ঠাকুরদার সিন্দুক রহস্য (৩য় পর্ব) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

ঠাকুরদার সিন্দুক রহস্য – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

জয়গোপালবাবুর মুখে তার পিসতুতো ভাই প্রবোধের কথা শুনেছিলুম। এই সেই প্রবোধ। সে জড়ানো গলায় হেসে বলল,–মাইরি সুবিমল! আমার খালি ভুল হয়! ছেলেকে দেখলেই বাপের নাম বলে ফেলি। হ্যাঁ! তুমি ঝাঁপুইহাটির হারাধনের ছেলে সুবিমল। বাবা সুবিমল! সাবধান! জুতো হারিয়ো না যেন! জুতো হারাতে-হারাতে শেষে নিজেই হারিয়ে যাবে! মাইরি বলছি! আমাদের গোপাল! জয়গোপালের জুতা হারাত না? শেষে আজ শুনি সে নিজেই হারিয়ে গেছে। হিমি কেঁদেকেটে থানাপুলিশ করে বেড়াচ্ছে। এই বাবা সায়েব! গিভ মি টেন রুপি! ওনলি টেন।

কর্নেল বললেন,–জয়গোপালবাবু হারিয়ে গেছেন। আপনি তাকে খুঁজে বের করুন।মাতাল প্রবোধ হিহি করে হেসে উঠল।–ওরে বাবা! এ তো দিশি সায়েব দেখছি! ধুস! কর্নেল আমাকে অবাক করে তাকে একটা দশটাকার নোট দিয়ে বললেন,–জয়গোপালবাবু। আপনার মামার ছেলে। তাকে খুঁজে বের করে সুবিমলকে গোপনে জানালে একশো টাকা বকশিশ পাবেন। কেউ যেন জানতে না পারে।টাকা পেয়ে প্রবোধ যেন হকচকিয়ে গিয়েছিল। তারপর সে সেলাম ঠুকে চাপাস্বরে বলল,–মাইরি, একশো টাকা দেবেন? কর্নেল একটু হেসে বললেন,–দেব।……. –মা কালীর দিব্যি?…… –মা কালীর দিব্যি।

মাতাল প্রবোধ ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে ভিড়ের মধ্যে গিয়ে মিশল। শেষ-বিকেলে তখন ব্রিজের মুখে যানবাহন আর তুমুল ভিড়। কারণ বাবুগঞ্জের উত্তরপ্রান্তে ব্রিজের কাছাকাছি দুধারে দোকানপাট। নদীর ওপারের গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে লোকেরা এসে শেষবেলায় কেনাকাটা করে বাড়ি ফেরার জন্য ব্যস্ত। গরু-মোষের গাড়ি, সাইকেলভ্যান, টেম্পো, লরি-বাস ব্রিজের মুখে এসে জট পাকিয়েছে।ভিড় পেরিয়ে কিছুটা যাওয়ার পর সুবিমল কর্নেলকে বলল,–ওই মাতালটাকে টাকা দিলেন স্যার! ও আবার মদের দোকানে গিয়ে মদ গিলবে।

কর্নেল বললেন,–সুবিমল! এবার জয়গোপালবাবুর বাড়ি চলে! –সামনে ডানদিকের গলিরাস্তায় ঢুকতে হবে। কিন্তু আপনি কি প্রবোধদার কথা বিশ্বাস করেছেন? -কিছু বলা যায় না। প্রবোধের কথা সত্য হতেও পারে।বিকেলের আলো দ্রুত কমে আসছিল। গলির দুপাশে মাটি বা ইটের একতলা বাড়ি। কিন্তু গলিপথটা নির্জন। একটু পরে দুধারে পোড়ো জমি চোখে পড়ল। ঝোঁপ-জঙ্গল গজিয়ে আছে। তারপর একটা পুরোনো একতলা ইটের বাড়ি দেখতে পেলুম। সামনে খানিকটা জায়গায় মাটি নগ্ন।

সেখানে দাঁড়িয়ে সুবিমল বাঁদিকে নিচু পাঁচিলে ঘেরা জমিটা দেখিয়ে বলল,–ওখানে স্যার মুখুজ্যেমশাইয়ের এক শরিক অবনীবাবু গার্লস স্কুল তৈরি করবেন। কিন্তু জমিটা জবরদখল। জয়গোপালবাবু যখন রেলে চাকরি করতেন, তখন হিমিদি–মানে হৈমন্তীদি, উনি স্যার প্রাইমারি স্কুলের টিচার–তো উনি অবনীবাবুর সঙ্গে এঁটে উঠতে পারেননি। মামলা করার সাহস হয়নি। পঞ্চায়েতে নালিশ করেছিলেন। শেষে পঞ্চায়েত বলেছিল, জমিটা খালি পড়ে আছে। ওটা গার্লস স্কুলের জন্য দান করে দাও।

