দিঘির জলে কার ছায়া গো পর্ব – ৮ হুমায়ূন আহমেদ

দিঘির জলে কার ছায়া গো পর্ব – ৮

আহসান বলল, আমার ধারণা আমি কারণটা জানি। নিম্নবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত যুবকদের নিজেকে বিশেষভাবে প্রকাশ করার তেমন সুবিধা নেই। সে ব্র্যান্ডের শার্ট কিনতে পারবে না। নতুন মডেলের গাড়ি কিনতে পারবে না। ইচ্ছা করলেই বান্ধবীকে নিয়ে দামি কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে যেতে পারবে না। তাকে খুঁজে বের করতে হয় তার আয়ত্ত আছে এমন কিছু। যেমন— মিথ্যাদিবস, কথা বন্ধ দিবস, এইসব। আমার ধারণা যদি সত্যি হয় তাহলে একদিন শুনবে, সে শনি বা রবিবারকে ডিক্লেয়ার করেছে কথা না-বলা দিবস।

সেদিন সে তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে। কিন্তু কথা বলবে না। তুমি প্রশ্ন করলে লিখে উত্তর দিবে।লীলা বলল, আপনার observation সত্যি হতেও পারে।আহসান বলল, তোমার মিথ্যাদিবস বান্ধব কিন্তু শুন্যে ভাসার ম্যাজিকটা অতি দ্রুত শিখেছে এবং ভালো শিখেছে। আমি নিজেই অবাক হয়েছি।সে যে কাজই করে খুব মন দিয়ে করে। একটা পর্যায় পর্যন্ত করে, তারপর থেমে যায়। পরিস্থিতি তাকে থামিয়ে দেয়।

আহসান বলল, আমাকে একটা কথা বলো তো। মুহিবের বিষয়ে তোমার পরিকল্পনা কী? তাকে বিয়ে করবে? না সে হবে তোমার দুই ময়ূর মিত্রা এবং চিত্রার মতো পোষা বন্ধু। বাঁদরটার কথা বললাম না। বাঁদরের কথা বললে তুমি আহত হবে এই সম্ভাবনা আছে।লীলা বলল, মনে করুন আপনি আহসান না। আপনি লীলা। আপনি হলে কী করতেন? আপনার honest মতামত কী?

আহসান বলল, তোমার মেন্টাল মেকাপের কাছাকাছি যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। মেয়েদের মেন্টাল মেকাপের কমপ্লেক্সিটি আমার জানাও নেই। কাজেই মতামত দিতে পারছি না। শুধু একটা জিনিস বলতে পারছি, মুহিবের প্রতি তোমার প্রেম নেই।প্রেম নেই?

না। তুমি তার কর্মকাণ্ড দেখে খুশি হও, আবার তোমার পোষা জীবজন্তুর কর্মকাণ্ড দেখেও খুশি হও। তাকে তুমি আশেপাশে অবশ্যই রাখতে চাও। তার শূন্যে ভাসা দেখে মজা পাবার জন্যে বা অন্যান্য কাজকর্মে মজা পাবার জন্যে। এর বেশি কিছু না। সত্যি যদি তার প্রেমে পড়তে, তাহলে তার এতবড় দুঃসময়ে তুমি তার পাশে থাকতে। তুমি কিন্তু পাশে নেই।

লীলা বলল, তার পাশে থাকা মানে তাকে লজ্জা দেয়া। এই লজ্জাটা তাকে দিতে চাচ্ছি না।আহসান বলল, শুধু লজ্জা দেয়া না। লজ্জা পাওয়াও। তুমি লজ্জাটাও পেতে চাচ্ছ না। আচ্ছা লীলা, তুমি কখনো তার বাসায় গিয়েছ? তার মা, বোন, এদের সঙ্গে তোমার দেখা হয়েছে?

