তোমাদের এই নগরে পর্ব:০৯ হুমায়ূন আহমেদ

তোমাদের এই নগরে পর্ব:০৯

আমার সাথে বড় বড় কথা বলবি না। আমি আশা না যে তুই যা বলবি তাই হাসি মুখে মেনে নিব। আর মনে মনে বলব–হিমু সাহেব কত বড় জ্ঞানী। কত দ্বজ্ঞানের কথা জানেন। একটা থার্ড গ্রেড ফাজিলের সাথে তোয় যে কোনো বেশিকম নাই, এটা অন্য কেউ না বুঝলেও আমি বুঝি। যা হাত মুখ ধুয়ে আয়। তোর ফিলসফির কথা শোনার জন্যে আমি আসি নি।

আমি হাত মুখ ধুয়ে ফিরে এসে দেখি অতি অল্প সময়ে ফরিদা খালা অসাধঃ সাধন করেছেন। ঝাটা যোগাড় করে নিজেই ঘর ঝাঁট দিয়েছেন। টেবিলের ওপর রাখা কাপড় লন্দ্ৰিতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমার চৌকিটা ছিল। ঘরের মাঝামাঝি সেটা সরিয়ে দিয়েছেন, এতে আগের চেয়ে বড় মনে হচ্ছে।

আমাকে দেখেই খালা বললেন—সন্ধ্যাবেলা রশীদকে জিনিসপত্র দিয়ে পাঠিয়ে দেব। ও সব ঠিকঠাক করে দেবে! তোর ঘরে তো ফ্যানও নেই। প্রচণ্ড গরমে ঘুমাস কী করে? একটা টেবিল ফ্যানও দিয়ে দেব। আর কী লাগবে বল? কিছু পাঠাতে হবে না খালা। এই মেসে আগামীকাল থাকব কি না তার নাই ঠিক।

যাবি কোথায়?

এখনো ঠিক করি নি।

এই মেসে অসুবিধা কী?

অসুবিধা আছে। মোসটায় শনির নজর পড়েছে। পুলিশ এসে মেসের লোকজন ধরে নিয়ে যাচ্ছে। হেভি পিটুনি দিচ্ছে।কাকে ধরে নিয়ে গেল? মেসের ম্যানেজার কালাম সাহেবকে ধরে নিয়ে গেছে। অনেস্ট লোক। সাতে-পাচে নাই। এমন মার দিয়েছে যে এক মারের চোটে ডিসঅনেস্ট হয়ে গেছে।জহিরকে বলি সে ছাড়িয়ে নিয়ে আসবে।জহির কে?

জহিরকে তুই জিনিস না—তোকে ধরে একটা আছাড় দিব। আমার ছোট ভাই।উনি ছাড়ীয়ে নিয়ে আসবেন কীভাবে? প্রধানমন্ত্রীর স্বজনের ইনফ্লুয়েন্স ছাড়া পুলিশের হাত থেকে ছাড়া পাওয়া মুশকিল। তোমরা নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় না?

গাধার মতো কথা বলিস না তো— জহির অবশ্যই ছাড়াতে পারবে। সে পুলিশের আই জি না? পত্রিকায় জহিরের ছবি ছাপা হয়েছে—তার জীবনী পর্যন্ত ছেপেছে। তুই টেলিফোন করে বলে দে তা হলেই হবে। তোকে সে খুবই পছন্দ করে। ওর পার্সেনাল নাম্বার তোকে দিয়ে যাচ্ছি।আচ্ছা দিও— এখন বল কাছে কেন এসেছ? রাগারগি না করে ঠাণ্ডা মাথায় বল।খালা কঠিন গলায় বললেন, আশার মাথায় তুই কী ঢুকিয়েছিস?

ও বলছে ওর মাথায় কী নাকি ঢুকে গেছে— ফুল-ফল। একটা বাচ্চা মেয়ের মাথায় ফুল-ফল ঢুকানোর মানে কী? ও তো তোর কোনো ক্ষতি করে নি। তুই তার ক্ষতি করলি কেন? কী মনে করে বাচ্চা একটা মেয়ের মাথায় ফুল-ফল ঢুকিয়ে দিলি? আমি মাথায় কিছু ঢুকাই নি খালা। ফুল-ফল অটো সিস্টেমে তার মাথায় ঢুকেছে। ওর অবস্থা কী? আধমরা হয়ে গত ছদিন ধরে বিছানায় পড়ে আছে। কিছুই খাচ্ছে না।চিকিৎসা করছ না?