এই সময় বাড়ির দরজা খুলে একজন প্রৌঢ়া বেরিয়ে বলল,–ওখানে কারা গো? সুবিমল এগিয়ে গিয়ে বলল,–সরলামাসি! আমি সুবিমল! হিমিদি বাড়ি নেই বুঝি? –অ! সুবিমল? এই দ্যাখো না বাবা কী বিপদ! আমাকে পাহারায় রেখে বাবুদিদি গেছেন থানায়। সেই দুপুরে গেছেন। এখনও ফিরছেন না। আমি শুধু ঘর-বার করছি।–কী বিপদ সরলামাসি? –তুমি শোনোনি? সারা বাবুগঞ্জ, শুনেছে। বিপদ বলে বিপদ! অমন এক জলজ্যান্ত লোক গোপালবাবু কলকাতা গেলেন। গিয়ে ফেরার পথে হারিয়ে গেলেন! –হারিয়ে গেলেন মানে? –হ্যারিয়ে গেলেন বইকী।

রানাঘাট ইস্টিশনে বাবুদাদাকে ট্রেন থেকে কাল বিকেলে নামতে দেখেছিল হরেন-গয়লা। শুধু সে একা দেখেনি। আরও দেখেছিল মুসলমান পাড়ার মকবুল। বাবুদিদির কান্নাকাটি আর থানা-পুলিশ করার খবর পেয়ে তারা এসে বলে গিয়েছে। পুলিশকেও বলেছে। এদিকে সারাটা রাত্তির গেল। সকাল গেল। বাবুদাদার খবর নেই। বাবুদিদির মাসতুতো দাদা কলকাতার পুলিশ। তাকে বাবুদিদি টেলিফোনে খবর দিয়েছিলেন। তিনি দুপুরবেলা এসে বাবুদিদিকে নিয়ে আবার থানায় গেছেন।-বলে প্রৌঢ়া আমাদের দিকে তাকাল।

সুবিমল বলল,–এনারা কলকাতার সায়েব। এখানে বেড়াতে এসেছেন। আমি যেখানে কাজ করি, সেই বাংলোতে উঠেছেন। স্যার! সরলামাসির জেলেপাড়ায় বাড়ি। দেখলে বুঝবেন না মাসির কী ক্ষমতা! ওদের মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির অফিসে দিনের বেলা ডাকাত পড়েছিল। মাছ বিক্রির টাকা সেদিন বিলি হওয়ার কথা। খবর পেয়ে নৌকায় চেপে ডাকাত এসেছিল। আর এই মাসি এক ডাকাতকে ধরে উপুড় করে ফেলেছিল। বেগতিক দেখে অন্য ডাকাতরা পালিয়ে যায়।

সরলা বলল,–ওসব কথা থাক বাবা সুবিমল। এই বিপদ নিয়ে আমার মাথার ঠিক নেই। অ্যাদ্দিন বাবুদাদা যেখানে যেতেন জুতো হারিয়ে আসতেন। ছেলেছোকরারা ঠাট্টা-তামাশা করত। এখন বাবুদাদা নিজেই কোথায় হারিয়ে গেলেন! রানাঘাট হাসপাতাল থেকে বাবুগঞ্জ পর্যন্ত যত ছোট-বড় হাসপাতাল আছে খোঁজ নিয়েছে পুলিশ। পাত্তা নেই।

কর্নেল বললেন,–জয়গোপালবাবুর কি কোনো শত্রু আছে এখানে? –অমন ভোলাভালা মানুষের কে শত্রু থাকবে সায়েবকবা? বাবুদাদা রেলের চাকরি শেষ করে নিজের বাবার বাড়িতে এসে ঠাই নিয়েছিলেন। ওনার বোন অ্যাদ্দিন বাড়িখানা যত্ন করে আগলে রেখেছেন। ধরুন, বাবুদিদিরও তো বয়েস হয়েছে। ছেলেপুলে নেই। আর কদ্দিন চাকরি করবেন? আপদে-বিপদে পড়লে আমাকে খবর পাঠান, আসি। পাশে এসে দাঁড়ালে উনিও মনে জোর পান। কিন্তু এ কী হল বুঝতে পারছি না।

কর্নেল বললেন,–সুবিমল! এই বাড়ির দরজায় কারা নাকি কুকুরের মুন্ডু কেটে ঝুলিয়ে ছিল–তুমিই বলছিলে!সুবিমল কিছু বলার আগেই সরলা বলল,–আজ্ঞে হ্যাঁ সায়েববাবা। বাবুদিদির পোষা কুকুর। কালো রঙের জন্য কালু নামে তাকে ডাকতেন। রাতবিরেতে বাড়ি পাহারা দিত, পেল্লায় কুকুর গোয় বাঘের মতো গজরাত।

