ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(৫)-হুমায়ুন আহমেদ

হােটেল ছেড়ে দিয়ে শহরতলিতে একটা বেশ বড় বাড়ি ভাড়া করে বসলাম । এক জজসাহেব শখ করে বাড়ি বানিয়েছিলেন।ছায়াসঙ্গী তার শখ হয়তাে এখনও আছে, ছেলেমেয়েদের শখ মিটে গেছে। এ-বাড়িতে কেউ আর থাকতে আসে না। 

একজন কেয়ারটেকার-কাম মালী-কাম দারােয়ান আছে। বাড়ির পুরাে দায়িত্ব তার। লােকটিকে দেখেই মনে হয় বদলােক। আমাকে যে বাড়িভাড়া দিয়েছে মনে হচ্ছে নিজ দায়িত্বেই দিয়েছে। ভাড়ার টাকা মালিকের কাছে পৌছাবে বলে মনে হলাে না। ওটা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। পৌছলে পৌছবে, না পৌছলে নেই। আমার এমাস থাকার কথা সেটা থাকতে পারলেই হলাে। নিরিবিলি বাড়ি, আমার খুবই পছন্দ হলাে। লেখালেখির জন্যে চমৎকার। 

কেয়ারটেকারের নাম ইয়াকুব। বয়স পঁয়তাল্লিশের কাছে । রিপালসিভ ধরনের চেহারা, তবে গলার স্বরটা অতি মধুর। আমি একাই এ-বাড়িতে থাকব শুনে সে বিস্মিত গলায় বলল, স্যার কি সত্যি সত্যি একা থাকবেন ? 

হা।। ‘বিষয়টা কী ? ‘বিষয় কিছু না। পড়াশােনা করব । লেখালেখি করব।’ 

‘আর খাওয়াদাওয়া ? হােটেল এইখানে পাবেন কোথায় ? সেই যদি শহরে যান। পাঁচ মাইলের ধাক্কা। 

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(৫)-হুমায়ুন আহমেদ

রান্না করে দেবে এমন কাউকে পাওয়া যায় না ? টাকা-পয়সা দেব।’ আপনি বললে আমি রাঁধব। খেতে পারবেন কি না সেটা হলাে কথা। ‘পারব। খাওয়া নিয়ে আমার কোনাে খুঁতখুঁতানি নেই। ‘আরেকটা জিনিস বলে রাখি স্যার । মুরগি ছাড়া কিন্তু কিছু পাওয়া যায় । হাটবারে মাছটাছ পাওয়া যায়। হাটবারের দেরি আছে। আর চালটা স্যার একটু মােটা আছে। আপনার নিশ্চয়ই চিকন চাল খেয়ে অভ্যাস। | চিকন চাল খেয়ে অভ্যাস ঠিকই, মােটা চালে অসুবিধা হবে না। তবে ভাত যেন শক্ত না হয়। শক্ত ভাত খেতে পারি না।’ 

দেখা গেল লােকটি রান্নায় দ্রৌপদী না হলেও তার কাছাকাছি । দুপুরে খুব ভালাে খাওয়াল । রাতেও নতুন নতুন পদ করল। আমি বিস্মিত। রাতে খেতে খেতে বললাম, এত ভালাে রান্না শিখলে কোথায় ? | ইয়াকুব গম্ভীর মুখে বলল, আমার স্ত্রীর কাছে শিখেছি। খুব ভালাে রাঁধতে পারত। 

‘পারত বলছ কেন ? এখন কি পারে না ? 

ইয়াকুব গম্ভীর হয়ে গেল। ভাবলাম নিশ্চয়ই খুব ব্যক্তিগত কোনাে ব্যাপার । এখন আর প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে না। তবে সহজেই নিজেকে সামলে নিল। সহজ স্বরে বলল, এখন পারে কি পারে না জানি না স্যার। আমার সঙ্গে থাকে না। 

‘কোথায় থাকে ? 

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(৫)-হুমায়ুন আহমেদ

জানি না কোথায় থাকে। ওর চরিত্র খারাপ ছিল। এর তার সাথে যােগাযােগ ছিল। বিশ্রী অবস্থা। বলার মতাে না। অনেক দেনদরবার করেছি, কিছু লাভ হয় নাই। তারপর সাত বছরের দুই মেয়ে ঘরে রেখে পালিয়ে গেছে, বুঝে দেখেন কত বড় হারামি । 

কতদিন আগের কথা ? বছর দুই। ‘কোনাে খবর পাওয়া যায়নি ? ‘মােড়লগঞ্জ বাজারে নাকি দেখা গিয়েছিল আমার কোনাে আগ্রহ ছিল । খোজ নেই নাই।’ 

এদের জীবনের এইজাতীয় কিচ্ছাকাহিনী শুনতে সাধারণত ভালােই লাগে। আমার লাগল না । আমাদের সবার জীবনেই একান্ত সমস্যা আছে। সেইসব নিয়ে মাথা ঘামালে চলে না। কিন্তু ইয়াকুব মনে হলাে কথা বলবেই। 

‘জীবনে বড় ভুল কী করেছিলাম জানেন স্যার ? সুন্দরী বিয়ে করেছিলাম। ডানাকাটা পরী বিয়ে করেছিলাম। 

বউ খুব সুন্দরী ছিল ? 

‘আগুনের মতাে ছিল। আগুন থাকলেই পােকামাকড় আসে। তাই হয়। আমার জীবন হলাে অতিষ্ঠ । একদিন মােড়লগঞ্জের বাজারে গেছি, ফিরে এসে দেখি সদরদরজা বন্ধ । অনেকক্ষণ ধাক্কাধাক্কি করলাম, কেউ দরজা খােলে না । শেষে ধুপ করে জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে কে যেন দৌড় দিল । আমি বউরে বললাম এ কে ? বউ বলল, আমি কী জানি কে ? 

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(৫)-হুমায়ুন আহমেদ

ইয়াকুব একের পর এক বউয়ের কীর্তিকাহিনী বলতে লাগল, আমি একসময় বিরক্ত হয়ে বললাম 

ঠিক আছে বাদ দাও এসব কথা । 

বাদ দিতে চাইলেও বাদ দেয়া যায় না। তিনবার সালিশি বসল। সালিশিতে ঠিক হলাে বউরে তালাক দিতে হবে। তালাক দিলাম না। মন মানল না। তার ওপর যমজ মেয়ে আছে। এর ফল হইল এই…’ 

স্ত্রী কোথায় আছে তুমি জান না ? ‘জী না।। ‘কী নাম মেয়েদের ? 

যমজ মেয়ে হয়েছিল জনাব। তুহিন একজনের নাম, তুষার আরেকজনের নাম। নাম রেখেছিল মেয়ের মা। 

‘ভালাে, খুব ভালাে। 

‘কোনােকিছু দরকার লাগলে এদের বলবেন। মেয়েরা এইখানেই থাকে, ডাক দিলেই আসবে। 

না, আমার কিছু লাগবে না। 

বিরক্ত করলেও বলবেন। থাবড়া দিয়ে গাল ফাটায়ে দিব। মেয়েগুলি বেশি সুবিধার হয় নাই। মায়ের খাসলত পেয়েছে। সারাদিন সাজগােজ । এই পায়ে আলতা, এই ঠোটে লিপস্টিক। 

স্কুলে পড়ে না ? ‘আরে দূর– পড়াশােনা! এরা যায় আর আসে। 

মেয়ে দুটিকে আমার অবিশ্যি খুবই পছন্দ হলাে। দুজনই হাস্যমুখ । সারাক্ষণ হাসছে। সবসময় সেজেগুজে আছে। কাজেরও খুব উৎসাহ। যদি 

বলি, এই এক গ্লাস পানি দাও তাে। অমনি ছুটে যাবে। দুজনই দুহাতে দুটা পানিভরতি গ্লাস নিয়ে এসে বলবে, চাচা আমারটা নেন। চাচা আমারটা নেন। আধ গ্লাস পানি খেলেই যেখানে চলত সেখানে বাধ্য হয়ে দু’গ্লাস খাই যাতে মেয়ে দুটোর কোনােটাই কষ্ট না পায়। 

স্নেহ নিম্নগামী। যত দিন যেতে লাগল বাচ্চা দুটিকে আমার ততই পছন্দ হতে লাগল । ছােটখাটো কিছু উপহার কিনে দিলাম । দুজনের জন্যে দুটা রং পেন্সিলের সেট, ছােট ছােট আয়না। যা-ই পায় আনন্দে লাফায়। বড় ভালাে লাগে দেখতে। ঐ বাড়িতে দেখতে দেখতে এগারাে দিন কেটে গেল। বারাে দিনের দিন একটা ঘটনা ঘটল। ঘটনাটা বলার আগে পারিপার্শ্বিক অবস্থার একটা বর্ণনা দিয়ে নিই। 

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(৫)-হুমায়ুন আহমেদ

আমার বাড়িটা পশ্চিমমুখী। বাড়ির সামনে এবং পেছনে আমন ধানের মাঠ। বাড়ির উত্তরে জংলা ধরনের জায়গা। একসময় নিবিড় বাঁশবন ছিল, এখন পাতলা হয়ে গেছে। দক্ষিণে উলকিবাড়ির বিশাল বাগান। সেই বাগানে আম, জাম, লিচু থেকে শুরু করে আতাফলের গাছ পর্যন্ত আছে । একজন বেঁটেখাটো দাড়িওয়ালা মালী সেই বাগান পাহারা দেয়। আমার সঙ্গে দেখা হলেই গভীর বিনয়ের সঙ্গে জানতে চায় স্যারের শইলডা কি ভাললা ? ঘুমের কোনাে ডিসটাব হয় না তাে ? 

আমি প্রতিবারই বিস্মিত হয়ে বলি, ঘুমের ডিসটার্ব হবে কেন ? ‘শহরের মানুষ হঠাৎ গেরামে আইস্যা পড়লেন। এইজন্যে জিগাই। ‘আমার ঘুম, খাওয়াদাওয়া কোনােকিছুতেই কোনাে অসুবিধা হচ্ছে না।’ 

‘অসুবিধা হইলে কইবেন। ভয়ডর পাইলে ডাক দিবেন। আমার নাম বদরুল । আমি রাইতে ঘুমাই না। জাগান থাকি । 

‘ঠিক আছে বদরুল। যদি কখনাে প্রয়ােজন বােধ করি তােমাকে ডাকব।’ 

| বারাে দিনের দিন প্রয়ােজন বােধ করলাম । দিনটা সসামবার। সকাল থেকেই মেঘলা ছিল। দুপুর থেকে তুমুল বর্ষণ শুরু হলাে। এর মধ্যে ইয়াকুব এসে বলল, স্যার একটা বিরাট সমস্যা। তুহিনের গলা ফুলে কী যেন হয়েছে, নিশ্বাস নিতে পারছে না। ওকে তাে স্যার ডাক্তারের কাছে নেয়া দরকার। 

আমি তৎক্ষণাৎ মেয়েটাকে দেখতে গেলাম। খুবই খারাপ অবস্থা, শুধু গলা না, সমস্ত মুখ ফুলে গেছে। কী কষ্টে যে নিশ্বাস নিচ্ছে সে-ই জানে। মেয়েটার শরীর এত খারাপ অথচ এরা আমাকে কিছুই বলেনি। আমার মনটাই খারাপ হয়ে গেল । 

আমি বললাম, এক মুহুর্ত দেরি করা ঠিক হবে না। তুমি এক্ষুনি মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে যাও। 

‘স্যার আপনার খাওয়াদাওয়া।। 

‘আমার খাওয়াদাওয়া নিয়ে তােমাকে কিছু চিন্তা করতে হবে না। চাল ফুটিয়ে নিতে পারব।

Leave a comment

Your email address will not be published.