• Wednesday , 3 March 2021

জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুল-শেষ পর্ব- হুমায়ূন আহমেদ

শেষ পর্যন্ত সরকারি চিঠি এসেছে। আগের চিঠির মেমো নাম্বার উল্লেখ করে সরকার জানাচ্ছে,জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল স্কুলের ছাত্র সংখ্যা আশংকাজনকভাবে কমিয়া গিয়াছে। শিক্ষক সংখ্যাও অপ্রতুল। এই অবস্থায় সরকারী অনুদান কাজে আসিবে কি আসিবে না তাহা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন। বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্যে ময়মনসিংহের ডেপুটি কমিশনারকে আহবায়ক করিয়া একটি কমিটি গঠন করা হইয়াছে। পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটিকে আগামী তিন মাসের ভিতর স্কুল সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ বিপোর্ট দেবার জন্যে অনুরোধ করা যাইতেছে।

ফজলুল করিম সাহেব দীর্ঘ সময় চিঠিটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। সব চিঠিই তিনি কয়েকবার করে পড়েন। শুধু এই চিঠিটিই একবার পড়লেন। আগামীকাল থেকে গরমের ছুটি শুরু হবে। আজ শেষ ক্লাস। ছুটির আগের শেষ ক্লাসে ছাত্ররা সব আনন্দ করে। আজ কিছুই হচ্ছে না। সব কেমন মরা। মরা। ছাত্রই নেই প্রাণ আসবে কোত্থেকে, স্কুলের প্রাণ হচ্ছে তার ছাত্র। দালান কোঠা তো স্কুলের প্রাণ না।

মওলানা সাহেব সন্ধ্যাবেলা হেডমাস্টার সাহেবের ঘরে এসে বললেন, স্যার বাসায় যাবেন না?আপনি চলে যান। আমি একটু পরে যাব।আপনার কি শরীর খারাপ করেছে?না। এমনিতেই ভাল লাগছে না।মামুন সাহেবের একটা চাকরি হয়েছে শুনেছেন বোধহয়।না শুনিনি–কোথায় চাকরি হয়েছে?সরকারী কলেজের লেকচারার। বরিশাল বিএম কলেজ। ইন্টারভ্যু দিয়ে এসেছিলেন। গতকাল চিঠি এসেছে।উনার না এখানে নিরিবিলিতে থেকে বি সি এস পরীক্ষার জন্যে তৈরী হবার কথা। বি, সি,এস দিচ্ছেন না।

আমাকে বললেন–বি সি এস দেবেন না। মাষ্টারী করবেন। খুব খুশী।খুশী হবারই কথা।আপনাকে কিছু জানাননি?প্রথমেই তো বলেছি জানায়নি। একই প্রশ্ন দুবার তিনবার করে কেন করেন।ভুল হয়ে গেছে স্যার ক্ষমা করে দেবেন। ক্ষমা করলাম। আপনার কথা শেষ হয়ে থাকলে চলে যান। আমি নিরিবিলিতে কিছুক্ষণ বসে থাকব।দুটা কথা বাকি আছে। বলেই চলে যাব। প্রথম কথাটা হল। এস,এস, সি ছাত্রদের কোচিং এর ব্যাপারে আপনি যা বলেছেন সেটা করা সম্ভব বলে আমার ধারণা। আমি মামুন সাহেবকে নিয়ে একটা পরিকল্পনা করেছি। শিক্ষকদের ডিউটি ভাগ করা হয়েছে। স্কুলের লাইব্রেরী ঘরে ছাত্ররা থাকবে।

এতগুলি ছাত্র লাইব্রেরী ঘরে থাকবে কি ভাবে?সব ছাত্র না–আমরা ৫ জন বেছে নিব। প্রথম পাঁচ জন।সেটা হবে না। একজনের জন্যে যে ব্যবস্থা বাকিদের জন্যেও একই ব্যবস্থা।মামুন সাহেব বলেছিলেন যে আপনি পাঁচজনের ব্যাপারে রাজি হবেন। সবাইকে নিয়ে একটা পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেখানে একটা ক্লাস ঘর খালি করে দিতে হবে। মামুন সাহেব পুরো ব্যাপার দেখবেন।

কলেজের চাকরি নিয়ে চলে যাচ্ছেন–তাহলে দেখবেন কি ভাবে?এস. এস. সি পরীক্ষা পর্যন্ত উনি থাকবেন। পরীক্ষার পর কলেজে জয়েন করবেন। আমার সঙ্গে সে রকম কধ্যা হয়েছে।ও আচ্ছা।খুব কর্মী ছেলে। একাই একশ। উনি থাকলে আর কিছু লাগবে।উনি নিজে থেকে রাজি হয়েছেন না আপনি বলে কয়ে ঠিক করেছেন?