কর্নেল বললেন,–সুবিমল বলছিল দুষ্টু ছেলে-ছোকরাদের কীর্তি।সরলা চোখ বড় করে ক্রুদ্ধস্বরে বলল,–ছেলে-ছোকরাদের সাধ্য কী রাত্তিরে তার কাছে যায়? সায়েববাবা! এ কাজ বজ্জাত লোকেদের। পাশেই দশকাঠা জায়গা গিলে খেয়ে আশ মেটেনি। এখন বাড়িখানা গিলে খাওয়ার মতলব করেছে।সুবিমল বলল,–কালুকে মেরে বাড়ি দখল করবে কী করে? সরলামাসি! তুমি কী বলছ? সরলা চাপাস্বরে বলল,–বাবুদিদি বলছিল, কালুকে মারার পর রোজ রাত্তিরে জানালার পিছনে কারা এসে ভূতপেরেতের গলায় কীসব বলে।

তখন বাবুদিদি বাড়িতে ইলেকটিরি আলো জ্বেলে দিয়ে বাবুদাদাকে ডাকাডাকি করেন। বুঝলে বাবারা? কাল সন্ধে হয়ে গেল, বাবুদাদা কলকাতা থেকে ফিরলেন না। তখন ওই গলির মুখে মন্ডলবাবুর ছেলে বিট্টুকে বাবুদিদি পাঠিয়েছিলেন। ওঁর ছাত্তর বিট্টু। সে আমায় ডেকে এনেছিল। তারপর রাত্তিরে ওই ভূতপেরেতের উৎপাত। জানলা খুলেই টর্চবাতি জ্বালালুম। কাকেও দেখতে পেলুম না, দৌড়ে পালানোর শব্দ শুনলুম। তখন চেঁচিয়ে বললুম, ওরে বদমাশের দল! আমি সেই ডাকাত-ধরা মেয়ে সল্লা-মেছুনি! এবার চেপে ধরব না, মাছবেঁধা করে বিধব।

কর্নেল বললেন, ভূতপেরেতের গলায় কী বলছিল তারা, বুঝতে পেরেছ? সরলা বলল,–সবকথা বুঝতে পারিনি। একটা কথা কানে আসছিল। জুতো। –জুতো? –আজ্ঞে হ্যাঁ সায়েববাবা! জুতো!সুবিমল হাসল,–তাহলে দুষ্টু ছেলেদের কাজ! –ছেলেদের অমন গলার স্বর হয় না। আর পায়ের শব্দও অত জোরালো হয় না। পিছনের দিকে গলির মুখে ততক্ষণে আলো জ্বলে উঠেছে। কাছে ও দূরে শাঁখ বাজছিল।কর্নেল বললেন,–সরলা! বাড়ির আলো জ্বালবে না? সরলা এতক্ষণে কাপড়ের আড়াল থেকে টর্চ আর একটা ধারাল হেঁসো বের করে বলল, ঘরের ভেতর আলোর সুইচ। বাবুদিদি সব ঘরে তালা এঁটে গিয়েছেন।

বলেই সে আঙুল তুলল,–ওই বাবুদিদিরা আসছেন! ঘুরে দেখলুম, সরলার বয়সি এক মহিলা আর একজন প্যান্ট-শার্ট-সোয়েটার পরা ভদ্রলোক গলিপথে এগিয়ে আসছেন। কাছে এসে সেই ভদ্রলোক কর্নেলকে নমস্কার করে বললেন, স্যার আপনি? কর্নেল বললেন,–হ্যাঁ পরেশ! জয়গোপালবাবুর নিখোঁজ হওয়ার খবর শুনে সেচবাংলো থেকে চলে এসেছি!বুঝলুম, ইনিই কলকাতা পুলিশের সেই সাব-ইন্সপেক্টর পরেশবাবু। তিনি বললেন,–হিমিদি! ইনিই সেই কর্নেলসাহেব। আর ইনি কর্নেলসাহেবের সঙ্গী সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরী।

হৈমন্তী আমাদের নমস্কার করে দ্রুত এগিয়ে গেলেন। সরলা তাকে অনুসরণ করল। কর্নেল বললেন,–তোমরা থানায় গিয়েছিলে শুনলুম।–সব বলছি স্যার! এখানে এত মশার মধ্যে আপনারা দাঁড়িয়ে আছেন। ভিতরে চলুন।এই সময় সামনের একটা ঘরের দরজা খুলে গেল। ভিতরে উজ্জ্বল আলো। হৈমন্তী ডাকলেন, –পরেশ! কর্নেলসায়েবদের এই ঘরে নিয়ে এসো।ঘরের সামনে একটুকরো বারান্দা আছে। বাইরের এই বারান্দায় উঠে কর্নেল থমকে দাঁড়ালেন। পরেশবাবু বললেন,–কী হল স্যার?

