ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১৭)-হুমায়ুন আহমেদ

‘চোখের নিচে কালি পড়েছে। মুখ শুকনাে। কী ব্যাপার ? ‘কোনাে ব্যাপার না মামা।

ছায়াসঙ্গী ‘গালটাল ভেঙে কী অবস্থা। তুই কথাও তাে কেমন অন্য রকম ভাবে বলছিস। 

কী রকম ভাবে বলছি ? ‘মনে হচ্ছে তাের গলাটা ভাঙা।’ ‘ঠাণ্ডা লেগেছে মামা।। প্রিয়াংকা কয়েকবার কাশল। মামাকে বােঝাতে চাইল যে তার সত্যি সত্যি কাশি হয়েছে, অন্যকিছু না। মামা আরাে গম্ভীর হয়ে গেলেন। শীতল গলায় বললেন, আর কিছু না তাে ? 

‘না।’ ঠিক করে বল।। “ঠিক করেই বলছি। 

প্রিয়াংকার কথায় তার মামা খুব আশ্বস্ত হলেন বলে মনে হলাে না । সারাক্ষণ গম্ভীর হয়ে রইলেন। চায়ের কাপে দুটা চুমুক দিয়েই রেখে দিলেন। যাইরে মা’ বলেই কোনােদিকে না তাকিয়ে হনহন করে চলে গেলেন। মামা চলে যাবার এক ঘণ্টার ভেতরই মামি এসে হাজির। বােঝাই যাচ্ছে মামা পাঠিয়ে দিয়েছেন। 

মামি প্রিয়াংকাকে দেখে আঁতকে উঠলেন। প্রায় চেঁচিয়ে বললেন, এক সপ্তাহ আগে তােকে কী দেখেছি আর এখন কী দেখছি ? কী ব্যাপার তুই খােলাখুলি বল তাে। কী সমস্যা ? 

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১৭)-হুমায়ুন আহমেদ

প্রিয়াংকা শুকনাে হাসি হেসে বলল, কোনাে সমস্যা না। 

মামি কঠিন গলায় বললেন, তুই বলতে না চাইলে আমি কিন্তু জামাইকে জিজ্ঞেস করব। জামাই আসবে কখন ? 

‘ও আসবে রাত আটটার দিকে। ওকে কিছু জিজ্ঞেস করতে হবে না মামি । আমিই বলছি। 

‘বল, কিছু লুকোবি না। প্রিয়াংকা প্রায় ফিসফিস করে বলল, আমি ভয় পাই মামি। ‘কিসের ভয়?’ 

কী যেন দেখি। নিজেও ঠিক জানি না কী দেখি। 

ভাসাভাসা কথা বলবি না। পরিষ্কার করে বল কী দেখিস।’ প্রিয়াংকা এক পর্যায়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল, মামি আমি বােধহয় পাগল হয়ে গেছি । আমি কীসব যেন দেখি । 

সে কী দেখে তা তিনি অনেক প্রশ্ন করেও বের করতে পারলেন না । প্রিয়াংকা অন্যসব প্রশ্নের জবাব দেয় কিন্তু কী দেখে তা বলে না ! এড়িয়ে যায় বা কাঁদতে শুরু করে। 

‘তাের কি বর পছন্দ হয়েছে ? 

হ্যা । ‘সে কি তােকে ভয়-টয় দেখায় ? 

কী যে তুমি বল মামি, আমাকে ভয় দেখাবে কেন ? রাতে কি তােরা একসঙ্গে ঘুমাস ?’ প্রিয়াংকা লজ্জায় বেগুনি হয়ে গিয়ে বলল, হ্যা। 

সে কি তােকে অনেক রাত পর্যন্ত জাগিয়ে রাখে ?’ কীসব প্রশ্ন তুমি কর মামি! ‘আমি যা বলছি তার জবাব দে।’ না, জাগিয়ে রাখে না। 

মামি অনেকক্ষণ থাকলেন। প্রিয়াংকাদের ফ্ল্যাটে ঘুরে ঘুরে দেখলেন । কাজের মেয়ে এবং কাজের ছেলেটির সঙ্গে কথা বললেন। কাজের মেয়েটির নাম মরিয়ম। দেশ খুলনা। ঘরের যাবতীয় কাজ সেই করে। কাজের ছেলেটির নাম জিতু মিয়া। তার বয়স নয়-দশ। এদের দুজনের কাছ থেকেও খবর বার করার চেষ্টা করা হলাে।

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১৭)-হুমায়ুন আহমেদ 

‘আচ্ছা মরিয়ম, তুমি কি ভয়-টয় পাও? 

