দিঘির জলে কার ছায়া গো পর্ব – ২ হুমায়ূন আহমেদ

দিঘির জলে কার ছায়া গো পর্ব – ২

বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মুহিব একটা চায়ের দোকানে অশ্রিয় নিয়েছে। পকেটে। টাকা থাকলে এককাপ চা খাওয়া যেত। হিমরা এমন অবস্থায় চা খেতে ইচ্ছা হলে। বলত—আছেন কোনো সহৃদয়ভাই যে একজন তৃষ্ণার্তকে চা খাওয়াবেন?

এধরনের কথা বলা সম্ভব হচ্ছেনা। মুহিববৃষ্টি থামার জন্যে অপেক্ষা করছে।মুহিবের মোবাইল আবার বেজে উঠেছে লীলার টেলিফোন মুহিব সেট বন্ধ করল চারপাশে একগাদা লোক নিয়ে লীলার সঙ্গে কথা বলা যায় না।লীলার সঙ্গে মুহিবের পরিচয়ের গল্পটা এখন। বলা যেতে পারে। তাদের পরিচয় নর্দমায় ঘিটনাটাএেরকম—মুহির হেঁটেবাসায় ফিরছে।ধানমণ্ডি ২নম্বর রোডে মানুষজনের জটলা। মনে হচ্ছে দুবাই কিছু একটা দেখে মজা পাচ্ছে। বিনা পয়সায় মজা পাবার লোভ কেউ ছাড়েন। মুহিব এগিয়ে গেল।

মজা পাবার মতোই ঘটনা অতিরূপবতীএক তরুণী নর্দমায় পড়ে গেছে। তার সারা শরীর নর্দমার নোংরা বিষাক্ত ঘন কৃষ্ণবর্ণের তরলে মাখামাখি। মেয়েটার উচিত নর্দমা থেকে ওঠার চেষ্টা করা। তা না করে নর্দমার নোংরীয় কী যেন খুঁজছে। সে ফিতাবিহীন ম্পঞ্জের একটা স্যান্ডেল তুলল। জনতার ভেতর একজন চেঁচিয়ে উঠল, পাইছে পাইছে। জিনিস পাইছে। সবাই হেসে উঠল।

মুহিব নর্দমার পাশে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে কঠিন গলায় বলল, উঠে আসুন।জনতার একজন বলল, ভাই, থাকুক না। খেলতেছে।আবারো সম্মিলিত হাসি।মুহিব বলল, হাত ধরুন, উঠে আসুন। মেয়েটা উঠে এসে বলল, আমার একটা বই নর্দমায় পড়ে গেছে। খুব জরুরি বই। বইটা খুঁজছিলাম।মুহিব নর্দমায় নেমে পড়ল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই বই নিয়ে উঠে এল। বইটার নাম– New Enlarged Anthology of Robert Frosts Poems.

মেয়েটা বলল, আমার পা কেটে গেছে, আমাকে একজন ডাক্তারের কাছে নিতে হবে। তার আগে একটা সাবান কিনে নিয়ে আসুন, আমি লেকের পানিতে গোসল করব। গা থেকে বিকট দুর্গন্ধ আসছে। আর কিছুক্ষণ এই দুর্গন্ধ থাকলে আমি অজ্ঞান হয়ে যাব।

মহিব সাবান কিনে আনল। মেয়েটা সারা গায়ে সাবান ডলে লেকের পানিতে গোসল করল। মুহিবকে বলল, আপনি আশেপাশে থাকুন। আমি সাঁতার জানি না। পা পিছলে বেশি পানিতে পড়ে গেলে টেনে তুলবেন। আর বইটা ধুয়ে ফেলুন। বইটা আমার মা আমার পঞ্চম জন্মদিনে দিয়েছিলেন। এটা তার স্মৃতিচিহ্ন। আমি যেখানেই যাই এই বই সঙ্গে থাকে। বইটার দ্বিতীয় পাতায় আমার মায়ের লেখাটা মুছে গেছে কি-না দেখুন তো।

মুহিব পাতা উল্টাল। নর্দমার নোংরা বইটার মলাটে লেগেছে। ভেতরটা ঠিক আছে। দ্বিতীয় পাতায় লেখা–

লীলাবতী মা মণি!

