তিথির নীল তোয়ালে-পর্ব-(২) হুমায়ূন আহমেদ

ছেলেটা লাফ দিয়ে ওঠে দাঁড়ালোগায়ে খয়েরী রঙের চাদরগলায় টকটকে লাল রঙের মাফলারচোখে সানগ্লাস থাকলে ষােলকলা পূর্ণ হতবুক পকেটে আছে নিশ্চয়ই

তিথির নীল তোয়ালে

এদের আর কিছু থাকুক না থাকুক সানগ্লাস থাকে। 

জাফর সাহেবের অনুমান মিথ্যা হল নাসে পা ছুঁয়ে সালাম করবার জন্য নিচু হতেই বুক পকেট থেকে একগাদা ভাংতি পয়সা, চাবীর রিং এবং একটা সানগ্লাস পড়ে গেলজাফর সাহেব থমথমে গলায় বললেন, তুমি কে

আমার নাম জামাননুরুজ্জামানভাল কথাব্যাপারটা কি? মুরগি তুমি এনেছ?‘ 

জিআমার বাড়ি অতিথপুর, ঢাকায় একটা কাজে আসছি আপনার আব্বা মুরগী দিয়ে দিলেনবললেন, নিয়ে যাও। 

নুরুজ্জামান দাঁত বের করে হাসছেপান খাওয়া লাল দাতজাফর সাহেবের ইচ্ছা হচ্ছে ধমক দিয়ে ছােকড়ার হাসি বন্ধ করেন। 

এত দূর থেকে মুরগি আনার দরকার কি? ঢাকায় কি মুরগি পাওয়া যায় না? উনি আপনাকে একটা চিঠিও দিয়েছেন। 

তিথির নীল তোয়ালে-পর্ব-(২) হুমায়ূন আহমেদ

দেখি চিঠি। 

জাফর সাহেব চিঠি নিলেনতাঁর মেজাজ আরাে খারাপ হলচিঠি একটি ব্যক্তিগত ব্যাপারখামে বন্ধ করে যার চিঠি তাঁর কাছে দিতে হয়এই সামান্য ব্যাপারও তাঁর বাবার মাথায় এখন ঢুকছে নাকারণটা কি? মস্তিষ্ক বিকৃতি শুরু হল নকি ? জাফর সাহেব ভুরু কুঁচকে অতি দ্রুত চিঠির উপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে 

গেলেন – 

বাবা জাফর, দোয়া নিওনুরুজ্জামানের সঙ্গে কয়েকটা মুরগি এবং কিছু ডিম পাঠালামঢাকায় নুরুজ্জামানের কিছু কাজ আছেতাকে সাহায্য করবেসে কয়েকদিন থাকবেতােমার বাসাতেই রাখাব্যবস্থা করদরিদ্র ছেলে, ঢাকায় আত্মীয়স্বজনও নেই। 

বৌমার চিঠিতে জানলাতােমার প্রেসারের সমস্যা হয়েছেআধুনিক জীবনযাপনের এই হল ফলপাখিমত আহার করবে, গাড়ি করে আফিসে গিয়ে কিছু কাগজপত্র সই করে ফিরে আসবেখানিকক্ষণ টিভি দেখে ব্লপিং পিল খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে প্রেসার তাে হবেইআমার এত বয়স হল, এখনাে তো জাতীয় কোন সমস্যা হয়নিশুনলাম, আজকাল তুমি অল্পতেই হৈচৈ চেঁচামেচি কর, এটাও 

তে ভাকথা না!... চিঠি আর পড়তে ইচ্ছা করছে নাচিঠি মানে উপদেশপাঁচপঞ্চাশ বছরের ছেলেকে এত উপদেশ দেয়া যায় না, এটা উনাকে কে বুঝিয়ে দেবে? জাফর সাহেব 

নুরুজ্জামানের দিকে তাকালেন। 

তিথির নীল তোয়ালে-পর্ব-(২) হুমায়ূন আহমেদ

সে এখনাে দাঁড়িয়ে আছেধপ করে সােফায় বসে পড়েনিযাক এইটুকু ভদ্রতা তাহলে আছে! নুরুজ্জামান হড়বড় করে বলল, ১৮টা ডিম দিয়েছিলেন এখনসতেরোটা আছেএকটা ভেঙ্গে গেছে। 

জাফর সাহেব লক্ষ্য করলেন সােফার এক কোনায় ডিমের পুটলিভাঙ্গা ডিম থেকে হলুদ রস বের হয়ে সােফায় নিশ্চয়ই লেগেছে। 