না।কোনো মেয়ে যদি সত্যি সত্যি কোনো ছেলের প্রেমে পড়ে, সে তখন এই ছেলের আশেপাশের সবকিছুর প্রেমে পড়ে।লীলা তাকিয়ে আছে। সে এইভাবে কখনো চিন্তা করে নি। আহসান বলল, তোমার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে তুমি সামান্য মন খারাপ করেছ। দাড়াও, মন ভালো করে দেই। মুহিব ছেলেটা কিন্তু তোমাকে অসম্ভব ভালোবাসে! আমি কাল রাতে বিষয়টা টের পেয়েছি।কীভাবে টের পেয়েছেন?

শূন্যে ভাসা ম্যাজিক শিখে আমার ঘর থেকে সে যখন বের হলো আমি তার পেছনে একজন লোক লাগিয়ে দিলাম। তার দায়িত্ব হচ্ছে মুহিবকে ফলো করা।এটা কেন করলেন? তোমার প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে করলাম। তুমি মুহিবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশছ। মুহিব ছেলেটা কেমন জানা দরকার। মুহিব কী করল জানো? কী করল?

অনেক কিছুই করল। হাঁটাহাঁটি। চায়ের দোকানে চা খাওয়ী। একটা পর্যায়ে সে এসে তোমাদের বাসার সামনে দাঁড়াল। তখন রাত বারোটা দশ। তোমার ঘরে বাতি জুলছিল। সে তাকিয়ে ছিল বাতির দিকে। যখন ৰাতি নিভল সে চলে গেল। প্রায় দুঘণ্টা ছিল।লীলা বলল, যে স্পাই লাগিয়ে ছিলেন সে এত Detail মনে রেখেছে?

আহসান বলল, স্পাইটা আমি নিজে। একটা কালো চাদর গায়ে জড়িয়ে বের হয়েছিলাম। মুহিব লক্ষ করে নি। তার অবশ্য চারদিক লক্ষ করার মতো মানসিক অবস্থাও ছিল না।লীলা বলল, খেতে আস। আমার ক্ষিধে লেগেছে। আজ সকাল সকাল খেয়ে নেব।আহসান বলল, তুমি বলা শুরু করেছ? লীলা বলল, হ্যাঁ।সর্বনাশ! সামনের মাসে পনেরো দিনের জন্যে জাপান যাবার কথা। ফিরে এলে আবার আপনি?

জাপান যেও না।আহসান বলল, আমাকে যেতেই হবে, উপায় নেই। একটা কাজ অবশ্য করা যায়। তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া যায়। যাবে? লীলা চুপ করে আছে। পরী মূর্তি ছাদে বসানো হচ্ছে। তার দৃষ্টি সেদিকে। কী সুন্দর দেখাচ্ছে মূর্তিটা! এত জীবন্ত! আহসান বলল, আজ আমার জন্মদিন। লীলা, শুভ জন্মদিন বলবে না? শুভ জন্মদিন।থ্যাংক য়্যু। আমি ঠিক করে রেখেছিলাম, ছাদটা পুরোপুরি গোছানো হলে তোমাকে ছাদে এনে আমার জন্মদিনের কথা তোমাকে বলব। সরি, আগেভাগে বলে ফেলেছি।চল খেতে যাই।

আহসান বলল, খাওয়ার পর ভ্রমণে বের হলে কেমন হয়? দুজন কিছুক্ষণ হাঁটলাম। একসময় ধাক্কা দিয়ে তোমাকে বড় কোনো নর্দমায় ফেলে দিলাম, তারপর টেনে তুললাম। তখন আর আমি পিছিয়ে থাকব না। মুহিবের কাছাকাছি চলে আসব।লীলা হাসল।মুহিব বলল, তোমার মেয়েটা আজ কী বেঁধেছে? জানি না। অনেক আইটেম নিশ্চয়ই করেছে। সে অল্প আইটেম রাঁধতে পারে। না।তুমি কি জানো আসমা কুয়েতের ঐ শেখের কাছে ফিরে যাচ্ছে? তাই না-কি?

