ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১৯)-হুমায়ুন আহমেদ

বিছানায় যে-মানুষটা শুয়ে আছে এই মানুষটাই সেই জাভেদ। তার পরনে জাভেদের মতােই লুঙ্গি, হাতকাটা গেঞ্জি । মুখ গম্ভীর ও বিষন্নছায়াসঙ্গী প্রিয়াংকা ছুটে শােবার ঘরে চলে এল। কোনােমতে বিছানায় উঠল ঐ তাে জাভেদ ঘুমুচ্ছে। গায়ে চাদর টানা— এতক্ষণ যা দেখেছি ভুল দেখেছি। যা শুনেছি তাও ভুল। কিছু-একটা আমার হয়েছে। ভয়ংকর কোনাে অসুখ। সকাল হলে আমার এই অসুখ থাকবে না। আল্লাহ তুমি সকাল করে দাও। খুব তাড়াতাড়ি সকাল করে দাও। সব মানুষ জেগে উঠুক। সূর্যের আলােয় চারদিক ভরে যাক। সে জাভেদকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল । জাভেদ ঘুম-ঘুম গলায় বলল, কী হয়েছে? 

সকালবেলা সত্যি সব স্বাভাবিক হয়ে গেল। রাতে এরকম ভয় পাওয়ার জন্যে লজ্জা লাগতে লাগল । জাভেদ কলেজে চলে যাবার পর সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মরিয়মকে তরকারি কাটায় সাহায্য করতে গেল । মরিয়ম বলল, আফার শইল কি খারাপ? 

‘না।’ ‘আফনের কিছু করন লাগত না আফা। আফনে গিয়ে হুইয়া থাকেন। ‘এইমাত্র তাে ঘুম থেকে উঠলাম, এখন আবার কী শুয়ে থাকব ? ‘চা বানায়া দেই ?’ 

‘দাও। আচ্ছা মরিয়ম, তােমার আগের আপাও কি আমার মতাে চা খেত ? 

‘হ। তয় আফনের মতাে চুপচাপ থাকত না। সারাদিন হইচই করত। গান-বাজনা করত।‘মারা গেলেন কীভাবে? 

‘হঠাৎ মাথা খারাপ হইয়া গেল। উল্টাপাল্টা কথা কওয়া শুরু করল—কী জানি দেখে। প্রিয়াংকা শঙ্কিত গলায় বলল, কী দেখে ? 

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১৯)-হুমায়ুন আহমেদ

দুইটা মানুষ নাকি দেখে। একটা আসল একটা নকল । কোনটা আসল কোনটা নকল বুঝতে পারে না।’ 

‘তুমি কী বলছ তাও তাে আমি বুঝতে পারছি না!’ ‘পাগল মাইনষের কথার কি ঠিক আছে আফা ? নেন চা নেন। 

প্রিয়াংকা মাথা নিচু করে চায়ের কাপে ছােট ছােট চুমুক দিচ্ছে। একবারও মরিয়মের দিকে চোখ তুলে তাকাচ্ছে না। তার ধারণা, তাকালেই মরিয়ম অনেক কিছু বুঝে ফেলবে। বুঝে ফেলবে যে প্রিয়াংকারও একই অসুখ হয়েছে । সে চায় না মরিয়ম কিছু বুঝুক। কারণ তার কিছুই হয়নি। অসুখ করেছে। অসুখ কি মানুষের করে না ? করে। আবার সেরেও যায় । তারটাও সারবে। 

রাত গভীর হচ্ছে। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে টুপ টুপ করে । খােলা জানালায় হাওয়া আসছে । প্রিয়াংকা জাভেদকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। তার চোখে ঘুম নেই। 

পাশের ঘরে বইয়ের পাতা ওলটানাের শব্দ হচ্ছে। এই যে সিগারেট ধরাল। সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ ভেসে আসছে। ইজিচেয়ার থেকে উঠল কঁাচ ক্যাচ শব্দ হচ্ছে ইজিচেয়ারে । 

প্রিয়াংকা স্বামীকে সজোরে জড়িয়ে ধরে কাঁপা গলায় ডাকল, এই-এই। ঘুম ভেঙে জাভেদ বলল, কী ? প্রিয়াংকা ফিসফিস করে বলল, কিছু না। তুমি ঘুমাও। 

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১৯)-হুমায়ুন আহমেদ

জমির সাহেব অফিস থেকে ফেরামাত্রই তার বড় মেয়ে মিতু বলল, বাবা আজ তােমার একটা চিঠি এসেছে। বলেই সে মুখের হাসি গােপন করার জন্যে অন্যদিকে তাকাল। 