ঢাকায় কত দিন থাকবে

কিছুদিন থাকতে হবে, স্যারকিছুদিন মানে কত দিন? বি স্পেসিফিকচার পাঁচ দিনএটা হচ্ছে ফ্ল্যাট বাড়িআমার স্ত্রী বর্তমানে বাসায় নেই, কাজের লােকও নেই এখানে থাকলে তােমার সমস্যা হবে ...। 

নুরুজ্জামান হাসিমুখে বলল, আমার কোন অসুবিধা হবে নাপ্রয়ােজনে কার্পেটে শুয়ে থাকবনরম কাপেট। 

এই কার্পেট শােয়ার জন্যে নাভাল কথা জুতা পরে এই কার্পেটে উঠবে নাতুমি কর কি

আমি অতিথপুর গার্লস হাইস্কুলের হেড মাস্টার। 

জাফর সাহেব বিস্মিত হলেন একুশবাইশের মত বয়স বলে মনে হচ্ছে এই ছেলে হেড মাস্টারতার মানে কি? তিনি বললেন, অতিথপুরে মেয়েদের হাইস্কুল আছে নাকি

এখনো স্কুল হয় নাইশুধু জমি পাওয়া গেছেমেয়েদের স্কুলের জন্যে একজন পঞ্চাশ ডেসিমেল জমি দান করেছেসবাই আমাকে ধরল তুমি জোগাড়যন্ত্র করে স্কুল দাড়া করায়ে দাও ... এই জন্যেই ঢাকায় আসছি। 

বুঝলাম নাঢাকায় এসে কি হবে

স্কুলের স্যাংশান লাগবেস্কুল ঘর তােলার জন্যে সাহায্য যদি কিছু পাওয়া যায়শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে একটু দেখা করব। 

তিথির নীল তোয়ালে-পর্ব-(২) হুমায়ূন আহমেদ

জাফর সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন, তুমি যে ভাবে কথা বলছ তাতে মনে হয় শিক্ষামন্ত্রী তােমার সঙ্গে দেখা করার জন্যে ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করছেন। 

আপনি একটু চেষ্টা চরিত্র করলে ....আমি চেষ্টা করলেও কিছু হবে নাশিক্ষামন্ত্রী কোন বাড়ির কাছের ব্যাপার নামন্ত্রীদের কোন দায় পড়েনি অতিথপুরের নুরুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করারতাদের 

আরাে কাজ আছেবুঝতে পেরেছ

জ্বি স্যার। 

আমার মনে হয় তােমার যা করা উচিত তা হল স্থানীয় এম.পি.সঙ্গে যােগাযোগ করামন্ত্রী অনেক বড় ব্যাপার‘ 

তবু আসলাম যখন একটু চেষ্টা করে দেখি। 

জাফর সাহেব বললেন, তােমার পড়াশােনা কতদূর? বি.. পাশ করেছিগৌরীপুর কলেজএম.. পাশ করার ইচ্ছা ছিল, টাকা পয়সা জোগাড় করতে পারলাম নামানুষের সব ইচ্ছা তো আর ...  নুরুজ্জামান কথা শেষ করল নাসােফায় বসে জুতা খুলতে লাগলজুতা জোড়া রেখে এল কার্পেটের বাইরেঅর্থাৎ এটা মোটামুটি নিশ্চিত যে সে এখানে কিছুদিন থাকবেটকটকে লাল রঙের মােজা দেখা যাচ্ছেকোন সুস্থ মাথার লােক এরকম মোজা পরে ? নতুন মােজাএক কোনায় এখনো লেবেল লাগানােলেবেল খুলেনিকিংবা কে জানে এরা হয়ত লেবেল খুলে না। 

সে এখন হ্যান্ডব্যাগের চেইন খুলছেজাফর সাহেব মনে মনে বললেন, গাধা! বসার ঘর থেকে বের হয়ে এলেনগাধাটা এখন নিশ্চয় লুঙ্গি বের করে পরে ফেলবেসােফার টেবিলে পা তুলে নখ কাটবেপকেটের ভাংতি পয়সার সঙ্গে একটা নেল কাটারও কার্পেটে পড়েছেএই জাতীয় লােকজন কোন কাজকর্ম না থাকলে বসে বসে নখ কাটেসেই কাটা নখ এসট্রেতে জমা করে রাখে। 

তিথি বলল, কি হল বাবা? মুখ দেখে মনে হচ্ছে ভয়াবহ কিছু ঘটে গেছেভদ্রলােক কিছুদিন এখানে থাকবেন তাই না

গেষ্ট রুম দেখিয়ে দেব?দেখিয়ে দে” 

রাতে ভাত খাবে ? খাবে তো বটেইদুজনের মত ভাত আছেআবার চড়াতে হবে। 

Leave a comment

Your email address will not be published.