নিজ থেকে রাজি হয়েছেন। আমাকে কিছু বলতে হয়নি। কলেজের এপয়েনমেন্ট লেটার পেয়ে খানিকক্ষণ খুশীতে খুব লাফালাফি করলেন তারপর আমাকে বললেন–মওলানা সাহেব, আমাদের হেডমাষ্টার সাহেব স্কুলটা নিয়ে একা একা যুদ্ধ করছেন। যুদ্ধে প্রায় পরাজিত। আমি একজন ভাল সৈনিক। এই সময়ে আমি তাকে ছেড়ে চলে যাব তা হয় না। এস, এস, সি পরীক্ষা পর্যন্ত দেখে যাবেন। তার যতটুকু সাধ্য করবেন।

ভাল।আমার স্যার আরেকটা কথা বাকি, ঐটা শেষ করে চলে যাব।বলুন।একটা ভাল ছেলে পাওয়া গেছে স্যার।ভাল ছেলে পাওয়া গেছে মানে কি? যা বলার গুছিয়ে বলুন।রেশমীর জন্যে একটা ছেলে পেয়েছি। দোকানে কাজ করে।ও আচ্ছা।ছেলেটিকে খবর দিয়ে এনেছি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। আপনি তার সঙ্গে কথা বলবেন?না।অন্য কোন সময় আসতে বলব?মওলানা ইতস্তত করে বললেন, নানান ধরনের কথা হচ্ছে। নানান রটনা।কি রটনা?এইসব কথা মুখ ফুটে আপনাকে বলা সম্ভব না।

বলা সম্ভব না হলে বলবেন না।জ্বি আচ্ছা।মওলানা সাহেব এই সমস্যা নিয়ে আপনাকে আর মাথা ঘামাতে হবে। স্কুলের সমস্যা নিয়ে ভাবুন।জ্বি আচ্ছা।যাবার সময় দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে যাবেন।মওলানা সাহেব দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে চলে গেলেন। জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল স্কুলের হেডমাষ্টার ফজলুল করিম সাহেবের চোখে পানি এসে গেছে। তিনি চোখের পানি মুছলেন না। কারণ চোখে যে পানি এসেছে তা তিনি নিজে বুঝতে পারেন নি।

ফজলুল করিম সাহেব তেমন কিছু খাচ্ছেন না। প্লেটের ভাত নাড়াচাড়া করছেন। প্লেটে ডাল নিতে গিয়েও নিলেন না। অথচ সজনে দিয়ে ব্রাধা ডাল তার অতি প্রিয়। রেশমী বলল, আপনার কি হইছে?কিছু হয় নাই। আমার ক্ষিধা একেবারেই নাই।দুপুরে স্কুলে কি খাইছেন?দুপুরে কিছু খাইনি। এই জন্যেই মনে হয় পিত্ত পড়ে গেছে। কিছু খেতে ভাল লাগছে না।জ্বর জ্বারি হয় নাই তো?

রেশমী ফজলুল করিম সাহেবের কপালে হাত রাখল। ফজলুল করিম সাহেবের মনে হল উত্তাপ দেখতে যতটুকু সময় লাগে রেশমী যেন তার চেয়ে বেশি সময় হাত কপালে রাখল।আপনি কি কিছু নিয়া চিন্তিত? উঁহুঁ।নতুন স্কুলে না-কি আপনার স্কুলের সব ছাত্র চইল্যা যাইতেছে। তা যাচ্ছে।রেশমী হাসি মুখে বলল, খালি স্কুল নিয়ে আপনি বইস্যা আছেন। দোকান আছে, দোকানদার আছে সওদা নাই।হাসি তামশা কিছু হয়নি রেশমী। হসিবে না।

