দুই দুয়ারী-পর্ব-(১৩)-হুমায়ুন আহমেদ

যাহােক, গাছ হবার জন্যে আমি একটা ফাঁকা জায়গায় দুহাত উপরে তুলে দাঁড়ালামএকটু ভয় ভয় করতে লাগলকি গাছ হব তা জানি নাব্যাটা কিছু বলে যায়নিএকটু দুঃশ্চিন্তাও হচ্ছেআমার ইচ্ছা বটগাছ হওয়াযাহােক, দাড়াতে না দাঁড়াতেই বৃষ্টিঝুম বৃষ্টিদুই দুয়ারীদাড়িয়ে আছি, পঁড়িয়ে আছিকেমন অন্য রকম লাগছেতারপর হঠাৎ লক্ষ্য করলাম পায়ের পাতায় কিড়বিড় করছেশিকড় গজিয়ে যাচ্ছে বােধ হয়আমি দিলাম এক লাফ ...‘ 

এষা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল। 

মন্টু বলল, এষা তুই এখান থেকে চলে যাতুই না গেলে গল্প শেষ করব নাকি রকম ইডিয়টের মত হাসছে। 

এষা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে উঠে গেলমতিন সাহেব একবারও হাসলেন নাশীতল গলায় বললেন, মন্টু তুমি গল্পটা গােড়া থেকে বলকোন কিছু বাদ না 

দিয়ে। 

ডিকশনারী মুখস্থ থেকে শুরু করব?ডিকশনারী মুখস্ত মানে?ব্যাটা তাে ডিকশনারী মুখস্থ করে বসে আছে আপনি জানেন না?” 

না তাে

এতক্ষণ ধরে আপনাকে আমি কি বলছি দুলাভাই? ডেঞ্জারাস লােকওকে এক্ষুণি বাড়ি থেকে বের করে দেয়া দরকারতবে খুব ট্যাক্টফুলি কাজটা করতে হবেযেন বুঝতে না পারে। 

তুমি গল্পটা বলআগে আমি গল্পটা মন দিয়ে শুনিকিছুই বাদ না দিয়ে বলবে। 

মন্টু গল্প শুরু করলমতিন সাহেব গভীর আগ্রহে গল্প শুনছেনতাঁর চোখে পলক পড়ছে নাএষা জুবায়েরকে টেলিফোন করেছেএষা হাসির যন্ত্রণায় ঠিকমত কথা 

পর্যন্ত বলতে পারছে নাজুবায়ের বলল, ব্যাপার কি এত হাসছ কেন? হিস্টিরিয়া হয়ে গেছে নাকি

হিস্টিরিয়া হবার মতই ব্যাপারআমার ছােট মামা মানে মন্টু মামা উনি গাছ হয়ে গেছেন। 

উনি গাছ হয়ে গেছেনকি গাছ বােঝা যাচ্ছে নাউনার ইচ্ছা ছিল বটগাছ হওয়ারহিহিহি...‘ 

কি বলছ ভালমত বল তাে গাছ হওয়া মানে ? এখনাে পুরােপুরি হয়নিপাতা বের হয়নি তবে শিকড় সম্ভবত গজিয়েছে। 

হিহি হি.... শােননা এষা, তােমার কথাবার্তা কিছুই বুঝতে পারছি নাতুমি চলে এসােমামার কাছ থেকে গল্পটা শুনে যাও। 

আমার একটা সমস্যা হয়েছে – অফিসে আটকা পড়েছিএই মুহূর্তে আসতে পারব নাতুমি বরং এক কাজ কর, আমার এখানে চলে এস। গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছিতারপর এক সঙ্গে তােমাদের বাসায় যাবদুপুরে তােমাদের ওখানেখাব এবং তােমার মামার গল্প শুনবরাখলাম, কথা বলতে পারছি না। 

মতিঝিলের একটি হাইরাইজ বিল্ডিংজুবায়েরের অফিসএগারােতলা ফ্লোরের এক-চতুর্থাংশবিদেশী কায়দায় সুন্দর করে সব গোছানােজুবায়েরের অফিস ঘরের বাইরে ছােট্ট কিউবিক্যালে অল্পবয়স্কা একজন তরুণীবসার ভাবভঙ্গি থেকে মনে হচ্ছে হয় স্টেনাে কিংবা রিসিপশনিস্টএষাকে দেখেই মেয়েটি উঠে দাঁড়ালমিষ্টি করে বলল, স্যার ভেতরে আছেনআপনার জন্য অপেক্ষা করছেনএষা এর আগেও দুবার এই অফিসে এসেছেকোন মহিলা স্টেনাে দেখেনিমেয়েটিকে নতুন নেয়া হয়েছে। 

এষ দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। 

জুবায়েরের ঘর ঠাণ্ডাএয়ার কুলার চলছেজানালার সানশেড নামানাে। জুবায়েরের টেবিলে একটি টি পটদুটা খালি কাপ। জুবায়ের বলল, তােমার জন্যে চা বানিয়ে বসে আছি। 

থ্যাংক ইউএকটা মেয়ে দেখলামতােমার স্টেনাে না রিসিপশনিস্ট? দুটোই — অফিসের শােভা বলতে পার। 

কবে স্টেনাে নিয়েছো? এই মাসেইআজ এই মেয়ের দ্বিতীয় দিন। 

জুবায়ের উঠে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলএষা বলল, দরজা বন্ধ করলে কেন

নিরিবিলি চা খাচ্ছি, এই জন্যে দরজা বন্ধ করলামএই দরজার টেকনিক কি জান? ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করলেই বাইরে লাল বাতি জ্বলে ওঠেঅর্থাৎ রেড সিগন্যাল, প্রবেশ নিষেধ। 

এষা শুকনাে গলায় বলল, চা খাবার জন্যে রেড সিগন্যাল লাগবে কেন? প্লীজ দরজা খােল। 

জুবায়ের বলল, তুমি এমন করছ কেন? আমি লক্ষ্য করেছি আমার সঙ্গে একা হলেই তুমি অস্বস্তি বােধ করদুদিন পর আমরা বিয়ে করছিকরছি না

প্লীজ দরজা খােলআমার সত্যি অস্বস্তি লাগছেঅস্বস্তি লাগছে?” 

‘া অস্বস্তি লাগছেশুধু অস্বস্তি না ঘেন্নাও লাগছেবাইরে একটি মেয়ে বসে আছে আর তুমি দরজা বন্ধ করে লাল বাতি জ্বালিয়ে দিলে? ছিঃ| জুবায়ের উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলশীতল গলায় বলল, চা খাওনকি চাও খাবে না

এষা চায়ের কাপে চা ঢাললএকটা কাপ এগিয়ে দিল জুবায়েরের দিকেজুবায়ের চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ঠাণ্ডা গলায় বলল, এষা একটা ব্যাপার আমার ভালমত জানা দরকারতুমি কি আমাকে পছন্দ কর?” 

‘া করিআমাকে বিয়ে করার মানসিক প্রস্তুতি কি তােমার আছে?আছে। 

আমার কিন্তু তা মনে হয় নাতুমি সব সময় আমার কাছ থেকে এক ধরনের দূরত্ব বজায় রাখতে চাওএটা আমি লক্ষ্য করেছিএটা আমার অবজারভেশন। 

তােমার অবজারভেশন ঠিক না

আমাকে তুমি যদি পছন্দ কর, যদি আমাকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করার জন্যে মানসিক প্রস্তুতি তােমার থাকে তাহলে আমার প্রসঙ্গে তােমার কোন রকম দ্বিধা থাকা উচিত নাতােমার ভেতর দ্বিধা আছেবড় রকমের দ্বিধা আছে। 

 তুমি এসব কি বলছ?” 

তােমার ভেতর যে কোন দ্বিধা নেই তা তুমি খুব সহজেই প্রমাণ করতে পার। 

কিভাবে

তুমি নিজে উঠে গিয়ে দরজা বন্ধ করবেলাল বাতি জ্বালিয়ে দেবেতারপর ...। 

তারপর কি?তারপরেরটা তারপরআপাততঃ প্রথম দুটি কাজ কর। 

এষা উঠে দাড়ালশুরুতে তার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল সে দরজা খুলে চলে যাবেতা সে করল নাদরজা বন্ধ করে শুকনাে গলায় বলল, এখন কি ? জুবায়ের তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেলম্বা লম্বা টান দিচ্ছে সিগারেটেঘর সিগারেটের ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে আছে। 

সুরমা ছেলের বিছানার কাছে বসে আছেনসাবেরের আকাশ পাতাল জ্বরদুজন ডাক্তারকে খবর দেয়া হয়েছে। দুজনের কেউই এখনাে এসে পৌছান নিসুরমা থমথমে গলায় বললেন, তাের এমন অসুখ আমি তাে কিছুই জানি না। 

তুমি ব্যস্ত থাক তােমাকে বলিনিএমন কি ব্যস্ত থাকি যে অসুখের খবরটাও বলা যাবে না” 

সাবের ক্ষীণ স্বরে বলল, বৃষ্টিতে ভেজাটা ঠিক হয়নিলােভ সামলাতে পারলাম না। 

কবে বৃষ্টিতে ভিজেছিস?” 

কাল রাত তিনটার দিকেমিঃ আগস্ট বললেন তিনি বৃষ্টিতে ভিজবেন .. . শুনে আমার খুব লােভ লাগল ...‘ 

সুরমা সাবেরকে কথা শেষ করতে দিলেন নাকঠিন মুখে একতলায় নেমে এলেনমিস্টার আগস্টকে পাওয়া গেল নাসে নাকি ঘুরতে বের হয়েছেআরেকটি দৃশ্য দেখে সুরমা খানিকটা চমকালেন হরিবাবু বিছানায় উবু হয়ে বসে একা একা লুডু খেলছেনগভীর মনযােগের সঙ্গে খেলছেনসুরমা যে ঘরে ঢুকেছেন এই দৃশ্যটিও তার চোখে পড়েনি। 

মিতু বলল, বাবা তােমার টেলিফোনমতিন সাহেব বললেন, বলে দে আমি বাসায়নেইতিনি দোতলার বারান্দায় রাখা ইজি চেয়ারে আধশােয়া হয়ে শুয়ে আছেনএকটার পর একটা সিগারেট খেয়ে যাচ্ছেনদুঘণ্টায় টি সিগারেট খাওয়া হয়েছে

Leave a comment

Your email address will not be published.