তিনি ছিলেন স্বাধীন চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, লেখক এবং গীতকিার। আশির দশকের মধ্যভাগে শুরু হওয়া স্বাধীনধারা চলচ্চিত্র আন্দোলনের অগ্রগণ্য পরিচালক তিনি। তিনি চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। জাতীয় আত্মপরিচয়, লোকজ ধর্ম ও সংস্কৃতি তাঁর চলচ্চিত্রে বিশেষ গুরুত্বসহকারে চিত্রিত হয়েছে।

যেজন্য তাঁর বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রের বিষয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, যে ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের জাতীয় আত্মপরিচয় সুনির্দিষ্ট হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় তাকে বেশিরভাগ সময়েই ঢাকা আর্ট কলেজে (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) কাটাতে দেখা যেত। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই তিনি লেখক শিবির, বাম আন্দোলন এবং বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভঅবে যুক্ত থেকেছেন।
- বিশিষ্ট এই চলচ্চিত্রকার জন্মগ্রহণ করেন – ৬ ডিসেম্বর, ১৯৫৬ সালে।
- এই পরিচালকের পৈত্রিক নিবাস – ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার নূরপুর গ্রাম।
- এই পরিচালকের বাবার নাম – মশিউর রহমান মাসুদ ও মায়ের নাম নুরুন নাহার মাসুদ।
- বিশিষ্ট এই চলচ্চিত্রকারের শিক্ষাজীবন – তিনি ভাঙ্গা ঈদগা মাদ্রাসায় প্রথম পড়াশোন শুরু করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তাঁর মাদ্রাসা শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে। যুদ্ধের পর তিনি ফরিদপুরের ভাঙ্গা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অংশ নেন এবং প্রথম বিভাগে পাশ করেন। এরপর আদমজী কলেজে ভর্তি হলেও পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
- চলচ্চিত্র আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় হয় – মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল, শামীম আখতারদের সাথে।
- বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ থেকে ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স শেষ করে তিনি তাঁর প্রথম প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন – ১৯৮২ সালের শেষ দিকে।
- তাঁর প্রথম প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করতে লেগেছিল – ৭ বছর।
- প্রথম প্রামাণ্যচিত্র – ‘আদম সুরত’।
- তাঁর প্রথম প্রামাণ্যচিত্র ‘আদম সুরত’ মুক্তিপ্রাপ্ত হয় – ১৯৮৯ সালে।
- ’আদম সুরত’ প্রামাণ্যচিত্রটি ছিল প্রখ্যাত বাংলাদেশী শিল্পী – এস এম সুলতানের জীবনের উপর।
- বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় একটি ভ্রাম্যমাণ গানের দলকে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র – ‘মুক্তির গান’।
- ’মুক্তির গান’ চলচ্চিত্রের নির্মাতার নাম – তারেক মাসুদ।
- তিনি মুক্তিযুদ্ধের ফুটেজনির্ভর প্রামাণ্যচিত্র ’মুক্তির গান’ নির্মণ করেন – ১৯৯৫ সালে।
- তিনি ১৯৭১ সালে মার্কিন নির্মাতা লিয়ার লেভিনের ক্যামেরাবন্দী ফুটেজের সাথে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংরক্ষণাগার থেকে ফুটেজ জুড়ে দিয়ে নির্মাণ করো হয় – ‘মুক্তির গান’ প্রামাণ্যচিত্রটি।
তারেক মাসুদ এর জীবনী ও সাহিত্যকর্ম
- ‘মুক্তির গান’ ”ফিল্ম সাউথ এশিয়া” থেকে বিশেষ সন্মাননা অর্জন করে – ১৯৯৭ সালে।
- ’মাটির ময়না’ চলচ্চিতের নির্মাতা – ‘মাটির ময়না’।
- তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র – ‘মাটির ময়না’।
- তাঁর শৈশবে মাদ্রাসা জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্মিত হয় – ‘মাটির ময়না’
- ’মাটির ময়না’ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় – ২০০২ সালে।
- কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় – ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রটি।
- ”একটি দেশের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামের হৃদয়স্পর্শী ও স্বচ্ছ উপস্থাপনা”র জন্য ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট লাভ করেন – তারেক মাসুদ।
- কান চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার প্রাপ্ত প্রথম বাংলাদেশী চলচ্চিত্র – ‘মাটির ময়না’।
- মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত তাঁর আত্মজৈবনিক – ‘মাটির ময়না’।
- কান চলচ্চিত্র উৎসবে ’ফিপ্রেস্কি’ আন্তর্জাতিক সমালোচক পুরস্কারের আওতায় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার অর্জন করেন – তারেক মাসুদ।
Biography of Tareq Masood
- তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন – ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রের মাধ্যেমে।
- অস্কারে প্রথম বাংলাদেশী বাংলা ভাষার চলচ্চিত্র – ‘মাটির ময়না’।
- বাংলাদেশ থেকে অস্কারের বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র শাখায় নিবেদন করা দ্বিতীয় বাংলাদেশী চলচ্চিত্র – ’মাটির ময়না’।
- দেশে ছড়িয়ে পরা জঙ্গিবাদ ও এর প্রভাব নিয়ে নির্মাণ করেন – ’রানওয়ে’।
- এক যুবককে ইসলামী শিক্ষার আড়ালে জঙ্গিবাদে উদ্ধুদ্ধ করার গল্প – ‘রানওয়ে’।
- তাঁর ডকুমেন্টারির মধ্যে রয়েছে – ‘আ কাইন্ড অফ চাইর্ডহুড’ (২০০২), ‘নারীর কথা’ (১৯৯৯), ’ইন দ্য নেইম অফ সেফিট’ (১৯৯৮) প্রভৃতি।
- বাংলাদেশের কর্মজীবী শিশুদের উপর প্রামাণ্যচিত্র – ‘ভয়েসেস অফ চিলড্রেন’ (১৯৯৭)।
- তাঁর নির্মিত মানবজাতির ঐক্যের উপর এনিমেশন চলচ্চিত্র – ’ইউনিসন’ (১৯৯৪)।
- স্বাধীনতা যুদ্ধে সাধারণ গ্রামীণ জনগণের অভিজ্ঞতা – ‘মুক্তির কথা’।
- ‘Let there be light’ একটি – প্রামাণ্য চিত্র।
- ‘Let there be light’ প্রামাণ্য চিত্রের রচয়িতা – তারেক মাসুদ।
- ’নরসুন্দর’ একটি – চলচ্চিত্র।
- তাঁর ‘নরসুন্দর’ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় – ২০০৬ সালে।
তারেক মাসুদ এর জীবনী ও সাহিত্যকর্ম
- ’নরসুন্দর’ স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রে প্রাধান্যশীল মুক্তিযুদ্ধের বায়ানের বিনির্মাণ দেখা যায় – পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকরদের ধাওয়া খেয়ে পলায়নরত এক মুক্তিযোদ্ধাকে তাদের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয় বিহারী নরসুন্দররা, যাদের সম্পর্কে সাধারণ ধারণা আছে যে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল।
- বাংলাদেশের প্রথম ভিডিও চলচ্চিত্র, প্রথম অ্যানিমেশন-চিত্র এবং প্রথম ডিজিটাল চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন – তারেক মাসুদ।
- সোনার বেড়ি’ (১৯৮৫)-বাংলাদেশের প্রথম ভিডিও চলচ্চিত্র ।
- বাংলাদেশের প্রথম অ্যানিমেশন-চিত্র – ‘ইউনিসন’ (১৯৯৪)।
- ‘অন্তর্যাত্র’-বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল চলচ্চিত্র ’।
- স্বল্পদৈর্ঘ্য, পূর্ণদৈর্ঘ্য, প্রামাণ্যচিত্র ও অ্যানিমেশন মিলিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন – ১৬ চলচ্চিত্র।
- সমসাময়িক বাংলাদেশের নানান ইস্যুকে মোকাবেলা করা হয়েছে, বিশেষত ২০০৪-০৫ সালের জঙ্গিবাদের সমস্যাসে আলোকপাত করা হয়েছে – ’রানওয়ে’ চলচ্চিত্রে।
Biography of Tareq Masood
- তিনি ‘মুক্তির গান’ চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান – ১৯৯৬ সালে।
- তিনি ২০০৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান – ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রের জন্য।
- তাঁর প্রাপ্ত পুরস্কার ও সন্মাননার মধ্যে রয়েছে – ’বাচাসস পুরস্কার’ (চলচ্চিত্র- ’মাটির ময়না’ ২০০৩), ‘চ্যালেন আই চলচ্চিত্র পুরস্কার’ (২০০৩), ’ভারতীয় আন্তর্জাতিক ভিডিও উৎসব’ (’জুরি পুরস্কার, ২০০৩), ‘কারা চলচ্চিত্র উৎসব’ (শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, ২০০৩), ’কেরালা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’ (গোল্ডেন ক্রো ফিজেন্ট, ২০০৩), ‘ডিরেক্টরস গিল্ড অব গ্রেট ব্রিটেন’ (শেষ্ঠ বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্রের পরিচালক, ২০০৪), ‘ইন্টরন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অব বাংলাদেশ’ (শ্রেষ্ঠ পরিচালক, ২০০৬), ’সিনেফান ফেস্টিভ্যাল অব এশিয়ান অ্যান্ড আরব সিনেমা’ (বিশেষ পুরস্কার, ২০০৬) প্রভৃতি।
- বিশিষ্ট এই চলচ্চিত্রকার মৃত্যুবরণ করেন – ১৩ আগস্ট, ২০১১ সালে তাঁর পরবর্তী চলচ্চিত্র ‘কাগজের ফুল’-এর সুটিংস্পট নির্বাচন করে ফেরার পথে মানিকগঞ্জের ঘিওরে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হন।