হ্যাঁ, কুয়েতের বদ শেখটা আসমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। সে জানিয়েছে আসমার কথা তার খুব মনে পড়ে। প্রায়ই তাকে স্বপ্নে দেখে। আসমা এতেই খুশি। সে এখন ফিরে যাবার জন্যে তৈরি। মেয়েরা কত অল্পতে খুশি হয় দেখেছ? ক্রিমিনাল লইয়ার হামিদুজ্জামানের চেম্বারে মুহিব বসে আছে। তার কাছে আসার কোনো ইচ্ছা মুহিবের ছিল না। নিলি ম্যাডাম তাকে পাঠিয়েছেন। যদি কেউ কিছু করতে পারে হামিদুজ্জামানই পারবে। হামিদুজ্জামানকে পঞ্চাশ হাজার টাকা আপাতত দেয়া হয়েছে। হামিদুজ্জামান বললেন, উকিল আর ডাক্তার এদের কাছে কিছু গোপন করবে না। গোপন করলে নিজেদেরই সমস্যা। বলো দেখি তোমার কাছে এখন ক্যাশ টাকা কত আছে?

মুহিব বলল, পাঁচ লাখের সামান্য বেশি। উত্তরখানের জমি বিক্রি করেছি। টাকা দিয়ে মামলা মিটমাট করব এইজন্যে। মেয়ের বাবা আশরাফ সাহেব পাচ লাখ টাকার বিনিময়ে মামলা তুলে নিবেন বলেছেন।হামিদুজ্জামান বললেন, মুখে মামলা তুলে নিলাম বললে তো হবে না। মেয়েকে এবং মেয়ের বাবাকে কোর্টে এসে বলতে হবে মামলা মিথ্যা। তারপর তারা ফেঁসে যাবে। মিথ্যা মামলা করার জন্যে জেলে ঢুকতে হবে। বুঝেছু ঘটনা? বুঝার চেষ্টা করছি।জমি কার কাছে বিক্রি করেছ?

হিশাম চাচার কাছে। উনি বাবার বিজনেস পার্টনার। বাবার বিজনেস নিয়ে নেয়ার জন্যে মামলা উনি করিয়েছেন। সালমা মেয়েটা তার ভাগ্নি। দূরসম্পর্কের ভাগ্নি।জমির দখল ছেড়ে দিয়েছ? জি-না। আমার মা এবং অশ্রু এখনো উত্তরখানের বাড়িতে আছেন। হিশাম চাচা সাতদিন সময় দিয়েছেন। আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নাই।

দখল ছাড়বা না। কোনোভাবেই না। আমরা উল্টা মামলা করব— জোর জবরদস্তি করে জমির দলিল করে নিয়েছে। বাঘ তখন ধান খাবে। দবিরকে পাঠাব। দবির এক ফাঁকে হিশাম আর মেয়ের বাপ— এই দুইটাকে ডলা দিয়ে আসবে।দবির কে?

আছে একজন। তার সঙ্গে তোমার পরিচয় মা হওয়াই ভালো। আমি ক্রিমিনাল লইয়ার। কিছু ক্রিমিনাল আমার পোষা থাকবে না। এখন আমাদের একটা কাজ করতে হবে। জমির বায়না যে তারিখে হয়েছে, তার আগের কোনো তারিখে থানায় জিডি এর ব্যবস্থা নিতে হবে। সেখানে থাকবে হিশাম তোমাকে ভয়-ভীতি দেখাচ্ছে।মুহিব বলল, ব্যাক ডেটে জিডি এন্ট্রি কীভারে হবে।হামিদুজ্জামান বিরক্ত মুখে বললেন, সেটা তো তোমার দেখার বিষয় না। আমার দেখার বিষয়। বুঝেছ কিছু?

