দিঘির জলে কার ছায়া গো শেষ – পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

দিঘির জলে কার ছায়া গো শেষ – পর্ব

মুহিব এখন আছে তার অতি পছন্দের একজন মানুষের সঙ্গে। তার নাম নিলি। এর মধ্যে আমি উপস্থিত হব না।নিলি বলল, আমি একটা ভুল করেছি। এত সুন্দর নাটক হয়েছে। আপনার উচিত ছিল লীলাকে পাশে নিয়ে দেখা। আমি একটা তুচ্ছ অজুহাতে আপনাকে আটকে রেখেছি। সরি। আমি ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলছি। আপনি লীলার কাছে যান। বিশাল একটা ফুলের তোড়া কিনবেন। চকলেট কিনবেন। এবং তাকে একটা বিশেষ কথা খুব গুছিয়ে বলবেন।কী কথা বলব?

আমি বলে দিচ্ছি কী বলবেন। আজ যতটা সুন্দর করেছেন, লীলার সঙ্গে অভিনয় যেন তারচেয়ে সুন্দর হয়। কথাগুলি যেন হৃদয়ের গভীর থেকে বের হয়ে আসে। পারবেন না।পারব।আপনি বলবেন, লীলা! আমি নিতান্তই দরিদ্র একজন ছেলে। চোখে আশা এবং স্বপ্ন ছাড়া আমার আর কিছুই নেই। আমার চারদিক অন্ধকার। তবে আমার বিশ্বাস, তুমি যদি একটা মশাল হাতে আমার পাশে এসে দাড়াও আমি অনেক দূর যাব। বলতে পারবেন?

জি মাডাম, পারব।অভিনয় করে দেখান। মনে করুন এটা চকলেটের বাক্স। আর এই হচ্ছে ফুল। মনে করুন আমি লীলা। কলিংবেল বেজেছে। আমি দরজা খুললাম, ক্যামেরা রোল করছে। অ্যাকশান।মুহিব কথাগুলি বলল। তার চোখ পানিতে ভর্তি হয়ে গেল। সে একবার চোখও মুছল।নিলি বলল, খুব সুন্দর হয়েছে। ছোট্ট একটা ভুল হয়েছে। একটা পর্যায়ে লীলার হাত ধরা প্রয়োজন ছিল। মূল জায়গায় ভুলটা করবেন না।মুহিব বলল, ভুল করব না।

নিলি বলল, একটি মেয়ের ভালবাসাকে আমি যুদ্ধের ট্যাংকের মতো মনে করি। সত্যিকার প্রেমিক-প্রেমিকা ট্যাংকের কঠিন বর্মের ভেতর থাকে। কোনো চড়াইউতরাই ট্যাংককে আটকাতে পারে না। আমার কথা না। আমি এত গুছিয়ে কথা বলতে পারি না। মনে হয় আর্নেস্ট হেমিংওয়ের কথা। উপন্যাসের নাম ফেয়ারওয়েল টু দা আর্মস কিংবা ফর হুম দা বেল টেলস।

মুহিব লীলাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে ফুল নেই। চকলেটের বাক্সও নেই। দোকান বন্ধু হয়ে গেছে বলে কিনতে পারে নি। মুহিব লীলাদের বাড়িতে ঢুকছে না। কারণ গাড়িবারান্দায় আহসান সাহেবের প্রকাও গাড়িটা দেখা যাচ্ছে।আজ সারাদিন বৃষ্টির ছিটেফোঁটা ছিল না। এখন টিপটিপ করে পড়তে শুরু করেছে। আহসানের গাড়ি গেট দিয়ে বের হচ্ছে। মুহিব উল্টোদিকে তাকাল যেন তাকে দেখা না যায়। গাড়ি মুহিবের সামনে এসে থামল। গাড়ির কাচ নামিয়ে আহসান মুখ বের করল।

