জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুল পর্ব – ৭
অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল স্কুলে আজ শিক্ষকদের বেতন হচ্ছে। তাও ভাঙ্গা বেতন না। পুরো বেতন। পুরো ব্যাপারটা শিক্ষকদের কাছে অপ্রত্যাশিত। বেতন হবে, এই সম্পর্কে হেড স্যার আগে কিছু বলেন নি। কোন আদায় পত্রও হয়নি। টাকাটা পাওয়া গেল কোথায়? কেউ এ সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করছে না। বেতন হচ্ছে এটাই বড় কথা। কোত্থেকে হচ্ছে, কি ভাবে হচ্ছে সেটা বড় কথা না। জানতে না চাওয়াই ভাল। শিক্ষকরা হেড সারের ঘরে ঢুকছেন, রেভিনিত্যু ষ্ট্যাম্পে সই করে বেতন নিচ্ছেন।মাহবুব সাহেব বেতন নিতে এলেন শেষে। এসিসট্যান্ট হেড মাস্টার হিসেবে ভার একটা দায়িত্ব আছে। ফান্ড কোথায় পাওয়া গেল তার জানা দরকার। তিনি শুকনো মুখে বললেন, টাকাটা কোত্থেকে দেয়া হচ্ছে?
ইমার্জেন্সি ফান্ড থেকে দিচ্ছি।স্কুল কমিটির অনুমতি ছাড়াতো স্যার আপনি ইমার্জেন্সি ফান্ড ভাঙতে পারেন না।অনুমতি পরে নিয়ে নিব। শিক্ষকরা অনেকদিন থেকে কষ্ট করছেন। তিন মাস বেতন হচ্ছে না। তাদের ইমার্জেন্সিওতো ইমার্জেন্সি।আমাদের তো স্যার আইন কানুন মানতে হবে।ইমার্জেন্সির সময় কোন আইন কানুন থাকে না। সাধারণ সময়ের সাধারণ আইন। জরুরী সময়ের জরুরী আইন। মাহবুব সাহেব টাকা গুনে Fani কাজটা স্যার ভুল করলেন।মানুষ হয়ে জন্মেছি ভুল করব না তাতো হয় না। দশবার শুদ্ধ করব, একবার ভুল করব তবেই না আমি মানুষ।
আজ আমি একটা মিটিং দিয়েছি মাহবুব সাহেব।কিসের মিটিং? স্কুল বিষয়ে আপনাদের সবার সঙ্গে কিছু কথা বলব। মুক্ত আলোচনা। আপনারও যদি বলার কিছু থাকে আপনিও বলবেন।মিটিং হবে কখন? পাঁচটার সময়।চারটার দিকে করতে পারেন না? আমার পাঁচটার সময় এক জায়গায় যাবার কথা।স্কুল পিরিয়ডে ছাত্রদের ক্ষতি করে তো আর মিটিং করতে পারি না। আপনার খুব জরুরী কোন কাজ থাকলে কাজে যাবেন। খুব জরুরী কিছু না থাকলে থাকুন, গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলব।দেখি।
মাহবুব সাহেবের কাজটা তেমন জরুরী না। আজ নিমখালি বাজারে হাট বার। হাটে গরু-ছাগল উঠে। ছেলের আকীকার জন্যে একটা গরু কেনার কথা। ফজলুল করিম সাহেবের মিটিংয়ের চেয়ে ছেলের আকীকা অনেক জরুরী। দুদিন পর পর ছেলে অসুখে ভুগছে। শরীর হয়েছে পাট কাঠির মত। আকীকা করা থাকলে নিশ্চিন্ত থাকা যায়। তাছাড়া হেড মাস্টার সাহেবের গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতায় আসলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু থাকবে না। স্কুল স্কুল বলে চেঁচিয়ে তো কিছু হবে না। তারপরেও মাহবুব সাহেব মিটিং এ থেকে যাওয়াই ঠিক করলেন। আরেক বুধবার পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করতে হবে। উপায় কি?