কর্নেল পকেট থেকে তার খুদে কিন্তু জোরালো টর্চের আলো পায়ের কাছে ফেললেন। দেখলুম ছোট্ট একটুকরো ইটের সঙ্গে বাঁধা ভাজকরা একটা হলদে কাগজ। কর্নেল সেটা কুড়িয়ে নিয়ে বললেন,–এটা সরলা বা তোমাদের চোখের পড়ার মতো জায়গায় কখন কেউ রেখে গেছে। দেখা যাক, এতে কী আছে।ঘরে ঢুকে দেখলুম একপাশে একটা তক্তাপোশ। তাতে সতরঞ্চি বিছানো আছে।

আর একটা পুরোনো নড়বড়ে টেবিল, চারটে তেমনই নড়বড়ে চেয়ার। দেওয়ালে পুরোনো একটা ক্যালেন্ডার ঝুলছে। দেওয়ালের তাকে ঠাসাঠাসি কী সব বই। পরেশেরই কথায় আমরা তক্তাপোশে বসলুম। কর্নেলের তাগড়াই শরীরের চাপে চেয়ার যে ভেঙে যেত, তা পরেশবাবু বিলক্ষণ জানেন মনে হল।হৈমন্তী ও সরলা দুজনে ততক্ষণে সম্ভবত রান্নাঘরে আমাদের জন্য চা করতে গেছেন। বাবুগঞ্জের শীতটা এতক্ষণে আমাকে বাগে পেয়েছে। জ্যাকেটের জিপ টেনে দিলুম।

কর্নেল ইটের টুকরো থেকে সাবধানে ভাঁজ করা কাগজটা খুলে ফেলেছেন। চোখ বুলিয়ে তিনি পরেশবাবুকে দিলেন। পরেশবাবু পড়ার পর বললেন,–কাদের এত স্পর্ধা? এভাবে চিঠি লিখে হিমিদিকে হুমকি দিয়েছে! সুবিমল ব্যস্তভাবে চাপাস্বরে জিজ্ঞেস করল,–কী লিখেছে? কী লিখেছে? আমিও না বলে পারলুম না,–চিঠিটা একবার দেখতে পারি? পরেশবাবু চিঠিটা আমাকে দিলেন। দেখলুম, হলদে কাগজটার উল্টোপিঠে কীটনাশক ওষুধের বিজ্ঞাপন। খালি পিঠে লাল কালিতে লেখা আছে। ইংরাজিতে একটা লাইন।

HE ME BONETK এই লাইনটা পড়ে বললুম,–কর্নেল! নোকটা রসিক। ইংরাজিতে যা লিখেছে, তা পড়লে হবে ‘হিমি বোনটিকে’। অদ্ভুত রসিকতা তো!পরেশবাবু বললেন,–এবার বাকিটা পড়ুন। রসিকতা না স্পর্ধা বুঝতে পারবেন।কর্নেল একটু হেসে বললেন,–জয়গোপালবাবুর মতোই ছিটগ্রস্ত।সুবিমল আগের মতো ব্যস্তভাবে বলল,–পড়ুন না জয়ন্তবাবু, কী লিখেছে?বললুম,–পদ্য বলে মনে হচ্ছে।

কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। তুমি পদ্যের মতো পড়ো। এই যে হৈমন্তীদেবীও এসে পড়েছেন। আমরা চা খাই। আপনি পদ্য শুনুন। সরলা কোথায়? তাকেও ডাকা উচিত।হৈমন্তী বললেন,–শ্মশানঘাটের সাধুবাবাকে চা পাঠাতে দেরি হয়েছে। সরলা তাকে চা দিতে গেল।–শ্মশানঘাটের সাধুবাবা? –আজ্ঞে হ্যাঁ। উনি রাত্তিরে এখানে দু-মুঠো খেয়ে এই ঘরে শুয়ে থাকেন। আবার ভোরবেলা চলে যান। সারাদিন তপ-জপ করেন। ওঁর সেবাযত্ন আমিই করছি।

তা কর্নেলসায়েব পদ্যের কথা বলছেন। কী পদ্য? পরেশবাবু বললেন,–কোনো বজ্জাত তোমাকে হুমকি দিয়ে পদ্য লিখেছে। ওই কাগজটা সুতোয় জড়িয়ে ইটের টুকরোতে বেঁধে বারান্দায় কখন সে রেখে গিয়েছিল।কর্নেল বললেন, আপনাকে লেখা চিঠি আপনি পাবেন। আগে কানে শুনে নিন। পড়ো জয়ন্ত!চিঠিটাতে লেখা পদ্য ছন্দ মিলিয়ে পড়তে শুরু করলুম।

কর্নেল নীলাদ্রি সরকার………. তাঁহাকে ডাকার কী দরকার……. প্রাণ যদি চাও গোপালদার……. সিন্দুক খুলবে ঠাকুরদার……. দর্শন পাবে দুই পাদুকার…….. জঙ্গলে পোডড়া-ভিটে সাধুখাঁর……. নিশিরাতে ঠিকঠাই রাখবার…….. হুঁশিয়ার পুলিশকে ডাকবার……. চেষ্টাটি করলে গোপালদার ………. মুন্ডুটি ধড় ছেড়ে যাবে তার…….. হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার……… কর্নেল বললেন,–চিঠিটা ওঁকে দাও জয়ন্ত!