না । ভয় পামু ক্যা ? ‘রাতে কিছু দেখটেখ না?’ 

কী দেখমু ?’ ‘আচ্ছা ঠিক আছে— যাও। 

প্রিয়াংকার মামি কোনাে রহস্য ভেদ করতে পারলেন না। তাঁর খুব ইচ্ছা ছিল জাভেদের সঙ্গে পুরাে ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করবেন, পরামর্শ করবেন। প্রিয়াংকার জন্যে পারা গেল না। সে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, মামি তুমি যদি তাকে কিছু বল তাহলে আমি কিন্তু বিষ খাব। আল্লাহর কসম বিষ খাব। নয়তাে ছাদ থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ব। 

তিনি কিছু জিজ্ঞেস করলেন না কারণ প্রিয়াংকা সত্যি বিষ-টিষ খেয়ে ফেলতে পারে। আমার মৃত্যুর জন্যে কেউ দায়ী নয়’ এই কথা লিখে একবার সে এক বােতল ডেটল খেয়ে ফেলেছিল। অনেক ডাক্তার হাসপাতাল করতে হয়েছে। এই কাণ্ড সে করেছিল অতি তুচ্ছ কারণে। তার এক বান্ধবীর সঙ্গে ঝগড়া করে। এই মেয়ের পক্ষে সবই সম্ভব। তাকে কিছুতেই ঘটানাে উচিত নয়। 

জাভেদ এল রাত সাড়ে আটটার দিকে। জাভেদের সঙ্গে খানিকক্ষণ টুকটাক গল্প করে প্রিয়াংকার মামি ফিরে গেলেন। তাঁর মনের মেঘ কাটল 

হলাে কী প্রিয়াংকার ? সে কী দেখে ? | প্রিয়াংকা নিজে জানে না তার কী হয়েছে। মামি চলে যাবার পর তার বুক ধকধক করা শুরু হয়েছে। অল্প অল্প ঘাম হচ্ছে। অসম্ভব গরম লাগছে। কিছুক্ষণ পরপর মনে হচ্ছে বােধহয় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। 

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১৭)-হুমায়ুন আহমেদ

তারা খাওয়াদাওয়া করে রাত সাড়ে দশটার দিকে ঘুমুতে গেল। জাভেদ বিছানায় শােয়ামাত্র ঘুমিয়ে পড়ে। আজ তাই হলাে। জাভেদ ঘুমুচ্ছে। তালে তালে বিশ্বাস পড়ছে। জেগে আছে প্রিয়াংকা। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার পানির পিপাসা পেল। প্রচণ্ড পানির পিপাসা। পানি খাবার জন্যে বিছানা ছেড়ে নামতে হবে। যেতে হবে পাশের ঘরে কিন্তু তা সে করবে না । অসম্ভব। কিছুতেই না। পানির তৃষ্ণায় মরে গেলেও না। এই পানি খেতে গিয়েই প্রথমবার তার অসুখ ধরা পড়েছিল। ভয়ে ঐদিনই সে মরে যেত । কেন মরল না ? মরে গেলেই ভালাে হতাে। তার মতাে ভীতু মেয়ের মরে যাওয়াই উচিত। 