দপ্তরী হরিপদ বড় একটা ধামায় পেঁয়াজ কাঁচামরিচ দিয়ে মুড়ি মাখছে। কেতলীতে করে চা এসেছে। মুড়ি খাওয়ার পর চা দেয়া হবে। মুড়ি এবং চা দুটার টাকাই হেড মাস্টার সাহেব দিয়েছেন।খবরের কাগজ বিছিয়ে মুড়ি টেলে দেয়া হয়েছে। মুড়ি চিবানোর কচাকচ শব্দের ভেতর ফজলুল করিম সাহেব ঢুকলেন। শিক্ষকরা উঠে দাঁড়ানোর ভঙ্গি করলেন তবে কেউ পুরোপুরি উঠলেন না।ফজলুল করিম সাহেব হাসি মুখে বললেন, মুড়ি খাওয়ার কচ কচ শব্দ একটু কমুক তারপর কথা বলি।মাহবুব সাহেব বললেন, যা বলার এর মধ্যেই বলুন। কথা শুনতেতো অসুবিধা হচ্ছে না। সবারই তাড়া আছে।
করিম সাহেবের জন্যে পিরিচে করে মুড়ি এবং একটা চামুচ এসেছে। তিনি মুড়ির দিকে তাকালেন মুড়ি মুখে নিলেন না।নীচু গলায় কথা বলা শুরু করলেন। একটা দুঃসময়ের ভেতর দিয়ে আমরা যাচ্ছি। নতুন করে বলার কিছু না সবাই তো জানেন। আমি যা বলতে চাচ্ছি তা হচ্ছে দুঃসময়টা সাময়িক।মাহবুব সাহেব বললেন, দুঃসময় সাময়িক মনে হবার কারণ কি? তেমন কোন কারণ অবশ্যি দেখছি না, তবু মনের ভেতর থেকে কে যেন বলছে দুঃসময় থাকবে না।নতুন সায়েন্স টিচার হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে বললেন, উইথফুল থিংকিং নাতো স্যার! হতে পারে, উইথফুল থিংকিং হতে পারে। দেখি এক কাপ চা খাওয়া যাক।
হরিপদ চায়ের কাপ এনে সামনে রাখল। করিম সাহেব মামুনের দিকে তাকিয়ে বললেন, সিগারেট খেতে ইচ্ছা হচ্ছে আপনার কাছে কি আছে? মামুন সিগারেট বের করে দিল। করিম সাহেব সিগারেট টান দিয়ে কাশতে লাগলেন। কাশি থামিয়ে সহজ গলায় বললেন, মামুন সাহেব আমি যা বলছি তা ঠিক উইথফুল থিংকিংও না। কিছু যুক্তি আছে। এত দিনের পুরনো একটা স্কুলতো জলে ভেসে যেতে পারে না।এটাতো স্যার কোন যুক্তি হল না।তা অবশ্যি হল না।মাহবুব সাহেব বিরক্ত গলায় বললেন, এটা বলার জন্যেই কি মিটিং ডেকেছেন?