মুহিব সাহেব, লীলার কাছে যাবেন তো? চলে যান। এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আপনার নাটক দেখে লীলা খুব কেঁদেছে। আমারও চোখের পানি ফেলার ইচ্ছা ছিল। পুরুষমানুষ বলে ফেলতে পারি নি। পুরুষদের errotion দেখানোর অনেক।imitation. গাড়িতে উঠুন, আপনাকে নিয়ে একটা লং ড্রাইভ দেব, তারপর নামিয়ে দেব লীলাদের বাড়ির সামনে।

মুহিব গাড়িতে উঠল।গাড়ি ঝড়ের গতিতে ছুটছে। আহসান নিচু গলায় গল্প করছে।আহসান বলল, লীলার সঙ্গে আমার পরিচয়ের শুরুটা কি জানেন? আপনাদের পরিচয়ের শুরুটা জানি। নর্দমায় পরিচয়। আমাদের সেরকম না। তবে সেই পরিচয়ও ইন্টারেস্টিং। বলব? বলুন।

আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি। হঠাৎ রাস্তার একটা নেড়ি কুকুর আমাকে তাড়া করল। ভয়ে এবং আতঙ্কে অস্থির হয়ে একটা খোলা গেট দেখে ঢুকে পড়লাম। ততক্ষণে কুকুরটা আমাকে কামড়ে ধরেছে। সেই বিশাল বাড়ির বারান্দায় অতি রূপবতী এক বালিকা কী যেন করছিল। আমি আশ্রয়ের জন্যেই বোধহয় মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে অজ্ঞান হয়ে পড়লাম। কুকুরটা আমাকে কামড়াল। মেয়েটাকে কামড়ালি। মেয়ের মা আমাদের উদ্ধার করতে এলেন, তাকেও কামড়াল। ঐ মেয়েই লীলা।লীলার মা আপনাকে খুব পছন্দ করতেন?

আহসান বলল, হ্যাঁ। উনি বলতেন, পাগলা কুকুর তাড়া করে আমার মেয়ের জামাইকে আমার ঘরে ঢুকিয়েছে।মুহিব বলল, লীলার সঙ্গে আপনার পরিচয়ের গল্পটা খুব সুন্দর।আহসান বলল, গল্পটা চমৎকার, কারণ গল্পটা মিথ্যা। লীলার সঙ্গে প্রথম দেখার অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত সিনারিও আমি কল্পনা করি। তারই একটা আপনাকে বললাম। আবার যেদিন দেখা হবে সেদিন আরেকটা বলব। আপনার সঙ্গে আমার কিছু মিলও আছে। আপনি যেমন গভীর রাতে লীলাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন, আমিও থাকি। তফাত একটাই, আপনি থাকেন রাস্তায় দাঁড়িয়ে, আমি থাকি দামি গাড়ির ভেতর। চলুন আপনাকে লীলার কাছে দিয়ে আসি।

ব্রাউন পেপারে মোড়া টাকা টেবিলের ওপর রাখা। মুহিব সালমার বাবা আশরাফ সাহেবকে বলল, টাকাটা নিয়ে এসেছি। আপনি পাঁচ লাখ চেয়েছেন, এখানে চার লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা আছে। বাকিটা আমি এক মাসের মধ্যে দেব।আশরাফ কিছুক্ষণ ব্রাউন পেপারের দিকে তাকিয়ে বিভূবিড় করে নিজের মনে কী যেন বললেন।

ভদ্রলোকের ভাবভঙ্গি, চোখের দৃষ্টি সবই প্রতিবন্ধীদের মতো। তিনি এখন তাকিয়ে আছেন তার সামনে রাখা গ্লাসভর্তি সবুজাভ পানীয়ের দিকে। গ্লাসের পাশে পিরিচে একটুকরা লেবু কাটা। তিনি বললেন, গ্লাসে আছে চিরতার পানি। ভোরবেলা খালি পেটে একগ্লাস চিরতার পানি খেয়ে লেবু দিয়ে মুখশুদ্ধি যে করে তার রোগবালাই হয় না।মুহিব বলল, ও।

আশরাফ বললেন, আরেকটা মহৌষধ হলো কালিজিরা। হাদিসে আছে— মৃত্যুরোগ ব্যতীত সর্বরোগের মহৌষধ কালিজিরা।মুহিব বলল, চাচা, টাকাটা রাখুন। আপনি বলেছিলেন মামলা তুলে নিবেন। আপনাকে আর আপনার মেয়েকে কোর্টে যেতে হবে। আমি টেক্সিক্যাব নিয়ে এসেছি।আশরাফ মুহিবের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি কি আমাকে খারাপ ভাবছ?