হৈমন্তীদেবীর হাতে চিঠিটা দিয়ে চায়ে চুমুক দিলুম। তারপর লক্ষ করলুম, হৈমন্তী চিঠিটাতে দ্রুত চোখ বুলিয়ে বললেন,–কর্নেলসায়েব! এ তো ভারি অদ্ভুত ব্যাপার! গোলমেলে ঠেকছে।কর্নেল বললেন, আগে বলুন কোথায় জঙ্গলে কোনো সাধুখাঁর পোড়ো-ভিটে আছে নিশ্চয় আপনি জানেন? -হ্যাঁ।

পুরোনো জমিদারবাড়ির ওধারে হরনাথ সাধুখাঁ নামে এক ব্যবসায়ীর বাড়ি ছিল। এখন তো সেই জমিদারবাড়ি ধ্বংসস্তূপ। হরনাথবাবু এখন বাজারে এসে বাড়ি করেছেন। চাল-ডাল এসবের আড়তদারি ব্যবসা করেন তিনি।–আপনার ঠাকুরদার সিন্দুক কোথায় আছে? হৈমন্তীদেবী কর্নেলের দিকে একবার তাকিয়ে মুখ নামালেন। তারপর মাথা নেড়ে আস্তে বললেন,–জানি না।

–আপনার ঠাকুরদার উইল আমি আপনার দাদার কাছ থেকে নিয়ে দেখেছি। তাতে একটা প্রাচীন সিন্দুকের কথা আছে। কিন্তু অদ্ভুত একটা ব্যাপার লক্ষ করলুম। আপনাদের তিনকামরা বাড়িটা একতলা। অথচ উইলে লেখা আছে, বাড়ির একটা অংশ দোতলা। সেই অংশের একতলায় সিন্দুকটা আছে।

পরেশবাবু বললেন, আমি তো এ বাড়িতে ছোটবেলায় কতবার এসেছি। দোতলায় কোনো ঘর দেখিনি। যদি আমার জন্মের আগে কোনো অংশ দোতলা থাকত, সে কথা নিশ্চয় জানতে পারতুম।হৈমন্তীদেবী গম্ভীরমুখে বললেন,–দোতলা ঘর থাকলে তা ভেঙে যাওয়ার কোনো চিহ্ন থাকত। আমি উইল দেখেছি। ওটা যে মুহুরিবাবু লিখেছিলেন, তারই ভুল বলে আমার ধারণা।

কর্নেল বললেন, আপনার দাদার কী ধারণা, জানেন? –দাদার বিশ্বাস, সিন্দুকটা কোনো ঘরে পোঁতা আছে।–আপনার ঠাকুরদার পাদুকা অর্থাৎ জুতোর ব্যাপারটা কী, আপনি জানেন?–নাঃ! দাদা আসবার পর তার অনেকগুলো জুতো হারিয়েছিল। তারপর দাদা নিজেই হারিয়ে গেল। শেষে এই চিঠি। কে বা কারা দাদাকে কোথায় বন্দি করে রেখে ঠাকুরদার জুতো দাবি করছে–কিছু বুঝছি না।–পরেশ! পুলিশ কি জয়গোপালবাবুর অন্তর্ধানের কোনো হদিস পেয়েছে?

পরেশবাবু বললেন,–বাবুগঞ্জে হরেন নামে একজন গোয়ালা আছে। সে দুধের কারবার করে। রোজ কলকাতা যাতায়াত করে সে। সে পুলিশকে বলেছে, প্ল্যাটফর্মে ভিড়ের মধ্যে গোপালদাকে সে দেখেছিল। আর মকবুল নামে একটা লোক ডিমের কারবারি। সে স্টেশনের পিছনে বাসে চাপবার সময় গোপালদাকে দেখতে পেয়েছিল। গোপালদা হন্তদন্ত হেঁটে একটা প্রাইভেট কারের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তখন বাস ছেড়ে দেয়। কাজেই মকবুল আর কিছু দেখতে পায়নি। কাজেই পুলিশ ঠিকই সন্দেহ করেছে, গোপালদা কারও প্রাইভেট কারে চেপেছিলেন। সে-ই তাকে সুযোগ পেয়ে অপহরণ করেছে।

–গাড়ির রং কী গাড়ি, তা কি মকবুল লক্ষ করেছিল? –গাড়িটার যা বর্ণনা মকবুল দিয়েছে, তাতে অ্যামবাসাডার বলে মনে হয়েছে। গাড়িটার রং তত সাদা নয়। মেটে রঙের। এখন সমস্যা হল, বাবুগঞ্জে আজকাল অসংখ্য গাড়ি আছে। হিমিদির সন্দেহ অবনী মুখুজ্যের গাড়ি। কিন্তু তার অ্যামবাসাড়ার গাড়ি নেই। সাদা রঙের মারুতি আছে।