না, আসল কথা বলা হয়নি আসল কথা হচ্ছে–এস, এস, সি পরীক্ষার আর আছে মাত্র তিন মাস। এই তিনমাস আমাদের প্রাণপন খাটতে হবে। এবারে তিনজন খুব ভাল ছেলে আছে। এর মধ্যে একজন তো অসম্ভব। ভাল–বদরুল আলম। এদের ঠিক ঠাক মত কোচিং করতে হবে। অসাধারণ একটা রেজাল্ট ওদের দিয়ে করাতে হবে। স্কুলের পূর্ব গৌরব ফিরিয়ে আনার একটা সুযোগ এসেছে। সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। এদের কোচিং এর বিষয়ে আপনাদের কোন মতামত আছে? কেউ কোন জবাব দিল না। কোচিং এর বিষয়ে নতুন তো কিছু বলার নেই। আগে যেমন হয়েছে এবারও তেমন হবে।করিম সাহেব বললেন, আমি চিন্তা করছি দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা এই ছেলেদের মনিটার করলে কেমন হয়। ইরতাজউদ্দিন সাহেবের সঙ্গে এ নিয়ে কথা হয়েছে। আপনাদের সঙ্গে আলোচনা হয়নি। আমি যা ভাবছি তা হচ্ছে না…
পরীক্ষার্থী যারা সবাই একসঙ্গে থাকবে। একসঙ্গে পড়বে। এতে একটা টিম স্পিরিট তৈরী হবে। দায়িত্ব শিক্ষকদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হবে। যেমন ভোর ছটা থেকে দুপুর বারটা পর্যন্ত একজন শিক্ষক। দুপুর বারটা থেকে সন্ধ্যা ছটা পর্যন্ত একজন এ রকম। প্রতিট বিষয়ের জন্যে আলাদা আলাদা ক্লাস হবে। আইডিয়াটা আপনাদের কাছে কেমন লাগছে।এবারো কোন জবাব পাওয়া গেল না। করিম সাহেব উৎসাহের সঙ্গে বললেন, এটা যে পুরোপুরি আমার মৌলিক আইডিয়া তাও না। তিব্বতে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের এইভাবে বড় বড় পরীক্ষার জন্যে তৈরী করা হয়।মাহবুব সাহেব বললেন, এটাতো স্যার তিব্বত না।
আমি জানি এটা তিব্বত না। আমার কথা হল, তিব্বত যদি এই নিয়মে কাজ করে আমাদের দেশেও করবে। একটা বড় কিছুর জন্যে সবাইকে এক সঙ্গে তৈরী করা। একটা টিম স্পিরিট সবার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া। যদি আমাদের এই গ্রামের দরিদ্র স্কুল অসাধারণ একটা রেজাল্ট করে তার ফল হবে সুদূর প্রসারী। স্কুল তখন টিকে যাবে। দূর দূর থেকে ছাত্ররা আমাদের এই স্কুলে পড়তে আসবে। সরকারী সাহায্য আসবে। দানশীল মানুষেরা এগিয়ে আসবেন।মাহবুব সাহেব বললেন, আপনার কথা শুনতে ভাল লাগছে। কিন্তু যে আইডিয়া শুনতে যত ভাল সেই আইডিয়ার মূল্য ততকম। তিনমাস পড়িয়ে ছেলেদের ফার্স্ট সেকেন্ড বানাবেন তা হয় না।
হবে না এটা আগে থেকে ধরে নেয়াটা কি ঠিক? চেষ্টাতো করা যেতে পারে।এতগুলি ছেলে একসঙ্গে থাকবে কোথায় থাকবে। এরা খাবে কি? এইগুলি নিয়ে আলোচনা করার জন্যেইতো মিটিং। আপনারা বলুন কি ভাবে করা যায়? চায়ের কাপে চুমুক দেয়ার শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ হচ্ছে না। মাহবুব সাহেব উঠে দাঁড়াতে দাড়াতে বললেন, স্যার আমি তাহলে উঠি? উঠবেন? কিছু বলবেন কি? এখনি বলতে হবে? পরে বলি? করিম সাহেব ক্লান্ত ভঙ্গিতে বললেন, আচ্ছা বলুন পরেই বলুন।শেষ পর্যন্ত সরকারি চিঠি এসেছে। আগের চিঠির মেমো নাম্বার উল্লেখ করে সরকার জানাচ্ছে,
জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল স্কুলের ছাত্র সংখ্যা আশংকাজনকভাবে কমিয়া গিয়াছে। শিক্ষক সংখ্যাও অপ্রতুল। এই অবস্থায় সরকারী অনুদান কাজে আসিবে কি আসিবে না তাহা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন। বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্যে ময়মনসিংহের ডেপুটি কমিশনারকে আহবায়ক করিয়া একটি কমিটি গঠন করা হইয়াছে। পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটিকে আগামী তিন মাসের ভিতর স্কুল সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ বিপোর্ট দেবার জন্যে অনুরোধ করা যাইতেছে।
ফজলুল করিম সাহেব দীর্ঘ সময় চিঠিটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। সব চিঠিই তিনি কয়েকবার করে পড়েন। শুধু এই চিঠিটিই একবার পড়লেন। আগামীকাল থেকে গরমের ছুটি শুরু হবে। আজ শেষ ক্লাস। ছুটির আগের শেষ ক্লাসে ছাত্ররা সব আনন্দ করে। আজ কিছুই হচ্ছে না। সব কেমন মরা। মরা। ছাত্রই নেই প্রাণ আসবে কোত্থেকে, স্কুলের প্রাণ হচ্ছে তার ছাত্র। দালান কোঠা তো স্কুলের প্রাণ না।মওলানা সাহেব সন্ধ্যাবেলা হেডমাস্টার সাহেবের ঘরে এসে বললেন, স্যার বাসায় যাবেন না? আপনি চলে যান। আমি একটু পরে যাব।আপনার কি শরীর খারাপ করেছে?