ঐ রাতে সে বেশ আরাম করে ঘুমাচ্ছিল। হঠাৎ বৃষ্টি হবার কারণে চারদিক বেশ ঠাণ্ডা। জানালা দিয়ে ফুফুরে বাতাস আসছে। ঘুমুবার জন্যে চমৎকার রাত। একঘুমে সে কখনাে রাত পার করতে পারে না। মাঝখানে একবার তাকে উঠে পানি খেতে হয় কিংবা রাথরুমে যেতে হয়। সেই রাতেও পানি খাবার জন্যে উঠল। জাভেদ কাত হয়ে ঘুমুচ্ছে। গায়ে পাতলা চাদর দিয়ে রেখেছে। অদ্ভুত অভ্যাস মানুষটার, যত গরমই পড়ক গায়ে চাদর দিয়ে রাখবে। প্রিয়াংকা খুব সাবধানে গায়ের চাদর সরিয়ে দিল। আহা আরাম করে ঘুমুক । কেমন ঘেমে গেছে।

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১৭)-হুমায়ুন আহমেদ 

স্বামীকে ডিঙিয়ে বিছানা থেকে নামল। স্বামীকে ডিঙিয়ে ওঠানামা করা ঠিক হচ্ছে না। হয়তাে পাপ হচ্ছে। কিন্তু উপায় কী, প্রিয়াংকা ঘুমােয় দেয়ালের দিকে। খাট থেকে নামতে হলে স্বামীকে ডিঙাতেই হবে। 

তাদের শােবার ঘর অন্ধকার, তবে পাশের ঘরে বাতি জ্বলছে। এই একটা বাতি সারারাতই জুলে, ঘরটা জাভেদের লাইব্রেরি ঘর। এই ঘরেই জাভেদ পরীক্ষার খাতা দেখে, পড়াশােনা করে। ঘরে আসবাবপত্র তেমন কিছু নেই। একটা বুকশেলফে কিছু বই, পুরনাে ম্যাগাজিন। একটা বড় টেবিল। টেবিলের উপর রাজ্যের পরীক্ষার খাতা । একটা ইজিচেয়ার। ইজিচেয়ারের পাশে সাইড টেবিলে টেবিল-ল্যাম্প। 

দরজার ফাক দিয়ে স্টাডিরুমের আলাের কিছুটা প্রিয়াংকাদের শােবার ঘরেও আসছে, তবুও ঘরটা অন্ধকার। স্যান্ডেল খুঁজে বের করতে অনেকক্ষণ মেঝে হাতড়াতে হলাে। স্যান্ডেল পায়ে পরামাত্র পাশের ঘরে কিসের যেন একটা শব্দ হলাে। 

ভারী অথচ মৃদু গলায় কেউ একজন কাশল, ইজিচেয়ার টেনে সরাল। নিশ্চয়ই মনের ভুল। তবু প্রিয়াংকা আরাে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। না আর কোনাে শব্দ নেই। শুধু সদর রাস্তা দিয়ে দ্রুতবেগে ট্রাক যাওয়া-আসা করছে। তা হলে একটু আগে পাশের ঘরে কে শব্দ করছিল ? অবিকল নিশ্বাস নেবার শব্দ। প্রিয়াংকা দরজা ঠেলে পাশের ঘরে ঢুকেই জমে পাথর হয়ে গেল। ইজিচেয়ারে জাভেদ বসে আছে। হাতে বই।

জাভেদ বই থেকে মুখ তুলে তাকাল। নরম গলায় বলল, কিছু বলবে ? কতটা সময় পার হয়েছে ? এক সেকেন্ডের একশাে ভাগের এক ভাগ, না অনন্তকাল ? প্রিয়াংকা জানে না। সে শুধু জানে সে ছুটে চলে এসেছে শােবার ঘরে— ঝাঁপিয়ে পড়েছে বিছানায়। তার সমস্ত শরীর কাঁপছে- সে কি অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে ? নিশ্চয়ই অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। ঘর দুলছে, চারদিকের বাতাস অসম্ভব ভারী ও উষ্ণ। জাভেদ জেগে উঠেছে। সে বিছানায় পাশ ফিরতে ফিরতে বলল, কী ? 

Leave a comment

Your email address will not be published.