নিউজার্সিতে ওদের ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তিনি টেলিফোনে অষুধ পত্র দিয়েছেন। সবই মনে হয় ঘুমের অষুধ। সারাক্ষণ ঘুমিয়েই থাকে। মাঝেমধ্যে ঘুম ভাঙে তখন বলে, এখানো মাথার মধ্যে ফুল-ফল আছে। কী যে যন্ত্রণায় পড়েছি।যন্ত্রণাতো বটেই?

অনেক অদ্ভুত রোগের কথা শুনেছি। এরকম তো কখনো শুনি নি।বড়লোকের বড় রোগ। —মাথার মধ্যে কথা ঢুকে যাওয়া। ছোটলোকের ছোট রোগ–পাতলা পায়খানা, দাউদ বিখ্যাউজ। তুমি এত চিন্তিত হয়ো না তো খালা। সেয়ে যাবে।বাইরের একটা মেয়ে প্রথম বাংলাদেশে শখ করে এসেছে। দেখি তো এখন ঝামেলাটা। আমি আগামী শনিবার ওকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। এত ঝামেলার আমার দরকার নেই-– যত মার মরে, রায় বাড়িতে এসে পুড়ে। সব ঝামেলা আমার ঘাড়ে। আমার বাড়িটা হয়েছে রায় বাড়ি।

আমার কাছে তোমার আসার উদ্দেশ্য কি এটাই? শনিবার আশা চলে যাচ্ছে এই খবর দেওয়া? নাকি আরো কিছু আছে? আশা তোকে একটা চিঠি লিখেছে। আমি চিঠিটা নিয়ে এসেছি।চিঠি অন্য কাউকে দিয়ে পাঠাতে পারতে। তোমার নিয়ে আসার তো দরকার নেই। তোমার আসার উদ্দেশ্যটা বল।

খালা শান্ত গলায় বললেন, তুই আশার সঙ্গে আর কখনো দেখা করবি না। কোনো যোগাযোগ রাখবি না। তোকে টাকা দিচ্ছি— তুই ঢাকার বাইরে কোথাও চলে যা। স্টিমারে করে পটুয়াখালি চলে যা। সেখান থেকে যাবি কুয়াকাটা। কুয়াকাটায় পর্যটনের মোটেল আছে। মোটেল বুক করে দেব। রাজার হালে থাকবি।আমাকে চলে যেতে হবে কেন? সমস্যাটি কী?

আশা তোর প্রসঙ্গে তার মাকে টেলিফোনে কী সব বলেছে। তিনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। খুবই চিন্তিত। কান্নাকাটিও করেছেন। আমার হাত পা, ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। কী বিপদে পড়লাম।আমি আনন্দিত গলায় বললাম, আশা কি আমার প্রেমে পড়েছে খালা?

খালা তিক্ত গলায় বললেন, তোর প্রেমে পড়বে কেন? তোর কোন জিনিসটা আছে প্রেমে পড়ার মতো? ছাল বাকল নেই একটা মানুষ।আমি গলা নিচু করে বললাম— সাধারণ মেয়েরা ছালবাকল নেই ছেলের প্রেমে কখনো পড়বে না। তারা ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার খুঁজবে। টাকা-পয়সা খুঁজবে। ঢাকায় বাড়ি আছে কিনা দেখবে। কিন্তু অতি বিত্তবান মেয়েরা ছালবাকল নেই ছেলেদের প্রতি এক ধরনের মমতা পোষণ করবে। অসহায়ের প্রতি করুণা। সেই করুণা থেকে প্রেম। দুই এ দুই বাইশ।

দুই এ দুই এ বাইশ হোক আর একুশ হোক। তুই এই মেয়ের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখবি না। তুই পালিয়ে যাবি।কুয়াকাটায় পালিয়ে গিয়ে সূর্যাস্ত সূর্যোদয় দেখব? দেখতে চাইলে দেখবি, আর মোটেলের ঘরে বসে থাকতে চাইলে বসে থাকবি। আমার কথা হচ্ছে এই মেয়ের কাছ থেকে দূরে চলে যাওয়া।আমি শান্ত গলায় বললাম, খালা এতে লাভ হবে না।লাভ হবে না কেন?