না। এমনিতেই ভাল লাগছে না।মামুন সাহেবের একটা চাকরি হয়েছে শুনেছেন বোধহয়।না শুনিনি–কোথায় চাকরি হয়েছে? সরকারী কলেজের লেকচারার। বরিশাল বিএম কলেজ। ইন্টারভ্যু দিয়ে এসেছিলেন। গতকাল চিঠি এসেছে।উনার না এখানে নিরিবিলিতে থেকে বি সি এস পরীক্ষার জন্যে তৈরী হবার কথা। বি, সি,এস দিচ্ছেন না।আমাকে বললেন–বি সি এস দেবেন না। মাষ্টারী করবেন। খুব খুশী।খুশী হবারই কথা।আপনাকে কিছু জানাননি?
প্রথমেই তো বলেছি জানায়নি। একই প্রশ্ন দুবার তিনবার করে কেন করেন।ভুল হয়ে গেছে স্যার ক্ষমা করে দেবেন। ক্ষমা করলাম। আপনার কথা শেষ হয়ে থাকলে চলে যান। আমি নিরিবিলিতে কিছুক্ষণ বসে থাকব।দুটা কথা বাকি আছে। বলেই চলে যাব। প্রথম কথাটা হল। এস,এস, সি ছাত্রদের কোচিং এর ব্যাপারে আপনি যা বলেছেন সেটা করা সম্ভব বলে আমার ধারণা। আমি মামুন সাহেবকে নিয়ে একটা পরিকল্পনা করেছি। শিক্ষকদের ডিউটি ভাগ করা হয়েছে। স্কুলের লাইব্রেরী ঘরে ছাত্ররা থাকবে।এতগুলি ছাত্র লাইব্রেরী ঘরে থাকবে কি ভাবে?
সব ছাত্র না–আমরা ৫ জন বেছে নিব। প্রথম পাঁচ জন।সেটা হবে না। একজনের জন্যে যে ব্যবস্থা বাকিদের জন্যেও একই ব্যবস্থা।মামুন সাহেব বলেছিলেন যে আপনি পাঁচজনের ব্যাপারে রাজি হবেন। সবাইকে নিয়ে একটা পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেখানে একটা ক্লাস ঘর খালি করে দিতে হবে। মামুন সাহেব পুরো ব্যাপার দেখবেন।কলেজের চাকরি নিয়ে চলে যাচ্ছেন–তাহলে দেখবেন কি ভাবে? এস. এস. সি পরীক্ষা পর্যন্ত উনি থাকবেন। পরীক্ষার পর কলেজে জয়েন করবেন। আমার সঙ্গে সে রকম কধ্যা হয়েছে।ও আচ্ছা।খুব কর্মী ছেলে। একাই একশ। উনি থাকলে আর কিছু লাগবে।উনি নিজে থেকে রাজি হয়েছেন না আপনি বলে কয়ে ঠিক করেছেন?