মুহিব বলল, জি-না।আশরাফ বললেন, মুখে না বললেও মনে মনে অবশ্যই ভাবছ। তবে বাবা শোন, আমি কিছুদিন সৌদিতে ছিলাম। সেখানে দেখেছি টাকার বিনিময়ে অপরাধ ক্ষমা করা হয়। কেউ যদি খুনও করে, রক্ত ঋণ দিলে তারও ক্ষমা হয়। এই কারণেই তোমার কাছে টাকা চেয়েছিলাম। আমি অতি দরিদ্র ব্যক্তি। ভিক্ষুকের কাছাকাছি।মুহিব বলল, চাচা, টাকাটা রাখুন।

আশরাফ বললেন, বাবা, টাকাটা আমি রাখতাম, কিন্তু বড় একটা সমস্যা হয়েছে। আমার মেয়ে আমার কাছে স্বীকার করেছে, এই জাতীয় কোনো ঘটনা ঘটে নাই। হিশাম সাহেবের আদেশে সে কাজটা করেছে। নিজেই দৌড় দিয়ে আলাউদ্দিন সাহেবের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে চিৎকার শুরু করেছে। দরজা ভেঙে তাকে সবাই বের করেছে। সে অজ্ঞান হবার ভান করেছে। বাবা, অত্যন্ত লজ্জার একটা ঘটনা। আমার মেয়েকে আল্লাহপাক এই কারণে কঠিন শাস্তি দিবেন। নবিজীর শেফায়াত সে পাবে এরকম মনে হয় না।

মুহিব আগ্রহ নিয়ে বলল, তাহলে তো চাচা, ঘটনা অনেক সহজ হয়ে গেল। আপনার মেয়ে কোর্টে গিয়ে আসলে কী ঘটেছে সেটা বলবে। আমার বাবা ছাড়া পাবেন।আশরাফ চুকচুক করে তার সামনে রাখা চিরতার পানি সবটা খেলেন। মুখে লেবুর টুকরা দিয়ে থেমে থেমে বললেন, এই কাজটা আমার মেয়ে করবে না। মেয়েটা নষ্ট হয়ে গেছে। হিশাম মেয়েটাকে নষ্ট করেছে। হিশাম বিপত্নীক মানুষ। সালমাকে বিয়ে করবে— এইরকম লোভ দেখাচ্ছে। সালমা এখন তার সঙ্গেই থাকে। কিয়ামতের আগে আগে এই ধরনের পাপাচার হয়। কেয়ামত নজদিক।

মুহিব বলল, ঘটনা কী ঘটেছে আপনি যদি কোর্টে গিয়ে বলেন তাহলেও মনে হয় হবে।আশরাফ বললেন, আমার পক্ষে কিছু করা সম্ভব না। আমি হিশামের আশ্রয়ে বাস করি। তবে আমি খাস দিলে তোমার পিতার জন্য দোয়া করব। বিচারকের দিলে যেন রহম হয়, তার জন্যে রোজা খব। এবং কোরান খতম দিব। বাবা, তোমাকে কি এক গ্লাস চিরতার পানি দিতে বলব? শরীরের জন্যে অত্যন্ত উপকারী। সারাদিনের নানান কর্মকাণ্ডে শরীরে যে বিষ উৎপন্ন হয়, সব নষ্ট করে দেয়।

মুহিব উঠে পড়ল। এর সঙ্গে কথা বলার আর কিছু নাই।মুহিব গেল হামিদুজ্জামানের কাছে। হামিদুজ্জামান বললেন, ঘুরে ফিরে সেই আমার কাছে? মুহিব বলল, জি চাচা।টাকা এনেছ? না-কি empty handed? টাকা এনেছি। এখানে সাড়ে চার লাখ আছে।চার চেয়েছিলাম, সাড়ে চার এনেছ কেন?