বুঝার চেষ্টা করছি।পত্রিকায় আমার পোষী লোক আছে।ক্রয়/তোমার বাবাকে নিয়ে একটা ফিচার। লিখবো।কী ফিচার লিখবে? লিখবে—একজনু সুম্মানিত শিক্ষক এবং এ দেশের প্রথম সারির গীতিকার ষড়যন্ত্রের শিকার। মিথ্যা অপবাদে তাকে জেলে পাঠানো হয়েছে এবং তার বিষয়ছপত্তি ইতিমধ্যেইvদলিল রেজিস্ট্র করে নিয়ে নেয়া হয়েছে দলিলের কপি ছেপে দেয়া হবে। এইখানেই শেষ না আরো বাকি আছে।আর কী বাকি? মেয়েটার নাম কী সালমা

জি।আমরা প্রমাণ করব আলম অতিদুষ্ট উইল ড্রাগ অ্যাভিষ্ট এক তরুণী। অসামাজিক কার্যকলাগালিভার কিছুছবি আমরা যোগাড় করব। নেংটা পুংটা ছবি প্রয়োজনে সস্তা কিছু ম্যাগাজিনে ছেপে দিব।

ছবি কোথায় পাবেন।ছবি ম্যানুফেকচার করা হর। পুরনো আমল নয় যে গান হবে—তুমি কি কেবলি ছবি শুধু পটে আঁকা? এই সময়ের গান হচ্ছে, তুমি কি নগ্ন ছবি? কম্পিউটারে আঁকা? হা হা হা।মুহিব বলল, চাচা,আমি এর মধ্য দিয়ে যাব তোমার বাবার সাত বছরের জেল হয়ে যাবে, তারপরেও যাবে না? না। হামিদুজ্জামান টেবিলের ওপর খানিকটা ঝুঁকে এসে বললেন, তুমি বরং এক কাজ করা আমার সঙ্গে কন্ট্রাক্টে আসি।কী কন্ট্রাক্ট?

তোমার কাছে পাঁচ লাখ টাকা আছে। সেখান থেকে চার লাখ আমাকে দাও। তোমাকে কিছুই করতে হবে না, নাকে সরিষার তেল কিংবা অলিভ ওয়েল যে কোনো একটা দিয়ে ঘুমাবে। আমার দায়িত্ব তোমার বাবাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসা। আরো সহজ করে দেই। টাকা এখন দিতে হবে না। তোমার বাবা ছাড়া পেয়ে আসুক তারপর দিবে।

চাচা, আপনাকে কিছু করতে হবে না।আমাকে যে পঞ্চাশ হাজার দিয়েছ সেটা কিন্তু গেল।গেলে গেল।তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করা হয় নাই। তুমি কর কী? আমি তেমন কিছু করি না। চাকরি খুঁজি।

পড়াশোনা কতদূর?

বিএ পাশ করেছি।

রেজাল্ট কী?

থার্ড ক্লাস।

বিবাহ করেছ?

না।

চা খাবে?

জি-না।

আরে বাবা, এক কাপ চা খাও। এত রাগ কেন? তোমার কাছে আমার আরেকটা প্রপোজাল আছে। আমি সরাসরি কথা বলতে পছন্দ করি। এখনো সরাসরি যা বলার বলব। ধানাইপানাই করে নষ্ট করার সময় আমার নাই।মুহিব বলল, বলুন কী বলবেন।

আমার বিষয়সম্পত্তি অনেক। ঢাকা শহরে বাড়ি আছে তিনটা। চালু দোকান আছে দুটা। দুটাই বসুন্ধরা কমপ্লেক্সে। আমার একটাই মেয়ে। সে বেহেশতের দূর না, আবার খারাপও না। ফিজিক্সের মতো কঠিন বিষয়ে M.Sc, পড়ছে। অনার্সে ফার্স্টক্লাস পেয়েছে। আমার মানিব্যাগে তার ছবি আছে। যদি চাও দেখাতে পারি। আমি নিজে অসৎ বলেই একজন অতি সৎ ছেলের সন্ধানে আছি। পাই না। বাংলাদেশে সব ধরনের পাত্র আছে, সৎপাত্র নাই। তুমি রাজি থাকলে আমি তোমার এবং তোমার পরবর্তী জেনারেশনের সব সমস্যার সমাধান করে দেব।