মিতুর বয়স একুশ। এই বয়সের মেয়েদের মুখে অকারণে হাসি আসে। হাসি তামাশা জমির সাহেবের একেবারেই পছন্দ নয়, বিশেষ করে মা-বাবাকে নিয়ে হাসাহাসি । আজকাল অনেক পরিবারেই তিনি এই ব্যাপার দেখেন। মেয়ে বাবার সঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছে খিলখিল করে হাসছে। এসব কী ? তিনি একবার তার এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেই বন্ধুর মেয়ে বাবাকে নিয়ে খুব হাসি তামাশা করতে লাগল।

এক পর্যায়ে বলে ফেলল, বাবা দিন-দিন তােমার চেহারা সুন্দর হচ্ছে। রাস্তায় বের হলে নিশ্চয়ই মেয়েরা তােমার দিকে তাকায়। জমির সাহেব স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তার নিজের মেয়ে হলে চড় দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিতেন। অন্যের মেয়ে বলে কিছু বলা গেল না। তবে ঐ বন্ধুর বাড়িতে যাওয়া তিনি ছেড়ে দিলেন। 

মিতু চিঠিটি বাবার দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল, বেয়ারিং চিঠি বাবা । দুটাকা দিয়ে চিঠি রাখতে হয়েছে। বলে আবার ফিক করে হেসে ফেলল। 

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১৯)-হুমায়ুন আহমেদ

জমির সাহেব কঠিন গলায় বললেন, হাসছিস কেন ? বেয়ারিং চিঠি এসেছে এর মধ্যে হাসির কী হলাে? এরকম ফাজলামি শিখছিস কোথায় ? 

মিতু মুখ কালাে করে চলে গেল । বাবাকে সে সঙ্গত কারণেই অসম্ভব ভয় পায়। জমির সাহেব লক্ষ করলেন খামের মুখ খােলা। এরা চিঠি পড়েছে। এই বেআদবিও সহ্য করা মুশকিল। একজনের চিঠি অন্যজন পড়বে কেন ? খামে তার নাম লেখা দেখার পরেও এরা কোন সাহসে চিঠি খােলে ? রাগে জমির সাহেবের গা কাপতে লাগল। এই অবস্থায় তিনি চিঠি পড়লেন। একবার, দুবার, তিনবার।

তার মাথা ঘুরতে লাগল। সুস্মিতা নামের এক মেয়ের চিঠি। তাঁর কাছে লেখা । সম্বােধন হচ্ছে প্রিয়তমেষু । এর মানে কী ? সুস্মিতা কে ? সুস্মিতা নামের কাউকেই তিনি চেনেন বলে মনে করতে পারলেন না। কলেজে পড়ার সময় কমলা নামের এক মেয়ের প্রতি খুব দুর্বলতা অনুভব করেছিলেন। মেয়েটির বিয়ে হয়ে যাবার পর দুর্বলতা কেটে যায়। এ ছাড়া অন্য কোনাে মেয়েকে তিনি চেনেন না। জমির সাহেব কপালের ঘাম মুছে চতুর্থবারের মতাে চিঠিটি পড়লেন।

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১৯)-হুমায়ুন আহমেদ

প্রিয়তমেষু, 

তুমি কেমন আছ ? তােমার কথা খুব মনে হয়। তােমার শরীর এত খারাপ হয়েছে কেন? শরীরের আরাে যত্ন নেবে। আমি দেখেছি তুমি বাসে যাওয়া-আসা কর । তােমাকে অনুরােধ করছি সপ্তাহখানেক বাসে উঠবে না । কাল তােমাকে নিয়ে একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছি। দুঃস্বপ্নটা হচ্ছে তুমি বাসে উঠতে গিয়ে পিছলে পড়ে পা ভেঙে ফেলেছ। স্বপ্নকে গুরুত্ব দেয়ার কোনাে মানে হয় না। তবু অনুরােধ করছি এক সপ্তাহ বাসে উঠবে না । 

বিনীতা তােমার সুস্মিতা। 

জমির সাহেব পঞ্চমবারের মতাে চিঠি পড়তে শুরু করলেন। মােটা নিবের কলমে গােটাগােটা অক্ষরের চিঠি। চিঠিতে তারিখ বা ঠিকানা নেই। হলুদ রঙের কাগজ। কাগজ থেকে হালকা ন্যাপথালিনের গন্ধ আসছে। 

বাবা তােমার চা। | মিতু চায়ের কাপ এনে বাবার সামনে রাখল। তার মুখ থমথম করছে। বাবার ধমকের কথা সে এখনও ভুলতে পারেনি। জমির সাহেব মেয়ের দিকে তাকিয়ে অস্বস্তির সঙ্গে বললেন, কে লিখল কিছুই বুঝতে পারছি না। সুস্মিতা নামের কাউকে চিনি না। 

 মিতু বলল, চিনি হয়েছে কি না দ্যাখাে । 

Leave a comment

Your email address will not be published.