মুহিব কিছু বলল না। হামিদুজ্জামান মানিব্যাগ খুলে তার মেয়ের ছবি বের করলেন। ছবি এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, মেয়ে দেখতে কেমন বলো।জি সুন্দর।সুন্দর কিছু দেখলে বলতে হয় মাশাল্লাহ। বলো মাশাল্লাহ।মুহিব বলল, মাশাল্লাহ।মেয়ের ডাকনাম মায়া। তোমার নামের সঙ্গে মিল আছে। তুমি মুহিব, সে মায়া। স্বামী-স্ত্রীর নামের মিল থাকলে সংসার সুখের হয়। মায়ার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলতে চাও? জি-না।সামনাসামনি কথা বলতে চাইলে গাড়ি পাঠিয়ে তাকে আনাই?

মুহিব বলল, চাচা, আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করব না। আপনি যা টাকা চেয়েছেন, আপনাকে দিলাম। বাবাকে বাঁচান। বিনা অপরাধে উনার জেল হলে দুঃখেই আমার বাবা মারা যাবেন আঠারোই এপ্রিল, রবিবার, দ্রুত বিচার আইনে আলাউদ্দিনের সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়ে গেল। বিচারক তার রায়ে মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষক সমাজের নৈতিক অধঃপতনের জন্যে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন, শাস্তি আরো কঠোর করার ইচ্ছা ছিল। আসামির বয়স এবং স্বাস্থ্য বিবেচনা করে লঘু দণ্ড দেয়া হয়েছে।

আজ বুধবার।মুহিবের মিথ্যাদিবস। সে অপেক্ষা করছে জেলখানার গেটে অজ তার বাবা আলাউদ্দিন মুক্তি পাবেন। তার সাজার মেয়াদ শেষ হয়েছে।মুহিবের পাশে লীলা দাঁড়িয়ে আছে। লীলা বলল, বাবার জন্যে একটা ফুলের মালা আনার দরকার ছিল না?

মুহিব বলল, বাবা কোনো রাজনৈতিক নেতা না লীলা যে ফুলের মালা গলায় দিয়ে তাকে বের করতে হবে।দীর্ঘদিন অন্যায় শাস্তি তিনি ভোগ করেছেন। একটা ফুলের মালা তার অবশ্যই প্রাপ্য।এখন ফুলের মালা আমি পাব কোথায়? লীলা বলল, ফুলের মালা আমি নিয়ে এসেছি।গুড।লীলা বলল, আমাকে কি তোমার বাবা পছন্দ করবেন?

মুহিব বলল, না। উনি কাউকেই পছন্দ করেন না। তবে দীর্ঘদিন জেলে থেকেছেন। তার মানসিকতা বদলাতেও পারে।লীলা বলল, আজ যে তোমাকে রাজপুত্রের মতো দেখাচ্ছে সেটা কি তুমি জানো? মুহিব বলল, এখন জানলাম।লীলা বলল, তোমার কেমন আনন্দ হচ্ছে একটু বলবে?

মুহিব বলল, বাবা ঘরে ফিরবেন। আগের মতো আমাকে গাধাপুত্র বলে গালি দেবেন, ভাবতেই ভালো লাগছে।লীলা বলল, Home এর defination কি মনে আছে? তোমাকে শিখিয়েছিলাম।মুহিব বলল, Home is the place where if you want to go there, they have to take you in.