মনের ভুলে হাসছি। পান দাও রেশমী, পান খাব।রেশমী পান এনে দিল। ফজলুল করিম সাহেব পান মুখে দিতে দিতে বললেন, খালি স্কুল আবার পূর্ণ হবে।ক্যামনে হবে? এবার এসএসসির রেজাল্ট হলেই দেখবে ছাত্র ছাত্রীরা আবার আসতে শুরু করেছে।কেন?ষ্টান্ড করবে। অবশ্যই করবে। গ্রামের স্কুল থেকে স্ট্যান্ড করলে সবার নজর পড়বে স্কুলের দিকে। আমাদের কয়েকজন ভাল ছাত্র এইবার আছে। এর মধ্যে একজন আছে–খুবই ভাল। শুধু হাতের লেখাটা খারাপ। লেখাটা যদি একটু ভাল হত।ছাত্রটা কে বদরুল আলম

ফজলুল করিম সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন,তুমি জান কিভাবে? রেশমী হাসিমুখে বলল, আপনার স্কুলে কি হইতেছে না হইতেছে আমি জানব না?অবশ্যই জানবে। কেন জানবে না?আপনে স্কুল নিয়া অত চিন্তা কইরেন না। অত চিন্তার কি আছে?চিন্তা করব না কি বল তুমি। স্কুল যদি উঠে যায়?উঠে গেলে কি আর করণ। দুনিয়ায় কিছু টিক্যা থাকে না।ফজলুল করিম সাহেব তাকিয়ে রইলেন। রেশমী বলল, একটা স্কুল চইল্যা গেলে চইল্যা যাবে। আরেকটা নয়া স্কুল হইছে। আফনে আমার একটা কথা হুনবেন?

কি কথা?আফনে গিয়া নীলগঞ্জ ইস্কুলের হেডমাস্টার হন।নতুন স্কুলের হেডমাস্টার হব?হুঁ। আপনের ছাত্র পড়ানি দিয়া কথা। কোন ইস্কুল সেইটা দিয়া দরকার কি? তার উপরে এমন না যে এই ইস্কুল আফনে বানাইছেন।ফজলুল করিম সাহেব আহত গলায় বললেন, এই নিয়ে আমি তোমার সঙ্গে তর্ক করতে চাচ্ছি না। চুপ কর। যা জান না তা নিয়ে তর্ক করাও ঠিক TI

রেশমী আহত গলায় বলল, আমি হইলাম দাসী বান্দি–আমার জানা অজানার দাম কি?সে তার ঘরে দরজা জানালা বন্ধ করে বসে রইল। রাতে ভাত খেল না। ফজলুল করিম সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন, আজকাল তোমার হয়েছে কি বল তো দেখি–কথায় কথায় রাগ।রেশমী জবাব দিল না।এরকম করলে কিন্তু আমি চলে যাব। স্কুল ঘরে রাত কাটাব। সেটা ভাল হবে

রেশমী দরজা খুলে বের হয়ে এল। সে কাঁদছিল। তার গাল ভেজা। ভেজা গাল সে মুছল না। ভেজা গালেই খেতে বসল। ফজলুল করিম সাহেব মোড়া টেনে তার পাশে বসলেন। রেশমী বলল, কেউ চাইয়া থাকলে আমি খাইতে পারি না। আপনে অন্য ঘরে গিয়ে বসেন। তিনি নড়লেন না। রেশমীর কোন কথা তিনি শুনতে পাচ্ছেন বলে মনে হল না। তিনি তাকিয়ে আছেন রেশমীর দিকে, কিন্তু ভাবছেন অন্য কথা। পাশ বই-এ তাঁর কিছু টাকা আছে। গ্রামের বসতবাড়ি-সম্পত্তি বিক্রি করে নগদ টাকা রেখে দিয়েছিলেন ভবিষ্যতের জন্যে। নব্বই হাজারের মত। সুদ টদ নিয়ে সেই টাকা এখন বেড়ে এক লাখ তিরিশ হাজার হয়েছে। এই টাকা ব্যবহার করা যেতে পারে। তার স্ত্রীর কিছু গয়না আছে। সামান্যই–গয়না এখন আর কি কাজে আসবে? সকাজ তো তেমন কিছু তিনি করেননি। সামান্য সৎকাজ করা হল।

স্কুলের কত ছাত্র দেশে বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এদের কাছে কোনমতে খবরটা পৌছাতে পারলেও তো কাজ হবে।রেশমী বলল, কি ভাবেন?না কিছু ভাবি না।আপনে দিন রাইত ভাবেন। অত ভাইব্যা ফয়দা নাই। যা হওনের হইব।ফজলুল করিম জবাব দিলেন না। যা হবার তা হবে ঠিকই–তবু চেষ্টা করে যেতে হবে।