বলে পরেশবাবু ঘড়ি দেখলেন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–হিমিদি! আমাকে সাড়ে সাতটার বাসে কলকাতা ফিরতে হবে। কর্নেলসায়েব! আমি একদিনের ছুটি নিয়ে এসেছিলুম। আপনি যখন এসে গেছেন, আমি নিশ্চিন্ত! বাবুগঞ্জ থানার ও.সি. বাসুদেব ঘোষ এখানে আপনার আসবার কথা জানেন। পুলিশ সুপার তাঁকে খবর দিয়েছেন। বাসুদেববাবু সেচ-বাংলোেয় আপনার সঙ্গে আজ রাত্রেই দেখা করতে যাবেন।

পরেশবাবু হৈমন্তীদেবীর সঙ্গে বাড়ির ভিতরে গেলেন। সেই সময় সুবিমল চাপাস্বরে বলল, –স্যার! আমার একটা সন্দেহ হচ্ছে। কর্নেল বললেন,–কী সন্দেহ? –হিমিদির ঠাকুরদার সিন্দুক কোথায় লুকোনো আছে তা হিমিদি হয়তো জানেন।–কী করে বুঝলে? –হিমিদির চোখ-মুখ দেখে। সিন্দুকের কথা শুনেই উনি কেমন যেন চমকে উঠেছিলেন।

কর্নেল কিছু বলার আগেই একটা ব্রিফকেস হাতে নিয়ে পরেশবাবু এলেন। তারপর আমাদের কাছে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। হৈমন্তীদেবী বাইরের বারান্দায় গিয়ে তাকে বললেন,–তোমাকে টেলিফোন করে সব জানাব পরেশ। তিনি ভিতরে এলে কর্নেল বললেন, –হৈমন্তীদেবী! ওই পদ্যে লেখা চিঠিটা আমার দরকার। আপনার দাদাকে উদ্ধার করার জন্য ওটা একটা মূল্যবান সূত্র। তবে একটা কথা। পুলিশকে এই চিঠির কথা যেন জানাবেন না।

চিঠিটা হৈমন্তীদেবীর হাতের মুঠোয় ছিল। তিনি কর্নেলকে সেটা দিলেন। এই সময় সরলার, সাড়া পাওয়া গেল। সে বাইরের বারান্দায় উঠে ঘরে ঢুকল! তার হাতে ছোট একটা কেটলি আর কাঁচের গেলাস। সে বলল,–গিয়ে দেখি শ্মশানঘাটে ধুনির আগুন আছে। কিন্তু সাধুবাবু নেই। ডাকাডাকি করে সাড়া পেলুম না।কর্নেল একটু হেসে বললেন,–সাধু-সন্ন্যাসীদের স্বভাবই এরকম। কোথায় কখন থাকেন। আবার উধাও হয়ে যান। আচ্ছা চলি। চিন্তা করবেন না। আপনার দাদাকে আশা করি শিগগির উদ্ধার করে দেব।

যে পথে গিয়েছিলুম, সেচ-বাংলোয় সেই পথেই এসেছিলুম। ঠান্ডায় আমার হাত-পা প্রায় নিঃসাড়। সুবিমল ঠাকমশাইকে কফির তাগিদ দিয়ে রুমহিটারের সুইচ অন করে দিল। তারপর সে বেরিয়ে গেল। তখন কর্নেলকে চাপাস্বরে জিজ্ঞেস করলুম,হালদারমশাইয়ের কানে কী ফুসমন্তর দিলেন যে উনি শ্মশানঘাট থেকে উধাও হয়ে গেলেন? কর্নেল একটু হেসে বললেন,–কাল বাবুগঞ্জে এসেই হালদারমশাই শ্মশানঘাটের ওদিকে ঝোঁপের আড়ালে সাধু সেজে গিয়েছিলেন।

তারপর শ্মশানঘাটের বটতলায় ধুনি জ্বেলে বসে ছিলেন। তাঁর বরাত ভালো। হৈমন্তীর সাধু-সন্ন্যাসীদের প্রতি খুব ভক্তি আছে। সেটা অবশ্য তাঁর পক্ষে স্বাভাবিক। তরে তার দেখাদেখি সরলারও একইরকম ভক্তি আছে। সরলা কাল বিকেলে শ্মশানঘাটে এক সাধুবাবাকে দেখে হৈমন্তীকে খবর দিয়েছিল। ব্যস্! শীতের রাতে শ্মশানঘাটে কাটানো সম্ভব ছিল না বলব না। কারণ হালদারমশাইয়ের পক্ষে পুলিশজীবনে অমন অভিজ্ঞতা হয়েছে।

কিন্তু ওখানে বসে থেকে কষ্ট করে রাত কাটিয়ে তার লাভটা কী? তার উদ্দেশ্য ছিল জয়গোপালবাবুর বাড়ির আনাচেকানাচে ওত পেতে দুবৃত্তদের পাকড়াও করা। কাজেই হৈমন্তী তার সেবাযত্ন করতে চাইলে প্রত্যাখ্যান করবেন কেন? –তাহলে গতরাতে গোয়েন্দামশাই দুবৃত্তদের সঙ্গে লড়াইয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন?–নাঃ! তারা আড়াল থেকে সম্ভবত দেখেছিল ত্রিশূলধারী এক সাধুবাবা হৈমন্তীর অতিথি!–তা উনি আজ হঠাৎ বেপাত্তা হলেন কেন? আপনার পরামর্শে? –হ্যাঁ।

