দুই দুয়ারী-পর্ব-(১৭)-হুমায়ুন আহমেদ

আগস্ট বলল, আপনি কি কিছু বলতে চাচ্ছেন? বলতে চাইলে বলে ফেলুনআর সুযােগ পাবেন না। 

দুই দুয়ারীএষা নীচু গলায় বলল, আপনি কে আমি জানি নাজানতেও চাই না হয়ত আপনি কেউ না, সাধারণ একজন মানুষ কিংবা হয়ত বিশেষ ধরনের একজন মানুষ ... আপনি যেই হােন, আমি হাত জোর করে আপনার কাছে একটা অনুরােধ করব। 

করুনভাইয়ার মাথায় যে পাগলামীটা ঢুকেছে তা আপনি দূর করে দিন। 

যাবার আগে আমি অবশ্যই তার সঙ্গে কথা বলবতবে তাতে লাভ হবে কিনা জানি নাসে যা করেছে তা যদি পাগলামী না হয় তাহলে তা দূর করা তাে 

অসম্ভব। 

এষা শান্ত গলায় বলল, আমার একটি ব্যক্তিগত সমস্যাও আপনাকে বলতে চাইবলতে ইচ্ছা করছে বলেই বলছিআমার কোন লাভ হবে বলে বলছি না – 

বলুনআমি খুব মন দিয়ে শুনছি। 

এষা নরম গলায় বলল, একটা ছেলের সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে আছেআমার ধারণা ছিল ছেলেটাকে আমি পাগলের মত ভালবাসিএখন মনে হচ্ছে বাসি নাআবার মনে হচ্ছে বাসিআপনি তাে অদ্ভুত অদ্ভুত সব কথাবার্তা বলেন 

আপনি কি এমন কিছু জানেন যা আমার মনের দ্বিধা দূর করতে পারবে

আগস্ট শব্দ করে হাসল। এষা আহত গলায় বলল, হাসছেন কেন? হাসছি কারণ একটি মেয়ে প্রেমে পড়েছে কি পড়েনি তা জানা খুব সহজকোন মেয়ে যদি প্রেমে পড়ে তাহলে তার মধ্যে কিছু অলৌকিক ক্ষমতা চলে আসেসেই মেয়ে যদি কোন কাচের পাত্রে হাত রাখে সেই পাত্র গঢ়ি নীল 

বর্ণ ধারণ করেআপনি একটি কাচের পাত্রে হাত দিয়ে দেখুন পাত্রটি নীল হচ্ছে কিনা। 

এষা চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বলল, শুধু শুধুই আপনার সঙ্গে কথা বললাম আপনি উদিএর বেশী কিছু নাআমার মনে হয় আপনাকে কোন একটা ঘরে দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয়েছিলদরজা খুলে চলে এসেছেন

দুই দুয়ারী-পর্ব-(১৭)-হুমায়ুন আহমেদ

হতে পারেবিচিত্র কিছু না। 

সাবের ঝিম মেরে পড়ে ছিল। 

রাত প্রায় তিনটাসুরমা ছেলের পাশে শুয়ে আছেনএতক্ষণ তিনি জেগেই ছিলেন, কিছুক্ষণ আগে ঘুমিয়ে পড়েছেননার্স মেয়েটি বারন্দার চেয়ারে জেগে বসে আছেমিস্টার আগস্টকে দেখে সে উঠে দাঁড়ালরুগীর ঘরে ঢুকতে নিষেধ করতে যাচ্ছিল কি ভেবে যেন করল না। 

মিস্টার আগস্ট ঘরে ঢুকলােসাবেরের কপালে হাত রাখতেই সে চোখ মেলে বলল, আমি জেগে ছিলাম। 

তাই নাকি?জ্বিজীবাণুদের সঙ্গে কথা বলছিলামকি কথা

ওদের একটা কবিতা শুনালাম আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে কি জানেন, ওরা কবিতা পছন্দ করেতবে অনেক কিছু বুঝিয়ে দিতে হয়যেমন দরজা দরজা ব্যাপারটা কি ওরা জানে না মজার কথা না

মজার কথা তাে বটেইআপনাকেও কবিতাটা শােনাই। 

আমাকে শুনাবে কেন? আমি তাে আর জীবাণু না” 

সাবের হেসে ফেললহাসতে হাসতেই কবিতা শুরু করল – 

দুহাতে দরজা খুলতেই দেখি তুমি 

যে ব্যথা বুকের মাঝে গােপনে পুষেছিএতােকাল ধরে, সারক্ষণ সাথী ছিল[তােমার বিকল্পরূপে শুধু এই ব্যথা] কি করে নামাই বলাে, তােমাকে দেখেই। 

চারচোখ অপলক শুধু মেলে রাখা কারাে কোন কথা নেই, অথচ কখনঅবাক চোখের ভাষা অতিদ্রুত গতি কেড়ে নিল দুজনের প্রিয়সম্ভাষণ 

কেন যে এমন হলাে, কেন যে এমন। 

মিস্টার আগস্ট বলল, জীবাণুরা আপনার এই কবিতা পছন্দ করেছে

বি যে বললাম, কয়েকটা জিনিস বুঝিয়ে দিতে হয়ছেযেমন চার চোখে চেয়ে থাকা মানে কি, দরজা মানে কি, দুহাত ব্যাপারটা কি? ওদের জগৎ আর আমাদের জগৎ তাে ভিন্ন। 

দুই দুয়ারী-পর্ব-(১৭)-হুমায়ুন আহমেদ

তাতাে বটেইওরাও কি কবিতা লেখে?জিজ্ঞেস করিনি। 

একবার জিজ্ঞেস করে জেনে নেবেনজি আচ্ছা। 

আরেকটা কথা আপনার মৃত্যু মানে তাে ওদেরও মৃত্যুতা নিয়ে ওরা কি দুঃখিত না?” 

নাওদের জীবনটা ক্ষণস্থায়ীস্ফুলিঙ্গের মতউড়ে যাবে, নিভে যাবেওরা এই ব্যাপারটায় অভ্যস্ত। 

আপনার সঙ্গে তাে ওদের এক ধরনের বন্ধুত্ব হয়েছে আপনার মৃত্যুতে তারা কি কষ্ট পাবে না?” 

জিজ্ঞেস করি নি। 

দেখুন না জিজ্ঞেস করে। 

Leave a comment

Your email address will not be published.