বেতন দিতে না পারলে স্কুলের শিক্ষকরা থাকবেন না। শিক্ষক না থাকলে ছাত্র থাকবে না… আচ্ছা সিরাজ সাহেবের সঙ্গে একবার দেখা করলে কেমন হয়? তিনিও তো সাহায্যের কথা বলেছিলেন। তিনি যদি তার মার নামে স্কুল না দিয়ে কলেজ দিতেন তাহলে খুব ভাল হত। ছাত্ররা তার স্কুল থেকে পাশ করে পাশেই কলেজে ভর্তি হয়ে যেতে পারত।

চা খাইবেন? এটু চা বানাইয়া দেই?দাও।রেশমী চা বানাতে বানাতে বলল, চিন্তায় চিন্তায় আফনের চউক্ষের নিচে কালি জমছে। আফনের অত কি চিন্তা? এই ইস্কুল কি আফনের একলার ইস্কুল?স্কুল সবার। কিন্তু আমি হচ্ছি স্কুলের প্রধান।বারান্দায় বসে ফজলুল করিম সাহেব চা খাচ্ছেন। একটু দূরে খুঁটিতে হেলান দিয়ে রেশমী বসে আছে। রেশমী হাসছে। অকারণেই খিলখিল করে হাসছে। হাসির কোন কথা তো হয়নি। মেয়েটা হাসছে কেন? ফজলুল করিম সাহেব বললেন, হাস কেন?রেশমী মুখে আঁচল চাপা দিতে দিতে বলল, নিজেই জানি না ক্যান হাসি। আফনে যখন ঘরে থাকেন না তখন আরো বেশি হাসি। হি হি হি।

হাসি সামলাবার জন্যে রেশমী ঘরে ঢুকে গেল। চায়ের কাপ হাতে অস্বস্তি ও বিস্ময় নিয়ে ফজলুল করিম সাহেব বসে রইলেন। তাঁর ইচ্ছা করছে রাতে একবার স্কুলে যেতে! লাইব্রেরী ঘর খালি করে চারটা ছেলেকে রাখা হয়েছে। ওরা পড়াশোনা কেমন করছে না করছে দেখা দরকার। অবশ্যি শিক্ষকদের ডিউটি ভাগ করে দেয়া হয়েছে। মৌলানা ইরতাজউদ্দিন রাত এগারোটা পর্যন্ত থাকবেন। আবার ফজর ওয়াক্তে ফজরের নামাজের পর ছাত্রদের ঘুম থেকে ডেকে তুলবেন। খুব ভোরবেলা অংক করার জন্য সবচে ভাল সময়। বিনয় বাবু নীলগঞ্জ স্কুলে যোগ দিলেও ভোরবেলা এসে অংক করিয়ে দেন। অনেকদিন বিনয় বাবুর সঙ্গে দেখা হয় না। লজ্জায় পড়েই বোধ হয় বিনয় বাবু তাকে এড়িয়ে চলেন। নীলগঞ্জ স্কুলে গিয়ে একবার বিনয় বাবুর লজ্জা ভাঙ্গিয়ে দিয়ে আসতে হবে। জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল স্কুলের সুদিন যদি আসে বিনয় বাবু ফিরেও আসতে পারেন। তার মত অংক জানা একজন লোক থাকা স্কুলের জন্যে বিরাট ব্যাপার।

রেশমী।জ্বি।একটু স্কুলে যাচ্ছি।এই রাইতে?দেখে আসি ছেলেগুলি কি করে। তাছাড়া রাতের খাবারের পর একটু হাঁটাহাটি করা শরীরের জন্যে ভাল। কথায় আছে আফটার ডিনার ওয়াক এ মাইল।চলেন যাই।ফজলুল করিম বললেন, তুমিও যাবে?সুন্দর চান্নি পসর রাইত। হাঁটতে ইচ্ছা করতাছে।ফজলুল করিম সাহেব চুপ করে রইলেন। রেশমী বলল, নয়া ইস্কুলে কি–কি দোলনা বসাইছে–দেইখ্যা আসি।

ফজলুল করিম সাহেব বললেন, দোলনা, সি সো স্লাইড এইসব বসিয়ে পার্কের মত করেছে। ছাত্ররা খেলাধুলা করে। আমরাও ইনশাআল্লাহ্ বসাব। তুমি কি সত্যি যাবে?হুঁ।চল তাহলে।কাপড়টা বদলাইয়া একটা ভাল কাপড় পরি।

রেশমী স্কুল ঘরে ঢুকল না। স্কুলের বাইরে বকুল গাছের নীচে দাঁড়িয়ে রইল। ফজলুল করিম সাহেব একাই গেলেন। মওলানা ইরতাজউদ্দিন আছেন। বারান্দায় জায়নামাজ পেতে তসবি পড়ছেন। ছেলেরা হারিকেন জ্বালিয়ে পড়ছে। হরিপদও আছে। তার এখন দিন রাত্রি ডিউটি। রাতে বারান্দায় মশারি খাটিয়ে শুয়ে থাকে। ছাত্রদের কখন কি দরকার হয়। রাতে তার ভাল ঘুম হয় না। সে ভূতের ভয়ে অস্থির থাকে। লাইব্রেরী ঘরেই সে জীবন বাবুর ভুত দেখেছিল। ছাত্রদের সে এই ঘটনা বলেনি। বাচ্চা মানুষ শুধু শুধু ভয় পাবে, কি দরকার।

মওলানা জায়নামাজ থেকে উঠে এলেন। ফজলুল করিম সাহেব বললেন, পড়াশোনা চলছে ঠিক মত?জি চলছে। আপনার আসার দরকার ছিল না। অনেকটা পথ। এসেছেন কিভাবে? হেটে?হুঁ। চাঁদনী আলোয় হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছি। চলুন ছেলেদের দেখে আসি।চলুন যাই, আপনাকে দেখলে ওরা উৎসাহ পাবে।

ছেলেরা হেড স্যারকে দেখে অভিভূত হয়ে গেল। মওলানা বললেন, তোমরা এমন পাথরের মুর্তির মত বসে আছ কেন? স্যারের পা ছুঁয়ে সালাম কর। দোয়া পাবে। দোয়াটা খুব দরকার। আল্লাহ্ পাক বলেছেন–আমি যাহাকে ইচ্ছা সম্পদ দেই। যাহাকে ইচ্ছা সম্মান কেড়ে নেই।

ছাত্ররা সালাম করতে এগিয়ে এল। ফজলুল করিম সাহেব বললেন, বদরুল তোমার হাতের লেখার অবস্থাটা কি? কিছু উন্নতি হয়েছেঃবদরুল মাথা নিচু করে রাখল।রোজ কুড়ি পাতা করে হাতের লেখা লেখার কথা, লিখছ তো?জ্বি স্যার।কই আজকে কি লিখলে দেখি।বদরুল কাগজের তাড়া নিয়ে এল। হাতের লেখার তেমন উন্নতি হয়নি, তবে আগের চেয়ে পরিস্কার হয়েছে।

ফজলুল করিম সাহেব বললেন, এই স্কুল রক্ষার দায়িত্ব তোমাদের উপর। তোমরা যদি অসাধারণ রেজাল্ট করে সবাইকে চমকে দিতে পার তাহলে আমরা টিকে যাব। পারবে না বাবারা?কেউ জবাব দিল না। তারা হেড স্যারকে অসম্ভব ভয় পায়। হেড স্যারের সামনে কথা বলা তাদের পক্ষে সম্ভব না।মওলানা হেড স্যারকে এগিয়ে দিতে আসছেন। বকুল গাছের কাছে এসে চমকে উঠে বললেন, এ কে?

রেশমী চট করে আড়ালে সরে গেল। ফজলুল করিম সাহেব বললেন–ও রেশমী। আমার সঙ্গে এসেছে। চাদনি পসর রাত দেখে তার হাঁটার শখ হয়েছে।মওলানা গম্ভীর গলায় বললেন, ও আচ্ছা।নতুন স্কুলটাও দেখতে চেয়েছিল। দেখায়ে এনেছি।ভাল।

মওলানা তাদের জীবন বাবুর কাঠের পুল পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। সারা পথে কঠিন দৃষ্টিতে রেশমীর দিকে কয়েকবার তাকানো ছাড়া একটি কথাও বললেন না। ফজলুল করিম সাহেব অনর্গল কথা বলে গেলেন বুঝলেন মওলানা সাহেব, শিক্ষকদের বেতনের একটা ব্যবস্থা করেছি। অস্থায়ী ব্যবস্থা স্থায়ী কিছু চিন্তা করতে হবে। বাজারে যে জমি স্কুলের আছে সেখানে ঘর তুলে দিলে কেমন হয়? ভাড়া যা আসবে তাতে স্কুলের কিছু আয় হবে। কিছু জমি বিক্রির ব্যাপারও চিন্তা করা যেতে পারে। স্কুল কমিটির সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এতদিনের স্কুল বানের জলে ভেসে যেতে পারে না। কি বলেন! তবে সরকারী অনুদানটা চলে এলে অবস্থা অন্য রকম হয়ে যাবে কি বলেন?

মওলানা শুধু মাথা নাড়ালেন, কিছু বললেন না।ফজলুল করিম সাহেব বললেন, আমার এখন পরিকল্পনা হল স্কুলের ফাইল ঘেঁটে ঘেঁটে পুরানো ছাত্রদের ঠিকানা বের করা। সাহায্য চেয়ে এদের সবার কাছে চিঠি যাবে। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিব।হুঁ।আমি আশা হারাবার কিছু দেখছি না।মওলানা ক্ষীণ গলায় বললেন, মাহবুব সাহেব নীলগঞ্জ স্কুলে এ্যাসিসটেন্ট হেড মাষ্টার হিসেবে জয়েন করেছেন, শুনেছেন বোধ হয়।ফজলুল করিম সাহেব অবাক হয়ে বললেন, শুনিনি তো।

আজই জয়েন করেছেন।একটা স্কুল থেকে রিজাইন না করে অন্য স্কুলে জয়েন করবেন কিভাবে?রিজাইন করেছেন। আমার কাছে রেজিগনেশন লেটার দিয়ে গেছেন।উনি চলে যাবেন ভাবিনি!উনার দেখাদেখি আরো অনেকেই যাবে। কে জানে হয়ত আমিও যাব। শুধু আপনি একাই থাকবেন।

রেশমী হাসছে। প্রথমে চাপা হাসি। তারপর মুখে আঁচল মুখে খিলখিল হাসি। ফজলুল করিম সাহেব মেয়েটির হঠাৎ হঠাৎ হাসির কারণ ধরতে পারছেন না। এটা কি হাসির সময়? ভার তীব্র মাথার যন্ত্রণা হচ্ছে। হঠাৎ করে মাথা ব্যথা শুরু হয়েছে। প্রেসার কি বেড়ে গেল?

স্যার,

আমার সশ্রদ্ধ সালাম জানবেন। অনেকদিন পর আপনাকে লিখছি। ব্যাঙের ডাকের ইংরেজীটা প্রথমে বলে নেই–Croak স্কুলে থাকার সময়ই ডিকশনারী ঘেঁটে ইংরেজীটা খুঁজে পেয়েছিলাম আপনাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। কিছু কিছু মানুষের জরুরী কথা ভুলে যাবার প্রবণতা থাকে। আমার তো খুবই আছে। আমি আপনাদের ছেড়ে চলে এসেছি আসার আগে সবচে জরুরী কথাটা বলতেও ভুলে গেলাম। সেটা হচ্ছে মানুষ হিসেবে আপনার তুলনা নেই। প্রতিষ্ঠান কখনো বড় হয় না। প্রতিষ্ঠানের পেছনে মানুষরা বড় হয়। জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল স্কুল ধ্বংস হতে বসেছে তা আমাকে তেমন আলোড়িত করছে না, ধ্বংস প্রাকৃতিক নিয়মেই হয়। ডাইনোসারের মত বিশাল প্রাণী লোপ পেয়েছে। কিন্তু স্কুল টিকিয়ে রাখার জন্যে আপনি যে একক যুদ্ধ শুরু করেছেন তা আমাকে অভিভুত করেছে।

মানুষ কঠিন পরিশ্রম করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এভারেস্টের চুঁড়ায় উঠতে যায়। ব্যাপারটা সব সময় আমার কাছে হাস্যকর মনে হয়। আপনাকে দেখার পর আর মনে হচ্ছে না। আপনাকে দেখার পর মনে হচ্ছে সব মানুষকেই তার ব্যক্তিগত এভারেষ্টের চূড়ায় উঠতে হয়। মানুষের এই হচ্ছে নিয়তি।

আপনার দুঃসময়ে আমি আপনাকে ছেড়ে চলে এসেছি। তার জন্যে আমি ক্ষমা প্রার্থী। আমি নিতান্তই দরিদ্র একজন মানুষ। বেঁচে থাকার সংগ্রামে আমাকে নামতে হয়েছে। আপনাকে ছেড়ে চলে এসেছি তার জন্যে আমার লজ্জার সীমা নেই।

আপনার ছাত্রদের আমি মোটামুটি ভাবে তৈরী করে দিয়েছি। আমি আমার সাধ্যমত করেছি। শহরের স্কুলগুলির সঙ্গে তারা পারবে কি না বলতে পারছি না। তবুও আশা করছি। শুনেছি দুএকদিনের ভেতর রেজাল্ট হবে। প্রবল আগ্রহ নিয়ে আমি তার জন্যে অপেক্ষা করছি।

স্যার চলে আসার দিন আপনি আমাকে বিদায় দিতে ষ্টেশন পর্যন্ত এলেন। আমার খুব ইচ্ছা করছিল–পা ছুঁয়ে আপনাকে সালাম করি। কেন জানি পারলাম না–ট্রেন ছেড়ে দেবার পর দেখি আপনি চোখ মুছছেন। একজন মানুষের জীবনের সঞ্চয় খুব বেশী থাকে না। আপনার চোখের জল আমার জীবনের পরম সঞ্চয়ের একটি। আপনি ভাল থাকুন–এই শুভ কামনা। আমি দূর থেকে আপনার পা স্পর্শ করে সালাম করছি। সালাম গ্রহণ করবেন-এই আমার বিনীত অনুরোধ।

স্যার আসব?

ইরতাজউদ্দিন সাহেব দরজার বাইরে থেকে উঁকি দিচ্ছেন। ফজলুল করিম সাহেব চিঠিটা ভাজ করে কোটের পকেটে রাখতে বললেন, আসুন। এস. এস. সির রেজাল্ট কবে হবে শুনেছেন কিছু?যে কোনোদিন হতে পারে।রেডিওর খবরটা প্রতিদিন মন দিয়ে শুনবেন। আমার রেডিও নেই। রেজাল্ট কেমন হবে মনে করছেন?

মওলানা জবাব দিলেন না। সবচে আশা যার উপর ছিল সেই বদরুল শেষ পরীক্ষার দুদিন আগে জ্বরে পড়ে গেল। শেষ পরীক্ষা দিয়েছে ১০৩ জ্বর নিয়ে। পরীক্ষার হল থেকে বেরুবা মাত্র তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছে।

ফজলুল করিম সাহেব বললেন, রেজাল্ট তেমন কিছু হবে বলে আপনি বোধহয় আশা করছেন না।জি-না।হতেও পারে। রেডিওর খবর রোজ শুনবেন।জ্বি আচ্ছা শুনব।জ্বর গায়ে পরীক্ষা দিলেও ভুল তো কিছু করেনি? তাই না?মওলানা জবাব দিলেন না। ফজলুল করিম সাহেব সরকারি চিঠিটা এগিয়ে দিলেন। ইরতাজউদ্দিন সাহেব চিঠি শেষ করে হেডমাস্টার সাহেবের দিকে তাকিয়ে দেখেন তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।

মওলানা বললেন, মন শান্ত করুন। যা হয় সব আল্লাহপাকের হুকুমেই হয়। ফজলুল করিম সাহেব বললেন, এই স্কুলের চারপাশে মিলিটারী আমাকে নেংটো করে ঘুরিয়েছে। সেও কি আল্লাহর হুকুমে?অবশ্যই। পরম মঙ্গলময় কিভাবে কি করেন তা বোঝার সাধ্য আমাদের নেই। স্যার আপনি শান্ত হোন। চলুন আপনাকে বাসায় দিয়ে আসি। চলুন।

ফজলুল করিম সাহেব প্রবল জ্বর নিয়ে বাসায় ফিরলেন। সেদিন সন্ধ্যাতেই রেডিও বাংলাদেশের স্থানীয় সংবাদে ঢাকা বোর্ডের রেজাল্ট প্রকাশের খবর ঘোষণা করা হল। বলা হল জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল স্কুলের মোঃ বদরুল আলম সম্মিলিত মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে। এই অসম্ভব গুরুত্বপুর্ণ খবরটি এলাকায় কেউ শুনল না। শুনলেও হয়তো বুঝতে পারলো না যে তাদের স্কুলের কথাই রেডিওতে বলা হচ্ছে।

