দুই দুয়ারী-পর্ব-(১৫)-হুমায়ুন আহমেদ

আমাদের এখানে একজন আছেন তার নাম মিঃ আগস্টতাঁর সঙ্গে কি কথা বলেছেন ?” 

কথা বলে দেখবেনচমৎকার মানুষজ্বি আচ্ছা, কথা বলবনিন, অষুধটা খানআমি অষুধ খাব না বলে ঠিক করেছিকখন ঠিক করলেন

দুই দুয়ারীকিছুক্ষণ আগেচোখ বন্ধ করে এই ব্যাপারটাই ভাবছিলামআমি ভেবে দেখলাম কি জানেন? আমি চিন্তা করে দেখলাম এই মুহূর্তে আমার শরীরে আছে লক্ষ কোটি জীবাণুঅষুধ খাওয়া মানে এদের ধবংস করাসেটা ঠিক হবে

আমাদের যেমন জীবন আছে, ওদেরও জীবন আছে সুখদুঃখ আছেএকটি জীবনের জন্যে লক্ষ কোটি জীবন নষ্ট করার কোন কারণ দেখি না। 

ছেলেমানুষি করবেন না অষুধ খাননাঅষুধ থাক আপনি বরং একটা কবিতা শুনুনআগে অষুধ খান তারপর শুনবতার আগে না। 

বললাম তাে অষুধ খাব না। 

হৈমন্তী মতিন সাহেবকে ডেকে নিয়ে এল তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, তুমি নাকি অষুধ খেতে চাচ্ছ না

নাঅষুধ খাওয়া মানে লক্ষ কোটি জীবাণুর মৃত্যুর কারণ হওয়া। 

অষুধ না খেলে তুমি নিজে মারা যাবেতােমার শরীরেও লক্ষ কোটি জীবন্ত কোষ আছেওদেরও মৃত্যু হবে। 

দুই দুয়ারী-পর্ব-(১৫)-হুমায়ুন আহমেদ

তােমার কথা খুবই ঠিক বাবাতবে যুক্তিতে ভুল আছেআমাদের শরীরে লক্ষ কোটি জীবকোষ থাকলেও আমাদের একটি মাত্র চেতনাকিন্তু জীবাণুগুলির স্বাধীন সত্তা আছেএরা প্রত্যেকেই আলাদা। 

তােমাকে কে বলেছে? জীবাণুগুলির সঙ্গে তােমার কি কথা হয়েছে? জ্বি হয়েছে। 

কখন কথা হল

‘পরশু রাতে প্রথম কথা হয়েছে। তারপরেও কয়েকবার কথা হয়েছে। দীর্ঘ সময় তাদের সঙ্গে কথা বলা একটা সমস্যা সবাই এক সঙ্গে কথা বলতে চায় 

আর কথা বলে খুব দ্রুত ...।

তুমি বােধ হয় বুঝতে পারছ না যে তােমার মাথাটা খারাপ হয়ে গেছেআমার কিন্তু তা মনে হয় না, বাবা। 

জীবাণুদের সঙ্গে কথা বলার এই কায়দা তােমাকে কে শিখিয়েছেন? মিস্টার আগস্ট ?

কথা বলছ না কেন? মিস্টার আগস্ট শিখিয়েছেন? কেউ শেখায়নিআমি নিজে নিজেই শিখেছি।’ 

মতিন সাহেব কিছু না বলে বারান্দায় নিজের জায়গায় ফিরে গেলেন। 

সিগারেট শেষ হয়ে গিয়েছিল সিগারেট আনতে পাঠালেনদারােয়ানকে বলে দিলেন মিস্টার আগস্ট আসামাত্র যেন তাকে খবর দেয়া হয়। 

মিতু এসে বলল, এষা আপু এসেছেমতিন সাহেব বললেন, আমার কাছে আসতে বলআসবে নাদরজা বন্ধ করে কাঁদছেকাঁদছে বুঝলে কি করে? শব্দ শােনা যাচ্ছেআচ্ছা, ঠিক আছে যাওকোথায় যাব?কোথায় যাবে আমি জানি নাআপাতত আমার সামনে থেকে যাওতুমি আমার উপর রাগ করছ কেন? আমি কি করলাম

দুই দুয়ারী-পর্ব-(১৫)-হুমায়ুন আহমেদ

যাও আমার সামনে থেকেযাও বলছি। 

মিতুর চোখে পানি এসে গেলসে চোখ মুছতে মুছতে বাবার সামনে থেকে চলে গেল এবং পর মুহূর্তেই ফিরে এসে বলল, বাবা নিশা আপু এসেছে। 