নিজ থেকে রাজি হয়েছেন। আমাকে কিছু বলতে হয়নি। কলেজের এপয়েনমেন্ট লেটার পেয়ে খানিকক্ষণ খুশীতে খুব লাফালাফি করলেন তারপর আমাকে বললেন–মওলানা সাহেব, আমাদের হেডমাষ্টার সাহেব স্কুলটা নিয়ে একা একা যুদ্ধ করছেন। যুদ্ধে প্রায় পরাজিত। আমি একজন ভাল সৈনিক। এই সময়ে আমি তাকে ছেড়ে চলে যাব তা হয় না। এস, এস, সি পরীক্ষা পর্যন্ত দেখে যাবেন। তার যতটুকু সাধ্য করবেন।
ভাল।আমার স্যার আরেকটা কথা বাকি, ঐটা শেষ করে চলে যাব।বলুন।একটা ভাল ছেলে পাওয়া গেছে স্যার।ভাল ছেলে পাওয়া গেছে মানে কি? যা বলার গুছিয়ে বলুন।রেশমীর জন্যে একটা ছেলে পেয়েছি। দোকানে কাজ করে।ও আচ্ছা।ছেলেটিকে খবর দিয়ে এনেছি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। আপনি তার সঙ্গে কথা বলবেন? না।অন্য কোন সময় আসতে বলব? মওলানা ইতস্তত করে বললেন, নানান ধরনের কথা হচ্ছে। নানান রটনা।কি রটনা?
এইসব কথা মুখ ফুটে আপনাকে বলা সম্ভব না।বলা সম্ভব না হলে বলবেন না।জ্বি আচ্ছা।মওলানা সাহেব এই সমস্যা নিয়ে আপনাকে আর মাথা ঘামাতে হবে। স্কুলের সমস্যা নিয়ে ভাবুন।জ্বি আচ্ছা।যাবার সময় দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে যাবেন।মওলানা সাহেব দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে চলে গেলেন। জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল স্কুলের হেডমাষ্টার ফজলুল করিম সাহেবের চোখে পানি এসে গেছে। তিনি চোখের পানি মুছলেন না। কারণ চোখে যে পানি এসেছে তা তিনি নিজে বুঝতে পারেন নি।
ফজলুল করিম সাহেব তেমন কিছু খাচ্ছেন না। প্লেটের ভাত নাড়াচাড়া করছেন। প্লেটে ডাল নিতে গিয়েও নিলেন না। অথচ সজনে দিয়ে ব্রাধা ডাল তার অতি প্রিয়। রেশমী বলল, আপনার কি হইছে? কিছু হয় নাই। আমার ক্ষিধা একেবারেই নাই।দুপুরে স্কুলে কি খাইছেন? দুপুরে কিছু খাইনি। এই জন্যেই মনে হয় পিত্ত পড়ে গেছে। কিছু খেতে ভাল লাগছে না।জ্বর জ্বারি হয় নাই তো? রেশমী ফজলুল করিম সাহেবের কপালে হাত রাখল। ফজলুল করিম সাহেবের মনে হল উত্তাপ দেখতে যতটুকু সময় লাগে রেশমী যেন তার চেয়ে বেশি সময় হাত কপালে রাখল।আপনি কি কিছু নিয়া চিন্তিত? উঁহুঁ।নতুন স্কুলে না-কি আপনার স্কুলের সব ছাত্র চইল্যা যাইতেছে। তা যাচ্ছে।রেশমী হাসি মুখে বলল, খালি স্কুল নিয়ে আপনি বইস্যা আছেন। দোকান আছে, দোকানদার আছে সওদা নাই।হাসি তামশা কিছু হয়নি রেশমী। হসিবে না।মনের ভুলে হাসছি। পান দাও রেশমী, পান খাব।
রেশমী পান এনে দিল। ফজলুল করিম সাহেব পান মুখে দিতে দিতে বললেন, খালি স্কুল আবার পূর্ণ হবে।ক্যামনে হবে? এবার এসএসসির রেজাল্ট হলেই দেখবে ছাত্র ছাত্রীরা আবার আসতে শুরু করেছে।কেন? ষ্টান্ড করবে। অবশ্যই করবে। গ্রামের স্কুল থেকে স্ট্যান্ড করলে সবার নজর পড়বে স্কুলের দিকে। আমাদের কয়েকজন ভাল ছাত্র এইবার আছে। এর মধ্যে একজন আছে–খুবই ভাল। শুধু হাতের লেখাটা খারাপ। লেখাটা যদি একটু ভাল হত।ছাত্রটা কে বদরুল আলম
ফজলুল করিম সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন,তুমি জান কিভাবে? রেশমী হাসিমুখে বলল, আপনার স্কুলে কি হইতেছে না হইতেছে আমি জানব না? অবশ্যই জানবে। কেন জানবে না? আপনে স্কুল নিয়া অত চিন্তা কইরেন না। অত চিন্তার কি আছে? চিন্তা করব না কি বল তুমি। স্কুল যদি উঠে যায়? উঠে গেলে কি আর করণ। দুনিয়ায় কিছু টিক্যা থাকে না।ফজলুল করিম সাহেব তাকিয়ে রইলেন। রেশমী বলল, একটা স্কুল চইল্যা গেলে চইল্যা যাবে। আরেকটা নয়া স্কুল হইছে। আফনে আমার একটা কথা হুনবেন? কি কথা? আফনে গিয়া নীলগঞ্জ ইস্কুলের হেডমাস্টার হন।নতুন স্কুলের হেডমাস্টার হব?