হালদারমশাই আমাকে খবর দিলেন, জয়গোপালবাবু বাড়ি ফেরার পথে নিখোঁজ। তাঁর বোন থানা-পুলিশ করে বেড়াচ্ছেন। কথাটা শুনেই আমি ওঁকে পরামর্শ দিলুম, প্রাক্তন জমিদারপরিবারের ঠাকুরবাড়িতে চলে যান। খুব হুঙ্কার ছাড়বেন। তন্ত্রমন্ত্র আওড়াবেন।–তাতে কী লাভ! –মুখুজ্যেবাড়ির লোকজনের গতিবিধির খবর দৈবাৎ মিলতেও পারে।–জয়গোপালবাবুর নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে মুখুজ্যেদের কোনো যোগাযোগ আছে বলে মনে করছেন? –জানি না।

তবে চান্স নিলে ক্ষতি কী? এই সময় ঠাকমশাই ট্রেতে কফি আর পাঁপড়ভাজা এনে টেবিলে রাখলেন। তারপর বললেন,–সাহেবকে থানা থেকে ফোন করেছিল কেউ। চণ্ডী ফোন ধরেছিল।–চণ্ডী কোথায়? -আজ্ঞে সে বাড়ি চলে গেছে। কাল সকালে ইঞ্জিনিয়ারসাহেবকে জিপগাড়িতে চাপিয়ে সে কোথায় নিয়ে যাবে। গ্যারেজ থেকে জিপগাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেছে চণ্ডী। বুঝলেন স্যার? জিপগাড়িটা ইঞ্জিনিয়ারসায়েব আপনাদের জন্যই পাঠিয়েছিলেন। আপনারা গাড়ি এনেছেন শুনে ইঞ্জিনিয়ারসায়েব জিপগাড়িটা চণ্ডীকে নিয়ে যেতে বলেছিলেন।

ঠাকমশাই মাথায় মাফলার জড়িয়েছেন এবং গায়ে আস্ত একখানা কম্বল। তিনি বেরিয়ে যাওয়ার পর বললুম,–একটা ব্যাপার ভারি অদ্ভুত লাগছে।কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন,–বলো! –কিডন্যাপার হুমকি দিয়ে পদ্য লিখল কেন? সে এও জানে স্বয়ং কর্নেল নীলাদ্রি সরকার জয়গোপালবাবুর কেস নিয়েছেন এবং এখানে এসেছেন। লোকটাকে রসিক মনে হচ্ছে।কর্নেল হাসলেন,–পল্লীকবিও বলতে পারো। ছন্দ আর মিল দেখে মনে হচ্ছে, সে অনেকদিন ধরে পদ্য লেখে। অবশ্য আমার তো মনে হয়, বাঙালিরা জাতকবি।

-–আচ্ছা কর্নেল, আপনি কখনও কবিতা লিখেছেন? বাইরে সুবিমলের কণ্ঠস্বর শোনা গেল,–কার সঙ্গে কথা বলছ জগাই।–এক ভদ্রলোক সায়েবদের সঙ্গে দেখা করতে চান।কর্নেল বারান্দায় বেরিয়ে গিয়ে বললেন, কী আশ্চর্য! হালদারমশাই যে! আসুন! আসুন! সুবিমল! গেট খুলে দিতে বলো!আমি চমকে উঠেছিলাম। কিন্তু বাইরে গেলাম না। কর্নেলকে বলতে শুনলাম,–সুবিমল! পটে প্রচুর কফি আছে। একটা কাপ নিয়ে এসো! কর্নেলের পিছনে হালদারমশাই ঢুকলেন।

সাধুবাবার বেশে নয়, প্যান্ট-শার্ট-সোয়েটার কোট-হনুমানের টুপি পরে এবং কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে। বললুম,–কর্নেল বলছিলেন আপনি মুখুজ্যেদের ঠাকুরবাড়িতে।আমাকে থামিয়ে দিয়ে হালদারমশাই বললেন,–পরে কইতাছি। আগে রেস্ট লই।কর্নেল চুপচাপ বসে কফিপানে মন দিলেন। একটু পরে সুবিমল একটা কাপ-প্লেট আনল। কর্নেল বললেন,–সুবিমল! ইনি আমার বন্ধু-ওঃ হো তুমি তো দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় জয়ন্তর ক্রাইম-রিপোর্টাজ পড়ো।