মুহিব বলল, চাচা, আমি উঠলাম। যা করার নিজেই করব।হামিদুজ্জামান থুথুদানে থুথু ফেলতে ফেলতে বললেন, তুমি যা করবে তা হলো বুড়া বাপকে সাত বছর জেল খাটাবে।মুহিব রাস্তায় কিছুক্ষণ এলোমেলো হাঁটল। বাবার সঙ্গে দেখা করার কথা আছে। এখনো সময় হয় নি। আগে থেকে জেলখানার গেটে বসে থাকার মানে হয় না। সে দুটা বেদনা কিনল। আলাউদ্দিন স্বপ্নে দেখেছেন বেদানা খাচ্ছেন। আজকাল প্রায়ই তিনি স্বপ্নে নানান খাদ্যদ্রব্য খেতে দেখেন। মুহিবকে সেইসব কিনে নিয়ে যেতে হয়।

হাঁটতে হাঁটতে মুহিব আজ দিনের কাজগুলি গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করল। ডিরেক্টর সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে হবে। নতুন একটা নাটক নিয়ে তিনি কথা বলবেন। লীলার সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয় না। একবার লীলাকে দেখে আসা দরকার। আজ শেষরাতে সে স্বপ্নে দেখেছে, লীলা তার সঙ্গে ঝগড়া করছে। শাড়ি আঁচলে পেঁচিয়ে কঠিন ঝগড়া। মুহিব ঝগড়ার বিষয়টা মনে করার চেষ্টা করল। কিছুতেই মনে পড়ছে না। হঠাৎ কোনো একদিন মনে পড়বে।

লীলাকে একটা টেলিফোন কি করবে? তার মোবাইলে ক্রেডিট নেই বললেই হয়। মুহিব মনে মনে বলল, লীলা, আমাকে একটা টেলিফোন কর। প্লিজ লীলা কর। টেলিপ্যাথির মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা। হিমুর একটা বইয়ে এরকম আছে। হিমু এই ভঙ্গিতে যোগাযোগ করতে পারত। বাদলের সঙ্গে তার কথা বলা দরকার। সে চোখ বন্ধ করে বলত–বাদল। বাদল। সঙ্গে সঙ্গে বাদলের টেলিফোন।মুহিবের টেলিফোন বাজছে। আশ্চর্য, লীলার টেলিফোন। লীলা বলল, আজ সন্ধ্যায় তুমি কী করছ? মুহিব বলল, কেন বলো তো?

আজ রাতে তোমার নাটকটা দেখাবে। তোমাকে নিয়ে একসঙ্গে দেখতাম। তিনজন মিলে দেখব। আমি, তুমি আর আহসান সাহেব।মুহিব বলল, না।না কেন? তোমাকে সঙ্গে নিয়ে নাটক দেখতে লজ্জা লাগবে।নিজের নাটক নিজে দেখবে না? নিলি ম্যাডাম দাওয়াত দিয়েছেন। আজ রাতে তাঁর বাসায় নাটকটা দেখব। নাটকের শেষে আমার কী সব ভুল হয়েছে তিনি ধরিয়ে দেবেন।লীলা হাসছে।মুহিব বলল, হাসছ কেন?

লীলা বলল, আমার ক্ষীণ সন্দেহ নিলি ম্যাডাম তোমার প্রেমে পড়েছেন। ছোট্ট উপদেশ দেই, উনার আকর্ষণী ক্ষমতা প্রচণ্ড। তুমি আবার বিপদে পড়ে যেও না।মুহিব বলল, বিপদে পড়ব না, কারণ নিলি ম্যাডাম কাউকে বিপদে ফেলার মানুষ না।লীলা বলল, বাসায় চলে এসো। আহসান সাহেব ছাদে একটা বাগান তৈরি করে দিয়েছেন। এত সুন্দর হয়েছে।মুহিব বলল, এখন আসতে পারব না। বাবার কাছে যেতে হবে। তাকে বেদানা খাওয়াতে হবে। তিনি বেদানা খেতে চাচ্ছেন। লীলা রাখি?

