তিথির নীল তোয়ালে-পর্ব-(৩) হুমায়ূন আহমেদ

জাফর সাহেব বললেন, আমি ভাত খাব নাগাধাটাকে খাইয়ে দেগাধা বলছ কেন

শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেস্কুল স্যাংশান করিয়ে সে গ্রামে মেয়েদের হাইস্কুল দেবেসেই নাকি হাইস্কুলের হেড মাস্টার। 

তিথির নীল তোয়ালে

তুমি বেশি রেগে যাচ্ছ, বাবাএসাে তুমি তােমার ঘরে শুয়ে থাকশুয়ে শুয়ে তােমার Self control বইটা পড়। 

তাের মা টেলিফোন করেছিল? নাআমি টেলিফোন করব?’ 

কোন দরকার নেইলেট দেম গাে টু হেলতাের মাব্যাপারে আমি হাত ধুয়ে ফেলেছি। 

আমার কি মনে হয় জান বাবা? আমার মনে হয় তােমারই উচিত মাকে টেলিফোন কররাগারাগি তুমি করেছ, মা করেনি। 

টেলিফোন করে কি বলব আই এ্যাম সরি ?” 

কিচ্ছু বলতে হবে নাটেলিফোন করলেই মারাগ পড়ে যাবেতারপর যখন শুনবে রাশেদা চলে গেছেবাসায় একজন অতিথি তখন সব সামলাবার জন্যে নিজেই আসবেনকরব টেলিফোন?” 

তিথির নীল তোয়ালে-পর্ব-(৩) হুমায়ূন আহমেদ

জাফর সাহেব কিছু বললেন নাতিথি টেলিফোন সেট বাবার সামনে থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেলমাসঙ্গে কথা বলার সময় যেন বাবা শুনতে না পানশায়লা টেলিফোন ধরলেনতিথি বলল, কেমন আছ মা

শায়লা ভারী গলায় বললেন, ভাল রাগ কমেছে ?” 

রাগ কমাকমির এর মধ্যে কি আছে! বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছি যখনপুরােপুরিই এসেছিতুই কি ভেবেছিস সুরসুর করে ফিরে আসব? তুই ভেবেছিস কি? তাের বাবা এক মাইল দূর থেকে ক্রলিং করে এসে আমার পায়ে ধরলেও লাভ হবে না। 

তােমার রাগ তাে কমে নি মা, বরং বেড়েছেএদিকে বাবা পুরােপুরি ঠাণ্ডামুখ শুকনাে করে ঘুরে বেড়াচ্ছেনতােমার সঙ্গে কমপ্রমাইজে আসতে চানআমাকে বললেন, তাের মাকে টেলিফোন করআমি নিজের ইচ্ছেয় টেলিফোন করিনি, মাবাবা করালাে| তুই তাের বাবাকে বল, আমি কোনদিনও তার সাধের ফ্ল্যাট বাড়িতে ঢুকবো নাকতবড় সাহস, আমার মেয়েদের সামনে আমাকে বলে ব্রেইনলেস ক্রিয়েচার ! ব্রেইনলেস ক্রিয়েচার বলা বাবার মুদ্রাদোষ

তিথির নীল তোয়ালে-পর্ব-(৩) হুমায়ূন আহমেদ

রাশেদাকেও বাবা ব্রেইনলেস ক্রিয়েচার বলেছেনএবং রাশেদাও বিদেয় হয়ে গেছেমা আমরা দারুণ বিপদে পড়েছিএদিকে গোদের উপর ক্যানসারের মত অতিথপুর থেকে এক অতিথি এসে উপস্থিতউনার হবি হচ্ছে মন্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলাউনি জানিয়েছেন ঢাকার সব মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা না বলে উনি বিদেয় হবেন না। 

চুপ করখামাখা বক বক করিস নাশুধু শুধু এত কথা বলিস কেন?বাবার সঙ্গে সত্যি কথা বলবে না, মা

মা, একটা কথা বলি, শােনতুমি কি একটু ওভার রিএক্ট করছ না? তুমি পঁচিশ বছর ধরে বাবার সঙ্গে আছ, তুমি তাে জান চট করে রেগে যাওয়া বাবার স্বভাবরেগে যায়, আবার রাগ চলেও যায়কখনাে রাগ পুষে রাখে নারাগ পুষে রাখার ব্যাপারটা কর তুমি। 

তিথির নীল তোয়ালে-পর্ব-(৩) হুমায়ূন আহমেদ

তুই আমাকে উপদেশ দিচ্ছিস?উপদেশ দিচ্ছি না, মাআর উপদেশ দিলেও তুমি সেই উপদেশ শােনার পাত্র বাবা তােমাকে ব্রেইনলেস ক্রিয়েচার বলাতে তুমি বাড়িঘর ছেড়ে চলে গেলে বাবা তো কোন কারণ ছাড়া হঠাৎ রেগে গিয়ে তােমাকে ব্রেইনলেস ক্রিয়েচার বলেনি ... সব মিলিয়ে বিচার করে দেখ নিশ্চয়ই তুমি এমন কিছু করেছ যেখান থেকে বাবার ধারণা হয়েছে ...

তুই আমাকে বিচার করা শেখাচ্ছিস! তাের এতবড় সাহস! তুই আমাকে..

এত চেঁচাচ্ছ কেন, মা? আমি তাে চেঁচাচ্ছি নাঠিক আছে মা, তুমি বেশি রেগে যাচ্ছআমি রাখি, পরে কথা বলব” 

খবর্দার ! টেলিফোন রাখবি নাটেলিফোন ধরে থাক। 

আচ্ছা মা, টেলিফোন ধরে আছিবল কি বলবেশান্তভাবে বল, মা

মামারা কি মনে করবে

তিথি টেলিফোন ধরে রইলশায়লা বললেন, খবর্দার, কোনদিন তুই আমার সঙ্গে কথা বলবি নাকোনদিন না। 

আচ্ছা বলব না” 

আর তুই তাের বাবাকে বলবি তাকে আমি শিক্ষা দিয়ে ছাড়বকত ধানে কত চাল বুঝিয়ে দেবমাথা কামিয়ে তাকে আমার সামনে আসতে হবেকতবড় সাহস আমাকে চাকর বাকরের সামনে অপমান করে। আমাকে স্টুপিডবলেষ্টুপিড পানিতে গুলে তাকে খাইয়ে দেব। 

তিথির নীল তোয়ালে-পর্ব-(৩) হুমায়ূন আহমেদ

শায়লা ঘটাং করে টেলিফোন রাখলেন। 

তিথি বাবার ঘরে ঢুকলজাফর সাহেব বিছানায় শুয়ে পড়েছেনহাতে সত্যি সত্যি self controlএর বইতিথিকে ঢুকতে দেখেই আগ্রহ নিয়ে বললেন, কথাহয়েছে তােমার সঙ্গে

হ্যাঁ হয়েছেকি বলল

তিথি ইতস্তত করে বলল, তেমন কিছু বলেনিতবে মনে হয় তাঁর নিজের আচারআচরণে খানিকটা লজ্জিতএখন লজ্জায় পড়ে টেলিফোনও করতে পারছে ফিরেও আসতে পারছে নাতুমি বরং কাল নিজে গিয়ে নিয়ে সােপ্রথমে হয়ত খানিকক্ষণ মিথ্যা রাগ দেখিয়ে চেঁচামেচি করবেতুমি পাত্তা দিও না। 

তিথি লক্ষ্য করল তার বাবার মুখ থেকে অন্ধকার অনেকখানি সরে গেছেবাবার অনন্দিত মুখের দিকে তাকিয়ে বড় মায়া লাগছেমা কেন যে এই মানুষটার উপর রাগ করে

জাফর সাহেব ইতস্ততঃ করে বললেন, ইরা আর মীর ওরা কি আমার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছিল

হ্যাঁ বাবা, চাচ্ছিলআমিই তােমাকে দেইনিমাসঙ্গে কথা না বলে ওদের সঙ্গে কথা বললে মা রেগে যাবেতুমি যেমন ফট করে রেগে যাও, মাও তাে সে রকম রাগে। 

তিথির নীল তোয়ালে-পর্ব-(৩) হুমায়ূন আহমেদ

দ্যাটস টুতুই যা, ছেলেটার ঘর দেখিয়ে দেতিথি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে রওনা হল। 

নুরুজ্জামান লুঙ্গি পরে সােফার এক কোণায় চুপচাপ বসে আছেতিথিকে দেখে আগের মত লাফ দিয়ে দাঁড়ালতিথি বলল, আসুন, আপনাকে আপনার থাকার ঘর দেখিয়ে দিচ্ছিসরি, অনেকক্ষণ একা একা বসিয়ে রেখেছি। 

নুরুজ্জামান মেয়েটির ভদ্রতায় মুগ্ধ হয়ে গেলঅনেকক্ষণ একা একা বসিয়ে রেখেছিকি সুন্দর করে কথাগুলি বললবলার কোন দরকার ছিল নাতাকে তাে একা একাই বসিয়ে রাখবেতার সঙ্গে গল্প করার কার এমন দায় পড়েছে। নুরুজ্জামান বলল, ডিমগুলাে কি করবএখানে সতেরােটা ডিম আছেআঠারােটা দিয়েছিলেন একটা ভেঙ্গে গেছে। ডিমের ব্যবস্থা আমি করব আপনি আসুননুরুজ্জামান উঠে এল। 

এটা আপনার ঘরসঙ্গে এটাচড বাথরুম আছেবাথরুমের একটা জিনিস আপনাকে দেখিয়ে দিএটা গরম পানির, এটা ঠাণ্ডা পানির কলগোসলের সময় ঠাণ্ডাগরম দুরকম মিশিয়ে নেবেনশুধু গরম পানির কল ছাড়লে কিন্তু বিপদেপড়বেনখুব গরম পানি আসেএকেবারে বয়েলিং ওয়াটারমশারি নেইমশারির দরকারও নেইনতলা পর্যন্ত মশা উঠতে পারে নাকাবার্ডে দুটা কম্বল আছেজানালাটানালা বন্ধ থাকলে শীত আসে নাএকটা কম্বলেও শীত মানার কথা, তারপরেও যদি শীত না মানে ...ভাত দিতে একটু দেরি হবে, আপনার কি খুবখিদে পেয়েছে

তিথির নীল তোয়ালে-পর্ব-(৩) হুমায়ূন আহমেদ

নুরুজ্জামান বলল, জ্বি।  

তাহলে আমি বরং এক কাপ চা আর বিসকিট দিয়ে যাইআধঘণ্টার মধ্যে ভাত দিয়ে দেব?” 

জি আচ্ছা। 

তিথি রান্নাঘরের দিক রওনা হলতার মায়া লাগছেখিদে লেগেছে কিনাজিজ্ঞেস করার সঙ্গে সঙ্গে বলল, হ্যাঁকেউ বলে নাবলার নিয়ম নেইসভ্য সমাজের নিয়ম হচ্ছে ভদ্রতা করে বলতে হয়, খিদে নেই। 

 

 

Leave a comment

Your email address will not be published.