মিস্টার আগস্ট এলেন সন্ধ্যার পর। 

বাসায় তখন তুমুল উত্তেজনাএম্বুলেন্স এসেছে সাবেরকে হাসপাতালে পাঠানাে হচ্ছেসুরমা ব্যাকুল হয়ে কঁদছেননিশা এবং এষা কাদছে না, তবে পুরােপুরি হকচকিয়ে গেছেমিস্টার আগস্টের বাড়িতে ঢােকা কেউ লক্ষ্য করল না সে চলে গেল কাঁঠাল গাছের দিকেসেখানে আগে থেকেই কে যেন বসে আছেমােটাসােটা একজন মানুষ। 

আগস্ট বলল, কে ? লােকটি দারুণ চমকে গেলএকজন বয়স্ক মানুষ এতটা চমকায় না। আগস্ট আবার বলল, ভাই, আপনি কে? আমি সিরাজুল ইসলাম। 

আচ্ছা চিনেছি আপনি মিতুর সবচেয়ে বড় বােনের হাসব্যাণ্ড?” 

এখানে বসে আছেন কেন?বাসায় কান্নাকাটি হচ্ছে আমি ভাবলাম একটু দূরেই থাকিজামাইর কখনাে বাড়ির মেইন স্ট্রীমের সঙ্গে মিশতে পারে নাতাছাড়া বাড়ির কেউ চায়ও জামাইরা তাদের সঙ্গে মিশে যাকভাল কথা, আপনি কে

আমার নাম আগস্টআচ্ছা, আপনি আগস্ট

মাই গডআমি ভেবেছিলাম অদ্ভুত একজন কাউকে দেখবঋষিদের মত চুল, দাড়ি লম্বা, ফর্সাআপনাকে তাে খুবই নরম্যাল একজন মানুষ বলে মনে হচ্ছে। 

দুই দুয়ারী-পর্ব-(১৫)-হুমায়ুন আহমেদ

খুব নরম্যাল নাআমি পুরােনাে কথা কিছুই মনে করতে পারছি নাএ্যামনেশিয়া ?ডাক্তার তাই বলেছে। 

আপনার সম্পর্কে এত সব অদ্ভুত কথা কেন রটছে বলুন তাে? মন্টুকে নাকি গাছ বানিয়ে দিয়েছেন? 

আগস্ট বসতে বসতে বলল, ঠিক বানাইনি, বানানোর কৌশল ব্যাখ্যা করলাম। 

সিরাজুল ইসলাম বিস্মিত হয়ে বললেন, গাছ বানানাের কৌশল আবার কি

আগস্ট কোন জবাব দিল নাসিরাজুল ইসলাম সাহেব একটু সরে বসলেনলােকটা উন্মাদ হতে পারেকিছু কিছু উন্মাদ সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে চলাফেরা করেতাদের পাগলামি হঠাৎ হঠাৎ চোখে পড়েমনে হচ্ছে সে রকম কেউদীর্ঘদিন একে বাড়িতে পােষা হচ্ছে কেন সেও এক রহস্য

সিরাজুল ইসলাম উঠে দাঁড়ালেনআগস্ট বলল, চলে যাচ্ছেন

সিরাজুল ইসলাম জবাব দিলেন নাপাগল মানুষের প্রতিটি কথার জবাব দেয়ার কোনই প্রয়ােজন নেইআগস্ট বলল, আপনার কাছে সিগারেট থাকলে দয়া করে একটা দিয়ে যান। 

সিরাজুল ইসলাম আবার ভাবলেন, বলবেন, আমি সিগারেট খাই নামিথ্যা কথাটা চট করে মুখে এল নাতিনি সিগারেটের প্যাকেট বের করলেন দুটা মাত্র সিগারেটতিনি প্যাকেটটাই কাঠাল গাছের দিকে ছুঁড়ে দিলেন। 

আগস্ট বলল, দিয়াশলাই? দিয়াশলাই না দিয়ে চলে যাচ্ছেনতিনি দিয়াশলাইও ছুঁড়ে ফেললেন। 

সাবেরকে হাসপাতালে নেয়ার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছেএকমাত্র উপায় ছিল জোর করে এম্বুলেন্সে তােলা মতিন সাহেব নিষেধ করলেনঅবােধ শিশুদের উপর জোর খাটানাে যায়সাবের শিশু নয়, অবােধও নয়তাছাড়া যে চিকিৎসা এখানে করা সম্ভব হচ্ছে না সে চিকিৎসা হাসপাতালে কিভাবে করা হবে? মতিন সাহেব কঠিন গলায় বললেন, সাবের, তুমি যে মারা যাচ্ছ তা কি বুঝতে পারছ

পারছি জীবাণুরা আমাকে বলেছেওদের সঙ্গে তােমার কথাবার্তা তাহলে এখনাে হচ্ছে? হঁ্যা, হচ্ছেতুমি যে নিতান্তই পাগলের মত কথা বলছ তা কি বুঝতে পারছ?” 

Leave a comment

Your email address will not be published.