আশা মেয়েটার স্বভাব চরিত্র যা দেখছি–এই কাণ্ড করলে তার প্ৰেম আরো বেড়ে যাবে। অবশ্যই সে খুঁজে খুঁজে আমাকে বের করে ফেলবে। কুয়াকাটায় উপস্থিত হবে। সমুদ্র তীরে নায়ক নায়িকার মিলন। ব্যাক গ্রাউন্ডে রবীন্দ্র সংগীত— বধু কোন আলো লাগল চোখে।

খালা কঠিন গলায় বললেন— নায়ক নায়িকার মিলন মানে? ফাজলামি কথা পুরোপুরি বন্ধ। জটিল একটা সমস্যা হয়েছে সেই সমস্যা কীভাবে মেটানো যায় সেটা বল। সব রোগের অনুধ আছে। এই রোগের কী অযুদ্ধ তুই বলা? তুই রোগের জীবাণু সাপ্লাই দিয়েছিস। অষুধও তুই দিবি।

প্রথম যে কাজটা করতে হবে তা হল মেয়েটার প্ৰেম ভাবটা কমাতে হবে। তার কাছ থেকে পালিয়ে গিয়ে সেটা করা যাবে না। তার সঙ্গে ছ্যাবলামি করতে হবে। যতই স্থাবলামি করা হবে ততই প্ৰেম ভাব কমবে।কী রকম ছ্যাবলামি?

গদগদ ভাবে কথা বলতে হবে। ভাবটা এরকম দেখাতে হবে যেন আমি তার প্রেমে পাগল। তারপর ফাঁট করে একদিন বিয়ের প্রপোজল দিতে হবে। বাংলা ছবির নায়কের মতো কঁদো কাদো গলায় বলতে হবে— আশা, ও আমার জানপাখি তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না। তুমি যদি আমাকে বিয়ে না কর তা হলে আল্লাহর কসম কোনো একটা পাঁচ টনি ট্রাকের সামনে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে যাব।

এমন অশালীন কথা তুই আমার সামনে বলতে পারলি? পারলাম কারণ কথাগুলি তোমার কাছে অশালীন সুনালেও সমস্যা সমাধানের এই হচ্ছে পথ।তোর এইসব কথাবার্তা শুনে আশার প্রেম কমে যাবে? অবশ্যই কমবে। অতি দ্রুত কমবে। বিয়ের কথাটা যেই বলব ওমি প্ৰেম জ্বর ধাই ধাই করে নামতে থাকবে, তারপর দিতে হবে। আসল আষুধ।আসল আষুধটা কী?

বিয়ের কথা বলার পরপরই বলতে হবে-–আশা শোন তোমাকে বিয়ে করলে কি আমি এটোমেটিক্যালি আমেরিকার গ্রিন কার্ড পাব? নাকি তার জন্যে আবার আরো ঝামেলা আছে? আমাকে পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দাও তো। আমার এই কথা শুনে আশার আক্কেল গুডুম হবে। সে বুঝবে আমার আসল উদ্দেশ্য হল গ্রিন কার্ড। সিন্দাবাদের ভূতের মতো স্ত্রীর কঁধে সওয়ার হয়ে আমেরিকা যাত্ৰা।

খালা কিছু বলছেন না। এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমার কথা বিশ্বাস করতে পারছেন না। আবার অবিশ্বাসও করতে পারছেন না।আমি বললাম, খালা এখন বল পরিকল্পনা মতো এণ্ডব? লদকালদকি টাইপ কথাবার্তা বলা শুরু করব? খালা ক্লান্ত নিশ্বাস ফেলে বললেন, তোকে কিছু করতে হবে না। তুই চুপ করে থাক।এখানেই থাকব? না কুয়াকাটার দিকে রওনা হয়ে যাব?