লোকজন মুহিবকে চিনতে পেরেছে। তাকে ঘিরে ভিড় বাড়ছে। ক্রমাগত মোবাইল ক্লিক ক্লিক করছে। ছবির পর ছবি উঠছে। ভিড় সামলানোর জন্যে পুলিশ এসেছে। পুলিশের ওসি ওয়াকিটকিতে আরো কিছু পুলিশ চেয়েছেন। ওসি সাহেব মুহিবকে বললেন, স্যার, আপনি গাড়িতে বসুন। সব কন্ট্রোল করা যাবে না। পাবলিকের বিশ্রী স্বভাব, সেলিব্রেটি দেখলে হুশ থাকে না।

মুহিবের মা এবং বোন জেলগেটে আসে নি। অশ্রুর বিয়ে হয়েছে। সে স্বামীর সঙ্গে রাজশাহীতে থাকে। তাদের একটা মেয়ে হয়েছে। মেয়ের নাম মুহিব রেখেছে নিলি। এই নাম অশ্রু বা অশ্রুর স্বামীর কারোই পছন্দ হয় নি। মুহিব বলেছে—এই নামের মেয়ের হার্ট হয় পৃথিবীর মতো বড়। নামটা রেখে দেখ! অশ্রু স্বামী এবং মেয়েকে নিয়ে ভোরবেলা ঢাকা পৌঁছেছে। নিলির সামান্য জ্বর এসেছে বলে তারা আসে নি। অশ্রুর স্বামীর নাম সাজ্জাদ। তার ভুবনে স্ত্রী এবং মেয়ে ছাড়া আর কিছুই নেই। মাঝে মাঝে অশ্রুর খুবই বিরক্ত লাগে

সে বলে, আমি খাটের নিচে যে ভূতটা দেখতাম তুমি তারচেয়ে খারাপ। ভূতটা শুধু রাতে থাকত। তুমি দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা থাক। ভূতটার চেহারার সঙ্গে তোমার মিল আছে। ভূতটার মাথায় চুল ছিল না। তোমার মাথায় টাক। ভূতটার মুখ ছিল লম্বা, তোমার মুখও লম্বা। কোনো কথাতেই সাজ্জাদের কিছু হয় না। সাজ্জাদের ধারণা, অশ্রু যখন বেশি রাগারাগি করে তখন তার চেহারা অনেক সুন্দর হয়ে যায়। তার দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে।

রাজিয়া বেগম জেলগেটে যান নি। কারণ তার অনেক কাজ। মানুষটা কতদিন পরে ঘরে আসবে। ঘরের ভাত খাবে। দীর্ঘ ছয় বছরের জেলখানায় এক বছর শাস্তি রেয়াত হয়েছে, জেলের বছর নয় মাসে হয়) কত কথা জমা আছে। কোনটার পর কোনটা বলবেন সেটা একটা সমস্যা।

অশ্রুর বিয়ের দিন কত বড় ঝামেলা হলো। বিয়ে ভেঙে যায় ভেঙে যায় অবস্থা। তারপর হঠাৎ করেই সব সমস্যার কী আশ্চর্য সমাধান! অশ্রুর স্বামীকে শুরুতে তার পছন্দ হয় নি। বুড়োটে চেহারা। মাথায় চুলের বংশও নাই। কথাবার্তাও যেন কেমন কেমন। অর্ধেক কথা বলে তো অর্ধেক বলে না। এখন মনে হচ্ছে, এরকম জামাই পাওয়া যে-কোনো মেয়ের জন্যেই ভাগ্যের কথা।

হিশাম সাহেবের গল্পটা গুছিয়ে বলতে হবে। সালমা মেয়েটাকে বিয়ে করেছে। ধুমধাম করে। বিয়ের কার্ড দিতে এসেছিল। কী সুন্দর সুন্দর কথা–ভাবি মেয়েটাকে উদ্ধারের জন্যে এই কাজটা করলাম গাঁয়েক গছে কে এই মেয়েকে বিয়ে করবে বলুন?

মুহিবের ফ্ল্যাট কেনার ঘটনাটা সুন্দর করে বলতে হবে। ঘটনা বলতে গিয়ে আগপিছ হয় কি-না সেই ভয়ও আছে। আগপিছ হলে ঘটনার মজাই শেষ হয়ে যাবে। একদিন মুহিবকে নিয়ে গেল। ফ্ল্যাট দেখাতে সে চারতলার একট ফ্ল্যাট কিনেছে। এখনো লিফট বসে নি। তিনি বললেন, বাবারে, আমি তো সিঁড়ি বাইতে পারব না। মুহিব বলল, কোনো চিন্তা নাই মা। আমি কোলে করে তুলব।রাজিয়া বললেন, পাগল না-কি? তুই কোলে করে তুলবি কীভাবে?

মুহিব বলল, দেখ না কীভাবে তুলি। সত্যি সত্যি সে তাঁকে কোলে করে চারতলায় তুলে বলল, সবচেয়ে সুন্দর ঘর ঘর কোনটা মা খুঁজে বের কর। তিনি খুঁজে বের করলেন। বারান্দাওয়ালা বিরাট ঘর। দক্ষিণ দিকে জানালা। সারাক্ষণ হাওয়া আসছে। মুহিব বলব, মা, এই ঘরটা তোমার আর বাবার। এই ঘরের পাশের ঘরটাও তোমার। বাবার সঙ্গে যখন রাগারাগি হবে, তখন এই ঘরে দরজা বন্ধ করে ঘুমাবে।

মুহিব তার বাবার ঘরটা আগের মতো করে সাজিয়েছে। পুরনো চটি জুতা। পুরনো কাপড়। দেয়ালে ফ্রেমে বাঁধানো মুহিবের ছেঁড়া BA-র সার্টিফিকেট। টিভি নষ্ট হয়ে গেছে বনে টিভি কেনা হয়েছে। একটা বেতের ইজিচেয়ার কেনা হয়েছে। ঘরে এসি লাগানো হয়েছে। মানুষটা যেন এসির বাতাসে আরাম করে ঘুমাতে পারে।রাজিয়া বেগম দুপুরের খাবার আয়োজন করছেন। কাজের ছেলেটি বাজার নিয়ে এসেছে। ঘরে রান্নার মেয়ে আছে। রাজিয়া ঠিক করেছে আজ নিজেই রাঁধরেন। সবই মুহিবের বাবার পছন্দের খাবার।

করল ভাজি (সঙ্গে কুচি কুচি আলু দিতে হবে। অল্প ভাজা হবে, যেন করলা সবুজ থাকে।)

সাজন (সর্ষে বাটা দিয়ে, সঙ্গে কাঁচামরিচ।)

কৈ মাছের ঝোল (টমেটো দিয়ে। কাঁচা টমেটো পেলে ভালো হয়।)

মাষকালাইয়ের ডাল (সঙ্গে টাকি মাছ দিতে হবে।)

রাতে করবেন হাঁসের মাংস। চালের আটার রুটি।

মুহিবকে ঘিরে ভিড় প্রচও বেড়েছে। ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়েছে। লীলা ডানে সরতে সরতে ঝুপ করে নোংরা নর্দমায় পড়ে গেল। পুরনো দিনের কথা মনে করে খিলখিল করে হেসে ফেলল। প্রকৃতি বড়ই অদ্ভুত। প্রকৃতি পুনরাবৃত্তি পছন্দ করে।আলাউদ্দিন জেলগেট থেকে বের হয়েছেন। মুহিব ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেছে।আলাউদ্দিন বলেন, নর্দমায় পড়ে আছে মেয়েটা কে?

মুহিব বলল, বাবা, ও তোমার বৌমা। ওর নাম লীলা।আলাউদ্দিন ছেলেকে কঠিন ধমক দিলেন, বৌমা নর্দমায় পড়ে আছে, তুই তাকে তুলবি না? গাধা। অর্ধমানব।লীলার হাতে ফুলের মালা। সে চেষ্টা করছে মালায় যেন নোংরা না লাগে

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *