চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস শেষ – পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস শেষ – পর্ব

ফরহাদের কাছে মনে হচ্ছে সে সারাজীবন খুব পরিশ্রম করেছে। নিঃশ্বাস ফেলার মত সময়ও তার ছিল না। আজ ছুটি পাওয়া গেছে। প্রচণ্ড কর্ম ব্যস্ত এ শহরে আজ তার কাজ নেই। আজ সারাদিন রাস্তায় হাঁটা। পার্কে বসে থাকা। নাপিতের দোকানে গিয়ে চুল কাটানো, মাথা মালিশ করানো। পুরানো বন্ধুদের সঙ্গেও দেখা করা যেতে পারে। অফিসে চলে যাওয়া যায়। ক্যাশিয়ার সিদ্দিক সাহেবের সঙ্গে বসে এক কাপ চা খাওয়া যেতে পারে।

বিদেশে তার মেয়েটা কেমন পড়াশোনা করছে সে সম্পর্কে জানতে চাইতে পারে। দেশের পলিটিকস নিয়েও কথা বলা যায়। কথা বলার বিষয় বস্তুর কোন অভাব নেই।গভীর রাতে ফার্মগেট পেট্রোল পাম্পের কাছে গেলে কেমন হয়। ঐ মেয়েটিকে হয়ত সেখানে পাওয়া যাবে। নিশিকন্যারাও এক অর্থে ভিক্ষুকদের মত। ভিক্ষুকরা যেমন নির্দিষ্ট জায়গায় ভিক্ষা করে, এরাও তাই করে, নিদৃষ্ট জায়গায় সেজেগুজে št তাকে বললেই হবে অনেক দিন আগে তোমাকে দেখে হঠাৎ বুকে একটা ধাক্কার মত খেয়েছিলাম।

কারণ তোমার চেহারা দেখতে আমার অতি প্রিয় একজনের মত। তখন আমার হাতে এক হাড়ি বগুড়ার দৈ ছিল। আমার খুব ইচ্ছা করছিল দৈ এর হাড়িটা তোমাকে দিতে। কেন জানি দেয়া হয় নি। আজ নিয়ে এসেছি। আমি খুবই খুশি হব যদি তুমি দৈটা নাও। তুমি ভাল থেকো কেমন? আমার অতি প্রিয়জনের নামটা জানতে চাও? ওর নাম আসমানী। ওর কোন ছবি আমার কাছে নেই। ছবি থাকলে দেখতে ওর সঙ্গে তোমার চেহারার কি অদ্ভুত মিল।

জাহানারাদের বাড়িতে একবার যাওয়া যায়। বাবার সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয় না। ঐ বাড়িতে সে অনেকবার গিয়েছে। তাকে পাওয়া যায় নি। তিনি বাড়িতে ছিলেন না। কোন রকম কাজ কর্ম নেই মানুষ সবচে ব্যস্ত থাকে। কাজের মানুষদের বাড়ি ঘরে পাওয়া যায়। অকাজের মানুষদের কখনোই পাওয়া যায় না।জাহানারাদের বাড়ির সামনের ফাঁকা জায়গায় জোবেদ আলি কি গাছের যেন চারা পুঁতছেন। ছেলেকে দেখে বিস্মিত গলায় বললেন, আরে তুই।

ফরহাদ বলল, কেমন আছ বাবা? আমি প্রায়ই আসি। তোমার সঙ্গে দেখা হয় না। যাক আজকে দেখা হয়ে গেল। কি করছ? জমি ঠিক করছি। এ জায়গার মাটি ভাল। গাছ ঠাই ঠাই করে বড় হবে। তোর কি শরীর খারাপ না-কি। তোকে কেমন অদ্ভুত লাগছে।চুল কাটিয়েছি মনে হয় এই জন্যে।শরীরের যত্ন নিবি বুঝলি। একসারসাইজ করবি। আমার নিজের শরীরটা যে ভাল আছে তার প্রধান কারণ এই বুড়ো বয়সেও কোদাল দিয়ে মাটি কোপাই।

শরীর ঠিক রাখার জন্যে সবারই একসারসাইজ দরকার শুধু গাছের বেলায় ভিন্ন ব্যবস্থা। গাছের একসারসাইজ লাগে না।ফরহাদ হাসল। জোবেদ আলি বললেন, তোর কাছে টাকা থাকলে আমাকে শ দুই টাকা দিয়ে যা। দারোয়ানের কাছ থেকে একশ টাকা নিয়েছিলাম এই নিয়ে হুলুস্থুল ব্যাপার হয়ে গেছে। এত লোক থাকতে দারোয়ানের কাছ থেকে কেন টাকা ধার করলাম। বড়লোকের কাছ থেকে টাকা ধার করলে সমস্যা নেই। দারোয়ান টাইপ মানুষদের কাছ থেকে টাকা ধার করলেই সমস্যা। আছে তোর কাছে টাকা?

ফরহাদ দুশ টাকা বের করে দিল। জোবেদ আলি লজ্জিত গলায় বললেন, যদি থাকে আরো একশটা টাকা দিয়ে যা। ছেলের কাছ থেকে ভিক্ষুকের মত টাকা নিতে হচ্ছে। মানুষ হয়ে জন্মেছি বলে আমার এই অপমানটা হচ্ছে। মানুষ না হয়ে গাছ হয়ে জন্মালে আমার এই অপমানটা হত না। তুই কখনো শুনেছিস একটা বটগাছ, চারা বট গাছের কাছে কোন জিনিস ধার চাইছে।

গাছ ছাড়া তুমি আর কিছু ভাব না বাবা?

গাছ নিয়ে ভাবা কি অন্যায়?

ফরহাদ বাবার পাশে বসতে বসতে বলল, কোন অন্যায় না। তুমি যেহেতু মানুষ, গাছ না। সেহেতু মাঝে মধ্যে আশেপাশের মানুষদের কথাও ভাববে।ভাবি না তোকে কে বলল। ভাবিতো। খুবই ভাবি।না বাবা তুমি ভাব না। একটা মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিকঠাক হয়েছিল। দাদাজান মারা যাওয়ায় বিয়েটা হয় নি। তারপর সে অসুস্থ হয়ে পড়ল। তুমি কখনো তার কথা জানতে চাও নি। মেয়েটাকে একবার দেখতে যাওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করোনি।

জোবেদ আলি লজ্জিত গলায় বললেন, চল যাই দেখা করে আসি। আজই যাই। হাত ধুয়ে লুঙ্গি বদলে পাজামা পরে আসি। পাঁচ মিনিটের মামলা। খালি হাতে যাওয়া ঠিক হবে না। হরলিক্স, ডাব, কলা, এইসব নিয়ে যেতে হবে। তোর কাছে টাকা আছে না?

ও দেশে নেই বাবা। চিকিত্সার জন্যে বাইরে গেছে।আচ্ছা ঠিক আছে। ভাল হয়ে আসুক, তারপর ইনশাল্লাহ দেখতে যাব। তোর কাছে সিগারেট থাকলে দেতো খাই।ফরহাদ সিগারেট দিল। জোবেদ আলি সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, ঐ মেয়েটার কথা যে কিছু জিজ্ঞেস করি না, তোর মায়ের ভয়ে জিজ্ঞেস করি না। তোর মার ধারণা আমাদের সংসারে এত সব ঝামেলা যে হচ্ছে সব ঐ মেয়েটার জন্যে হচ্ছে।তার মানে?

ওর সঙ্গে বিয়ে ঠিক হবার পর থেকেই ঝামেলা শুরু হল। তোর চাকরি চলে গেল। বিয়ের দিন তোর দাদাজান মারা গেলেন। আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দিল। এখন পরের বাড়িতে অনুদাস হয়ে আছি।তুমি কি মার কথা বিশ্বাস কর?

তুই পাগল হয়েছিস? তোর মা যখন সত্যি কথা বলে তখনো আমি বিশ্বাস করি না। ঐ দিন মঞ্জু টাকার জন্যে এসেছিল—কি কান্নাকাটি। তোর মা তাকে একটা পয়সা দেয় নি। শেষে সে এসেছে আমার কাছে। আমি জন্মদাতা পিতা। বিপদে পড়লে আমার কাছেতো আসবেই। কাঁদতে কাঁদতে বলল, বাবা আমাকে টাকা জোগাড় করে দাও।ফরহাদ বিস্মিত হয়ে বলল, ওর টাকা দরকার কেন?

জানি না কেন। আজকাল আমি কিছু জানতে চাই না। জানতে চেয়েতো কোন লাভ নেই। কিছু করতে পারব না। শুধু শুধু জেনে কি হবে। চা খাবি রে ব্যাটা? চা? বাড়িতে চা খেয়ে লাভ নেই, বাসার সামনে একটা রেস্টুরেন্ট আছে চল। সেখানে বাপ বেটায় চা খাই। ওরা চা-টা ভাল বানায়।চল যাই। জোবেদ আলি ক্লান্ত গলায় বললেন, এখানে আমি ভালই আছি। আমার কোন অসুবিধা হচ্ছে না। কাজে কর্মে ব্যস্ত আছি। তবে মাঝে মধ্যে পুরানো দিনের কথা মনে হয়। তখন মনটা খুব খারাপ হয়। পুরানো কোন কথা?

তুই যখন চাকরি করতি। ঢাকার বাইরে থেকে গভীর রাতে বাসায় ফিরতি। বাপ ব্যাটা এক সঙ্গে ভাত খেতাম। মনে নেই ঔ যে কাতল মাছের বিরাট এক মাথা তুই আমার পাতে তুলে দিলি। তবে এইসব ভেবে মন খারাপ করি না। মন খারাপ করলেতো কোন লাভ নেই। শুধু শুধু মন খারাপ করব কেন?

নান্টু ভাই পোলাও রান্না করছেন। পোলাও এবং মুরগির কোরমা। তাঁকে খুবই আনন্দিত মনে হচ্ছে কারণ অর্ণব খাটে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। আজ রাতে সে। বাবার সঙ্গে থাকবে। অর্ণব গভীর আগ্রহে বাবার কর্মকান্ড দেখছে। নান্টু ভাই। ছেলের আগ্রহ দেখেও মজা পাচ্ছেন। তিনি ফরহাদের জন্যে অপেক্ষা করছেন। ফরহাদ এলে তাকে ডিম আনতে পাঠাবেন। ফার্মের ডিম না, দেশী ডিম।

ডিমের পুডিং বানাতে হবে। ডিমের পুডিং ছেলের খুব পছন্দ। রান্না শেষ করেই ভিডিওর দোকানে যেতে হবে। মিকি মাউসের ক্যাসেট আনতে হবে। খাওয়া দাওয়ার পর বাবা বেটা মিলে ক্যাসেট দেখা হবে। যে ভাবেই হোক ছেলেকে আনন্দে রাখতে হবে। আজ অর্ণবের দুঃখের দিন। কারণ আজ সন্ধ্যায় তার মার বিয়ে। মা-বাবার দ্বিতীয় বিয়েতে ছেলে মেয়ের উপস্থিত থাকা নিষিদ্ধ। সেই জন্যেই বোধ হয় শর্মিলা এত সহজে ছেলেকে ছেড়ে দিয়েছে।নান্টু বলল, মনটা খারাপ না-কি রে ব্যাটা?

অর্ণব বলল, না।কখনোই কোন কিছু নিয়ে মন খারাপ করবি না। সব সময় Do ফুর্তি।অর্ণব পা দুলাতে দুলাতে বলল, আচ্ছা।আর এই যে আমি এক জায়গায় থাকছি, তোর মা অন্য জায়গায় থাকছে। এটাও কোন ব্যাপার না। তোর জন্যে বরং লাভ। তুই একটা জায়গার বদলে দুটা জায়গা পাচ্ছিস।

হুঁ।অর্ণবকে এখন কেন জানি অবোধ শিশু মনে হচ্ছে না। সে কেমন বয়স্ক মানুষের মত গম্ভীর ভঙ্গিতে বসে আছে। নান্টুর মনে হচ্ছে অর্ণবের সঙ্গে জটিল সংসারিক বিষয় নিয়ে আলাপ করা যায়, এবং আলাপ করাই উচিত। এই পৃথিবীতে সবচে বড় বান্ধবী হয় মা এবং কন্যা, এবং সবচে বড় বন্ধু পিতা ও পুত্র। দুই বন্ধু জটিল আলাপ যদি না করে, কে করবে?

অর্ণব।

হুঁ।

তোর মার আজ যে বিয়ে হচ্ছে সেই লোকটা কেমন?

হুঁ।

তোকে আদর করে?

হুঁ।

বেশি?

হুঁ।

আমার চেয়েও বেশি?

একটু বেশি।

ছেলের শেষ উত্তরটা নান্টুর ভাল লাগল না। নিজেকে সে এই ভেবে সান্তনা দিল যে ছেলে মানুষ, না ভেবে চিন্তে কথা বলছে। সে ঠিক করে রাখল যে ছেলেকে সত্যি ভালবাসা এবং নকল ভালবাসার মধ্যে প্রভেদটা বুঝতে হবে। তবে এখন না, একটু বড় হলেই বুঝতে হবে। সব কিছুরই একটা সময় আছে।তোর মা আমার সম্পর্কে তোকে কিছু বলে? না।ভাল মন্দ কিছুই বলে না?

অর্ণব বাবার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পা নাচাতে নাচাতে বলল–পেপসি খাব।নান্টু বলল, একটু ধৈর্য ধরে বস বাপধন। তোর ফরহাদ চাচু চলে আসবে। সে এলেই তাকে পেপসি আর ডিম আনতে পাঠাব। ডিমের পুডিং বানাব। ডিমের পুডিং কি তোর পছন্দ? হুঁ।ফরহাদ চাচুকে কি পছন্দ?

হুঁ।ফরহাদ খুবই ভাল ছেলে। এরকম ভাল ছেলে বাংলাদেশে নাই। ভাল ছেলেদের কপালে দুঃখ থাকে। এই জন্যে তার কপালেও দুঃখ।নান্টু আশা করেছিল ছেলে বলবে, কেন দুঃখ? অর্ণব তা করল না। সে আগের মতই পা দুলাতে লাগল। নান্টুর ইচ্ছা করছে ফরহাদের দুঃখ কষ্ট নিয়ে ছেলের সঙ্গে আলাপ করতে। অল্প বয়স থেকেই মানুষের দুঃখ কষ্ট সম্পর্কে ধারণা হওয়া দরকার। তাহলে বয়স কালে দুঃখী মানুষের প্রতি মমতা হয়।

নান্টু গরম ঘিয়ে চাল দিয়ে নাড়তে নাড়তে বলল, যে মেয়েটির সঙ্গে ফরহাদ চাচুর বিয়ের কথা হয়েছিল তার একটা ভয়ংকর অসুখ করেছে। খুবই ভয়ংকর অসুখ। সে চিকিৎসার জন্যে দেশের বাইরে গেছে। বুঝতে পারছিস? হুঁ।তোর ফরহাদ চাচুর খুব ইচ্ছা ছিল সেও সঙ্গে যাবে। টাকা নেই যাবে কি ভাবে? এখন সে পাগলের মত রাস্তায় হাঁটে। রাতে ঘুমায় না।

যতবারই আমার ঘুম ভাঙ্গে আমি দেখি সে চুপচাপ বিছানায় বসে আছে। আমার চোখে পানি এসে যায়।অর্ণব বলল, বাবা পেপসি খাব।ধৈর্য ধর বাবা। একটু ধৈর্য ধর। জীবনে বড় হতে হলে ধৈর্য ধরতে হয়। ধৈর্য ইংরেজি কি জানিস? পেশেন্স। আমার ধৈর্য ছিল না বলে—আজ এই দশা। টিভি দেখবি। টিভি ছেড়ে দেব? না।এটা ভাল। দিনরাত টিভি দেখা কোন কাজের কথা না। চোখের ক্ষতি হয়।

নান্টু পোলাও এ পানি দিয়ে পাতিলের মুখে ঢাকনা দিয়ে ছেলের কাছে এসে বসল। সে সামান্য উদ্বিগ্ন। কারণ ভাজা চালে গরম পানি দেয়ার কথা, সে দিয়েছে ঠাণ্ডা পানি। পোলাও হয়ত বা নরম হয়ে যাবে।অর্ণব।হুঁ।তোর ফরহাদ চাচুর জন্যে আজ একটা সুসংবাদ আছে। সে মেসে এলেই সুসংবাদটা দেব তারপর দেখব সে কত খুশি হয়। সুসংবাদটা কি জানতে চাস?না।

এটাতো বাবা ঠিক না। মানুষের সুখের সংবাদ, দুঃখের সংবাদ সব জানার আগ্রহ থাকতে হবে। সুসংবাদটা হল তোর ফরহাদ চাচুর জন্যে আমি টাকা জোগাড় করেছি। এখন শুধু একটা পাসপোর্ট করিয়ে প্লেনে তুলে দেয়া। পাসপোর্ট বের করা একদিনের মামলা। ইনশাল্লাহ আগামী পরশুর ফ্লাইটে তাকে তুলে দেব। বাবা কাজটা ভাল করেছি না? জানি না।

খবরটা যখন তাকে দেব সে যে কি খুশি হবে এটা ভেবেই আনন্দে আমার চোখে পানি এসে যাচ্ছে। খুব যখন আনন্দ হয় তখন মানুষের চোখে পানি আসে। তোর আসে না বাবা? না।এখন না এলেও পরে আসবে। পৃথিবীর সবচে পবিত্র পানি কি জানিস বাবা?

না।মনের আনন্দে চোখে যে পানি আসে সেই পানি পৃথিবীর সবচে পবিত্র পানি।বাবা পেপসি খাব।আর দশটা মিনিট পোলাটা নামিয়ে আমি নিজেই যাব।আমিও যাব।অবশ্যই যাবি। তোকে ফেলে যাব না-কি? বাবারে আমি কাউকে ফেলে যাই না। লোকজন আমাকে ফেলে যায়।

নান্টু ঘড়ি দেখল। নটা বাজে। শর্মিলার বিয়ে হয়ত হয়ে গেছে। দ্বিতীয় বিয়েতো কোন জাকজমকের বিয়ে না। দায়সারা বিয়ে। কাজির সামনে দুটা সিগনেচার। তারপর শুকনা খোরমা চিবানো। নান্টুর বিয়ের সময় খোরমা বাদ পড়ে গিয়েছিল। সব আনা হয়েছে। খোরমা আনা হয় নি। কন্যা পক্ষের একজন খুব হৈ চৈ শুরু করল—খোরমা আনতে হয় এটা জানেন না?

খোরমা নিয়ে হৈ চৈ করলেও কনের গয়না দেখে সবাই খুশি। পুরানো আমলের ভারী ভারী গয়না। খাদ কম সোনা বেশি। একটু চাপ দিলে গয়না বেঁকে যায়। সবই নান্টুর মায়ের গয়না। নান্টুর মা খুব অভাবে অনাটনে দিন কাটালেও তার বিয়ের একটি গয়না হাত ছাড়া করেন নি। ছেলের বৌকে কোন একদিন দেবেন বলে যক্ষের মত আগলে রেখেছিলেন।

নান্টু আজ সকালে খুব একটা খারাপ কাজ করেছে। শর্মিলার কাছ থেকে মার গয়না চেয়ে নিয়ে এসেছে। শর্মিলা এতে নিশ্চয়ই মনে কষ্ট পেয়েছে। কষ্ট পেলেও কিছু করার নেই। গয়না বিক্রি করে টাকার ব্যবস্থা না করলে ফরহাদকে আসমানীর কাছে পাঠানো যেত না।

নান্টুর মনে হল বেহেশতে বসে তার মা তার উপর খুব রাগ করছেন। বিরক্ত গলায় বলছেন—নান্টু তুই কেমন ছেলে বলতো। গয়না চেয়ে নিয়ে চলে এলি? মেয়েটার কাছেই থাকতো। অর্ণবের বিয়ের সময় সে গয়নাগুলি অর্ণবের বৌকে দিত। গয়না যে বিক্রি করলি এখন অর্ণবের বৌকে কি দিবি?

নান্টু মনে মনে প্রশ্ন করল, মা কাজটা কি খুব ভুল করেছি? নান্টুর মনে হল তার মা বলছেন—তুই আমার পাগলা ছেলে। ভুল তুই করবি নাতো কে করবে? ব্যাটা শোন, ভুল করে মনে যদি আনন্দ পায় তাহলে ভুলগুলিই শুদ্ধ।অর্ণব বিস্মিত হয়ে দেখছে তার বাবার চোখে পানি। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, বাবা কাঁদছ কেন?

নান্টু বলল, রান্নার সময় চোখে ধোঁয়া লেগেছে। এই জন্যে চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। কাঁদছি নাতো। আমি কাঁদব কেন? নান্টু অবাক হয়ে দেখল তার ছেলের ঠোট বেঁকে যাচ্ছে। বাবার কান্না দেখে ছেলের কান্না পেয়ে যাচ্ছে। অর্ণব প্রাণপণ চেষ্টা করছে কান্না সামলাবার। পারছে না। এইতো ছেলের চোখে পানি।

নান্টু ছেলেকে কাছে টেনে নিল। তার মনে হল এই পৃথিবীতে তারচে সুখী মানুষ আর কেউ নেই।পেট্রোল পাম্পের মেয়েটা অবাক হয়ে মানুষটাকে দেখছে। সুন্দর একজন মানুষ। লম্বা, ফর্সা। দৈয়ের হাড়ি হাতে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কি সুন্দর করেই না কথা বলছে। যেন সে রাস্তার কোন মেয়ে না। দ্রঘরের কোন মেয়ে। তাকে তুমি তুমি করেও বলছে না। আপনি করে বলছে।

অনেকদিন আগে আপনাকে দেখেছিলাম। তখন আমার হাতে এক হাড়ি দৈ ছিল। আমার ইচ্ছা ছিল আপনাকে দৈটা দেব। সেদিন দেয়া হয় নি। আজ নিয়ে এসেছি। আপনি যদি নেন তাহলে আমি খুব খুশি হব। আমার নাম ফরহাদ।মেহেরুন্নিসা নামের নিশিকন্যা হাত বাড়িয়ে দৈ নিল। ক্ষীণ গলায় বলল, আমারে দৈ দেওনের ইচ্ছা ক্যান হইল?

ফরহাদ বলল, আপনি দেখতে আমার অতি প্রিয় একজনের মত। সে খুব অসুস্থ। দেশের বাইরে গেছে চিকিৎসার জন্যে। তার কথা খুব মনে পড়ছে বলেই আপনার কথা মনে পড়েছে।আপনি তার কাছে যান না ক্যান?

টাকা ছিল না বলে যেতে পারি নি। পরে অবশ্যি আমার এক বন্ধু টাকা জোগাড় করেছিলেন। কিন্তু টাকাটা আমার ভাইকে দিতে হয়েছে। ও মহাবিপদে পড়েছিল–টাকাটা পাওয়ায় উদ্ধার পেয়েছে।মেহেরুন্নিসা সহজ ভাবে বলল, আপনের ভালবাসার মানুষটার নাম কি? ফরহাদ বলল, তার নাম আসমানী। নামটা সুন্দর না?

বলতে বলতে ফরহাদের গলা ধরে এল। মেহেরুন্নিসা বলল, বৃষ্টি আসতেছে ভাইজান। আপনে ঘরে যান। আমি খুবই খারাপ একটা মেয়ে। তারপরেও আমি আপনেরে বললাম, দেখবেন আপনার ভালবাসার মানুষ আপনার কাছে ফিরা আসব।

বৃষ্টি নেমেছে। বৃষ্টি নামলেই লোকজন আশ্রয়ের খুঁজে এদিক এদিক ছুটে যায়। ফরহাদ সে রকম কিছু করল না। বৃষ্টির ভেতর সে এগুচ্ছে। তার মধ্যে কোন ব্যস্ততা নেই।আসমানী একবার বলেছিল, এই যে বাবু সাহেব শুনুন। একবার আমরা ঝুমঝুমা বৃষ্টিতে হাত ধরাধরি করে রাস্তায় হাঁটব। বৃষ্টি বিলাস করব। কেমন?

ফরহাদ বলল, আচ্ছা।

মনে থাকে যেন?

আমার মনে থাকবে।

ফরহাদের মনে আছে।

তার মনে থাকলেতো কিছু যায় আসে না। বিশ্বব্রহ্মান্ডের যিনি নিয়ন্ত্রক–তাঁর কি মনে আছে? তাঁর হয়তো মনে নেই। মানুষের মনে স্বপ্ন ঢুকিয়ে দিয়ে তিনি হয়ত দূরে সরে যান। কিংবা কে বলবে তিনি হয়ত দূরে যান না। খুব কাছেই থাকেন। স্বপ্ন ভঙ্গের যন্ত্রণায় মানুষ যখন ছটফট করে, তিনিও করেন। কারণ এইসব স্বপ্নতো তিনিই তৈরি করেছেন। স্বপ্ন ভঙ্গের কষ্ট অবশ্যই তাঁকেও সইতে হবে।

ফরহাদ পেছনে তাকালো মেয়েটা ঠিক আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে ভিজছে। একটুও নড়ে নি। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সেই দৃষ্টিতে গভীর মমতা। বৃষ্টি হচ্ছে। আসমানী একবার বলেছিল—বৃষ্টি হল মেঘের অশ্রু। মেঘ কাঁদছে, কারণ মেঘমালার জন্মই হয়েছে কাঁদার জন্যে।

 

Read more

অরণ্য পর্ব – ১ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.