তাহলে অনুমান করো নি কে? হালদারমশাই কাপে কফি ঢালতে-ঢালতে বললেন,–আইজ রাতে হেভি শীত পড়ছে।সুবিমল মুচকি হেসে বলল,–মনে পড়েছে। আপনি হালদারমশাই বলে ডাকলেন, তখন আমার অত খেয়াল ছিল না। নমস্কার স্যার। আমি বাংলোর কেয়ারটেকার সুবিমল হাজরা।গোয়েন্দা এবার হাসবার চেষ্টা করে বললেন,–বয়সে পোলাপান! আপনি কমু ক্যান? তুমিই কমু!–নিশ্চয় স্যার! আপনাদের তিনজনকে একত্রে চর্মচক্ষে দেখতে পাব তা কল্পনাও করিনি।

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন,–সুবিমল! বিকেলে শ্মশানঘাটে এঁকেই তুমি নমো করেছিল! সুবিমল চমকে উঠে বলল,–কী অদ্ভুত! ইনিই সাধুবাধা সেজে শ্মশানঘাটে বসেছিলেন! –হ্যাঁ, ওই প্রকাণ্ড ব্যাগে ওঁর জটাজুট দাড়ি-টাড়ি আছে। কিন্তু ত্রিশূল? হালদারমশাই! ত্রিশূল কোথায় ফেলে এলেন? –সব কমু। কফি খাইয়া লই। হেভি ফাইট দিছি। টায়ার্ড।কর্নেল বললেন,–সুবিমল! হালদারমশাইয়ের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।সুবিমল বলল,–কোনো অসুবিধে নেই স্যার।

ইঞ্জিনিয়ার সেনসায়েব এসে যে ঘরে থাকেন, সেই ঘরে ওঁর থাকার ব্যবস্থা করছি। আর ঠাকমশাইকে বলে আসি, একজন গেস্ট এসেছেন।সে বেরিয়ে যাওয়ার পর হালদারমশাই ফুঁ দিয়ে দ্রুত কফি শেষ করলেন। তারপর যা বললেন, তা সংক্ষেপে এই : কর্নেলের কথামতো সন্ধ্যায় হালদারমশাই শ্মশানঘাট থেকে উঠে বাবুগঞ্জের ভিতর দিয়ে হেঁটে যান। তার নিজস্ব হিন্দিতে জমিদারদের ঠাকুরবাড়ির পথ জিজ্ঞেস করে চলতে থাকেন। তারপর নিজের খেয়ালে সোজা ঠাকুরবাড়িতে না ঢুকে পিছনে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ঢুকে পড়েন। ততক্ষণে সন্ধ্যারতি শেষ হয়েছে।

হালদারমশাই পাঁচিল ডিঙিয়ে ঢুকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঠাকুরবাড়ির ভিতরের চত্বরে উজ্জ্বল আলো। তিনি কী করবেন ভাবছেন, হঠাৎ পিছন থেকে টর্চের আলো এসে তার ওপর পড়ে। বেগতিক দেখে তিনি ত্রিশূল তুলে হুঙ্কার দিয়ে তেড়ে যান। কিন্তু তার পিছন থেকে কেউ তাকে জাপটে ধরে। জোর ধস্তাধস্তি চলতে থাকে। মরিয়া হয়ে হালদারমশাই তার লাইসেন্সড রিভলভার বের করে টর্চের দিকে গুলি ছোড়েন।

টর্চের কাঁচ গুঁড়ো হয়ে টর্চ ছিটকে পড়ে। সামনের লোকটা আর্তনাদ করে ওঠে। এদিকে যে পিছন থেকে তাকে জাপটে ধরে মাটিতে ফেলেছিল, সে হালদারমশাইয়ের হাতে রিভলভার দেখে এবং গুলির শব্দ শুনে বাপরে! বাপরে! ডাকাত! ডাকাত! বলে চাচাতে-চাঁচাতে রাস্তার দিকে ছুটে যায়। লোকেরা লাঠিসোটা-বল্লম নিয়ে ছুটে আসতে পারে ভেবে হালদারমশাই ত্রিশূলের কথা ভুলে গিয়ে তার ওই ঝোলাটি চেপে ধরে দৌড়তে থাকেন।

নাক বরাবর দৌড়ে নির্জন পিচরাস্তা পেয়ে যান। তারপর টর্চের আলো জ্বেলে সামনে শালের জঙ্গল দেখে ঢুকে পড়েন। জঙ্গলের ভিতরে সাধুবাবার বেশ বদলে প্যান্টশার্ট-সোয়েটার-কোট আর হনুমান টুপি পরে জঙ্গল থেকে বেরুচ্ছেন, সেই সময় দেখতে পান, পাশের একটা মারামরাস্তা দিয়ে একটা গাড়ি আসছে। তিনি লক্ষ করেন ওটা জিপগাড়ি। হাত তুলে গাড়ি দাঁড় করিয়ে তিনি সেচ-বাংলোর কথা জিজ্ঞেস করেন। জিপের চালক বলে, এই মোরামরাস্তা ধরে চলে যান।

 

Read more

ঠাকুরদার সিন্দুক রহস্য (শেষ পর্ব) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

Leave a comment

Your email address will not be published.