতেও কষ্ট হচ্ছে। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙ্গে আসছে। ইচ্ছে করছে রেলিং ধরে খানিকক্ষণ বিশ্রাম করতে। হঠাৎ করে খুব ঘুমও পাচ্ছে। মেসে ফিরে গিয়ে আরাম করে কিছুক্ষণ ঘুমুতে পারলে ভাল হত।

চিন্তা ভাবনাহীন নিশ্চিন্ত ঘুম। কতদিন হয়ে গেল সে আরাম করে ঘুমুতে পারছে না। ঘুমিয়ে পড়তে পারলে দরদাম করে মাছ কেনার কথা ভাবতে হবে না। নান্টু ভাইয়ের কথা ভাবতে হবে না। চিলড্রেনস রাইমস, পার্ট টুর বইটা কোথায় পাওয়া যাবে তা নিয়েও ভাবতে হবে না। ফরহাদ প্রাইভেট টিউশ্যানী শুরু করেছে। তার ছাত্রর মা চিলড্রেনস রাইমস পার্ট টু বইটা না-কি কোন দোকানে খুঁজে পাচ্ছেন না। ফরহাদের দায়িত্ব বইটার খোঁজ করা।

এক বিদেশী অষুধ কোম্পানী মেডিকেল রিপ্রেজনটেটিভ চেয়ে বিজ্ঞাপন দিয়েছে। সেখানে লেখা—বেতন ভাতা আকর্ষণীয়। ছবি এবং বায়োডাটাসহ যোগাযোগ করুন। ফরহাদের কাছে বায়োডাটা আছে। ছবি নেই। থ্রি আর সাইজের ছবি তুলতে হবে। হাসি হাসি মুখের ছবি। কাউকে দিয়ে সুপারিশ করাতে পারলে ভাল হত। কোন মন্ত্রী বা এ ধরনের ক্ষমতাবান কেউ।

তবে মন্ত্রীর সুপারিশে কাজ হবে না, কারণ পাঁচ হাজার দরখাস্ত যদি পড়ে সেই পাঁচ হাজারের মধ্যে চার হাজার দরখাস্তে মন্ত্রীর সুপারিশ থাকবে। বাংলাদেশের মন্ত্রীরা জুড়ালো সুপারিশ করতে খুব পছন্দ করেন। নতুন ধরনের কোন সুপারিশ যদি কেউ তার জন্যে করত। যেমন ধরা যাক—কবি শামসুর রাহমান সাহেব তার দরখাস্তের উপরে গোটা গোটা অক্ষরে তাকে নিয়ে দুলাইনের কবিতা লিখে সুপারিশ করলেন–

এই ছেলেটা ভাল এবং সৎ

তার বিষয়ে ইহাই আমার চিন্তিত অভিমত।

—শামসুর রাহমান

বাহ্ কবিতাটা তো ভাল হয়েছে। ফরহাদ ক্লান্ত ভঙ্গিতে হাঁটছে। প্রাণপণে চেষ্টা করছে—আসমানীর বিষয়ে এখন আর কিছু ভাববে না। কিছু না।

দিনটা কেমন মেঘলা মেঘলা। এ রকম মেঘলা দিনে আসমানীকে নিয়ে বেড়াতে বের হলেই আসমানী বার বার তাকাতো আকাশের দিকে এবং বলতো তোমার কি মনে হয় বৃষ্টি হবে? ফরহাদ বেশির ভাগ সময়ই বলতো, জানি নাতো।আমার খুব টেনশান লাগছে।কেন?

আকাশে ঘন কাল করে মেঘ হলেই আমার টেনশান শুরু হয়। যদি বৃষ্টি না হয়, যদি বৃষ্টি না হয়।টেনশানের কি আছে? সব মেঘে কি আর বৃষ্টি হয়? হয় না বলেই তো টেনশান।আসমানী আজ সঙ্গে থাকলে তার টেনশান হত। কারণ আকাশ দ্রুত কালো হচ্ছে। কালো মেঘ নিয়ে যে গানটা আছে সেটা যেন কি?

মেঘ কালো আঁধার কালো আর কলংক যে কালো।ফরহাদ নিউ মার্কেটের দিকে রওনা হল। রাইমসের বইটা কিনে, মাছ কিনতে ঢুকবে। এর মধ্যে যদি ভালমত বৃষ্টি নামে তাহলে মাছের দাম কমে যাবে। বৃষ্টির দিনে ইলিশ মাছের দাম বাড়ে। অন্য সব মাছের দাম কমে যায়।

 

Read more

চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস পর্ব – ১৮ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.