‘আপনি নিশ্চয়ই দাবী করেন না যে আপনি একজন দেবদূত। আকাশ থেকে পড়েছেন।

কি যে বলেন। দেবদূত হতে যাব কেন?”
এষা গলার স্বর নামিয়ে বলল, সায়েন্স ফিকশানের কোন ক্যারেক্টার না তাে ?
আপনার কথাটা বুঝতে পারছি না।
‘সায়েন্স ফিকশানে এরকম প্রায়ই পাওয়া যায় – ভবিষ্যতের একজন মানুষ টাইম মেশিনে করে অতীতে চলে এসেছেন – আপনি তেমন কেউ না তাে? ম্যান ফ্রম দ্যা ফিউচার ?”
‘না – তা না। তবে ...‘।
তবে কি ? ‘হলে মন্দ হত না।
লােকটি মুখ টিপে হাসল। সে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। তার চোখ কালাে। তবু কালাে চোখেও কোথায় যেন নীলচে ভাব আছে।
এষার কেন জানি ভয় ভয় করতে লাগল। যদিও সে জানে ভয়ের কোনই কারণ নেই। কাঁঠাল গাছের নীচে বসে থাকা লােকটি আধা পাগল ধরনের মানুষ। এই ধরনের মানুষ নিজস্ব ভঙ্গিতে কিছু কথাবার্তা বলে। যেসব কথাবার্তা সাধারণ মানুষের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়।
এষা
‘তুমি কি একটু পরীক্ষা করে দেখবে আমি ডিকশনারীটা পুরােপুরি মুখস্থ করতে পেরেছি কিনা।
‘আপনি আমাকে তুমি করে বলছেন কেন?”
‘আচ্ছা আর বলব না। আপনি কি দয়া করে দুএকটা কঠিন ইংরেজী শব্দ জিজ্ঞেস করবেন – আমি দেখতে চাই ডিকশনারী মুখস্থ করতে পারলাম কি না।
এষা কিছু না বলে উঠে চলে গেল। লােকটা আবার ডিকশনারী খুলে বসল। তার গায়ে চৈত্র মাসের কড়া রােদ এসে পড়েছে। সেদিকে তার জুক্ষেপও নেই। ঘণ্টাখানিক এইভাবেই পার হল। তখন মন্টুকে শিস দিয়ে আসতে দেখা গেল। সে
উৎসাহের সঙ্গে বলল, ব্রাদার কি করছেন?
‘কিছু করছি না।” ‘রােদে তাে ভাজা ভাজা হয়ে গেলেন। চলুন ঘুরে আসি। ‘কোথায়?”
‘আরে ব্রাদার চলুন না। গাড়ি করে যাব। গাড়ি করে ফিরে আসব। গায়ে হাওয়া লাগবে।
‘চলুন। ‘আপনার সঙ্গে আমার এখনাে পরিচয় হয়নি। আমার সমস্যা কি জানেন? আমি আগ বাড়িয়ে লােকের সঙ্গে কথা বলতে পারি না। কেউ আমার সঙ্গে কথা বলতে এলে – খুবই ভাল কথা। কথা বলব। সেধে চা খাওয়াব। সিগারেট অফার করব। কেউ নিজের থেকে আমার কাছে না এলে আমি ভুলেও কিছু বলব না।
গাড়িতে উঠতে উঠতে মিস্টার আগস্ট বলল, আমরা যাচ্ছি কোথায়?
মন্টু দরাজ গলায় বলল, চলুন না ভাই – শালবন দেখে আসি। চৈত্র মাসে শালবনের একটা আলাদা বিউটি আছে।
রাস্তা ফাঁকা, গাড়ি চলছে ঝড়ের গতিতে। লােকটি পেছনের সীটে চোখ বন্ধ করে পড়ে আছে। মন্টু খানিকটা অস্বস্তি বােধ করছে। একটা বিড়াল দূরে কোথাও ছেড়ে দিয়ে আসা এক কথা আর একটা জলজ্যান্ত মানুষ ছেড়ে দিয়ে আসা ভিন্ন কথা। কেমন যেন খুঁত খুঁত করছে। মন্টু উঁচু গলায় বলল, ব্রাদারের কি ধূমপানের অভ্যাস আছে?