আলাউদ্দিন বেদানার দানা ভেঙে ভেঙে মুখে দিচ্ছেন। আগ্রহ নিয়ে চাবাচ্ছেন। তাকে কেন জানি খুব অসহায় লাগছে। মুখের চামড়া ঝুলে পড়েছে। চোখের দৃষ্টি ছানিপড়ার মতো।আলাউদ্দিন বললেন, তোর পিতা কি বাংলার লট? এক কথায় পঞ্চাশ হাজার টাকা হামিদুজ্জামানকে দিয়ে চলে এসেছিস? আশেপাশে লোকজন না থাকলে এখনই থাপড়ায়ে তোর চাপার দাঁত ফেলে দিতাম। এক্ষণ তাঁর কাছে যাবি। পা ধরে পড়ে থাকবি। বলবি, চাচা মাথা গরম ছিল, ভুল করেছি। আপনি ছাড়া গতি নাই।

মুহিব বলল, উনি তখন নতুন শর্ত দেবেন। বলবেন আমার মেয়েকে বিয়ে কর।বিয়ে করবি। বিয়ে তো করতেই হবে। তুই তার সঙ্গে কন্ট্রাক্টে চলে যা। তুই বল, আপনি বাবাকে রিলিজ করে নিয়ে আসুন। বিনিময়ে আপনার মেয়েকে আমি বিয়ে করব। বাপের জন্যে এই সামান্য কাজটা করতে পারবি না? কথা বলছিস না কেন? পারবি না? না-কি কারো সাথে এর মধ্যে লদকালদকি প্রেম হয়ে গেছে?

বেকার ছেলে আর কিছু পারুক না-পারুক প্রেমটা পারে। তার জন্মই নেয় রোমিওজুলিয়েটের রোমিও হিসেবে। তার চেহারা দেখেই বুঝেছি জটিল প্রেম। নাটকের মেয়ে? তুই তো আবার শুনেছি নাটকে নেমেছিস। নাটকের মেয়েগুলি তো প্রেমের জন্যে জিহ্বা লম্বা করেই রাখে। মেয়েটার নাম কী? নাম বল। মুহিব বলল, নাম জেনে কী করবে?

আলাউদ্দিন হতাশ গলায় বললেন, তাও তো কথা। আমি নাম জেনে কী করব? নাম দিয়ে তুই তসবির মতো জপ করবি। আমার কী? নাম ফুলকুমারী হলে যা, গাধাকমারী হলেও তা।সেন্ট্রি ঘরে ঢুকে বলল, আপনাদের সময় শেষ। এখন যান।আলাউদ্দিন বললেন, বাবারে, আসল কথাই তো বলা হয় নাই।সেন্ট্রি বলল, নকল কথা যা বলেছেন তাতেই হবে।লীলা টিভির সামনে বসে আছে। লীলার পাশে আহসান। কিছুক্ষণ আগে নাটক শেষ হয়েছে। লীলা চোখে রুমাল চেপে বসে আছে। তার কান্না শেষ হয় নি, এখনো তার শরীর ফুলে ফুলে উঠছে।

আহসান বলল, আমি নাটক-সিনেমা বুঝি না, কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি, মুহিবের অভিনয় অসাধারণ। সে তার ব্যক্তিগত হতাশা ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। যখন সে হাসতে হাসতে বলল, আমি চলে যাচ্ছি—কিন্তু আমি চাই তোমার সুন্দর সংসার হোক। তোমার উঠানে তোমার ছেলেমেয়েরা খেলা করুক। তখন তার হাসিতে কান্না ঝরে পড়ছিল। যদিও ডায়ালগ সস্তা ধরনের হয়েছে। তারপরেও।

লীলা বলল, রবীন্দ্রনাথের কবিতার দুটা লাইন বললে অনেক সুন্দর হতো—

আমি বর দিনু দেবী তুমি সুখী হবে

ভুলে যাবে সর্বগ্লানি বিপুল গৌরবে।

আহসান বলল, রবীন্দ্রনাথ ছাড়াই কিন্তু ইমোশন তৈরি হয়েছে। এ তো কম কথা না। মুহিবকে টেলিফোন কর।লীলা বলল, না।আহসান বলল, না কেন?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *