দুই দুয়ারী-পর্ব-(১২)-হুমায়ুন আহমেদ

আমি খেলব না।” আপনার দানগুলি আমি চেলে দেবআপনাকে কষ্ট করতে হবে নাদেবী

না আমার শরীর ভাল নাতা হলে তাে আমাকে একা একাই খেলতে হয়। 

হরিবাবু শুয়ে পড়লেনকাজের মেয়েটা মশারী খাটিয়ে দিয়ে গিয়েছেঘরে বাতি জ্বলছেসেই বাতির আলাে চোখে লাগছেপাশের খাটে বসে লােকটা খট খট শব্দে লুডুর দান ফেলছেহরিবাবু বললেন, বাতিটা নেভাবেন? চোখে আলাে লাগছে।  আচ্ছা আচ্ছনিভিয়ে দিচ্ছি, আপনি ঘুমুনাের চেষ্টা করুন। 

লােকটা বাতি নিভিয়ে বাইরে বেরুতেই ঝমঝম শব্দে বৃষ্টি পড়তে লাগলহরিবাবুর তন্দ্রার মত এসে গেলসঙ্গে সঙ্গে তন্দ্রাও কেটে গেলতিনি বিছানায় উঠে বসলেনকারণ অনেক অনেকদিন আগের একটা ঘটনা তার মনে পড়ে গেছেসেই ঘটনার সঙ্গে আজকের রাতের ঘটনার এত অদ্ভুত মিল হরিবাবুর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। 

বিয়ের পর প্রথম শ্বশুর বাড়ি গিয়েছেনচৈত্র মাস অসহ্য গরমআরতী অনেক রাতে ঘুমুতে এসে বলল এই গরমে তুমি ঘুমুতে পারবে না এক কাজ করলে কেমন হয় এসাে আমরা লুডু খেলিসাপ লুডু। 

তিনি বিরক্ত গলায় বললেন, পাগল নাকি

আরতী লুডু বাের্ড মেলে দিয়ে বলল, সাপ লুডু খেলার নিয়ম জাননা তাে? এক না পড়লে ঘুটি বের হবে না। 

আমি খেলব নাকি সব ছেলেমানুষী করছ। 

তােমার দানগুলি আমি চেলে দেবতােমাকে কষ্ট করতে হবে নাআমি প্রথম দান দেই কেমন

তিনি চুপ করে রইলেনআরতী একা একাই খেলে যাচ্ছেচাল দিচ্ছেউত্তেজনায় তার মুখ ইষৎ লালচেতিনি বিরক্ত গলায় বললেন, অন্য কোথাও গিয়ে খেল তােকানের কাছে খট খট করবে নাঘরের বাতি নিভিয়ে দিয়ে যাও। 

আরতী মুখ কালাে করে ঘরের বাতি নিভিয়ে বাইরে চলে গেলআর তখনি ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। 

এতদিন পর একই ঘটনা আবার কি করে ঘটল? রহস্যটা কি? হরিবাবু ঘর থেকে বের হয়ে এলেনলােকটাকে দেখতে পেলেন না। 

মিস্টার আগস্ট দোতলায় উঠে এসেছে। 

সাবেরের ঘরে হালকা টোকা দিয়েছেসাবের সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে বলল, ভাই আসুন। 

এখনাে জেগে আছেন?” 

আপনার জন্য অপেক্ষা করছিজানতাম রাত তিনটার দিকে আপনি আসবেনবসুন, ঐ চেয়ারে বসুনআমার কাছে আসবেন না‘ 

ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হয়েছেআমাকে ডাবল অসুখে ধরেছে। 

ডাবল নিউমােনিয়া? ভিনানিউমােনিয়া শুধু বা লাংসটা ধরেছেডানটা ঠিক আছে। ডাবল অসুখ বললেন যে?” 

চিকেন পক্স হয়ে গেছে রে ভাইসারা শরীরে ফুটে বের হয়েছেদারুণ ইন্টারেস্টিংএকসঙ্গে কয়েকটি অসুখ সম্পর্কে জানতে পারছি। 

চিকিৎসা করাচ্ছেন? ‘না। রােগের গতিপ্রকৃতি দেখছি, চিকিৎসা করাটা ঠিক হবে নাআবার যদি মরে টরে যান‘সেই সম্ভাবনা তাে আছেইনাে রিস্ক নাে গেইন। 

আমার মনে হয় না আপনি মরবেনমানুষের মনের জোর যখন পুরােপুরি চলে যায় মৃত্যু তখনি আসেআপনার মন শক্তই আছে। 

সত্যি কথা বলেছেনআমার মনের জোর একশগুণ বেড়ে গেছেআমার যে এত বড় অসুখ বাসার কেউ জানেই নাহসমুখে সবার সঙ্গে গল্প করিসবার ধারণা সামান্য ঠাণ্ডাএদিকে চিকেন পক্সে গা পচে যাচ্ছে। 

তাই নাকিহ্যা ঘা হয়ে গেছেইনফেকশনএন্টিবায়ােটিক শুরু করা উচিৎশুরু করবেন না?নাদেখিআরাে কিছুদিন দেখিজর আছে?” 

জ্বর তাে আছেইজ্বর থাকবে না

সাবের উঠে বসল। গলার স্বর নামিয়ে ফিস ফিস করে বলল, আসল ব্যাপার আমি এখনাে আপনাকে বলিনিআমার স্মৃতিশক্তি এখন স্বাভাবিক পর্যায়ে আছেযা পড়ি মনে থাকে। 

অসুখের মধ্যেও পড়ছেন? পড়ব না ? কি বলেন আপনি? ক্রমাগত পড়ে যাচ্ছিকবিতা? কবিতাও পড়ছেন নাকি?” 