আপাতত এইখানেই থাক। আমি পরে তোর সঙ্গে যোগাযোগ করব। নে তোর চিঠি নে।খালা চিঠিতে রোমান্টিক কোনো ডায়ালগ কি আছে? আমি জীবনে কোনো প্ৰেমপত্ৰ পাই নি। প্রেমের ডায়ালগ যদি এই চিঠিতে থাকে তা হলে এটাই হবে আমার জীবনের প্রথম প্রেমপত্র। কিছু কি আছে? তোর কাছে লেখা চিঠি আমি কি করে বলব প্রেমের ডায়ালগ আছে কি না।এই চিঠি না পড়ে তুমি আমাকে দিচ্ছ এটা বিশ্বাসযোগ্য না বলেই জিজ্ঞেস করছি। প্রেমের কথাবার্তা কি আছে?

খালা বিরক্ত গলায় বললেন— না। এইসব কিছু নেই। গদগদ টাইপ প্রেমের চিঠি লেখার মেয়ে আশা না।খালা উঠে দাঁড়ালেন। তাকে খুবই চিন্তিত মনে হচ্ছে। তাঁর ঠোঁট নড়ছে। মুখ দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না। আমি আশার চিঠি পড়তে শুরু করলাম। ইংরেজিতে লেখা চিঠি। অনুবাদ করলে এরকম দাঁড়ায়।

হিমু সাহেব

আমি এখন মাথার ভেতর একটা পোকা নিয়ে বিছানায় শুয়ে আছি। পোকাটা ক্রমাগত গান করছে– ফুলের মতো ফল। ফলের মতো ফুল। ভয়ঙ্কর এবং কুৎসিত এই চক্রসংগীত। মাঝে মাঝে ইচ্ছা করছে দেয়ালে মাথা ঠুকে মাথা ফাটিয়ে ফেলি। তারপর একটা চিমটা দিয়ে পোকাটা বের করে ফেলি। তা সম্ভব হচ্ছে না বলেই জটিল ধরনের সব সিডেটিভ খেয়ে ঘুমুচ্ছি। পোকা কিন্তু আমার ঘুমের ভেতরও গান গেয়ে যাচ্ছে।

দয়া করে আমার এই ব্যাপারটা নিয়ে আপনি চিন্তিত হবেন না। অষুধ পত্ৰ চলছে পোকা যথাসময়ে মারা যাবে। নতুন কোনো পোকা না ঢোকা পর্যন্ত সময়টা ভালোই কাটবে।ওই বর্ষার দিনে আমি খুবই আনন্দ করেছি। জুর নিয়ে বের হয়েছিলাম। জুর সেরে গেছে। আপনার সঙ্গে পাইপে বসে বৃষ্টি দেখা হল না— এই দুঃখটা দূর হচ্ছে না।

ঝর-ঝর করে বৃষ্টি পড়ছে আমরা দুজন পাইপে বসে বৃষ্টি দেখছি। এই দৃশ্যটা আমি কল্পনায় অনেকবার দেখেছি। বাস্তব কল্পনাকে ছাড়িয়ে যাবে কিনা এটাই আমার দেখার ইচ্ছা। আমার কল্পনাশক্তি ভালো বলেই বাস্তব কখনোই আমার কল্পনাকে অতিক্রম করতে পারে না। যাই হোক মাথা থেকে পোকাটা বের হওয়া মাত্র আমি আপনাকে নিয়ে পাইপে ঢুকব। তখন যদি বৃষ্টি নাও থাকে আপনি দমকলকে খবর দেবেন যেন দমকল বাহিনী নকল বৃষ্টি তৈরি করে দেয়।একটা ছোট্ট অনুরোধ কি আমি আপনাকে করতে পারি? আমাকে এসে দেখে যান না? প্লিজ।