হুঁ। আপনের ছাত্র পড়ানি দিয়া কথা। কোন ইস্কুল সেইটা দিয়া দরকার কি? তার উপরে এমন না যে এই ইস্কুল আফনে বানাইছেন।ফজলুল করিম সাহেব আহত গলায় বললেন, এই নিয়ে আমি তোমার সঙ্গে তর্ক করতে চাচ্ছি না। চুপ কর। যা জান না তা নিয়ে তর্ক করাও ঠিক।রেশমী আহত গলায় বলল, আমি হইলাম দাসী বান্দি–আমার জানা অজানার দাম কি? সে তার ঘরে দরজা জানালা বন্ধ করে বসে রইল। রাতে ভাত খেল না। ফজলুল করিম সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন, আজকাল তোমার হয়েছে কি বল তো দেখি–কথায় কথায় রাগ।রেশমী জবাব দিল না।
এরকম করলে কিন্তু আমি চলে যাব। স্কুল ঘরে রাত কাটাব। সেটা ভাল হবে রেশমী দরজা খুলে বের হয়ে এল।সে কাঁদছিল। তার গাল ভেজা। ভেজা গাল সে মুছল না। ভেজা গালেই খেতে বসল। ফজলুল করিম সাহেব মোড়া টেনে তার পাশে বসলেন। রেশমী বলল, কেউ চাইয়া থাকলে আমি খাইতে পারি না। আপনে অন্য ঘরে গিয়ে বসেন। তিনি নড়লেন না। রেশমীর কোন কথা তিনি শুনতে পাচ্ছেন বলে মনে হল না। তিনি তাকিয়ে আছেন রেশমীর দিকে, কিন্তু ভাবছেন অন্য কথা। পাশ বই-এ তাঁর কিছু টাকা আছে। গ্রামের বসতবাড়ি-সম্পত্তি বিক্রি করে নগদ টাকা রেখে দিয়েছিলেন ভবিষ্যতের জন্যে।
নব্বই হাজারের মত। সুদ টদ নিয়ে সেই টাকা এখন বেড়ে এক লাখ তিরিশ হাজার হয়েছে। এই টাকা ব্যবহার করা যেতে পারে। তার স্ত্রীর কিছু গয়না আছে। সামান্যই–গয়না এখন আর কি কাজে আসবে? সকাজ তো তেমন কিছু তিনি করেননি। সামান্য সৎকাজ করা হল।স্কুলের কত ছাত্র দেশে বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এদের কাছে কোনমতে খবরটা পৌছাতে পারলেও তো কাজ হবে।রেশমী বলল, কি ভাবেন? না কিছু ভাবি না।আপনে দিন রাইত ভাবেন। অত ভাইব্যা ফয়দা নাই। যা হওনের হইব।ফজলুল করিম জবাব দিলেন না। যা হবার তা হবে ঠিকই–তবু চেষ্টা করে যেতে হবে।
Read more