সাবের লজ্জিত মুখে বলল, জ্বি তাও মাঝে মধ্যে পড়ছিজানি কাজটা ঠিক হচ্ছে না কিন্তু কেন জানি ভাই ভাল লাগে। 

লােকটা চেয়ারে পা উঠিয়ে বসলসহজ গলায় বলল, সবশেষে যে কবিতাটা পড়লেন সেটা শোনান তাে। 

সত্যি শুনতে চান ? হ্যা চাই” 

সাবের বালিশের নীচ থেকে রুলটানা খাতা বের করললাজুক গলায় আবৃত্তি শুরু করল – 

নারে মেয়ে, নারে বােকা মেয়ে

আমি ঘুমােবাে নাআমি নির্জন পথের দিকে চেয়ে এমন জেগেছি কত রাত, এমন অনেক ব্যথা আকাঙ্ক্ষার দাঁত ছিড়েছে আমাকেতুই ঘুমাে দেখি, শান্ত হয়ে ঘুমোশিশিরে লাগেনি তার চুমাে, বাতাসে উঠেনি তার গান। 

ওরে বােকা, এখনাে রয়েছে রাতি, দরজায় পড়েনি তার টোকা” 

কবিতা পড়তে পড়তে সাবেরের চোখে পানি এসে গেলসে লজ্জিত চোখে তাকিয়ে অপ্রস্তুতের হাসি হাসল। 

লােকটা বলল, সাবের সাহেব আমার একটা কথা রাখবেন? অবশ্যই রাখবকি কথা বলুন তাে?” আপনি ডাক্তারী পড়শােনাটা ছেড়ে দিনকবিতা লিখতে শুরু করুন। 

আপনি পারবেনসবাই সব কিছু পারে না। একেক জনকে একেক ধরনের দায়িত্ব দিয়ে পাঠানাে হয়। 

কে পাঠান?লােকটি এই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে উঠে দাড়ালসাকের দুঃখিত গলায় বলল, চলে যাচ্ছেন? হ্যাকেন বলুন তাে?দেখছেন না ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। ভাবছি বৃষ্টিতে খানিকক্ষণ ভিজব‘বৃষ্টিতে ভিজবেন? আপনি খুবই স্ট্রেঞ্জ মানুষসব মানুষই স্ট্রেঞ্জ। 

হ্যা তাও ঠিকআমারাে বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছা করছে। ‘খুব বেশী করছে? হ্যা খুব বেশীমনে হচ্ছে বৃষ্টিতে ভিজতে না পারলে মরে যাবতাহলে চলে আসুনচলে আসব? বাসার কেউ দেখে ফেললে দারুণ হৈ চৈ করবেকেউ দেখবে নাঠাণ্ডা হাওয়ায় সবাই আরাম করে ঘুমুচ্ছেতাহলে চলে আসি কি বলেন? আসুনউঠতে পারছি না হাতটা ধরে টেনে তুলুন। 

তারা দুজন কাঠাল গাছের নীচে গিয়ে বসলসাবের মুগ্ধ গলায় বলল, অপূর্ব! অপূর্ব

ভােরবেলা মন্টু এসে উপস্থিততার চোখ লালজামা কাপড় কাদাপানিতে মাখামাখিখালি পা, চোখেমুখে কেমন দিশেহারা ভঙ্গিপ্রথমেই দেখা হল এষার সঙ্গেএষা বলল, ব্যাপার কি মামা

মন্টু থমথমে গলায় বলল, ব্যাটা আছে না গেছে? মিস্টার আগস্টের কথা বলছ?” 

আমার কাছ থেকে একটা কথা শুনে রাখতার ত্রিসীমানায় যাবি নাভুলেও ব্যাটার কথা শুনে আমার জীবন সংশয় হয়ে গেলআরেকটু হলে গাছ হয়ে যেতাম। 

গাছ হয়ে যেতে মানে?” 

ইন ডিটেইলস কিছু বলতে পারব নামাথা ঘুরছেরেস্ট নিতে হবেজুতা জোড়াও গেছেনতুন জুতা, পাঁচশ টাকায় কেনাএষা। 

জি মামা ?” 

আমি যে ফিরে এসেছি ঐ লােককে বলবি নাখবরদার না। লােক ডেনজারাস লােকভেরী ডেনজারাসভুজুং ভাজুং দিয়ে আমাকে প্রায় গাছ বানিয়ে ফেলেছিল। 

তুমি এসব কি বলছ মামা। 

মন্টু দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললএষা বলল, মামা তুমি এক্ষুণি বাবার সঙ্গে দেখা করবাবা তােমার জন্যে অস্থির হয়ে আছেনবাবার ধারণা, তােমার বড় রকমের কোন বিপদ হয়েছে। 

বিপদ হতে যাচ্ছিলঅল্পের জন্যে বেঁচেছি। 

মতিন সাহেব মন্টুর বক্তব্য মন দিয়ে শুনলেনমন্টুর গল্প তিনি বিশ্বাস 

করছেন এমন মনে হল নাআবার অবিশ্বাস করছেন তাও মনে হল নামতিন সাহেবের এক পাশে এষা অন্য পাশে মিতুদুজনই গভীর আগ্রহে গল্প শুনছেএষা গল্পের মাঝখানে দুবার হেসে ফেললমন্টু বলল, আরেকবার হাসলে চড় খাবিএকটা সিরিয়াস এক্সপেরিয়েন্স বলছি আর তুই হাসছিস।। 

 তারপর দুলাভাই শুনুন কি হলব্যাটা ফট করে আমার মাথায় গাছ হওয়ার আইডিয়া ঢুকিয়ে দিলমনে হয় ম্যাসমেরিজম জানে

Leave a comment

Your email address will not be published.