বিনীতা

আশা।

আবুল কালাম সাহেবকে দেখতে থানায় উপস্থিত হলাম। ডিউটি অফিসার খুবই ব্যস্ত। এই ব্যস্ততার ভেতরও তিনি চট করে আমাকে দেখে আবার ব্যস্ত হয়ে গেলেন। তার ব্যস্ততা নাংকের লোম ছেড়ায় সীমাবদ্ধ। এই মহৎ কর্মটি তিনি বেশ আয়োজন করে করছেন। তার সামনে ছোট্ট একটা আয়না। একপাশে কেচি এবং চিমটা। দুটা মাত্র গর্ত দিয়ে আল্লাহ তাকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন বলে তিনি ঝামেলায় পড়ে গেছেন। হাত তিনটা থাকলে তাঁর জন্যে সুবিধা হত। এক হাতে আয়না ধরে থাকতেন। অন্য দুহাত দিয়ে চিমটা এবং কাঁচি ব্যবহার করতেন।

আমি ডিউটি অফিসারের সামনে দাঁড়িয়ে অতি বিনীত ভঙ্গিতে বললাম, স্যার স্নামালিকুম।ডিউটি অফিসার হাত থেকে আয়না নামিয়ে ভুরু কুঁচকে বললেন, কী চাই? আমি তাঁর সামনের চেয়ারে বসতে বসতে হাসি মুখে বললাম, গল্প করতে এসেছি স্যার। কিছুক্ষণ আপনার সঙ্গে গসিপিং করব যদি অনুমতি দেন।ডিউটি অফিসার হুঙ্কার দিয়ে বললেন, গসিপিং করব মানে? কিসের গসিপিং?

আমি মুখের হাসি আরো বিস্তৃত করে বললাম— আপনি তো স্যার অবসর আছেন, নাকের লোম ফেলছেন। আমিও অবসর। কাজেই আসুন কিছুক্ষণ গসিপিং করি।আপনি কে? আমি একজন কবি। আমার কথা মনে হয় বিশ্বাস হচ্ছে না। পুরোনো ফাইল ঘেঁটে দেখতে পারেন। তিন বছর আগে আপনাদের হাজতে চারদিন ছিলাম। সেখানে আমার পরিচয় লেখা আছে— কবি।

কবি?

জি স্যার কবি। পোয়েট। আমি রবীন্দ্ৰনাথ ঘরানার কবি। মিল দিয়ে দিয়ে কবিতা লেখি। যেমন—

পুলিশ

ফুলিশ

গরু

সরু

সিঁড়ি

কিড়িকিড়ি…

ডিউটি অফিসার নড়েচড়ে বসলেন। ঝড় আসার পূর্ব লক্ষণ। বাঘ শিকারের উপর ঝাপ দেওয়ার আগে মাটিতে লেজের একটা বাড়ি দেয়। পুলিশও নড়ে চড়ে বসে।আমি মধুর গলায় বললাম, স্যার দুকাপ চা দিতে বলুন। আমারটায় চিনি একটু বেশি— তিন চামচ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ চায়ে চিনি বেশি খেতে খেতেন বলে আমি সবদিকেই উনাকে অনুসরণ করার চেষ্টা করছি। চিনি নিয়ে কবিগুরু একটা গানও লিখেছেন। গানটা কি শুনেছেন?

ডিউটি অফিসার নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরেছেন। পুলিশের ঠোঁট কামড়ানোর মানে হল–দশ নম্বর সিগন্যাল। তুফান এল বলে। আমি শান্ত গলায় বললাম, চিনি নিয়ে লেখা রবীন্দ্রনাথের গানটা হচ্ছে—

চিনি গো চিনি তোমারে

ওগো বিদেশিনি।

অর্থাৎ তিনি বিদেশী চিনির কথা বলছেন। দেশি চিনি ময়লা লালচে ধরনের। বিদেশী চিনি ফকফকা সাদা।

ডিউটি অফিসার কলিং বেলে চাপ দিলেন। এখন তাঁর মুখে সামান্য হাসি দেখা গেল। মাকড়সার জালে পোকা আটকে পরার পর মাকড়সা পোকার দিকে তাকিয়ে যেরকম হাসি দেয় সেরকম হাসি।আমিও হাসলাম। তবে হাসি তৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে বললাম— এই গানটার ইংরেজি শুনবেন—চিনিগো চিনি তোমারে Sagar Sugar you…

 

Read more

তোমাদের এই নগরে পর্ব:১০ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.