বড় হয়ে এই বইটা পড়বে। ঠিক আছে মা?

চাঁদের কণা। লক্ষ্মী সোনা। ঘুটঘুট। পুটপুট।

আমার মা হুটহুট।

মুহিব বলল, আপনার নাম লীলাবতী?

লীলা গায়ে সাবান ডলতে ডলতে বলল, হুঁ।

মুহিব বলল, আপনার মা লিখেছেন— আমার মা হুটহুট। হুটহুট মানে কী?

হুটহুটের কোনো মানে নেই। এটা হলো Nonsence Rhyme.

ননসেন্স রাইমটা কী?

লীলা বলল, ননসেন্স রাইম হলো অর্থহীন ছড়া। কোনো অর্থ হবে না, কিন্তু ভালো লাগবে। অন্তমিল থাকবে, ছন্দ থাকবে।লীলার পা ভালোই কেটেছিল। দুটা স্টিচ লাগল। ডাক্তার ধনুষ্টংকারের ইনজেকশন দিলেন। অ্যান্টিবায়োটিক দিলেন। মুহিব লীলাকে তার বাসায় পৌঁছে দিল। লীলা বলল, আজ আপনি বাসায় ঢুকবেন না। আগামীকাল ঠিক এই সময় আসবেন।মুহিব বলল, আগামীকাল আসব কেন?

লীলা বলল, দরকার আছে। অবশ্যই আসবেন।মুহিব পরদিন গেল। লীলা গাভর্তি গয়না পরে বসে আছে। তাকে দেখাচ্ছে ইন্দ্রাণীর মতো। লীলা বলল, আমার গায়ের সব গয়না হলো আমার মার। বিশেষ বিশেষ দিনে আমি আমার মায়ের গয়না পরে বসে থাকি।মুহিব বলল, আমাকে আসতে বলেছেন কেন?

লীলা বলল, ধন্যবাদ দেবার জন্যে। গতকাল ধন্যবাদ দেয়া হয় নি। বসুন।মুহিব বসল। লীলা বলল, বাবা বাসায় থাকলে ভালো হতো। বাবার সামনে ধন্যবাদ দিতে পারতাম। বাবার আজই একটা জরুরি কাজ পড়ে গেল।লীলা হাতে একটা কাগজ নিয়ে পড়তে শুরু করল–

আমি এখনো আপনার নাম জানি না। আপনি আমার নাম জানেন। আপনি কিছুটা এগিয়ে আছেন। নর্দমায় পড়ে যাবার মতো হাস্যকর একটি ঘটনা আমার জীবনে ঘটেছে। আপনি আমাকে টেনে তুলেছেন। এটি চোরাবালি থেকে টেনে তোলার মতো বড় কোনো উদ্ধারকর্ম না। তারপরেও যে স্বাভাবিকতার সঙ্গে কাজটি আপনি করেছেন তা আমাকে মুগ্ধ করেছে। আপনাকে লিখিতভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। ধন্যবাদ, ধন্যবাদ, ধন্যবাদ।

মুহিব বলল, আপনি তো বিরাট নাটক শুরু করেছেন।লীলা বলল, নাটক এখনো শেষ হয় নি। এখন আমার মা যে কবিতার বইটা দিয়েছেন, সেখান থেকে একটা কবিতা পাঠ করে শোনানো হবে। আপনার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে না, কবিতা আপনার পছন্দের বিষয়। তারপরেও শুনতে হবে।

God once declared he was true

And then took the veil and withdrew,

And remember how final a hush

Then descended of old on the bush.

লীলা বলল, কিছু বুঝতে পারলেন।মুহিব বলল, না।লীলা বলল, বুঝতে না পারলে লজ্জিত বোধ করার কিছু নেই। এই কবিতাটা খুব সহজভাবে লেখা অত্যন্ত কঠিন একটা কবিতা। এখন বলুন, আপনার নাম কী?

মুহিব।আপনার মোবাইল টেলিফোনের নাম্বারটা আমাকে দিন। টেলিফোনে আরো একদিন আসতে বলব, বাবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্যে।আমার কোনো মোবাইল টেলিফোন নেই।নেই কেন? মোবাইল ব্যবহার পছন্দ করেন না বলে নেই, না-কি টাকা নেই বলে নেই?

মুহিব বলল, টাকা নেই বলে নেই।লীলা তার সেটটা এগিয়ে দিয়ে বলল, রেখে দিন, এটা আপনার। আমি আরেকটা কিনে নেব। নিতে বলছি নিন। আর শুনুন, আমি ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী। ইংরেজিতে আপনি, তুই নেই। সবাই তুমি। এখন থেকে আপনাকে আমি তুমি করে বলব। আপনিও আমাকে তুমি বলতে পারেন। তুমি বলতে অস্বস্তি বোধ করলে আপনি বলতে পারেন।মুহিব বলল, আমি এখন উঠি?

লীলা বলল, না। তুমি দুপুরে আমার সঙ্গে খাবে। আমি রান্না করেছি। আমি রাঁধতে পারি না। ডিমভাজি করেছি আর ডাল। বুয়া কৈ মাছ রান্না করেছে। আমি চাই আমার রান্না আজ খাবে। বাথরুমে যাও, হাতমুখ ধুয়ে আস। ঐদিকে বাথরুম।মুহিব দ্রুত বাথরুমে ঢুকে গেল। তার চোখে পানি এসে যাচ্ছিল। বাথরুমে ঢুকে পড়ায় লীলা নামের অদ্ভুত মেয়েটা মুহিবের দুর্বলতা ধরতে পারল না।

বৃষ্টি এখনো পুরোপুরি কমে নি। তবে আগের মতো পড়ছে না। টিপটিপ করে পড়ছে। মুহিব বের হয়ে পড়ল। ভাব দেখে মনে হচ্ছে, এই বৃষ্টি আজ সারাদিনেও কমবে না। চায়ের দোকানে বন্দি হয়ে থাকার কিছু নেই।সামান্য এগুতেই বড় বড় ছাতা হাতে কিছু লোকজনকে দেখা গেল। অতি ব্যস্ত ভঙ্গিতে তারা ছোটাছুটি করছে। মুহিব এগিয়ে গেল। বেকার মানুষদের কৌতূহল বেশি থাকে। কৌতূহল মেটানোর অবসরও তাদের আছে।

নাটকের শুটিং হচ্ছে। সব রেডি করা আছে। বৃষ্টি পুরোপুরি থামলেই শুটিং শুরু হবে। নায়িকা প্লাস্টিকের লাল চেয়ারে বসা। তার মাথার ওপর সী বিচের প্রকাও ছাতা ধা। সেই ছাতার রঙও লাল। ছাতা এমনভাবে ধরা যেন নায়িকার মুখ দেখা না যায়। মুহিব ছাতা হাতে নিয়ে ছোটাছুটি করছে এমন একজনকে বলল, ভাই নাটকের নাম কী?

নাটকের লোকজন দর্শকদের কোনো প্রশ্নের জবাব দেয় না। এই লোক দিল। ভদ্রভাবে বলল, এই বসন্তে। ভ্যালেনটাইন দিবসের নাটক।মুহিব বলল, নামটা সুন্দর। ডিরেক্টর কে? আমিই ডিরেক্টর।মুহিব বলল, স্যার সরি।সরি কেন? মুহিব বলল, আপনাকে সাধারণ কেউ ভেবেছিলাম, এইজন্যে সরি বলেছি।আমি সাধারণ। অসাধারণ কিছু না। একটা শট দেবেন? মুহিব বলল, বুঝতে পারলাম না কী বললেন?