রাত আটটার খবরের পর নীলগঞ্জ হাই স্কুলের নতুন এসিসটেন্ট হেডমাষ্টার মাহবুব সাহেব ছুটতে ছুটতে এলেন। তিনি সম্ভবত মনের ভুলে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছেন–আমাদের স্কুল সেকেন্ড স্ট্যান্ড করেছে। আমাদের জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল স্কুল।তার পেছনে পেছনে এলেন নীলগঞ্জ স্কুলের অন্য শিক্ষকরা। রাত দশটায় জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল স্কুল লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল। এমন আনন্দময় ঘটনা এই অঞ্চলের ইতিহাসে অনেকদিন ঘটেনি।

ফজলুল করিম সাহেব চলে এসেছেন। তাঁর শরীর কাঁপছে জ্বরের ঘোরে আনন্দে তা তিনি বুঝতে পারছেন না। বদরুল আলম এসেছে সে স্যারকে সালাম করবার জন্যে নিচু হতেই ফজলুল করিম সাহেব তাকে জাপটে ধরে ফেললেন। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন–আয় তো দেখি তোকে কোলে নিয়ে স্কুলের চারদিকে একটা চক্কর দিতে পারি কি না। আয়।…..

সত্যি সত্যি বদরুলকে কোলে নিয়ে ফজলুল করিম সাহেব দৌড়ানোর চেষ্টা করছেন। বদরুল স্যারের গলা জড়িয়ে ধরে আছে। সে খুব কাঁদছে। ফজলুল করিম সাহেবের সঙ্গে অনেকেই দৌড়াচ্ছে। শুধু তার অতি প্রিয়জন মওলানা ইরতাজউদ্দিন নেই।স্কুলে হৈ চৈ হচ্ছে। মওলানা ইরতাজউদ্দিন হৈ চৈ অগ্রাহ্য করে ফজলুল করিম সাহেবের বাসায় এসেছেন। রেশমীর সঙ্গে জরুরী কথা বলা দরকার। এখনই বলা দরকার।

মওলানাকে দেখেই রেশমী বের হয়ে গেল। সেও আনন্দে ঝলমল করছে।মওলানা বললেন, খবর জান তো রেশমী?জি জানি। খালুজান কই?উনি বদরুলকে কোলে নিয়ে চক্কর দেয়ার চেষ্টা করছেন।রেশমী শাড়ির আঁচল মুখে দিয়ে হাসি চাপার চেষ্টা করছে। মওলানা বললেন, রেশমী শোন–আমাদের স্কুল আবার শুরু হবে। নতুন করে শুরু হবে। খুব ভালোমত শুরু হবে।

জ্বি আমি জানি।এখন তোমার কাছে একটা অনুরোধ। তুমি উনাকে ছেড়ে চলে যাবে।আমি কি করেছি?তুমি খুব ভাল করে জান আমি কেন এইসব বলছি। তুমি বুদ্ধিমতি মেয়ে, তোমার বুদ্ধির অভাব নেই। তুমি উনার মনের ভাব জান। ওনারটাও জান।

রেশমী মাথা নিচু করে রইল। মওলানা বললেন, হেড স্যারকে নিয়ে কোন রটনা হতে দেয়া যাবে না। তুমি যদি থাক ঘটনা অনেক দূর গড়াবে। লোকজন হেড স্যারকে ছিঃ ছিঃ করবে। তুমি কি সেটা জান না?

জানি।তুমি চাও না আমরা স্কুলটাকে নিয়ে অনেক দুর যাই?চাই। আমি চলে যাব।কখন যাবে?আপনি যদি বলেন এখন, তা হইলে এখনই যাব।হ্যাঁ, এখনই চলে যাও।উনার পা ধোয়ার পানির ব্যবস্থা করে তারপরে যাই?আচ্ছা।রেশমী জলচৌকির পাশে পানির বালতি টেনে আনছে। খড়ম জোড়া এনে রাখল। রেশমী কাদছে। টপ টপ করে তার চোখ থেকে দু ফোটা পানি জলচৌকিতে পড়ল।মওলানা দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি মনে মনে মেয়েটির জন্যে প্রার্থনা করলেন। এই মেয়েটা ভাল। আল্লাহ এর ভাল কর। বাজী পোড়ানোর শব্দ হচ্ছে। স্কুলে মনে হয় বাজী পোড়ানো হচ্ছে। ঢোল বাজানোর শব্দ আসছে। নিশ্চয়ই হরিপদের কান্ড। ঢোলের শব্দ প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে।

 

Read more

হিমুর বাবার কথামালা-পর্ব-০১- হুমায়ূন আহমেদ

Related Posts

Leave A Comment