‘বি না।।
‘বেঁচে গেছেন। অসম্ভব পাজি নেশা। টাকা নষ্ট, স্বাস্থ্য নষ্ট। আমার দেড় প্যাকেটের মত লাগে। আগে দু প্যাকেট লাগতাে। কমিয়ে দেড় করেছি।”
লােকটি জবাব দিল না। সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছে। মন্টু একের পর এক সিগারেট টেনে যেতে লাগল। সে বুঝতে পারেনি তার এতটা অস্বস্তি লাগবে।
গাড়ি এসে মৌচাকে শালবনের কাছে থামল। মন্টু ক্ষীণস্বরে বলল, ব্রাদার নামুন।
লােকটা নামল। হাসিমুখেই নামল। ‘ব্রাদার আপনার হাতে এটা কি বই?” ‘ডিকশনারী। ‘ডিকশনারী নিয়ে ঘুরাঘুরি করছেন। ব্যাপার কি?”
‘ডিকশনারীটা মুখস্থ করে ফেলেছি চৰ্চার ব্যাপার তাে, চর্চা না থাকলে ভুলে যাব। এই জন্যে সঙ্গে সঙ্গে রাখি। সময় পেলেই পাতা উল্টাই।”
‘সত্যি মুখস্থ করে ফেলেছেন?”
হ্যা।
বলেন কি ব্রাদার, আপনি তাে মহাকাবিল লােক। দেখি ডিকশনারীটা দিন তাে আমার হাতে।
লােকটা ডিকশনারী মন্টুর হাতে তুলে দিল। মন্টু পাতা উল্টে বলল, বলুন
তাে Meed মানে কি?
‘মীড শব্দটার মানে হল পারিশ্রমিক। ‘গুড, হয়েছে। এখন বলুন ম্যালানিন মানে কি?” ‘ম্যালানিন হচ্ছে কৃষ্ণকায় জাতির চুলের ও ত্বকের কৃষ্ণবর্ণ। ‘ভেরী গুড। এবার বলুন শেরাটন মানে কি? ‘শেরাটন হচ্ছে অষ্টাদশ শতাব্দীর আসবাবপত্রের অনাড়ম্বর নির্মাণশৈলী।
‘হয়েছে। আমি তাে জানতাম শেরাটন হােটেলের নাম। ব্রাদার আপনি তাে কাবিল আদমী।‘কাবিল আদমী ব্যাপারটা কি?” ‘কাবিল আদমী হল গ্রেটম্যান। আপনার বয়স অল্প। আরেকটু বেশী বয়স হলে আপনার পা ছুঁয়ে সালাম করে ফেলতাম। অনেস্ট। আপনি তাে ব্রাদার সুপারম্যান। আসুন এই গাছটার নীচে বসি। ব্রাদারলি কিছু কথাবার্তা বলি।
দু’জনে গাছের নীচে বসল। মন্টু বলল, সঙ্গে চা থাকলে ভাল হত। গাছের নীচে বসে চা খেতাম। গ্রেট মিসটেক হয়ে গেছে।লােকটা বলল, আপনি কি আমাকে এখানে রেখে যেতে এসেছেন? ‘আরে না। কি যে বলেন। আপনাকে খামাখা এখানে রেখে যাব কেন? আপনি বিড়াল হলেও একটা কথা ছিল। আমি আবার বিড়াল ফেলে দিয়ে আসার ব্যাপারে এক্সপার্ট। বিড়াল কিভাবে ফেলে দিয়ে আসতে হয় জানেন? না।
একটা বস্তায় ভরতে হয়। বস্তার ভিতর নিতে হয় কপূর। যাতে কপূরের গন্ধে অন্য সব গন্ধ ঢাকা পড়ে যায়। অনেক দূরে নিয়ে বস্তার মুখ খুলতে হয়। বস্তার মুখ খুলবার আগে বস্তাটা ঝ ঝ করে ঘুরাতে হয় যাতে বিড়ালের দিকভ্রম
‘অনেক কায়দাকানুন দেখি। | ‘হ্যা অনেক। তারপরেও বিড়াল গন্ধ শুকে কে বাসায় চলে আসে। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে মিউ মিউ করে ডাকে। মনটা খুব খারাপ হয় ভাইসাব। আহা! বেচারা কতদূর থেকে হাঁটতে হাঁটতে এসেছে। মন খারাপ হলেও কিছু করার নেই। আবার বস্তায় ভরে ফেলে দিয়ে আসতে হয় আরাে দূরে। আবারাে চলে আসে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মিউ মিউ করে।
Read more