আমাদের একজন আর্টিস্ট আসে নি। তার মুখে একটা সংলাপ আছে। আপনি দিতে পারবেন? মুহিব তাকিয়ে রইল। কী বলবে বুঝতে পারছে না। ডিরেক্টর সাহেব বললেন, নাটকের নায়িকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে চোখ মুছছে। আপনি একজন পথচারী। মেয়েটাকে কাঁদতে দেখে এগিয়ে যাবেন। এবং বলবেন, ম্যাডাম, কী হয়েছে? মুহিব বলল, রাস্তায় কোনো অপরিচিত মেয়েকে কাঁদতে দেখলে আমরা ম্যাডাম বলি না। আমরা শুধু বলি— কী হয়েছে?

ঠিক আছে আপনি কী হয়েছে বলবেন। তখন মেয়েটি বলবে— Get lost. তারপরেও আপনি দাঁড়িয়ে আছেন। তখন মেয়েটি বিরক্ত হয়ে বলবে— Get lost-এর মানে বোঝেন না? যান ফুটেন। আপনি চলে আসবেন। পারবেন? জি স্যার পারব।গুড। ক্যামেরার দিকে ভুলেও তাকাবেন না। ক্যামেরার দিকে তাকালে শট NG হয়ে যাবে। NG টা কী? NG হচ্ছে Not Good, অর্থাৎ শট নষ্ট। আবার নতুন করে নিতে হবে। পারবেন তো?

স্যার চেষ্টা করব।তাহলে আসুন। বৃষ্টি থেমে গেছে। এখনি শট হবে।মুহিব ঠিকঠাক মতো করল। নায়িকার মুখে Get lost শুনে আহত দৃষ্টিতে তাকালো। নায়িকা যখন বলল, ফুটেন তখন আরো লজ্জা পেল। চলে যাবার সময় এক পলকের জন্যে দাঁড়িয়ে আরেকবার তাকালো নায়িকার দিকে।ডিরেক্টর সাহেব বললেন, আপনার টেলিফোন নাম্বার দিয়ে যান। ছোটখাটো কোনো রোল খাকলে আপনাকে ডাকব। আপনি ক্যামেরা ফ্রি। চা খান।

শুধু চা না, তাকে চায়ের সঙ্গে দুটা সিঙ্গাড়া দেয়া হলো। সিঙ্গাড়া খাবার সময় নায়িকা এসে সামনে দাড়ালেন। হাসিমুখে বললেন, আপনার অভিনয় ভালো হয়েছে। এটা প্রথম কাজ? জি।নাম কী? মুহিব। আপনার টেলিফোন নাম্বার এবং নাম একটা কাগজে লিখে আমাকে দিন। আমি চেষ্টা করব আপনাকে ভালো একটা সুযোগ দিতে।ম্যডাম থ্যাংক য়্যু।আপনি কি আমার নাটক বা সিনেমা দেখেছেন?

জি ম্যাডাম, অনেক দেখেছি। (পুরোপুরি মিথ্যা কথা। তাদের বাসার টিভি থাকে বাবার শোবার ঘরে। মুহিবের টিভি দেখা হয় না। নায়িকাকে সে চিনতে পারে নি। তবে আজ যেহেতু বুধবার, মিথ্যা কথা বলা যায়।) মিথ্যাদিবস শেষ হবার একঘণ্টা আগে রাত এগারোটায় মুহিবের জীবনে বিস্ময়কর ঘটনা ঘটল। দুপুরের দেখা নায়িকা তাকে টেলিফোন করলেন।

আপনি মুহিব! জি।আমাকে চিনেছেন তো? দুপুরে আমার সঙ্গে কাজ করলেন।জি ম্যাডাম। স্নামালিকুম। ওয়ালাইকুম সালাম।আপনার জন্যে ভালো একটা খবর আছে। একটা নাটকে আপনাকে কেন্দ্রীয় চরিত্র দেবার ব্যবস্থা করেছি। থ্যাংক য়্যু ম্যাডাম।ভালোমতো কাজ করবেন, আমার যেন বদনাম না হয়। আমি ডিরেক্টরকে বলেছি–আপনি একজন Born actor. ম্যাডাম, আপনার দয়ার কথা সারাজীবন মনে থাকবে।কান্নার শব্দ পাচ্ছি। কে কাঁদছে? আমার ছোটবোন কাঁদছে। ভূত দেখে ভয় পেয়ে কাঁদছে। তার নাম অশ্রু। সে প্রায়ই ভূত দেখে।আজও দেখেছে?

জি। মাথার চুল আঁচড়াচ্ছিল। হাত থেকে চিরুনি পড়ে গেল। সে চিরুনি তুলতে নিচু হয়েই দেখে, তার খাটের নিচে ভুতটা বসে আছে। ভূতটা তার মাথার চুল খপ করে ধরে ফেলল। অশ্রু অনেক চেষ্টা করল চুল ছাড়াতে পারল না। তার মাথার একগোছা চুল ভূতটা টেনে ছিঁড়ে ফেলেছে।এই ঘটনা কি সত্যি ঘটেছে, না আপনি বানাচ্ছেন? সত্যি ঘটেছে ম্যাডাম।আপনার বোন কত বড়?

এগজাক্ট বয়স বলতে পারব না। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবে। কোচিং সেন্টারে কোচিং করছে।আপনার বোনের নাম কী বললেন? অশ্রু।আমার ধারণী অশ্রু সিজিয়োফ্রেনিক। ওর চিকিৎসা করাতে হবে। আমি একজন ডাক্তারের ঠিকানা দেব। তার কাছে নিয়ে যাবেন। আমি ব্যবস্থা করে দেব যেন ভিজিট না নেয়।ম্যাডাম, থ্যাংক য়্যু।যে নাটক করতে যাচ্ছেন তার নাম জানতে চাইলেন না? নাম কী?নামটা পয়েটিক–দিঘির জলে কার ছায়া গো।

টেলিফোনে লীলা কাউকে হ্যালো বলে না। বান্ধবীদের বলে, আমি সমুচা। মুহিবকে বলে, আমি লী। অপরিচিতদের বলে, লীলা কথা বলছি।লীলা টেলিফোন করেছে মুহিবকে। যথারীতি বলল, আমি লী। ওপাশ থেকে হেড়ে গলায় কে একজন বলল, কারে চান? লীলা বলল, এটা মুহিবের ফোন না? ওপাশ থেকে বলল, হইতে পারে। আমি স্যারের নাম জানি না।আপনার স্যার কে? হিরু।হিরু মানে? তার নাম হিরু?

নাটকের হিরু। স্যার এহন পার্ট গায়। পরে করেন।আপনি কে? আমার নাম ছামছু। প্রডাকশনে কাম করি। আফা, অহন রাখি। হিরুইন আমারে বুলায়! আধঘণ্টা পর লীলা আবার টেলিফোন করল। সেই হেঁড়ে গলা। লীলা বলল, আপনি ছামছু? জে।আপনার স্যার কী করে? হিরুইনের সাথে নাশতা খায়। কী নাশতা?

এক পিস কেক, সিঙাড়া আর কলা।আপনার স্যারকে কি এখন টেলিফোন দেয়া যাবে? ধরেন দিতাছি।টেলিফোনে মুহিবের গলা পাওয়া গেল। লীলা বলল, কী করছ তুমি? মুহিব বলল, নাটক করছি। চ্যানেল আই-এ ভ্যালেনটাইন ডে-তে দেখাবে।তুমি অভিনয় কর জানতাম না তো! মুহিব হাসতে হাসতে বলল, আমি নিজেও জানতাম না। পাকেচক্রে হয়ে গেল। কীভাবে হয়ে গেল পরে বলব।কিসের অভিনয় করছ?

আমি একজন পেইন্টার। আমার সঙ্গে হঠাৎ একটা মেয়ের পরিচয় হয়েছে। এই নিয়ে গল্প। মেয়েটি অন্ধ।কোথায় শুটিং হচ্ছে বলো তো? আমি আসছি। শুটিং দেখব। আমি জীবনে কখনো শুটিং দেখি নি।অসম্ভব। তোমার সামনে আমি কিছুই পারব না।তোমার অভিনয় কেমন হচ্ছে? মনে হয় ভালো। ডিরেক্টর সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, আমি মঞ্চকর্মী কি-না। এই থেকে মনে হলো ভালো হচ্ছে। লীলা, আমাকে ডাকছে। পরে কথা বলব। মনে হয় শট দিতে হবে।শট দিতে হবে মানে কী?

একটা সিকোয়েন্স হবে। সিকোয়েন্সকেই এরা শট বলে। আমি ঠিক জানিও। লীলা রাখি? ডিরেক্টর সাহেব সিকোয়েন্স বুঝিয়ে দিলেন। অন্ধ মেয়েটিকে আপনি রাস্তা পার করে দেবার জন্যে হাত ধরেছেন। মেয়েটি বলল, হাত ধরেছেন কেন? আপনি বলবেন, রাস্তা পার করার জন্যে।মেয়েটি বলবে, হাত ছাড়ুন, আমি নিজে নিজে রাস্তা পার হতে পারি।এই বলে হাত ছাড়িয়ে সে নিজে নিজে রাস্তা পার হতে যাচ্ছে, তখন দেখা গেল দ্রুতগতিতে একটা ট্রাক আসছে।

আপনি ভয়ে অস্থির হয়ে একবার ট্রাকের দিকে তাকাচ্ছেন, আরেকবার মেয়েটির দিকে তাকাচ্ছেন। আমি কাট না বলা পর্যন্ত অভিনয় ধরে রাখবেন। অভিনয় ছেড়ে দেবেন না।মুহিব বলল, কী বললেন বুঝতে পারলাম না স্যার। অভিনয় ধরে রাখব মানে কী? যারা নতুন তাদের প্রধান সমস্যা, নিজের ডায়লগ বলার পরই তারা। এক্সপ্রেশন ছেড়ে দেয়। এটা করবেন না। বুঝেছেন?

জি স্যার।দৃশ্যটা খুবই ভালো হলো। ডিরেক্টর বললেন, এক্সেলেন্ট। শুধু এক্সেলেন্ট বললেও কম বলা হবে। এক্সেলেন্টের ওপরে। তোমরা আমাদের নতুন অভিনেতা মুহিবের জন্যে একটা ক্ল্যাপ দাও।সবাই ক্ল্যাপ দিল। ডিরেক্টর তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে সিগারেট ধরাতে ধরাতে মুহিবকে বললেন, সিগারেটের ব্যান্ড হেভিট কি আছে?

মুহিব জবাব না দিয়ে মাথা নিচু করল। ডিরেক্টর প্রডাকশনের এক ছেলেকে (ছামছু না, অন্য আরেকজন) বললেন, মুহিবকে এক প্যাকেট সিগারেট দাও।প্রডাকশনের ছেলে সিগারেট দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল, ডিরেক্টর সারি আপনেরে ভালো পাইছেন। আপনার কপাল খুলল। চা খাবেন? চা দিব? দাও।হিরুইন আপনারে ডাকে। ঐ দেহেন, ইশারা করতেছে।

মুহিব সিগারেটের প্যাকেট হাতে এগিয়ে গেল। হিরোইনের নাম নিলি। তার গায়ের রঙ শ্যামলা। এই রঙেই তাকে সুন্দর লাগছে। মনে হচ্ছে ফর্সা রঙ তাকে মানাত না। তার বয়স পঁচিশের ওপরে, কিন্তু দেখাচ্ছে সতেরো-আঠারো বছরের তরুণীর মতো।নিলির মাথার ওপর প্রডাকশনের একটা ছেলে প্রকাও ছাতা ধরে আছে। নিলি বসে আছে ছায়ায়। তার পাশে একটা খালি চেয়ার আছে। মুহিব সেখানে বসল না। নিলি বলল, দূরে বসেছেন কেন? ছায়ায় এসে বসুন।

মুহিব বলল, আমি একটা সিগারেট ধরাবো এইজন্যে দূরে বসেছি।নিলি বলল, তাহলে ঠিক আছে। আমি সব সহ্য করতে পারি, দুটা জিনিস সহ্য করতে পারি না। সিগারেটের ধোয়ার গন্ধ আর কানের কাছে মশার ভনভন শব্দ। আমার এমনই কপাল, এই দুইয়ের অত্যাচার আমাকে সহ্য করতে হয়। ধরুন একটা ঘরে আমি আছি, আরো দুজন আছে। ঘরে যদি মশা থাকে, সেই মশা ঐ দুজনের কাছে যাবে না। আমার কানের কাছে এসে শুনন করতে থাকবে। আর ঐ দুজন যদি সিগারেট ধরায়, তাদের ধোয়া অন্য কোনো দিকে যাবে না। আসবে আমার কাছে। আপনি সিগারেট ধরাচ্ছেন না কেন?

মুহিব বলল, থাক, আপনার সামনে ধরাব না।নিলি বলল, ধরান তো। আমি এখুনি প্রমাণ করব যে ধোয়া আমার দিকে আসবে।মুহিব সিগারেট ধরাল। ধোয়া সত্যি সত্যি নিলির দিকে যাচ্ছে। নিলি খিলখিল করে হেসে ফেলল। মুহিব মনে মনে স্বীকার করল, এত সুন্দর হাসির শব্দ সে আগে কখনো শোনে নি। বেশিরভাগ রূপবতী মেয়ে নকল হাসি হাসে। হাসার সময় ঢং করার চেষ্টা করে। তাদের হাসি হায়নার হাসির মতো হয়ে যায়। মুহিবের ধারণা, প্রতিটি তরুণী মেয়ের হাসির শব্দ রেকর্ড করে তাকে শোনানো উচিত। এতে যদি কিছু হয়।মুহিব, আপনার বোন কেমন আছে?

ভালো আছে ম্যাডাম।অশ্রু নাম, তাই না? জি।তাকে ডাক্তারের কাছে কবে নিয়ে যাবেন? এখনো ঠিক করি নাই।আজ তো সন্ধ্যার আগেই শুটিং শেষ হবে। আজই নিয়ে যান। আমি ডাক্তারের সঙ্গে আপয়েন্টমেন্ট করে দেই। দেব? জি আচ্ছা। নিলি হ্যান্ডব্যাগ খুলে টেলিফোন বের করল। অনেক সময় নিয়ে এসএমএস টাইপ করে পাঠিয়ে দিল। টেলিফোন ব্যাগে রাখতে রাখতে বলল, আটটার আগে চলে যাবেন। গ্রীনরোড়ে তার চেম্বার। ৩৮ গ্রীনরেড়ি। চেম্বারে সাইনবোর্ড আছে–নিরাময়। ডাক্তার সাহেবের নাম খালেক। মনে থাকবে?

থাকবে।আমার অন্ধের অভিনয় কেমন হয়েছে? ভালো হয়েছে।দর্শক যখন দেখবে তখন কি তাদের মনে হবে এই মেয়েটা সত্যি অন্ধ? মুহিব বলল, মনে হবে না। নিলি বলল, কেন মনে হবে না? কারণ আপনি বিখ্যাত অভিনেত্রী। সবাই আপনাকে চেনে। আপনি যাই করেন সবাই ধরে নেবে অভিনয় করছেন। তবে যারা আপনাকে চেনে না, তারা অন্ধ মেয়ে ভাববে। অবশ্যই ভাববে। এত জোর দিয়ে অবশ্যই কেন বলছেন? আমাকে খুশি করার জন্যে?

জি-না ম্যাডাম। আমি হিমু গ্রুপের মানুষ। হিমু গ্রুপের মানুষ কাউকে খুশি করার জন্যে কিছু করে না।নিলি বলল, হিমুর ব্যাপারটা আমি জানি। উপন্যাসের একটা চরিত্র। একে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার কিছু নেই।ম্যাডাম, মানুষের নিয়ম হচ্ছে, গুরুত্বহীন বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া। আর গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলি পাশ কাটিয়ে যাওয়া।নিলি বলল, হতে পারে। আপনার সিগারেট শেষ হয়ে গেছে, আরেকটা ধরান তো।মুহিব অবাক হয়ে বলল, আরেকটা ধরাব? হুঁ। আরেকটা।কেন?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *